Thursday, January 24, 2019

মনোজ দত্তর চিঠি



- চিঠি? আমার নামে?

- অনিল হালদার আপনি হলে, ইয়েস।

- তোমায় দেখে তো ঠিক ক্যুরিয়র কোম্পানির লোক মনে হয় না হে..।

- ও মা। না না, আমি পোস্টম্যান বা কুরিয়রের লোক নই।

- তা'হলে আমার অফিস বয়ে এলে যে...।

- শুধু তাই নয়, আগাম অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে আসিনি। তাই আপনার সেক্রেটারি ঝাড়া তিন ঘণ্টা বসিয়ে রেখেছিলেন।

- খামের গায়ে তো কিছুই...।

- লেখা নেই..। জানি।

- এ চিঠি কার লেখা? তুমি নিয়ে এসেছ কেন?

- এত মন দিয়ে লিখলাম চিঠিটা, তাই ভাবলাম আমিই নিয়ে যাই। ওহ, আমার নাম মনোজ দত্ত।

- সশরীরেই যখন এলে, তখন চিঠির কী দরকার ছিল..ব্যাপারটা কী...। আজকাল ছেলেছোকরাদের ব্যাপারস্যাপার বোঝা দায়। চাকরীর আবেদনটাবেদন নয় তো?

- লেফাফা খুলে দেখুন না স্যর। 

- তোমার হাবভাব কেমন সাসপিশাস মনে হচ্ছে, খামে গোলমেলে কিছু নেই তো?

- গুড নিউজই আছে স্যার। খুলেই দেখুন না।

- নিজেই লিখেছ যখন, বলেই দাও কী আছে এতে। বৃদ্ধ বয়সে এই অকারণ কায়দা বরদাস্ত হয় না।

- আপনি এত স্কেপ্টিক কেন বলুন তো অনিলবাবু?

- আমি? স্কেপ্টিক? শোন হে ছোকরা, বাতিকগ্রস্ত হলে কলকাতার বুকে এত বড় ব্যবসা ফেঁদে বসতে পারতাম না। রেন্টেড টেবিল দিয়ে শুরু বছর কুড়ি আগে। আজ আট হাজার স্কোয়্যার ফিটের অফিস।  গারমেন্ট ইম্পোর্টে গত দশ বছরে শহরের আর কোনো ফার্ম এত প্রগ্রেস করেনি। আর ব্যবসায় এগিয়ে যেতে হলে নির্ভয়ে ডিসিশন নিতে হয়। আমায় স্কেপ্টিক বললে ধর্মে সইবে না।

- তা'হলে খুলেই দেখুন ন। খামে কী আছে।

- তোমার নামটা কী বললে যেন হে?

- মনোজ। দত্ত। নামটা চেনা ঠেকছে কি?

***

- মনোজ দত্ত, নামটা মনে পড়েছে। ট্যু লেট। বাট মনে পড়েছে।

- অন্ধকারে ঘরে আপনার মাথাটা দিব্যি খোলতাই হয় যায় দেখছি অনিলবাবু।

- এ জায়গাটা কোথায়?

- খামের ভিতর। অফ কোর্স।

- ওহ, ম্যাজিশিয়ান মনোজ দত্ত। অফ কোর্স। আমার তোমায় চট করে চিনে ফেলা উচিত ছিল।

- সং সেজে টুপি থেকে খরগোশ বের করা খোকাভোলানো ইউজলেস ফেলো। আপনার দেওয়া লম্বা কমপ্লিমেন্ট ভুলিনি স্যর।

- তাই আমায় খামের ভিতর পুরে ফেলতে এত বছর পর ফিরে এসেছ! ইডিয়ট। এ'সব তুকতাক আর শয়তানি ছাড়া যে তোমার আর কোনো মুরোদ নেই তা আমি আগেই বুঝেছিলাম। রিভেঞ্জ নিতে এসেছ! রাস্কেল। মেঘার নখের যোগ্য তুমি ছিলে না।

