Thursday, June 11, 2020

মিস্টার সেনের থেরাপিস্ট


- এক্সকিউজ মী?

- বিলীভ মী। বানিয়ে বলছি না।

- আমি আপনার থেরাপিস্ট। ডেফিনিটলি আপনাকে অবিশ্বাস করছি না মিস্টার সেন। তবে...।

- তবে? ডাক্তার?

- না মানে...ব্যাপারটা বিষম খাওয়ার মতই।

- শুনেই আপনাকে বিষম খেতে হচ্ছে৷ তাহলে আমার কী অবস্থা সে'টা ভাবুন।

- আর একবার আমায় নিশ্চিত হতে দিন মিস্টার সেন৷ আপনি বলছেন আপনি আজ রাত্রে ঘুমোতে গেলেন। কিন্তু যেই সকালে আপনার ঘুম ভাঙবে সে'টা আগামীকালের সকাল নয়, গতকালের।

- এগজ্যাক্টলি। সঠিক বুঝেছেন। 

- আর এমনটা হচ্ছে গত মাসখানেক ধরে?

- রাইট ডাক্তার। আমি রোজ একদিন করে পিছিয়ে চলেছি। আমি আজ থেকে গতকালে পিছিয়ে যাচ্ছি। রোজ।

- কী সাংঘাতিক।

- আজ জুন মাসের নয় তারিখ, তাই তো? একমাস আগে আমি জুলাইয়ের নয়ে ছিলাম।

- অ।

- আপনি অবিশ্বাস করতে পারেন। আমি মাইন্ড করব না।

- বিপুলা এ পৃথিবী। এটসেটেরা এটসেটেরা। বিশ্বাস অবিশ্বাসের দায় আমার নয়। 

- আজকে ইন্ডিয়া জিম্বাবুয়ের ওয়েনডে হচ্ছে তো? 

- হচ্ছে।

- মোবাইলে লাইভ স্কোর চেক করুন দেখি ডাক্তার।

- গোটা সেশনের টাকা দিয়েছেন। যা বলবেন শুনব। যা করতে বলবে করব। এই যে...টসে জিতে ইন্ডিয়া ব্যাট করছে। বাইশ নম্বর ওভারে একশো বেয়াল্লিশ এক উইকেটে। কোহলি চালিয়ে খেলছে।

- বাইশ নম্বর ওভার তো। তেইশ নম্বর ওভারের প্রথম বল। একটা বিমার কোহলির কনুইয়ে লাগবে। রিটায়ার্ড হার্ট। 

- বলেন কী।

*মিনিট পাঁচেক পর*

- তুকতাক নাকি মিস্টার সেন? কোহলি বোধ হয় গোটা সিরিজের জন্য গেল।

- কোহলিকে নিয়ে ভাববেন না ডাক্তার। হালকা চোট। হাড় ভাঙেনি। পরের ম্যাচ খেলবে। সেঞ্চুরিও করবে।

- একটা খটকা লাগছে মিস্টার সেন। জুন মাসের নয় তারিখ তো আপনি ইতিমধ্যেই দেখেশুনে ফেলেছেন। এ চেম্বারের ঘটনাটাও তো..।

- ইয়েস। এ দিনটাও আমার দেখা।

- মিস্টার সেন। আপনাকে কাউন্সেল করা আমার কম্ম নয় যা বুঝছি।

- হাল ছাড়ছেন ডাক্তার?

- একটা কাজ করা যাক। আগামীকাল সকালে বরং আমি আপনাকে একটা ফোন করি। বা দেখাও করতে পারি। ব্যাপারটা ভীষণ ইন্ট্রিগিং। 

- আপনার আগামীকাল ডাক্তার? অর্থাৎ দশই জুন?

- ইয়েস।

- হ্যাঁ। দেখা করতেই পারেন। কিন্তু আপনি আজ ঘুমিয়ে কাল সকালবেলা দশই জুনে পৌঁছবেন অথচ আমি ফিরে যাব ন'তারিখে। অতএব  আপনার সঙ্গে আমার কথা হবে ভবিষ্যতের আমির সঙ্গে। দশই জুন আমার দেখা ও চাখা হয়ে গেছে। আমাদের দেখা হবে ওয়াইজ আউল কফি শপে।

- ওহ। সে'টাও আপনার জানা?

- ইয়েস ডাক্তার। আর এ'টাও জানা যে আপনার সঙ্গে আমার আগামী পরশু,  তরশু এবং তারপর একটানা প্রায় রোজ দেখা হবে। ওই একই কফিশপে।

- আপনি নিশ্চিত? আমাদের দেখা হবে?

- ডাক্তার ডাকটা বিরক্তিকর লাগছে। অনুপমা বলেই ডাকি?

- অ্যাস ইউ উইশ মিস্টার সেন।

- আমরা তুমিতে শিফট করব ঠিক সাত দিন পরে।

- হোয়াট?

- তুমিতে শিফট করব। ষোলোই জুন।

- মিস্টার সেন, ব্যাপারটা অস্বস্তিকর জায়গায় যাচ্ছে।

- প্রেম নিবেদনটা আমিই করব। বাইশে জুন। হুট করে বিয়ের জেদটা অবশ্য আপনার দিক থেকেই আসবে অনুপমা। 

- বাড়াবাড়ি হচ্ছে নাকি?

- আমার সিচুয়েশনটা আজ আপনার গোলমেলে ঠেকছে৷ কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই বুঝবেন কী গভীর সমস্যার আমি রয়েছি তেইশে জুন আপনি আমার হাত টেনে নিজের মুঠোর মধ্যে নেবেন অনুপমা। ওই, ওয়াইজ আউল কফি শপেই।

- মিস্টার সেন...!

- ষোলোই জুন থেকে তুমি বলার পাশাপাশি আমার নাম ধরে ডাকাও শুরু করবেন আপনি। মিস্টার সেনের বদলে অভিরূপ। 

- ব্যাপারটা পাগলামোর পাশাপাশি খুব আপত্তির জায়গায় পৌঁছে যাচ্ছে মিস্টার সেন। 

- অনুপমা। কোহলির ওই চোটের মতই হয়ত আমাদের সম্পর্কটাও ঠেকানো যাবেনা। জানি৷ তবু, ফিরে আসার সুযোগ পেয়ে একটা শেষ চেষ্টা করতে এলাম, যদি আপনাকে ঠেকানো যায়। আমি আপনাকে সত্যিই ভালোবেসেছি অনুপমা। আর সেই ভালোবাসার জন্যই বলতে এলাম, আমার সঙ্গে আর দেখা করবেন না। প্লীজ না। জানি না এই ভাবে আমাদের তেসরা জুলাইয়ের হুটহাট করে সেরে ফেলা বিয়েটা আটকানো যাবে কিনা। কিন্তু নয়ই জুলাইয়ের পর থেকে আমি আর এগিয়ে দশই জুলাইয়ে যেতে পারিনি; এ'টা ভেবে একটা প্রবল অস্বস্তি হচ্ছে৷ ব্যাপারটা সুবিধের ঠেকছে না। অনুপমা, প্লীজ অ্যাভয়েড মী। প্লীজ।

- দেখুন মিস্টার সেন। আমি আপনার থেরাপিস্ট না হলে এখুনি আপনাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতাম। কিন্তু আপনার কথাগুলো মন দিয়ে শোনা আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে, তা যতই গোলমেলে হোক না কেন। আর হ্যাঁ, আগামীকাল আমি আপনার সঙ্গে দেখা করব এবং সে'টা করব পিওরলি অ্যাকাডেমিক ইন্টারেস্টে। না হয় সেই ওয়াইজ আউলের কফি শপেই দেখা করব কারণ আপনার বিটকেল ডিলিউসনগুলো ধুয়েমুছে সাফ করার দরকার আছে।

- ভুল করছেন অনুপমা। একটা বিরাট ভুল করছেন।

- কাল সন্ধ্যে সাতটায়।  ওয়াইজ আউল কফি শপ। আর এখন আপনি আসতে পারেন৷ আপনার সঙ্গে এখন আর বাড়তি কথা বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

***

- অনুপমা।

- ইয়েস ডক্টর মিত্র? অভিরূপ কেমন আছে...?

- সরি। চেষ্টা করেও কিছু করতে পারলাম না। ইট ওয়াজ আ ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক।  ইওর হাসব্যান্ড ইজ নো মোর।

- আজ জুলাইয়ের দশ তারিখ। অভিরূপ ঠিক এই ভয়টাই পেয়েছিল ডাক্তার। আমায় সাবধানও করেছিল। কিন্তু আমিই...।

- আর ইউ ওকে অনুপমা? আমি জানি এ'টা কত বড় একটা শক...।

- অভিরূপ আমায় সাবধান করেছিল। বারবার। অথচ ওকে বিশ্বাস করতে চেয়েও পারিনি। আই ফেল ইন লাভ ডক্টর, আমি ভালোবেসেছিলাম।

Wednesday, June 10, 2020

দিবাকর মুন্সীর ফর্মুলা


*
ব্যাপারটা তেমন কঠিন নয়৷ হোমিওপ্যাথির চারটে বড়ি এক  গেলাস জলে মিশিয়ে দেওয়া। ব্যাস, কাজ শেষ। কাচের গেলাসটা শৌখিন কাঠের টেবিলের ওপর রাখা থাকবে, সকালের দিকটায় এ' ঘরে কেউ থাকবেও না। গেলাসের জলে সে বড়ি মিশিয়েই মনোহরের ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ার কথা। ঘরটা আদতে স্বনামধন্য লেখক অমল চৌধুরীর অফিসঘর। মনোহর বেরিয়ে যাওয়ার আধঘণ্টা পর অমলবাবু  সেই ঘরে ঢুকবেন, নিজের টেবিলে বসবেন আর কিছুক্ষণের মাথায় নিশ্চয়ই সেই গেলাসে চুমুক দেবেন৷ 

সেক্রেটারি হিসেবে কাজটা করতে একদমই মন সরছিল না মনোহরের। কিন্তু এই সামান্য কাজের জন্য দিবাকর মুন্সীর আড়াই লাখটাকার অফারটা ফিরিয়ে দেওয়া গেলনা। অমল চৌধুরীর সেক্রেটারি হিসেবে দেড় বছর চাকরী করেও এত টাকা আয় করতে পারেনি সে। দিবাকর মুন্সী প্রকাশক, অমলবাবুর বেশির ভাগ বই উনিই ছাপেন। সম্প্রতি কী একটা ব্যাপার নিয়ে দু'জনের মধ্যে মন কষাকষি শুরু হয়েছিল বটে। কিন্তু দিবাকরবাবু যে আড়ালে ডেকে এমন একটা অফার দিয়ে বসবেন, সে'টা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি মনোহর।

