Saturday, January 4, 2020

পলিটিক্স

- দেশলাই?

- আছে। 

- সিগারেট?

- সোজা সিগারেট চাইলেই হত। 

- খারাপ দেখায়।  

- তাতেই বা কী। ফ্রি সিগারেট তো আর রিফিউজ করবেন না। 

- সিগারেটই চেয়েছি,এক গেলাস দুধ তো নয়। আপনার উপকারই করছি। 

- আপনি পলিটিক্সে আসুন না। 

- ইউ মীন, পার্লামেন্টে আসুন, তাই তো? পলিটিক্সে কে নেই বলুন।

চুপ

- অ্যাই প্রজা! চুপ করে বসে যে বড়?

- আজ্ঞে, দুপুরবেলা কিনা। ভাতটাত খেয়ে একটু জিরোচ্ছিলাম মন্ত্রিমশাই!

- মহারাজ দেশের জন্য দশের জন্য খেটে মরছেন আর তুই সিডিশাস কাজকর্ম করছিস?

- আমি? ও মা! কই,কিছুই করিনি তো! আমি তো চুপটি করে বসে!

- আজ মহারাজের প্রশংসা না করে চুপটি বসে। কাল আড়ালে নিন্দে করবি, পরশু রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করে গলা ফাটাবি। আমি কিছু বুঝি না ভেবেছিস? শালা ট্রেটার!

রাজনৈতিক তর্ক

কলকাতার শীতের মতই রাজনৈতিক তর্কে যুক্তির পরিমাণ আশঙ্কাজনক ভাবে কমে এসেছে। অন্যদের সমালোচনা করে কূলকিনারা পাইনা বটে, তবে কালেভদ্রে নিজের স্বীকারোক্তিটুকু টেবিলের ওপরে সাজিয়ে দেওয়াটা উচিৎ বৈকি। (অবশ্য সমস্ত উচিৎ কাজ করতে চাইলেও সমূহ বিপদ, কিন্তু সে আলোচনা অন্যদিন)।

ফেসবুক থেকে টুইটার; নিজের টাইমলাইন মোটের ওপর যে'ভাবে সাজিয়ে নিয়েছি তা'তে এক জবরদস্ত ইকো-চেম্বার তৈরি হয়েছে। আমি বলি "ওহে শোনো, অমুকচন্দ্র আসলে একটি মূর্তিমান শয়তান"। অমনি চতুর্দিক থেকে ইকো ফিরে আসে 'বঢিয়া বোলিয়াছেন', 'এমন করে সোজা কথা সহজ ভাষায় বলতে পারার জন্য অভিবাদন', 'ঘ্যাম বলেছিস' ইত্যাদি। এ'দিকে আমার 'কাস্টোমাইজড' টাইমলাইনও তখন অমুকচন্দ্রের যাবতীয় শয়তানিগুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণে পরিপূর্ণ; সে'সব পড়ে আমারও বারবার মন হচ্ছে 'বঢিয়া', 'সাবাশ', 'ঘ্যাম' ইত্যাদি। অমুকচন্দ্রের শয়তানি সম্বন্ধে কেউ সামান্যতম সন্দেহ প্রকাশ করলেও মনে মনে সে ভিন্নমতাবলম্বীর টুঁটি টিপে ধরছি।  পলিটিকাল ডিসকোর্সে অবশ্য এমন 'ইকো চেম্বার' ব্যাপারটা আধুনিক ফেনোমেনা নয় বলেই আমার ধারণা, তবে সোশ্যাল মিডিয়া যে ব্যাপারটাকে 'ম্যাগনিফাই' করেছে তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। 

তবে এই ইকো-চেম্বারের পরিসরে বাস করেও, যাবতীয় তর্কবিতর্ক হইহট্টগোলের মধ্যে থেকেও; কয়েকটা ব্যাপারে বোধহয় নিশ্চিন্তে ফোকাস করা যায়; 

১। মতামত (ওপিনিওন) এ'দিক ও'দিক দৌড়ঝাঁপ করতেই পারে কিন্তু 'ঘটনা এবং পরিসংখ্যান'; এই ব্যাপারটা অমোঘ এবং নিশ্চল। সে'খানে 'গ্রে এরিয়া'র সুযোগ নেই। ইকো-চেম্বার থেকে ওপিনিওন গ্রহণ করার প্রসেস নিশ্চয়ই নিন্দনীয় নয়। হারারি সাহেব জোরালো সুরে বলেছেন; 'গসিপ' ও 'দলবাজি' ছিল বলেই আজ হোমোস্যাপিয়েনরা   গোরিলাদের মত জংলি-জীবনে আটকে না থেকে রিট্যুইট-মার্কা আধুনিক হতে পেরেছে। কাজেই ওপিনিওন গ্রহণ ব্যাপারটা অস্বাভাবিক নয় কিন্তু ইকো-চেম্বার থেকে 'অব্জেক্টিভ' খবরের বদলে গোঁজামিল ডেটা জোগাড় করলেই সমূহ বিপদ। এবং সেই বিপদকে তেমন পাত্তা না দিয়ে আমরা রীতিমতো খতরো কি খিলাড়ি হয়ে পড়ছি। আর খতরো কি খিলাড়ি হয়ে আমাদের ইতিহাস-জ্ঞান অত্যন্ত সরেস হয়ে উঠছে। ক্লাবের আড্ডায় কানাইদা বলেছে হরিহর সামন্তর দাদু রবীন্দ্রনাথের মানিব্যাগ চুরি করেছিলেন অতএব গোটা পাড়া জানল সামন্তরা দাড়ি-বিরোধী জোচ্চোরের বংশ। এদিকে সামন্য খোঁজখবর করলেই জানা যেত যে হরিহর সামন্তর দাদুর মৃত্যু ঘটে রবীন্দ্রনাথের জন্মের আগে এবং জোয়ান বয়স থেকে মরার দিন পর্যন্ত পর্যন্ত  লম্বা দাড়িয়ে দুলিয়ে ঘুরে বেরিয়েছেন তিনি। হতে পারে সামন্তরা দিনে সুদখোর ও রাতে সিঁদকাটিয়ে; সত্যিই তাঁরা আদর্শ জোচ্চোর এবং পাড়ার ইকো-চেম্বারের ওপিনিওন নেহাত ফেলনা নয়। কিন্তু সঠিক কারণ না টেনে স্রেফ হরিহরের দাদু দাড়ি-বিরোধী বলে সামন্তদের জোচ্চোর বলাটা বিশ্রী এবং বিষাক্ত। ইকোচেম্বারে ওপিনিওনের ভীড় ঠেলে ডেটা তুলে আনা চাট্টিখানি কথা নয়, তুলে আনায় রগরগে মজাও নেই। কিন্তু মাঝেমধ্যে খেটে তর্ক করলে ব্যাপারটা মন্দ দাঁড়ায় না।

২। আমার ধারণা দলমত নির্বিশেষে সমস্ত রাজনৈতিক নেতা যেটা চান সে'টা হল তাদের সমর্থকদের হোয়াটাবাউটারি এক্সপার্টে পরিণত করা। মোটের ওপর নিশ্চিন্ত হয়ে বলতে পারি এ কথা; পলিটিকাল ফ্যানডমের সেল্ফ-অ্যাকচুয়ালাইজেশন রয়েছে ওই একটি ব্যাপারেই। রাজনৈতিক দলের কর্মীরা নিজেদের হোয়াটাবাউটারিতে সঁপে দেবেন সে'টা স্বাভাবিক। কিন্তু সাধারণ সমর্থক হয়ে সে'টা শুরু করলেই নারায়ণ দেবনাথিও ভাষায় যাকে বলে "চিত্তির"। 