- রিভেঞ্জ? না অনিলবাবু। আদৌ না। প্রতিহিংসার জন্য আপনাকে টুপিতে হাপিশ করে সহজেই খরগোশ করে বের করতে পারতাম। সে এলেম আমার আছে। আপনি এ আর্টকে নীচু চোখে দেখতেই পারেন, তা'তে আর্টের কিছু এসে যায়না। আমি আর্টিস্ট স্যর, আমি রিভেঞ্জের মানু্ষ নই। আমি সত্যিই আপনার মেয়েকে ভালোবেসেছিলাম জানেন, মেঘাও আমাকে ভালবেসেছিল।  আপনি ওকে বাধ্য করেছিলেন আমার থেকে দূরে সরে আসতে। তবে বিশ্বাস করুন, ওর আত্মহত্যার জন্য আমি আপনাকে দায়ী করিনি কোনোদিন।

- শাট আপ। ইডিয়ট। এত বছর পর এই ডার্ক ম্যাজিকে আমায় বিপদে ফেলবে ভেবেছ?

- না হালদারবাবু। আমি মেঘার ভালোবাসায় ফিরে এসেছি, আমি জানি আপনি বড় যন্ত্রণায় আছেন। আমারই মত। আমি আপনার জন্য এসেছি স্যর। থাকবেন আমার সঙ্গে এই জগতে? নাকি ফিরে যাবেন? ব্যবসায়, কলকাতায়, অফিসে, হেরে যাওয়া জগতে...। এ'খানে মেঘার সুবাস আছে; আমার ভালোবাসার জোরে তার সুবাস এখনও টিকিয়ে রেখেছি। থাকবেন এখানে? মেঘার সুবাস দু'জনে ভাগ করে কাটিয়ে নেব?

- কী হচ্ছে কী এ'সব!

- আপনি চাইলেই আমি আপনাকে খামের বাইরে ছেড়ে আসতে পারি। কিন্তু সে'খানে দেওয়ালে টাঙানো মেঘার ছবি আছে হালদারবাবু। মেঘা নেই। মেঘা এ'খানে আছে। আমার মধ্যে। থাকবেন প্লীজ?

- ফ্রড! এ'সব মিথ্যে!

**

ঝিমটি ভাঙতেই হালদারবাবু টের পেলেন টেবিলে কেউ বেনামী খাম রেখে গেছে। সেক্রেটারি কিছুই বলতে পারল না, এমন কী সিসিটিভিতেও কাউকে তাঁর ঘরে এ খাম নিয়ে আসতে দেখা যায়নি। ভোজবাজিই বটে।

হালদারবাবু মিচকি হেসে মাথা নাড়লেন; আজ মেঘার জন্মদিন। কতদিন মেয়েটার গায়ের মায়াবী গন্ধ এমন ভাবে নাকে এসে ঠেকেনি। কতদিন। মনোজ ছোকরাটার এলেম আছে। আর বেশি চিন্তা না করে উকিলকে ফোন করলেন অনিল হালদার; উইলের ব্যাপারটা ঠিকঠাক করে তারপর এ খাম খুলতে হবে। আজই।

জুতোবাজ



এক বন্ধু রেকমেন্ড করেছিল 'বিসনেস ওয়ার্স' পডকাস্ট। পেপসি-কোকের পর নাইকি এবং অ্যাডিডাসের বাজারদখলের লড়াই নিয়ে রোমহষর্ক কয়েকটা এপিসোড শুনেছিলাম। আর তার কয়েকদিনের মাথায় নজরে পড়ল এই বইটা; নাইকির ফিল নাইটের আত্মজীবনী। সোজাসাপটা ভাষা, কিছু কিছু জায়গায় প্রায় ডায়েরির মত গড়গড়িয়ে লেখা। আর সোজাসাপটা লেখার যে কী গুণ; মনে হয় টেবিলের ও'পাশে বসে কেউ গল্প বলছেন। এ চ্যাপ্টার থেকে ও চ্যাপ্টার যাওয়ার সময় মনে হয়; "এক মিনিট স্যার, চট করে চানাচুরের ডিবেটা নিয়ে আসি"।

