Sunday, March 1, 2020

মারো গুলি


- দত্ত! অ্যাই যে, দত্ত! আমার টেবিলে খবরের কাগজ আজ একটা কম কেন?
- তিপ্পান্নটা কাগজের জায়গায় বাহান্নটা রয়েছে, এতে অত চেল্লামেল্লির কী হয়েছে মিনিস্টারদাদা?
- সেক্রেটারি হয়ে এত চ্যাটাংচ্যাটাং কথা বলার সাহস তুমি পাও কী করে! ব্যাটার যত বড় মুখ নয় তত বড়..।
- সুইস ব্যাঙ্কের পাশবই আপডেট করিয়ে এনেছি গতকাল।
- তোমার সবদিকে খেয়াল ভায়া। তুমি না থাকলে আমি যে কী করতাম..। 
- বলছিলাম, খবরেরকাগজে মুখ গুঁজে পড়ে না থেকে ব্রেকফাস্টটা তাড়াতাড়ি সেরে ফেলুন৷ দশটা নাগাদ জ্যাপান ডট ওআরজির ডেলিগেটদের সঙ্গে মিটিং আছে। 
- ওহহো,তা ওদের জন্য লাঞ্চের ব্যবস্থা কী করেছ? বড্ড বায়নাক্কা ওদের। লিথিয়ামটিথিয়াম কিন্তু ওদের জন্য বড্ড স্পাইসি।
- মিনিস্টারদাদা, টোটালি সোলার বুফে রেখেছি৷ চেটেপুটে খাবে। 
- গুড গুড। ওদের ক্ষেত্রে অবশ্য একটা সাফক্লাস সুবিধে আছে। আমাদের মত মানুষ ট্যাঁকে নিয়ে ঘোরার বিশ্রী ঝ্যামেলা ওদের নেই।
- ঝামেলা বলে ঝ্যামেলা। মালগুলো দু'আনার কাজ করে আর বারো আনার অধিকার দাবী করে। 
- আহা দত্ত, ওরা আহাম্মক হতে পারে, তা বলে ওদের মাল বলে ডেকো না। ওরা না থাকলে তো আর আমরা...।
- আহাম্মক, নেকুপুষু, রিসোর্স-খেকো; কিছু বলতেই আর দোষ নেই। এই যেমন ডাইনোসরদের ফ্যাট আগলি বাস্টার্ডাস বললেও সেন্টিমেন্ট হার্ট করার ব্যাপার থাকে না।
- আমি ঠিক বুঝতে পারছি না দত্ত...।
- মিনিস্টার সব কিছু বুঝলে সেক্রেটারি তার ন্যাজটা নাড়বে কী করে বলুন। বুঝিয়ে বলি বরং, এখন কিন্তু আমরাও জ্যাপান ডট ওআরজি'র মত সুপারপাওয়ার...সিকিউরিটি কাউন্সিলের ডাক এলো বলে...। 
- বলো কী দত্ত! কিন্তু দেশে মানুষ থাকলে তো..।
- মিনিস্টারদাদা...তিপ্পান্নটা কাগজের মধ্যে কোন কাগজটা কম সে'টা বোধ হয় খেয়াল করেননি৷ এ দেশের খবরের কাগজগুলোর মধ্যে একটাই ছিল ব্যাটাচ্ছেলে মানুষগুলোর। 
- সে কাগজ বন্ধ করে দিয়েছ?
- আজ্ঞে না, সে কাগজের প্রয়োজন ফুরিয়েছে। ইন্ডিয়া ডট বিজের যত মানুষ; সব এক্কেরে একরাতে ঝেঁটিয়ে সাফ করেছি। এ'বার থেকে শুধুই আমরা। কন্ট্রোল রুমে বসে যে বোতাম যেমন টিপবেন, দেশের সক্কলে তেমনই মুণ্ডু দোলাবে।
- এ'বার থেকে..শুধু...শুধুই আমরা? শুধুই রোবট...? 
- কে...কেন?
- আরে মালগুলোর খালি কথায় কথায় প্রতিবাদ। কাজেকম্মে এন্তার ভুল অথচ অনবরত হিউমান রাইটস হিউমান রাইটস বলে ভ্যাজরভ্যাজর করেই চলেছে৷ এ'সব ন্যাকাপনা চলতে থাকলে ইন্ডিয়া ডট বিজ ক্র‍্যাশ করতই৷ কাজেই...ওই তর্ক-লজিক-ডিবেট ঢের হয়েছে। গুলি করে মেরে ফেলবার সহজ উপায় থাকতে শৌখিন যুক্তিতর্কে অকারণ সময় নষ্ট করার যে কী দরকার।