তমুক নেতার সমর্থক - "অমুক নেতা চোর"।
অমুক নেতার সমর্থক - "তমুক নেতা ডাকাত"।

তমুকের ডাকাতির আশ্বাসে অমুকের চুরিজোচ্চুরি পাপের ভার লাঘব হয় যায় না। কিন্তু সমর্থকদের এই লাগামছাড়া গুঁতোগুঁতি গোছের তর্ক বোধ হয় অমুকনেতা এবং তমুকনেতা দু'জনের জন্যই সুবিধেজনক। এ'টুকু হাসিলের জন্যেই তাদের যাবতীয় সভা, মিটিং, মিছিল ও বাতেলা। 

"অমুক চোর কিনা" এ প্রসঙ্গ উত্থাপিত হলে যদি দু'দিকের সমর্থকই শুধু অমুককে নিয়েই আলোচনা করেন; তা'হলে বাস্তবিকই অমুকনেতা ও তমুকনেতা দু'জনেই ফাঁপরে পড়বেন। কারণ হোয়াটাবাউটারি বাদ গেলেই ওপিনিওন ফিকে হয়ে  মজবুত হবে 'অবজেক্টিভ ইনফর্মেশন'। আর সমর্থকরা অব্জেক্টিভ হলে যে নেতাদের দুশ্চিন্তা বাড়বে তা বলাই বাহুল্য। 

উপরোক্ত দু'টো কথা পেরিয়ে এ'বার একটা জরুরী (এবং ব্যক্তিগত)  'ওপিনিওন-বায়াস' প্রসঙ্গে আসি। এই 'বায়াস'গুলো সম্ভবত ফেলনা নয়, নয়ত মতাদর্শগত লড়াইগুলো মরে যাবে। কিন্তু মতাদর্শগুলোকে অযৌক্তিক বিষোদগারের বাইরে টেনে এনে ভ্যালিডেট করা যাবে কী ভাবে? 

প্রথমত, মতাদর্শের পক্ষে দাঁড়ানো মানে সেই মতের পক্ষে 'ফ্যাক্ট'কে দুমড়েমুচড়ে দেওয়া নয় বা ইনফর্মেশন যাচাই না করা নয়। লম্বা দাড়ি ও রবীন্দ্রনাথের পক্ষ নিতে গিয়ে হরিহরের সামন্তর দাদুর ঘাড়ে মিথ্যে দোষ চাপিয়ে দেওয়াটা চাপের; আর তার দোষ লম্বা দাড়ি বা রবীন্দ্রনাথের নয়, দোষ রয়েছে তর্কবাগীশের যুক্তিবোধে।

দ্বিতীয়ত, মতাদর্শ 'কন্সিস্টেন্ট' না হলে নারায়ণ দেবনাথিও ভাষায় যাকে বলে 'আইইকস'। অমুকচন্দ্র নেতার ঘামাচিতে নাইসিল দেব আর তমুকচন্দ্র নেতার ঘামাচিতে বিছুটি; তা'তে সেই হোয়াটাবাউটারি ফিরে আসতে বাধ্য।

তৃতীয়ত, সম্পদ আর ক্ষমতা যার হাতে; তার জবাবদিহির দায় অবশ্যই বেশি। এটা অবশ্যই অকাট্য সত্য নয়, নিতান্তই একটা মতামত (ওপিনিওন')।  কিন্তু ওই; ইতিহাস সম্ভবত এম্পিরিকাল থাপ্পড় কষিয়ে প্রমাণ করে দেয় যে এই জবাবদিহির নিয়মে গোলমাল মোটেই অভিপ্রেত নয়। চোখাচোখা প্রশ্নগুলোর বেশিরভাগই যে সরকার বাহাদুরকে তাক করে ছুঁড়তে হবে (কেন্দ্রীয় সরকার / রাজ্যসরকার; যার জোর যত বেশি, তার দায়ভারও ততটাই) , সে'টাই স্বাভবিক। এর অন্যথা হলেই নারায়ণ দেবনাথিও ভাষায় ব্যাপারটা যাকে বলে "ইররক....গেলুম রে"।

