Saturday, November 3, 2018

অপচয়

- হোয়াই শুড উই হায়্যার ইউ?

- কারণ...কারণ আমি জানপ্রাণ লাগিয়ে কাজ করব স্যার৷ দেখবেন! যে কোনো কাজ! প্রয়োজনে দিনের পর দিন না ঘুমিয়ে না খেয়ে...অনবরত কাজ করে যাব। ফ্যাক্টরি থেকে কোথাও বেরোব না....।

- মিস্টার সেন। ফ্যাক্টরি ফ্লোরে প্রাণপাত করার জন্য ক্যান্ডিডেট কম পড়েনি। আপনার মত অন্তত হাজারখানেক মানুষের আবেদনপত্র জমা পড়েছে। চাকরীটা তাদেরও জন্যেও ততটাই দরকারী মিস্টার সেন। যাকগে, অন্য প্রশ্নে আসি। আগের চাকরীটা গেল কী করে?

- বিশ্বাস করুন, দোষ আমার ছিল না৷ যন্ত্রটা আপনা থেকেই স্লো ডাউন করেছিল; আমার অপারেট করার ভুলে নয়। তা'তে প্রডাকশন গ্রোথ পয়েন্ট ফাইভ পার্সেন্ট কমে গেছিল চার মিনিটের জন্য। তবে জবাবদিহি করার কথা ছিল মেন্টেনেন্স টীমের, অপারেটর হিসেবে আমার কিছুই করার ছিল না।

- আপনার এই ঘ্যানঘ্যান করার স্বভাবটা কি পুরনো?

- স্যর, বিশ্বাস করুন...।

- আজকের ইন্টারভিউতে যদি কিছু একটা করে না উঠতে পারেন মিস্টার সেন...।

- আমার বেকারির তিরিশ দিন পূর্ণ হবে। আর তা'হলে কাল ভোরে ফায়্যারিং স্কোয়্যাড। সরকারী  মেমো এসে গেছে।

- ভাবতে অবাক লাগে, একশো দশ কি বারো বছর আগেও আপনারই মত বেকার মানুষগুলোকে দিনের পর দিন বাঁচিয়ে রাখা হত। এমন কী অবসরপ্রাপ্ত প্রতিটা মানুষকেও বাঁচতে দেওয়া হত। সেই দিনগুলো সম্বন্ধে আপনার কী মতামত মিস্টার সেন?

- অপচয়।  রিসোর্সের তীব্র অপচয়। যার ফলে মানুষকেই ভুগতে হয়েছে। আর সেই সময় শুধু বেকার বা বৃদ্ধরাই নন, অনেক মানুষ এমন সব খেলো জীবিকায় নিজেদের গা ভাসিয়ে রেখেছিলেন যে'খানে তাদের সমাজে নেট প্রডাকশন-ওয়াইজ কন্ট্রিবিউশন ছিল জিরো, অনেক ক্ষেত্রে নেগেটিভ। 

- তেমন কিছু প্রফেশনের উদাহরণ দিতে পারেন?

- কবি, সাহিত্যিক, গায়ক, অভিনেতা...এ'রকম আরো দু'শো বত্রিশ রকমের জীবিকায় থাকা যত মানুষ; যাদের ইভল নিউক্লিয়াস বলা হত। দ্য গ্রেট পার্জিং অফ টু থাউজ্যান্ড অ্যান্ড সেভেন্টিটুতে এ'দের সবাইকে...। এ'দের সবাইকে ফায়্যারিং স্কোয়্যাডের সামনে রেখে...।

- আপনার গলা কাঁপছে মিস্টার সেন, আপনিও কি আন্ডারগ্রাউন্ড কবিতা অ্যাক্টিভিস্টদের মত এদের প্রতি সিম্প্যাথেটিক?

- না! না! বিশ্বাস করুন স্যার ও'দের আমি ঘেন্না করি। যারা এক দানা সম্পদও নষ্ট করে তাদের আমি সহ্য করতে পারিনা। আমি আমাদের কন্সটিটিউশনের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ, আর পাঁচটা সৎ নাগরিকের মতই। 

- আই মাস্ট সে মিস্টার সেন, আপনাকে আমার তেমন অপছন্দ হয়নি।

- রিয়েলি স্যর?

- রিয়েলি! এই ফ্যাক্টরিতে আপনি একদম বেমানান হবেন না। হিউম্যান রিসোর্সকে বলে দিচ্ছি আপনার একটা ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করতে। ওই ম্যান্ডেটরি বেসিক ব্যাপার। আপনার দুই জেনারেশনের মধ্যে যদি কোনো ইভল স্কোয়্যাডের মানুষ ছিল কিনা; ফর্ম্যালিটি মাত্র। আর তারপর আপনার একটা শপ ফ্লোর প্রডাক্টিভিটি টেস্ট হবে। আজকেই। কঙ্গ্র‍্যাচুলেশনস মিস্টার সেন। 

- থ্যাঙ্ক ইউ স্যার। থ্যাঙ্কিউ। 

ভবদুলালের ভোর

নভেম্বরের ভোরগুলোয় অমন একটু শীতশীত ভাব থাকেই। আর ছুটির ভোরগুলোতে ট্রেনও খালিখালি থাকবেই। ভোরের শীতশীত আমেজ আর ট্রেনের ফাঁকাফাঁকা ভাব; ভবদুলালের মনে হচ্ছিল যেন তার বুকের মধ্যে কেউ দু'ঘটি আনন্দ-শরবত ঢেলে দিয়েছে।

আর মনের মধ্যে আনন্দ চাগাড় দিয়ে উঠলেই একটু গড়িয়ে নিতে ইচ্ছে করে তাঁর। এমনিতেই চোখ ঢুলঢুল করছিল; সেই অন্ধকার থাকতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে স্টেশনমুখো ছুটতে হয়েছে। কামরাটা দিব্যি ফাঁকা; কাজেই সীটের ওপরেই লম্বা হতে দ্বিধা করেনি ভবদুলাল। হাওয়ায় শিরশিরানি ভালোই আছে, তবু জানালার কাচ সামান্য তুলে রেখেছিল সে। ট্রেনের ