Saturday, February 9, 2019

নিউজ চ্যানেল



- খোকা! স্যাট স্যাট করে টিভির সামনে এসে না পড়লেই নয়?

- আহ! টিভি না পেরিয়ে ফ্রিজ পর্যন্ত পৌঁছব কী করে? আর ফ্রিজেই তো ছানার জিলিপির বাক্স।

- ছানার জিলিপি? দেশ গোল্লায় যাচ্ছে আর উনি ছানার জিলিপির জন্য আমার কনসেন্ট্রেশনে ফিনাইল ঢালছেন।

- দেখছ তো নিউজ চ্যানেল, তার আবার কনসেন্ট্রেশন কীসে।

- দেশের পলিটিকাল ক্রাইসিস সম্বন্ধে খবর রাখার প্রয়োজন বোধ করিস?

- ক্রাইসিস? ও তোমার এই খবরের চ্যানেলগুলোর বাড়াবাড়ি।

- বাড়াবাড়ি? বটে? অ্যাডাম স্মিথ সামান্য দু'পাতা উলটে দেখলে বুঝতিস। দেশের পলিটিকাল হিস্ট্রি একটু দরদ দিয়ে পড়লে টের পেতিস যে কী ভোলাটাইল সিচুয়েশনে আমরা বাস করছি। য়ুরোপের ইতিহাস ঘেঁটে দেখলেই জানতে পারবি যে...।

- মাইরি বাবা। দেখছ তো নিউজচ্যানেলের গাঁজা চিৎকার চ্যাঁচামেচি, এ'দিকে কোট করবে মার্ক্স স্মিথ অরবিন্দ। এক পিস জিলিপি খাবে?

- একটা গোটা জেনারেশন নেরোর মত জিলিপির বেহালা হাতে সং সেজে দাঁড়িয়ে আছে। তোদের দেখে খুব চিন্তা হয় রে খোকা।

- দু'টো জিলিপিই পড়ে আছে বোধ হয়।

- ফের জিলিপি? এ'দিকে দেশের মধ্যে ক্রাইসিস...ফের যদি টিভির সামনে এসেছিস...।

- এর চেয়ে সিরিয়াল দেখো বাবা, কানে ও মনে পলিউশন কমবে।

- পলিটিকাল ডিবেট শোনা মানে মনকে পলিউট করা?

- আলবাত! এ'গুলো ডিবেট কই, এ তো ইটপাটকেল ছুঁড়ছে।

- শোন, এ'সব টিভি ডিবেটের দুধে জল মিশবেই...আমাদের কাজ হচ্ছে জল সাইড করে দুধটুকু সাবাড় করা।

- জল বাদ দিয়ে দুধ?

- ইয়েস।  আর তার জন্য লাগে অ্যাওয়ারনেস, দরকার পড়াশোনা। শুধু নেটফ্লিক্স নেটফ্লিক্স করে বাঁদুরর লাফ লাফালে কাঁচকলা হবে।

- বটে? তা গত দু'ঘণ্টা ধরে যে দ্রাবিড়ের কনসেন্ট্রেশনে এ'সব নিউজ চ্যানেলের ডিবেট শুনলে, তা'তে তুমি জল বাদ দিয়ে কোন জ্ঞান গ্রিপ করেছ? কী'ভাবে এনরিচড হয়েছ?

- রীতিমতো এনরিচড হয়েছি।

- রিয়েলি?

- হান্ড্রেড পার্সেন্ট।

- বেশ, বলো তা'হলে এই চিৎকার আর গোলমাল থেকে তুমি কী জ্ঞানলাভ করেছ।

- তোকে বলতে যাব কেন?

- বলবে নাই বা কেন?

- শোন তবে, এতক্ষণে কী বুঝেছি।

- বলো। শুনি। কী বুঝেছ।

- আমি বুঝেছি যে শেষ ছানার জিলিপির জোড়াটা আমার বড্ড দরকার। একটা প্লেটে করে দিয়ে যাবি বাবু? আর রিমোটটা দিয়ে যা বুঝলি, দেখি কোনো ভালো সিনেমাটিনেমা চলছে কিনা।

ধারালো প্রপোজাল


প্রপোজ করতেই হলে ধারালো তরবারি হয়ে ফালাফালা করে দিতে হবে। এস্পারওস্পার চাই, নেকু হ্যাঁগোওগোভালোবাসিগো দিয়ে বেশিদিন কাজ চলবে না।

বাঙালির প্রপোজাগুলো টেম্পলেটগুলো আপগ্রেড করে রাখা দরকার।

১৷
আউট- তোমাকেই ভালোবাসি।
ইন - ভীড় মিনিবাসে তোমার জন্য জানলা ছেড়ে দেব।

২।
আউট - তোমায় ছাড়া বাঁচবা না।
ইন - তুমি না থাকলে যে আমায় বিউলির ডালে রসগোল্লা চুবিয়ে খেতে হবে!

