Sunday, February 10, 2019

সিরিয়ার গল্পগুলো


দেশের এবং দশের ইতিহাস বলতে গেলে স্বাভাবিক ভাবেই এসে পড়বে সমষ্টিগত চাওয়া, পাওয়া এবং হারানোর গল্প। সে'খানে নেতৃস্থানীয় মানুষদের (তা রাজনৈতিক হোক বা অরাজনৈতিক, সামরিক হোক বা অসামরিক, ভালোর দলে হোক বা মন্দের) কথাও অবশ্যই বলতে হবে। কিন্তু ইতিহাসের গল্পে সচরাচর ঢেউয়ে ভেসে যাওয়া সাধারণ মানুষের পার্স্পেক্টিভ উঠে আসে না। বা কখনও উঠে এলেও তা স্রেফ অলঙ্কার হয়েই থাকে; শুধুই সে সব গড়পড়তা মানুষের অভিজ্ঞতায় ভর দিয়ে ইতিহাস রচনা করা চলে না। এ'টা কোনো ক্ষোভ থেকে বলা নয়, বরং এ'টাই বাস্তব। স্বাধীন ভারতবর্ষের ইতিহাস লিখতে গেলে যেমন আমাদের ফোকাস পড়তেই পারে ১৯৪৮য়ের তিরিশে জানুয়ারির ওপর। আর সেই দিনটার ব্যাপারে দরকারি কিছু লিখতে হলে স্বাভাবিক ভাবেই আমি জানতে চাইব সে'দিন সকালটা মোহনদাস কী ভাবে কাটিয়েছিলেন বা গডসে কী ভাবছিলেন বা দেশভাগের আগুন রাজনীতিতে ছড়িয়ে পড়া নিয়ে বিশেষজ্ঞরা কী ভাবছিলেন। কিন্তু সেই ১৯৪৮য়ের তিরিশে জানুয়ারি বুঝতে গিয়ে কি আমি সে'দিনটা একজন করোলবাগের ফলবিক্রেতার জন্য কেমন কেটেছিল; সে'টা জানতে চাইব? বা নবদ্বীপের এক মুদীখানার মালিক সে'দিন বিকেলে কী করেছিলেন; তা জানতে পারলে আমার ইতিহাস-বোধ কতটা পূর্ণতা লাভ করবে? আমার ধারণা ছিল সে সব অভিজ্ঞতা সাহিত্যে রস যোগাতে পারলেও তা দিয়ে ইতিহাসকে যথাযথ ভাবে চেনা সম্ভব নয়।

কিন্তু তার পাশাপাশি প্রায়ই মনে হয়েছে সাধারণ মানুষের জবানিতে যদি ইতিহাস পালটে যাওয়ার গল্প শুনি; কেমন লাগবে? তেমন কিছু লেখা অবশ্যই পড়েছি দেশভাগ বা নাৎসি অত্যাচারের মর্মান্তিক অধ্যায় নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে; তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এর সঙ্গে যোগ করতে হয়েছে ঐতিহাসিকের ন্যারেশন ও কমেন্ট্রি। কোনো রকম ন্যারেশন ছাড়া, শুধু মাত্র সাধারণ নাগরিকদের দৈনন্দিন দিনলিপি থেকে অসাধারণ নির্জাসটুকু তুলে নিয়ে; এই বই যে নিষ্ঠার সঙ্গে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরেছে তা এক কথায় অনবদ্য।  আর আটপৌরে অভিজ্ঞতাগুলো এক সুতোয় সঠিক প্যাটার্নে গাঁথতে পারলে; স্বৈরাচার, বিপ্লব, ব্যর্থতা ও মানুষের যন্ত্রণার গল্পগুলো আপনা থেকেই সাহিত্যগুণে ভরপুর হয়ে ওঠে।

এখন মনে হচ্ছে; ল্যাপিয়ারের ফ্রীডম অ্যাট মিডনাইট যদি লেখকের ন্যারেশন ছাড়া; দিল্লীর কোনো খেটে খাওয়া চা-ওলা, পুরুলিয়ার কোনো দরিদ্র চাষি, ভাগলপুরের কোনো সৎ স্কুলমাস্টার,  করাচীর কোনো সরল সাহিত্যিক, মুম্বইয়ের কোনো ব্যর্থ থিয়েটার শিল্পী আর শ্রীনগরের কোনো ট্রাকড্রাইভারের অভিজ্ঞিতা জড়ো করে লেখা হত? তা'তে ইতিহাসের ব্যঞ্জনা সঠিক ভাবে ফুটিয়ে তোলা যেত?