এ'বারে র‍্যান্ডম অবজার্ভেশনগুলোঃ

১. আমেরিকানদের খেলাধুলোর প্রতি আগ্রহের সঙ্গে আমাদের কিছুতেই তুলনা চলে না। আগাসি বা ফিল নাইটরা ব্যতিক্রমী, তাঁদের দৃষ্টান্ত দিয়ে গড়পড়তা আমেরিকানদের বিচার করা অবশ্যই অনুচিত।  কিন্তু এই দু'জনের আত্মজীবনী পড়ে  বুঝেছি যে সে'দেশে স্পোর্টস ব্যাপারটা সিস্টেমের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে ভাবে মিশে আছে; বিশেষত শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে। এবং সবচেয়ে বড় কথা হল অলিম্পিয়ান বা সেলেব্রিটি হওয়ার লোভটুকুই স্পোর্টসের শেষ কথা নয়। আগাসির টেনিস বা নাইটের দৌড় নিয়ে গল্প লেখা হয় বটে কিন্তু তাঁরাই শুধু ক্রীড়াবিদ নন। অফিস ফেরতা মানুষের জগিংয়ে বেরোনো বা ব্যাডমিন্টন খেলতে যাওয়ার মধ্যেও রয়েছে সার্থকতা; সে'খেলাটুকুও সিরিয়াসলি নেওয়ার দরকার আছে, সে'টুকু খেলার মধ্যেও নিয়ম আর ভালোবাসা টিকিয়ে রাখাটা জরুরী। বিভিন্ন চাপে যতবার ফিল নাইট পর্যুদস্ত বোধ করেছেন; ততবার তিনি দৌড়েছেন মাইলের পর মাইল। ফিল নাইট ব্যবসায়ী হিসেবে যতটা সফল, তাঁর জীবন ততটাই সার্থক ক্রীড়াবিদ হিসেবে; যদিও তেমন মেডেলটডেল কোনোদিনই জোটাতে পারেননি তিনি।

২. প্রতিটা সফল ব্যবসার গল্প যত্ন করে বলতে পারলে বোধ হয় এমন কিছু রোম্যান্টিক  মুহূর্ত, অ্যাডভেঞ্চার ও ঘুরে দাঁড়ানোর রূপকথা ভেসে উঠবে যা যে কোনো নভেলের কান মুলে দিতে পারে। ফিল বড় যত্ন করে সমস্ত গল্প বলেছেন। কফিকাপ হাতে বারান্দায় বসে যে সুরে গপ্প ফাঁদা উচিত, সে'ভাবেই।

৩. ক্রমশ বিশ্বাস মজবুত হচ্ছে যে আত্মজীবনীতে নিজের কথা বলার চেয়ে ভালো স্ট্র‍্যাটেজি হচ্ছে আশেপাশের মানুষগুলোর কথা গুছিয়ে বলা। ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, রাগ, প্রতিশোধ,  হাসিঠাট্টা; সমস্ত ফিল্টার দিয়ে নিজের চারপাশের মানুষগুলোকে স্পষ্টভাবে দেখাতে পারলেই নিজের জীবনের গল্পটা দিব্যি বলা হয়ে যায়; এবং স্টাইল হিসেবে সে'টাই মনোগ্রাহী। ফিল এই কাজটা খুব ভালোভাবে করেছেন। প্রায় গোটা বই জুড়েই নিক একজন অবসার্ভার; ব্লুরিবন থেকে নাইকি হয়ে ওঠার গল্প এগিয়ে চলে অন্যদের সাফল্য আর ব্যর্থতায় ভর দিয়ে।

৪. ফিল বহু বছর লড়াই করবেন নিজের বাবার চোখে পুত্র-গর্বের ঝিলিক দেখতে।  আর বহু বছর পর বুঝবেন যে সে লড়াইটা অদরকারী ছিল। তবে সে যাত্রাপথটা অদরকারী ছিল না। আর সে যাত্রাপথের শেষ প্রান্তে এসে তাঁর নিজের চোখ ঝাপসা হয়ে আসবে নিজের বৃদ্ধ পিতার জন্য গর্বে। ফিলের বাবা ছিলেন ভুলেভ্রান্তিতে ভরা, ঠিক ম্যাথুর বাবার মতই। ম্যাথু কে? ফিল নাইটের বড় ছেলে, যার অকালমৃত্যুর ধাক্কা সহ্য করত হবে নাইটকে।