অবশ্য অমলবাবু মানুষ হিসেবে তেমন সুবিধের নন, পয়সাকড়ির ব্যাপারে বেশ চশমখোরই বলা চলে। কিন্তু তবু এমন গোলমেলে একটা কাজ করতে যে সে রাজী হবে সে'টা মনোহর আগে ভাবেনি। নিজের মধ্যে যে এত লোভ জমে আছে, সে'টা সে এর আগে টের পায়নি। দিবাকর মুন্সী অবশ্য বারবার আশ্বাস দিয়েছে যে অমল চৌধুরীকে প্রাণে মারবার কোনও ইচ্ছে তার নেই। তাছাড়া এই অমলবাবুর সেক্রেটারির চাকরীটাও দিবাকর মুন্সীই পাইয়ে দিয়েছিলেন।  তাছাড়া দিবাকরবাবু ঘোর ব্যবসায়ী মানুষ, তাঁর কথায় বিশ্বাস করারও কোনও কারণ নেই৷ তবে আগাম হাতে পাওয়া আড়াই লাখটাকার জন্য এ সামান্য কাজটুকু না করার মানে হয়।


**

- হ্যালো।

- হ্যালো। দিবাকর? নাহ্ হে। ক'দিন ধরে অনেক ঝগড়াঝাটি করলাম বটে তোমার সঙ্গে। কিন্তু আজ হঠাৎ মনে হচ্ছে তোমার কথাই ঠিক৷ আমি আর প্রেমের গল্প লিখব না। বড্ড বেশি রিপিটেটিভ হয়ে যাচ্ছিল। এ'বারে পুজোয় আমি বরং একটা ভৌতিক উপন্যাস জমা দেব। প্রেমের দু'টো লেখা পড়েছিল। নিজেই সে লেখায় চোখ বুলিয়ে দেখে বুঝলাম; সেই একঘেয়ে বিরক্তিকর খাড়া বড়ি থোড। ফর্মুলায় পেয়ে বসলে যা হয় আর কী। কিন্তু আমার ঘোর কেটেছে৷ পাণ্ডুলিপি দু'টো পুড়িয়ে ফেলেছি। ভূতের উপন্যাসের একটা প্লটও মাথায় দানা বেঁধেছে। আজই লেখা শুরু করব।

- অমলদা, যখনই আপনি নতুন স্টাইল ধরেছেন, ফাটিয়ে দিয়েছেন। এ'বারেও তাই হবে। আমি নিশ্চিত।

- কিন্তু তোমার একটা সাহায্য লাগবে যে দিবাকর।

- এনিথিং ফর ইউ অমলদা। বলুন না।

- কোনও সেক্রেটারিই আমার অফিসে বছর দেড়েকের বেশি টিকছে না হে। আর সেক্রেটারি ছাড়া যে আমি অচল।

- সে কী, ওই যে ছেলেটি। কী নাম যেন.. মনোহর। বেশ চটপটে করিৎকর্মা ছোকরা বলে মনে হয়েছিল তো। সেও কেটে পড়েছে নাকি?

- এই নিয়ে টানা সাত নম্বর সেক্রেটারি না বলে কয়ে ডুব দিল হে। স্ট্রেঞ্জ ব্যাপারস্যাপার।  আর তুমি ছাড়া তো আমার গতি নেই। দাও দেখি একটা নতুন কাউকে খুঁজেপেতে।  

- ও নিয়ে আপনি ভাববেন না অমলদা। ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

***

- এসো দিবাকর। এসো। 

- কেমন আছ ডাক্তার?

- যেমন দেখছ৷ দিব্যি।

- তোমার জন্য নিয়ে এলাম। এই দ্যাখো।

- নতুন পাণ্ডুলিপি? 

- অমল চৌধুরীর নতুন নভেল। পুজোর আগেই ছেপে বেরোবে। এই প্রথম ভদ্রলোল ভৌতিক প্লট নিয়ে লিখল। পড়ে দ্যাখো ডাক্তার, এক্কেবারে হাইক্লাস। কে বলবে কয়েকমাস আগেই গেঁজে যাওয়া প্রেমের প্লটে দিস্তে দিস্তে লিখে পাঠকের হাড় জ্বালাচ্ছিল। 

- বেশ পড়ে দেখব। তবে সেই তো ভিশিয়াস সাইকেল। এই ভূতের নভেল বেস্টসেলার হবে। তারপর একটানা যাই লিখবে শুধু ভূত। ততক্ষণ লিখে যাবে যতক্ষণ না পাঠক বমি করতে শুরু করেছে৷ 

- তা আর বলতে। গোয়েন্দা গল্প পাঠক খেলো মানে একটানা শুধু ডিটেকটিভ নভেল চালাবে। ঐতিহাসিক শুরু হলো তো বছরখানেক শুধু ঐতিহাসিক।  একবার প্রেমের প্লটে আটকা পড়ল তো শুধু গদগদ। আবার নামী লেখকের ইগোর ওজনও কম নয়৷ বিন্দুমাত্র নেগেটিভ ফীডব্যাক পেলেই বাবুর গোঁসা হয়ে যায়। 

- ফর্মুলা যে সাহিত্যের কী ক্ষতি করে। অথচ ফর্মুলা ফর্মুলা করেই অমলবাবুরা নষ্ট হয়ে যান, আর পাঠকদের প্রতিও অবিচার করেন।

