Monday, March 2, 2020

আ ক্লিয়ার ব্লু স্কাই



জনি বেয়ারস্টোর বায়োগ্রাফিতে আর যাই থাক, ওয়ার্নের জীবনীতে বর্ণিত সেই ক্রিকেটীয় থ্রিল নেই৷ কিন্তু এ বই পড়ার জন্য সে অর্থে ক্রিকেট ভক্ত না হলেও চলে। কালপুরুষ ছবির শেষে সমুদ্র ঘেঁষে পিতা-পুত্রের হেঁটে যাওয়া যারা দেখেছেন, নিশ্চিত ভাবেই সেই সিনেমার ভবঘুরে বাঁশিওয়ালার সুর ভোলেননি। আমি ভুলিনি। আর গোটা বই জুড়ে সেই সুর ঘুরে ফিরে আসে।
স্পয়লার নয় (জীবন থেকে তুলে আনা এমন তরতাজা গল্পের স্পয়লার হয় না), শুধু বইয়ের পটভূমিটা দু'লাইনে বলা যায়৷ জনির বয়স যখন সাত তখন ওর মায়ের ক্যান্সার ধরা পড়ে। তার কিছুদিনের মাথায় জনির বাবা ডেভিড বেয়ারস্টো (যিনি নিজেও একজন ক্রিকেটার, ইয়র্কশায়ারের এক প্রাক্তন মহারথী বলা চলে) আত্মহত্যা করেন। সে'খান থেকে জনি যে হারিয়ে যাননি তার প্রমাণ তাঁর ক্রিকেট কেরিয়ার। বলাই বাহুল্য যে সেই উত্থান নিয়ে একটা রূপকথার মত গল্প বলা যেতেই পারে। কিন্তু এ বইয়ে ঠিক রূপকথার মেজাজ নেই। 


এক খোকা পথ হাঁটছে আর অনবরত নিজের বাবার না-থাকা-টুকুকে পেরিয়ে আবছা কিছু স্মৃতি আঁকড়ে নিজের বাপের গন্ধ খুঁজে নিচ্ছে৷ সিনিয়র বেয়ারস্টোও উইকেট কীপার ছিলেন, তাঁর দুম করে চলে যাওয়ার গুমোটে আটকে না থেকে জুনিয়র বেয়ারস্টো উইকেটকীপিং গ্লাভস হাতে তুলে নিচ্ছেন; ব্যাপারটা যেমন যন্ত্রণাদায়ক তেমনি সুন্দর। এই বই না পড়লে অবশ্য সেই দোলাচলটা টের পাওয়া যাবে না। মতি নন্দীর উপন্যাস হতে পারত এ বই; সহজেই। 
এ বইয়ের একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল বিষাদ। অথচ এ বইয়ের নাম "আ ক্লীয়ার ব্লু স্কাই" কী অপূর্ব ভাবে সার্থক। ক্রিকেটার জনি বেয়ারস্টোর আত্মজীবনী পড়তে বসেছিলাম৷ বই শেষ করে টের পেলাম যে বেয়ারস্টোর আত্মজীবনীই বটে; তবে পুত্র জনির নয়, পিতা ডেভিডের।
নিজের বাপের বিষাদকে এমন ভাবে ভালোবাসায় মুড়ে রাখতে খুব বেশি মানুষ পারেননি। জোনাথন মার্ক বেয়ারস্টো পেরেছেন আর এক মন ভালো করা গল্পের মাধ্যমে নিজের বাপকে মৃত্যুঞ্জয় করে তুলতে পেরেছেন। 
এ বই না পড়লেই নয়।

