Thursday, November 14, 2019

গোরা



যথেষ্ট গল্পের বই পড়া হচ্ছে না বা পড়ার সময় হচ্ছে না; অনুযোগ আর আফসোস কিছুতেই যাওয়ার নয়। এই ঘ্যানঘ্যানের মধ্যে একটা সিদ্ধান্ত বেশ কঠিন; যে বই আগেই পড়া আছে, সে বইতে আবার ফেরত যাওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত? এর উত্তর আমার কাছে স্পষ্ট; পুরনো বই যা এক সময় ভালো লেগেছে, তা নতুন করে আবিষ্কার করার সুযোগ থাকে বৈকি। সে নিয়ে ধন্দ আমার মনে অন্তত নেই, ভালো লাগা বইতে ফেরত যেতে হবেই। এবার প্রশ্ন হচ্ছে নেটফ্লিক্স আর বেহালার ট্র্যাফিক জ্যামের মধ্যে অনবরত পেষাই হওয়ার ফাঁকে যেটুকু পড়ার সময়; তার মধ্যে কতটুকুরী-রীডেখরচ করা উচিৎ আর কতটুকু সময় নতুন বই খুঁজেপেতে পড়ার কাজে ব্যবহার করা উচিৎ? প্রতিটা নতুন বই ধরার আগে চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খায় বটে। কিন্তু দুহাজার উনিশে যেটুকু যা পড়াশোনা হয়েছে; তাঁর অনেকটা জুড়েই রয়েছে এমন সব বই যা আগে পড়া। ইন ফ্যাক্ট, বছরের শুরুতেই ঠিক করেছিলাম এবারের রী-রীড লিস্টে থাকবে সম্পূর্ণ হ্যারি পটার সিরিজ এবং বাংলা ট্রায়ো; শ্রীকান্ত, অপু (পথের পাঁচালী, অপরাজিত) এবং গোরা। হ্যারি পটার পুরোটা শুনেছি। পথের পাঁচালীও পড়া হল। আশা করি অপরাজিতটাও বছরেই হবে। কিন্তু শ্রীকান্ত মনে হয় পরের বছরই ধরতে হবে।

সদ্য শেষ করলাম গোরা। শ্রীকান্ত পড়েছিলাম মাধ্যমিকের আগে, গোরা পড়েছিলাম উচ্চ্যমাধ্যিকের পরে সম্ভবত। সে সময় গোরার তুলনায় নিশ্চিতভাবেই শ্রীকান্তকে অনেক বেশি মনে ধরেছিল; শুধু চরিত্রটা নয়, কাহিনীর নিরিখেও শ্রীকান্তই ছিল আমার অন্যতম প্রিয় লেখা। শ্রীকান্তর প্রতি পক্ষপাত যেন কোনোদিন না কাটে; এই ইচ্ছেটাও আন্তরিক।গোরা তখন সামান্য বোরিং ঠেকেছিল বটে। এমন কী কিছু কিছু ব্যাপারে আজও সমান খটমট মনের মধ্যে রয়েই গেছে।কিন্তু সে খটমটে অলোকপাত করার আগে আমার কর্তব্য টা জানিয়ে রাখা যে এই যাবতীয় খটমট প্রকাশ করা মানে রবিস্যারকেক্রিটিকালি অ্যানালাইজকরা নয়। সে সাহস হওয়ার আগে যেন আমার ব্লগে বাজ পড়ে। শুধুই আমার মগজে কতটুকু ঢুকেছে আর কতটুকু গোঁত্তা খেয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে; তার হিসেব।

এবার আসি ওই খটকা প্রসঙ্গ। বারো ক্লাসে যাহাইলি সাস্পিশাসঠেকেছিল, তা আজও প্রাণে কেমন ভাবে যেন ঠেকেছে। গোরা আর বিনয় প্রাণের বন্ধু; আল্টিমেট ইয়ারদোস্ত যাকে বলে। অথচ তাদের আড্ডা-আলোচনায় এমন মখমলে সরি/থ্যাঙ্কিউ/এক্সকিউজমি/প্লীজ মার্কা সহবত লেগে যে মনে হয়আগন্তুকে উড়ে এসে জুড়ে বসা মামা নেহাত ভুল বলেননি; রবীন্দ্রনাথ সত্যিই আড্ডাটাড্ডার ধার ধারতেন না (সেটা নিয়ে অমন গর্বেরই বা কী আছে কে জানে) দুই বন্ধু রাত জেগে ছাতে আড্ডা মারছে অথচ সে আড্ডার ভাষা কর্পোরেট শিষ্টতাকেও হার মানায়; কেমন রোয়াকবিরোধী রিভোল্ট রে বাবা। গুরুদেবের প্রেমের ভাষাও যে স্যাট করে বুঝেবাহ গুরু কী দিলেবলে টেবিল চাপড়াতে পেরেছি তা নয়।
কিন্তু গোরা এবার পড়াটা বড় জরুরী ছিল। রাইট, রাইখ, লেফট, রাষ্ট্রবাদ, সনাতন ধর্ম, ভারতবর্ষ নিয়ে আজকাল এত ডিবেট; অথচ সেসব তর্কে অব্জেক্টিভিটি ব্যাপারটা আমরা এত গুলিয়ে দিই যে একে অপরের কলার ধরে টানা ছাড়া বিশেষ কিছুই আর করা হয়না। সে সব আলোচনায় চোখা চোখা কমেন্টেটররাও বড় বড় কথার আড়ালেধ্যার্বালসেন্টিমেন্ট গুঁজে দিয়ে সরে পড়েন।

