Sunday, March 1, 2020

দ্য বুক থীফ


প্রতি বছর বইমেলার আগে মনে হয় এইবারে অন্তত নার্ভ ধরে রাখতে পারব। মনে হয় এবারে অন্তত বাৎসরিক হুজুগের পাল্লায় পড়ে তাকের না পড়া বইয়ের বোঝা আরও খানিকটা বাড়িয়ে ফেলব না। এবারেও তেমনই একটা কিছু ভেবে রেখেছিলাম, কিন্তু শেষে ওই যা হওয়ার তাই হল। পাঠকের চেয়ে কনজিউমারের মেজাজে ধার বেশি; কাজেই শেষে পর্যন্ত পিঠের ব্যাগ বোঝাই করে বাড়ি ফেরা। নিশ্চিত জানি যে এই নতুন বইগুলোর মধ্যে বেশ কিছু বই হয়ত আগামী একবছরেও পড়া হবে না এবং পরের বইমেলার সময় এই বইগুলোর দিকে তাকিয়ে বারবার শিউরে উঠতে হবে। 
এবারের বইমেলার দিন কয়েক আগে শেষ করেছি মার্কাস জুসাকের “দ্য বুক থীফ”। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জার্মানী আর সেই সময়ের নিবিড় অন্ধকার হাতড়ে বেড়ানো কিছু মানুষের গল্প বলেছেন লেখক। কাহিনীর মূলে রয়েছে লিজেল মেমিঙ্গার নামের এক কিশোরী। হিটলারের জার্মানির আর সেই বিষিয়ে যাওয়া সময়ে আটকে থাকা মানুষের অপরিসীম যন্ত্রণা নিয়ে আলোচনা আগেও হয়েছে আর ভবিষ্যতেও হবে। সেই যন্ত্রণাকেই প্রায় সহজবোধ্য কবিতার ভাষায় এ বইতে তুলে ধরেছেন লেখক। 
গল্পের মূলে রয়েছে বইচোর লিজেল; পাঠক লিজেল। বই পড়বার সুতীব্র আকাঙ্ক্ষা বয়ে বেড়িয়েছে মেয়েটা, নিজের জীবনের প্রতিটি ট্র্যাজেডির সঙ্গে বইপড়া কে জুড়ে দিতে শিখেছে সে। বইকে ক্রমাগত লিজেল যন্ত্রণার মলমের মত ব্যবহার করেছে; একদল মানুষ যখন অসহায় ভাবে বেসমেন্টে লুকিয়ে থেকেছে বোমারু বিমানের আক্রমণের ভয়ে, লিজেলের পাঠ করা বই তখন উপশম হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিটি আতঙ্কিত মানুষের বুকে। সমস্যা হল; লিজেলের তাক ভর্তি না-পড়া-বই ছিল না। তার কেনার সামর্থ্যও ছিল না। লিজেলের কোনও বইই ছিল না।
কাজেই বইচুরি ছাড়া লিজেলের আর কোনও উপায় ছিল না। বইয়ের জঁর, লেখনী, বিষয়, মতাদর্শ, অর্থ; এসব নিয়ে ভাববার বিলাস লিজেলের কপালে ছিল না, যে কোনও একটা বই হলেই হল। 
বই; যার মলাটে হাত বুলনো যায়, প্রতিটা পাতায় ছাপা প্রতিটি শব্দের ওজন মাপা যায়, এক লাইন থেকে পরের লাইনে যাওয়ার ব্যস্ততায় বারুদের গন্ধ পাশ কাটিয়ে যাওয়া যায়…। লিজেলের চোখ দিয়ে বই পড়ার আরাম আর স্নেহটুকু ছুঁয়ে দেখা যায়; সে ছুঁয়ে দেখাটুকুর মূল্য বইমেলা সমস্ত বইয়ের চেয়ে বেশি। লিজেলের বইচুরি আর বই পড়ার আবডালে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য ট্র্যাজেডি আর অজস্র ভালোবাসার মুহূর্ত। এ বইকে শুধু নাৎসি জার্মানারি বীভৎসতার হিসেবকিতেবে বেঁধে ফেলা অসম্ভব।
লিজেল বেড়ে ওঠা হান্স আর রোজা হুবারম্যানের সংসারে। হান্স একজন ভীতু সৈনিক অথচ দুঃসাহসী নাগরিক; আমি বড় হয়ে হান্স হতে চাই। ব্যাপারটা সহজ নয়, তবে চাইতে তো ক্ষতি নেই। আর তার পাশাপাশি রোজা হুবারম্যান। কাটখোট্টা, পাথুরে রোজা হুবারম্যানের অ্যাকোর্ডিয়ন আঁকড়ে বসে থাকা ভালোবাসা; তা কন্টেক্সট-সহ লিখে বোঝানোর ক্ষমতা (এবং ভাষার জোর) আমার নেই। 
দুটো কথা না বলেই নয়। 
এক, এ কাহিনীর অন্যতম চরিত্র মৃত্যু। মৃত্যুর জবানিতেই আমরা লিজেলকে চিনেছি, গোটা উপন্যাস গড়ে উঠেছে মৃত্যুরই ন্যারেশনে। পিওভিটা যেমন ডার্ক ও ধারালো , তেমনই সুন্দর ও স্নেহের। সাধে কি বলেছি যে এই গদ্যে সহজ কবিতার সারল্য মিশে আছে? 
দুই, লেখকের স্টাইলে যে কী অবধারিত ভাবে যে শৈলেন ঘোষ মিশে রয়েছেন। পরতে পরতে শৈলেনের স্পর্শ লেগে আছে জুসাকের গল্প বলায়। অবশ্যই এ উপন্যাসে অনেক বেশি মাত্রায় ট্র্যাজেডির স্পর্শ লেগে আছে, রয়েছে অনেকটা বাড়তি হতাশা। কিন্তু কোথাও কীভাবে যেন শৈলেনের রূপকথার উপাদান এই গল্পে ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন জুসাক।

