Sunday, March 1, 2020

রোজ ডে-র লেখা


রোজ ডে। 
এ দিনে মান্নাবাবুর কথা মনে পড়বে সে’টাই স্বাভাবিক। 
গোলাপের উল্লেখ মান্নাবাবুর বেশ কিছু গানে রয়েছে। এই যেমন “ভালোবাসার রাজপ্রাসাদ” গানটায় রাজার ভূত স্মৃতি হাতড়ে বলছেন “ইন্ দ্য গুড ওল্ড ডেজ, প্রেমিকাকে তাক করে ইরানি গোলাপ ছুঁড়ে মারতাম”। 
অথবা উত্তমবাবুর দেওয়া লিপের সেই গান 
“মানুষ খুন করলে পরে, মানুষই তার বিচার করে, নেই তো খুনির মাফ, তবে কেন পায় না বিচার নিহত গোলাপ”। এমন এক্সট্রিম-ভেগান প্রেমের গান শুধু বাংলায় কেন, পৃথিবীর সঙ্গীত ইতিহাসে বিরল। 

তবে মান্নাবাবুর গোলাপের রেফারেন্সওলা গানগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠটি হল;
“লাল মেহেন্দির নক্সা হাতে, 
তুললে যখন গোলাপ কুঁড়ি ই ই ই ই ই ই, 
বেশ মিষ্টি
একটা আওয়াজ হল মিষ্টি
একটা আওয়াজ হল...
বাজল ক’টা কাচের চুড়ি 
বলো না 
তোমার নামটা কী গো...
বলো সখী...
তোমার নামটা কী গো...
বলো না...
তোমার নামটা কী গো...। 

খানিক ভেবে দেখেছি, গায়ক নিশ্চয়ই মিষ্টি আওয়াজ বলতে গোলাপ ছেঁড়ার কথা বলছেন না, আওয়াজটা হল কাচের চুড়ির। তবে এতবার “নামটা কী গো...বলো না...বলো সখী” বলে ঘ্যানরঘ্যানর করা চাট্টিখানি কথা নয়। বুলডোজার এমন মোলায়েম ঘ্যানঘ্যানে টেম্পোতে গাইতে পারলে আর্থার ডেন্টও নিশ্চিতভাবেই কোনো ঝ্যামেলা না করে সামনে থেকে সরে যেতেন।

এয়ারপোর্টের সামোসা


এয়ারপোর্টের বাইরে অপেক্ষা করতে করতে ভদ্রলোকের চোখে পড়ল একটা সাজানো-গোছানো খাবারদাবারের দোকান। বার্গারটার্গার, প্যাটিসট্যাটিসের পাশাপাশি রয়েছে মরা সামোসা। ভদ্রলোক কাচের শোকেসের কাছে গিয়ে মন দিয়ে দেখলেন; সামোসাই, শিঙাড়ার লাবণ্য সেগুলির মধ্যে আদৌ নেই।
অনেকক্ষণ ধরে পেটের মধ্যে একটা বিশ্রী খিদে খলবল করে বেড়াচ্ছিল বটে। কিন্তু বেঢপ সামোসার ঠাণ্ডা লাশ চিবুতেও তেমন প্রবৃত্তি হচ্ছিল না। শেষে খিদে যখন পেটের মধ্যে সিঁদ কাটতে শুরু করলে তখন বাধ্য হয়ে সেই কাচের শোকেসের সামনে গিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়ালেন ভদ্রলোক। 
- কী চাই স্যর?
- সমস্যা, থুড়ি, সমোসা। হেহ হেহ। পিজে। 
- ক'পিস দেব?
- ওই একটি ম্যানেজ করতে পারলেই পদ্মশ্রী। 
- হান্ড্রেড অ্যান্ড ফিফটি রুপিজ। 
- পার পিস?
- হ্যাঁ স্যর। 
- মিনিমান তিনশো হওয়া উচিৎ। পার পিস!
- এক্সকিউজ মি স্যর?
- চলুন আড়াইশোয় রফা করছি। কিন্তু তার কম এক পয়সাও নয়। 
- আমি ঠিক বুঝতে পারছি না স্যর।
- উফ আপনি বড় হার্ড বার্গেন করেন মশাই৷ বেশ, সোয়া'দুশোই সই। আর টানাহ্যাঁচড়া করবেন না প্লীজ।
- কিন্তু এর দাম তো দেড়শো টাকা। 
- স্যার, এই ব্রয়লার সামোসার লাশ গেলা তো চাট্টিখানি কথা নয়। নিন, আমায় দুশো টাকা দিন, আমি না হয় একটা চোখনাককান বুজে খেয়েই নিচ্ছি। তবে ক্যাশে দেবেন ভাইটি।
- আমি আপনাকে টাকা দেব? আপনি আমার দোকান থেকে সামোসা খাবেন আর আমি আপনাকে টাকা দেব? মাইরি, ইয়ার্কি পেয়েছেন?
- ও সমোসা খেলে কপালে নিউক্লিয়ার অম্বল নাচছে যে, নির্ঘাৎ। বে অফ জেলুসিলে স্কুবা ডাইভিং করলেও রক্ষে নেই। আপনার এমন দামী শোকেস থেকে ওই লাশ সরানোর জন্য অন্তত দু'শো টাকা দেবেন না? মার্ডার আর ডাকাতি একসঙ্গে করবেন স্যর?
***
ভদ্রলোক সামোসা পাননি৷ আর দোকানিদাদার সেই গোটা বেলাটাপ্রবল অস্বস্তিতে কেটেছিল।