নিখুঁত রোল



আদতে আমি রোলে সস্ দেওয়ার সম্পূর্ণ বিরোধী নই৷ সমস্ত রোলই তো আর নিখুঁত হয়ে ওঠেনা আর আমার মতে রোলের ভুলভ্রান্তিগুলোকে ঢেকে ফেলতে সস্ ব্যাপারটা বেশ কাজে লাগে। মলাট ছেঁড়া বইতে প্রয়োজনে সেলোটেপ আঁটতে হবে বৈকি।

তবে যেই রোলে কামড় বসিয়ে মনে হবে যে এ'তে এক ফোঁটা সস্ পড়লেই সব মাটি; 
প্রেমিক অমিত রে'র কবিতায় বকুলতলার ক্রিকেট কোচ লায়ন রে'র কোটেশনের মত,
ঘনাদার গল্পে টেনিদার ইয়াক ইয়াকের মত,
ফেলুদার নোটবুকে টুকে রাখা রেজালার রেসিপির মত, 
দুর্দান্ত ডিবেটের মধ্যিখানে গুঁজে দেওয়া হোয়াটাবাউটারির মত;
অমনি বুঝে নিতে হবে যে সেই রোলই সার্থক ও নিখুঁত। 

তেমন নিখুঁত রোল যে সহজে জোটে না ভাইটি। রোলের পরোটা দিব্যি ভাজা হতে হবে অথচ সামান্য নরমভাবটুকু না থাকলেই নয়, ভিতরের চিকেনকুচি তন্দুর থেকে তুলে সামান্য ভেজে নিতে হবে, পেঁয়াজ-লঙ্কা-নুন পড়বে চন্দ্র-সূর্যের হিসেব মেনে; এমন হাজারো বায়নাক্কায় সামান্য এ'দিক ও'দিক হলেই আমিরের "লাগান" মার্কা পার্ফেকশন উড়ে গিয়ে উঠে আসবে "মেলা" গোছের লম্ফঝম্প৷ আর সেই লম্ফঝম্প সামাল দিতেই প্রয়োজন হয় সসের। 

সেই পার্ফেক্ট রোল খুঁজে পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। তবে খোঁজ পেলে একটা ব্যাপার নিশ্চিত জানবেন। নিখুঁত রোল-বানিয়ের কর্ম-ব্যস্ততাটুকু চাক্ষুষ করতে পারার মধ্যে একটা শীতের বিকেলের সমুদ্র দেখার মত নিবিড় ভালোবাসা জড়িয়ে আছে।

হিসেবের মিষ্টি



- এই সন্দেশটা কত করে দাদা? 
- বারো টাকা পিস।
- বারো....আটটায় ছিয়ানব্বুই। দশটায় আবার একশো কুড়ি..।

