Thursday, February 7, 2019
সকল দেশের সেরা
বাপনের ওয়েক-আপ কল
- উঠে পড়ো বাপনবাবু। ক্যুইক। আর শুয়ে থাকা চলবে না।
- দাদু, টূ আর্লি। আর একটু পরে উঠব।
- নো বাপন। অন্তত আজকের দিনটা তোমায় সময় মত উঠতেই হবে...। কাম অন।
- ওহ, আজ সাতই ফেব্রুয়ারি।
- হ্যাপি বার্থডে দাদুসোনা।
- থ্যাঙ্কিউ। কিন্তু দাদু, এ বয়সে কি আর জন্মদিন নিয়ে এতটা বাড়াবাড়ি চলে?
- বয়স আবার কী? ইউ আর মাই নাতি, আমার কাছে তুমি সবসময় এই এত্তটুকুনই থাকবে। কাজেই ওয়ান্স এগেইন, জন্মদিনের শুভেচ্ছা এবং ভালোবাসা। নাও, চটপট করে উঠে পড়ো দেখি।
- আর একটু শুয়ে থাকি দাদু? প্লীজ?
- না! একদম নয়। আগে যাও গিয়ে তোমার মা'কে প্রণাম করে এসো।
- মা প্রত্যেকবার বড্ড ইমোশনাল হয়ে বড়ে। আমার জন্মদিন না নোবেল পেয়েছি বোঝা দায়।
- শী ইজ ইওর মাদার। তোমার জন্মদিনে সে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়বে; সে'টাই স্বাভাবিক। বরং তোমায় বলি; মিলেনিয়ালদের মত কূল হতে গিয়ে কোল্ড হয়ে পড়ো না বাপনবাবু! নাও গেট আপ। ক্যুইক, ক্যুইক।
- যাচ্ছি বাবা যাচ্ছি! উফ!
***
- কী হল দীপা! এমন ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলে! দুঃস্বপ্ন?
- না, দুঃস্বপ্ন কেন হবে! রাত সোয়া বারোটা হয়ে গেছে। সাতই ফেব্রুয়ারি পড়ে গেছে।
- বাপনের জন্মদিন..।
- ও এসেছিল গো, গত পাঁচ বছর ধরে যেমন আসছে। ঠিক এই দিনে ঠিক এই সময়...। আমায় প্রণাম করতে..। আমার পায়ের পাতায় ওর হাতের ছোঁয়া টের পেয়েছি..।
- তোমার স্বপ্ন দীপা, বাপন কী ভাবে আসবে?
- এসেছিল! স্বপ্নে নয়। বিশ্বাস করো, প্লীজ! বাপনের আমায় জড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর আমি জড়িয়ে ধরতে গেলেই মিলিয়ে যায়...প্রতিবারের মত..।
- স্বপ্ন!
- স্বপ্ন নয় গো! বিশ্বাস করো!
- শুয়ে পড়ো, প্লীজ।
Sunday, February 3, 2019
বইমেলায় গুমখুন
- দত্তবাবু, কলকাতা বইমেলার স্টল সংখ্যা তিনশো চোদ্দ দশমিক এক পাঁচে আপনাকে স্বাগত জানাই।
- স্টল নাম্বার কত?
- তিনশো চোদ্দ দশমিক এক পাঁচ।
- জব্বর গোলমাল পাকিয়েছে দেখছি গিল্ড! ডেসিমালে স্টল নম্বর!
- আপনি বইয়ের জন্য এসেছেন না স্টল নম্বরের জন্য?
- দাঁড়ান দাঁড়ান, তিনশো চোদ্দ থেকে বেরিয়ে তিনশো পনেরো নম্বর স্টলে ঢুকতে যাবো। তিনশো চোদ্দ থেকে বেরোতেই সামান্য হোঁচট খেলাম, আর তারপরেই এই...।
- স্টলে এসে পড়লেন, স্বাভাবিক। তিনশো চোদ্দ আর তিনশো পনেরোর মাঝখানে ঢুকতে হলে হোঁচট খেতেই হবে।
- ভোজবাজি দেখছি।
- এ'বারে বইগুলো একটু নেড়েচেড়ে দেখুন দত্তবাবু। এসেই যখন পড়েছেন..।
- আপনাদের এ'টা কোন পাবলিকেশন?
