Tuesday, July 2, 2019

খাওয়াদাওয়া আর খাবারদাবার

নামীদামী রেস্তোরাঁয় ঢোকার মোহ আর ইহ জনমে কাটবে না। কষানো মাংস, খুশবুদার বিরিয়ানি, রগরগে কালিয়া বা তেলে টইটম্বুর ভাজাভুজির টান আলাদা; যত যাই বলি, সে' টান উপেক্ষা করার শক্তি আয়ত্ত করার ইচ্ছেও তেমন নেই। কিন্তু তবু, কিছু কিছু অতি সরল-সিধে "খেতে বসার" স্মৃতি মনের মধ্যে জেঁকে বসে থাকে চিরকালের জন্য। অফিসের দৌড়ঝাঁপে বা গেরস্থালীর ব্যস্ততার মধ্যে মাঝেমধ্যে সে'সব তৃপ্তির খাওয়াদাওয়ার কথা মনে পড়ে। বলে রাখা উচিৎ, মাঝেমধ্যে খাওয়াদাওয়ার কথা ভাবতে আমার ভালো লাগে। খাবারদাবারের নয়, খাওয়াদাওয়ার কথা ।

এই যেমন টিউশনি ফেরতা ছাতা মাথায় দাঁড়িয়ে আছি চপের দোকানের সামনে, বৃষ্টির ছাঁটে জামার বাঁ'দিকে হাতাটা ভিজে জ্যাবজ্যাব করছে। পিঠের ব্যাগ উলটো করে বুকের দিকে ঝোলানো যাতে ভিজে না যায়। ছাতা বেয়ে জল ঝরেই চলেছে, আর ঝরছে দোকানের ছাউনি বেয়ে; তাদের গতি ও নামার ধরন অবশ্যই বৃষ্টির মোমেন্টামের চেয়ে আলাদা। সেই ছাত আর ছাতা বেয়ে ঝরে পড়া জলের রিদমের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ফুটছে কড়াইয়ের তেল। দোকানের চপ-মাস্টার একের পর এক আলুর চপ ছাড়ছে কড়াইতে; কড়াই ভর্তি তেলে চপগুলো ডগমগ হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। সেই চপে কামড় দেওয়ার মুহূর্তটা মনে নেই; কিন্তু সেই ছাতা মাথায় কড়াইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকাটা মনে আছে। জলের ছাঁট, ছাত বেয়ে জল ঝরার শব্দ, সর্ষের তেল আর বেসনের গন্ধ; চোখ বুঝলেই এখনও এগুলো ঝলমল করে উঠবে।

কিন্তু কথা হচ্ছিল সরলসিধে খাওয়াদাওয়ার। আলুর চপ আর যাই হোক সরলসিধে নয়, ছুঁচ হয়ে ঢুকে বোফর্স হয়ে বেরোনোর ক্ষমতা রয়েছে তাদের। এই যেমন - অফিসে বিস্তর হুড়মুড়; ইয়ে লাও, উয়ো সামলাও, দিস কেলো, দ্যাট ক্যালামিটি; ইত্যাদিতে মন এক্কেবারে বনেট গরম সেকেলে গাড়ি। লং ডিস্ট্যান্স ড্রাইভিংয়ের ক্ষেত্রে আমার সুপরিচিত এক ড্রাইভারদাদা ধর্মেন্দ্র প্রতি ঘণ্টাখানেক অন্তর গাড়ি থামিয়ে বলতেন "মাইন্ড কো থোড়া রিফ্রেশ কর লেতে হে"; মিনিট খানেক দাঁড়াতেন, গুটখা আর জর্দা মিশিয়ে কিছু একটা খেতেন আর তারপর ফের ফুরফুরে মেজাজে ইগনিশন অন করতেন। প্রবল হুড়মুড়ে পড়ে আমারও মাঝেমধ্যে ওই "মাইন্ড কো থোড়া রিফ্রেশ কর লেতে হ্যায়" মার্কা বাই জাগে। আর আমার জর্দা-গুটখা বলতে ওই সাতপুরনো খাওয়াদাওয়ার স্মৃতি। 

আজ যেমন মনে পড়ল কটিহার থেকে কিষণগঞ্জ যাওয়ার পথে এক দোকানের বেঞ্চিতে বসে ভাত, ডাল, আলুভাজা, পটলের তরকারি আর ডিমের ওমলেট খাওয়ার সুখস্মৃতি। হাইওয়ের ধারের ধাবা মানেই রুটি-মাংস-তড়কা গোছের খাবারদাবারের কথা মনে পড়ে। কিন্তু এই খাবারের দোকানের বৃদ্ধ মালিক একজন বাঙালি (নামটা বেমালুম ভুলে গেছি, ভোলা উচিৎ হয়নি)। রুটি তড়কা পাওয়া যাবে কিনা জিজ্ঞেস করায় সোজা জানালেন;