৫. নাইকির মাধ্যমে কিছু জবরদস্ত বন্ধু জুটিয়েছিলেন ফিল। নাইকির সাফল্য সে'সব বন্ধুত্বের গল্পও বটে। আর বড় চিত্তাকর্ষকভাবে সে'সব বন্ধুদের কথা বলেছেন ফিল। বন্ধুদের সাহায্যে  নাইকি তৈরি করেননি ভদ্রলোক, বরং নাইকির মাধ্যমে খুঁজে পেয়েছেন সে'সব বন্ধুদের। খুঁজে পেয়েছেন জীবনসঙ্গিনীকে। এমন কি নাইকি নামটাও ফিলের দেওয়া নয়, বরং স্বপ্ন হাতড়ে সে নাম পেয়েছিলেন তেমনই এক বন্ধু। পড়তে দিব্যি লাগে সে'সব গল্প।

৬. জাপানি ও মার্কিনীদের তফাৎ, মিল ও ব্যবসায়িক রসায়ন নিয়ে বেশ জরুরী কিছু কথা রয়েছে এ বইয়ে।

৭. এক্সেলেন্সের প্রতি আনুগত্য; আমার আদৌ নেই। কিন্তু জবরদস্ত  মানুষজনের থাকে। সে জন্যেই আজকাল বিভিন্ন বায়োগ্রাফি পড়ার চেষ্টা করছি।  ভালো লাগে, মাঝেমধ্যে গায়ে কাঁটা দেয়। এক্সেলেন্সের একটা বড় দিক বোধ হয় মানুষকে সম্মান করতে পারা। এই একটা গুণের জন্যেই হাজার গলদ সত্ত্বেও  ফিল নাইটরা ব্যতিক্রমী; এ জন্যেই হয়ত তাঁদের জীবনী হয়ে ওঠে 'গ্রিপিং'। সেল্ফ-হেল্প বই আমার ধাতে সয় না, কিন্তু এ'বইগুলো বেশ চমৎকার।

ভাঙা প্রেম


প্রত্যেক ভাঙা প্রেমের শেষ দৃশ্যে এক থালা বিরিয়ানি থাকলে ভালো হয়৷ থালার একপাশে হেরো প্রেমিক, অন্যপাশে পর্যুদস্ত প্রেমিকা।

বিরিয়ানি সুবাসের পাশাপাশি ইতিউতি "খাচ্ছ না কেন?" ভেসে বেড়াবে বাতাসে। আর সরু চালচাপা-নরম আলুর মত ঘাপটি মেরে পড়ে থাকবে "আর দেখা হবে না, না?"র ধান্দাবাজ প্রশ্ন।

বিরিয়ানি আর ভাঙা প্রেমে তাড়াহুড়ো চলে না, সে'টাই বাঁচোয়া।

রাজ্যপাট



- ভাই মন্ত্রী! ও মন্ত্রী!

- রাজাদা, ডাকছেন?

- আমার আর কে আছে ভাই?

- কেন? সিংহাসন আছে। এক ডিবে ইয়ারবাড আছে৷ মাইক্রোওয়েভে দেড়খন্ড পিৎজা আছে। আর আছে বালিশের ওয়াড়ে চায়ের ছোপ।

- তোমার আমি এত কদর করি ভাই মন্ত্রী,  অথচ তোমার যত চ্যাটাংচ্যাটাং কথা। নেহাত রাজ্যপাট সামলে রাখো। সকালে পোনামাছটা, বিকেলে সিগারেটটা এনে দাও; তাই বলে কি একটু মিঠে সুরে কথা বলতে নেই?

- আহ, রাজন। রাজপুরুষের অত নেকুপুষু হলে মানায় না।

- মনে বড় দুঃখ ভাই মন্ত্রী।

- দুঃখ? স্যাডনেস? ফ্যাঁচফোঁচ? হুহু?