- অগত্যা। ফর্মুলা ভাঙার দায় নিতে হয় আমার মত প্রকাশকদের৷ নেহাত তোমার ওই সাহিত্য ফর্মুলা ভাঙার জাদুবড়ি ছিল ডাক্তার। ওটির গুণেই তো বারবার এই অমল চৌধুরীকে খাদের ধার থেকে টেনে আনতে পারি। তবে যাদের দিয়ে অমলদাকে এ বড়ি গেলানো, সেই সেক্রেটারিগুলোর খাই বড় বেড়ে গেছে আজকাল।

- স্টাইলভাঙা লেখকের বই বেচে মুনাফাও তো কম হয়না তোমার দিবাকর। না হয় মাঝেমধ্যে অভাবী ছেলেমেয়েগুলোকে কিছু কিছু দিলে। যাকগে, শোনো। অমল চৌধুরী আগামী কিছুদিন ভূতের গল্প নিয়েই থাক। পরের বছর ওর স্টাইল ভাঙার জন্য নতুন বড়ি তৈরি করছি, এ'বার ওঁর ভাঁড়ার থেকে রম্যরচনা টেনে বের করব ভাবছি। 

- ব্রাভো ডাক্তার। ব্রাভো। এমনিতে অমলদার ভাষার জোর আছে৷ শুধু তোমার ওই স্টাইলভাঙার সাহস দেওয়া বড়ির সাপ্লাই থাকলেই, ভদ্রলোক অসাধ্যসাধন করতে পারবেন। 

-  আমার কমিশনটা ভুলো না যেন দিবাকর। 

Tuesday, June 9, 2020

নন্দর তন্ত্রসাধনা

ব্যাপারটা যে আগাগোড়াই গোলমেলে তা নিয়ে আর নন্দর কোনও সন্দেহ রইলনা। বারুইপুর স্টেশনের কাছে চটিবইয়ের দোকান থেকে বাইশ টাকায় ১০১ তন্ত্র টোটকার মেডইজি গাইডবইটা কিনেছিল সে; নেহাত শখেরই বশে। এমন শিক্ষামূলক বইপত্র সে মাঝেমধ্যেই কিনে থাকে। ম্যাজিকের সহজপাঠ, জার্মান পদ্ধতিতে বাঙালি মাংস রান্না অথবা চটজলদি হোমিওপ্যাথি; এমন চিত্তাকর্ষক বই সে মাঝেমধ্যেই কিনে আনে। আর সে'সব বই পড়ে পড়েই তো পাড়ার ক্লাবের সান্ধ্য আড্ডায় নন্দর সবসময় একটা দাপুটে উপস্থিতি থাকে। 

পোস্টঅফিসের ক্লার্কের চাকরীটায় থিতু হওয়া সত্ত্বেও এখনও বিয়েটা সেরে ফেলা হল না। আজ নন্দর বাপ-মা বেঁচে থাকলে হয়ত একটা সম্বন্ধ দেখেশুনে একটা হিল্লে করে ফেলতেন; বত্রিশ বছর বয়সে তাঁকে এমন একা থাকতে হত না৷ 

যা হোক, একা থাকায় বিস্তর সুবিধেও আছে৷ এই যেমন তন্ত্রসাধনার বইয়ের খানচারেক পাতা পড়ার পরেই কেমন একটা নেশা ধরে গেল। গত তিনদিন সিকলীভ নিয়ে বাড়িতে বসে দিব্যি এ বই থেকে বিভিন্ন মন্ত্রতন্ত্র প্র‍্যাক্টিস করে যাচ্ছে সে। মনের মধ্যে বেশ কেমন একটা চনমনে ভাবও তৈরি হচ্ছে৷ একশো বারো পাতার বই, প্রথম দিন ঝড়ের গতিতে পড়ে শেষ করে ফেলেছিল সে। তারপর থেকে প্রতিটি শব্দ ধরে ধরে পড়ছে, জটিল জায়গাগুলো বারবার আবৃত্তি করছে। বাড়িতে গেরুয়া বসন বলতে তেমন কিছু ছিলনা তাই একটা পুরনো গেরুয়া গামছা জড়িয়েই তন্ত্র অধ্যয়ন চালিয়ে যাচ্ছে নন্দ; টিশার্ট আর বার্মুডা পরে এমন গভীর কেতাব আত্মস্থ করা যায়না৷  

দিব্যি চলছিল সবকিছু।  রাতের কোন সময়ে সধবা মড়ার সিঁথি থেকে সিঁদুর নিয়ে তা'তে বাদুড়ের রক্ত আর জবাফুল পোড়ানো ছাই মিশিয়ে পুরিয়া বানিয়ে খেলে আড়াই বছর আয়ুবৃদ্ধি হবে, অমাবস্যার রাতে শ্মশানের মাটিতে গজানো কলমিশাক তুলে কুচনো বেগুন দিয়ে কীভাবে রান্না করে খেলে অন্তরাত্মার তেজ বাড়বে; এমন সব রসালো টোটকা তো ছিলই। পাশাপাশি ছিল বেশ কিছু ঘরোয়া টোটকার হদিশও। ঝাঁটা, কাটারি, কড়ি, হরতকি, সৈন্ধবলবণ, শাড়ির আঁচল থেকে কেটে নেওয়া টুকরো আর এমন শ'খানেক ঘরোয়া জিনিসপত্র দিয়ে যে কী অসাধ্যসাধন করা যায়; তন্ত্রের গভীরে না ঢুকলে তা বোঝা সম্ভব নয়।

