Tuesday, July 2, 2019

ইন্ডিয়ান সামার


বই পড়ার পরপরই সে বইয়ের বিষয়ে দু'কথা বলতে গেলে যে'টা বড় সুবিধে সে'টা হল বইয়ের "ডিটেলস"গুলো টাটকা তাজা মাথার মধ্যে ঘুরে বেড়ায়। রেফারেন্স টেনে কিছু বলতে সুবিধে হয়। কিছুদিন কেটে গেলে সেই "ডিটেলস"গুলো ফিকে হয়ে আসে, অন্তত আমার ক্ষেত্রে তা তো হয়ই। তবে বই শেষ হওয়ার পর কিছুদিন কেটে গেলে একটা ভালো ব্যাপারও ঘটে; প্রাথমিক উচ্ছ্বাস, চমক বা লেখকের ভাষাগত চমকের আবরণ ভেদ করে বইয়ের নির্যাসটুকু 'ইন্টারনালাইজড' হয়। বিশেষত নন-ফিকশনের ক্ষেত্রে; উচ্ছাসের বাষ্প সাফ করে নিজের বোধবুদ্ধির ফ্রেমে সে বইয়ের মূল বক্তব্যটা যাচাই করে নিতে খানিকটা সময় তো লাগেই।

মাসখানেক আগে শেষ করা 'ইন্ডিয়ান সামার' বইটার ডিটেলগুলো কিছুটা আবছা হয়ে এলেও, বইয়ে সাতচল্লিশের যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন আর সংঘাতগুলো তুলে ধরা হয়েছে; সে'গুলো ক্রমশ মনের মধ্যে উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। সে'দিক থেকে আমার কাছে এ বই ল্যাপায়ারের 'ফ্রীডম অ্যাট মিডনাইট'য়ের চেয়ে বেশি ইম্প্যাক্টফুল। অনেক বিষয় সম্বন্ধে আমাদের ধ্যানধারণা যে একেবারে 'কাঁচকলা' তা কিন্তু নয়; কিন্তু ইনফর্মড ওপিনিওন (কিছুটা বায়াস না থাকাটাও অবশ্য অবাস্তব) তৈরি করতে গেলে এ ধরনের বই অত্যন্ত কাজের।

বইয়ের কোন রেফারেন্স পয়েন্টগুলো মনের মধ্যে জেঁকে বসে আছে?

১। মোহনদাস গান্ধী। ভদ্রলোকের চারিত্রিক জটিলতাগুলো খুব যত্ন করে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। তাঁর সাংসারিক জীবনের ব্যর্থতাগুলো, তাঁর অতিধার্মিক বাতিকসমূহ, বিজ্ঞান বা মেডিকাল সায়েন্স বা টেকনোলজি সম্পর্কে তাঁর বিটকেল বিরক্তি; এ'রকম আরো বেশ কিছু গোলমেলে দিক বহু ক্ষেত্রে বারবার আলোচিত হয়েছে এবং এ বইতেও সে'গুলো সম্বন্ধে তথ্যের অভাব নেই। কিন্তু বেশ কিছু প্রকাণ্ড "ফ্ল" থাকা সত্ত্বেও, মোহনদাসের গুরুত্ব তাঁর অহিংসার থিওরি এবং প্র‍্যাক্টিকাল ডেমোন্সট্রেশনে। যে কোনো মতবাদের ক্ষেত্রেই, মাঠে নামলে দেখা যায় প্রচুর ফাঁকফোকড় রয়েছে, গান্ধীর ক্ষেত্রেও সে তর্ক চলতেই পারে। কিন্তু আধুনিক যুগে তাঁর অহিংসার স্ট্র‍্যাটেজির গুরুত্ব যে কী অপরিসীম, তা রীতিমতো খাতায়কলমে কন্টেক্সটুয়ালাইজ করতে পেরেছেন লেখক। অহিংসা যে হিংসার চেয়ে ভালো এবং ক্ষেত্র বিশেষে সুইসাইডাল; তা জানার জন্য পলিটিকাল অ্যানালিস্ট না হলেও চলবে। কিন্তু রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে অহিংসাকে সঠিক সময়ের অন্তত শ'খানেক বছর আগে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন মোহনদাস; ইতিহাস অন্তত এই প্রবল সত্যটাকে কিছুতেই পাশ কাটিয়ে যেতে পারবে না। এমন কী মোহনদাস নিজের প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক ব্যর্থতার মধ্যে দিয়ে অহিংসার 'স্ট্র‍্যাটেজিক' গুরুত্বর পক্ষে যে সওয়াল রেখে গেছেন, তার গুরুত্ব না দিয়ে উপায় নেই। হাজারো ইডিওলজিকাল কলকারখানার পাশে মোহনদাস নিজের ল্যাবরেটরিতে চোয়াল শক্ত করে এক্সপেরিমেন্ট চালিয়ে গেছেন এবং সহজে তাঁকে নড়ানো যায়নি; স্রেফ সে জেদের মূল্যেই ইতিহাস তাঁর স্থান চিরঅমলিন। গান্ধীর সেই প্যারালাল 'ম্যানহ্যাটন প্রজেক্ট' সযত্নে উপস্থাপিত হয়েছে এ বইয়ে। আর হ্যাঁ, দেশভাগের সময় মোহনদাসের ভূমিকা কেন খানিকটা ওভাররেটেড; সে বিষয় নিয়েও বিশদে আলোচনা করেছেন লেখক।