- গুমখুন প্রকাশনী।
- সর্বনাশ! এ'টা কোনো নাম হল?
- বইয়ের স্টলের নম্বর আর প্রকাশনার নামগুলোই সব নয় দত্তবাবু, বইয়ের জন্য বইমেলায় আসা। বই দেখুন।
- এক মিনিট, আপনি আমার নাম জানলেন কী করে?
- আপনিও আমায় চেনেন। অমনোযোগী না হলে দিব্যি চিনতে পারতেন।
- কে আপনি?
- কত টালবাহানা আপনার মশাই। স্টলের নম্বর নাপসন্দ। প্রকাশনার নাম শুনে বিরক্তি। স্টলে বসে থাকা মানুষকে নিয়ে খুঁতখুঁত। বইমেলায় এসে বই ছাড়া সব নিয়েই আপনার আদেখলাপনা রয়েছে দেখছি। বইগুলো মন দিয়ে দেখুন নয়ত...।
- ও কী! রিভলভার! আপনি উন্মাদ দেখছি।
- সামনের বইগুলো উল্টেপাল্টে দেখুন। নয়ত ট্রিগার সামলে চলার লোক আমি নই...। রোববার বিকেলে বইমেলায় আকচার খুন হচ্ছে, আপনি টের না পেলেও হচ্ছে। আজ আপনি হবেন।
- প্লীজ, এই পাগলামো বন্ধ করুন। বন্দুক নামান। আমি বই দেখছি।
- গুডবয়। ক্যুইক।
- এ কী! এ তো গুমখুন প্রকাশনীর বই নয়; এ'টা যে আনন্দর বই। সুনীলের নভেল। আর.. আরে...এ যে ছোটমামার উপহার দেওয়া বইটাই..ওই কপিটাই...বছর বারো আগে আমার জন্মদিনে..আর এ'টা নারায়ণ সান্যাল, দে'জের বই। আমার বন্ধু শ্যামলের দেওয়া, "চট করে পড়ে ফেল দেখি' বলে সই করেছে। এই যে বুদ্ধদেব গুহর প্রেমের গল্প; সর্বনাশ। মিতুলের দেওয়া। তখনও আমাদের সম্পর্ক ভাঙেনি। এই যে গোলাপি কালিতে ও দু'কলম লিখে দিয়েছিল...। কিন্তু এই বইগুলো এ'খানে কী ভাবে?
- এ'রকম বহু বই এখানে যাচ্ছে। আপনার না পড়া সমস্ত বই। আপনার হারানো যত বই, অযত্ন ফেলে রাখা কত বই। স্নেহের মানুষদের থেকে উপহার পাওয়া না পড়া বই। সে'সব জড়ো করেই এই স্টল। সংগ্রহটা চমৎকার দত্তবাবু।
- বই না পড়ে ফেলে রাখা মানে গুমখুন?
- না, অত কাব্যিক এ নাম নয়। গুমখুন আপনি আজ হবেন, সে জন্যই আপনাকে এ'খানে টেনে আনা। সে জন্যেই এই প্রকাশনী। তার আগে ভালো করে ভেবে বলুন দেখি দত্তবাবু; আমায় এখনও চিনতে পারছেন না?
- আপনার মুখটা দিব্যি চেনা ঠেকছে...।
- নিজের মুখ চেনা ঠেকবে সে'টাই স্বাভাবিক।
- আপনি আর আমি.. আমি আর আপনি...?
