Thursday, January 24, 2019

একুশে একুশ




হারারিদার লেখা পড়া মানে মগজকে সমুদ্রস্নান করিয়ে আনা। বই শেষ করার পর কিছুদিন অন্তত হারারি-মোডে সমস্ত কথাবার্তা,থিওরি,খবরকে অ্যানালাইজ করার চেষ্টা করি। কিন্তু সে ব্যাপারটা রীতিমত আননার্ভিং। এক বন্ধুর রেকমন্ডেশনে বছরখানেক আগে পড়েছিলাম সেপিয়েন্স। গত বছরের শেষে পড়েছি 'হোমো ডেউস' আর এ বছরের শুরুতে 'টুয়েন্টি ওয়ান লেসনস ফর দি টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি'। এ দু'টো বই পরপর পড়ে ফেলাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

হারারি থরেথরে কনসেপ্ট সাজিয়ে দেওয়ার লোক নন; কাজেই মুখে'উরিব্বাস' অথচ মনের মধ্যে অসহায় 'এ বই শেষ হচ্ছেনা' গোছের হাঁসফাঁস থাকার সম্ভাবনা নেই। ভদ্রলোক সম্ভবত চেয়েছেন তাঁর পাঠক অবজেক্টিভ আর সাব্জেক্টিভের তফাৎগুলো স্পষ্টভাবে চিনতে শিখবেন; অন্তত চেষ্টা করবেন। অসুবিধে হচ্ছে আমরা প্রায়শই ভেবে থাকি  সাব্জেক্টিভ আর অব্জেক্টিভের তফাৎ কী এমন হাতিঘোড়াডাইনোসোর; আমরা দিব্যি বুঝি। কিন্তু হারারিদা এই কনফিডেন্সের কলার নাচিয়ে ডিগবাজি খাওয়াতে ওস্তাদ। ব্যাপারটা কিন্তু নেহাত মজার নয়; কত কিছু নিয়ে আজীবন নিশ্চিন্তে ছিলাম, হারারিদা গোলমাল পাকিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেলেন।

এই যেমন রাজস্থানের কোনো নেতা বললেন 'সবার আগে আমার জাত, তারপর অন্যকিছু'। এ'টা শুনে আমার প্রচণ্ড খারাপ লাগল; খারাপ লাগাটা স্বাভাবিক। আবার 'সবার আগে আমার দেশ, তারপর অন্যকিছু'; এ'টা শুনলে বেশ লাগে। কিন্তু দু'টোর মধ্যে কি আদৌ কোনো মিল নেই? তফাৎ থাকলে কোথায় আছে? হারারিদা এই সন্দেহগুলো বিশ্রীভাবে ইঞ্জেক্ট করেছেন। লিবারেলরা আদৌ কতটা লিবেরাল? প্রাইভেসি কি সত্যিই দরকারি? নাকি গুগলকে নিজের সমস্ত হাঁড়ির খবর বিলিয়ে দেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ যাতে গুগলের এআই আমায় আগাম বলে দিতে পারে কে আমার আদর্শ বন্ধু হতে পারে বা ভবিষ্যতে আমার ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কতটা? সন্ত্রাসবাদ কি আজকের দিনে আদৌ তেমন দুশ্চিন্তার কারণ নাকি আমরা বাতিকগ্রস্ত; পরিসংখ্যান কী বলছে?

বিভিন্ন গল্পে, আলোচোনায়, থিওরির ডিসেকশনে; মোদ্দা কথাটায় বার বার ফিরে গেছেন হারারিদা - সাব্জেক্টিভ আর অব্জেক্টিভের ফারাকটা প্রত্যক্ষ করে আমরা সঠিক প্রশ্নগুলো করতে পারছি কিনা।