- দশটা দেব?
- বাজেট এক্সিড করছে। 
- আটটা দেব?
- আট সংখ্যাটা...কেমন যেন..খচখচ করছে জানেন। মানে..চার টাকা আন্ডারইউটিলাইজডও থেকে যাচ্ছে। যাকগে, এই সন্দেশটা কত করে?
- পনেরো টাকা পিস। 
- পত্রপাঠ ক্যান্সেল৷ ক্ষীরকদম?
- পনেরো টাকা পিস। 
- উফ! বারোর নীচে কোনগুলো?
- নীচের দিকে যেগুলো রাখা আছে। 
- এই সন্দেশটা কত করে?
- আট টাকা পিস।
- লে হালুয়া। বারো পিস, সেই আন্ডারিউটিলাইজড চারটাকা। 
- তা'হলে কি এটা দেব? বারোটা?
- কুটুমবাড়ি নেমন্তন্ন। অন্তত একশো টাকা যদি খরচ না করি, মনের মধ্যে খচখচ করবে। 
- তেরোটা নিন।
- চারটাকা বেশি খরচ হলে ক্ষতি নেই বটে। 
- তাহলে দিই?
- বেজোড় সংখ্যায় নেব? কেমন চোখ টাটাবে। 
- চোদ্দটা নিন৷ 
- বারো টাকা বেশি? এ যে আসা যাওয়ার বাসভাড়া চলে যাবে। বলছিলাম যে, দশটাকার মিষ্টি কিছু আছে কি?
- রসগোল্লা নিন।
- রসগোল্লা? গুড়ের?
- গুড়েরটা বারো টাকা পিস। চিনিরটা নিন।
- তাও নেওয়া যায়। তবে দেবেন কীসে? মাটির ভাঁড়ে?
- প্লাস্টিক কন্টেনারে। 
- অর্জুন শান্তিনিকেতনি থলেতে তীর বয়ে বেড়ালে ভালো দেখাত দাদা? এ জন্যেই আজকাল কারুর বাড়ি রসগোল্লা নিয়ে যেতে ইচ্ছে করে না। 
- এই সন্দেশটা নিন। দশটাকা পীস৷ 
- সাইজ একটু ছোট বুঝলেন...ভলিউমটা খুব ইম্পর্ট্যান্ট। খুব। শনিমন্দিরে দেওয়ার মিষ্টির মাইক্রো বাক্স হাতে তো যাওয়া যায় না৷ 
- আপনি কি মিষ্টি নেবেন আদৌ? নিলে এ'টা নিন, দশটাকার সন্দেশ। এই যে, এগুলো। নেবেন কি? 
- আলবাত। আপনি এই দশটাকার সন্দেশই দশ পিস দিন। তবে বড় বাক্সে।
- সন্দেশ গড়াগড়ি খাবে যে, ভেঙে যাবে। 
- ভায়া, নেমন্তন্ন খেতে দশ বারোজন মানুষ যাবে। অর্থাৎ দশ বারোটা মিষ্টির বাক্স; ডাইরেক্ট কম্পিটিশন। আর কম্পিটিশন মিষ্টির কোয়ালিটিতে নয়, বাক্সের সাইজে। এক কাজ করুন, ওই দশটাকার মিষ্টি আটটা দিন আর কুড়ি টাকার বোঁদে। সমস্তটাই এক বাক্সে দিলে ভল্যুম বাড়বে, কাজেই বাক্সটা আর একটু বড় দেবেন। 
- নরেন্দ্রনাথ খামোখা রামকৃষ্ণের পাল্লায় পড়ে বিবেকানন্দ হতে গেলেন। সময়মত আপনার আশীর্বাদ পেলে দিব্যি প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন । 
- হে হে হে।

দাস কেবিনে খাবো না



- আজ মোটেও দাস কেবিনে খাবো না...। 
- অবভিয়াসলি। অবিভিয়াসলি। কোনো মতেই নয়। দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
- গড়িয়াহাট পৌঁছবো। জরুরী কেনাকাটা সারব। তারপর সোজ ট্যাক্সি ধরে বাড়ি।

- সোজা। স্ট্রেট। কোনোরকম ডায়ে বাঁয়ে না তাকিয়ে।
- নেহাত যদি খিদে পায়...।
- ঘণ্টাখানেক ঘুরঘুর করে কেনাকাটি। ফিনকি দিয়ে ক্যালরি ঝরবে; খিদের আর দোষ কী।
- রাইট। কাজেই নেহাত যদি খিদে পায় তা'হলে সামান্য ডালের বড়া। ব্যাস। 
- ওই যৎসামান্য। 
- তবে ইয়ে; খালিপেটে ডালের বড়াফড়া খেলে আবার সামান্য বুকজ্বালা হতে পারে। 
- বুকজ্বালা আদৌ ভালো ব্যাপার নয়৷ বুকজ্বালা হেলাফেলা করা উচিৎ নয়। আর খালিপেটে ওই ডালের বড়া খাওয়া তো ক্রিমিনাল অফেন্স। তাই না?
- কাজেই একট রোল দিয়ে পেট সইয়ে নিলেই হবে।
- মাত্র এক পিস রোল৷ খালিপেট ঘটিত বুকজ্বালার সমস্যা এড়িয়ে চলতে নেহাৎ মেডিসিনাল পারপাসে ব্যবহৃত হবে৷ 
- করেক্ট। বেদুইনের সামনে দু'দণ্ড জিরিয়ে নেওয়া যাবে। তারপর না হয় ওই সামান্য ডালের বড়া।
- যৎসামান্য ডালের বড় বই তো নয়৷ 
- আর তেমন গোলমাল দেখলে পুদিনহরা তো আছেই...।
- শুনেছি পুদিনহরায় নাকি কী সব কেমিক্যালটেমিক্যাল মেশানো আছে...কিছুতেই আজকাল আর ভরসা করা যায় না।
- বটেই তো। পলিটিশিয়ান টু ওষুধ, সর্বত্র ভেজাল। অগত্যা না হয় থামসআপই খাব৷ 
- অগত্যা। অসহায়। 
- তাই তো। তার বেশি কিছু নয়৷ আর হ্যাঁ, ডালের বড়া খেতে হলে কিন্তু সামনে দাঁড়িয়ে ভাজাতে হবে। 
- প্রয়োজনে ভাজতে বলে না হয় দশ মিনিট অপেক্ষা করব।
- অপেক্ষার প্রসঙ্গে মনে পড়ল, দাসকেবিনের ঠিক সামনে যে দাদা ঠেলা লাগিয়ে ডালের বড়া বিক্রি করে, তার ভাজা বড়াগুলোই মুচমুচে ম্যাক্স। 
- বেশ, তাকেই টাটকা ভাজতে বলে দশ মিনিট অপেক্ষা করব। 
- অপেক্ষা তো করতেই পারি, তবে আমার না দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে ইচ্ছে করে না। কেমন উদাস লাগে। 
- এ যে ভারী সমস্যার ব্যাপার। বড়া ভাজিয়ে দাদার ঠেলার পাশে চেয়ার পাওয়া যাবে কী করে? নিরুপায় হয়ে দেখছি আমাদের দাস কেবিনের বেঞ্চিতে বসেই অপেক্ষা করতে হবে৷ 
- নিরুপায়। হেল্পলেস। অসহায়। আহা রে।
- শুনেছি মিনিমাম মোগলাই বা কাটলেট অর্ডার না করলে নাকি দাস কেবিনের বেঞ্চিতে বসা বারণ? 
- পাষাণ ক্যাপিটালিস্টদের হাতে পড়ে শেষে আমাদের মোগলাই কাটলেট খেতে হবে?
- সত্যিই খুব অসহায় বোধ করছি। 
- নেহাৎ পরিস্থিতির চাপে পড়ে আমাদের এইসব ছাইপাঁশ গিলতে হচ্ছে আজ।
- বুক ফেটে যাচ্ছে। 
- আহা।