৩।
আউট - যা তোমারে দিয়েছিনু তা তোমারই দান।
ইন - এক প্লেটে পাঁচটা ফিশফিঙ্গার দেখছি, আমি দু'টো তুমি তিনটে। না বললে হবে না।

৪।
আউট - ভালোবাসা মানে আর্চিস গ্যালারি।
ইন - রোজ মশারি আমি টাঙাবো, প্রমিস।

৫।
আউট - তুমি আমার চিরদিনের..।
ইন- দু'জনের ফোনেই দেখছি টাইপ সি চার্জার। সুবিধে হল কিন্তু...।

৬।
আউট - এই নশ্বর জীবনের মানে শুধু তোমাকেই পাওয়া...।
ইন - ও মা! আপনার গাদার পিস ভালো লাগে? আমি আবার পেটি ভক্ত। কম্বোটা কতটা খাপেখাপ সে'টা ভেবে দেখেছেন কি?

৭।
আউট - আমায় বিয়ে করবে?
ইন - যা বুঝছি, দু'জনের একটা আমাজন প্রাইম অ্যাকাউন্টেই চলে যাওয়া উচিৎ।

৮।
আউট - এসো এসো আমার ঘরে এসো, বাহির হয়ে এসো তুমি যে আছ অন্তরে।
ইন - বাবা মা মালদায় মেজোপিসির বাড়ি গেছে, বুঝলে। এ'দিকে মিনুদি ছুটিতে। বাড়ি শুনশান।

৯।
আউট - এই পথ যদি না শেষ হয়।
ইন - ভিডিও চ্যাটে বড্ড ডেটা খায় গো।  নেহাত আমার দিনে তিন জিবি করে ডেটা, তাই বাঁচোয়া। ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, তোমার প্ল্যানটাও আপগ্রেড করে দিই?

১০।
আউট - পারব না হতে আমি রোমিও, তাই দুপুর বেলাতে ঘুমিও।
ইন - ফাইনাল স্কোরলাইন; ল্যাদ ১ আর তুমি ০।

Thursday, February 7, 2019

সকল দেশের সেরা


- হ্যান্ডস আপ!

- কাটা গেছে স্যর, দু'টোই। তবু কল্পনায় দু'হাত তুলে ধরলাম..ফায়্যার করবেন না প্লীজ। পেটে বড্ড খিদে, এত খিদে নিয়ে ফস করে মরে গেলে যদি অম্বল হয়?

- বাজে ঠাট্টা একদম নয়! একদম নয়। নেতার হুকুম, বাজে ঠাট্টা শুনলেই ঢিশকাঁও!

- সৈনিকদাদা, বন্দুক আপনার হাতে। আমার হাত জোড়াই বরং গায়েব। আমি ঠাট্টা করি কোন মুখে?

- তা এত রাত্রে কাঁটাতারের তল দিয়ে সটকাবার তাল  করেছ ব্যাটাচ্ছেলে? তোমার তো সাহস কম নয়!

- কাঁটাতারের তল দিয়ে...ও মা! আমি কি পাগল না আমাদের প্রাণের চেয়ে প্রিয় নেতার ফর্সা নাকের ডগায় বসা বেয়াদপ মশা? আমি কাঁটাতার পেরোব? আমি কি জানিনা যে ও'পারে শত্রুদেশ?

- বাজে কথা বলবে না! বাজে কথা বলবে না! পেরোতে না চাইলে এই অসময়ে কাঁটাতারের আশেপাশে ঘুরঘুর করছিলে কেন?

- আজ্ঞে সৈনিকদাদা, থুতু ফেলতে এসেছিলাম। কাঁটাতারের ও'পারে। হারামজাদাদের দেশের মাটিতে থুতু ছিটিয়েও শান্তি। তাই না?