বিভিন্ন গূঢ় মন্ত্রটন্ত্র আউড়ে বেশ চমৎকার দু'টো দিন কেটেছিল নন্দর। এত সহজে যে তন্ত্রশক্তি আয়ত্ত্ব করা যায় তা সে ভাবতেও পারেনি। তন্ত্রবলে দিব্যি ঘর ঝাড় দেওয়া, ঘর মোছা বা রান্নাবান্নার কাজ চালিয়ে নেওয়া যায়। এমন মহামূল্যবান সব বই কেন যে অমন সস্তা চটিবইয়ের দোকানে পড়ে থাকে। এই বইয়ের থেকেই এক দু'টো মন্ত্র আউড়ে নন্দ মনে এমন বল পেলো যে দিব্যিদৃষ্টিতে স্পষ্ট দেখতে পেল যে দক্ষিণপাড়ার সলিল দত্তর ছোটমেয়ে নির্মলার সঙ্গেই তাঁর বিয়ে হবে৷ তন্ত্রের সত্যকে তো আর মিথ্যে হতে দেওয়া যায়না, তাই নন্দ স্থির করলে যে সে নিজেই নিজের সম্বন্ধ নিয়ে সলিল দত্তর বাড়িতে হাজির হবে। তন্ত্রে পাওয়া আশ্বাস তো আর মিথ্যে হতে পারেনা৷ কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল সংসারে বাঁধা পড়ে আর কী হবে। তন্ত্রের স্বাদ একবার যে পেয়েছে, তাঁর মুক্তি তো শ্মশানে স্তব্ধতা আর অমাবস্যার অন্ধকারে। নির্মম গেরস্থালীতে আটকা পড়লে তাঁর চলবে কেন?

কিন্তু এই সাতপাঁচ ভাবনার মধ্যেই ঘটল সেই বিশ্রী গোলমেলে ব্যাপারটা। ঘরের কোণে পড়ে থাকা ঝাঁটাটা উড়ে এসে নন্দকে পেটাতে আরম্ভ করল। পেটাতে শুরু করল অথচ থামার নাম নেই।  এ'দিকে সে বইতে উড়ন্ত ঝাঁটার পিটুনি আটকানোর কোনও টোটকাও বাতলে দেওয়া নেই৷ 

আধঘণ্টা এক তরফা উড়ন্ত ঝাঁটার হাতে বেধড়ক পিটুনি খাওয়ার পর  রাগের চোটে নন্দ সেই তন্ত্র টোটকার বইটাকে ছিঁড়ে কুচিকুচি করে ওয়েস্টপেপার বাস্কেটে ফেলে দিল। ব্যাস, অমনি ঝাঁটা বাবাজীও ঠাণ্ডা। কী অদ্ভুতুড়ে কাণ্ড। 

নাহ্, নন্দ ঠিক করলে যে তান্ত্রিক হওয়ার ব্যাপারটা আপাতত মুলতবি রাখতে হবে। যত্তসব বিটকেল ব্যাপার। তার চেয়ে বরং দক্ষিণপাড়ার দত্তবাড়ির ছোটমেয়েটির ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়ে বিয়েথার ব্যাপারটা সেরে ফেললে একটা কাজের কাজ হবে৷ 

***

- গিন্নী, ছেলেটাকে এ'বার ছাড়ো। 

- সে আহাম্মককে একলা ছাড়ার উপায় আছে? নিজের কোনও ব্যাপার তাঁর বিন্দুমাত্র খেয়াল থাকে?

- আদরে যেমন বাঁদর করেছ, তেমনটাই তো ভুগতে হবে। 

- নন্দ তোমার ছেলে নয় যেন?

- আমি ওর বাপ। ওকে আলবাত ভালোবাসি। কিন্তু তা'বলে মরার পরেও চটিবইয়ের ভূত হয়ে ওর দেখভাল করাটা বাড়াবাড়ি।  অন্যান্য ভূতেরাও এ'সব বাড়াবাড়ি শুনলে ছি ছি করবে।

- বাড়াবাড়ি এ'টা?

- বাড়াবাড়ি নয়? নন্দর মনখারাপ হলে ম্যাজিকের চটি বই সেজে ওর পিছু নেওয়া। শরীর খারাপ হলে হোমিওপ্যাথির বই হয়ে ওকে টোটকা বাতলে দেওয়া। তন্ত্রের বইয়ের চেপে ওর বাড়ির কাজ করে দেওয়া, এগুলো বাড়াবাড়ি নয়?

- নন্দটা যে বড় একা গো। মা হয়ে আমি কী করে...।

- এ'বার অন্তর ওকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে দাও গিন্নী।

- সে ব্যবস্থাই তো করে এলাম এ'বারে। দত্তবাড়ির ছোটমেয়েটা বড় মিষ্টি। আর ও মনে মনে নন্দকে বেশ পছন্দও করে। নেহাত নন্দটা হাবলা তাই এদ্দিন টের পাইনি। ওই তন্ত্রের অছিলায় সে বুদ্ধি নন্দর মাথায় রেখে এসেছি।

- সে তো বুঝলাম, কিন্তু ওকে হঠাৎ ঝেঁটাপেটা করতে গেলে কেন?