Friday, February 21, 2020

মায়ের ভাষা

- বিনোদ, তোর মাথাটা গেছে!

- সে কী...।

- তোর খামখেয়ালিপনা এ'বার পাগলামোর পর্যায় চলে যাচ্ছে। তোর এই অসভ্যতাগুলো আমি সেক্রেটারি হিসেবে সহ্য করতে পারি। কিন্তু বন্ধু হিসেবে তোকে সাবধান করে দেওয়াটা আমার কর্তব্য৷ 

- তুই কি আমার কাছে শুধুই একজন সেক্রেটারি রে বিশে?

- তা নই বলেই মেগাস্টার বিনোদ দত্তর সামনে বুক ঠুকে কথাগুলো বলতে পারছি। কিন্তু বিনোদ, শুনে রাখ। পাবলিক তোর এই পাগলামো বেশি দিন বরদাস্ত করবে না।

- চা খাবি?

- কথা ঘোরাস না। সিংঘানিয়া চটে বোম হয়ে আছে। আর ওকে দোষ দিই বা কী করে বল্! ওর চ্যানেলে এত বড় একটা ইভেন্টের লাইভ টেলিকাস্ট, এদ্দিনের পাবলিসিটি যেটার ফোকাসে ছিলিস তুই৷ সেটা এইভাবে গুবলেট পাকিয়ে দেওয়া; চ্যানেলের মালিক হিসেবে সিংঘানিয়া তোকে স্যু কেন করবে না বলতে পারিস?

- মাতৃভাষার ভালোবাসা; বিনোদ ও বিনোদন। বেশ গালভরা একটা নাম রেখেছিল বটে সিংঘানিয়ার চ্যানেল। কী বলিস বিশে?

- তোর গা চিড়বিড়ানো হাসিটা এ'বার বন্ধ কর। সিংঘানিয়ার প্রডাকশন কোম্পানি ছাড়া ইন্ডাস্ট্রি অন্ধকার। ওঁর টিভি চ্যানেলের লাইভ অনুষ্ঠানে অমন চ্যাংড়ামি করে তুই কত বড় অন্যায় করেছিস জানিস?

- চ্যাংড়ামো? আমি চ্যাংড়ামো করেছি?

- করিসনি? সঞ্চালক একের পর এক প্রশ্ন করে গেল আর তুই বোবা-কালা হয়ে বসে রইলি৷ হাজার প্রশ্নেও টুঁ শব্দটি করলি না। লাইভ শোতে টেলিভিশনের সামনে বসা কয়েক কোটি লোক হাসালি! দু'ঘণ্টার অনুষ্ঠান আধঘন্টার মধ্যে মুলতুবি করতে হল। স্পনসররা ফায়্যার, সিংঘানিয়ার অন্তত সাত কোটি টাকা জলে গেল৷ তোর অফিসে আজ ইটপাটকেল ছোঁড়া হয়েছে৷ আর আগামীকালের কাগজগুলোর হেডলাইনের কথা ভেবেই শিউরে উঠতে হচ্ছে। 

- তুই ওভাররিয়্যাক্ট করছিস বিশে। আমি বরং চা বানাই।

- অসহ্য। জাস্ট অসহ্য।

- অমন অস্থির হচ্ছিস কেন বল তো?