- বাঙালি তো, নাকি?
- হ্যাঁ।
- এই ভরদুপুরে খসখসে রুটি খামোখা খেতে যাবেন কেন? ভাত শেষ হয়ে গেছে বটে, কিন্তু এখুনি চাপিয়ে দিতে বলছি।
- হ্যাঁ মানে তা'তো বুঝলাম কিন্তু একটু তাড়া ছিল যে...।
- লংরানে বেরিয়েছেন তো। তাড়া কীসের? দুপুরের খাবারটা একটু ঠাণ্ডা মাথায় না সারলেই মুশকিল। শুনুন, পটলের তরকারি আছে, দোকানের নয়। নিজের জন্য বানিয়েছিলাম। বৌয়ের রেসিপি। আলু পটল নয় কিন্তু, শুধু পটলের তরকারি; গা-মাখা করে। মিনিমাম মশলা, কিন্তু জিভে ধরবেই। চেখে দেখুন না একবার।
- ও মা, আপনি অত ব্যস্ত হবেন না...আমি না হয়...।
- ব্যস্ত কীসের? রেসিপি বৌয়ের কিন্তু পরিমাণ বোধ তো আমার। একার জন্য যা রাঁধি তা দিয়ে দোকানের তিনজন ছেলের খাওয়াদাওয়া হয়ে যায়। ডাল আছেই। আমি বরং আপনার জন্য আলুভাজা আর ওমলেট বানাতে বলে দিই। ওমলেটে লঙ্কা চলবে?
ভদ্রলোক এমন অবলীলায় পরিস্থিতিটা সম্পূর্ণ নিজের কন্ট্রোলে এনে ফেললেন যে আমার কিছু করার ছিল না। ভদ্রলোক উত্তরবঙ্গের এক গাঁয়ের মানুষ, তার স্ত্রীও সে'খানেই থাকেন। প্রতি মাসে এক-দু'দিনের জন্য গ্রামে ফেরেন। আধ ঘণ্টার মধ্যে স্টিলের থালায় চেপে এলো ধোঁয়া ওঠা ভাত, সঙ্গে গরম ডাল, পটলের তরকারি, নরম খোসা-না-ছাড়ানো আলুভাজা। ডবল ডিমের ওমলেটটটা শালপাতার দোনায় করে থালার এক পাশে রাখা ছিল।

খাওয়ার সময় ভদ্রলোক সামনে বসেছিলেন আগাগোড়া। দোকানের ছেলেটা যতক্ষণ লেবু এনে দেয়নি ততক্ষণ আমায় ভাত মাখতে দেননি; "খেতে বসে তাড়াহুড়োটা আমার মোটে বরদাস্ত হয় না, দাঁড়াও। আগে লেবু লঙ্কা আনুক, তারপর ভাত মাখবে"। আপনি থেকে সহজেই তুমিতে নেমে এসেছিলেন, ভাতের ধোঁয়া আর ডিমভাজার গন্ধে সে "তুমি" বড় নরম হয়ে মনে ঠেকেছিল।

ভদ্রলোক পটলের তরকারি আর আলুভাজার দাম নেননি। সেই খেতে বসাটুকু মনে করলে মন হালকা হয়, বৃদ্ধের তদারকি মনে পড়লে মনে হয় "আহা, বড় মোলায়েম"। এই দৃশ্যটুকু বার দুয়েক মনের মধ্যে ঝালিয়ে নিলেই মনের সমস্ত হুড়মুড় সাফ, ফুরফুরে মেজাজে ফের কাজে ওয়াপসি।

যতই হোক, খাওয়াদাওয়া মানে তো শুধুই খাবারদাবার নয়।

ইন্ডিয়ান সামার


বই পড়ার পরপরই সে বইয়ের বিষয়ে দু'কথা বলতে গেলে যে'টা বড় সুবিধে সে'টা হল বইয়ের "ডিটেলস"গুলো টাটকা তাজা মাথার মধ্যে ঘুরে বেড়ায়। রেফারেন্স টেনে কিছু বলতে সুবিধে হয়। কিছুদিন কেটে গেলে সেই "ডিটেলস"গুলো ফিকে হয়ে আসে, অন্তত আমার ক্ষেত্রে তা তো হয়ই। তবে বই শেষ হওয়ার পর কিছুদিন কেটে গেলে একটা ভালো ব্যাপারও ঘটে; প্রাথমিক উচ্ছ্বাস, চমক বা লেখকের ভাষাগত চমকের আবরণ ভেদ করে বইয়ের নির্যাসটুকু 'ইন্টারনালাইজড' হয়। বিশেষত নন-ফিকশনের ক্ষেত্রে; উচ্ছাসের বাষ্প সাফ করে নিজের বোধবুদ্ধির ফ্রেমে সে বইয়ের মূল বক্তব্যটা যাচাই করে নিতে খানিকটা সময় তো লাগেই।