এগরোলিও

এগরোলের আস্বাদনের প্রসেস নিতান্ত সরল নয়; চিবিয়ে খাওয়াটুকু তো সে প্রসেসের আইসবার্গের মুণ্ডু মাত্র। খামচে ধরে ইয়াব্বড় কামড় বসালাম; তেমন মনোভাব নিয়ে হীরক রাজের মূর্তি বানানো চলে, চরণদাসের গান বাঁধা যায়না।

এগরোলের স্বাদ স্পর্শ করতে হলে এগরোল দাদার চাটুর ও'পাশে ভীরু প্রেমিকের মত দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। সদ্য বেলে নেওয়া পরোটা যখন চাটুর তেলে বসবে তখন এক মৃদু আরামদায়ক কাঁপুনি ঝর্ণার জলের মত শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে আসবে। সেই কাঁপুনির সুরকে চিনতে না পারলে এগরোল মিথ্যে।  চাটুর তেলের ওপর সে পরোটা নেচে বেড়াবে আর তার বুকে  থইথই করবে ডিম। সেই পরোটা ভাজার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সে ভীরু প্রেমিক কখন যে অঙ্কভুলের ভয় কাটিয়ে শ্যামল মিত্রের সুর আঁকড়ে ধরবে; তা সে নিজেও টের পাবে না।

সম্বিৎ ফিরবে চাটু থেকে পরোটা নামানোর 'থ্যাপ' শব্দে। আরামদায়ক কাঁপুনি কেটে গিয়ে তখন বুকের মধ্যে মৃদু আনচান; মনে ঘোরাঘুরি করবে ওল্ড মঙ্কের সুবাস আর ময়দানে শীতের বিকেল মেশানো বেপরোয়া স্নেহ। পেঁয়াজকুচি, নুন, লেবু মিলেমিশে পূর্ণ হবে আয়োজন; সুমনের সস্নেহ ফিসফিস মনের ছাতে মাদুর পেতে বলবে "হে আমার আগুন, তুমি এ'বার ওঠো জ্বলে"।

এগরোল আস্বাদনের মূলে তো এই সাধনাটুকুই। চিবিয়ে খাওয়ার ব্যাপারটুকু তো স্রেফ নজরুলের গানের খাতা মলাট দেওয়া; তার বেশি কিছু নয়।

৩১শে ডিসেম্বর


-  এই যে মিস্টার মুকর্জি। 

- আরে আপনি...। 

- অবাক হচ্ছেন? বিদেয় করতে পারলে বাঁচেন? 

- ও মা। না না। বসুন। ইয়ে, চা খাবেন?

- চিনি ছাড়া। 

- শ্যিওর। তবে ফ্লাস্কের কিন্তু। 

- চলবে। 

-  এই যে ।

- থ্যাঙ্ক ইউ মিস্টার মুকর্জি।

- কেমন লাগছে?

- চলে যেতে কেমন লাগছে? 

- রিফ্রেজ করি। এতদিন ছিলেন, কেমন লাগল। 

- ইউ হ্যাভ লেট মি ডাউন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে। 

- সরি। 

- কিন্তু সেগুলোই শেষ কথা নয় মুকর্জি।  ইউ হ্যাভ অলসো সারপ্রাইজড মি অ্যাট টাইমস। ইন আ গুড ওয়ে। 

- তাহলে আপনাকে আগাগোড়া হতাশ করিনি বলছেন?

- আমায় আপনি হতাশ করবেন মিস্টার মুকর্জি? ছাপোষা চাকুরে, ইন্টারেস্ট রেট কমে যাওয়ায় কেঁপে ওঠা মানুষ আমায় হতাশ করবে? যাক গে, আমার কথা বাদ দিন। আমি আজ আছি কাল নেই। ফর আ চেঞ্জ আপনার কথা শুনি। কেমন দেখলেন? আমায়?