- গবেট ছেলে ভাবছিল সংসার ছেড়ে তান্ত্রিক হবে৷ আমি দেখলাম এ তো উল্টোবুঝলিরাম। ব্যাস, ঝ্যাঁটা তুলে দিলাম আচ্ছা করে। ঘা-কতক পিঠে পড়তেই সব পাগলামি ঠাণ্ডা আর কী।

Saturday, May 30, 2020

"দ্য লোল্যান্ড" প্রসঙ্গে


যিনি "দ্য লোল্যান্ড" রেকমেন্ড করেছিলেন তিনি এককথায় এ উপন্যাস সম্বন্ধে বলেছিলেন; "বিষাদসিন্ধু"।

বিষাদসিন্ধুতে যে মিঠে রোদ্দুর এসে মিশেছে, সে'টা টের পেতে হল বইটা পুরো পড়ে। ঝুম্পা লাহিড়ীর লেখা আমি সদ্য পড়েছি। কিছুদিন আগে পড়েছিলাম 'নেমসেক' আর দু'তিনদিন আগে শেষ করলাম নেমসেক। সে বই সম্বন্ধে চারটে মনের কথা।

১।

কলকাতা সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে ক্লিশেয় মাখামাখি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। মনে রাখতে হবে যে লাহিড়ীর পাঠক আন্তর্জাতিক; তাঁদের কাছে যে ধরণের কলকাতা বিষয়ক ডিটেলিং চমৎকার  ঠেকবে, বাংলার (এবং কলকাতার) বাঙালির কাছে সেই ডিটেলিংই ক্লিশে ভারে ক্লিষ্ট মনে হতে পারে৷ কিন্তু লাহিড়ীর গুণ সে'খানেই। তাঁর বর্ণনা প্রায় নিখুঁত, বাহুল্যবর্জিত আর তাঁর ভাষা প্রাণবন্ত।  কলকাতার যে'টুকু তাঁর লেখায় ফুটে ওঠে, সে'টুকু পড়লে আজীবন কলকাতায় বন্দী কোনও মানুষেরও দিব্যি ভালো লাগবে বলে আমার মনে হয়। অফিস যাওয়ার পথে রোজ টালিগঞ্জ পেরিয়ে যাই, এ বইতে টালিগঞ্জ একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ক'দিন ধরে যখনই টালিগঞ্জ পেরোতে হয়, 'দ্য লোল্যান্ড'য়ের সুভাষ, উদয়ন আর গৌরীর কথা মনে পড়ে। বেলা নামের এক কিশোরীর কথা মনে পড়ে যার টালিগঞ্জের সঙ্গে যোগাযোগ মাত্র কয়েকদিনের। আর হ্যাঁ, নেমসেকের কলকাতার তুলনায় লোল্যান্ডের কলকাতার ব্যপ্তি অনেকটা বেশি। 

 ২। 

বিষাদে মিঠে রোদ্দুরের ব্যাপারটা সামান্য খোলসা না করলেই নয়। লোল্যান্ডে আমার সবচেয়ে প্রিয় চরিত্র গৌরী। সে আদর্শ বলে নয়। বরং তাঁর ভুলভ্রান্তিগুলোই এ উপন্যাসের মূল রসদ। সত্যি কথা বলতে কী উপন্যাসের মূলে রয়েছে একটা অস্থির সময় আর ক্যাটালিস্ট হয়ে উঠেছে গৌরীর অন্ধকারটুকু। কত মানুষের ঘেন্না, রাগ আর বিরক্তি সামাল দিয়ে গৌরী পথ হেঁটেছেন। একদিকে যেমন ভালোবেসেছেন, অন্যদিকে প্রকাণ্ড সব ভুলও করেছেন৷  হলফ করে বলতে পারি যে একসময় পাঠকের সমস্ত রাগ এসে পড়বে গৌরীর ওপর। কিন্তু সেই উপন্যাসের এই কাল্পনিক চরিত্রটি যেন ভালো থাকে, যেন সামান্য স্বস্তি খুঁজে পায়; এ আশাটুকুও পাঠকের বুকের মধ্যে আনচান তৈরি করবেই। লাহিড়ীর লেখায় যে অসাধারণ 'এমপ্যাথি' রয়েছে, তার মাধ্যমেই গৌরীকে ভালোওবাসবেন কিছু (বা বেশিরভাগ) পাঠক। 

৩। 

বাপ-ছেলের সম্পর্ক নিয়ে কত লেখা পড়ি। বাপ মেয়ের ভালোবাসাটুকুর ওম অনুভব করার জন্য এ বই হয়ত আবার পড়ব। সুভাষের বেলাকে আঁকড়ে রাখা আর বেলার ভেসে যেতে চেয়েও ভেসে না যাওয়া, এ'সবটুকুর মধ্যেই সুভাষের ভালোবাসা। হেঁয়ালি বা স্পয়লার নয়; তবু বলি যে সুভাষ সে অর্থে বেলার বাবা নন৷ আবার সুভাষ যে ভাবে বেলার পিতা হয়ে উঠতে পেরেছেন, বাপ-মা দু'জনের ভালোবাসা জুড়লেও বোধ হয় সুভাষের স্নেহের গভীরতার সঙ্গে তুলনা চলেনা।  হয়ত এমন একটা সময় আসে যখন বৃদ্ধ বাপ-মা সন্তানের স্নেহের মধ্যে আশ্রয় খোঁজেন৷ সুভাষকে সে আশ্রয় দিয়ে নিজের বুকে টেনে নিয়েছিল বেলা, মায়ের মতই। বুকে টেনে নিয়ে আশ্রয় দেওয়ার ব্যাপারে সে বাপ কা বেটি আর কী। 