সেইসব ডিবেটের বিষেগোরাখানিকটা বোরোলিনের উপশম ছুঁইয়ে গেল বৈকি। উপন্যাসে যাবতীয় প্রেম, বন্ধুত্ব সামাজিক দোলাচলের মধ্যে মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ভারতবর্ষ।
দেশকে গ্রহণ করব কী ভাবে
দেশ কে কী বা কারা? গ্রহণ করার প্রয়োজনই বা কী? ভালোটুকুকে যে ভালো বলে সমাদর করতেই হবে তাতে আশ্চর্য কী, কিন্তু দেশের যেটুকু মন্দ; তা এক কোথায় আমি নইবললেই ল্যাঠা চুকে যায় কি?

সমস্ত প্রশ্নের উত্তর রবীন্দ্রনাথ অঙ্কের ভাষায় হয়ত দেননি; কিন্তু কিছু চরিত্র সৃষ্টি করে সেসব নিয়ে চমৎকার আলোচনা করেছেন। এক চরিত্রের মুখ দিয়ে বলা অকাট্য যুক্তিকে অন্য চরিত্রের বিচক্ষণতা দিয়ে অ্যানালাইজ করেছেন। গোটা উপন্যাসটাই হয়ে উঠেছে একটা টানটান তর্ক; সে তর্কে ভাঁওতা নেই, বাতেলা নেই, সিমেন্টের মত নিরেট লজিক সাজিয়ে প্রতিপক্ষকে দুরুমুশ করাটাই সেখানে সব নয়। সবচেয়ে বড় কথা; এখানে রয়েছেএমপ্যাথি প্রেমের বাষ্প আর সম্পর্কের ধোঁয়াশার বাইরে এসে; গোরা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে সেইতর্কে আগন্তুকের মামা প্রাচীন গ্রীসের আখড়ার আড্ডার কথা বলেছিলেন; আড্ডা অফ দ্য হাইয়েস্ট অর্ডার। এই উপন্যাস একদিক থেকে সেই লেভেলের আড্ডার একটা ডেমনস্ট্রেশনই বটে। আর হবে নাই বা কেন; এখানে ন্যাশনালিজম আর হিঁদুয়ানির স্বপক্ষে আর বিপক্ষে যুক্তি সাজিয়েছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। বাঘা বাঘা ইন্টেলেকচুয়ালরা যখন নিজেদের বিশ্বাসকে আন্ডারলাইন করে বাকি সমস্ত কিছুকে নস্যাৎ করে ফেলেন; তখন তাদের দিকে তাকিয়ে উপন্যাসের পাঠক গোরার বিশ্বাস, বিনয়ের ব্যালেন্স এবং পরেশবাবুর স্নেহ-মিশ্রিত আইডিয়ালিজমের কথা মনে করে স্বস্তি খুঁজে নেবে। উপন্যাস প্রসঙ্গে একটা কথা না বললেই নয়; আনন্দময়ী সম্ভবত আমার সর্বকালের প্রিয় চরিত্রগুলোর একটা। তাঁর নিষ্ঠা, তাঁর আধুনিকতা আর তাঁর সাহস; তাঁকেমায়ের মতই ভালোনা বলে উপায় আছে কি? নেহাত সস্তাপানয়ের লোভেই যে রবীন্দ্রনাথ উপন্যাসের নামআনন্দময়ী বদলে গোরা রেখেছেন, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত।

শেষে একটা কথা না বলেই নয়। ব্রাহ্ম সমাজের স্বপক্ষে দুটো কথা যে রবীন্দ্রনাথ বলবেন সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু স্বপক্ষের সেই দুটো কথা বলতে গিয়ে আগে বিভিন্ন ক্রিটিসিজমে ছিন্নভিন্ন করেছেন সে সমাজ এবং তাদের গা বাঁচিয়ে চলার সংস্কৃতি তাদের জ্যাঠামোকে। নিজের পাড়া, নিজের ভাষা, নিজের ধর্ম বা নিজের দেশের সমালোচনা করলেই কাউকেব্যাটাচ্ছেলে গোল্লায় গেছে মার্কামন্তব্যে বিদ্ধ করতে হবে; এমন ব্যাপার শুনলে রবিস্যার ফিক করে হেসে ফেলতেনই। আমি নিশ্চিত।