এই বই পেরেছে। চমৎকার ভাবেই পেরেছে। এবং এমন ভাবে তুলে ধরেছে যে মনে হয়েছে সিরিয়া দেশটা বোধ হয় খুব দূরে নয়; সে মানুষগুলোও বোধ অনতিদূরেই জটলা বেঁধে বসে; তাঁদের অভিজ্ঞতা শুনে আমাদের শিউরে ওঠাটা শীতের ছাতে খালি গায়ে হেঁটে আসার মতই রীতিমত স্বাভাবিক। মা, ছেলে, মেয়ে, বাবা, শিক্ষক, ছাত্র, চাকুরে, বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী ; কত মানুষকে নিজেদের ঘর এবং সর্বস্ব ভাসিয়ে দিয়ে বেরিয়ে পড়তে হয়েছে। তাঁরা সিরিয়া ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছেন স্রেফ বেঁচে থাকার দুঃসাহসী স্বপ্ন নিয়ে; আর তাঁদের অভিজ্ঞতা পর পর সাজিয়ে লেখিকা বলেছেন আসাদ এবং তাঁর বাথপার্টির অত্যাচার, সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ,  বিপ্লবের বিশ্বাসঘাতকতা এবং সমস্ত হারানো মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্নের গল্প।

বইয়ে লেখা ঘটনাগুলো এখানে লেখার মনে হয়না। মানুষ নিজের যন্ত্রণা নিজে যে কোনো সাহিত্যিকের থেকে ভালো ভাবে বলতে পারবেন সে'টাই স্বাভাবিক আর সেই অভিজ্ঞতার থেকে প্যাটার্ন খুঁজে ইতিহাস চিনে নিতে পারার মধ্যেই বোধ হয় সার্থকতা।  আমাদের স্কুলের ইতিহাস বইগুলো যদি এমন হত কী ভালোই না লাগত পড়তে।

দু'টো ব্যাপার নিয়ে এ বই বেশ ভাবিয়েছে।

এক, কথায় কথায় অমুক রাজনৈতিক দল আইসিসের মত বা অমুক নেতা অবিকল হিটলার বা আমাদের স্বাধীনতা বলে কিস্যু নেই; এমন কথা বলার আগে বত্রিশ বার ভেবে নেওয়া উচিৎ। সিরিয়া বা সুদান বা হলোকস্টের রোষে পড়া মানুষগুলো যে পরিমাণে স্বৈরাচার ও অত্যাচার সহ্য করেছে/ করে চলেছেন; তার তুলনায় আমরা রীতিমত স্বর্গে বাস করছি। ফস্ করে নিজেদের সঙ্গে তাঁদের তুলনা টেনে বসাটা সেই মানুষদের জীবন সংগ্রামের প্রতি অবজ্ঞা ছাড়া কিছুই নয়।

দুই, যারা সরকারে রয়েছেন, ক্ষমতা যাদের হাতে; তাঁদের চাঁচাছোলা নিন্দে করে যেতেই হবে। একটানা, অক্লান্তভাবে।  তাঁদের ব্যাপারে গদগদ হয়ে পড়ার কোনো মানেই হয়না। আমাজনের কাস্টোমার কেয়ারের থেকে নিজের পাওনাগণ্ডা বুঝে নেওয়ার ব্যাপারে আমরা যতটা ক্ষুরধার,  তার কয়েক হাজারগুণ বেশি খুঁতখুঁতে হতে হবে নিজেদের প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী,  এমপি ও এমএলএ-দের ব্যাপারে। নিজেদের কোনো এক নেতায় বা মতবাদে (বা তার বিরোধিতায়)চোখ বুজে সঁপে দেওয়া মানেই দেশকে ভাসিয়ে দেওয়ার রাস্তা প্রশস্ত করা।