- ইউ হ্যাভ লেট মি ডাউন । কিছু কিছু ক্ষেত্রে। 

- হেহ হেহ। 

- তবে আগাগোড়াই হতাশ করেননি। 

- আমার আবার ওই হতাশাগুলো জানার দিকেই বেশি ইন্টারেস্ট। কারণ ওতেই গল্প জমে ভালো। 

- বটে?

- ডেফিনিটলি। কই বলুন, হতাশাগুলোর ব্যাপারে ঝেড়ে কাশুন। 

- কত কিছু পড়া হল না। 

- এসব ইনিয়েবিনিয়ে কথা বলে আর কদ্দিন চালাবেন মিস্টার মুকর্জি। এ'সব পলিটিকাল উত্তর ট্যুইটারে মানায়। ওসব আদত হতাশা নয়। 

- আমার হতাশা আপনি সঠিক বুঝবেন? 

- পাঁয়তারাগুলো বুঝি। যথেষ্ট বই পড়া হল না, জিমে যাওয়া হল না, নতুন ভাষা শেখা হল না, নতুন কোথাও ঘুরে আসা হল না...। ধুর মশাই। ওসব হল ফেসবুকের হতাশা। 

- ইউ ক্যান বি রুড। 

- দ্যাট ইজ মাই জব মিস্টার মুকর্জি। 

- বেশ...ইন দ্যাট কেস...আপনিই বলুন না; আমি আপনাকে ঠিক কী কী ভাবে আপনাকে হতাশ করেছি।  

- কোদালকে কোদাল বললে কোদাল মালিকের গায়ে ফোস্কা পড়ে মুকর্জি। 

- বলেই ফেলুন। কতক্ষণ আর আছেন বলুন। তার আগে আসুন, আর এক কাপ চা। 

- থ্যাঙ্ক ইউ। 

- আমি আপনাক ঠিক কী কী ভাবে হতাশ করেছি?

- আজেবাজে টার্গেট নিয়েই পড়ে রইলেন মুকর্জি। ভালোবাসার কথা প্রাণ খুলে বললেন না, অভিমানগুলো স্পষ্ট ভাবে জানালেন না, ভুলগুলো স্বীকার করার সৎসাহস জড়ো করতে পারলেন না। মাঝেমধ্যেই ভাবেন  নিজের ইগোর মধ্যে নিজেকে বেঁধে রাখবেন না। কিন্তু সেই ভাবনাতেই আটকে থাকলেন। আরও কতগুলো দিন কেটে গেল। ণ্ঠে করেননি। না না, গা বাঁচিয়ে গর্তে লুকিয়েছিলেন তা বলব না। নিজেকে পলিটিকল সান্ত্বনা দিতে কসুর করেননি। কিন্তু ভয়গুলোকে আগলে রেখেছে। আপ্রাণ। ভবিষ্যতের ভয়, সমাজের ভয়, চাকরীর ভয়...। সে'সব ভয়ের ফর্দ করতে বসলে আমার সময় ফুরিয়ে যাবে মিস্টার মুকর্জি। কিন্তু মোদ্দা কথা হল, নিয়মিত হেঁটে সামান্য মেদ ঝরানো বা এসআইপিতে দু'পয়সা রেখে নিজের ভালোমন্দ মেপে পার পাবেন ভেবেছেন? লৌকিকতা, সামাজিকতা আর আখেরের ভয় আপনার থেকে প্রতিবাদের ভাষা কেড়ে নিয়েছে মিস্টার মুকর্জি, এর চেয়ে বড় হতাশা আর কী হবে? সেই হতাশাটুকু তাও না হয় পাশ কাটিয়ে যেতে পারতাম...প্রতিবাদ ইজ নট রামশ্যামযদুমদু'জ কাপ অফ টী। আপনাকে নিয়ে আমার গ্রেটেস্ট ডিস্যাপয়েন্ট কোথায় জানেন মিস্টার মুকর্জি? 