জেটবাহাদুর মশাবাহিনী

গুডনাইট অলআউট এইসব বিশ্রী বিষাক্ত যন্ত্রপাতির যুগে হাইকোয়ালিটি মশাদের প্রভাব প্রতিপত্তি আগের চেয়ে বেশ খানিকটা কম। ব্যায়াম করা চাবুক চেহারার মশাদের দল আজকাল আর অত সহজে দেখাও যায়না; অন্তত ঘরে বা অফিসে তো নয়ই। কলেজে পড়ার সময় যে ভাগ্যবান বন্ধুরা নন্দন চত্ত্বরে বসে প্রেম করেছে, তাদের মুখে শুনেছি পালোয়ান মশাদের জেটবাহাদুর গল্প; চুমুর চক-চকাম নাকি সহজেই ঢাকা পড়ে যেত সেই মশাশ্রেষ্ঠদের মঁ-মঁ-মঁ-মঁ গুঞ্জনে। 
আজকাল যে'সব মশা নজরে পড়ে তাদের আর যাই হোক; সুগঠিত সুঠাম সুদৃঢ় বলা চলেনা। বেশির ভাগই কুচিকুচি সাইজের; তাদের কামড়ে ধার নেই। বাকিরা বেঢপ থ্যাবড়া, তাদের বেয়াল্লিশ মাসে বছর; গায়ে বসে সামান্য এক কামড় দিয়েই আর নড়তেচড়তে পারেনা। তাদের থাবড়ে মারতেও মায়া হয়; আলতো ফুঃ দিয়ে "সোনা বাবা" করে উড়িয়ে দেওয়া ছাড়া কিছু করার থাকে না। মোদ্দা কথা হল এই অস্থির সময়ে মশা ম্যানেজমেন্টের চ্যালেঞ্জটাই নষ্ট হয়ে যেতে বসেছে। 
সামগ্রিকভাবে মেট্রো মশাদের ফিজিকাল ফিটনেস আর প্রত্যুতপন্নমতিত্ব তলানিতে এসে ঠেকেছে। আগে তারা দলবদ্ধ হয়ে ডাকাতে মেজাজে হা-রে-রে-রে সুরে আক্রমণ করত; এখন টুকটাক সিঁদ কাটে বা পকেটে ব্লেড চালানো লেভেলের মিনমিনে কলজে নিয়ে ঘুরঘুর করে। অচিরেই ক্যালক্যাটার মসকিউটোরা মাস স্কেলে কুইট করবে; এ দুশ্চিন্তা মনের মধ্যে মাঝেমধ্যেই ঘুরপাক খায়। 
তবে দমবন্ধ করা অন্ধকার ভেদ করে সামান্য আশার আলো আজ দেখতে পেলাম। কলকাতা বিমানবন্দরের তেইশ এফ গেটের সামনে বসে ফ্লাইটের অপেক্ষা করতে করতে টের পেলাম পালোয়ান মশাদের একটা চমৎকার অভয়ারণ্য এখানে গড়ে তোলা গেছে। অসংখ্য মশামহারথী বিভিন্ন ফর্মেশনে আক্রমণ করছে আর এলোপাথাড়ি চড় থাপ্পড়কে অবলীলায় ডজ করে সরে পড়ছে। সবচেয়ে বড় কথা; তারা কামড় দেওয়ার পরেই লেতকে চামড়ার ওপর পড়ে থাকছে না, স্যাট করে উড়ে যাচ্ছে৷ ভোর রাত্রে চোখে সামান্য ঘুম ছিল বটে কিন্তু এমন টীম-পারফর্মেন্স শেষ কবে দেখেছি মনে নেই, কাজেই ওদের হাতে ঘুম ফর্দাফাই হলেও ওদের বোঝাপড়ার তারিফ না করে থাকা গেল না। গালের মশাকে যেই আক্রমণ করতে যাব অমনি আরও তিনটে মশা বাঁ হাতের মধ্যমায় এসে বসেছে; সে'দিকে মন দিতেই ডান হাতের থাপ্পড় গেল ভড়কে আর গালের মশা এক হোমিওপাতি শিশি রক্ত চুষে গায়েব। ভুল দেখেছি কিনা জানিনা তবে ঘুমচোখে একবার যেন মনে হলো এই মশারা বোধহয় হাইফাইভ দিতেও শিখে গেছে।  
এ মশারা প্রত্যেকে হাইলি স্কিলড। তাদের কামড়ে ঝাল নেই, মাইনর কুটুশ আছে; তবে যে'টা মোক্ষমভাবে আছে সে'টা হলা কামড়ানোর কয়েক সেকেন্ড পর ছড়িয়ে পড়া জ্বালা। 