বইমেলার ভীড়ে


- এত মানুষ বই কেনে রে বিল্টে?
- এত্ত এত্ত মানুষ।
- শয়ে শয়ে হাজারর হাজারে দোকান। সবার বিক্রিবাটা হয়?

- এক্কেবারে লাল হয়ে যায় মামা। লাল হয়ে যায়।
- এত লেখা হয়? ছাপার জন্য এতশত লেখা পাওয়া যায়?
- পাওয়া যাবে না কেন? দিস্তে দিস্তে লেখা হচ্ছে রোজ। দিস্তে দিস্তে।
- দিস্তে দিস্তে লেখার মত এত লেখক কি সত্যি আছে রে বিল্টে?
- রীতিমতো আছে, ঠাসাঠাসি করে আছে৷ ঠাসাঠাসি।
- এত লেখা...এত সমস্ত লেখা পড়ার মানুষ আছে? 
- প্রচুর মানুষ পড়ে মামা। গাদা গাদা পড়ে। পড়েই চলে।
- কিন্তু বিল্টে...আমি পড়ি কই...। কেন যে এ'সব বইমেলাটইমেলায় আমায় টেনে আনিস..। তখন থেকে এই এক স্টলেই বা কেন দাঁড়িয়ে আছি... আধঘণ্টা হতে চলল রে...।
****
- মাসে দু'চারটে চিঠি লিখলে তোর খুব ক্ষতি হবে রে বিল্টু?
- আমি লিখব? তোকে
- আলবাত লিখবি। আমরা সামনের মাসে যোধপুর চলে যাচ্ছি, তুই চিঠি না লিখলে চলবে কেন?
- আজকাল লোকে চিঠিটিঠি লেখে?
- গাদাগুচ্ছের লেখে। গাদাগুচ্ছের। 
- সে'সব পড়ার সময় আছে মানুষের?
- চিঠি পড়ার সময়? অঢেল। অঢেল। 
- সে'বার সমরবাবুর ফিজিক্স টিউশনির টাকা ফাঁকি দিয়ে তোর জন্য বইমেলা থেকে বই কিনে দিয়েছিলাম। আজও পড়লি না,কচু দেব গাদাগুচ্ছের চিঠি।
- আমায় আবার একবার বইমেলা নিয়ে যাস, কেমন? বাবু?
- পুরনো বইগুলোই পড়িস না৷ তোকে নিয়ে যাব বইমেলায়? ছোহ্। 
- তুই পড়িস তো। তুই বই চেনাবি। আঙুল নাচিয়ে দেখাবি; হুইয্যে সঞ্জীব, হুইয্যে শীর্ষেন্দু। আর আমার মন পড়ে রইবে কাটলেটের দোকানে। আর কাগজের ফুলের স্টলে। 
- ধুস।
- ধুস? তুই বইমেলা দেখাবি, আমি তোর মত করে বইমেলা চিনব, সে বেলা ধুস? থাক, তোর আর চিঠি লিখে কাজ নেই। তোর দেমাক বড্ড বেশি।
***
মৃণালিনী স্টলে প্রায় চল্লিশ মিনিট মত ছিল। নিজের জন্য "লোটাকম্বল" বইটা নিল আর যে বারো বছরের ছিপছিপে ছেলেটা মৃণালিনীর গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিল; তার জন্য নিল গোটা ফেলুদা সমগ্র। 
ভীড়ের আড়ালে থেকে আর মামার বাজে প্রশ্নের ঢেউ ডজ করে সমস্তটাই লক্ষ্য করল বিল্টুকুমার৷ মৃণালিনী "লোটাকম্বল" বইটা নিল দেখে সামান্য ঢোঁক গিললে সে৷ টিউশনির টাকা সরানোর পাপের টাকায় কেনা "লোটাকম্বল" না পড়ে হয়ত ভালোই করেছে মৃণালিনী। 
তবে যোধপুরে নিয়মিত চিঠি লিখতে না পারার আফশোসটা বহুদিন পর ফের একবার বিল্টুবাবুর মনের মধ্যে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল৷

অরওয়েলদা




- অরওয়েলদা!
- আহ্, জ্বালাসনে।
- ও অরওয়েলদা! 
- চুপ কর না ব্যাটাচ্ছেলে ইস্টুপিড।
- আরে বলই না, কী করছ?
- নোট নিচ্ছি।
- ভূতের আবার নোটের কী দরকার?
- এ দুনিয়া স্টাডি করে স্পষ্ট বুঝেছি যে বেঁচে থাকতে যা লিখেছি সে সমস্ত বড্ড হালকা হয়ে গেছে। এ'বার লিখব রিয়ালিস্টিক কিছু...ডার্ক কিছু একটা...তাই বর্তমান থেকে নোট নিচ্ছি...দয়া করে অকারণ ভ্যাজরভ্যাজর করে কনসেন্ট্রেশনের বারোটা বাজাস না।