- চোপ! ধরা পড়লে সবাই ও'সব বড় বড় কথা বলে।

- না গো না, আমাদের নেতামশাই কত ভালোবাসা দিয়ে এই দেশ গড়েছেন। আমাদের এ স্বপ্নের দেশে কত দেশাত্মবোধক গান, কত দেশ গড়ার বই, আমাদের সেনা কত মজবুত, আমাদের রক্ত বিপ্লবে টইটম্বুর! আর ওই হারামজাদাদের দেশে দিনে তিনবেলা থালাভরা ভাতখাওয়ার আদেখলাপনা, হাসপাতালে ওষুধ ডাক্তারের ন্যাকামো আর কলকারখানায় ব্যস্ততার শয়তানি।

- তিনবেলা ভাত খায়? ও'দেশের লোক?

- বখে গেছে গো সৈনিকদাদা, ও দেশে এক্কেবারে বখে গেছে। শয়াতানের ছেলেদের আবার অনেক নেতা, অরাজকতা এমন পর্যায় গেছে যে সে ব্যাটাবেটিদের ভোট দিয়ে নেতা বাছতে হয়।

- এই তুমি শত্রুদেশের নিন্দে করছ না প্রশংসা?

- তৌবা তৌবা, ওই জানোয়ারদের দেশের প্রশংসা করব আমি? আরে আমাদের এই শ্রেষ্ঠ দেশ ভুলে আমি ওই নরকের প্রশংসা করব? আমি কি উন্মাদ না আমাদের আদরের নেতার পায়ের ফোস্কা? এমন অপবাদ দেওয়ার আগে আমার কপালে গুলি করলে না কেন সৈনিক? নেহাত গোপনে বিদেশি খবরের কাগজ পড়ে ফেলেছিলাম তাই মহান নেতার অনুপ্রেরণায় তার সাগরেদরা আমার হাত দু'টো টুক করে কেটে ফেলেছিল; নয়ত আমি নিজের হাতে আপনার বন্দুক কেড়ে নিজের মাথায় ঠুকে দিতাম।

- বাজে কথা বন্ধ করে বলো দেখি, তুমি একা এসেছ না সঙ্গে ছেলেমেয়েবৌ আছে?

- ছেলেমেয়েবৌ? ছিল বটে। কিন্তু নেতার দেখানো বিপ্লবের পথে তাঁরা শহিদ হয়েছে সৈনিকদাদা।

- শত্রুসেনা তাঁদের কোতল করেছে?

- তেমনটাই হতে যাচ্ছিল কিন্তু শত্রু সৈন্যের হাতে পড়ার আগেই টপাটপ তারা মরে গেল হে। খিদে জিনিসটা যে এত গোলমেলে সে'টা টের পাইনি। তবে নেতা বলেছেন খিদে আর রক্ত ছাড়া বিপ্লব হয়না। নেতার জয় হোক, এ দেশের জয় হোক।

- তুমি তা'হলে শত্রুসেনার কাছে আশ্রয়ভিক্ষা করতে আসনি?

- কতবার বলব সৈনিকদাদা! না! শত্রুশিবিরে গিয়ে একবাটি ভাত খেয়ে প্রাণ আইঢাই করে মরি আর কী! আমি শুধু দেখতে এসেছিলাম এ কাঁটাতার কতটা মজবুত।  আর ও দেশের মাটি তাক করে থুতু ফেলতে।

- বেশ, প্রাণে না মেরে তোমার দুই ঠ্যাঙে দুটো গুলি ঠুকে ছেড়ে দিচ্ছি। নেতা বলেছেন; উদারচেতা হতে হবে।

- আমাদের ভালোবাসার নেতা অমর রয়ে। আমাদের দেশের ওপর যেন আন্তর্জাতিক ইতর সমাজের চোখ না পড়ে।

বাপনের ওয়েক-আপ কল

- উঠে পড়ো বাপনবাবু। ক্যুইক। আর শুয়ে থাকা চলবে না।

- দাদু, টূ আর্লি। আর একটু পরে উঠব।

- নো বাপন। অন্তত আজকের দিনটা তোমায় সময় মত উঠতেই হবে...। কাম অন।

- ওহ, আজ সাতই ফেব্রুয়ারি।

- হ্যাপি বার্থডে দাদুসোনা।

- থ্যাঙ্কিউ। কিন্তু দাদু, এ বয়সে কি আর জন্মদিন নিয়ে এতটা বাড়াবাড়ি চলে?

