Wednesday, July 22, 2020

টেলিপ্লে


এই নিয়ে দুশো বাইশ নম্বর চিঠি পেলেন রাধামাধব। একেবারে নিয়ম বেঁধে। আর্লি রাইজার রাধামাধবের ঘুম ভাঙবে ঠিক ভোর সাড়ে পাঁচটায়; মোবাইলের অ্যালার্মে। আড়মোড়া ভাঙার আগেই বালিশের তলায় চালান করে দেওয়া আঙুলের ডগাটি ঠেকবে গিয়ে খামের আরামদায়ক খসখসে। 

সেই খামটা বালিশের তলা থেকে টেনে বের করে আনতেই একটা মনকেমন করা মিষ্টি সুবাসে ঘর ভরে যাবে। ঠিক যেন ওই শিউলি আর পায়েস মেশানো একটা গন্ধ। সে সুবাস নাকে এসে ঠেকলেই মনে চনমন, প্রাণে ফুরফুর।  

একে মাঝবয়সী মানুষের একার সংসার, তার ওপর বিশ্রী একটা ভাইরাসের ঠেলায় প্রায় বছর দুয়েক  বাড়ির বাইরে এক পাও বেরোনো হয়নি। ইন্টারনেটের ঘ্যাঁচরঘোচর, ওয়ার্ক ফ্রম হোমের হিজিবিজি আর নিষ্প্রাণ হোম ডেলিভারির চোটে প্রাণ প্রায় শুকিয়ে যেতে বসেছিল।কিন্তু সেই শুকনো খটখটে প্রাণে দু'পশলা বৃষ্টির মত এলো এই চিঠি। 

ব্যাপারটা শুরু হয় মাস সাত-আটেক আগে। তা প্রায় ভোজবাজিই বলা চলে।   ভোরবেলা ঘুম ভাঙলেই একটা করে চিঠি। রোজ। সে চিঠির হাতের লেখাটি বড় সুন্দর; ছাপার অক্ষরের মত উজ্জ্বল কিন্তু কাঠকাঠ নয়, বেশ মিষ্টি। সাদা খামের ওপরে যত্নে লেখা নাম; রাধামাধব দত্ত। আর সেই মিঠে হাতের লেখায় নিজের নামটুকু বারবার পড়তে বড় ভালো লাগে রাধামাধবের।  সাদা খামের ভিতরে হলুদ রঙের মোটা কাগজ। তার ওপর নীল কালিতে লেখা একটা গানের প্রথম দুলাইন। 

এক একদিন, এক একটা গান। কোনওদিন হেমন্তবাবুর "জীবনপুরের পথিক" আবার কোনওদিন মান্নাবাবুর "চার দেওয়ালের মধ্যে নানান দৃশ্যকে”। ব্যাস, ও'টুকুই। কার হাত ছুঁয়ে সে চিঠি রাধামাধবের বালিশের তলায় এসেছে, সে’টুকু এত দিনেও জানা গেল না। অবশ্য তা জানার চেষ্টাও করেননি রাধামাধব। ঘুম থেকে উঠে অমন সুগন্ধি চিঠি হাতে পেলে মন যে দিব্যি তরতাজা হয়ে পড়ে, কী হবে চিঠি লিখিয়ের খোঁজ করে? বালিশের তলায় সে চিঠি পৌঁছয় কী করে তা নিয়েও মাথা ঘামাতে ইচ্ছে করে না রাধামাধবের। বড় কথা হল সে চিঠি আসে। রোজ আসে, নিয়ম করে আসে। ম্যাজিকের মত, ছুঁতে না পারা কলেজ প্রেমের মত; ব্যাস। এর বেশি কিছু জানতে রাধামাধবের বয়েই গেছে। 

সে চিঠি খুলে গানের দুলাইন পড়লেই একটা সুরের মখমলে ঢেউ এসে রাধামাধবের বুকে দোলা দেয়। হাত বাড়িয়ে খাটের পাশের টেবিল থেকে বাঁশিটা টেনে নিয়ে সেই গানের সুর ধরেন রাধামাধব। মনের মধ্যে ভালোবাসা জমতে শুরু করে, শিউলি আর পায়েস মেশানো সুবাসে ভেসে যান তিনি। 

****

- এই দ্যাখ বিন্তি। 

- এটা কী রে দাদা। 

- টেলিপ্লে স্পীকার। 

- কী সব গালভরা নাম বলিস রে তুই দাদা। এ'দিকে এ যে দেখছি স্রেফ একটা থ্যাব্যড়া বাক্স। তাও যা মনে হচ্ছে, সস্তা কাঠের। 

- দেখতে থ্যাবড়া বেঢপ বটে। কিন্তু এ হচ্ছে লেটেস্ট টেকনোলজিকাল মিরাকেল। 

- কী'রকম? 