মাসখানেক আগে শেষ করা 'ইন্ডিয়ান সামার' বইটার ডিটেলগুলো কিছুটা আবছা হয়ে এলেও, বইয়ে সাতচল্লিশের যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন আর সংঘাতগুলো তুলে ধরা হয়েছে; সে'গুলো ক্রমশ মনের মধ্যে উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। সে'দিক থেকে আমার কাছে এ বই ল্যাপায়ারের 'ফ্রীডম অ্যাট মিডনাইট'য়ের চেয়ে বেশি ইম্প্যাক্টফুল। অনেক বিষয় সম্বন্ধে আমাদের ধ্যানধারণা যে একেবারে 'কাঁচকলা' তা কিন্তু নয়; কিন্তু ইনফর্মড ওপিনিওন (কিছুটা বায়াস না থাকাটাও অবশ্য অবাস্তব) তৈরি করতে গেলে এ ধরনের বই অত্যন্ত কাজের।

বইয়ের কোন রেফারেন্স পয়েন্টগুলো মনের মধ্যে জেঁকে বসে আছে?

১। মোহনদাস গান্ধী। ভদ্রলোকের চারিত্রিক জটিলতাগুলো খুব যত্ন করে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। তাঁর সাংসারিক জীবনের ব্যর্থতাগুলো, তাঁর অতিধার্মিক বাতিকসমূহ, বিজ্ঞান বা মেডিকাল সায়েন্স বা টেকনোলজি সম্পর্কে তাঁর বিটকেল বিরক্তি; এ'রকম আরো বেশ কিছু গোলমেলে দিক বহু ক্ষেত্রে বারবার আলোচিত হয়েছে এবং এ বইতেও সে'গুলো সম্বন্ধে তথ্যের অভাব নেই। কিন্তু বেশ কিছু প্রকাণ্ড "ফ্ল" থাকা সত্ত্বেও, মোহনদাসের গুরুত্ব তাঁর অহিংসার থিওরি এবং প্র‍্যাক্টিকাল ডেমোন্সট্রেশনে। যে কোনো মতবাদের ক্ষেত্রেই, মাঠে নামলে দেখা যায় প্রচুর ফাঁকফোকড় রয়েছে, গান্ধীর ক্ষেত্রেও সে তর্ক চলতেই পারে। কিন্তু আধুনিক যুগে তাঁর অহিংসার স্ট্র‍্যাটেজির গুরুত্ব যে কী অপরিসীম, তা রীতিমতো খাতায়কলমে কন্টেক্সটুয়ালাইজ করতে পেরেছেন লেখক। অহিংসা যে হিংসার চেয়ে ভালো এবং ক্ষেত্র বিশেষে সুইসাইডাল; তা জানার জন্য পলিটিকাল অ্যানালিস্ট না হলেও চলবে। কিন্তু রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে অহিংসাকে সঠিক সময়ের অন্তত শ'খানেক বছর আগে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন মোহনদাস; ইতিহাস অন্তত এই প্রবল সত্যটাকে কিছুতেই পাশ কাটিয়ে যেতে পারবে না। এমন কী মোহনদাস নিজের প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক ব্যর্থতার মধ্যে দিয়ে অহিংসার 'স্ট্র‍্যাটেজিক' গুরুত্বর পক্ষে যে সওয়াল রেখে গেছেন, তার গুরুত্ব না দিয়ে উপায় নেই। হাজারো ইডিওলজিকাল কলকারখানার পাশে মোহনদাস নিজের ল্যাবরেটরিতে চোয়াল শক্ত করে এক্সপেরিমেন্ট চালিয়ে গেছেন এবং সহজে তাঁকে নড়ানো যায়নি; স্রেফ সে জেদের মূল্যেই ইতিহাস তাঁর স্থান চিরঅমলিন। গান্ধীর সেই প্যারালাল 'ম্যানহ্যাটন প্রজেক্ট' সযত্নে উপস্থাপিত হয়েছে এ বইয়ে। আর হ্যাঁ, দেশভাগের সময় মোহনদাসের ভূমিকা কেন খানিকটা ওভাররেটেড; সে বিষয় নিয়েও বিশদে আলোচনা করেছেন লেখক।

