Tuesday, July 2, 2019

কফিহাউসের সেই আড্ডাটা


"তা ব্যাপার কী হে রমাপদ, আজকেও কি স্পেশ্যাল অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল নাকি"?

ইঙ্গিতটা রমাপদর সুপরিচিত আর এ বিষয়ে সে রীতিমত লাজুকলতা৷ এমনিতে আড্ডার ব্যাপারে সে বেশ তৎপর, অন্য সকলের আগেই সে পৌঁছে গিয়ে একটা ব্ল্যাককফি আর অমলেট নিয়ে বসে পড়ে। কিন্তু যেদিন সে অর্পিতার সঙ্গে অফিসের বাইরে দেখা করতে যায়; সে'দিন দেরী হবেই। আর ভজহরিদা বোধহয় রমাপদর লাজুক হাসিটা বেশ উপভোগ করেন, তাই তাঁর এহেন প্রশ্ন।

ডিসুজার সামনের প্লেটে তখনও একটুকরো স্যান্ডুইচ পড়ে আছে দেখে তার পাশ ঘেঁষেই বসল রমাপদ, বড্ড খিদে পেয়েছে। ডিসুজা হেসে প্লেটটা তার দিকে সামান্য ঠেলে দিল।

" হ্যাঁ রে রমা, এ'বছর তোর একটা প্রমোশনও তো হল, তা এ'বার অন্তত বিয়ের কথাটা কি পাড়তে পেরেছিস না এখনও সেই অফিস থিয়েটার রিহার্সালের প্রেমালাপেই আটকে রয়েছিস..", সুজাতার যাবতীয় আগ্রহের কেন্দ্রে থাকে 'কবে বিয়ে করছিস' গোছের প্রশ্ন। ব্যাপারটা খানিকটা বিরক্তিকর। স্যান্ডুইচ চিবুতে চিবুতেই রমাপদ বলেই ফেলল "একটা পেল্লায় বাড়ি আর মস্ত চাকরীওলা পাত্র জোগাড় করে নিজেকে সঁপে দিয়েছিস; ভালো কথা। কিন্তু তা বলে কি জগতসংসারের সব্বাইকে ছাদনাতলায় গিয়ে জড়ো হতে হবে? অর্পিতা চাকরীতে আরো থিতু হতে চায়..আরোকিছুটা সময় দরকার ওর, আর আমারও কোনো তাড়া নেই"।

"বোগাস, তোদের যত সিউডো-সোশ্যালিস্ট প্রপাগান্ডা"! টেবিলের অন্য প্রান্ত থেকে অমলের আচমকা চড়ানো কণ্ঠস্বর গমগমিয়ে উঠলো। অমলের টেবিল চাপড়ানিগুলো না শুনলে কফিহাউসটাকে বড্ড শুনশান লাগে রমাপদর। আর তার এড়ে তর্কগুলোয় যথাযথ সঙ্গ দেয় নিখিলেশ। অমলের ঠোঁটে সর্বক্ষণ ঝুলে থাকা চারমিনার আর নিখিলেশের দিকে তাক করা ধারালো শ্লেষ। দু'জনেই বামপন্থী অথচ দু'জনেরই ধারনা অন্যের ইডিওলজিটুকু স্রেফ দেখনাই আর সেই নিয়েই দু'জনের যত গুঁতোগুঁতি। প্রত্যেকদিন আড্ডার মাঝে ওরা যে একে অপরের কলার ধরে ঝুলে পড়ে না; সে'টাই আশ্চর্যজনক। স্কুলমাস্টার আর শখের কবি অমলকে স্রেফ 'আ কগ ইন দ্য স্টেট মেশিনারি' বলে উড়িয়ে দেয় নিখিলেশ। আর অন্যদিকে একটা পেল্লায় বিজ্ঞাপন সংস্থার ক্রিয়েটিভ টীমে কাজ করা নিখিলেশের বামপন্থাটুকুকে স্রেফ ধান্দাবাজের মুখোশ ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারত না অমল।