- হব না? তুই স্টার হতে পারিস, আমি তো একজন পাতি সেক্রেটারি।  মিডিয়ার কলগুলো আমার কাছে আসছে, তোর কাছে নয়। কাল সিংঘানিয়ার অফিসে গিয়ে আমাকেই গড়াগড়ি খেতে হবে। নিজের মাথায় ছাতা ধরা লোকগুলোকে এ'ভাবে ঠেলে দিসনা বিনোদ। 

- শান্ত হ। সিংঘানিয়ার কাছে আমি নিজে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে আসব, কেমন?

- এমন পাগলামির কারণটা আমায় বলবি? সঞ্চালকের কোনো প্রশ্নের উত্তর দিলি না কেন?

- কারণটা শুনবি? সত্যিই শুনতে চাস?

- অন্তত আমায় না বলে তোর ছাড় নেই।

- আসলে, স্টুডিওর চেয়ারে বসতেই; হঠাৎ এই অনুষ্ঠানের নামটা মনের মধ্যে কেমন যেন একটা দোলা দিয়ে গেল। মাতৃভাষার ভালোবাসা। তাই হঠাৎ ইচ্ছেটা মাথাচাড়া দিল বুঝলি, ভাবলাম আমার মাতৃভাষাতেই না হয় কথা বলি।

- এই সেই চন্দ্রবিন্দুর চ। ইয়ার্কি হচ্ছে? মাতৃভাষায় কথা বলতে চেয়ে লাইভ টেলিকাস্টে তুই চুপ করে বসে রইলি? 

- জানিস বিশে, স্টুডিওর ওই আলোর ঝলমলে হঠাৎ খুব মায়ের কথা মনে পড়ল৷ আমার মা। মা যে কী ভালো খেত তা কোনোদিনই জানতে পারিনি; শুধু জানতাম মাছের ভালো টুকরোগুলো পরিবারের সকলের পাতে দিয়ে যে কাঁটাল্যাজা পড়ে থাকবে, তা দিয়েই মা ভাত মেখে খাবে। মায়ের পাতে কোনোদিন ভাত কম হত না, বাড়ির সবাইকে খাইয়ে আধমুঠো ভাত পড়ে থাকলে মায়ের খিদেও আধমুঠোয় এসে দাঁড়াত। হাঁড়িতে ভাত না থাকলে মায়ের খিদেও পেত না। দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী ঠাকুরদাকে মা ভক্তি করত, সেই ঠাকুরদা জোর গলায় জানান দিতেন মেয়েমানুষের কণ্ঠস্বর উঁচুতে উঠলে গেরস্তের অকল্যাণ, মায়ের গলা শোনাই যেত না প্রায়।   আমার জন্মের বছর দুই আগে আমার এক দিদি জন্মেছিল। ঠাকুমা খুব চেয়েছিলেন নাতি হবে, নাতনির মুখ দেখে মনের দুঃখে মাকে বলেছিলেন; "পোড়ামুখী, পরের বার যেন চাঁদপানা  খোকার মুখ দেখতে পাই"৷ আমার ধারণা মা সেদিনও চুপটি করেছিল। ঠাকুমার সেই দীর্ঘশ্বাসের বোঝা বয়ে আমার সেই দিদিটি বেশি বেঁচে থাকতে পারেনি৷ জানিস বিশে, আমি জানি না মায়ের প্রিয় রং কী, মা পাহাড় বেশি ভালোবাসে না সমুদ্র!৷ মায়ের নিশ্চুপ পেরিয়ে মায়ের খবর নেওয়াই হয়নি কোনোদিন। তাই স্টুডিওতে বসে গ্লোসাইনে "মাতৃভাষার ভালোবাসা" দেখে মায়ের জন্য যে কী ভীষণ মনকেমন করে উঠল...। তাই সেখানে যতক্ষণ ছিলাম আমি আমার মায়ের ভাষা আঁকড়ে পড়ে রইলাম৷ আমায় মায়ের ভাষা। 

- পৃথিবীতে যতজন বাংলায় কথা বলে,  তার চেয়ে অনেক বেশি মা-মেয়ে বোধ হয় তোর মায়ের ভাষাতেই কথা বলে। 

- হেহ্। 

- চা খাবি রে বিনু?