- বয়স আবার কী? ইউ আর মাই নাতি, আমার কাছে তুমি সবসময় এই এত্তটুকুনই থাকবে। কাজেই ওয়ান্স এগেইন, জন্মদিনের শুভেচ্ছা এবং ভালোবাসা। নাও, চটপট করে উঠে পড়ো দেখি।

- আর একটু শুয়ে থাকি দাদু? প্লীজ?

- না! একদম নয়। আগে যাও গিয়ে তোমার মা'কে প্রণাম করে এসো।

- মা প্রত্যেকবার বড্ড ইমোশনাল হয়ে বড়ে। আমার জন্মদিন না নোবেল পেয়েছি বোঝা দায়।

- শী ইজ ইওর মাদার। তোমার জন্মদিনে সে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়বে; সে'টাই স্বাভাবিক। বরং তোমায় বলি; মিলেনিয়ালদের মত কূল হতে গিয়ে কোল্ড হয়ে পড়ো না বাপনবাবু! নাও গেট আপ। ক্যুইক, ক্যুইক।

- যাচ্ছি বাবা যাচ্ছি! উফ!

***

- কী হল দীপা! এমন ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলে! দুঃস্বপ্ন?

- না, দুঃস্বপ্ন কেন হবে! রাত সোয়া বারোটা হয়ে গেছে। সাতই ফেব্রুয়ারি পড়ে গেছে।

- বাপনের জন্মদিন..।

- ও এসেছিল গো, গত পাঁচ বছর ধরে যেমন আসছে। ঠিক এই দিনে ঠিক এই সময়...। আমায় প্রণাম করতে..।  আমার পায়ের পাতায় ওর হাতের ছোঁয়া টের পেয়েছি..।

- তোমার স্বপ্ন দীপা, বাপন কী ভাবে আসবে?

- এসেছিল! স্বপ্নে নয়। বিশ্বাস করো, প্লীজ! বাপনের আমায় জড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর আমি জড়িয়ে ধরতে গেলেই মিলিয়ে যায়...প্রতিবারের মত..।

- স্বপ্ন!

- স্বপ্ন নয় গো! বিশ্বাস করো!

- শুয়ে পড়ো, প্লীজ।

Sunday, February 3, 2019

বইমেলায় গুমখুন


- দত্তবাবু, কলকাতা বইমেলার স্টল সংখ্যা তিনশো চোদ্দ দশমিক এক পাঁচে আপনাকে স্বাগত জানাই।

- স্টল নাম্বার কত?

- তিনশো চোদ্দ দশমিক এক পাঁচ।

- জব্বর গোলমাল পাকিয়েছে দেখছি গিল্ড! ডেসিমালে স্টল নম্বর!

- আপনি বইয়ের জন্য এসেছেন না স্টল নম্বরের জন্য?

- দাঁড়ান দাঁড়ান, তিনশো চোদ্দ থেকে বেরিয়ে তিনশো পনেরো নম্বর স্টলে ঢুকতে যাবো। তিনশো চোদ্দ থেকে বেরোতেই সামান্য হোঁচট খেলাম, আর তারপরেই এই...।

- স্টলে এসে পড়লেন, স্বাভাবিক।  তিনশো চোদ্দ আর তিনশো পনেরোর মাঝখানে ঢুকতে হলে হোঁচট খেতেই হবে।

- ভোজবাজি দেখছি।

- এ'বারে বইগুলো একটু নেড়েচেড়ে দেখুন দত্তবাবু। এসেই যখন পড়েছেন..।

- আপনাদের এ'টা কোন পাবলিকেশন?

- গুমখুন প্রকাশনী।

- সর্বনাশ! এ'টা কোনো নাম হল?

- বইয়ের স্টলের নম্বর আর প্রকাশনার নামগুলোই সব নয় দত্তবাবু, বইয়ের জন্য বইমেলায় আসা। বই দেখুন।

- এক মিনিট, আপনি আমার নাম জানলেন কী করে?

- আপনিও আমায় চেনেন। অমনোযোগী না হলে দিব্যি চিনতে পারতেন।

- কে আপনি?