" এই সান্যাল একটা সুযোগ পেলেই এই শহর আর দেশকে লাথি মেরে বিদেশে কেটে পড়বে এক্সট্রা টু পাইসের জন্য। আমার কথাটা মিলিয়ে নিস রমা"! বেশি উত্তেজিত হলে নিখিলেশের পদবী ধরে আক্রমণ করত অমল। আর অমলের রেগে যাওয়াটা বাকি সকলে দিব্যি উপভোগ করত, নিখিলেশও হয়ত সে কারণেই অমলকে বাড়তি কাঠি করত। অবশ্য যাবতীয় ঝগড়াঝাটি সত্ত্বেও, অমলকে চারমিনার ধার দেওয়ার বেলায় কোনোরকম কিপটেমো করত না নিখিলেশ।

"বটে? নেহরুভিয়ান সোশ্যালিজমের কথা বললেই সে'টা প্রপাগান্ডা? হ্যাঁ রে মইদুল! তুই তো রিপোর্টার, দেশের হালহকিকত সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল। তোর কী মনে হয়"? আলতো করে মইদুলের দিকে বলটা ঠেলে দিল নিখিলেশ।

" আবার আমায় নিয়ে টানাটানি কেন", কাগজ থেকে মুখ তুলতে হল মইদুলকে, "আমি জার্নালিস্ট। ফ্যাক্ট সাজিয়ে দেওয়াটা আমার কাজ। ওপিনিওন ফর্ম করবে পাঠক। আমি তো আর পলিটিকাল কমেন্টেটর নই। তোমাদের মত স্যাটিরিস্টও নই"।

" তোমাদের ঝগড়ায় ফোকাস করতেই হবে দেখছি, তবে তার আগে আর একটা কবিরাজি অর্ডার করি। টেবিলে দেখছি স্রেফ স্যান্ডুইচের প্লেট আর কফির কাপ...কেমন ম্যাড়মেড়ে লাগছে"।

রমাপদও একটা কাটলেট অর্ডার করল। ভোর চারটেয় শুরু হওয়া আড্ডা অন্তত সকাল সাড়ে সাতটা পর্যন্ত চলবে। অবশ্য একসময় রমাপদরা সন্ধ্যেবেলাতেই আসত, তখনই আড্ডা বসত; জানালার বাইরে তখন আলো ঝলমলে সরগরম কলেজ স্ট্রীট। কিন্তু সে সব বহুযুগ আগের কথা। মারা যাওয়ার পর থেকে অন্যান্য ভূতেদের মত এই সময়টা ছাড়া আর কফিহাউসে জমায়েত হওয়ার উপায় থাকে না। বেলা বাড়লেই সাফসাফাইয়ের জন্য মানুষদের আনাগোনা শুরু হয়।

রমাপদ নিজে অবশ্য অমল-নিখিলেশের তর্কের ক্রস-ফায়্যারটুকু এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করে। তার আগ্রহ বরং ভজহরিদার গল্পে। ভজহরিদাই তাঁদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ। রেলের চাকুরে এবং এই সাতজনের দলে একমাত্র তিনিই উত্তর কলকাতার আদিবাসিন্দা। তাঁর ছেলেবেলার গল্পগুলো যেমন আজগুবি, তেমনই মজাদার। ভদ্রলোক গুলবাজিতে যে অদ্বিতীয় তা অনস্বীকার্য কিন্তু মনটা বড় ভালো। গল্প বলাতেও সবিশেষ এলেম আছে ভজহরিদার। বিশেষত তার ছোটবেলার তিন স্যাঙাত; প্যালা, হাবুল ও ক্যাবলাদের গ্যাংলীডার হিসেবে তিনি যে'সব অ্যাডভেঞ্চারের মুখোমুখি হয়েছিলেন সে'গুলো শুনলেও গায়ে কাঁটা দেয়। তবে গল্পগুলো এমনই গ্যাসবেলুন লেভেলের যে তাঁর স্যাঙাৎরা বর্তমানে কে কোথায় আছে বা আদৌ আছে কিনা তা জিজ্ঞেস করতেও সাহস হয়না।