২। জহরলাল নেহরু। বইয়ের অনেকটা জুড়ে রয়েছেন জহরলাল। ফটোফ্রেমের সাজানোগোছানো 'ফার্স্ট প্রাইম মিনিস্টার' শুধু নন, মানুষ, বন্ধু ও প্রেমিক জহরলালই এ বইয়ের মূল আকর্ষণ। ভদ্রলোকের পাঁচমেশালি দিকটা বিভিন্নভাবে স্পষ্ট করে তুলতে পেরেছেন লেখক। ব্রিটিশদের প্রতি রাগ থেকে ব্রিটিশদের প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধাভক্তি ও ভালোবাসা, গান্ধীকে বাপের মত ভালোবাসা আবার গান্ধীর কিছু ধ্যানধারণা শুনে কেঁপে উঠে পাশ কাটিয়ে যাওয়া, রাজনৈতিক লোভের পাশাপাশি বেহিসেবী আইডিয়ালিজম; জহরলালের একটা বড় গুণ বোধ হয় তাঁর "এক্সট্রিম পয়েন্ট"গুলো এড়িয়ে মাঝামাঝি থাকতে পারায়। সেই মাঝামাঝি থাকতে পারার ভালো এবং গোলমেলে দিকগুলোর কথা চমৎকারভাবে বলা হয়েছে। এ বইয়ে গান্ধীর চেয়ে অনেক বেশি জায়গা জুড়ে আছেন নেহেরু,
তবু তাঁকে নিয়ে আমার এ কাঁচা লেখায় বেশি না ফেনিয়ে বলি; বইটা পড়ুন। নেহরুর অন্ধ ভক্তই হোন বা কট্টর বিরোধী ; এ বই অত্যন্ত দরকারী।


৩। "নেহরু গান্ধীর জন্য দেশভাগ হয়েছে"। যে কোনো অতি-সরল কথা তলিয়ে দেখাটা জরুরী। আজকাল আবার এ আলোচনাটা ফের গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এবং সে অভিযোগ হয়য় দুম করে উড়িয়ে দেওয়াটাও হঠকারী ব্যাপার হবে। কিন্তু আয়রনিগুলো স্পষ্ট করে বুঝতে গেলে এই বইয়ের জবাব নেই। সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের পাল্লায় পড়লে মুসলিমদের সর্বনাশ হবে, মোটের ওপর এই থিওরিতে ভর দিয়ে সফল হয়ছিলেন জিন্নাহ। দেশভাগের সব দোষ 'নেহরু গান্ধী'র বলে গলা ফাটানো যায় বটে, কিন্তু অলটারনেটিভগুলো ঠিক কী কী ছিল? একটা মুসলিম রাষ্ট্রের পাশাপাশি হিন্দু রাষ্ট্র? কিন্তু তা'তে কি জিন্নাহর আশঙ্কায় শিলমোহর পড়ত না? আর যারা সেকিউলার দেশ চেয়েছেন, তাঁরা নেহেরুর জায়গায় ঠিক কী কী অন্যভাবে করলে দেশের ও দশের বাড়তি উপকার হত? আমি আমার নড়বড়ে লেখায় গুলিয়ে দিয়ে থাকতে পারি, কিন্তু এ বইতে লেখক মজবুতভাবে এ'সব প্রশ্নের মোকাবিলা করেছেন এবং পাঠককে যত্ন করে গাইড করেছেন।