রোজ ডে-র লেখা


রোজ ডে। 
এ দিনে মান্নাবাবুর কথা মনে পড়বে সে’টাই স্বাভাবিক। 
গোলাপের উল্লেখ মান্নাবাবুর বেশ কিছু গানে রয়েছে। এই যেমন “ভালোবাসার রাজপ্রাসাদ” গানটায় রাজার ভূত স্মৃতি হাতড়ে বলছেন “ইন্ দ্য গুড ওল্ড ডেজ, প্রেমিকাকে তাক করে ইরানি গোলাপ ছুঁড়ে মারতাম”। 
অথবা উত্তমবাবুর দেওয়া লিপের সেই গান 
“মানুষ খুন করলে পরে, মানুষই তার বিচার করে, নেই তো খুনির মাফ, তবে কেন পায় না বিচার নিহত গোলাপ”। এমন এক্সট্রিম-ভেগান প্রেমের গান শুধু বাংলায় কেন, পৃথিবীর সঙ্গীত ইতিহাসে বিরল। 

তবে মান্নাবাবুর গোলাপের রেফারেন্সওলা গানগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠটি হল;
“লাল মেহেন্দির নক্সা হাতে, 
তুললে যখন গোলাপ কুঁড়ি ই ই ই ই ই ই, 
বেশ মিষ্টি
একটা আওয়াজ হল মিষ্টি
একটা আওয়াজ হল...
বাজল ক’টা কাচের চুড়ি 
বলো না 
তোমার নামটা কী গো...
বলো সখী...
তোমার নামটা কী গো...
বলো না...
তোমার নামটা কী গো...। 

খানিক ভেবে দেখেছি, গায়ক নিশ্চয়ই মিষ্টি আওয়াজ বলতে গোলাপ ছেঁড়ার কথা বলছেন না, আওয়াজটা হল কাচের চুড়ির। তবে এতবার “নামটা কী গো...বলো না...বলো সখী” বলে ঘ্যানরঘ্যানর করা চাট্টিখানি কথা নয়। বুলডোজার এমন মোলায়েম ঘ্যানঘ্যানে টেম্পোতে গাইতে পারলে আর্থার ডেন্টও নিশ্চিতভাবেই কোনো ঝ্যামেলা না করে সামনে থেকে সরে যেতেন।