ইন অর্ডার টু লিভ


পৃথিবীটা সত্যিই ছোট।

কিছুদিন আগেই পড়েছিলাম সুদানের লোপেজ লোমংয়ের দুর্ধর্ষ লড়াইয়ের কথা। অকথ্য অত্যাচারের কবল থেকে কোনোক্রমে পালিয়ে বেঁচেছিলেন; গিয়ে পড়েছিলেন কিনিয়ার উদ্বাস্তু শিবিরের ভয়াবহ অভাব ও চরম অব্যবস্থায়। তবে সমস্ত বাধাবিঘ্ন জয় করে ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছিলেন লোপেজ; নতুন দেশ খুঁজে পেয়েছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, সে'খানে নিজেকে নতুন ভাবে গড়ে তুলেছিলেন।তিনি। লোপেজের জীবনের উজ্জ্বলতম অধ্যায়  ২০০৮য়ের চীন অলিম্পিক; যে'খানে আমেরিকার পতাকাবাহক ছিলেন তিনি। আর ঠিক সেই অলিম্পিকের সময়ই চীনের সরকার সচেষ্ট হয়ে উঠেছিল সে দেশের নারী-ব্যবসা রুখতে। যে ব্যবসার মূলে ছিল উত্তর কোরিয়া থেকে পালিয়ে আসা উদ্বাস্তু মেয়েরা, যারা আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল বাঁচতে। সে মেয়েদের তখন ডাঙায় বাঘ আর জলে কুমির অবস্থা; হয় কুচক্রে পেষাই হওয়া আর নয়তো চীনে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে উত্তর কোরিয়ায় ফেরত যাওয়া যা নিশ্চিত মৃত্যুর সামিল। সেই সব দুর্ভাগা মেয়েদের একজন য়েওনমি পার্ক। যে অলিম্পিক লোপেজের জীবনে এনে দিয়েছিল আলোর স্পর্শ, সে সময়টার অন্ধকারেই হারিয়ে যাওয়ার কথা ছিল য়েওনমির।

য়েওনমির জন্ম ১৯৯৩ সালে, আমার চেয়ে কত ছোট। অথচ  যে বয়সে আমি সঠিক ভাবে গুলতানিও আয়ত্ত করতে পারেনি; সে বয়সে সে দেখেছে কী ভাবে তাকে বাঁচাতে তার মা নিজেকে সঁপে দিয়েছেন ধর্ষকদের হাতে। ২০০৮য়ে আমি চাকরী পেয়েছি; বিহারের ছোট্ট শহরে যেতে হবে বলে বেশ গাঁইগুঁই করছি।  আর ঠিক সেই সময় পনেরো বছরের য়েওনমি শিখেছে নিজেকে বারবার বিক্রি করে কী'ভাবে নিজের পরিবারের মানুষগুলোকে টিকিয়ে রাখা যায়। য়েওনমি একা নয়, সবচেয়ে বড় কথা; উত্তর কোরিয়ার বন্দীদশা থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসা বেশিরভাগ মানুষের কপাল য়েওনমির চেয়েও বহুগুণ মন্দ।

উত্তর কোরিয়া নিয়ে ইন্টারনেটে প্রচুর প্রতিবেদন পড়েছি আগে, কিন্তু এ বইয়ে বর্ণিত ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে সে'সবের তুলনা চলেনা। প্রোপাগান্ডার চশমা চোখে জন্মানো যে ঠিক কতটা দুর্বিষহ,  তা এ বই না পড়লে বোধ হয় কল্পনা করাও অসম্ভব।  আর 'আমার দেশই সেরা'; এই মহামন্ত্র বোধ হয় এলএসডির মত গোলমেলে। উত্তর কোরিয়ায় ছেলেমেয়েরা যোগ বিয়োগ শেখে রামের দু'টো আপেলের সঙ্গে শ্যামের তিনটে আপেল জুড়ে নয়। তারা শেখে যদি আজ তুমি তিনজন 'আমেরিকান বাস্টার্ড' কোতল কর আর আগামীকাল চারজন; তা'হলে ক'জন নিকেশ হল? ঈশ্বরে অবিশ্বাস ছাপিয়ে তারা তৈরি করেছেন সুপার-ঈশ্বর যিনি অবলীলায় হাজারে হাজারে বই লিখে ফেলেন বা যার অঙ্গুলি হেলনে আকাশের মেঘ সাফ হয়ে যায়। সেই সুপার-ঈশ্বরের প্রতি অভিবাদনে উচ্ছাসের পরিমাণ যদি সামান্যও কম হয়, তো সোজা কনসেনট্রেশান ক্যাম্প। ঘরে ঘরে সরকারি রেডিও যা বন্ধ করা যাবে না, আর সে রেডিওতে একটাই চ্যানেল; ঈশ্বরপুত্রের। যৌথখামারের খুড়োর কলের আড়ালে ভেঙেচুরে যাওয়া পাবলিক ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম। গোটা অর্থনীতি দাঁড়িয়ে ঘুষ, কালোবাজারের ওপর। 

হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা হওয়ার কথা, কিন্তু ডাক্তাররা মাইনেটাইনে তেমন পাননা; তাঁদের ঘুষ না দিলে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু। শিক্ষক, পুলিশ; ঘুষ ছাড়া কোথাও দু'পা এগোনোর  উপায় নেই। আর ডায়ে বাঁয়ে সামান্য ভুলচুক হলেই অজস্র চোখ কান রয়েছে 'পার্টি অফিসে' খবর পৌঁছে দেওয়ার জন্য। এবং যে কোনো ভেঙেচুরে পড়া দেশের মানুষের মূল যন্ত্রণার নাম খিদে। খুনে তরবারির মত ঠাণ্ডা নিরেট খিদে। সে খিদের তাড়না থেকে বাঁচতে য়েওনমিরা পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছিল।

এই বইয়ের তিনটে মূলভাগ। প্রথম, উত্তর কোরিয়ার বন্দীদশায় য়েওনমির বড় হয়ে ওঠা। দ্বিতীয়,  চীনে য়েওনমির সংগ্রাম এবং ছিন্নভিন্ন হওয়া। তৃতীয়,  চীন থেকে মঙ্গোলিয়া হয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় পৌঁছনো; মুক্তি ও আলো। আর য়েওনমির বইতে একটা জিনিস স্পষ্ট; অসহনীয় উদ্বাস্তু জীবনেও নীলকণ্ঠ হওয়ার দায় কাঁধে নিতে হয় নারীদেরই।

আশ্চর্য প্রদীপ


বিপিন সান্যাল একটা দেশলাই কাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে দাঁতের ফাঁক থেকে মৌরির কণা বের করার চেষ্টা করছিলেন। চোখ বুজে, গা এলিয়ে; যতটা মন দিয়ে করা সম্ভব আর কী। মানকরের মত ছোট্ট শহর হলে যা হয় আর কী; দুপুরের সময়টা দোকানে খদ্দেরদের আসা-যাওয়া তেমন থাকে না, ক্যাশকাউন্টারে বসে একটু গা এলিয়ে নেওয়ার এ'টাই প্রশস্ত সময়। দাঁত খোঁচানোয় বিঘ্ন ঘটল 'আপনিই বিপিনবাবু? এই সান্যাল মেটাল ট্রেডার্সের মালিক?" ডাকে।

জলদগম্ভীর পুরুষকণ্ঠ। নাম ধরে ডেকেছে কাজেই খদ্দের সম্ভবত নয়। বিপিনবাবু চোখ মেলতে দেখলেন গেরুয়া আলখাল্লা পরা একজন মাঝবয়সী ভদ্রলোক, দাড়িগোঁফে মুখ ঢাকা। সন্ন্যাসী গোছের কেউ, তবে ভিখিরি নিশ্চয়ই নয়; বাঁ হাতের কবজিতে যে ঘড়ি তার ব্যান্ড দেখে মনে হয় বেশ দামী।

- আপনিই বিপিনবাবু?

- আমিই। কী ব্যাপার?

- আজ্ঞে আমার নাম স্বরূপানন্দ।আমি জসিডি থেকে আসছি।

- জসিডি থেকে এসেছেন আমার সঙ্গে দেখা করতে?

- আজ্ঞে হ্যাঁ। বসতে পারি?

- বসুন। তা, আমার এই লোহালক্কড়ের দোকানে কী মনে করে স্বরূপানন্দজী?

- হ্যাঁ, সোজা সে ব্যাপারটা নিয়েই বলি। গত পরশু জসিডি থেকে এক ট্রাক লোহালক্কড়  আপনার কাছে এসে পৌঁছয়।

- লোহালক্কড় বলতে স্ক্র‍্যাপ। ও'টাই আমার ব্যবসা। ঝাড়খণ্ডে আমার এজেন্ট দীনদয়াল, সেই ও'সব সংগ্রহ করে পাঠিয়েছে।

- জানি। খুলে বলি, সেই সব লোহার মধ্যে একটা পেতলের প্রদীপ এসে পড়েছে।

- গতকাল মালপত্তর ঝাড়াইবাছাইয়ের সময় পেতলের কিছু জিনিসপাতি পাওয়া গেছে বটে, একটা প্রদীপও ছিল হয়ত। কিন্তু সে ভাঙাচোরা পুরনো সব মাল। তার জন্য আপনি অদ্দূর থেকে..।

- ও প্রদীপ আমার দরকার। খুব জরুরী। আমি উপযুক্ত দাম দিতেও রাজী আছি...।

- আমার গুদামের এক কোণে পড়ে আছে হয়ত..কিন্তু ফালতু জিনিস মশাই। তাছাড়া ছোটেলালটাকে দেখছি না কাল বিকেল থেকে। সে না থাকলে গুদামে কিছু খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

- ছোটেলাল?

- ওই, আমার ফাইফরমাশ খাটে। আর গুদাম সামলায়। ছোকরা কাজেকর্মে ভালো, শুধু একটু নেশাভাং করে। অবিশ্যি ভালো বাউল গানও গায়, শুনলে আপনার মনপ্রাণ ভরে যাবেই। কপাল বুঝলেন, কপালের ফের। নইলে কি আর শিল্পী মানুষকে লোহার স্ক্র‍্যাপের গুদামে কাজ করে দিন কাটাতে হয়? যাক গে,  কাল বিকেল থেকে যে কোথায় গায়েব হল। আর সে না থাকলে ওই ছোট্ট প্রদীপ খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

- আমি বোধ হয় জানি ছোটেলাল কোথায়। চলুন আপনার গোডাউনে। সময় নষ্ট করা যাবে না।

- আমার দোকান। আমার দোকানের গুদাম। আপনি বলার কে?

- দোকানঘর আর গুদাম থাকবে বটে, কিন্তু দোকানের মালপত্র আর লোকজন, সবই গায়েব হয়ে যাবে বিপিনবাবু। সময় নষ্ট করবেন না। ছোটেলালের ভরসা না করে আমায় নিয়ে চলুন, এখুনি।

- অ্যাই আপনি কি ভণ্ড সাধু নাকি? কী ভেবেছেনটা কী? আমার দোকানে এসে আমায় বিঁধবেন?  ছোটেলাল না ফিরলে গুদাম খোলা হবে না।

- আমার ধারণা ছোটেলাল আর ফিরবে না। প্রদীপ একবার কাউকে গিলে ফেললে আর তার নিস্তার নেই। মানুষ জিনিসপত্র জন্তুজানোয়ার; কিছুতেই সে প্রদীপের অরুচি নেই। পারলে গোটা দুনিয়াটাই...। একমাত্র আমিই পারি তাকে আটকাতে...।

***

স্বরূপানন্দকে নিয়ে গুদামে পৌঁছে বিপিনবাবুর ভির্মি খাওয়ার যোগাড় হল, গোটা গুদামঘর ফাঁকা। এক কণা লোহাও কোথাও নেই। শুধু এক কোণে পড়ে আছে পুরনো তোবড়ানো প্রদীপখানা; তার গায়ে বাহারী নক্সা। আর প্রদীপের কাছেই যে কালো সুতোয় ঝোলানো মাদুলিটা পড়ে আছে, সে'টা যে ছোটেলালেরই তা বিলক্ষণ জানেন বিপিনবাবু। বিপিনবাবুকে দূরে দাঁড় করিয়ে প্রদীপের দিকে হেঁটে গেলেন স্বরূপানন্দ।

**

- কী ব্যাপার ভায়া আলাদীন,  আজ এত সকাল সকাল তলব?