৪। 

গল্পের পরিসর চল্লিশের দশকের কলকাতা থেকে ইন্টারনেট সমৃদ্ধ আধুনিক দুনিয়া। এসেছে নক্সাল আন্দোলন প্রসঙ্গ৷ এসেছেন উদয়ন নামের এক উজ্জ্বল তরুণ, হারিয়েও গেছেন৷ খুন হন উদয়ন, নিজের বাবা মা ও স্ত্রীর চোখের সামনে। সে মৃত্যুর মেঘ আবছায়ায় ভরে দিয়েছে গোটা উপন্যাস। সে মৃত্যুর যন্ত্রণা বয়ে বেড়িয়েছেন উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্র। উদয়নকে ভালোবাসা প্রতিটি মানুষ সে যন্ত্রণায় একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে রইলেন অথচ একে অপরের হাত ধরতে পারলেন না। সেই পাহাড়প্রমাণ মনখারাপের মধ্যেই এই ভালোবাসার উপন্যাস। বার বার ফিরে এসেছে উদয়নের মৃত্যু, উপন্যাস শেষও হয়েছে সেই মৃত্যু আর একটা ব্যর্থ আন্দোলনের যন্ত্রণায়৷ কিন্তু মৃত্যু আর যাবতীয় ব্যর্থতা পেরিয়ে এ উপন্যাসে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে ভালোবাসা আর কলকাতার গল্প৷

Sunday, May 24, 2020

দাদার লাইব্রেরি

- দাদা।


- কী ব্যাপার পিলু? এত রাত্রে?


- মনে হল তুই হয়ত এখনও ঘুমোসনি। তাই ভাবলাম যাই একবার...।


- আয়। বস।


- কী পড়ছিস?


-  ইংরেজি নভেল পড়ে হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। ভাবলাম একটু শরদিন্দু ঝালিয়ে নিই। তোর ডিনার হয়েছে রে পিলু?


- দাদা। রাত ক'টা বাজে সে খেয়াল আছে? পৌনে একটা৷ আর নীলাকে তো জানোই, রাত ন'টার মধ্যে খাওয়াদাওয়া না করলেই এক্কেবারে হুলুস্থুল শুরু করবে।


- নীলার শাসনে আছিস তাই কোলেস্টেরলে পিষে মারা যাসনি এখনও। 


- ছেলেবেলায় মায়ের শাসন। আর এখন বৌয়ের। তোর তো আর সে বালাই নেই, বেশ আছিস।


- বৌ না থাক। বই তো আছে। আর বইও শাসন করে, সোহাগও করে। এই লাইব্রেরি কত সাধ করে বানানো বল দেখি।


- তা বটে। টিকলিকে তো আমি বারবার বলি, জ্যেঠুর লাইব্রেরিতে যা৷ দু'টো বই উল্টেপাল্টে দেখ৷ তোর মত ভোরেশাস রীডার না হোক, মাঝেমধ্যে দু'একটা বই তো পড়তেই পারে বলো। কিন্তু না। সে দিনরাত শুধু ওই মোবাইলে মুখ গুঁজে পড়ে আছে। 


- দিনকাল পাল্টেছে। বইটাই তো আজকাল একমাত্র রিসোর্স নয়। তুই বরং ওকে জোর করিস না। 


- জোর করলেও সে মেয়ে পাত্তা দেবে নাকি৷ ব্যক্তি স্বাধীনতার যুগ। তার ওপরে সদ্য কলেজে যাওয়া শুরু করেছে, তা'তে বাড়তি আর এক জোড়া ডানা গজিয়েছে। 


- পিলু। বুড়োদের মত খিটখিট করিসনা। নতুনদের সব খারাপ আর আমাদের সব ভালো, এ'সব ন্যাকাপনা আমার অসহ্য লাগে। বাড়িতে এত বড় লাইব্রেরি, তুইই বা ক'টা বই পড়েছিস গত দু'বছরে?


- ব্যবসাপত্তর সামলে আর পড়ার সময় কোথায় বল৷ আমার ওই ইকনমিক টাইমসই ভালো। তা দাদা, আর কতক্ষণ পড়বি? এত রাত হল...।


- পড়ার জন্য এই রাতটাই ভালো সময় বুঝলি। দিনের গোলমালে বরং ফোকাস নষ্ট হয়। তা হ্যাঁ রে পিলু, তোর চেহারাটা এত শুকনো লাগছে কেন?


- ও তেমন কিছু না।


- তুই আমার চেয়ে সাত বছরের ছোট পিলু। কাস্টোমারদের ফাঁকি দিয়ে বাড়তি দু'পয়সা কামিয়ে নিচ্ছিস নে, আমার চোখ ফাঁকি দিতে পারবি না। 


- বাজারের যা অবস্থা। ডিপ্রেশন,  মিসগভার্নেন্স, শেয়ারমার্কেট রক্তারক্তি। তার ওপর কোরাপশন; গত বছরখানেক ধরে ব্যবসাটা যে কী'ভাবে চালাচ্ছি তা আমিই জানি। 


- পিলু, আমি দেখি তো তোর ব্যস্ততা।  আর কেউ না জানুক, আমি তো জানি তুই উদয়াস্ত কী পরিশ্রম করিস। শোন, আমি তোর দাদা। এক বাড়িতে আমরা থাকি। আমি একতলায় তুই দোতলায়, অথচ দিনের পর দিন আমাদের দেখা হয়না৷ এই যে তুই আজ মাঝরাত্রে আমার সঙ্গে দেখা করতে এলি, কী ভালোই যে লাগল। রোজ আসিস না কেন? নীলা বারণ করে? 