বেঁচে থাকতে ভজহরিদা নাকি এই কফিহাউসের সাতজনকে নিয়ে একটা জবরদস্ত ছড়াও লিখেছিলেন এবং পরে তা'তে সুরও জুড়েছিলেন। কিন্তু কিছুতেই সে ছড়া বা সুর মনে করতে পারেননা তিনি। রমাপদর স্থির বিশ্বাস যে ভজহরিদার বাকি গল্পগুলোর মত এই কফিহাউসের গান লেখার গল্পটাও গাঁজাখুরি।

আমাদের মওকা


মওকা মওকার লেবুটা শিলনোড়ায় বেটে সুপার-ছিবড়ে করে ফেলা গেছে। বর্ডারের দু'দিকেই ম্যাচ নিয়ে যে সব ভিডিও ও বিজ্ঞাপন তৈরি হচ্ছে তা'তে হিউমর ও রুচি দু'টোরই ঘামাচি-আক্রমণে মৃত্যু হওয়া উচিৎ।

এই "আমি তোর বাপ" স্তরের কথায় নাকি দুর্দান্ত চালাকি রয়েছে। পাকিস্তান যদি বাংলাদেশের বাবা হওয়ার দাবী করে, তা'হলে কানে কী বিশ্রীই না ঠেকবে, তাই না? আর ভারতবর্ষ আরও প্রাচীন বলে অহংকার? আরো সুগভীর তার চরিত্র ও ইতিহাস? গর্ব তো ভালোই, কিন্তু সে'টা এ'ভাবে ফাটা মাইক বাজিয়ে অন্যের গায়ে 'আমি তোর বাপ' মার্কা জলবেলুন ছুঁড়ে না বললে প্রকাশ করা যায়না? হরপ্পা মহেঞ্জোদারোর মালিকানা ফলিয়ে পাকিস্তানও দাদাগিরি (থুড়ি...বাবাগিরি) ফলাবে বোধ হয় এ'বার। ওরা অভিনন্দনের চায়ের কাপ তুলে কথা বলেছে তাই আমরাও অভিনন্দনের দাড়িগোঁফ ওদের মুখে চাপিয়ে প্রতিশোধ নিয়েছি; এতে কি অভিনন্দনের প্রতি বেশ জমকালো কুর্নিশ জানানো হল আদৌ? ক্লাস ওয়ানের ঝগড়াতেও এর চেয়ে বেশি গভীরে গিয়ে কথা চালাচালি হয়।

'বিশ্বকাপ হারলে হারুক, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জিতলেই হল'; এ'তে হিউমর নেই, দেশের প্রতি ভক্তি নেই আর নেই ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা। পাকিস্তান ম্যাচ এলেই আমাদের পেঁদিয়ে-হাতের-সুখ-করা-মব্ মানসিকতা টুক করে বেরিয়ে আসে (আমি নিশ্চিত পাকিস্তানেও ব্যাপারটা অন্যরকম নয়)।একদিকে আমাদের দেশের ক্যাপ্টেন গ্যালারির দিকে তাকিয়ে আবেদন করছেন যাতে ভারতীয় দর্শকরা স্টিভ স্মিথকে গালিগালাজ বন্ধ করে অভিবাদন জানায়। আর অন্যদিকে আমরা বড়মুখ করে বলছি 'আমরা পাকিস্তানের বাপ, তাই আমরাই জিতব'!

এ'সব ছেলেমানুষি এবং সোশ্যালমিডিয়া মাস্তানি বন্ধ করে পাকিস্তান ক্রিকেট ও ক্রিকেটারদের ব্যাপারে মনে সমীহ আনলে খেলাটা আরো উপভোগ্য হবে; এ সহজ ব্যাপারটা কবে যে আমি ও আমরা ঠাহর করতে পারব। বাবর আজমের একটা ভালো শটকে 'তোফা' বলা মানে পাকিস্তানের যাবতীয় অন্ধকারকে সমর্থন জানানো নয়; এই সরল সিধে সত্যটা স্বীকার করে নিতে যে আমাদের কী আপত্তি!