- ঐযে, মানুষদের যেমন গুগল হোম বা আমাজন ইকো বা ওই ধরণের যন্ত্রপাতি? যে গান শুনতে চাইবি অমনি স্পিকারে সে গান বেজে উঠবে? এও তাই, তবে মানুষদের জন্য নয়। তোর আর আমার মত ভূতেদের জন্য।

- যে গান শুনতে চাইব পাব? 

- আলবাৎ। শুধু এই ফোঁকরের মধ্যে দিয়ে একটা চিঠি ফেলে দিলেই হবে। 

- চিঠি?

- সাদা খামের মধ্যে হলুদ কাগজে সে গানের দু'লাইন লিখে দিলেই হবে। 

- সত্যি রে দাদা?

- তুই আমার একমাত্র আদরে বাঁদর বোন, তোকে মিথ্যে বলব রে? ঘোস্টকার্টে মদন তান্ত্রিকের লেটেস্ট রিলিজ। ফ্ল্যাশসেলে কলেক্ট করেছি বিন্তি। শুধু তোর জন্যে। আর প্রচণ্ড কাসস্টোমাইজেবল। ওকে গুগল বা আলেক্সা গোছের একঘেয়ে কম্যান্ডে শুধু সাড়া দেবে, এমন ত্যাঁদড় নয় এই টেলিপ্লে। তুই নিজের পছন্দমত নাম দিতে পারবি এই যন্ত্রের। 

- ফাটাফাটি। আমি কিন্তু সবসময় শুধু বাঁশি শুনব। বলে রাখলাম। 

- বেশ তো, শুনিস'খন । আর এর নামটা কী দিবি?

- রাধামাধব। কেমন?

Monday, July 20, 2020

বটুগোয়েন্দার ইলিশচুরি

- এই যে বউ...।

- অত চেল্লাচিল্লি কেন।

- চেল্লাচিল্লি করার মতই দাঁও মেরেছি।

- চোরের গলায় অত তেজ ভালো না..।

- বিশু দারোগা চোর বলে চোপা করলে গায়ে লাগেনা। কিন্তু তুমিও চোরছ্যাঁচড় বলেই হ্যাটা করবে গো বউ? শিল্পীর কদর করবে না?

- উঁ। ভীড় বাসট্রেন থেকে এর ব্যাগ ওর থলে সরানোও নাকি শিল্প। ধুর ধুর শিল্পী ছিলেন মধুজ্যেঠু। গেরস্ত বালিশে মাথা ঠেকানোর দশ মিনিটের মধ্য সিঁদ কেটে মালপত্তর সরিয়ে হাওয়া।

- আরে সে মান্ধাতা আমলে পড়ে থাকলে চলবে কেন। ইন্টারনেটে চারদিকে কিস্তিমাত হচ্ছে। এ যুগে সিঁদ কাটলে লোক হাসবে যে। তবে যাক। আজ এক্কেবারে কেল্লাফতে করেছি। এই দ্যাখো।

- রামোহ্। চামড়ার দামী ব্যাগ নয়, জমকালো বটুয়া নয়, এ যে দেখি বাজারের থলে...। তাও ময়লা...।

- কিন্তু বউ, এ থলের মধ্যেই যে সাতরাজার ধন। 

- আহ, কী আছে সে'টা বলবে তো।

- ডাউন মেমারি লোকালে ফিরছিলাম। তখনই নজরে পড়ল লোকটাকে। গোবেচারা চেহারা, ট্রেনের দরজার এক্কেরে মুখে দাঁড়িয়ে হাওয়া খাচ্ছেন বাবু। ...দেখেই বুঝেছি এর মাথায় কাঁঠাল ভাঙা বাংলায় বানানভুল করার চেয়েও সহজ। ব্যাস। অমনি পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। তা ভদ্দরলোকের হাতে ঝোলানো থলির ভিতর উঁকি মারতেই বুকের মধ্যে এক্কেবারে যেন সাতশো বত্রিশটা রংমশাল জ্বলে উঠল। ঠিক করে ফেললাম এ ব্যাগ না হাতালেই নয়..। ভদ্রলোক শক্ত করে থলেটা ধরেছিলেন..। প্রথমে ভাবলাম।যে প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে ট্রেন গতি নিলে; সে ব্যাগ শেষ মুহূর্তে ছিনিয়ে ট্রেন থেকে দৌড়ে নেমে পগারপার হওয়াটাই একমাত্র উপায়। কিন্তু মা ভবতারিণীর আজ অসীম দয়া; ছিনতাইয়ের হ্যাপা পর্যন্ত যেতেই হল না। হঠাৎ এক প্যাকেট সল্টেড বাদাম কিনে খেতে শুরু করলেন ভদ্রলোক,হাতের থলেটা পাশে নামিয়ে রেখে। সে বাদামের নেশায় এতটাই বুঁদ হয়ে ছিলেন যে আমি দিব্যি থলে উঠিয়ে পাণ্ডুয়া স্টেশনে স্যাট করে নেমে পড়লাম অথচ সে'টা সেই থলেওলা টেরই পেলেনা। 

- হাউই গপ্প তো অনেক হলো। তা এই থলেতে আছেটা কী?