২। জহরলাল নেহরু। বইয়ের অনেকটা জুড়ে রয়েছেন জহরলাল। ফটোফ্রেমের সাজানোগোছানো 'ফার্স্ট প্রাইম মিনিস্টার' শুধু নন, মানুষ, বন্ধু ও প্রেমিক জহরলালই এ বইয়ের মূল আকর্ষণ। ভদ্রলোকের পাঁচমেশালি দিকটা বিভিন্নভাবে স্পষ্ট করে তুলতে পেরেছেন লেখক। ব্রিটিশদের প্রতি রাগ থেকে ব্রিটিশদের প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধাভক্তি ও ভালোবাসা, গান্ধীকে বাপের মত ভালোবাসা আবার গান্ধীর কিছু ধ্যানধারণা শুনে কেঁপে উঠে পাশ কাটিয়ে যাওয়া, রাজনৈতিক লোভের পাশাপাশি বেহিসেবী আইডিয়ালিজম; জহরলালের একটা বড় গুণ বোধ হয় তাঁর "এক্সট্রিম পয়েন্ট"গুলো এড়িয়ে মাঝামাঝি থাকতে পারায়। সেই মাঝামাঝি থাকতে পারার ভালো এবং গোলমেলে দিকগুলোর কথা চমৎকারভাবে বলা হয়েছে। এ বইয়ে গান্ধীর চেয়ে অনেক বেশি জায়গা জুড়ে আছেন নেহেরু,
তবু তাঁকে নিয়ে আমার এ কাঁচা লেখায় বেশি না ফেনিয়ে বলি; বইটা পড়ুন। নেহরুর অন্ধ ভক্তই হোন বা কট্টর বিরোধী ; এ বই অত্যন্ত দরকারী।


৩। "নেহরু গান্ধীর জন্য দেশভাগ হয়েছে"। যে কোনো অতি-সরল কথা তলিয়ে দেখাটা জরুরী। আজকাল আবার এ আলোচনাটা ফের গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এবং সে অভিযোগ হয়য় দুম করে উড়িয়ে দেওয়াটাও হঠকারী ব্যাপার হবে। কিন্তু আয়রনিগুলো স্পষ্ট করে বুঝতে গেলে এই বইয়ের জবাব নেই। সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের পাল্লায় পড়লে মুসলিমদের সর্বনাশ হবে, মোটের ওপর এই থিওরিতে ভর দিয়ে সফল হয়ছিলেন জিন্নাহ। দেশভাগের সব দোষ 'নেহরু গান্ধী'র বলে গলা ফাটানো যায় বটে, কিন্তু অলটারনেটিভগুলো ঠিক কী কী ছিল? একটা মুসলিম রাষ্ট্রের পাশাপাশি হিন্দু রাষ্ট্র? কিন্তু তা'তে কি জিন্নাহর আশঙ্কায় শিলমোহর পড়ত না? আর যারা সেকিউলার দেশ চেয়েছেন, তাঁরা নেহেরুর জায়গায় ঠিক কী কী অন্যভাবে করলে দেশের ও দশের বাড়তি উপকার হত? আমি আমার নড়বড়ে লেখায় গুলিয়ে দিয়ে থাকতে পারি, কিন্তু এ বইতে লেখক মজবুতভাবে এ'সব প্রশ্নের মোকাবিলা করেছেন এবং পাঠককে যত্ন করে গাইড করেছেন।