কলকাতা বিমানবন্দর কতৃপক্ষকে আন্তরিক অভিনন্দন কলকাতার মেট্রো-জীবনের বিষণ্ণতার আস্তরণ ভেদ করে এমন হাই কোয়ালিটি মশাদের ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য। এইমাত্র বোর্ডিং শুরু হয়েছে। জেটবাহাদুর মশাবাহিনীকে "ব্রাভো" বলে এগোলাম৷ এই অকুতোভয় সৈনিকদের আধলিটার রক্তদান করতে পেরে গর্বিত বোধ করছি।

Sunday, March 1, 2020

ফ্যাসিজমঃ আ ওয়ার্নিং


ফ্যাসিবাদ শব্দটা নিয়ে এখন চারদিকে বেশ কফিহাউস লেভেলে কপচানি চলছে। এটাও মেনে নিতে অসুবিধে নেই যে মতের অমিল হলেই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের গায়ে ফ্যাসিস্টের তকমা এঁটে দেওয়ার মধ্যে পপকর্ন-মুচমুচ থাকলেও, ব্যাপারটা সম্পূর্ণভাবে যুক্তিযুক্ত নাও হতে পারে। 
আর পাঁচটা নেটিজেনের মতই আমার ধৈর্য কম। দুম করে ওপিনিওন ঝেড়ে দিয়ে আমি তৃপ্তিলাভ করি আর রাজনৈতিক তর্কে নির্বিচারে 'ফ্যাসিস্ট" গোছের শব্দ জুড়ে দিয়ে আমি টেবিল চাপড়ে থাকি। সস্তা থ্রিল আমার মন্দ লাগে এমন কথা বললে বেশ 
অন্যায়ই হবে বটে। তবে ইদানীং মনে হচ্ছিল এই ফ্যাসিজম সম্বন্ধে সামান্য পড়াশোনা করলে নেহাত মন্দ হয়না৷ একদিকে বেশ ভজকট ব্যাপারে জানার ইচ্ছে আর অন্যদিকে শখের-প্রাণ-গড়েরমাঠ সিন্ড্রোম; কঠিন কন্সেপ্ট বুঝতে চাওয়া সহজ গল্প শোনার স্টাইলে। কাঠখোট্টা পাথুরে ভাষায় আরসালান বিরিয়ানির রিভিউ পড়লেও তা বাসি-পাউরুটি-মার্কা নিরস ঠেকতে পারে। সবচেয়ে ভালো হত যদি ফ্যাসিবাদের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে সঞ্জীব বা পূর্ণেন্দু পত্রী কোনও প্রামাণ্য বই লিখতেন; তা নিশ্চিত ভাবেই আমার মত "কিশোর সমগ্র"-প্রাণ মানুষের জন্য সুখপাঠ্য হত। কিন্তু তেমন সরেস বইয়ের অপেক্ষায় থাকলেই হয়েছে আর কী। 