- দেখাব। তার আগে খোকা আর খুকিকে ডাকো দেখি। ওদের সামনেই না হয়...।

***

- পৌনে দু'কিলো সাইজের ইলিশ?

- করেক্ট।

- দু'টো ইলিশ?

- করেক্ট।

- কোয়ালিটি?

- এ-ক্লাস।

- তুমি জানো সে জিনিসের মার্কেট ভ্যালু কত?

- হিসেব করতে গেলে ভির্মি খেতে হবে। থাক না।

- থাক না মানে? অমন ইলিশ সহ থলে গায়েব হয়ে গেল?

- গায়েব নয়। চুরি।

- বটু গোয়েন্দার ইলিশ মাছের থলি চুরি হল?

- এতে এত অবাক হওয়ার কী আছে সুবিনয়।

- অবাক হব না বটু? থানার বড়বাবুরা তোমার কনসাল্টেশনের জন্য হন্যে হয়ে ঘোরে। দুঁদে ক্রিমিনালরা তোমার নাম শুনলে থরথর করে কাঁপে। তেমন গোয়েন্দার মাছের থলে চুরি হয়ে গেল ট্রেনের ভিড়ে, অথচ সে টেরটিও পেল না। বাজারে এ কথা রটলে তোমার মানইজ্জত থাকবে বটু?

- মানইজ্জতের পরোয়া করলে কি আর ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়িয়ে বেড়াতাম হে সুবিনয়। সে চিন্তা নেই।  ইলিশের থলে চুরি হয়েছে বটে, কিন্তু তা আমায় ফাঁকি দিয়ে হয়নি।

- তার মানে? তুমি টের পেয়েছ যে তোমার থলি চুরি হচ্ছে?

- হাপিসটি হয়েছে পাণ্ডুয়া স্টেশনে। আর চুরিটা হয়েছে আমার সুপারভিশনে।

- তার মানে?

- চুরিটা আমি অ্যালাউ করেছি।

- তুমি চুরিটা হতে দিয়েছ?

- করেক্ট।

- তুমি দেখেছ সে চোরকে?

- বয়স পঁয়তাল্লিশ থেকে সাতচল্লিশের মধ্যে। একমাথা এলোমেলো ময়লা চুল, নীল শার্টটিকে আর যাই হোক নতুন বলা চলে না। ট্রাউজারটা এককালে হয়ত মিশকালো ছিল, এখন ফ্যাকাসে। পায়ে সস্তা হাওয়াই চটি। হাতে একটা পুরনো ইলেকট্রনিকস ঘড়ি, নেহাৎ শস্তা নয় তবে সে'টি যে চুরির মাল সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত। 

- তা এই লোকটিকে তুমি তোমার থলে সরাতে দিলে?

- দিলাম। ইনফ্যাক্ট, যতটা সম্ভব সাহায্য করলাম। 

- খোলসা করো হে বটু।

- চোরের হাবভাব আমি বিলক্ষণ চিনি। তাঁদের আঙুল আর কবজির মুভমেন্ট, চোখের ধারলো ফোকাস আর ঠোঁটের পরিশীলিত উত্তেজনা; এই কম্বিনেশনটা নিশ্চিত ভাবে ঠাহর করতে পারাটা যে কোনও গোয়েন্দার জন্যেই একটা জরুরী স্কিল। তবে এই ভদ্রলোক..।

- ভদ্রলোক?

- সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় নিজের আখের গোছানো মানুষজন যদি ভদ্র হতে পারেন, সামান্য পকেটমারকে ছোটোলোক বলি কী করে বলো। যাকগে, তা অন্যদের পকেট আর ব্যাগ জরীপ করতে করতে এই নীল শার্ট ভদ্রলোকটি হঠাৎ একটা বই হকারের কাছে ছোটদের বই চেয়ে দরদাম শুরু করলেন। ওই সস্তা চটিবই। ট্রেন কাঁপানো দরদাম করে দু'টো বই বাগালেন ভদ্রলোক; একটা গোপাল ভাঁড়ের হাস্যরস আর একটা বীরবলের গল্প। কেনার পর বইগুলো নিজে একবারও উল্টেপাল্টে না দেখে নিজের বুকপকেটে যত্ন করে মুড়ে রাখলেন। বই কেনার সময়টুকু ভদ্রলোকের চোখ থেকে সেই ফোকাস গায়েব, ঠোঁটের উত্তেজনা কেটে গিয়ে উজ্জ্বল হাসি আর আঙুলের চনমন গায়েব। কেন?

- কেন?