পুনশ্চঃ
নিজের দেশের/নিজেদের দোষ বেশি করে দেখব; বেশ করব। কারণ নিজের দেশের ভালো-মন্দ, শিষ্টাচার, পাগলামোতে আমার যোগাযোগটা সোজাসাপটা। স্টার স্পোর্টসের মত নামীদামী ব্রডকাস্টারকেও যখন এমন সস্তা বিজ্ঞাপন বানাতে হয়, তখন সে বিজ্ঞাপনের 'মার্কেট' সম্বন্ধে চিন্তিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে বইকি।

ফির নহি আতে


कुछ लोग एक रोज़ जो बिछड़ जाते हैं
वो हजारों के आने से मिलते नहीं
उम्र भर चाहे कोई पुकारा करे उनका नाम
वो फिर नहीं आते, वो फिर नहीं आते..


সে'সব "ফির নহি আতে"র ফর্দে কত ঝাপসা মুখ যে রয়েছে। এই যেমন;

১। এক মাছওলাকাকু ক্রিকেট নিয়ে গল্প জুড়তে পারলে খদ্দের ভুলে যেতেন। আজহারউদ্দিনের ফিল্ড প্লেসমেন্টের ভুলগুলো অনায়াসে বলে দিতে পারতেন। প্রবীণ আমরের ডিফেন্সের খামতিগুলোও তাঁর চোখ এড়াত না। আর ক্রিকেট নিয়ে জরুরী আলোচনার সময় কেউ বেমক্কা 'মাগুর কত করে গো' জিজ্ঞেস করলেই রেগে টং হয়ে যেতেন।

২। স্কুলছুটির পর স্কুলগেটের কাছেই একটা গাছের ছায়ার দেখা যেত ফুচকাকাকু। একসঙ্গে সাত-আটজনকে সাত-আট রকমের ঝাল-টক-নুন রেশিওতে খাইয়ে যেতেন। আর যে আলুকাবলি মাখতেন তা' খেলে আয়ুবৃদ্ধি অবশ্যম্ভাবী। তবে তার বিশেষত্ব ছিল ফুচকাপযোগী কিশোরের গানে। "মেরে মেহেবুব কয়ামত হোগি"র সুরে এগিয়ে দেওয়া ফুচকার টইটম্বুর বুক থেকে জল চলকে ওঠা...আহা।

৩। কাগজদাদাভাই গল্প করতেন শুকতারা, আনন্দমেলা নিয়ে। ভোরে কাগজ দিয়েই গায়েব হতেন বটে কিন্তু ছুটির দিন দুপুরবেলা ঠিক একবার ঢুঁ মেরে যেতেন। বাতাসা-জল হোক বা মুড়কি-সরবত; ঠাকুমা কিছু না কিছু দিতেনই। সেই বাতাসা বা মুড়কি চিবুতে চিবুতে কাগজদাদাভাই একের পর এক গল্প ও উপন্যাসের ট্রেলার শুনিয়ে যেতেন।

এমন আরও কতজন বিছড়েটিছড়ে গেছেন। হাজার মানুষের ভীড়েও তাঁদের গলার স্বর বা গল্প বলার ভঙ্গিমাগুলো মনের মধ্যে উঁকি মারে। কিন্তু উঁকি মেরে কোন কাঁচকলাটা হবে? কবি তো নিদান দিয়ে রেখেছেন; যে একবার ফসকেছে, উম্রভর তার নাম পুকারলেও সে আর ফিরবেটিরবে না।

তুক ক্রিকেট


আমার ধারণা কুসংস্কার না থাকলে বোধ হয় স্পোর্টস-ফ্যান হওয়াতে সাংবিধানিক বাধা আছে। বিশেষত ক্রিকেটে; যে'খানে প্রতিটি বলের মধ্যে বেশ কিছু সেকেন্ডের বিরতি থাকে; সেই মুহূর্তগুলোয় সোফা-কুশন-চেবানো মামুলি ফ্যানেরা টিভির দিকে তাকিয়ে ছটফট করা ছাড়া তেমন কিছুই করে উঠতে পারেনা। ফুটবলের ক্ষেত্রে গোটা ব্যাপারটা স্যাট করে শুরু হয়ে ফ্যাট করে শেষ হয়ে যায়; ম্যাচ চলাকালীন ব্রেনকে সোজাসুজি অ্যাড্রেনালিনের হাতে ছেড়ে দেওয়া ছাড়া কোনও উপায় থাকে না। কিন্তু ক্রিকেট সে তুলনায় রীতিমত বিষাক্ত। ওই ব্যাটসম্যান হেলমেট খুলে ড্রেসিংরুমের দিকে কিছু ইশারা করলেন, এই বোলার মিড অফে ক্যাপ্টেনের দিকে তাকিয়ে সামান্য থমকালেন; এমন হাজারো অ-স্কোরবোর্ডিও সিচুয়েশন আর নখ খাওয়ার সুযোগে ভরপুর এই ভল্ডেমর্টিও খেলাটা।

আমার এক পাড়াতুতো কাকু কমিউনিস্ট; মানে পরশুরামের কুঠারকে টুথপিক হিসেবে ব্যবহার করা কমিউনিস্ট। ভদ্রলোক ভোগের খিচুড়িতে দু'ফোঁটা ভডকা ছিটিয়ে শুদ্ধ না করে মুখে তুলতে পারতেন না। তিনিও দেখেছি ম্যাচ খুব খটমট জায়গায় পৌঁছলে চটপট মানত করে ফেলতেন। বহুদিন আগে, সেই কাকুর পাশে বসে ভারত পাকিস্তান ফাইনাল দেখছিলাম। ডান পায়ে ঝিঁঝিঁ ধরে যাওয়ায় ঘণ্টাখানেক পর বসার পোজিশনে ইঞ্চিখানেক অ্যাডজাস্টমেন্ট করেছিলাম আর তখনই সৌরভ আউট। কাকুর সে কী হাহাকার; "কুলীন বংশের ছেলে আমি; সময়মত পৈতে হলে এখন তোকে স্রেফ অভিশাপে অভিশাপে শেষ করে দিতাম! পা নড়ানোর আর সময় পেলিনা? এ'বার ম্যাচ হারলে দায়টা কে নেবে?"।

জটিল সিচুয়েশনে কারণে অকারণে বাথরুম ছোটার ব্যাপারটা খুবই খতরনাক। বাথরুমে গেলেই মনে হয় ম্যাচ ভাসিয়ে চলে গেলাম; মাঠের খেলোয়াড়রা তো শুধু দ্যাখনাই, ভাগ্যের আসল কন্ট্রোলপ্যানেল তো আমার ব্ল্যাডারে। আবার এও হয়েছে বিপক্ষের খুনে ব্যাটসম্যানদের দাপটে যেই হাল ছেড়ে বাথরুম গেছি, অমনি উইকেট পড়েছে; এ'বার সামলাও ঠেলা। মাঠের ক্যাপ্টেন আর প্যাভিলিয়নে বসা ম্যানেজারের চেয়েও আমার চাপ বেশি; কারণ লিটার লিটার জল খেয়ে বিপক্ষের পার্টনারশিপ ভাঙার গুরু-দায়িত্ব যে আমার কাঁধে।

এই হাড়-জ্বালানো কুসংস্কারগুলোর বিভিন্ন স্তরে খেলা করে।

প্রথমত, ম্যাচের আগে। যত বড় ম্যাচ, তত দুর্বল মন। পয়া জামা, পয়া বসার পোজিশন, পয়া রিমোট ধরার কায়দা, পয়া মায়ের চিৎকার, পয়া ছড়া যা ম্যাচের আগে জাতীয় সঙ্গীতের মত আওড়ালে ভালো ফল পাওয়া যায়; এমন লম্বা ফর্দ ধরে ব্যূহরচনা করতে হয়।

দ্বিতীয়ত, প্রিয় ব্যাটসম্যান ভালো খেললে। বসার জায়গা থেকে না নড়া, অতিরিক্ত কথা না বলা (যে'টুকু বলা সে'টুকু প্যাটার্নে, যেমন প্রতি ওভারে তিন আর চার নম্বর বলের মধ্যে কথা বলা যাবে, নচেৎ স্পিকটি নট), কলিং বেল/টেলিফোনে সাড়া না দেওয়া, অন্যদের নড়তে না দেওয়া ইত্যাদি।