- মান্নাদের গলা কাঁপুনির মত। সঞ্জীবের শেষ লাইনের মত। রোববার দুপুরের কলেজস্ট্রীটের মত।

- সরেস। রাজাদা, বড় বাজে বুকে। না?

- বড্ড বাজে। রীতিমত বাজে ভায়া। বুকে জমাট বেঁধে আসে। মনে হয় যদি ছাতে উঠে সাইকেল চালাতে পারতাম তা'হলে খানিকটা ভার লাঘব হত।

- আপনার দুঃখ ভল্যিউম উইদাউট ওয়েট নয় দেখছি৷

- হাই ডেন্সিটি মন্ত্রী।  হাই ডেন্সিটি।

- মায়ের কথা মনে পড়ছে?

- ছেলেবেলার দুপুরে মাকে জড়িয়ে শুতাম। বিকেলে তড়াং করে উঠে পড়তাম আমার প্রাণের বন্ধুর সাইকেলের কলিংবেলে। সব কন্ডেন্স করে গেছে ভাই।

- তা, এ দুঃখের গন্ধ কিছু টের পাচ্ছেন শাহেনশাহ?

- কনসেন্ট্রেট করলেই সে গন্ধ পাওয়া যায়। তবে ফ্লাকচুয়েট করে। কিছুক্ষণ আগেই ছিল পেট্রোলে শিউলি৷ এখন পাচ্ছি ফেনাভাতে টোস্টবিস্কুট।

- কী জানেন রাজাধিরাজ,  সুখ ব্যাটাচ্ছেলে বেশ কুকুরছানার মত চঞ্চল; এই হলুদ রবারের বল মুখ করে দৌড়ে বেড়াচ্ছে তো অমনি আপনার হাঁটু জড়িয়ে ল্যাপ্টালেপ্টি আর কুঁইকুঁই। দুঃখ বেড়াল, সহজে ধরা দেবে না। তাকে খেলিয়ে খেলিয়ে বুকে তুলে নিলে তবে সেই গ্যাঁট হয়ে বসে জিরোবে, গালে গাল ঠেকিয়ে মৌজ করবে। কাজেই ব্যস্ত হবেন না রাজাদা, দুঃখকে জার্মিনেট করতে দিন।

- দেব?

- আলবাত দেবেন। দুঃখগুলো বড় না হলে আপনাকে সামলে রাখবে কে? দুঃখগুলো জড়িয়ে না থাকলে বাঁদরামির ভাইরাসে বখে যাবেন যে!

- ভাইমন্ত্রী, তুমি ছিলে তাই এ যাত্রা রাজ্যপাট টিকিয়ে রাখতে পারলাম। নয়ত কবেই ভেসেটেসে যেতাম...।

- আমি রাখারই বা কে আর ভাসাবারই কে। নদী যার, ডোবানোর ফন্দি যার; দুঃখের খড়কুটোও তারই দেওয়া। তা মহারাজ, সাইকেল না থাক; মাদুর তো আছে। যাবেন নাকি? ছাতে?

একুশে একুশ




হারারিদার লেখা পড়া মানে মগজকে সমুদ্রস্নান করিয়ে আনা। বই শেষ করার পর কিছুদিন অন্তত হারারি-মোডে সমস্ত কথাবার্তা,থিওরি,খবরকে অ্যানালাইজ করার চেষ্টা করি। কিন্তু সে ব্যাপারটা রীতিমত আননার্ভিং। এক বন্ধুর রেকমন্ডেশনে বছরখানেক আগে পড়েছিলাম সেপিয়েন্স। গত বছরের শেষে পড়েছি 'হোমো ডেউস' আর এ বছরের শুরুতে 'টুয়েন্টি ওয়ান লেসনস ফর দি টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি'। এ দু'টো বই পরপর পড়ে ফেলাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