- শিল্পীর ফোকাস আর উত্তেজনা ভাসিয়ে দেওয়া স্নেহ। বাড়ির বাচ্চাদের জন্য কি ভদ্রলোক দু'টো বই হকারের ব্যাগ থেকে সরিয়ে দিতে পারতেন না? পারতেন৷ কিন্তু তা করলেন না কেন? কারণ ছোটদের পড়ার বইটুকু তিনি চুরি করে সংগ্রহ করতে চাননি। শিক্ষার প্রতি সম্মান। আমাদের অনেকের মধ্যে নেই, ওঁর আছে। আসলে মানুষের এথিকস বোধ অতি বিচিত্র হে সুবিনয়। যা হোক, বইদুটো কেনার পর ভদ্রলোকের চোখের ফোকাস আর ঠোঁটের উত্তেজনা ফেরত এলো। অর্থাৎ তিনি ফের শিকারী বাজপাখি। এসে দাঁড়ালেন আমার পাশে। তাঁর দৃষ্টি এসে পড়লো আমার থলের ওপর৷ প্রমাণ সাইজের দু'টো ইলিশ দেখে তার চোখের দৃষ্টি আরও প্রখর হয়ে ওঠা উচিৎ ছিল, ঠোঁট লোভে কেঁপে ওঠা উচিৎ ছিল। অথচ...।

- অথচ?

- অথচ তার দৃষ্টি হয়ে উঠল ঘোলাটে। ঠোঁটে ফুটে উঠল বিষাদ। আর নিজের অজান্তেই তিনি বুক পকেটে মুড়ে রাখা বইদুটো খামচে ধরলেন। এথিকসের মতই, পিতৃস্নেহও রীতিমতো বেহিসেবী একটা প্রসেস৷ আমার ইলিশের থলিটি তাকে টানলো কিন্তু সে টানে লোভ নেই৷ সে টানে নিজের সন্তানদের মুখে ইচ্ছেমত মাছের টুকরোটা তুলে দিতে না পারার আক্ষেপ রয়েছে৷ যন্ত্রণা রয়েছে। ব্যাস, তারপর আর কী। মক্কেলের ঘাড় মটকে আদায় করা ইলিশ আবারও জুটেই যাবে।

- ইলিশভাজা দিয়ে জমিয়ে আড়াই থালা ভাত খাবো ভেবে এসেছিলাম হে বটু। কাজটা তুমি খারাপ করোনি বটে৷ তবু আমার বুকের ভিতরটা কেমন যেন খালি খালি বোধ হচ্ছে..।

- গোয়েন্দাগিরির নেশায় মশগুল না হলে আমি অতি চমৎকার রাঁধুনি হতাম সুবিনয়। যাকগে, হাঁসের ডিম কষা করেছি, তাতেও ওই আড়াই থালা ভাত সাবাড় হবেই। দেখে নিও।

Thursday, July 9, 2020

তিব্বতি মাদুলি


- মনখারাপ?

- আজ্ঞে। প্রচণ্ড। টেরিফিক লেভেলে মনখারাপ।

- সে তো বুঝলাম। কিন্তু কেন? জয়েন্টে ফেল? মিনিবাসের পকেটমারিতে সত্তর টাকা জলে? 

- কই। না তো।

- তোমার বয়সে তো এ'সবই হয় খোকা...।

- খোকা? অমল বলে ডাকলেই হয় তো। ফার্স্ট ইয়ারে রয়েছি স্যার।

- স্যার? সাতাশ বছর হল তিব্বত থেকে ফিরে তন্ত্রসাধনা করছি। তাবিজমাদুলি দিচ্ছি। স্যারট্যার আবার কী। এ কি ডালহৌসির প্রাইভেট ফার্ম নাকি। গদগদ সুরে বাবাজী বলে ডাকো।  

- বাবাজী। আমার যে বড্ড মনখারাপ। সুপার-গভীর মনখারাপ। জিভে ফুচকাও তিতকুটে হয়ে ঠেকছে; এমন মনখারাপ। 

- কেস সিরিয়াস, সে না হয় বুঝলাম। কিন্তু মনখারাপের সোর্স না জানলে মাদুলিটা দেব কী করে?

- আমিও কী ছাই জানি? বড় আশা করে এসেছিলাম তিব্বতি মন্ত্রতন্ত্র ঝেড়ে আপনি যদি ট্র‍্যাক করতে পারেন। 

- নাহ্। অমন আনতাবড়ি মাদুলি আমি দিতে পারিনা৷ আমি ফচকে ব্যবসায়ী নই, সাধক। 

- ঝড়ে বক ছাড়ুন না কিছু একটা। এমন ওজনদার মনখারাপ দিনের পর দিন বয়ে বেড়ালে শোল্ডার ডিসলোকেট করে ফেলব তো। 

- ছাড়ব? ঝড়ে বক?

- নয়ত আর তন্ত্র কীসে?

- দাঁড়াও, কনসেন্ট্রেট করি।

- আমার মনখারাপের সোর্স...কন্সেন্ট্রেট করলে খুঁজে পাবেন? বাবাজী? 