- বলে ফেলুন। রোডরোলারটা চালিয়েই দিন। 

- আজেবাজে টার্গেট নিয়েই পড়ে রইলেন মুকর্জি। ভালোবাসার কথা প্রাণ খুলে বললেন না, অভিমানগুলো স্পষ্ট ভাবে জানালেন না, ভুলগুলো স্বীকার করার সৎসাহস জড়ো করতে পারলেন না। মাঝেমধ্যেই ভাবেন, কিন্তু শেষে ওই নিজের ইগোর মধ্যে নিজেকে বেঁধে রাখেন। নিজের ভাবনাতেই আটকে থাকলেন মুকর্জি। আরও কতগুলো দিন কেটে গেল, নষ্ট হল।  

- বটে। 

- এতশত হতাশা মিস্টার মুকর্জি, অথচ আপনার যত চিন্তা যথেষ্ট বই পড়া হল না বলে। 

- একটা কথা জিজ্ঞেস করব?

- শুট। 

- আপনি বললেন, আমি আগাগোড়া আপনাকে হতাশ করিনি। কিন্তু  আপনার কথা শুনে তো মনে হচ্ছে...। 

- করেননি। আগাগোড়া হতাশ করেননি মিস্টার মুকর্জি। 

- কেন?
 
- ওই। ভয়। যে ভয়ের জন্যে হতাশা, সেই ভয়ের সবটুকুই অন্ধকারের নয় মিস্টার মুকার্জি। নিজের জন্য যেটুকু ভয় পুষে রেখেছেন, আসছে বছরের রিজোলিউশনে সেসবের ভার খানিকটা অন্তত কমানোর চেষ্টা করবেন না হয়। কেমন? কিন্তু মিস্টার মুকর্জি, যে  ভয়টুকু অন্যদের নিয়ে; খোকার দুধেভাতে  থাকা না থাকা নিয়ে দুশ্চিন্তা, ভালোবাসার মানুষের আওড়ানো হা থেকে হাওড়া বুঝে নিতে না পারার আশঙ্কা, ছোটোবেলার স্মৃতি আর দাদুদিদার সুবাস ফিকে হতে না দেওয়ার এলোপাথাড়ি চেষ্টা, বন্ধুদের দূরে যাওয়ার ভয়ে অকারণে কেঁপে ওঠা; এই ভয়গুলো যদ্দিন রয়েছে মিস্টার মুকর্জি, আপনাকে নিয়ে আগাগোড়া হতাশ হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। 

- কোনও মানুষকে নিয়েই আগাগোড়া হতাশ হওয়ার সুযোগ নেই বোধ হয়। যাক গে, আর এক কাপ চা চলবে নাকি?

- ফ্লাস্কের চা দিয়ে আতিথেয়তা আর কদ্দিন মিস্টার মুকর্জি। নতুন বছরে বরং ভালো কোয়ালিটির চা অ্যাপ্রিশিয়েট করতে শিখুন। কেমন?

- এটা কি ওই পলিটিকিকালি গা বাঁচানো রিজোলিউশন নয়?

- অমন দু'একটা না থাকলে কি চলে মিস্টার মুকর্জি? যাক গে, এবার আমায় যেতে হবে। সময় নেই। 

- ওহ হ্যাঁ। আসুন। আর ইয়ে, থ্যাঙ্ক ইউ, মিস্টার টু-থাউজ্যান্ড-নাইনটিন। আপনি যদ্দিন ছিলেন অন্ধকার কম ছিল না, তবে গোটাটাই হতাশায় মোড়া নয়। 

- মিস্টার টুয়েন্টি টুয়েন্টি এলেন বলে, তাঁকে আর ফ্লাস্কের চা না দিয়ে ফ্রেশ দার্জিলিং অফার করবেন। কেমন? চলি। ভালো থাকুন মিস্টার মুকর্জি। 

- গুডবাই মিস্টার টু-থাউজ্যান্ড-নাইনটিন। থ্যাঙ্ক ইউ ফর এভ্রিথিং।