৪। এডউইনা ও ডিকি মাউন্টব্যাটেন ( এবং জহরলাল)। মশলা ব্যাপারটা লেখক এড়িয়ে যাননি বা যাওয়ার চেষ্টা করেননি। কিন্তু লজিক এবং কমনসেন্সকে জলাঞ্জলি না দেওয়ায় যে'টা হয়েছে সে'টা হল গসিপের বাইরে গিয়ে এদের তিনজনের সম্পর্কের প্লেটনিক দিকগুলো ফুটে উঠেছে; স্পষ্ট হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক ইকুয়েশনের পাশাপাশি এই সম্পর্কের অভিপ্রেত বা অনভিপ্রেত ফলাফলগুলো।
ডিকি মাউন্টব্যাটেনের যাবতীয় সাফল্য ও ব্যর্থতার নিয়ে বিস্তারিত ব্যালেন্সশিট সাজিয়ে বসেছেন লেখক; বিশেষত ভারতবর্ষের নিরিখে। সে ব্যালান্সশিট যেমন চিত্তাকর্ষক, তেমনই জটিল। তবে সে জটিলতার বর্ণনা দিতে গিয়ে পাঠককে ব্যতিব্যস্ত করে তোলেননি লেখক।
আর রয়েছেন এডউইনা। আমাদের দুর্ভাগ্য যে সে সময়ের রাজনৈতিক চরিত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম একজনকে আমরা শুধু গসিপের মাত্রায় চিনি। এডউইনার সেই রাজনৈতিক ভূমিকা সযত্নে খোলসা করেছেন লেখক। অবশ্য এ বইয়ের পরিসর থেকে এডউইনার প্রেম ও প্রেমিকরাও বাদ পড়েননি। নেহরু আর এডউইনার সম্পর্কটা ঠিক কীরকম ছিল? লেখক এ বইতে সমস্ত 'পাবলিক ফ্যাক্টস' সোজাসাপটা ভাবে সাজিয়েছেন; এবং আলোচনা করেছেন যুক্তি এবং কমনসেন্স দিয়ে যাতে ব্যাপারটা গসিপে-গুবলেট না হয়ে যায়। তাঁদের সম্পর্কের রাজনৈতিক প্রভাবগুলোকেও খতিয়ে দেখা হয়েছে।
সবচেয়ে বড় কথা, সমস্ত সস্তা মশলার লোভ কাটিয়ে, নেহরু, ডিকি ও এডউইনা; এই তিনজনের বন্ধুত্ব ও আভ্যন্তরীণ সম্পর্কের উষ্ণতাটুকুর ওপর ফোকাস করেছেন লেখক। এ জন্য সাধুবাদ প্রাপ্য তাঁর।

৫। মহম্মদ আলী জিন্নাহ। তাঁর আশঙ্কাগুলো, তাঁর পরিকল্পনাগুলো, নেহরুর সঙ্গে লড়া ডুয়েল এবং তাঁর মিইয়ে যাওয়া স্বপ্নগুলো। সে'গুলো ছুঁতে পেরেছেন লেখক। জিন্নাহর ব্যাপারে আরো বিশদে পড়ার ইচ্ছে তৈরি হয়েছে বৈকি।

এ'ছাড়া, প্রতি পরিচ্ছেদে রয়েছে অসংখ্য টানটান ঘটনা ও গল্পের উল্লেখ; যা পাঠককে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গ্রিপ করে রাখবেই।
মোটের ওপর, যাকে বলে; "স্ট্রংলি রেকমেন্ডেড"।

Wednesday, May 15, 2019

খচখচ


- কী বুঝছ ভাইটি?

- ছেলেপিলেরা দেখছি বড়ই উত্তেজিত।

- কিন্তু তোমার মুখ দেখে তো মনে হচ্ছে বেশ ফুর্তিতেই আছ।

- ব্যাজার মুখে থাকব কেন বলতে পারেন খুড়ো?

- তোমার মূর্তিফূর্তি এমন টেরিফিক লেভেলে ভাঙচুর করছে। সে'সব দেখে একটু নার্ভাস হবে না?

-  আদিঅনন্তকাল ধরে এই ভগবানবাজি করে করে আপনার সেন্স অফ হিউমরে মরচে পড়ে গেছে দেখছি।

- যাহ্, আমি আবার কী করলাম?

- ভ্যাপসা গরমে ছেলেপুলেগুলো ঘেমেনেয়ে নাস্তানাবুদ হয়ে পড়েছে। এ'দিকে আপনি বৃষ্টি চার্জ করার ব্যবস্থা না করে পিএনপিসি চালিয়ে যাচ্ছেন।

- বটে? মানুষ এমন গাম্বাটস্য গাম্বাট কাজ করে যাবে আর তুমি দোলনায় দুলে দুলে মাথার টিকি নাচিয়ে মজা দেখবে?

- এই যে বামিয়ানে সে'বার আপনার মূর্তিগুলো সাফ করে দিলে, আপনি এখানে বসে কোন ঘ্যাম কাজটা করেছেন শুনি?

- ঘ্যাম? আহ, ভাষাটাষা সামলে ভায়া। আর তাছাড়া আমি কবেকার পিস্, মূর্তিটূর্তির মায়া কবেই ত্যাগ করেছি। কিন্তু তোমরা হলে ইয়ং ঘোস্ট, বাঁদরদের বাঁদরামি তোমাদের স্পর্শ না করলে চলবে কেন?

- কী জানেন খুড়ো, বেঁচে থাকতে দেখেছি প্রতিটি সৎকাজে খোঁচা মারার লোকের অভাব হয়না। মোটাবুদ্ধি, মোটাচামড়া আর গবেটসুলভ আত্মবিশ্বাস;  এ'গুলোর রমরমা চিরদিনই একই রকম। আর মূর্তির মধ্যে যেহেতু আমার নার্ভাস সিস্টেম নেই; তাই তার গায়ে বিছুটি ঘষলে বা বোম মারলেও আর পরোয়া করিনা। তবে মনে ফুর্তি ঠিক নেই গো দাদা, মনের মধ্যে খচখচ তো সামান্য আছেই।

- আছে? খচখচ?