তবে একটা হারারিদার একটা থিওরির কথা উল্লেখ করতেই এতটা গল্প ফাঁদা। ভদ্রলোক বলছেন সমস্যা কোনো ইজমে নয়, সমস্যাটা সেই ইজম-বাদীদের অনমনীয় একরোখা বিশ্বাসে। অর্থাৎ আপনি অমুক-ইজমে আস্থা রাখতেই পারেন, কিন্তু আপনার সে আস্থাকে তখনই সিরিয়াসলি নেওয়ার প্রশ্ন আসবে যখন আপনি স্পষ্টভাবে বলতে পারবেন  অমুক-ইজমের ক্ষতিকারক প্রভাবগুলোর সম্বন্ধে। কাজেই আপনার বিজেপি-কংগ্রেস-তৃণমূল-সিপিএম সমর্থনকে তখনই সিরিয়াসলি নেওয়া যেতে পারে যখন আপনি আপনার প্রিয় রাজনৈতিক দলের কুপ্রভাব সম্বন্ধে দিব্যি একটা মনোগ্রাহী লেকচার দিতে পারবেন। হিন্দুত্ববাদী হতে পারেন, ইসলামপন্থী হতে পারেন, সেকিউলার হলেও আপত্তির কিছু নেই; কিন্তু ওই, আপনাকে স্পষ্টভাবে জানতে হবে আপনার স্টান্সের গড়বড়ে দিকগুলোর সম্বন্ধে।

আর নিজের মতামতের গড়বড়গুলো ঘেঁটে দেখা যে কী অস্বস্তিকর ভাই, কী বলব।

২৮১র বই



গতবছর শুরুর দিকে পড়েছিলাম সৌরভের বায়োগ্রাফি।  এ'বছরটা শুরু হল ভিভিএস লক্ষ্মণের জীবনী দিয়ে। ব্যক্তিগতভাবে এই ধরনের বই পড়ার সময় খুব মারকাটারি ভাষায় ভেসে যাওয়ার আশা আমার থাকে না। বরং থাকে দু'টো স্পষ্ট চাহিদা;

এক, কেরিয়ারের টাইমলাইন গড়গড় করে আউড়ানো হবে না। বিশেষত লক্ষ্মণ, দ্রাবিড়, শচীন বা সৌরভদের ক্রিকেট জীবন সম্বন্ধে আমারা অনেকেই বেশ কিছুটা ওয়াকিবহাল; তাঁদের ব্যাপারে বিভিন্ন খবর, সাক্ষাৎকার ও প্রতিবেদনে ইন্টারনেটও রীতিমত সমৃদ্ধ। কাজেই আমাদের আগ্রহ না শোনা গল্পগুলোর প্রতি, তাঁদের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলোর প্রতি। গসিপ নয়, কিন্তু তাঁর আশপাশের মানুষগুলো সম্বন্ধে উপলব্ধিগুলোও জরুরী। এ'ব্যাপারে নিজের বইটা ঠিক জমিয়ে তুলতে পারেননি শচীন (বা বোরিয়াবাবু)।

দুই, লেখার টোন হবে সৎ এবং নির্মেদ। অমুকের জীবনী পড়তে গিয়ে তমুকের কণ্ঠস্বর কানে এসে ঠেকলেই মুশকিল। ভালো কি মন্দ; সে প্রশ্নে না গিয়েই স্বীকার করে নিতে পারি যে সৌরভের বইটাতে এই সমস্যাটা প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছে; ও বই সৌরভের চেয়ে অনেক বেশি গৌতমবাবুর। মন খুলে গল্প বলার ব্যাপারটাই সৌরভের বইতে তেমন ভাবে পাইনি; অথচ বিভিন্ন সাক্ষাৎকার দেখে আমার মনে হয়েছে সৌরভ বেশ জমিয়ে গল্প শোনাতে পারেন।

আর এই দু'টো ব্যাপারেই লক্ষ্মণদার বায়োগ্রাফি শচীন ও সৌরভের থেকে অনেক এগিয়ে। তাছাড়া চ্যাপেল এবং জন রাইট; এই দু'জনের কোচিং নিয়েও বিভিন্ন অ্যানেকডোট চমৎকার ভাবে তুলে ধরেছেন ভদ্রলোক।

এবং সবচেয়ে বড় কথা, ভালোমানুষদের ভালোমানুষির গল্প একটানা শুনতে শুনতে মনে হতে পারে সে ভালোমানুষি কিছুটা হলেও গায়ে পড়া এবং খানিকটা কালটিভেটেড। কিন্তু ভিভিএস সে'খানেই মন জয় করে নিতে পারেন; ভদ্রলোকের হিউমিলিটি অতুলনীয়। মানুষটা সত্যিই বড় ভালো (আমার মনে হল); প্রায় সঞ্জীবেস্ক সরল চরিত্র।

বাহবা প্রাপ্য  আর কৌশিকের যিনি লক্ষ্মণের সঙ্গে লিখেছেন। বাহারি ভাষা আর পোড়খাওয়া-লিখিয়ে-মার্কা কেরামতি ব্যবহার করে লক্ষ্মণের সারল্য আর স্টাইল গুলিয়ে দেননি তিনি।

খুনের গল্প


এক

অফিসের ক্যান্টিনে চারাপোনা বা ব্রয়লার কাহাতক সহ্য হয়। কাজেই সোমবারের তেতো ভাবটা কাটাতে আজ লাঞ্চের সময় বেরিয়ে তন্দুরি রুটি আর দু’বাটি মটন কষা খেয়ে ফিরছিলেন তাপসবাবু। মনোজের হাতে বানানো সরেস মিঠে পান একটা খেলে জিভে লেগে থাকা কষা মাংসের স্বাদের প্রতি যথাযথ স্যালুট জানানো হবে; অতএব তক্ষুনি অফিসে না ঢুকে মনোজের পান দোকানের দিকে এগিয়ে গেলেন তিনি। অফিসের লাগোয়া যে খান দুই পানের দোকান নেই তা নয়, কিন্তু পান বানানোর ব্যাপারে মনোজের পরিমিতিবোধটা শ্রদ্ধা করেন তাপস সাহা ; কাজেই সঠিক পানের জন্য বাড়তি হাফ কিলোমিটার অনায়াসে হেঁটে যান তিনি। মনোজের দোকানে পৌঁছনোর আগেই ভবদুলাল গাঁয়েন লেনের নিরিবিলিতে থমকে দাঁড়াতে হল তাপসবাবুকে।
“এই যে তাপসবাবু, ও মশাই! শুনছেন? এক মিনিট প্লীজ”।

ট্র্যাকস্যুট আর স্পোর্টসশ্যু পরা এক ভদ্রলোক তার দিকেই ছুটে আসছিলেন। বেয়াড়া দুপুরে এমন জগঝম্প মেজাজে জগিং করতে বেরিয়েছেন; ব্যাপারটা অস্বস্তিকরই বটে।

- আমায় ডাকছেন?
- এই গলিতে আর ক’টা তাপসবাবুকে জোটাতে পারব বলুন। উফ, সেই কখন থেকে আপনাকে ডাকছি মাইরি। শোনার নামই নেই।
- সরি, আমি শুনতে পাইনি।
- শুনতে পাবেন কী করে? মাংস রুটি হোক বা সন্ধ্যের শিঙাড়া জিলিপি। সকালের ডালকচুরি হোক বা রাত্রের কাতলা কালিয়া ও গুড়ের পায়েস; খাবার দেখলে আপনার হুঁশ থাকে নাকি! নোলা সড়াক করে বেরিয়ে আসে আর মগজ ঝপাৎ করে বন্ধ। ডাক শুনবেন কী করে?
- এক্সকিউজ মি? চিনি না জানি না, এমন ভাবে কথা বলছেন কেন?
- ও মা! চিন্তা করবেন না। আমি কিছু মনে করিনি। বেশ করেছেন আমার ডাক শুনতে পাননি। রিল্যাক্স।
- দেখুন, আমি বলছি যে বলা নেই কওয়া নেই আপনি আমার সঙ্গে এমন দেমাক নিয়ে কথা বলছেন কোন সাহসে?
- দেমাক? ও মা। ভূতের আবার দেমাক।
- আপনি ভূত?
- রীতিমত। স্পষ্ট।
- গাঁট্টা মেরে সিধে করে দেব, দিনদুপুরে সং সেজে ভূত। ইয়ার্কি হচ্ছে? আর আপনি আমায় ডেকে ডেকে সাড়া পাননা?
- পাই না তো। এই গত হপ্তায় প্রতিটা দিন আমি আপনাকে ভোর পৌনে ছ’টায় ডেকেছি। কিন্তু কী খতরনাক ঘুম মশাই আপনার তাপসবাবু। পৌনে আটটা নাগাদ বৌদির খ্যাঁকখ্যাঁক শুরু না হলে বিছানা থেকে আপনাকে হাফইঞ্চিও নড়ানো যায় না যে।
- তবে রে শালা। বৌ তুলে কথা? তিন তলার ঘরের দরজা এঁটে শুই। নীচে কোলাপিসবল গেট আর চারটে গোদরেজের তালা। ওপরের দরজায় ট্রিপল ছিটকিনি। আর তুই কিনা আমায় রোজ ভোরে ডাকতে আসিস? মামদোবাজি?
- শুধু কি ঘুমের সময় ডেকেছি তাপসবাবু? গতকাল সন্ধেবেলা যখন হরেনদার দোকান থেকে কুড়ি টাকার ফুলুরি আর বেগুনি কিনছিলেন, কত করে ডাকলাম। আপনার সাড়া মেলেনি।
- তবে রে ব্যাটাচ্ছেলে! আমার পিছনে স্পাই হয়ে ঘুরঘুর করা! তুই জানিস আমার পিসতুতো ভাই লালবাজারের বাঘা অফিসার? আমার ছেলেবেলার বন্ধু মন্টুর ভায়রা হল গিয়ে এমএলএ? বল, বল কে তোকে আমার পিছনে লাগিয়েছে।
- ভূতকে পুলিশ আর এমএলএ দেখিয়ে কী হবে তাপসদা। তবে যাক, আজ অন্তত শুনতে পেয়েছেন। গুডবাইটা বলে যেতে পারব।
- গুডবাই? আপনি কে? কে আপনি? চট করে বলুন নয়তো...।
- কতবার বলব! ভূতকে চমকিয়ে লাভ নেই তাপসবাবু। বললাম তো রিল্যাক্স। আর আপনি কি সত্যিই আমায় চিনতে পারেননি?
- আমার চেনা উচিৎ ছিল?
- আলবাত চেনা উচিৎ ছিল। খুন করবেন অথচ যাকে খুন করলেন তাকে বেমালুম ভুলে মেরে দেবেন?
- যত পাগল অপোগণ্ড জোটে আমারই কপালে। আমি খুনি? বলতে লজ্জা করে না? কে রে তুই?

- রিল্যাক্স। আমি আপনার নিউ ইয়ারের হেলথ রেজোলিউশন; নিয়মিত জগিং আর পরিমিত খাওয়াদাওয়ার রেজোলিউশন। আমায় চিনতে যে পারবেন না তা বেশ জানতাম; জানুয়ারির অর্ধেক পেরিয়ে গেছে যে।

Tuesday, January 8, 2019

চুমু অ্যানোমালি

- হ্যালো হেডঅফিস!

- হ্যালো! কোন ইউনিট থেকে বলছেন? 

- দু'শো বাহাত্তর বাই এ বাই থ্রি জেড নাইন থ্রি।  

- দু'শো বাহাত্তর বাই এ বাই থ্রি জেড নাইন থ্রি? হেডঅফিসে আপনার কল তো বড় একটা আসে না...। 

- অত নরম ভাবে থাপ্পড় কষিয়ে কী হবে স্যার। সোজাসুজি বলুন আমি অকাজের। 

- না না, ও মা! আমি তেমন ভাবে বলতে চাইনি ভাই...।

- চাইবেন নাই বা কেন বলুন। বত্রিশ বছরের জীবনে আমি এই প্রথম হেডঅফিসে কল করেছি। আমি ব্রেনের রোমান্টিক-চুমু রেজিস্ট্রেশন ইউনিট, কিন্তু আজ পর্যন্ত একটা মাইনর চুমুও স্মৃতি হিসেবে ফাইল করতে পারিনি মগজ হেডঅফিসের মেমরি রেজিস্টারে। খুলি-স্পেস নষ্ট করে চলেছি কেবল। 

- মনখারাপ করতে নেই ভায়া। মনখারাপ করতে নেই। তা আজ কী মনে করে? চুমু রেজিস্টার করার আছে নাকি? চুমু-রেজিস্টারে প্রথম এন্ট্রি আজ হবে নাকি?

- ইয়ে, ব্যাপারটা গোলমেলে। 

- গোলমেলে?

- অ্যানোমালি রিপোর্ট করার আছে হেডঅফিস স্যার। 

- ভাই দু'শো বাহাত্তর বাই এ বাই থ্রি জেড নাইন থ্রি ওরফে চুমু-সেন্টার। আপনি কি শিওর? চুমু নয়? অ্যানোমালি?  

- হান্ড্রেড পার্সেন্ট। ঠোঁট এবং জিভ থেকে কোনও সিগনাল আসেনি। কিন্তু জানেন, আমার ইউনিট-মনিটরের সমস্ত গ্রাফ চুমুর মত লাফালাফি করেছে ঝাড়া আড়াই ঘণ্টা। একদম জিভে জিভ চুমু লেভেলের এক্সট্রিম রিপ্‌লস দেখা গেছে গ্রাফে। অবিকল স্মুচ এফেক্টস। 

- অথচ জিভ ঠোঁট থেকে কোনও সিগনাল নেই ভাই দু'শো বাহাত্তর বাই এ বাই থ্রি জেড নাইন থ্রি? আপনি?

- জিরো। চুমু রিপলস মনিটরে অথচ জিভ ঠোঁট চুপচাপ। তা না হলে আর কাঁদুনি গাইছি কেন হেডঅফিসদাদা। 

- কী মুশকিল। চুমু সেন্টারের মনিটরে চুমু-রিপ্‌লস দেখা গেছে, কাজেই মেমরি রেজিস্টারে তো এন্ট্রি করতেই হবে। এ'দিকে ঠোঁট আর জিভ থেকে কোনও সিগনালই নেই! লে হালুয়া। এন্ট্রি করব কী ভাবে। 

- ভাবুন স্যার। কী ডেঞ্জারাস ব্যাপার। এখন উপায়?

- দাঁড়ান। এরর্‌ লগ চেক করি। লাইনে থাকুন। 

- বেশ, দেখুন। 

- এই যে, পাওয়া গেছে। চুমু রেপ্লিকেটিং সিগন্যাল আপনি কোথা থেকে রিসিভ করেছেন সে'টা মালুম হয়েছে। যাক বাবা। 

- অ্যানোমালি আইডেন্টিফাই করা গেছে? মাইরি? 

- স্পষ্ট। আমাদের হিউম্যান ইউনিট আজ চুমু খায়নি তাই আপনি ঠোঁট বা জিভ থেকে কোনও সিগন্যাল পাননি। 

- তবে মনিটরে যত উত্তেজনা? স্মুচ সমান সিগন্যালস? 

- হিউম্যান ইউনিট পুরনো বইয়ের তাক সাফ করার সময় খুঁজে পেয়েছেন কলেজ জীবনের নোটের খাতা। আর সেই খাতার ভাঁজে রাখা ছিল... বারো তেরো বছর পুরনো এক জোড়া হলদেটে মিনিবাসের টিকিট আর আধ-ছেঁড়া এক জোড়া গানের অনুষ্ঠানের পাস; সুমনের গানের অনুষ্ঠানের। তো দশ বছর কলকাতার বাইরে থাকা হিউম্যান ইউনিট স্বাভাবিক ভাবেই কেঁপে ওঠেন সে পুরনো টিকিট আর পাসের কাগজ দেখে। ব্রেনের বিভিন্ন ইউনিটে এমার্জেন্সি সাইরেন ছড়িয়ে পড়ে। অতঃপর হিউম্যান ইউনিট খামচে ধরেন সে টিকিট-জোড়া। সেই খামচে ধরাই চুমুর সিগনাল হয়ে আপনার ইউনিটের মনিটরে গিয়ে হামলে পড়ে। 

- ওহ, তাই এই অ্যানোমালি। চুমু নয়। 

- বলেন কী! এ যে রীতিমত চুমু ভাই দু'শো বাহাত্তর বাই এ বাই থ্রি জেড নাইন থ্রি ওরফে চুমু-সেন্টার! ঠোঁট আর জিভে এসে রোম্যান্স আটকে থাকবে তা কী হয়? হেডঅফিস মেমরির চুমু রেজিস্টারে আজই আপনার প্রথম এন্ট্রি হবে, কংগ্রাচুলেশনস!  