৪। এডউইনা ও ডিকি মাউন্টব্যাটেন ( এবং জহরলাল)। মশলা ব্যাপারটা লেখক এড়িয়ে যাননি বা যাওয়ার চেষ্টা করেননি। কিন্তু লজিক এবং কমনসেন্সকে জলাঞ্জলি না দেওয়ায় যে'টা হয়েছে সে'টা হল গসিপের বাইরে গিয়ে এদের তিনজনের সম্পর্কের প্লেটনিক দিকগুলো ফুটে উঠেছে; স্পষ্ট হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক ইকুয়েশনের পাশাপাশি এই সম্পর্কের অভিপ্রেত বা অনভিপ্রেত ফলাফলগুলো।
ডিকি মাউন্টব্যাটেনের যাবতীয় সাফল্য ও ব্যর্থতার নিয়ে বিস্তারিত ব্যালেন্সশিট সাজিয়ে বসেছেন লেখক; বিশেষত ভারতবর্ষের নিরিখে। সে ব্যালান্সশিট যেমন চিত্তাকর্ষক, তেমনই জটিল। তবে সে জটিলতার বর্ণনা দিতে গিয়ে পাঠককে ব্যতিব্যস্ত করে তোলেননি লেখক।
আর রয়েছেন এডউইনা। আমাদের দুর্ভাগ্য যে সে সময়ের রাজনৈতিক চরিত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম একজনকে আমরা শুধু গসিপের মাত্রায় চিনি। এডউইনার সেই রাজনৈতিক ভূমিকা সযত্নে খোলসা করেছেন লেখক। অবশ্য এ বইয়ের পরিসর থেকে এডউইনার প্রেম ও প্রেমিকরাও বাদ পড়েননি। নেহরু আর এডউইনার সম্পর্কটা ঠিক কীরকম ছিল? লেখক এ বইতে সমস্ত 'পাবলিক ফ্যাক্টস' সোজাসাপটা ভাবে সাজিয়েছেন; এবং আলোচনা করেছেন যুক্তি এবং কমনসেন্স দিয়ে যাতে ব্যাপারটা গসিপে-গুবলেট না হয়ে যায়। তাঁদের সম্পর্কের রাজনৈতিক প্রভাবগুলোকেও খতিয়ে দেখা হয়েছে।
সবচেয়ে বড় কথা, সমস্ত সস্তা মশলার লোভ কাটিয়ে, নেহরু, ডিকি ও এডউইনা; এই তিনজনের বন্ধুত্ব ও আভ্যন্তরীণ সম্পর্কের উষ্ণতাটুকুর ওপর ফোকাস করেছেন লেখক। এ জন্য সাধুবাদ প্রাপ্য তাঁর।

৫। মহম্মদ আলী জিন্নাহ। তাঁর আশঙ্কাগুলো, তাঁর পরিকল্পনাগুলো, নেহরুর সঙ্গে লড়া ডুয়েল এবং তাঁর মিইয়ে যাওয়া স্বপ্নগুলো। সে'গুলো ছুঁতে পেরেছেন লেখক। জিন্নাহর ব্যাপারে আরো বিশদে পড়ার ইচ্ছে তৈরি হয়েছে বৈকি।

এ'ছাড়া, প্রতি পরিচ্ছেদে রয়েছে অসংখ্য টানটান ঘটনা ও গল্পের উল্লেখ; যা পাঠককে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গ্রিপ করে রাখবেই।
মোটের ওপর, যাকে বলে; "স্ট্রংলি রেকমেন্ডেড"।

Wednesday, May 15, 2019

খচখচ


- কী বুঝছ ভাইটি?

- ছেলেপিলেরা দেখছি বড়ই উত্তেজিত।

- কিন্তু তোমার মুখ দেখে তো মনে হচ্ছে বেশ ফুর্তিতেই আছ।

- ব্যাজার মুখে থাকব কেন বলতে পারেন খুড়ো?

- তোমার মূর্তিফূর্তি এমন টেরিফিক লেভেলে ভাঙচুর করছে। সে'সব দেখে একটু নার্ভাস হবে না?

-  আদিঅনন্তকাল ধরে এই ভগবানবাজি করে করে আপনার সেন্স অফ হিউমরে মরচে পড়ে গেছে দেখছি।

- যাহ্, আমি আবার কী করলাম?

- ভ্যাপসা গরমে ছেলেপুলেগুলো ঘেমেনেয়ে নাস্তানাবুদ হয়ে পড়েছে। এ'দিকে আপনি বৃষ্টি চার্জ করার ব্যবস্থা না করে পিএনপিসি চালিয়ে যাচ্ছেন।

- বটে? মানুষ এমন গাম্বাটস্য গাম্বাট কাজ করে যাবে আর তুমি দোলনায় দুলে দুলে মাথার টিকি নাচিয়ে মজা দেখবে?

- এই যে বামিয়ানে সে'বার আপনার মূর্তিগুলো সাফ করে দিলে, আপনি এখানে বসে কোন ঘ্যাম কাজটা করেছেন শুনি?

- ঘ্যাম? আহ, ভাষাটাষা সামলে ভায়া। আর তাছাড়া আমি কবেকার পিস্, মূর্তিটূর্তির মায়া কবেই ত্যাগ করেছি। কিন্তু তোমরা হলে ইয়ং ঘোস্ট, বাঁদরদের বাঁদরামি তোমাদের স্পর্শ না করলে চলবে কেন?