খানিকটা খোঁজখবর নিয়ে পড়া (শোনা, অডিওবুক) শুরু করলাম ম্যাডেলিন অলব্রাইটের "ফ্যাসিজমঃ আ ওয়ার্নিং"। সে অর্থে, ম্যাডেলিন ম্যাডাম যে নারায়ণ দেবনাথ-সুলভ সরল ভাষায় এ বই লেখেননি তা বলাই বাহুল্য। তবে দিব্যি তরতর করে এগিয়ে যাওয়া যায়। অলব্রাইট হলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন সেক্রেটারি অফ স্টেট; কাজেই তার লেখায় অবধারিত ভাবে প্রাধান্য পেয়েছে ডেমোক্র‍্যাট আমেরিকান পয়েন্ট অফ ভ্যিউ; কিন্তু তা'তে এ বইয়ে ধরা ইতিহাস তেমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি বলেই আমার মনে হয়৷ 
বাঁধাধরা ফর্মুলা বা ডেফিনিশনে ফ্যাসিবাদকে বোঝা সম্ভব না হলেও, ফ্যাসিবাদের বৈশিষ্ট্যগুলোকে বিভিন্ন উদাহরণের মাধ্যমে চমৎকার ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন ম্যাডেলিন অলব্রাইট। ফ্যাসিবাদ সম্বন্ধে আমাদের বেশির ভাগ ধারণাই সম্ভবত হিটলার এবং মুসোলিনি কেন্দ্রিক অথচ ফ্যাসিবাদ কোনো ছকে বাঁধা অঙ্ক নয় যে জার্মানির দুই যোগ দুই আর পাকিস্তানের দুই যোগ দুইতে কোনো ফারাক থাকবে না। বিভিন্ন দেশে বিভিন্নভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে ফ্যাসিবাদী মনোভাব। সবচেয়ে বড় কথা সময়ের সঙ্গে ফ্যাসিবাদ এক জটিল বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে গেছে। উনিশশো তিরিশের দশকে ফ্যাসিবাদের যে চেহারা ছিল তার সঙ্গে আধুনিক ফ্যাসিবাদি হিসেবকিতেব সম্পূর্ণ খাপেখাপ নাও মিলতে পারে। 
এই চ্যালেঞ্জগুলো সত্ত্বেও অলব্রাইট যে'টা সফল ভাবে তুলে ধরতে পেরেছেন সে'টা হল একটা সরকার বা নেতার ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটা। এই প্রক্রিয়াটাকে মোটের ওপর বুঝতে পারলেই হয়ত যে কোনো আধুনিক নাগরিক চিনে নিতে পারবেন অশুভ শক্তিগুলোকে। ব্যাপারটা টুক করে লিখে দেওয়াটা সহজ কিন্তু আত্মস্থ করা কঠিন; আরও কঠিন হল বোঝানো। 
যে কোনো সরকারি হঠকারিতাই কি ফ্যাসিস্ট কাজকারবারের সঙ্গে তুলনীয়? একনায়কতন্ত্র আর ফ্যাসিবাদে কি প্রায় একই ব্যাপার? এমন অনেক জটিল প্রশ্ন অত্যন্ত সহজভাবে আলোচনা করেছেন ম্যাডাম অলব্রাইট। আর বইজুড়ে যাবতীয় আলোচনার মূলে রয়েছে ইতিহাস। ইতিহাস ঘাঁটতে গিয়ে শুধু জার্মানি আর ইতালিতে আটকে না থেকে লেখিকা চমৎকার ভাবে তুলে ধরেছেন উত্তর কোরিয়া, তুরস্ক, পোল্যান্ড, হাঙ্গারি, রাশিয়া, মিশর, ভেনেজুয়েলাএবং আরও অনেক দেশের ফ্যাসিবাদী ইতিহাস। ফ্যাসিবাদের পলিটিকাল ইতিহাসের একটা চমৎকার প্রাইমার তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন লেখিকা, আর সেটা তৈরি করেছেন এমন ভাষায় যা সাধারণ পাঠকের জন্য সহজ ও মূল্যবান। মার্কিন।সেক্রেটারি অফ স্টেট হিসেবে নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় ভর দিয়ে যেভাবে পুতিন,শ্যাভেজ, কিম, ট্রাম্পের (এবং অন্য অনেক দেশনেতার) চরিত্রের বিশ্লেষণ করেছেন লেখিকা; তা অত্যন্ত মনোগ্রাহী। মোদ্দা কথা; ১৯৩০ দশক থেকে এই সময়; ফ্যাসিবাদের ইতিহাসকে বেশ 'কমপ্যাক্ট' ভাবে এই বইতে তুলে ধরেছেন ম্যাডেলিন অলব্রাইট। 
সবচেয়ে বড় কথা, ম্যাডেলিন চেষ্টা করেছেন ফ্যাসিজমের আগাম চিহ্নগুলোর দিকে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে। নাগরিকরা ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে লড়বে তাতে আর আশ্চর্য কী। কিন্তু আধুনিক নাগরিকের ওপর রয়েছে বাড়তি দায়িত্ব; তাঁকে ইতিহাস জানতে হবে এবং সেই জানার ভিত্তিতে সতর্ক হতে হবে যাতে আজকের সাদামাটা জনদরদী সরকার আগামীকালের ফ্যাসিস্ট না হয়ে ওঠে। আগামীকাল যে ফ্যাসিবাদ ধেয়ে আসছে, তার আগাম চিহ্ন আজকেই প্রকট হবে; নাগরিকদের তাই সতর্ক ও সচেতন না হয়ে কোনো উপায় নেই। 
সেই ক্লিশেটা এখানে বসিয়ে দেওয়াটা আমার কর্তব্য; রোমের মতই, হিটলারও একদিনে তৈরি হয়নি।