- জিনি, আমার জন্য যথেষ্ট পরিমাণে লোহা জোগাড় করতে পারবে? শ্বশুরমশাইয়ের একটা মূর্তি বানাবো, কিন্তু এ দেশে লোহার যে বড় অভাব। এ'দিকে তাঁকে প্রজারা লৌহপুরুষ বলে সেলাম করত কিনা, তাই জেসমিনের বড় ইচ্ছে।

- জেসমিন বৌদিকে বলো আমি লোহা জোগাড় করে মূর্তি বানিয়ে এনে দিচ্ছি, চটপট। আর কোনো হুকুম?

- হুকুম না, তবে আমার বড় শখ হে জিনি...।

- আপনার শখ? আদেশ করুন।

- আমার বড় ইচ্ছে, নতুন দেশের নতুন ভাষার নতুন ধরনের সুরের গান শুনব। বড় ইচ্ছে।

- বেশ। তেমন একজন গায়ক এনে হাজির করছি। আপনার প্রাসাদেই সে থাকবে আর আপনার ইচ্ছেমত গান শোনাবে, অন্য দেশের অন্য ভাষার অন্য সময়ের গান। কেমন?

- বাহ্! আচ্ছা ভাই জিনি, যখন যা চাই, যাকে চাই; তা তুমি ও প্রদীপের মধ্যে থেকে বের করে আনো কী করে?

- ও'সব গোপন কথায় কাজ কী ভাই আলাদীন? তুমি একটু অপেক্ষা করো, আমি চট করে লোহা আর গায়ক নিয়ে আসি।


Saturday, February 9, 2019

নিউজ চ্যানেল



- খোকা! স্যাট স্যাট করে টিভির সামনে এসে না পড়লেই নয়?

- আহ! টিভি না পেরিয়ে ফ্রিজ পর্যন্ত পৌঁছব কী করে? আর ফ্রিজেই তো ছানার জিলিপির বাক্স।

- ছানার জিলিপি? দেশ গোল্লায় যাচ্ছে আর উনি ছানার জিলিপির জন্য আমার কনসেন্ট্রেশনে ফিনাইল ঢালছেন।

- দেখছ তো নিউজ চ্যানেল, তার আবার কনসেন্ট্রেশন কীসে।

- দেশের পলিটিকাল ক্রাইসিস সম্বন্ধে খবর রাখার প্রয়োজন বোধ করিস?

- ক্রাইসিস? ও তোমার এই খবরের চ্যানেলগুলোর বাড়াবাড়ি।

- বাড়াবাড়ি? বটে? অ্যাডাম স্মিথ সামান্য দু'পাতা উলটে দেখলে বুঝতিস। দেশের পলিটিকাল হিস্ট্রি একটু দরদ দিয়ে পড়লে টের পেতিস যে কী ভোলাটাইল সিচুয়েশনে আমরা বাস করছি। য়ুরোপের ইতিহাস ঘেঁটে দেখলেই জানতে পারবি যে...।

- মাইরি বাবা। দেখছ তো নিউজচ্যানেলের গাঁজা চিৎকার চ্যাঁচামেচি, এ'দিকে কোট করবে মার্ক্স স্মিথ অরবিন্দ। এক পিস জিলিপি খাবে?

- একটা গোটা জেনারেশন নেরোর মত জিলিপির বেহালা হাতে সং সেজে দাঁড়িয়ে আছে। তোদের দেখে খুব চিন্তা হয় রে খোকা।

- দু'টো জিলিপিই পড়ে আছে বোধ হয়।

- ফের জিলিপি? এ'দিকে দেশের মধ্যে ক্রাইসিস...ফের যদি টিভির সামনে এসেছিস...।

- এর চেয়ে সিরিয়াল দেখো বাবা, কানে ও মনে পলিউশন কমবে।

- পলিটিকাল ডিবেট শোনা মানে মনকে পলিউট করা?

- আলবাত! এ'গুলো ডিবেট কই, এ তো ইটপাটকেল ছুঁড়ছে।

- শোন, এ'সব টিভি ডিবেটের দুধে জল মিশবেই...আমাদের কাজ হচ্ছে জল সাইড করে দুধটুকু সাবাড় করা।

- জল বাদ দিয়ে দুধ?