- কী জানেন খুড়ো, বেঁচে থাকতে দেখেছি প্রতিটি সৎকাজে খোঁচা মারার লোকের অভাব হয়না। মোটাবুদ্ধি, মোটাচামড়া আর গবেটসুলভ আত্মবিশ্বাস;  এ'গুলোর রমরমা চিরদিনই একই রকম। আর মূর্তির মধ্যে যেহেতু আমার নার্ভাস সিস্টেম নেই; তাই তার গায়ে বিছুটি ঘষলে বা বোম মারলেও আর পরোয়া করিনা। তবে মনে ফুর্তি ঠিক নেই গো দাদা, মনের মধ্যে খচখচ তো সামান্য আছেই।

- আছে? খচখচ?

-  সত্যিই আছে। নয়ত রীতিমতো হরিতকী ফ্লেভারের পপকর্ণ আনিয়ে খেতাম৷

- তা খচখচানিটা ঠিক কী রকম নেচারের?

- বাঁদরেরা মূর্তি ভেঙে ভাববে রাজ্যজয় করলাম, তা'তে আর আশ্চর্য কী। কিন্তু ভদ্রসমাজের পেল্লায় থেকে পেল্লায়তর মূর্তি বানিয়ে 'কী দিলাম' গোছের বাতেলা দেওয়া যে কী হাড়-জ্বালানি ব্যাপার দাদা, কী বলব। ভয়ে সিঁটিয়ে আছি গো দাদা, এই বুঝি ভাঙা মূর্তির বদলে একটা ডাইনোসর সাইজের কিছু বানিয়ে ফেলবে। অথচ সে'টাকা দিয়ে...।

- যদির টাকা নদীতেই পড়বে হে। রিল্যাক্স।

Saturday, May 4, 2019

সাইক্লোন

সে এক দুর্দান্ত ঝড় আসবে। সেমি-প্রলয় গোছের কিছু। উড়ে বেড়াবে ডিশটিভির চাকতি, রাস্তায় উপড়ে পড়া গাছের ধাক্কায় তুবড়ে যাবে মারুতিভ্যানের ছাত। সে সাইক্লোন অবশ্য এখনও এসে পড়েনি। তবে সন্ধে থেকে একটানা লোডশেডিং, আর বাইরে বৃষ্টির তোড়ে ফ্যাকাসে হয়ে আসা রাতের অন্ধকার ।  খবরাখবর যে'টুকু তা জোড়া পেন্সিল ব্যাটারির ছোট রেডিওর মাধ্যমে। এ'দিকে মোবাইলের ব্যাটারি সাত পারসেন্টে নেমেছে; ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই নির্ঘাৎ স্যুইচ অফ।

অনুপ সামন্ত একটানা সাতখানা হাই তুলে বিছানায় গা এলিয়ে দিলেন।  কাহাতক ঠায় বসে থাকা যায়, মোমবাতির ঘোলাটে আলোয় একটানা বই পড়াও কষ্টকর। একা থাকার এই এক সমস্যা; 'জলের বোতলটা এগিয়ে দাও' গোছের কথা বলার কেউ নেই, 'দরজা জানালাগুলো চেপেচুপে বন্ধ করেছিস তো' বলে খোঁজখবর নেওয়া কেউ নেই।

মোমবাতিটা নেভানোর ঠিক আগে হাতঘড়িতে সময় দেখেছিলেন অনুপবাবু, রাত পৌনে একটা। আর আধ ঘণ্টার মাথায় সেই তুমুল সাইক্লোন শহরের বুকে আছড়ে পড়ার কথা; ইন্টারনেট স্যাটেলাইট ইত্যাদির যুগে আজকাল এ'সব খবর খুব একটা এ'দিক ও'দিক হয়না।

ঝড়ের রাতের অন্ধকারে একাকিত্ব ব্যাপারটা বেশ সহজেই গাঢ় হয়ে পড়ে বোধ হয়, আর তখন বড় মায়ের কথা মনে পড়ে। সামান্য তিন দিনের জ্বরে চলে গেল মা; এই গত বছর। ছেলের বিয়ে দেখে যাওয়ার বড় সাধ ছিল, হল না। কত কীই তো হয়না আর সেই না হওয়াগুলোই পোষা বেড়ালের মত চিরকাল পায়ে-পায়ে ঘুরবে।

মায়ের নরম শাড়ির ওম বড় মনে পড়ে, রাতে পাশ ঘেঁষে শুলে মা প্রায়ই গাইতেন "ভব-সাগর-তারণ-কারণ হে, রবি-নন্দন-বন্ধন-খণ্ডন হে"। মায়ের সে সুরে বুকে বাতাস বইত; ঝড়টড় নয়, ঝিরিঝিরি বৃষ্টির শেষে ছাতের টাবে রাখা নয়নতারার মাথা নুইয়ে দেওয়া মখমলি হাওয়া। সে সুরের জন্য বড় মন আনচান করে আজকাল। আর সে আনচান বাড়লেই ঘরের দক্ষিণ দিকের দেওয়ালে টাঙানো মায়ের ফ্রেম করা ছবিটার দিকে নিবিষ্টচিত্তে তাকিয়ে থাকেন ভদ্রলোক। আজও সে দেওয়াল তাক করে টর্চের আলো ফেললেন অনুপবাবু, সে আলোয় মায়ের মুখ যেন আরো উজ্জ্বল মনে হল। নাকের নীচের অংশটুকু ধরে বিচার করলে মায়ের সঙ্গে অনুপবাবুর মুখের হুবহু মিল।