- সে'সব কথা থাক দাদা।


- যাকগে, ব্যবসার সমস্যা কথা কিছু বলছিলিস। 


- দাদা, বাড়তি কিছু টাকা ঢালতে না পারলে ব্যবসাটা ভেসে যাবে। টিকলি আর নীলাকে নিয়ে যে কী বিপদে পড়তে হবে আমায়..। আর দুম করে টাকাটা আমি কী করে জোগাড় করব বল।


- পিলু। তুই কি ফের বাড়ি বিক্রির কথা বলতে এসেছিস?


- গোটা বাড়িটা আমরা বিক্রি কেন করব দাদা? তুই কী ভাবিস, এ বাড়ির প্রতি আমার টান নেই? তোকে তো আগেও বলেছি কতবার; শুধু একতলার এই উত্তরের দিকটা বেচে দেব। লীগাল দিকটা অলরেডি দেখে নিয়েছি৷ আর দ্যাখ, এত বড় বাড়ি মেন্টেন করা এমনিতেও আমার পক্ষে..। তাছাড়া লাহাদের অফারটা লুক্রেটিভ। ডিপার্টমেন্টাল স্টোর খুলতে চায়। পোজিশন ভালো, মার্কেট রেটের আড়াইগুণ অফার করেছে। 


- পিলু..।


- প্লীজ দাদা..আমার কথাটা ভাব একবার...।  শুধু তো এই একতলার উত্তর দিকটা..।


- কিন্তু এই সে'খানেই তো আমার এই লাইব্রেরি পিলু...এই লাইব্রেরি ভাঙলে আমি কোথায় যাব...। এই বইগুলো ছাড়া তো আমার আর কিছুই নেই। 


- প্লীজ। আমার জন্য একটু ভেবে দেখবি?


- কথাটা তুই তো আগেও বলেছিস। বহুবার। আমার উত্তরও তো তুই জানিস। এ লাইব্রেরি আমি ছাড়তে পারব না। আর আমার জোর করিস না, ফল ভালো হবে না।


- তুই আমার কথাটা একবারও ভাববি না দাদা?


- আমি তোর চোখের দিকে তাকিয়ে তোর মনের কথা টের পাই পিলু। আজও আমি সে'টা পারি। এ লাইব্রেরি নষ্ট করতে তুইও চাস না, তা আমি বেশ বুঝি। আর শোন, নীলাকে বলে দিস। এ লাইব্রেরি আমি কিছুতেই ছাড়ব না।


- আমি আসি দাদা। অনেক রাত হল।


- পিলু।


- কিছু বলবি?


- তোকে সত্যিই বড় শুকনো দেখাচ্ছে রে। শরীরের অযত্ন এ'বার একটু কম কর। আর...আর মাঝেমধ্যে আসিস  আমার ঘরে, কেমন? না হয় রাত্রের দিকেই আসিস, নীলারা ঘুমোলে। কোনও বাড়ি বেচার মতলব ছাড়া আসিস কখনও। দুই ভাই মিলে না হয় একটু খোশগল্প করা যাবে। আসবি পিলু?


- গুডনাইট দাদা। 


***


- নাহ্। দাদার সেই একই গোঁ। লাইব্রেরি সে ছাড়বে না। 


- যত বাজে কথা। এ সব তোমারই বদমায়েশ।


- কী যাতা বলছ নীলা?


- আমি ঠিকই বলেছি। তুমিই ওই লাইব্রেরির মায়া ত্যাগ করতে না পেরে লাহাদের অফার রিফিউজ করছ। আর সে'টা চালাচ্ছ দাদার নামে।


- কতবার বলব, আমি দাদার লাইব্রেরি সহ বাড়ির ওই অংশটা বেচে দিতে চাই। কিন্তু দাদা অ্যালাউ না করলে..।এইতো, আজও দাদা বললে, লাইব্রেরি হাতছাড়া হলে তার ফল ভালো হবে না। 


-  যত্তসব বাজে কথা। 


- বাজে কথা?


- বাজে কথা নয়? দু'বছর আগে যে মানুষটা মারা গেছে তাকে নাকি তুমি শুধু দেখতে পাও। আর চাইলেই তাঁর সঙ্গে গল্পগুজব করে আসো। আর সে নাকি বাড়ি বিক্রি আটকাচ্ছে...। আমার মেজদা বললে হালিশহর থেকে ওঝা নিয়ে এসে হিল্লে করে দেবে। তা'তেও তোমার আপত্তি...তোমারই কোনও মতলব আছে..।


- শোনো নীলা। দাদা আজীবনের কমিউনিস্ট।  ধান্দাবাজ পলিটিকাল ফায়দা লোটা লোক নয়, মনেপ্রাণে কমিউনিস্ট।  মরার আগে উকিল ডেকে এমন লিখিত ব্যবস্থা করে গেছিল যাতে কেউ ধর্মমতে ওঁর শ্রাদ্ধ না করে। সেই কম্যুইনস্ট দাদার আত্মাকে আমি ওঝা লাগিয়ে বাড়িছাড়া করব গো নীলা? ধর্মে সইবে?