-  সত্যিই আছে। নয়ত রীতিমতো হরিতকী ফ্লেভারের পপকর্ণ আনিয়ে খেতাম৷

- তা খচখচানিটা ঠিক কী রকম নেচারের?

- বাঁদরেরা মূর্তি ভেঙে ভাববে রাজ্যজয় করলাম, তা'তে আর আশ্চর্য কী। কিন্তু ভদ্রসমাজের পেল্লায় থেকে পেল্লায়তর মূর্তি বানিয়ে 'কী দিলাম' গোছের বাতেলা দেওয়া যে কী হাড়-জ্বালানি ব্যাপার দাদা, কী বলব। ভয়ে সিঁটিয়ে আছি গো দাদা, এই বুঝি ভাঙা মূর্তির বদলে একটা ডাইনোসর সাইজের কিছু বানিয়ে ফেলবে। অথচ সে'টাকা দিয়ে...।

- যদির টাকা নদীতেই পড়বে হে। রিল্যাক্স।

Saturday, May 4, 2019

সাইক্লোন

সে এক দুর্দান্ত ঝড় আসবে। সেমি-প্রলয় গোছের কিছু। উড়ে বেড়াবে ডিশটিভির চাকতি, রাস্তায় উপড়ে পড়া গাছের ধাক্কায় তুবড়ে যাবে মারুতিভ্যানের ছাত। সে সাইক্লোন অবশ্য এখনও এসে পড়েনি। তবে সন্ধে থেকে একটানা লোডশেডিং, আর বাইরে বৃষ্টির তোড়ে ফ্যাকাসে হয়ে আসা রাতের অন্ধকার ।  খবরাখবর যে'টুকু তা জোড়া পেন্সিল ব্যাটারির ছোট রেডিওর মাধ্যমে। এ'দিকে মোবাইলের ব্যাটারি সাত পারসেন্টে নেমেছে; ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই নির্ঘাৎ স্যুইচ অফ।

অনুপ সামন্ত একটানা সাতখানা হাই তুলে বিছানায় গা এলিয়ে দিলেন।  কাহাতক ঠায় বসে থাকা যায়, মোমবাতির ঘোলাটে আলোয় একটানা বই পড়াও কষ্টকর। একা থাকার এই এক সমস্যা; 'জলের বোতলটা এগিয়ে দাও' গোছের কথা বলার কেউ নেই, 'দরজা জানালাগুলো চেপেচুপে বন্ধ করেছিস তো' বলে খোঁজখবর নেওয়া কেউ নেই।

মোমবাতিটা নেভানোর ঠিক আগে হাতঘড়িতে সময় দেখেছিলেন অনুপবাবু, রাত পৌনে একটা। আর আধ ঘণ্টার মাথায় সেই তুমুল সাইক্লোন শহরের বুকে আছড়ে পড়ার কথা; ইন্টারনেট স্যাটেলাইট ইত্যাদির যুগে আজকাল এ'সব খবর খুব একটা এ'দিক ও'দিক হয়না।

ঝড়ের রাতের অন্ধকারে একাকিত্ব ব্যাপারটা বেশ সহজেই গাঢ় হয়ে পড়ে বোধ হয়, আর তখন বড় মায়ের কথা মনে পড়ে। সামান্য তিন দিনের জ্বরে চলে গেল মা; এই গত বছর। ছেলের বিয়ে দেখে যাওয়ার বড় সাধ ছিল, হল না। কত কীই তো হয়না আর সেই না হওয়াগুলোই পোষা বেড়ালের মত চিরকাল পায়ে-পায়ে ঘুরবে।

মায়ের নরম শাড়ির ওম বড় মনে পড়ে, রাতে পাশ ঘেঁষে শুলে মা প্রায়ই গাইতেন "ভব-সাগর-তারণ-কারণ হে, রবি-নন্দন-বন্ধন-খণ্ডন হে"। মায়ের সে সুরে বুকে বাতাস বইত; ঝড়টড় নয়, ঝিরিঝিরি বৃষ্টির শেষে ছাতের টাবে রাখা নয়নতারার মাথা নুইয়ে দেওয়া মখমলি হাওয়া। সে সুরের জন্য বড় মন আনচান করে আজকাল। আর সে আনচান বাড়লেই ঘরের দক্ষিণ দিকের দেওয়ালে টাঙানো মায়ের ফ্রেম করা ছবিটার দিকে নিবিষ্টচিত্তে তাকিয়ে থাকেন ভদ্রলোক। আজও সে দেওয়াল তাক করে টর্চের আলো ফেললেন অনুপবাবু, সে আলোয় মায়ের মুখ যেন আরো উজ্জ্বল মনে হল। নাকের নীচের অংশটুকু ধরে বিচার করলে মায়ের সঙ্গে অনুপবাবুর মুখের হুবহু মিল।