বাপু, নাথু ও ম্যাজিক


- আই শালা, ইদিকে দ্যাখ।
- আমায় বলছ?
- নেংটি শালা তুই ছাড়া আর আছেটা কে। ইদিকে দ্যাখ।
- ইদিকে মানে কোনদিকে?
- নেতানো পাঁপড়ের মচমচ দেখো, প্রশ্ন করে আবার। শালা হাতের রিভলভার দেখছিস না?
- তা দেখেছি। 
- দ্যাখ ব্যাটা গদ্দারচন্দ্র গদগদি! এই দ্যাখ!
- ম্যাজিকট্যাজিক কিছু দেখাবে নাকি বাবু? রিভলভারের নল দিয়ে টুকুস করে গোলাপ বেরিয়ে আসবে?
- বুড়োভামের ফুর্তি দেখে গা জ্বলে যায়। আজ যদি কচুকাটা না করেছি...।
- বন্দুকের গুলি ছুঁড়ে ঝাঁঝরা করা যায় নাথু। কচুকাটা করতে হলে তলোয়ারই ভালো। 
- দেশের সর্বনাশ করে এমন দেমাক দেখাতে লজ্জা করে না রে হারামজাদা।
- যুক্তির বদলে বন্দুক তুলে নিয়েছ নাথু৷ এ দেশের সর্বনাশ যে হয়নি, সে কথা হলফ করে বলি কী করে বলো। 
- ওরে আমার হরিদাস পাল এলেন হে। ওঁর যুক্তি বহুত খুব আর আমার যুক্তি গবেটামো।
- বন্দুকের নল থেকে গোলাপ বের করে দেখাও দিকি নাথু৷ তখন বুঝব এদ্দিনে কত যুক্তি শিখেছ।
- বাহাত্তর বছর হল, বছরের এই দিনটা রোজ একবার করে তোর বুকে গুলি ঠুসে যাই৷ তবু মাইরি তোর ঢিঁটগিরি গেলনা।
- বেঁচে থাকতে যায়নি, এখন কি আর পাল্টানোর বয়স আছে ভাই নাথু? তবে ওই হালটাল ছাড়তে আমি পারব না৷ একদিন তোমার বন্দুক থেকে গোলাপের ডাঁটি বেরিয়ে আসবেই৷ দেখো। 
- ধেত্তেরি শালা টেকো ফুটানিবাজ।
- তোমার ছাড়ব না ভাই নাথু। যতই তম্বি করো।
- মাইরি, ইচ্ছে করছে তোর মাথায় থানইট ছুঁড়ে মারি। প্রতি বছর এইভাবে আমার বন্দুকের সামনে এসে হ্যাহ্যা করার কোনও মানে হয়? 
- যদ্দিন বেঁচে ছিলাম; তদ্দিন কত কাজ ছিল হে। দেশের জন্য, দশের জন্য৷ এখন তেমন ব্যস্ততা নেই, শুধু অপেক্ষা। আমি তোমার অপেক্ষায় আছি হে নাথু। আজ এই নিয়ে সত্তর বছর হবে। এইভাবে একদিন সাতশো হবে, সাতহাজার হবে। তবে আমার সময়ের অভাব নেই নাথু। তোমার অপেক্ষায় দিব্যি আছি। চালাও।
- আপনি না মাইরি...।
- কই। আজ তাড়া নেই? 
- আমি কিন্তু সত্যিই আজও গুলি চালাব...।
- মিথ্যে কোনোকিছুর সঙ্গেই থেকে লাভ নেই৷ গুলি চালাতে হলে মিছিমিছি ভণিতা না করাই ভালো।
- তাই বলে প্রতিবছর এইভাবে আমার বন্দুকের নলের সামনে এসে আপনি...।
- ঘাবড়ে গেলে চলবে কেন? হয় এইবেলা পাশে এসে বাধ্য খোকাটির মত চুপটি করে বসবে। নয়ত আমার ছাতি তাক করে দুড়ুম! কেমন?
- বেশ! এই যে! নিন!

****দুড়ুম****

- এ কী নাথু!
- এ কী বাপু! বন্দুকের নল থেকে সত্যিই গোলাপের ডাঁটি...। ম্যা...ম্যাজিক!
- হে রাম!
- ও কী! আপনার মনখারাপ কেন?
- কে জানে নাথু। হঠাৎ মনে বড় কুডাক দিল। এক নাথুকে অন্ধকার থেকে টেনে বার করলাম, এ'দিকের দেশের মাটিতে অন্য কোনও নাথু অন্ধকারের দিকে এগিয়ে গেল কিনা কে জানে।