তৃতীয়ত, বিপক্ষ ব্যাটসম্যান বেধড়ক পেটাচ্ছে বা নিজদের উইকেট পর পর পড়ে চলেছে। ম্যাচ নিয়ে টানাটানি, রীতিমত ক্রাইসিস। ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের পদ্ধতিতে আবার আগ্রাসী না হলে চলবে না। উপায়? চ্যানেল বদলানো; ছেলেবেলায় আমার ভাগ্য ফেরানোর চ্যানেল ছিল জি বা আলফা বাংলা। 'এক আকাশের নীচে' সিরিয়ালটার ভক্ত হয়ে পড়েছিলাম স্রেফ নিজেদের একটা পার্টনারশিপ তৈরির চেষ্টায় বা বিপক্ষের পার্টনারশিপ ভাঙার লোভে। তা'তেও কাজ না হলে নেক্সট লেভেল হল খানিকক্ষণের জন্য টিভি বন্ধ রাখা। তা'তেও ভাগ্যের চাকা না ঘুরলে বাইরে গিয়ে একটু হাঁটাহাঁটি করে আসতে হবে, শাস্ত্রে বোধ হয় তাই বলেছে। ২০১১র বিশ্বকাপ ফাইনালে শচীন শেওয়াগ আউট হওয়ার পর আমায় ছাতে গিয়ে পায়চারী করতে হয়েছিল যাতে কোহলি আর গম্ভীর একটু নিজেদের মত করে দাঁড়াতে পারে।

চতুর্থ, ১৩ রান (১৩ নাকি অপয়া এ'দিকে কেউ বেড়াল দেখে থমকে দাঁড়ালে তাকে নিউটন তুলে গালাগাল দিয়ে থাকি) বা ১১১র নেলসন/ডাবল নেলসন/ট্রিপল নেলসন গোছের শেফার্ডসাহেব-সার্টিফাইড ক্রিকেট-অপয়া সংখ্যা বা সতেরো, তিয়াত্তর বা একশো সাত গোছের কিছু সংখ্যা (কোনও কারণ নেই, এগুলো স্রেফ নিজের অপছন্দের নম্বর)স্কোরবোর্ডে দেখলেই সজাগ হয়ে উঠতে হয়। এই সব দুঃসময়ে বিপদ কাটাতে দুর্বল কলজে খুব ন্যক্কারজনক কিছু শর্টকাট অবলম্বন করে থাকে। এই যেমন গায়ত্রী মন্ত্রের রিদমে হাট্টিমাটিম বিড়বিড় করা বা "কত না ভাগ্যে আমার, এ জীবন ধন্য হল, সিঁথির এই একটু সিঁদুরে সবকিছু বদলে গেল..." গোছের টোটকা গান গাওয়া; খুব কাজে লাগে, যাকে বলে সুপার-এফেক্টিভ।

তবে এ'সবই নিজের নোটবুকের হিসেবকিতেব, আমি নিশ্চিত প্রত্যেকের নিজস্ব ক্রিকেট দেখার মানসিক-মাদুলির ফর্দ রয়েছে। আজকের ম্যাচে রোহিতের সেঞ্চুরি পর্যন্ত বড় বেকায়দা পোজিশনে শুয়ে থাকতে হল, এমন কী সেঞ্চুরির পরেও নড়তে সাহস হয়নি। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ বলে কথা। নেহাত ঘাড়ের কাছের চুলকানিটা চেরনোবিলের আকার ধারণ করায় সামান্য নড়েছিলাম আর ভুডু-অঙ্কের নিখুঁত প্রভাবে রোহিত অমনি লোপ্পা ক্যাচ তুলে দিয়েছিল। স্যাড়াক্‌ করে অরিজিনাল পোজিশনে ফেরত আসতে হয়েছে যাতে ডেভিড মিলার রোহিতের তোলা ক্যাচটা বিনা গোলমালে ফেলতে পারেন। মোটের ওপর এই ম্যাচটা বিরাটদের ভালোয় ভালোয় উতরে দিয়েছি কিন্তু আগামী দু'দিন আমার মাথা আর ঘাড়ের ডান দিকে বত্রিশখানা ছুঁচ ফোটালেও টের পাব না।