- কনসেন্ট্রেট করে ডাকলে মাতারা জ্বরের রাতে কপালে জলপটি রেখে যান। ফোকাস ঠিক থাকলে স্বয়ং মহাদেব এসে বিড়িতে আগুন দিয়ে যান৷ তোমার মনখারাপের সোর্স তো অতি পাতি ব্যাপার হে।

- হোক বাবাজী হোক। কন্সেন্ট্রেট করে আমার মনখারাপের সোর্স খুঁজে বের করা হোক।

- তিব্বতের লামাদের মাংসের শিঙাড়া খাইয়ে এমন ইম্প্রেস করেছিলাম যে তাঁরা সাধনার প্রচুর শর্টকাট শিখিয়ে দিয়েছিলেন। এই যেমন এখুনি; এখন এক লহমায় পৌঁছে গেলাম তোর মনখারাপের গোড়ায়। 

- তা, কী বুঝছেন?

- কাল সকালেই সে গায়েব। ফুসমন্তর এক্কেবারে।

- ফুসমন্তর? 

- ফুসমন্তর। মিছে কথা কইতে নেই খোকা। মনখারাপের কারণ তো বেশ স্পষ্ট জানা আছে দেখছি।

- মোটেও না। কে গায়েব হল, কে ফুসমন্তর তাতে আমার কী?

- কিচ্ছুটি নয়?

- নয়ই তো। আপনি বড় বাড়তি কথা বলেন বাবাজী।

- কাল সোয়া দশটার ট্রেন।

- ট্রেন হোক। প্লেন হোক। স্পেসশিপ হোক। আমার কিছুই এসে যায়না। মাদুলির ব্যবস্থা করুন, আমার তাড়া আছে?

- তাড়া আছে?

- এ...এ কী..আমার হাত খামচে ধরছেন কেন বাবাজী?

- পালস না মেপে মাদুলি দেব?

- আপনি তান্ত্রিক না হোমিওপ্যাথি জ্যেঠু?

- ফার্স্ট ইয়ারে চোখ ছলছল কাজের কথা নয় অমলবাবু।

- ও কিছু না। থাক মাদুলি।

- সোয়া দশটার ট্রেন। ফুসমন্তর।

- হাত ছাড়।

- আপনি আজ্ঞে থেকে তুই?

- বাবাজীটি টেরিফিক লেভেলের ভণ্ড।

- ডায়াগনোসিসটা টেরিফিক লেভেলের খাঁটি।

- মনখারাপটাও। যাসনা। 

- বাবার ট্রান্সফার। 

- তোর বাবাকে পুলিশে দেওয়া উচিৎ। 

- খুব মনখারাপ?

- ওই যে। টেরিফিক লেভেলে।

- মাদুলিটাদুলিতে কাজ হবে? তিব্বতি টোটকা?

- দিবি?

- ওই যে। লামাদের মাংসের শিঙাড়া খাইয়ে আদায় করা মন্ত্রের গুণে তৈরি মাদুলি। তোর কাছে রেখে যাব। যদ্দিন না ফিরি, মনখারাপের ইন্স্যুরেন্স। 

- বটে? টেরিফিক লেভেলের মাদুলি তো! সালোয়ারকামিজ পরা বিনুনি দোলানো বাবাজীর এলেম আছে। 

- এলেম? তা আছে। আর আছে কাল সোয়া দশটার ট্রেনের টিকিট। 


***

- অমলবাবু?

- ইয়েস?

- হ্যাপি বার্থডে।

- হেহ্। থ্যাঙ্কিউ ডক্টর।

- কত হল বাইশ না তেইশ?

- তিরানব্বুইটাকে সত্যিই তেইশ বলে বোধ হচ্ছে ডাক্তার।

- প্রেশারটাও বেশ কন্ট্রোলে আনা গেছে। আর এই রিপোর্টগুলোও; পার্ফেক্ট। আপনার সেঞ্চুরি আটকায় কার সাধ্যি। 

- হোপ সো ডক্টর।

- আপনার মনটকে শুধু এমনই চনমনে রাখুন। তা'হলে সেঞ্চুরির পরেও চালিয়ে খেলতে পারবেন।

- মনখারাপ যে আমায় ছুঁতে পারেনা ডাক্তার।  

- বটে?

- সবই একটা তিব্বতি মাদুলির গুণ। 

- তিব্বতি মাদুলি? আমি তো জানতাম আপনি এথেইস্ট।

- কচু। আমার চেয়ে বড় থেইস্ট এ দুনিয়ায় নেই হে ডাক্তার। বাবাজী ফিরে আসবে, সে আশায় তিব্বতি মাদুলি বুকে আঁকড়ে কী প্রবল আনন্দে বেঁচে আছি। সেঞ্চুরিটা যে আমায় পেরোতেই হবে। আমি কেটে পড়ার পর বাবাজীর ওয়াপসি হলে একটা যাতা কাণ্ড ববে।

- তিব্বতি মাদুলিটা কিন্তু আমায় খুবই ইন্ট্রিগ করছে।

- সে হল গিয়ে তন্ত্রের মিরাকেল ডাক্তার। 

- সেই তিব্বতি মাদুলি? মিরাকেল?

- ইয়েস। অবিশ্যি, সেই তিব্বতি মাদুলিকে অবশ্য তোমরা বেরসিকরা চুমু বলে জানো। 

Wednesday, July 1, 2020

বাইশের দুই বিনোদ দত্ত লেন

- কাকে চাই?