বেঁচে থাকতে মা অবিশ্যি জ্বালাতনও কম করতেন না, বেশ বাতিকগ্রস্ত ছিলেন তিনি। অফিস থেকে বেরোনোর সময়  থাকত হাজার রকমের প্রশ্ন; মানিব্যাগ নিয়েছিস তো? টিফিনবক্সের সঙ্গে আলাদা একটা ছোট কৌটে অল্প খেজুর দিয়েছি, খেতে ভুলবি না তো? ফিরতে দেরী হলে আগাম ফোনে জানিয়ে রাখবি তো? দৌড়ে বাসে উঠবি না তো? এমন আরো খানকুড়ি প্রশ্ন, রোজ। আর এমন ঝড়ের রাতে না জানি মায়ের কাছে কত কৈফিয়ত দিতে হত; বারান্দার টবগুলো ভিতরে এনে রাখা হয়েছে কিনা, ছাতে কোনো কাপড় মেলা আছে কিনা, টিভি ফ্রিজের প্লাগ খোলা আছে কিনা; এমন হাজারো প্রশ্ন বারে বারে তেড়ে আসত অনুপবাবুর দিকে। আর সেই সব প্রশ্ন আর আকুতির অভাবটা অনুপবাবুর বুকে বড় বাজছিল, বাতাসের শোঁশোঁ শব্দ গলায় ঘুরপাক খাচ্ছিল যেন। অবিশ্যি ঝড় শুরু হয়নি এখনও, তবে 'এনিটাইম নাউ' পরিস্থিতি।

চমকে উঠতে হল খট করে বিশ্রী শব্দটা হওয়ায়, মায়ের ছবিটা দেওয়ালের পেরেক উপড়ে মেঝেয় পড়েছে, ছড়িয়ে পড়েছে কাচ। আড়মোড়া ভেঙে খাট ছেড়ে উঠলেন অনুপবাবু। মায়ের ছবিটা যত্ন করে তুলে পাশের টেবিলে রাখলেন। বড় কান্না পাচ্ছিল; এমনটা হয়, যাদের মা না থাকে; তাঁদের তো হয়ই।

তখনই খেয়াল পড়ল পাশের দেওয়ালের জানালাটা আধ-খোলা, বাতাসের শব্দে মালুম হচ্ছিল গতিবেগ বাড়ছে। ছুটে গিয়ে জানালাটা বন্ধ করলেন অনুপবাবু, আর সামান্য দেরী হলেই বিশ্রী কাণ্ড ঘটত।

**

গীতাদেবী স্বস্তি পেলেন।

খোকাটা আগের মতই বেখেয়ালি রয়ে গেল, হাজারবার এক কথা কানের কাছে ঘ্যানরঘ্যানর না করলে বাবুর কিছুতেই জরুরী কাজগুলো মনে থাকবে না। আগে তাও চিৎকার চ্যাঁচামেচি করে কাজ সেরে ফেলা যেত, এখন তার বদলে বিশ্রী সব কাণ্ড ঘটাতে হয়। এই যেমন আজ এই ঝড়ের রাতে জানালার খোলা পাল্লার দিকে খোকার নজর টানতে গিয়ে নিজের ছবির ফ্রেমটাকেই ভেঙে ফেলতে হল।

Wednesday, May 1, 2019

লুডো


- বাদাম দেব নাকি?

- নেব। নিলে একদান লুডো খেলবে?

- বিক্রি বন্ধ করে তোমার সঙ্গে লুডো খেলব বিল্টুবাবু?

- চার প্যাকেট বাদাম আর দু'প্যাকেট কাঠিভাজা কিনব। প্লাস এক প্যাকেট মিষ্টিবাদাম।

- টিউশনির টাকা মেরেছ?

- মেজমাসী যাওয়ার আগে গোপনে বখশিশ দিয়ে গেল, কড়কড়ে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট।

- বেশ। তবে একদান। আমি লাল হলুদ নেব।

- বসে পড়ো।

- টিউশনির ব্যাগে লুডোর বোর্ড আর ঘুটি নিয়ে ঘুরছ। বিকেলে একলা ঘাটের বেঞ্চিতে বসে। ব্যাপার কী বিল্টুবাবু?