দ্য বুক থীফ


প্রতি বছর বইমেলার আগে মনে হয় এইবারে অন্তত নার্ভ ধরে রাখতে পারব। মনে হয় এবারে অন্তত বাৎসরিক হুজুগের পাল্লায় পড়ে তাকের না পড়া বইয়ের বোঝা আরও খানিকটা বাড়িয়ে ফেলব না। এবারেও তেমনই একটা কিছু ভেবে রেখেছিলাম, কিন্তু শেষে ওই যা হওয়ার তাই হল। পাঠকের চেয়ে কনজিউমারের মেজাজে ধার বেশি; কাজেই শেষে পর্যন্ত পিঠের ব্যাগ বোঝাই করে বাড়ি ফেরা। নিশ্চিত জানি যে এই নতুন বইগুলোর মধ্যে বেশ কিছু বই হয়ত আগামী একবছরেও পড়া হবে না এবং পরের বইমেলার সময় এই বইগুলোর দিকে তাকিয়ে বারবার শিউরে উঠতে হবে। 
এবারের বইমেলার দিন কয়েক আগে শেষ করেছি মার্কাস জুসাকের “দ্য বুক থীফ”। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জার্মানী আর সেই সময়ের নিবিড় অন্ধকার হাতড়ে বেড়ানো কিছু মানুষের গল্প বলেছেন লেখক। কাহিনীর মূলে রয়েছে লিজেল মেমিঙ্গার নামের এক কিশোরী। হিটলারের জার্মানির আর সেই বিষিয়ে যাওয়া সময়ে আটকে থাকা মানুষের অপরিসীম যন্ত্রণা নিয়ে আলোচনা আগেও হয়েছে আর ভবিষ্যতেও হবে। সেই যন্ত্রণাকেই প্রায় সহজবোধ্য কবিতার ভাষায় এ বইতে তুলে ধরেছেন লেখক। 
গল্পের মূলে রয়েছে বইচোর লিজেল; পাঠক লিজেল। বই পড়বার সুতীব্র আকাঙ্ক্ষা বয়ে বেড়িয়েছে মেয়েটা, নিজের জীবনের প্রতিটি ট্র্যাজেডির সঙ্গে বইপড়া কে জুড়ে দিতে শিখেছে সে। বইকে ক্রমাগত লিজেল যন্ত্রণার মলমের মত ব্যবহার করেছে; একদল মানুষ যখন অসহায় ভাবে বেসমেন্টে লুকিয়ে থেকেছে বোমারু বিমানের আক্রমণের ভয়ে, লিজেলের পাঠ করা বই তখন উপশম হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিটি আতঙ্কিত মানুষের বুকে। সমস্যা হল; লিজেলের তাক ভর্তি না-পড়া-বই ছিল না। তার কেনার সামর্থ্যও ছিল না। লিজেলের কোনও বইই ছিল না।
কাজেই বইচুরি ছাড়া লিজেলের আর কোনও উপায় ছিল না। বইয়ের জঁর, লেখনী, বিষয়, মতাদর্শ, অর্থ; এসব নিয়ে ভাববার বিলাস লিজেলের কপালে ছিল না, যে কোনও একটা বই হলেই হল। 
বই; যার মলাটে হাত বুলনো যায়, প্রতিটা পাতায় ছাপা প্রতিটি শব্দের ওজন মাপা যায়, এক লাইন থেকে পরের লাইনে যাওয়ার ব্যস্ততায় বারুদের গন্ধ পাশ কাটিয়ে যাওয়া যায়…। লিজেলের চোখ দিয়ে বই পড়ার আরাম আর স্নেহটুকু ছুঁয়ে দেখা যায়; সে ছুঁয়ে দেখাটুকুর মূল্য বইমেলা সমস্ত বইয়ের চেয়ে বেশি। লিজেলের বইচুরি আর বই পড়ার আবডালে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য ট্র্যাজেডি আর অজস্র ভালোবাসার মুহূর্ত। এ বইকে শুধু নাৎসি জার্মানারি বীভৎসতার হিসেবকিতেবে বেঁধে ফেলা অসম্ভব।
লিজেল বেড়ে ওঠা হান্স আর রোজা হুবারম্যানের সংসারে। হান্স একজন ভীতু সৈনিক অথচ দুঃসাহসী নাগরিক; আমি বড় হয়ে হান্স হতে চাই। ব্যাপারটা সহজ নয়, তবে চাইতে তো ক্ষতি নেই। আর তার পাশাপাশি রোজা হুবারম্যান। কাটখোট্টা, পাথুরে রোজা হুবারম্যানের অ্যাকোর্ডিয়ন আঁকড়ে বসে থাকা ভালোবাসা; তা কন্টেক্সট-সহ লিখে বোঝানোর ক্ষমতা (এবং ভাষার জোর) আমার নেই। 
দুটো কথা না বলেই নয়। 
এক, এ কাহিনীর অন্যতম চরিত্র মৃত্যু। মৃত্যুর জবানিতেই আমরা লিজেলকে চিনেছি, গোটা উপন্যাস গড়ে উঠেছে মৃত্যুরই ন্যারেশনে। পিওভিটা যেমন ডার্ক ও ধারালো , তেমনই সুন্দর ও স্নেহের। সাধে কি বলেছি যে এই গদ্যে সহজ কবিতার সারল্য মিশে আছে? 
দুই, লেখকের স্টাইলে যে কী অবধারিত ভাবে যে শৈলেন ঘোষ মিশে রয়েছেন। পরতে পরতে শৈলেনের স্পর্শ লেগে আছে জুসাকের গল্প বলায়। অবশ্যই এ উপন্যাসে অনেক বেশি মাত্রায় ট্র্যাজেডির স্পর্শ লেগে আছে, রয়েছে অনেকটা বাড়তি হতাশা। কিন্তু কোথাও কীভাবে যেন শৈলেনের রূপকথার উপাদান এই গল্পে ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন জুসাক।