- এক। কিন্তু এক নই! আমি পাঠক। বইয়ের এ মলাট থেকে ও মলাট ঘুরে বেড়ানো পথিক। আপনার মত ঘরকুনো কনসিউমারিস্ট বই কিনিয়ের সঙ্গে আমার তুলনা চলে না। এই গুমখুন স্টলে বহু বছর নষ্ট হয়েছে। আর নয়, এ'বারে আমার মুক্তি আর তার জন্য আপনাকে খুন হতেই হবে...।
- ও কী! রিভলভার নীচে নামান...ও কী! থামুন!
- গুডবাই বইখুনি দত্তবাবু!
*দ্রুম দ্রুম দ্রুম*
চোখে মুখে জলের ঝাপটা পড়তে জ্ঞান ফিরল দত্তবাবুর। বইমেলায় তিনশো চোদ্দ নম্বর স্টলের বাইরে হোঁচট খেয়ে পড়ে কিছুক্ষণের জন্য চারপাশে অন্ধকার দেখেছিলেন তিনি। দৃষ্টির ঝাপসা কেটে যাওয়ার পর দেখলেন তাকে ঘিরে ছোটখাটো একটা জটলা। আশাপাশে লোকজনকে ধন্যবাদ দিয়ে দ্রুত মেলা ছেড়ে বেরিয়ে এলেন ভদ্রলোক।
তিনশো চোদ্দ আর তিনশো পনেরো নম্বর স্টলের মাঝে যে লাশটা সবার অগোচরে পড়ে রইলো, তার প্রতি বিন্দু মাত্র অনুকম্পা অনুভব করতে পারলেন না তিনি৷ বইমেলা থেকে বেরিয়ে ট্যাক্সি না ধরা পর্যন্ত স্বস্তি নেই; বাড়ির বইয়ের আলমারিটা ততক্ষণে নিশির মত ডাকতে শুরু করেছে।
Saturday, January 26, 2019
লস্ট বয় অফ সুদান
এ বই ছাব্বিশে জানুয়ারি পড়া শেষ হল, সে'টা একটা উপরি পাওনা।
১৯৯০। দক্ষিণ সুদানের এক প্রত্যন্ত গ্রাম; কিমটং। বিজলিবাতি বা গাড়িঘোড়া বা স্কুল সে গ্রামে ছিল না; শুধু এ'টুকু বললে সে গাঁয়ের অন্ধকার সঠিকভাবে বোঝানো সম্ভব নয়। আসলে আমি কোনো কিছু বললেই সে পৃথিবীর যন্ত্রণাগুলো যথাযথ ভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারব না। তার জন্য লোপেজের আত্মজীবনী 'রানিং ফর মাই লাইফ' পড়া ছাড়া গতি নেই।
ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে তখন সুদান তছনছ; লোপেপে (ভালো নাম; লোপেজ লোমং) নামে ছ'বছরের এক শিশু কিমটং গ্রামের গীর্জা থেকে অপহৃত হয়। লোপেপে একা নয়, প্রতিদিন বহুসংখ্যক শিশুদের তুলে নিয়ে যেত যুযুধান সেনারা। যে পাশবিক পরিস্থিতিতে সেই অপহৃত শিশু ও কিশোরদের রাখা হত, তা'তে অনেকেই মারা যেত অত্যাচার ও অনাহার সহ্য করতে না পেরে। যাদের মধ্যে বেঁচে থাকার দুঃসাহস ও অমানবিক তাগদ থাকত; তাদের জোর করে ভর্তি করা হত সৈন্য হিসেবে। উইকিপিডিয়ায় 'লস্ট বয়েজ অফ সুদান' সার্চ করলে সে বিষয়ে কিছুটা জানা যায়। বাপ-মায়ের কোল থেকে এক প্রকার ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল লোপেপেকে। তখন সে দুধের শিশু, বন্দী অবস্থার অকথ্য অত্যাচার সহ্য করে তার বেঁচে থাকার কথা ছিল না। কিন্তু বরাত জোরে সে পালিয়ে বাঁচে।