বেঁচে থাকতে মা অবিশ্যি জ্বালাতনও কম করতেন না, বেশ বাতিকগ্রস্ত ছিলেন তিনি। অফিস থেকে বেরোনোর সময়  থাকত হাজার রকমের প্রশ্ন; মানিব্যাগ নিয়েছিস তো? টিফিনবক্সের সঙ্গে আলাদা একটা ছোট কৌটে অল্প খেজুর দিয়েছি, খেতে ভুলবি না তো? ফিরতে দেরী হলে আগাম ফোনে জানিয়ে রাখবি তো? দৌড়ে বাসে উঠবি না তো? এমন আরো খানকুড়ি প্রশ্ন, রোজ। আর এমন ঝড়ের রাতে না জানি মায়ের কাছে কত কৈফিয়ত দিতে হত; বারান্দার টবগুলো ভিতরে এনে রাখা হয়েছে কিনা, ছাতে কোনো কাপড় মেলা আছে কিনা, টিভি ফ্রিজের প্লাগ খোলা আছে কিনা; এমন হাজারো প্রশ্ন বারে বারে তেড়ে আসত অনুপবাবুর দিকে। আর সেই সব প্রশ্ন আর আকুতির অভাবটা অনুপবাবুর বুকে বড় বাজছিল, বাতাসের শোঁশোঁ শব্দ গলায় ঘুরপাক খাচ্ছিল যেন। অবিশ্যি ঝড় শুরু হয়নি এখনও, তবে 'এনিটাইম নাউ' পরিস্থিতি।

চমকে উঠতে হল খট করে বিশ্রী শব্দটা হওয়ায়, মায়ের ছবিটা দেওয়ালের পেরেক উপড়ে মেঝেয় পড়েছে, ছড়িয়ে পড়েছে কাচ। আড়মোড়া ভেঙে খাট ছেড়ে উঠলেন অনুপবাবু। মায়ের ছবিটা যত্ন করে তুলে পাশের টেবিলে রাখলেন। বড় কান্না পাচ্ছিল; এমনটা হয়, যাদের মা না থাকে; তাঁদের তো হয়ই।

তখনই খেয়াল পড়ল পাশের দেওয়ালের জানালাটা আধ-খোলা, বাতাসের শব্দে মালুম হচ্ছিল গতিবেগ বাড়ছে। ছুটে গিয়ে জানালাটা বন্ধ করলেন অনুপবাবু, আর সামান্য দেরী হলেই বিশ্রী কাণ্ড ঘটত।

**

গীতাদেবী স্বস্তি পেলেন।

খোকাটা আগের মতই বেখেয়ালি রয়ে গেল, হাজারবার এক কথা কানের কাছে ঘ্যানরঘ্যানর না করলে বাবুর কিছুতেই জরুরী কাজগুলো মনে থাকবে না। আগে তাও চিৎকার চ্যাঁচামেচি করে কাজ সেরে ফেলা যেত, এখন তার বদলে বিশ্রী সব কাণ্ড ঘটাতে হয়। এই যেমন আজ এই ঝড়ের রাতে জানালার খোলা পাল্লার দিকে খোকার নজর টানতে গিয়ে নিজের ছবির ফ্রেমটাকেই ভেঙে ফেলতে হল।

Wednesday, May 1, 2019

লুডো


- বাদাম দেব নাকি?

- নেব। নিলে একদান লুডো খেলবে?

- বিক্রি বন্ধ করে তোমার সঙ্গে লুডো খেলব বিল্টুবাবু?

- চার প্যাকেট বাদাম আর দু'প্যাকেট কাঠিভাজা কিনব। প্লাস এক প্যাকেট মিষ্টিবাদাম।

- টিউশনির টাকা মেরেছ?

- মেজমাসী যাওয়ার আগে গোপনে বখশিশ দিয়ে গেল, কড়কড়ে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট।

- বেশ। তবে একদান। আমি লাল হলুদ নেব।

- বসে পড়ো।

- টিউশনির ব্যাগে লুডোর বোর্ড আর ঘুটি নিয়ে ঘুরছ। বিকেলে একলা ঘাটের বেঞ্চিতে বসে। ব্যাপার কী বিল্টুবাবু?

- চাল দাও।

- সোজা ছক্কা। বাহ্। আচ্ছা, টিউশনি কামাই করেছ?

- তা'তে তোমার কী?

- মাধ্যমিকে ফেল করবে?

- ফার্স্ট ডিভিশন কেউ আটকাতে পারবে না।

- বিকেলে ঘাটে বসে লুডো না খেললে আরো দু'নম্বর বাড়ত।

- দু'প্যাকেট বাদাম না হয় বেশি নেব। ঘ্যানঘ্যান বন্ধ করবে?

- একশো টাকার খবরটা ভাঁওতা নয় তো?