এয়ারপোর্টের সামোসা


এয়ারপোর্টের বাইরে অপেক্ষা করতে করতে ভদ্রলোকের চোখে পড়ল একটা সাজানো-গোছানো খাবারদাবারের দোকান। বার্গারটার্গার, প্যাটিসট্যাটিসের পাশাপাশি রয়েছে মরা সামোসা। ভদ্রলোক কাচের শোকেসের কাছে গিয়ে মন দিয়ে দেখলেন; সামোসাই, শিঙাড়ার লাবণ্য সেগুলির মধ্যে আদৌ নেই।
অনেকক্ষণ ধরে পেটের মধ্যে একটা বিশ্রী খিদে খলবল করে বেড়াচ্ছিল বটে। কিন্তু বেঢপ সামোসার ঠাণ্ডা লাশ চিবুতেও তেমন প্রবৃত্তি হচ্ছিল না। শেষে খিদে যখন পেটের মধ্যে সিঁদ কাটতে শুরু করলে তখন বাধ্য হয়ে সেই কাচের শোকেসের সামনে গিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়ালেন ভদ্রলোক। 
- কী চাই স্যর?
- সমস্যা, থুড়ি, সমোসা। হেহ হেহ। পিজে। 
- ক'পিস দেব?
- ওই একটি ম্যানেজ করতে পারলেই পদ্মশ্রী। 
- হান্ড্রেড অ্যান্ড ফিফটি রুপিজ। 
- পার পিস?
- হ্যাঁ স্যর। 
- মিনিমান তিনশো হওয়া উচিৎ। পার পিস!
- এক্সকিউজ মি স্যর?
- চলুন আড়াইশোয় রফা করছি। কিন্তু তার কম এক পয়সাও নয়। 
- আমি ঠিক বুঝতে পারছি না স্যর।
- উফ আপনি বড় হার্ড বার্গেন করেন মশাই৷ বেশ, সোয়া'দুশোই সই। আর টানাহ্যাঁচড়া করবেন না প্লীজ।
- কিন্তু এর দাম তো দেড়শো টাকা। 
- স্যার, এই ব্রয়লার সামোসার লাশ গেলা তো চাট্টিখানি কথা নয়। নিন, আমায় দুশো টাকা দিন, আমি না হয় একটা চোখনাককান বুজে খেয়েই নিচ্ছি। তবে ক্যাশে দেবেন ভাইটি।
- আমি আপনাকে টাকা দেব? আপনি আমার দোকান থেকে সামোসা খাবেন আর আমি আপনাকে টাকা দেব? মাইরি, ইয়ার্কি পেয়েছেন?
- ও সমোসা খেলে কপালে নিউক্লিয়ার অম্বল নাচছে যে, নির্ঘাৎ। বে অফ জেলুসিলে স্কুবা ডাইভিং করলেও রক্ষে নেই। আপনার এমন দামী শোকেস থেকে ওই লাশ সরানোর জন্য অন্তত দু'শো টাকা দেবেন না? মার্ডার আর ডাকাতি একসঙ্গে করবেন স্যর?
***
ভদ্রলোক সামোসা পাননি৷ আর দোকানিদাদার সেই গোটা বেলাটাপ্রবল অস্বস্তিতে কেটেছিল।

বইমেলার ভীড়ে


- এত মানুষ বই কেনে রে বিল্টে?
- এত্ত এত্ত মানুষ।
- শয়ে শয়ে হাজারর হাজারে দোকান। সবার বিক্রিবাটা হয়?