জয় হিন্দ।

খাওয়াদাওয়া আর খাবারদাবার

নামীদামী রেস্তোরাঁয় ঢোকার মোহ আর ইহ জনমে কাটবে না। কষানো মাংস, খুশবুদার বিরিয়ানি, রগরগে কালিয়া বা তেলে টইটম্বুর ভাজাভুজির টান আলাদা; যত যাই বলি, সে' টান উপেক্ষা করার শক্তি আয়ত্ত করার ইচ্ছেও তেমন নেই। কিন্তু তবু, কিছু কিছু অতি সরল-সিধে "খেতে বসার" স্মৃতি মনের মধ্যে জেঁকে বসে থাকে চিরকালের জন্য। অফিসের দৌড়ঝাঁপে বা গেরস্থালীর ব্যস্ততার মধ্যে মাঝেমধ্যে সে'সব তৃপ্তির খাওয়াদাওয়ার কথা মনে পড়ে। বলে রাখা উচিৎ, মাঝেমধ্যে খাওয়াদাওয়ার কথা ভাবতে আমার ভালো লাগে। খাবারদাবারের নয়, খাওয়াদাওয়ার কথা ।

এই যেমন টিউশনি ফেরতা ছাতা মাথায় দাঁড়িয়ে আছি চপের দোকানের সামনে, বৃষ্টির ছাঁটে জামার বাঁ'দিকে হাতাটা ভিজে জ্যাবজ্যাব করছে। পিঠের ব্যাগ উলটো করে বুকের দিকে ঝোলানো যাতে ভিজে না যায়। ছাতা বেয়ে জল ঝরেই চলেছে, আর ঝরছে দোকানের ছাউনি বেয়ে; তাদের গতি ও নামার ধরন অবশ্যই বৃষ্টির মোমেন্টামের চেয়ে আলাদা। সেই ছাত আর ছাতা বেয়ে ঝরে পড়া জলের রিদমের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ফুটছে কড়াইয়ের তেল। দোকানের চপ-মাস্টার একের পর এক আলুর চপ ছাড়ছে কড়াইতে; কড়াই ভর্তি তেলে চপগুলো ডগমগ হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। সেই চপে কামড় দেওয়ার মুহূর্তটা মনে নেই; কিন্তু সেই ছাতা মাথায় কড়াইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকাটা মনে আছে। জলের ছাঁট, ছাত বেয়ে জল ঝরার শব্দ, সর্ষের তেল আর বেসনের গন্ধ; চোখ বুঝলেই এখনও এগুলো ঝলমল করে উঠবে।

কিন্তু কথা হচ্ছিল সরলসিধে খাওয়াদাওয়ার। আলুর চপ আর যাই হোক সরলসিধে নয়, ছুঁচ হয়ে ঢুকে বোফর্স হয়ে বেরোনোর ক্ষমতা রয়েছে তাদের। এই যেমন - অফিসে বিস্তর হুড়মুড়; ইয়ে লাও, উয়ো সামলাও, দিস কেলো, দ্যাট ক্যালামিটি; ইত্যাদিতে মন এক্কেবারে বনেট গরম সেকেলে গাড়ি। লং ডিস্ট্যান্স ড্রাইভিংয়ের ক্ষেত্রে আমার সুপরিচিত এক ড্রাইভারদাদা ধর্মেন্দ্র প্রতি ঘণ্টাখানেক অন্তর গাড়ি থামিয়ে বলতেন "মাইন্ড কো থোড়া রিফ্রেশ কর লেতে হে"; মিনিট খানেক দাঁড়াতেন, গুটখা আর জর্দা মিশিয়ে কিছু একটা খেতেন আর তারপর ফের ফুরফুরে মেজাজে ইগনিশন অন করতেন। প্রবল হুড়মুড়ে পড়ে আমারও মাঝেমধ্যে ওই "মাইন্ড কো থোড়া রিফ্রেশ কর লেতে হ্যায়" মার্কা বাই জাগে। আর আমার জর্দা-গুটখা বলতে ওই সাতপুরনো খাওয়াদাওয়ার স্মৃতি। 