- ইয়েস।  আর তার জন্য লাগে অ্যাওয়ারনেস, দরকার পড়াশোনা। শুধু নেটফ্লিক্স নেটফ্লিক্স করে বাঁদুরর লাফ লাফালে কাঁচকলা হবে।

- বটে? তা গত দু'ঘণ্টা ধরে যে দ্রাবিড়ের কনসেন্ট্রেশনে এ'সব নিউজ চ্যানেলের ডিবেট শুনলে, তা'তে তুমি জল বাদ দিয়ে কোন জ্ঞান গ্রিপ করেছ? কী'ভাবে এনরিচড হয়েছ?

- রীতিমতো এনরিচড হয়েছি।

- রিয়েলি?

- হান্ড্রেড পার্সেন্ট।

- বেশ, বলো তা'হলে এই চিৎকার আর গোলমাল থেকে তুমি কী জ্ঞানলাভ করেছ।

- তোকে বলতে যাব কেন?

- বলবে নাই বা কেন?

- শোন তবে, এতক্ষণে কী বুঝেছি।

- বলো। শুনি। কী বুঝেছ।

- আমি বুঝেছি যে শেষ ছানার জিলিপির জোড়াটা আমার বড্ড দরকার। একটা প্লেটে করে দিয়ে যাবি বাবু? আর রিমোটটা দিয়ে যা বুঝলি, দেখি কোনো ভালো সিনেমাটিনেমা চলছে কিনা।

ধারালো প্রপোজাল


প্রপোজ করতেই হলে ধারালো তরবারি হয়ে ফালাফালা করে দিতে হবে। এস্পারওস্পার চাই, নেকু হ্যাঁগোওগোভালোবাসিগো দিয়ে বেশিদিন কাজ চলবে না।

বাঙালির প্রপোজাগুলো টেম্পলেটগুলো আপগ্রেড করে রাখা দরকার।

১৷
আউট- তোমাকেই ভালোবাসি।
ইন - ভীড় মিনিবাসে তোমার জন্য জানলা ছেড়ে দেব।

২।
আউট - তোমায় ছাড়া বাঁচবা না।
ইন - তুমি না থাকলে যে আমায় বিউলির ডালে রসগোল্লা চুবিয়ে খেতে হবে!

৩।
আউট - যা তোমারে দিয়েছিনু তা তোমারই দান।
ইন - এক প্লেটে পাঁচটা ফিশফিঙ্গার দেখছি, আমি দু'টো তুমি তিনটে। না বললে হবে না।

৪।
আউট - ভালোবাসা মানে আর্চিস গ্যালারি।
ইন - রোজ মশারি আমি টাঙাবো, প্রমিস।

৫।
আউট - তুমি আমার চিরদিনের..।
ইন- দু'জনের ফোনেই দেখছি টাইপ সি চার্জার। সুবিধে হল কিন্তু...।

৬।
আউট - এই নশ্বর জীবনের মানে শুধু তোমাকেই পাওয়া...।
ইন - ও মা! আপনার গাদার পিস ভালো লাগে? আমি আবার পেটি ভক্ত। কম্বোটা কতটা খাপেখাপ সে'টা ভেবে দেখেছেন কি?

৭।
আউট - আমায় বিয়ে করবে?
ইন - যা বুঝছি, দু'জনের একটা আমাজন প্রাইম অ্যাকাউন্টেই চলে যাওয়া উচিৎ।

৮।
আউট - এসো এসো আমার ঘরে এসো, বাহির হয়ে এসো তুমি যে আছ অন্তরে।
ইন - বাবা মা মালদায় মেজোপিসির বাড়ি গেছে, বুঝলে। এ'দিকে মিনুদি ছুটিতে। বাড়ি শুনশান।

৯।
আউট - এই পথ যদি না শেষ হয়।
ইন - ভিডিও চ্যাটে বড্ড ডেটা খায় গো।  নেহাত আমার দিনে তিন জিবি করে ডেটা, তাই বাঁচোয়া। ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, তোমার প্ল্যানটাও আপগ্রেড করে দিই?

১০।
আউট - পারব না হতে আমি রোমিও, তাই দুপুর বেলাতে ঘুমিও।
ইন - ফাইনাল স্কোরলাইন; ল্যাদ ১ আর তুমি ০।