হারারি থরেথরে কনসেপ্ট সাজিয়ে দেওয়ার লোক নন; কাজেই মুখে'উরিব্বাস' অথচ মনের মধ্যে অসহায় 'এ বই শেষ হচ্ছেনা' গোছের হাঁসফাঁস থাকার সম্ভাবনা নেই। ভদ্রলোক সম্ভবত চেয়েছেন তাঁর পাঠক অবজেক্টিভ আর সাব্জেক্টিভের তফাৎগুলো স্পষ্টভাবে চিনতে শিখবেন; অন্তত চেষ্টা করবেন। অসুবিধে হচ্ছে আমরা প্রায়শই ভেবে থাকি  সাব্জেক্টিভ আর অব্জেক্টিভের তফাৎ কী এমন হাতিঘোড়াডাইনোসোর; আমরা দিব্যি বুঝি। কিন্তু হারারিদা এই কনফিডেন্সের কলার নাচিয়ে ডিগবাজি খাওয়াতে ওস্তাদ। ব্যাপারটা কিন্তু নেহাত মজার নয়; কত কিছু নিয়ে আজীবন নিশ্চিন্তে ছিলাম, হারারিদা গোলমাল পাকিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেলেন।

এই যেমন রাজস্থানের কোনো নেতা বললেন 'সবার আগে আমার জাত, তারপর অন্যকিছু'। এ'টা শুনে আমার প্রচণ্ড খারাপ লাগল; খারাপ লাগাটা স্বাভাবিক। আবার 'সবার আগে আমার দেশ, তারপর অন্যকিছু'; এ'টা শুনলে বেশ লাগে। কিন্তু দু'টোর মধ্যে কি আদৌ কোনো মিল নেই? তফাৎ থাকলে কোথায় আছে? হারারিদা এই সন্দেহগুলো বিশ্রীভাবে ইঞ্জেক্ট করেছেন। লিবারেলরা আদৌ কতটা লিবেরাল? প্রাইভেসি কি সত্যিই দরকারি? নাকি গুগলকে নিজের সমস্ত হাঁড়ির খবর বিলিয়ে দেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ যাতে গুগলের এআই আমায় আগাম বলে দিতে পারে কে আমার আদর্শ বন্ধু হতে পারে বা ভবিষ্যতে আমার ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কতটা? সন্ত্রাসবাদ কি আজকের দিনে আদৌ তেমন দুশ্চিন্তার কারণ নাকি আমরা বাতিকগ্রস্ত; পরিসংখ্যান কী বলছে?

বিভিন্ন গল্পে, আলোচোনায়, থিওরির ডিসেকশনে; মোদ্দা কথাটায় বার বার ফিরে গেছেন হারারিদা - সাব্জেক্টিভ আর অব্জেক্টিভের ফারাকটা প্রত্যক্ষ করে আমরা সঠিক প্রশ্নগুলো করতে পারছি কিনা।

তবে একটা হারারিদার একটা থিওরির কথা উল্লেখ করতেই এতটা গল্প ফাঁদা। ভদ্রলোক বলছেন সমস্যা কোনো ইজমে নয়, সমস্যাটা সেই ইজম-বাদীদের অনমনীয় একরোখা বিশ্বাসে। অর্থাৎ আপনি অমুক-ইজমে আস্থা রাখতেই পারেন, কিন্তু আপনার সে আস্থাকে তখনই সিরিয়াসলি নেওয়ার প্রশ্ন আসবে যখন আপনি স্পষ্টভাবে বলতে পারবেন  অমুক-ইজমের ক্ষতিকারক প্রভাবগুলোর সম্বন্ধে। কাজেই আপনার বিজেপি-কংগ্রেস-তৃণমূল-সিপিএম সমর্থনকে তখনই সিরিয়াসলি নেওয়া যেতে পারে যখন আপনি আপনার প্রিয় রাজনৈতিক দলের কুপ্রভাব সম্বন্ধে দিব্যি একটা মনোগ্রাহী লেকচার দিতে পারবেন। হিন্দুত্ববাদী হতে পারেন, ইসলামপন্থী হতে পারেন, সেকিউলার হলেও আপত্তির কিছু নেই; কিন্তু ওই, আপনাকে স্পষ্টভাবে জানতে হবে আপনার স্টান্সের গড়বড়ে দিকগুলোর সম্বন্ধে।

আর নিজের মতামতের গড়বড়গুলো ঘেঁটে দেখা যে কী অস্বস্তিকর ভাই, কী বলব।