লোপেপে সীমানা পেরিয়ে এসে পৌঁছয় কেনিয়ার কাকুমা রিফিউজি শিবিরে। সে'খানে দশ বছর কাটায় লোপেপে। এই দশ বছরের যে বর্ণনা বইতে রেখেছেন লোপেজ লোমং, তা পড়ে শিউরে উঠতে হয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত আফ্রিকার যে ভয়াবহ ছবি তুলে ধরেছেন লোপেপে, তা যে কোনো পাঠককে বাধ্য করবে খাবারের প্রতিটি কণাকে বা সাধারণ প্যারাসেটামলের মত ওষুধকে অন্য মাত্রার সমীহ করতে। কেনিয়ার সেই শরণার্থী শিবিরে লোপেপেদের দিনে একবারের বেশি খাওয়া জুটত না, তাও আধপেটা। রিফিউজি, তাই শিবিরের বাইরে গিয়ে কোনো কাজ করার অনুমতিও ছিল না তাঁদের। হপ্তায় একদিন তাঁরা দিনে দ্বিতীয় বারের জন্য খেতে পারত; কারণ সে'দিন শিবির সংলগ্ন ময়লার স্তুপে কাকুমার অন্য প্রান্ত থেকে উচ্ছিষ্ট,ফেলে দেওয়া বা নষ্ট হয়ে যাওয়া খাবার এনে ফেলা হত। সেই ময়লার স্তুপেও চলত কাড়াকাড়ি, হাতাহাতি। আর পাশাপাশি ছিল মৃত্যু; লোকজনের মরে যাওয়াটা প্রায় এলেবেলে পর্যায়ের একটা ব্যাপার ছিল। বইয়ের প্রথম অংশ লোপেপের সেই সংগ্রামের; অবশ্য সে সময় বেঁচে থাকা ব্যাপারটাই লোপেপের কাছে ঈশ্বরের আশীর্বাদের মত ছিল। সে ধরেই নিয়েছিল বাপ মায়ের দেখা আর সে পাবে না। আর তার সমস্ত যন্ত্রণার মলম বলতে ছিল তিনটে ব্যাপার; ঈশ্বরে আস্থা, দৌড় আর ফুটবল।
বইয়ের পরের অধ্যায় লোপেপের অন্ধকার থেকে আলোর দিকে ছুটে যাওয়া নিয়ে। লোপেপে প্রথম অলিম্পিকের কথা শোনে পনেরো বছর বয়সে, প্রথম পাউরুটি চেখে দেখার সুযোগ পায় তারও পরে; যখন ভাগ্যের দুরন্ত মোচড়ে সে আমেরিকায় যাওয়ার সুযোগ পায়। আমার খানিকটা মনে আছে প্রথমবার কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার সময় লালমোহনের উচ্ছ্বাস। লোপেজ 'লোপেপে' লোমং; ষোলো বছর বয়সে বহু কাঞ্চনজঙ্ঘা উচ্ছ্বাসে ভেসে যেতে শুরু করে যখন সে প্রথম জানতে পারে পেট ভরে যাওয়া বলে একটা ব্যাপার থাকে, বাথরুম বলে একটা ব্যাপার আছে, আছে পরিষ্কার কাপরজামা পরার একটা নিশ্চিন্দি। লোপেপের চোখ দিয়ে চারপাশের সাধারণ জিনিসগুলো দেখতে শুরু করলে তাজ্জব বনে যেতে হয়। গত দু'দিন ধরে চানাচুরের একটা দানা প্লেটের বাইরে পড়লে লজ্জা হচ্ছে।এই লজ্জাটা শৌখিন এবং সাময়িক, সে'টাও স্বীকার করে নেওয়াই ভালো।