- ম্যাডাম, এ'টা কি অমলেশ সমাদ্দারের বাড়ি?

- ওই ঢাউস নেমপ্লেটটা চোখে পড়েনি? ও'টায় কি অমলেশ সমাদ্দার লেখা আছে?

- এইচ দত্ত। ওহ, সরি। সরি। আসলে..।

- বাড়ির নম্বর কিছু আছে?

- বাইশের দুই বিনোদ দত্ত লেন।

- গুলিয়েছেন।

- গুলিয়েছি?

- এক্কেবারে।

- আসলে গুগল ম্যাপ ধরে..।

- ম্যাপকানা হয়ে অলিগলিতে ঢুকলে ওই হয়। ঝাড়া আড়াইশো মিটার পিছিয়ে গিয়ে শনিমন্দির পড়বে। সে'টার বাঁদিকের গলিতে ঢুকে ডান হাতের চার নম্বর বাড়ি।

- থ্যাঙ্কিউ।

- ও মা! কড়াইয়ের মাছ পোড়া লাগল বোধ হয়...।

**

ঘাটে এসে গা এলিয়ে দিতে ইচ্ছে করল নির্মলের। শেষ বিকেলের রোদ্দুর নরম হয়ে এসেছে। ঘাটের সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসে পছন্দসই একটা জায়গা দেখে জলে গোড়ালি ডুবিয়ে বসল সে। প্যান্টে শ্যাওলার দাগ বসে যাবে, যাক গে। আজ গায়ে বুকে বড় নিবিড় ভালোলাগা লেগে আছে। 

পকেট থেকে বাদামের প্যাকেটটা বের করে ডান হাতের মুঠোয় কয়েকটা নুনমাখানো বাদাম ঢেলে নিয়ে সামান্য গুনগুন শুরু করল নির্মল। 

বুকের ভিতরটা কেমন তিরতির করছিল, ওই ভালোলাগায়। সুমির সংসার; সে এক জমকালো ব্যাপার।
সুমির রান্নাঘরের কড়াইতে মাছ।
সুমির কোমরে গোঁজা শাড়ির আঁচল।
সুমির থুতনিতে ঘামের দানা।

দেখে প্রাণ ভরবে না কেন?  আর কেউ না জানুক, নির্মল তো জানে; তাঁর বুকে হিংসের একটা ফোঁটাও নেই৷ মাকালীর দিব্যি কেটে সে বলতে পারে। 

কী বিচ্ছিরি পাগলামি যে আজ হঠাৎ মাথায় চেপে বসল! যাক, সে পাগলামীর বশে এদ্দিন পর দেখা তো হল। ক্ষণিকের কথাবার্তা, এ দাড়িগোঁফে ঢাকা বাউণ্ডুলে চেহারা সুমি চিনতে পারবেনা; এ'টুকু ভরসা ছিল। নাহ্, সুমিকে কোনওভাবেই বিরক্ত করা চলবে না।

সুমি যে কী ভালো। কী ভালো। এই যে গায়ে মুখে লাগা শেষ বিকেলের আলো আর পা ভেজানো নদীর জলের মিঠে শিরশির; আর দু'টো মিলেমিশে এই যে মনঅবশ করা ভালোলাগা - সুমি তার চেয়েও ভালো। 

চারদিকে কতশত মনকেমন করা ভালো; সঞ্জীবের বইতে রাখা ভোরের শিউলি ভালো, জলপটিতে মায়ের হাতের ওমটুকু ভালো, খিদেপেটে গরম ভাতের গন্ধ ভালো ।  আর সে'সমস্ত ভালো মিশলে যে কান্না; সুমি সে'খানে।

বাইশের দুই বিনোদ দত্ত লেন; নির্মলের অল্প হাসি পায়। 

**

বাইশের দুই বিনোদ দত্ত লেন; যত্তসব!

সাজানো ঠিকানার অছিলায় দেখা করতে আসায় দোষ নেই, আর কড়াইতে মাছের মিথ্যেটুকুতেই যত পাপ? মোটেই না। সুমি জানে, পাপ নেই তাতে। 

এদ্দিন পর যে লুকিয়ে দেখা করতে আসে, তার সামনে ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলা যায় নাকি? সুমি জানে, যায় না।

নির্মলের সাহস না থাক, এক ফোঁটা হিংসুটেপনাও কি থাকতে নেই? 

**

(পুনশ্চঃ হটস্টারে "আরিয়া" ওয়েবসিরিজটি দেখলাম। এ লেখার সঙ্গে অবশ্য সে সিরিজের কোনও যোগাযোগ নেই। তবে 'বড়ে অচ্ছে লগতে হ্যায়' গানটা মনের মধ্যে নতুন করে দাগ কেটে গেল। এই আর কী)

খুনখারাপি আর মামলেট


 - ব্রাদার, একটু অপেক্ষা করা যায় না?