- এক্কেবারে লাল হয়ে যায় মামা। লাল হয়ে যায়।
- এত লেখা হয়? ছাপার জন্য এতশত লেখা পাওয়া যায়?
- পাওয়া যাবে না কেন? দিস্তে দিস্তে লেখা হচ্ছে রোজ। দিস্তে দিস্তে।
- দিস্তে দিস্তে লেখার মত এত লেখক কি সত্যি আছে রে বিল্টে?
- রীতিমতো আছে, ঠাসাঠাসি করে আছে৷ ঠাসাঠাসি।
- এত লেখা...এত সমস্ত লেখা পড়ার মানুষ আছে? 
- প্রচুর মানুষ পড়ে মামা। গাদা গাদা পড়ে। পড়েই চলে।
- কিন্তু বিল্টে...আমি পড়ি কই...। কেন যে এ'সব বইমেলাটইমেলায় আমায় টেনে আনিস..। তখন থেকে এই এক স্টলেই বা কেন দাঁড়িয়ে আছি... আধঘণ্টা হতে চলল রে...।
****
- মাসে দু'চারটে চিঠি লিখলে তোর খুব ক্ষতি হবে রে বিল্টু?
- আমি লিখব? তোকে
- আলবাত লিখবি। আমরা সামনের মাসে যোধপুর চলে যাচ্ছি, তুই চিঠি না লিখলে চলবে কেন?
- আজকাল লোকে চিঠিটিঠি লেখে?
- গাদাগুচ্ছের লেখে। গাদাগুচ্ছের। 
- সে'সব পড়ার সময় আছে মানুষের?
- চিঠি পড়ার সময়? অঢেল। অঢেল। 
- সে'বার সমরবাবুর ফিজিক্স টিউশনির টাকা ফাঁকি দিয়ে তোর জন্য বইমেলা থেকে বই কিনে দিয়েছিলাম। আজও পড়লি না,কচু দেব গাদাগুচ্ছের চিঠি।
- আমায় আবার একবার বইমেলা নিয়ে যাস, কেমন? বাবু?
- পুরনো বইগুলোই পড়িস না৷ তোকে নিয়ে যাব বইমেলায়? ছোহ্। 
- তুই পড়িস তো। তুই বই চেনাবি। আঙুল নাচিয়ে দেখাবি; হুইয্যে সঞ্জীব, হুইয্যে শীর্ষেন্দু। আর আমার মন পড়ে রইবে কাটলেটের দোকানে। আর কাগজের ফুলের স্টলে। 
- ধুস।
- ধুস? তুই বইমেলা দেখাবি, আমি তোর মত করে বইমেলা চিনব, সে বেলা ধুস? থাক, তোর আর চিঠি লিখে কাজ নেই। তোর দেমাক বড্ড বেশি।
***
মৃণালিনী স্টলে প্রায় চল্লিশ মিনিট মত ছিল। নিজের জন্য "লোটাকম্বল" বইটা নিল আর যে বারো বছরের ছিপছিপে ছেলেটা মৃণালিনীর গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিল; তার জন্য নিল গোটা ফেলুদা সমগ্র। 
ভীড়ের আড়ালে থেকে আর মামার বাজে প্রশ্নের ঢেউ ডজ করে সমস্তটাই লক্ষ্য করল বিল্টুকুমার৷ মৃণালিনী "লোটাকম্বল" বইটা নিল দেখে সামান্য ঢোঁক গিললে সে৷ টিউশনির টাকা সরানোর পাপের টাকায় কেনা "লোটাকম্বল" না পড়ে হয়ত ভালোই করেছে মৃণালিনী। 
তবে যোধপুরে নিয়মিত চিঠি লিখতে না পারার আফশোসটা বহুদিন পর ফের একবার বিল্টুবাবুর মনের মধ্যে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল৷

অরওয়েলদা




- অরওয়েলদা!
- আহ্, জ্বালাসনে।
- ও অরওয়েলদা! 
- চুপ কর না ব্যাটাচ্ছেলে ইস্টুপিড।
- আরে বলই না, কী করছ?
- নোট নিচ্ছি।
- ভূতের আবার নোটের কী দরকার?
- এ দুনিয়া স্টাডি করে স্পষ্ট বুঝেছি যে বেঁচে থাকতে যা লিখেছি সে সমস্ত বড্ড হালকা হয়ে গেছে। এ'বার লিখব রিয়ালিস্টিক কিছু...ডার্ক কিছু একটা...তাই বর্তমান থেকে নোট নিচ্ছি...দয়া করে অকারণ ভ্যাজরভ্যাজর করে কনসেন্ট্রেশনের বারোটা বাজাস না।