- বুকপকেটে খসখস করছে। তাজা নোট। এই দ্যাখো।

-  বুকে না হয় একশো টাকার নোটের খসখস। গলায়?

- খেলতে হবে না তোমার লুডো। তোমার বিক্রির সময় নষ্ট করে এ'খানে বসতেও হবে না। এই সময় নদীর ধারে কত মানুষজন আসে। কত লোকে বাদাম কেনে। তুমি এসো'খন।

- টিউশনি?

- একটু দেরী হয়ে গেছে। তবে যাব।

***

- বাবা, এই অসময়ে অফিসে চলে এলে?

- এমনি আসিনি। সঙ্গে লুডোর বোর্ডও আছে। এই যে।

- কিন্তু বাবা, এখন আমি ব্যস্ত..। একটু জরুরী মিটিং আছে সন্ধেবেলা।

- টুক করে এক দান খেলে নেব। আমার লাল হলুদ।

- কিন্তু বাবা...।

- না হয় এখন ভালো চাকরী করো। তাই বলে বাৎসরিক ট্র‍্যাডিশনকে ল্যাং মারবে বিল্টুবাবু? 

- পাক্কা এক দান কিন্তু। কনফারেন্স রুমে চলো।

- ভাগ্যিস সে'দিন ঘাটের ধারের বেঞ্চিতে স্পট করেছিলাম।  নয়ত খামোখা মনখারাপে টিউশনে ফাঁকি পড়ত।

- সে এক ইতিহাস। কিন্তু বাবা, নিজের বাদাম বিক্রি বন্ধ করে লুডো খেলাটা ফাঁকিবাজি নয়?

- আমার মনখারাপটা মনখারাপ নয়?

- আজ আমার শুরুতেই ছক্কা।

- মেজমাসীর বখশিশটা সেই কবে থেকে আমার পাওনা।

- হেহে। বুক পকেটে কড়েকড়ে টাকার খসখস? শুনবে?

- আর গলায়?

- বাবা, এই দিনটা খুব খারাপ। তাই না?

- খুউব। ধুস, আমার আবারও পুট...তোমার মা এমন ধুপ করে চলে গেলো তার আগের বছর, বিল্টুবাবু। তবে আমি খুব চেষ্টা করেছিলাম।

- জানি বাবা। বারবার এ কথা বলো কেন?

- এ দিনেই সে চলে গেছিল। প্রতিবছর এ দিনটাতেই তাই..তাই বার বার বলতে ইচ্ছে করে..। আর তাই বছরের এ দিনটায় বাদাম-বিক্রি বন্ধ রাখলেও তা'তে ফাঁকি নেই..।

- বাবা, এই কনফারেন্স রুমে লুডো কী বেমানান। মেজাজটাই মাটি।  চলো ঘাটের বেঞ্চিতেই যাই, সে'খানে লুডো পেতে বসি।

- ও মা, তোর সন্ধেবেলার মিটিং?

- বছরের এ দিনটায় মিটিংয়ে ডুব দিলেও তা'তে ফাঁকি নেই..।

- তা'হলে চটপট!

- ঝটপট!

- আচ্ছা বিল্টুবাবু, ছোট্টবেলায় ঘাটের সেই বেঞ্চিতে তুমি মায়ের সঙ্গে প্রায়ই রাত্রে এসে বসতে। মা তোমায় জড়িয়ে কীর্তন গাইত। বিক্রিবাটা শেষে আমি পাশে এসে বসতাম..তুমি ঘুমিয়ে না পড়া পর্যন্ত মায়ের গান থামত না। আমি সেই সুরে দুলে দুলে পয়সাকড়ি গুনতাম। তারপর ঘুমন্ত বিল্টুবাবুকে কোলে নিয়ে বাবা-মা ঘরে ফিরত...তোমার মনে পড়ে? বিল্টুবাবু?