- চোপ শালা। বন্দুকের ছ'টা গুলিই গেঁথে দেব মুণ্ডুতে..।

- অপচয় করবে কেন? একটা গুলিতে যদি খেলখতম করা যায়, তা'হলে বাকি পাঁচটা নষ্ট করার কোনও মানে হয়?

- এই! মাইরি! বলছি...।

- ভাতের দানা হোক কি বুলেট। অপচয় দেখলেই বুকে বড় বাজে।

- কপালে পিস্তলের নল ঠেকিয়ে রেখেছি, তারপরেও এত ফটরফটর? আচ্ছা ত্যাঁদড় মাল মাইরি।

-  আমার বাপ, আমার অঙ্কের মাস্টার, আমার মায়া। সবার মুখেই আজীবন ওই এক কথা শুনেছি। আমি নাকি রাম-ত্যাঁদড়। তা ও'টাকে আমি কম্পলিমেন্ট হিসেবেই ট্রীট করি বুঝলে হে। কোনও কিছু একটু না বাজিয়ে আমি এক্সেপ্ট করতে পারিনি কোনওদিনই। 

- মায়া কে?

- আমার স্ত্রী। ওই যে..।

- কে? কে? কে ওখানে?

- আরে ধুর ধুর। এই কলজে নিয়ে মার্ডার করতে নেমেছ? লাশ নামানো কি অতই সস্তা? ও'দিকে কেউ নেই হে। ওই দেওয়ালের ছবিটা দ্যাখো। ওই যে। মায়ার ছবি। সে ফাঁকি দিয়ে সুট্ করে সরে পড়েছে অনেক আগে। মায়ার মত মেয়ে হয় না গো ব্রাদার। এই যে তুমি অসময়ে এলে, শুকনো মুখে তোমার সে কিছুতেই বসে থাকতে দিত না। ঘরে আর কিছু না থাকলে দু'টো ডিম অন্তত চট করে ভেজে দিত। আর কফি। আহা, মায়ার হাতের কফি ভায়া..প্রতি চুমুকে ইউরেকা। 

- ধুত্তোরি। তখন থেকে ভ্যাজরভ্যাজর। 

- তুমিই তো চান্স দিচ্ছ ব্রাদার। বন্দুক বাগিয়ে ঢুকেছ৷ সোজা ঠাই ঠাই চালিয়ে দিলেই ল্যাঠা চুকে যায়। তা না করে যেই না ওই বাতেলা ঝাড়া শুরু করেছ তখনই বুঝেছি...স্কিলে খামতি আছে। তা এতক্ষণ যখন গালগল্প হলই, আর মিনিট দশেক দেবে নাকি? ব্রাদার?

- কোনও চালাকি নয় কিন্তু...খুব সাবধান।

- চালাকির দ্বারা মহৎ কার্য ইয়ে হয়না। শোনোনি নাকি?

- দু'মিনিট দেব। তার বেশি নয়।

- পাঁচে রফা কর ভায়া। উইন উইন।

- আমি ঘড়ি দেখছি,  পাঁচ মিনিট পরেই কিন্তু..।

- ঢিশুম। জাস্ট ফাইভ মিনিটস।

- কী হবে পাঁচ মিনিটে?

- পেঁয়াজ কুচোতে গেলে দেরী হয়ে যাবে। মামলেটের বদলে বরং পোচ করে আনি। আর ফ্লাস্কের কফি। 

- খাওয়ার শখ?

- আরে আমার জন্য না। ওই যে বললাম। মায়া নেই বলে তুমি শুকনো মুখে কেটে পড়বে। সে'টি হচ্ছে না। মায়ার খারাপ লাগবে। সে মরে গেছে বটে, কিন্তু উবে তো যায়নি। 

- দত্তবাবু। আমায় আর নার্ভাস করবেন না প্লীজ। আপনাকে খুন করাটা অত্যন্ত জরুরী।

- হাজরা পাঠিয়েছে? 

- আজ্ঞে। সোয়া লাখ পাবো। টাকাটার বড্ড দরকার।

- এ জন্যেই হাজরার মত বিজনেস রাইভাল আমার দু'চোখের বিষ। আর খুন করাবি করা, আমাদের ব্যবসার লাইনে এ'সব একটু না করলে চলবে কী করে৷ কিন্তু তাই বলে আমায় খুন করার রেমুনারেশন সোয়া লাখ? তুমিই বলো ব্রাদার, আমি কি অতই মামুলি?

- আজ্ঞে?

- হাজরা কী ভেবেছে। শুধু বিজনেস টার্নওভারে মেপে নিমাই দত্তের তল পাবে? হাজরা জানে যে নারায়ণ দেবনাথের কমিস্কের ব্যাপারে আমার চেয়ে বড় এক্সপার্ট গোটা দেশে নেই? জানে ও? ও জানে যে যে সতেরোটা ডায়েরী বোঝাই হয়ে আছে আমার লেখা গান? সে গানে সুরও নিজে বসাই আমি? ও জানে? রোজ রাত্রে হারমোনিয়াম নিয়ে ছাতে উঠে আমি নিমাইসঙ্গীত গাই! ব্যবসার খাতিরে খুন করছিস কর, তাই বলে সোয়া লাখের বিনিময়ে আমায় নিকেশ করবে? আটকালচারড ব্রুট কোথাকার। 

- আজ্ঞে দত্তবাবু, আমি ছাপোষা খুনি। ও'সবের আমি কী বুঝি বলুন। 

- ও মা। নারায়ণ দেবনাথ না বুঝলে চলবে কেন?