- কত টালবাহানা আপনার মশাই। স্টলের নম্বর নাপসন্দ। প্রকাশনার নাম শুনে বিরক্তি। স্টলে বসে থাকা মানুষকে নিয়ে খুঁতখুঁত। বইমেলায় এসে বই ছাড়া সব নিয়েই আপনার আদেখলাপনা রয়েছে দেখছি। বইগুলো মন দিয়ে দেখুন নয়ত...।

- ও কী!  রিভলভার! আপনি উন্মাদ দেখছি।

- সামনের বইগুলো উল্টেপাল্টে দেখুন। নয়ত ট্রিগার সামলে চলার লোক আমি নই...। রোববার বিকেলে বইমেলায় আকচার খুন হচ্ছে, আপনি টের না পেলেও হচ্ছে। আজ আপনি হবেন।

- প্লীজ, এই পাগলামো বন্ধ করুন। বন্দুক নামান। আমি বই দেখছি।

- গুডবয়। ক্যুইক।

- এ কী! এ তো গুমখুন প্রকাশনীর বই নয়; এ'টা যে আনন্দর বই। সুনীলের নভেল। আর.. আরে...এ যে ছোটমামার উপহার দেওয়া বইটাই..ওই কপিটাই...বছর বারো আগে আমার জন্মদিনে..আর এ'টা নারায়ণ সান্যাল, দে'জের বই। আমার বন্ধু শ্যামলের দেওয়া, "চট করে পড়ে ফেল দেখি' বলে সই করেছে। এই যে বুদ্ধদেব গুহর প্রেমের গল্প; সর্বনাশ। মিতুলের দেওয়া। তখনও আমাদের সম্পর্ক ভাঙেনি। এই যে গোলাপি কালিতে ও দু'কলম লিখে দিয়েছিল...। কিন্তু এই বইগুলো এ'খানে কী ভাবে?

- এ'রকম বহু বই এখানে যাচ্ছে। আপনার না পড়া সমস্ত বই। আপনার হারানো যত বই, অযত্ন ফেলে রাখা কত বই। স্নেহের মানুষদের থেকে উপহার পাওয়া না পড়া বই। সে'সব জড়ো করেই এই স্টল। সংগ্রহটা চমৎকার দত্তবাবু।

- বই না পড়ে ফেলে রাখা মানে গুমখুন?

- না, অত কাব্যিক এ নাম নয়। গুমখুন আপনি আজ হবেন, সে জন্যই আপনাকে এ'খানে টেনে আনা। সে জন্যেই এই প্রকাশনী।  তার আগে ভালো করে ভেবে বলুন দেখি দত্তবাবু; আমায় এখনও চিনতে পারছেন না?

- আপনার মুখটা দিব্যি চেনা ঠেকছে...।

- নিজের মুখ চেনা ঠেকবে সে'টাই স্বাভাবিক।

- আপনি আর আমি.. আমি আর আপনি...?

- এক। কিন্তু এক নই!  আমি পাঠক। বইয়ের এ মলাট থেকে ও মলাট ঘুরে বেড়ানো পথিক। আপনার মত ঘরকুনো কনসিউমারিস্ট বই কিনিয়ের সঙ্গে আমার তুলনা চলে না। এই গুমখুন স্টলে বহু বছর নষ্ট হয়েছে। আর নয়, এ'বারে আমার মুক্তি আর তার জন্য আপনাকে খুন হতেই হবে...।

- ও কী! রিভলভার নীচে নামান...ও কী! থামুন!

- গুডবাই বইখুনি দত্তবাবু!

*দ্রুম দ্রুম দ্রুম*

চোখে মুখে জলের ঝাপটা পড়তে জ্ঞান ফিরল দত্তবাবুর। বইমেলায় তিনশো চোদ্দ নম্বর স্টলের বাইরে হোঁচট খেয়ে পড়ে কিছুক্ষণের জন্য চারপাশে অন্ধকার দেখেছিলেন তিনি। দৃষ্টির ঝাপসা কেটে যাওয়ার পর দেখলেন তাকে ঘিরে ছোটখাটো একটা জটলা। আশাপাশে লোকজনকে ধন্যবাদ দিয়ে দ্রুত মেলা ছেড়ে বেরিয়ে এলেন ভদ্রলোক।

তিনশো চোদ্দ আর তিনশো পনেরো নম্বর স্টলের মাঝে যে লাশটা সবার অগোচরে পড়ে রইলো, তার প্রতি বিন্দু মাত্র অনুকম্পা অনুভব করতে পারলেন না তিনি৷ বইমেলা থেকে বেরিয়ে ট্যাক্সি না ধরা পর্যন্ত স্বস্তি নেই; বাড়ির বইয়ের আলমারিটা ততক্ষণে নিশির মত ডাকতে শুরু করেছে।