Saturday, April 27, 2019

ওয়ার্নবাবুর বই


ফিল নাইটের ব্যাপারে আগে তেমন কিছু জানতাম না, যতটুকু জেনেছি ও চিনেছি; সে'টা ভদ্রলোকের চমৎকার আত্মজীবনীটা পড়ে। সে তুলনায় শেন ওয়ার্ন স্বাভাবিক ভাবেই বেশ কিছুটা পরিচিত। এবং পরিচিত বলেই তেমন কেউ রেকমেন্ড না করলেও বইটা পড়ে ফেলার আগে বেশি ভাবতে হয়নি। ফিল নাইটের আত্মজীবনী খুব ভালো লেগেছিল কারণ নাইট নিজের কথা বলতে গিয়ে ফোকাস করেছেন তাঁর চারপাশের মানুষের ওপর; সে'সব মানুষের চরিত্র যত ফুটে উঠেছে, পাঠকের কাছে তত স্পষ্ট হয়েছে নাইটের জীবন। এ'দিকে ওয়ার্নের বায়োগ্রাফি জুড়ে ওয়ার্ন দ্য রকস্টার, ওয়ার্ন দ্য ফাইটার, ওয়ার্ন দ্য ট্র্যাজিক হিরো এবং সর্বোপরি ওয়ার্ন দ্য অজি। ওয়ার্নের ক্রিকেট জীবনের অন্যতম গোলমেলে অধ্যায় বুকির থেকে টাকা নেওয়ার ঘটনাটা। সে সম্বন্ধে ওয়ার্ন বেশ কিছু স্পষ্ট ইনফরমেশন দিয়েছেন বটে কিন্তু নিজের পক্ষে যে যুক্তিগুলো সাজিয়েছেন তা আমার অন্তত বেশ কাঁচা মনে হয়েছে। আর বই জুড়ে মাঝেমধ্যেই উঁকি মেরেছে তাঁর ধারালো নাক উঁচু মেজাজ; বিশেষত ড্যারিল কালিনান প্রসঙ্গে (অপ্রাসঙ্গিক ভাবেও তাঁকে কম খোঁচা মারেননি ওয়ার্ন)।

তবুও, এই বই আমি এক নিঃশ্বাসে পড়ে শেষ করেছি এবং সবচেয়ে বড় কথা; স্বীকার করে নিয়েছি যে সাদায় কালোয় শেন ওয়ার্নদের বিচার করা মুশকিল। ভদ্রলোকের ঘ্যামকে কুর্নিশ না করে থাকা যায় না; খানিকটা ভক্তই হয়ে গেলাম বোধ হয়। এ বইকে 'মাস্ট রীড' (আমার মনে হয়েছে) কেন?

১। স্পিন বোলিংয়ের শিল্প নিয়ে ওয়ার্ন কথা বলতে শুরু করলে মনে হয় দুনিয়ার বাকি সব কিছু মুছে যাক; শুধু এ'টুকুই টিকে থাকুক। যে প্যাশন আর কঠোর মনঃসংযোগের গল্প শেন এ বইতে শুনিয়েছেন তা'তে চমৎকৃত হতেই হবে। উনি যখন স্পিন বোলিংয়ের টেকনিক নিয়ে আলোচনা করেছেন; আঙুল এবং হাতের তালুর পজিশনের কথা বলেছেন বা নিজের রান-আপ বিশ্লেষণ করেছেন; তখন ক্রিকেট-গবেট হয়েও আমার মনে হয়েছে হাতের কাছে একটা ক্রিকেট বল থাকলে একটু ফ্লাইট দেওয়ার চেষ্টাচরিত্র করে দেখা যেত। তাঁর স্পিন-কাহিনীকে অন্য স্তরে নিয়ে গিয়ে আলোচনা করেছেন ওয়ার্ন যখন তিনি স্পিন বোলিংয়ের মনস্তত্ত্ব নিয়ে কথা বলেছেন। লালমোহন হলে স্বীকার করতেন; "থ্রিলিং ব্যাপার মশাই"। স্পিন বোলিং স্রেফ প্রতি বলে উইকেট পাওয়ার মরিয়া চেষ্টা নয়, বিভিন্নভাবে একজন ব্যাটসম্যানকে প্রস্তুত করতে হয়, এবং তারপর নিকেশ করতে হয় মোক্ষম চালে। বেয়নেটে ফালাফালা করে দেওয়ার গল্প স্পিন নয়, বরং নাকে নাক ঠেকিয়ে আদর করতে করতে একটা ধারালো ছুরি এমনভাবে গলায় ছুঁইয়ে দিতে হবে যেন কেউ গলায় পালক বুলিয়ে দিল; আর অমনি ঝরে পড়বে তাজা গরম রক্ত।

২। ইংলিশ ক্রিকেট কালচার। লক্ষ্মণের আত্মজীবনীতেও প্রসঙ্গক্রমে উঠে এসেছে সাহেবদের নিখাদ ক্রিকেট ভালোবাসার কথা আর সে ভালোবাসা থেকে তাঁদের ঘরোয়া ক্রিকেটও বঞ্চিত নয়। লক্ষ্মণের মতই তরুণ শেনও ক্রিকেটের গভীরে প্রবেশ করেন ইংল্যান্ডেই। আর অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ানদের খেলাধুলোর প্রতি ভালোবাসা, তাঁদের অধ্যবসায়। অজিরা একবগগা, ব্রিটিশরা নাকউঁচু; এ'সব জেনারালাইজেশনের মধ্যে যুক্তি খুঁজে লাভ নেই, তবে তাঁদের ক্রীড়া সংস্কৃতির সামনে আমাদের মাথা নুইয়ে দাঁড়াতেই হবে।  খেলা সাহেবদের কাছে ছেলেখেলার ব্যাপার নয়; ওয়ার্নের বইতে সেই কালচারের বিভিন্ন ভাবে আলোচিত হয়েছে। 