Thursday, January 3, 2019

কাহারবা নয়


রাতের বাতাসে বেশ ডিসেম্বরের ছ্যাতছ্যাত। গায়ে চাদর জড়িয়ে বসে রেডিও শুনছিলাম, মনে বেশ বৈঠকি আমেজ। টকমিষ্টি চানাচুরের কয়েক পেগ মুখে পড়তেই মান্নাবাবুর গলাটা কানে আরো মিষ্টি হয়ে ঠেকল বোধ হয়।

সমস্তই ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু হঠাৎ কী যে হল; দুম করে 'কাহারবা নয় দাদরা' গেল মাঝপথে থেমে। রেডিও থামেনি, বিজ্ঞাপন বিরতিও নয়৷ মান্নাবাবু গান থামিয়ে দুম করে জিজ্ঞেস করলেন;.

- কী ব্যাপার? মতিগতি ঠিক আছে?

- ইয়ে, আমায় বলছেন? (আমি তো থ)

- আর কাকে বলব শশীবাবু? বলি হচ্ছে না যে। আসর ঝুলে যাচ্ছে।

- আজ্ঞে আমি আপনার তবলচি শশী নই৷ আমি তো স্রেফ শ্রোতা, তাও রেডিওর বাইরে বসে। ওই কাহারবা দাদরার ইস্যুটা আপনি আপনার তবলচিকে কনভে করুন, কেমন?

- চোপ। যত ভুল কি তবলায়? গান শোনার ব্যাপার কি এতটাই এলেবেলে? হচ্ছে না আপনার দ্বারা, এমন বিশ্রীভাবে গান শুনছেন যে মনে হচ্ছে রেডিও থেকে বেরিয়ে এসে কান মুলে দিই।

- সর্বনাশ! আমি কী করলাম? মন দিয়েই শুনছিলাম যে। ওই যে 'গোলাপজল দাও ছিটিয়ে,  গোলাপফুলের পাপড়ি ছড়াও'...বড্ড দরদ দিয়ে ধরেছেন স্যার...আহা। খামোখা থামতে গেলেন..।

- খামোখা? বটে? এ'দিকে আপনি যে ভুল তালে চানাচুর চিবোচ্ছিলেন, সে বেলা? 

- আজ্ঞে?

- গানের তাল একদিকে, আর আপনার চানাচুর চেবানোর মচমচ যে অন্য পানে বইছে। দুনিয়াকে রসাতলে পাঠাতে আপনার মত দু'চারজন বেপরোয়া চানাচুর-চিবিয়েই যথেষ্ট। 

- তালে তালে চানাচুর চেবাবো?

- চানাচুর তৈরিই হয়েছে গানের তালে তালে চেবানোর জন্য। তাতেই গানের মুক্তি, চানাচুরের উত্তরণ। 

- আর আমি বেসুরে চানাচুর চিবিয়ে গান মাটি করছি?

- আলবাত।  সুরের ওঠা নামা অনুভব করুন, মনপ্রাণ দিয়ে। আর চানাচুরের প্রতিটি কণা সেই অনুভবে এসে মিশবে। তা না পারলে বাড়ির ওই চার ডিবে চানাচুর গঙ্গায় ভাসিয়ে আসুন। অসুরের হাতে ইয়ারবাড আর বেসুরোর মুখে চানাচুর বেমানান।

***

আমার বার বার মনে হয় যে 'কাহারবা নয় দাদরা' শুনতে শুনতে আমি হয়ত আড়াই সেকেন্ডের জন্য ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। তবে এই চানাচুর চেবানোর সুর-তাল-লয় যে ধরে ফেলেছি, তা কি মান্নাবাবুর ধমক ছাড়া হত? সুগায়কের সহশিল্পীদের মধ্যে একজন চানাচুর-চিবিয়ে-শ্রোতার গুরুত্ব অপরিসীম, তা আজ বেশ বুঝেছি। আর বেহালা শিখতে না পারার আফসোসটা কেটে গেছে, স্পষ্ট বুঝছি যে এ দুনিয়ায় বেহালাবাদকের চেয়ে গুণী চানাচুর-চিবিয়ের সংখ্যাটা অনেক কম।