বইয়ের বাকি অংশ জুড়ে 'ইউনাইটেড স্টেটস অফ আমেরিকা' আর ফেলে আসা মাটির টান। লোপেপের লেখায় একটা সরল প্রশ্ন বার বার উঠে এসেছে; জন্মসূত্রে পাওয়া পদবীর মতই, জন্মসূত্রে পাওয়া নাগরিকত্বের প্রতি আনুগত্যই দেশাত্মবোধের শেষ কথা হতে যাবে কেন? লোপেপের জীবন ও বেঁচে থাকা সম্পূর্ণ ভাবে পালটে যায় এক আমেরিকান দম্পতির স্নেহে; আমেরিকায়। লোপেপেও আমেরিকাকে ভালোবাসতে কসুর করেনি; আমেরিকাকে ততটাই আপন করে নিয়েছে যতটা একজন সাতপুরুষ পুরনো মার্কিনীর পক্ষে সম্ভব। লোপেপে যেমন আমেরিকার ছত্রছায়ায় ঘুরে দাঁড়িয়েছে, হয়ে উঠেছে সে দেশের অন্যতম সেরা ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড অ্যাথলিট এবং বেজিং অলিম্পিকে মার্কিন পতাকাবাহক; আমেরিকাও ততটাই সমৃদ্ধ হয়েছে লোপেজ লোমংয়ের মত সুনাগরিক পেয়ে। নিজের পিতৃপরিচয়ের মতই, জন্মভূমি বেছে জন্ম নেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু নিজের পছন্দসই দেশ বেছে নেওয়ার পথটা সরল নয় কেন? লোপেজ পেরেছেন, বেশিরভাগ 'লস্ট বয়েজ অফ সুদান' পারেনি।
লোপেজ নিজের ফেলে আসা জগতকে মনে রেখেছেন, স্মৃতি আগলে রেখেছেন; বার বার ফিরে গেছেন। দেখেছেন যুদ্ধ থামলেও সে'খানকার অবিশ্বাস্য অন্ধকার ফিকে হয়নি এতটুকু। সে'খানে আজও সামান্য পেনিসিলিনের অভাবে শয়ে শয়ে শিশু মারা যাচ্ছে, আজও স্কুল নেই। আশা নেই, স্বপ্নও নেই। নিজের জন্মভূমিতে সেই আশা ও স্বপ্ন পৌঁছে দেওয়ার ইচ্ছের কথা লিখেছেন লোপেজ, আর লিখেছেন আমেরিকার প্রতি তাঁর ভালোবাসার কথা। লোপেজের মত কিছু নিবেদিতপ্রাণ নাগরিক পেলে যে'কোনো দেশে বিদ্যুৎবেগে এগিয়ে যাবেই। এ বই পড়ে মনে হয়, একদিন সমস্ত দেশের ইমিগ্রেশন পলিসি ঢেলে সাজানো হবে। একটা ফুটবল টীমের স্কাউটরা যে'ভাবে গোটা দুনিয়া চষে বেড়াতে পারে ভালো খেলোয়ার 'রিক্রুট' করতে, একটা দেশ আদর্শ নাগরিকদের খোঁজ করবে না কেন?
সবশেষে দু'টো কথা বলা দরকার।
এক, লোপেজের ঈশ্বর-বিশ্বাস। পাঠক নিজে ঈশ্বর-অবিশ্বাসী হতেই পারেন, কিন্তু লোপেজের ঈশ্বরকে অবিশ্বাস করা অসম্ভব। মাঝেমধ্যে মনে হবে লোপেজ যেন দাদার কীর্তির কেদার আর ঈশ্বর হলেন ভোম্বলদা; মাঝেমধ্যে ফাঁপরে ফেললেও, উতরে তিনিই দেবেন।
দুই, অলিম্পিকে মেডেল জেতা হয়নি লোপেজের। তবে হেরে যাওয়া রেসের শেষে গেয়েছিলেন আমেরিকার জাতীয় সঙ্গীত, তাঁর সঙ্গে গলা মিলিয়েছিলেন খেলা দেখতে আসা প্রচুর মার্কিনী দর্শক। এই অভিজ্ঞতার কথাটা লোপেজের ভাষায় পড়া দরকার। (প্রসঙ্গত, আজ দেখলাম দীপা কর্মকারের বই বেরিয়েছে, দেখা যাক)।