গানের দুই

গানের ১। 

একটা সাতপুরনো বহুবার শোনা গান। যেটা কানের মধ্যে এর আগে বহুবার ঘোরাঘুরি করলেও মনের দিকে এগোতে পারেনি, বুকে দাগ কাটেনি।
কথা নেই বার্তা নেই, তেমনই একটা বহুবার শুনে পাত্তা না দেওয়া গান নতুন ভাবে সামনে এসে দাঁড়ায়। এমন দাবী নিয়ে সে গান আসে যে তার জন্য তখন জানালার সীট ছেড়ে 'আপনি বসুন না, আমি সামনেই নেমে যাব' মার্কা সারেন্ডার* না করে উপায় থাকেনা।
রাতবিরতে দুম করে সে পুরনো গানটাকে কাছে টেনে নিয়ে ভালোবেসে ফেলতে পারাটা বোধ হয় একটা সুপারপাওয়ার। সে'টুকু আছে বলেই বোধ হয় মানুষ প্রেমে পড়ে, সঞ্জীব পড়ে ভেসে যায়, কাউকে পড়ানো যাবে না এমন চিঠি লেখে।

গানের ২। 

দ্য গ্রাস ইজ গ্রীনার অন দ্য আদার সাইড।
অলসো,
এই রাতবিরেতে,
পাশের বাড়ির রেডিও থেকে ভেসে আসা গানের সুর ইস স্যুইটার দ্যান দ্য সাউন্ড অফ দ্য ফাইনেস্ট মিউজিক সিস্টেমস কেপ্ট অ্যাট হোম।

কবিতা আর ঝোল

- বৃষ্টি কি থামবে না?

- থামলে কী আর হবে দাদা..

- অফিস টাইমে রাস্তাঘাটে হয়রানি একটু কমবে।

- তা বটে।

- আরও একটা বেনিফিট আছে।

- কী'রকম?

- দু'দিন ধরে হোয়্যাটস্যাপে বড্ড কবিতা আসছে হে। সবার মেজাজে রোদ্দুর না পড়লে কবিতার ফ্লো কমবে বলে মনে হচ্ছে না।

- কবিতা তো ভালো জিনিস দাদা।

- পাঁঠার ঝোলও ভালো জিনিস হে। কিন্তু তা'তে সাঁতার কাটা চলে না।

হিরো নম্বর ১


হিরো নম্বর ওয়ান' সিনেমার কোন গান ছেড়ে কোন গানের প্রশংসা করব?সে'গুলোকে কাঠকাঠ র‍্যাঙ্কিংয়ে বসানোও অসম্ভব অনুচিত।

রোম্যান্টিক বাতিক উঠলে 'সাতো জনম তুঝকো পাকে গোরি তেরে নয়নো মে হম বস যাতে' সুরে নিজেকে ডুবিয়ে দিলেই হয়। 'ইউপি-ওয়ালা ঠুমকা'টা সোনুর ম্যাজিক আর পাঁচালি-মার্কা মিঠে তালে জমজমাট। নাচের নাম শুনলে আমার পায়ে কেউ যেন পিরামিড সাইজের পাথর বেঁধে দেয়, কিন্তু সেই আমিও বোধ হয় 'ম্যায় তুঝকো ভগা লায়ুঙ্গা' শুনলে মনে মনে সামান্য নেচে নিই। বিভিন্ন ড্রামাটিক লেভেলে ছড়িয়ে রয়েছে 'ম্যানে পয়দল সে যা রহা থা' কথা; এই গানে বর্ণিত 'ট্রিং ট্রিং কা ইশার' কনসেপ্টের সঙ্গে যার পরিচর নেই, সে কি আদৌ কোনোদিন প্রেমে পড়তে পেরেছে? আর গোবিন্দার ক্যারিস্মা আর করিস্মায় মাত করে দেওয়া 'তু মেরা হিরো নম্বর '; সে গান কানে এলে 'ওয়াহ্' বলা ছাড়া কোনো গতি থাকে না।

একটা জরুরী ব্যাপার; শুধু শুনে এই সব গানের মর্ম আত্মস্থ করা সম্ভব নয়৷ গান শোনার পাশাপাশি গোবিন্দাকে না দেখলে গানগুলোর আত্মাকেই চেনা হবে না যে। আর হ্যাঁ, গানগুলো ম্যাজিক দেখার জন্য সিনেমাটা পুরো দেখা আদৌ তেমন জরুরী নয় (অবশ্য সিনেমাটা না দেখারও কোনো যুক্তিগ্রাহ্য কারণ নেই)

কিন্তু আবারও বলি, শোনার পাশাপাশি গানগুলো দেখাও জরুরী। এই যেমন 'তু মেরা হিরো নম্বর ওয়ান' গানখানা। গানের প্রায় গোটাটা জুড়ে করীশ্মা কপুর গোবিন্দার মানভঞ্জনের চেষ্টায় মগ্ন। কিন্তু গোবিন্দা সহজে ভোলার পাত্র নন। এই গানের শেষ প্রান্তে এসে গোবিন্দা গললেন এবং নিজের গলে যাওয়া ব্যাক্ত করতে যে অনাবিল নাচ তিনি নাচলেন; তা'তে জীবনানন্দ আছেন কিনা জানা নেই, কিন্তু ট্রামের জানালায় বসে অঞ্জনবাবুর সুর গুনগুন করার ভালোবাসাটুকু নিশ্চয়ই আছে।