রোজ ডে-র লেখা


রোজ ডে। 
এ দিনে মান্নাবাবুর কথা মনে পড়বে সে’টাই স্বাভাবিক। 
গোলাপের উল্লেখ মান্নাবাবুর বেশ কিছু গানে রয়েছে। এই যেমন “ভালোবাসার রাজপ্রাসাদ” গানটায় রাজার ভূত স্মৃতি হাতড়ে বলছেন “ইন্ দ্য গুড ওল্ড ডেজ, প্রেমিকাকে তাক করে ইরানি গোলাপ ছুঁড়ে মারতাম”। 
অথবা উত্তমবাবুর দেওয়া লিপের সেই গান 
“মানুষ খুন করলে পরে, মানুষই তার বিচার করে, নেই তো খুনির মাফ, তবে কেন পায় না বিচার নিহত গোলাপ”। এমন এক্সট্রিম-ভেগান প্রেমের গান শুধু বাংলায় কেন, পৃথিবীর সঙ্গীত ইতিহাসে বিরল। 

তবে মান্নাবাবুর গোলাপের রেফারেন্সওলা গানগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠটি হল;
“লাল মেহেন্দির নক্সা হাতে, 
তুললে যখন গোলাপ কুঁড়ি ই ই ই ই ই ই, 
বেশ মিষ্টি
একটা আওয়াজ হল মিষ্টি
একটা আওয়াজ হল...
বাজল ক’টা কাচের চুড়ি 
বলো না 
তোমার নামটা কী গো...
বলো সখী...
তোমার নামটা কী গো...
বলো না...
তোমার নামটা কী গো...। 

খানিক ভেবে দেখেছি, গায়ক নিশ্চয়ই মিষ্টি আওয়াজ বলতে গোলাপ ছেঁড়ার কথা বলছেন না, আওয়াজটা হল কাচের চুড়ির। তবে এতবার “নামটা কী গো...বলো না...বলো সখী” বলে ঘ্যানরঘ্যানর করা চাট্টিখানি কথা নয়। বুলডোজার এমন মোলায়েম ঘ্যানঘ্যানে টেম্পোতে গাইতে পারলে আর্থার ডেন্টও নিশ্চিতভাবেই কোনো ঝ্যামেলা না করে সামনে থেকে সরে যেতেন।