'হেরে যাওয়া রেস' বললাম কি? লোপেপে হেরে যাওয়ার বান্দাই নন।
Friday, January 25, 2019
মুঝে ইয়াদ আতি হ্যায়
"...অপনে দেশ কি মিট্টি কি খুশবু
মুঝে ইয়াদ আতি হ্যায়
মুঝে ইয়াদ আতি হ্যায়
কভি বেহলাতি হ্যায়
কভি তড়পাতি হ্যায়
মুঝে ইয়াদ আতি হ্যায়"।
মাটির টান, দেশের টান, ফেলে আসা সময়ের টান; এ'সবের মিশেলে বোধ হয় এমন সুরই তৈরি হয়। আর গানের কথায় এত সহজে কী ভাবে যে মায়ের আদর আর সোঁদা গন্ধ মিশিয়ে দেওয়া যায়; তা জাভেদবাবুই জানেন। পতাকা, পার্লামেন্ট আর সিলেবাসের ইতিহাস; এ'সবের বাইরে যে দেশটুকু; এ গান একান্তভাবে সেই দেশের।
প্রত্যেকটা মানুষ নিজের মধ্যে যত্ন করে বয়ে নিয়ে চলে একটা দেশ; 'আমি-রিপাবলিক'-
কারুর কাছে সংবিধান বলতে মায়ের সাতপুরোনো গানের খাতা, আবার কারুর কাছে আয়নার এক কোণে সাঁটা লাল টিপ।
কারুর পতাকা বলতে শিব্রাম, কারুর দেরাজে যত্নে রাখা ফেরত-না-দেওয়া রুমাল।
কারুর মুক্তিযুদ্ধ লোকাল ট্রেনের মান্থলিতে, কারুর ইতিহাস জমাট বেঁধে আছে অজস্র পোস্ট না করা চিঠিতে।
খোদ ভারতবর্ষের বুকের মধ্যে ধুকপুক করে চলেছে একশো কোটিরও বেশি দেশ। এ গান তেমন যে কোনো দেশের জাতীয় সঙ্গীত হয়ে উঠতে পারে। এই গানের মধ্যে আছে সেই অগুনতি দেশের জার্নাল। আর আছে সেই সমস্ত দেশের কাছে ফিরতে চাওয়ার কাঙালপনা।
আমার দেশের চেহারার সঙ্গে আপনার দেশের চেহারায়
ও চরিত্রে বিস্তর ফারাক। যেমন মিনিবাসের জানালায় কানে ইয়ারফোন লাগিয়ে যে মেয়েটি গা এলিয়ে বসে; তাঁর দেশে হয়ত সদ্য ভাঙা প্রেমের অনাবৃষ্টি। আবার প্রায় অনাহারে বেড়ে ওঠা যে কিশোর তেরো বছর বয়সে প্রথম পাউরুটি চুরি করেছে, তার দেশ জুড়ে তখন ফরাসী বিপ্লব মিইয়ে দেওয়া অভ্যুত্থান।
অনবরত নিজের দেশের স্মৃতি হাতড়ে চলা আর ক্রমশ সে দেশ থেকে দূরে সরে যাওয়া; হারিয়ে যাওয়া; এই দোলাচল রয়েছে এ গানের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। 'দেশ'য়ের রেসিপি একেকজনের কাছে এক এক রকম আর সঞ্চিত স্মৃতির হাত ধরে নিজের সে দেশকে চিনে নিতে পারাটা যে কী প্রবল ভাবে কলম্বাসিও! দেশকে চিনে নিতে পারার নিবিড় ভালোবাসা মেশানো সুরটুকু সবার বুকেই ইতিউতি বাজে; এ গান সেই সুরকে বড় মোক্ষম ভাবে ধরেছে।
এ'খানে সুরে বাজিমাত নেই, জলপটি আছে।
এ গানের কথায় বিদ্যুৎ নেই, আছে মায়ের কাঁধ; যে'খানে থুতনি রাখলে সমস্ত জমাট বাঁধা অভিমান গলে জল হতে বাধ্য।