৩। বিভিন্ন ম্যাচ সিচুয়েশন ওয়ার্ন যে'ভাবে বর্ণনা করেছেন তা লাজওয়াব। এ ক্ষেত্রে অনেকটা প্রশংসা প্রাপ্য আমার প্রিয় ধারাভাষ্যকার মার্ক নিকোলাসের যিনি ওয়ার্নের হয়ে এই বই লিখেছেন। তবে এই বই যে মার্ক নিকোলাসের ভাষার খেল নয়, আগাগোড়াই ওয়ার্নের; তা স্পষ্ট। গ্যাটিং  বল থেকে সাতশো নম্বর উইকেট; শেনের পিওভি থেকে স্পষ্ট দেখা যায় পিচের রঙ, অনুভব করা যায় ঘাম, উত্তেজনা আর কপালে উড়ে আসা চুল।

৪। ওয়ার্নের ক্রিকেট মস্তিষ্ক আর তাঁর যাবতীয় মাইন্ড-গেম; স্রেফ এ'টুকু নিয়েই একটা নেটফ্লিক্স সিরিজ হতে পারে বোধ হয়। "দ্য বেস্ট ক্যাপ্টেন দ্যাট অস্ট্রেলিয়া নেভার হ্যাড"। সেই ক্যাপ্টেনকে একটানা বেশ কিছু বছর পেয়েছিল হ্যাম্পশায়ার আর কিছুদিনের জন্য রাজস্থান রয়্যালস। ক্যাপ্টেন ওয়ার্ন বলেছেন টীম তৈরির গল্প, বিপক্ষের মাথার মধ্যে ঢুকে সিঁদ কাটার গল্প। টোটকা দিয়ে বুঝিয়েছেন কেভিন পিটারসনের মত ম্যাভেরিককে বা ব্র্যাডম্যান-কাইফকে (হেহ্‌) কী ভাবে সামলাতে হবে। অধিনায়কত্ব প্রসঙ্গে বলা দরকার; সৌরভ সম্বন্ধে ওয়ার্ন যা বলেছেন তা দাদা-ভক্তদের যে 'থ্রিলিং' লাগবেই সে সম্বন্ধে আমি নিশ্চিত।

৫। অস্ট্রেলিয়ান টীমের গালগল্প আর টানাপোড়েনের কথা যে'ভাবে বলা হয়েছে তা নিঃসন্দেহে 'গ্রিপিং'। ওয়ার্ন বেশ চাঁচাছোলা ভাবে সব কিছু বলে যেতে পারেন,কাজেই স্টিভ, বুকানন বা গিলক্রিস্টের সঙ্গে তাঁর মনমালিন্যের গল্পগুলো বেশ 'ছাল ছাড়ানো নুন মাখানো' লেভেলের। বিশেষত বুকাননের সঙ্গে তাঁর গুঁতোগুঁতির ঘটনাগুলো ওয়ার্ন যে'ভাবে বলেছেন তা অত্যন্ত উপভোগ্য (বুকাননের কর্পোরেট ট্রেনিং মডিউলগুলো ওয়ার্ন যে'ভাবে ছারখার করতেন, তা খানিকটা কমিকও বটে)। স্টিভ ও'র  সঙ্গে ওয়ার্নের মতানৈক্য সোজাসুজি দুই ধরণের জীবনধারার সংঘাত। ওয়ার্ন টিম অস্ট্রেলিয়ার প্রতি যে অনুগত ছিলে তা নিয়ে সন্দেহের বিশেষ কারণ নেই কিন্তু স্টিভ-গিলিদের ব্যাগি-গ্রিন স্তুতি বা 'ডিফাইনড স্কোপ অফ প্যাট্রিওটিজম' কে পাত্তা দেওয়ার বান্দা ওয়ার্ন ছিলেন না। আর পাত্তা দিলে তিনি আর যাই হোক ওয়ার্ন হতে পারতেন না। ইয়ে, খেলার বাইরে গিয়ে শচীন সম্বন্ধেও দু'চারটে কটু কথা শেনদাদাকে বলতে হয়েছে; কী এবং কেন সে'টা বললে স্পয়লার দেওয়ার হয়ে যাবে।

৬। জিনিয়াস হয়ে ওঠার 'প্রসেস' আর ট্র্যাজিক পরিণতিগুলো নিয়ে বেশ খোলতাই ভাবে কথা বলেছেন ওয়ার্ন। এই গোটা বইয়ে ওয়ার্নের সুর ভীষণ সোজাসাপটা। কিছুক্ষেত্রে আগ বাড়িয়ে ডিফেন্স  করেছেন বটে, তবে বইয়ের ফ্লো নষ্ট হয়নি তা'তে। ওয়ার্ন যে ওয়ার্ন হয়েই ফুটে উঠেছেন; সে'টাই এই বইয়ের সার্থকতা।

এই হাফ-ডজন কারণে ভর দিয়েই আবারও বলব; আমার এ বই পড়ে মনে হয়েছে "বাহ্‌, দুর্দান্ত"।