আজ যেমন মনে পড়ল কটিহার থেকে কিষণগঞ্জ যাওয়ার পথে এক দোকানের বেঞ্চিতে বসে ভাত, ডাল, আলুভাজা, পটলের তরকারি আর ডিমের ওমলেট খাওয়ার সুখস্মৃতি। হাইওয়ের ধারের ধাবা মানেই রুটি-মাংস-তড়কা গোছের খাবারদাবারের কথা মনে পড়ে। কিন্তু এই খাবারের দোকানের বৃদ্ধ মালিক একজন বাঙালি (নামটা বেমালুম ভুলে গেছি, ভোলা উচিৎ হয়নি)। রুটি তড়কা পাওয়া যাবে কিনা জিজ্ঞেস করায় সোজা জানালেন;

- বাঙালি তো, নাকি?
- হ্যাঁ।
- এই ভরদুপুরে খসখসে রুটি খামোখা খেতে যাবেন কেন? ভাত শেষ হয়ে গেছে বটে, কিন্তু এখুনি চাপিয়ে দিতে বলছি।
- হ্যাঁ মানে তা'তো বুঝলাম কিন্তু একটু তাড়া ছিল যে...।
- লংরানে বেরিয়েছেন তো। তাড়া কীসের? দুপুরের খাবারটা একটু ঠাণ্ডা মাথায় না সারলেই মুশকিল। শুনুন, পটলের তরকারি আছে, দোকানের নয়। নিজের জন্য বানিয়েছিলাম। বৌয়ের রেসিপি। আলু পটল নয় কিন্তু, শুধু পটলের তরকারি; গা-মাখা করে। মিনিমাম মশলা, কিন্তু জিভে ধরবেই। চেখে দেখুন না একবার।
- ও মা, আপনি অত ব্যস্ত হবেন না...আমি না হয়...।
- ব্যস্ত কীসের? রেসিপি বৌয়ের কিন্তু পরিমাণ বোধ তো আমার। একার জন্য যা রাঁধি তা দিয়ে দোকানের তিনজন ছেলের খাওয়াদাওয়া হয়ে যায়। ডাল আছেই। আমি বরং আপনার জন্য আলুভাজা আর ওমলেট বানাতে বলে দিই। ওমলেটে লঙ্কা চলবে?
ভদ্রলোক এমন অবলীলায় পরিস্থিতিটা সম্পূর্ণ নিজের কন্ট্রোলে এনে ফেললেন যে আমার কিছু করার ছিল না। ভদ্রলোক উত্তরবঙ্গের এক গাঁয়ের মানুষ, তার স্ত্রীও সে'খানেই থাকেন। প্রতি মাসে এক-দু'দিনের জন্য গ্রামে ফেরেন। আধ ঘণ্টার মধ্যে স্টিলের থালায় চেপে এলো ধোঁয়া ওঠা ভাত, সঙ্গে গরম ডাল, পটলের তরকারি, নরম খোসা-না-ছাড়ানো আলুভাজা। ডবল ডিমের ওমলেটটটা শালপাতার দোনায় করে থালার এক পাশে রাখা ছিল।

খাওয়ার সময় ভদ্রলোক সামনে বসেছিলেন আগাগোড়া। দোকানের ছেলেটা যতক্ষণ লেবু এনে দেয়নি ততক্ষণ আমায় ভাত মাখতে দেননি; "খেতে বসে তাড়াহুড়োটা আমার মোটে বরদাস্ত হয় না, দাঁড়াও। আগে লেবু লঙ্কা আনুক, তারপর ভাত মাখবে"। আপনি থেকে সহজেই তুমিতে নেমে এসেছিলেন, ভাতের ধোঁয়া আর ডিমভাজার গন্ধে সে "তুমি" বড় নরম হয়ে মনে ঠেকেছিল।

ভদ্রলোক পটলের তরকারি আর আলুভাজার দাম নেননি। সেই খেতে বসাটুকু মনে করলে মন হালকা হয়, বৃদ্ধের তদারকি মনে পড়লে মনে হয় "আহা, বড় মোলায়েম"। এই দৃশ্যটুকু বার দুয়েক মনের মধ্যে ঝালিয়ে নিলেই মনের সমস্ত হুড়মুড় সাফ, ফুরফুরে মেজাজে ফের কাজে ওয়াপসি।

যতই হোক, খাওয়াদাওয়া মানে তো শুধুই খাবারদাবার নয়।