- খুনটা আমায় করতেই হবে।

- তাই বলে দেড় লাখে? না না। সে অন্যায় বরদাস্ত করা যায় না ব্রাদার।

- পাঁচ মিনিট কিন্তু শেষ হতে চলল।

- যাহ্। একটু ম্যানেজ করো ভাই। ডিমটা ভেজে না দিলে মায়া কষ্ট পাবে। 

- আচ্ছা। ইয়ে, দত্তবাবু। আমি পেঁয়াজ কুচিয়ে দেব? মামলেটই হোক বরং। পোচের বদলে। নিজের জন্যেও না হয় একটা ভেজে নেবেন।

- এই অসময়ে? আমিও খাব একটা? কড়া ভাজা অমলেট? জিভটা যে সুড়সুড় করছে না তা নয়...কিন্তু অম্বলটম্বল হলে..।

- কিছু মনে করবেন না। খুনটা কিন্তু আমায় করতেই হবে দত্তবাবু।

- তাই তো। তা'হলে আর অম্বলের ভয় কীসের বলো ব্রাদার। আচ্ছা, হাঁসের ডিমের অমলেট চলবে? ফ্রিজে এখনও বেশ কয়েকটা আছে।

- তাই হোক। তা..রান্নাঘরটা কোন দিকে? 

- কিচেন এ'দিকে। কিন্তু তুমি গেস্ট হয়ে পেঁয়াজ কুচোবে?

- আমি সুপার ফাইন পেঁয়াজ কুচোতে পারি দত্তবাবু। আমার বৌ হাতে ধরে শিখিয়েছিল। মামলেটের জন্য একেবারে নিখুঁত।

- বটে? 

- আজ্ঞে। ইয়ে..তার নামও ছিল..মায়া।

- ছিল? ব্রাদার?

- সেও এখন ফটো। আমাদের শোওয়ার ঘরের পশ্চিম দিকের দেওয়ালে, তারামা হার্ডওয়্যার স্টোরের ক্যালেন্ডারটার পাশে ঝোলানল। রোজ ঘুমোনোর আগে খোকা সেই ফটোফ্রেমের দিকে তাকিয়ে আমার কাছে গল্প শুনবে। শুনবেই। ওর মায়ের গল্প। মায়ার গল্প। 

- অ।

- আসলে..টাকাটা আমার বড় দরকার দত্তবাবু। খোকার একটা অপারেশন না করালেই নয়। 

- অ। খোকার জন্য। এ সোয়া লাখ তো সোয়া লাখ নয় ভায়া। সোয়া'শো কোটির সমান। শোনো, এখন ডিম ভাজি। তারপর আর দেরী নয়। 

- আমায় ক্ষমা করতে পারবেন দত্তবাবু?

- মায়ার কাছেই যাওয়া তো। আমার বরং একটা হিল্লে হয়ে গেল। একা একা রোজ নিমাইসঙ্গীত গাইতে বসে বুক ফেটে যায় ভায়া, সবটুকুই তো মায়ারই জন্য। কিন্তু তোমার খোকার গল্পগুলো শোনাটা জরুরী৷ আমি তোমায় বাড়তি টাকা দিতেই পারতাম, আমি তো আর ওই হাজরার মত চশমখোর নই৷ কিন্তু এ কাজে ফাঁকি দিলে হাজরা তোমার ছড়বে না হে।

- দত্তবাবু..। হাজরার দলের বাকি লোকেরা বাইরে দাঁড়িয়ে। কাজ হলে লাশ আর প্রমাণ লোপাট করবে বলে। বিশ্বাস করুন আমি যদি খুন নাও করি ওরা আপনাকে..।

- কেঁদো না ভায়া। মাঝেমধ্যেই মায়াকে বলি, আসছি গো। তোমার কাছে আসছি। শুধু সাহসের অভাবে এদ্দিন..। যাক, এই ভালো। তোমার খোকার জন্য আমার হারমোনিয়ামটা দিয়ে গেলাম। বসার ঘরেই রাখা আছে। নিয়ে যেও। আর শোনো, খোকাকে ওর মায়ের গল্পে রেখো, কেমন? দেখো একদিন সে মস্ত বড় মানুষ হবে।

- দত্তবাবু...।

- আর দেরী নয়। পেঁয়াজ কুচোও ব্রাদার। ওমলেটের ব্যাপারটা কুইকলি সেরে ফেলা যাক। নয়ত তোমার স্যাঙাৎরা এসে রসভঙ্গ করবে।