- চাল দাও।

- সোজা ছক্কা। বাহ্। আচ্ছা, টিউশনি কামাই করেছ?

- তা'তে তোমার কী?

- মাধ্যমিকে ফেল করবে?

- ফার্স্ট ডিভিশন কেউ আটকাতে পারবে না।

- বিকেলে ঘাটে বসে লুডো না খেললে আরো দু'নম্বর বাড়ত।

- দু'প্যাকেট বাদাম না হয় বেশি নেব। ঘ্যানঘ্যান বন্ধ করবে?

- একশো টাকার খবরটা ভাঁওতা নয় তো?

- বুকপকেটে খসখস করছে। তাজা নোট। এই দ্যাখো।

-  বুকে না হয় একশো টাকার নোটের খসখস। গলায়?

- খেলতে হবে না তোমার লুডো। তোমার বিক্রির সময় নষ্ট করে এ'খানে বসতেও হবে না। এই সময় নদীর ধারে কত মানুষজন আসে। কত লোকে বাদাম কেনে। তুমি এসো'খন।

- টিউশনি?

- একটু দেরী হয়ে গেছে। তবে যাব।

***

- বাবা, এই অসময়ে অফিসে চলে এলে?

- এমনি আসিনি। সঙ্গে লুডোর বোর্ডও আছে। এই যে।

- কিন্তু বাবা, এখন আমি ব্যস্ত..। একটু জরুরী মিটিং আছে সন্ধেবেলা।

- টুক করে এক দান খেলে নেব। আমার লাল হলুদ।

- কিন্তু বাবা...।

- না হয় এখন ভালো চাকরী করো। তাই বলে বাৎসরিক ট্র‍্যাডিশনকে ল্যাং মারবে বিল্টুবাবু? 

- পাক্কা এক দান কিন্তু। কনফারেন্স রুমে চলো।

- ভাগ্যিস সে'দিন ঘাটের ধারের বেঞ্চিতে স্পট করেছিলাম।  নয়ত খামোখা মনখারাপে টিউশনে ফাঁকি পড়ত।

- সে এক ইতিহাস। কিন্তু বাবা, নিজের বাদাম বিক্রি বন্ধ করে লুডো খেলাটা ফাঁকিবাজি নয়?

- আমার মনখারাপটা মনখারাপ নয়?

- আজ আমার শুরুতেই ছক্কা।

- মেজমাসীর বখশিশটা সেই কবে থেকে আমার পাওনা।

- হেহে। বুক পকেটে কড়েকড়ে টাকার খসখস? শুনবে?

- আর গলায়?

- বাবা, এই দিনটা খুব খারাপ। তাই না?

- খুউব। ধুস, আমার আবারও পুট...তোমার মা এমন ধুপ করে চলে গেলো তার আগের বছর, বিল্টুবাবু। তবে আমি খুব চেষ্টা করেছিলাম।

- জানি বাবা। বারবার এ কথা বলো কেন?

- এ দিনেই সে চলে গেছিল। প্রতিবছর এ দিনটাতেই তাই..তাই বার বার বলতে ইচ্ছে করে..। আর তাই বছরের এ দিনটায় বাদাম-বিক্রি বন্ধ রাখলেও তা'তে ফাঁকি নেই..।

- বাবা, এই কনফারেন্স রুমে লুডো কী বেমানান। মেজাজটাই মাটি।  চলো ঘাটের বেঞ্চিতেই যাই, সে'খানে লুডো পেতে বসি।

- ও মা, তোর সন্ধেবেলার মিটিং?

- বছরের এ দিনটায় মিটিংয়ে ডুব দিলেও তা'তে ফাঁকি নেই..।

- তা'হলে চটপট!

- ঝটপট!

- আচ্ছা বিল্টুবাবু, ছোট্টবেলায় ঘাটের সেই বেঞ্চিতে তুমি মায়ের সঙ্গে প্রায়ই রাত্রে এসে বসতে। মা তোমায় জড়িয়ে কীর্তন গাইত। বিক্রিবাটা শেষে আমি পাশে এসে বসতাম..তুমি ঘুমিয়ে না পড়া পর্যন্ত মায়ের গান থামত না। আমি সেই সুরে দুলে দুলে পয়সাকড়ি গুনতাম। তারপর ঘুমন্ত বিল্টুবাবুকে কোলে নিয়ে বাবা-মা ঘরে ফিরত...তোমার মনে পড়ে? বিল্টুবাবু?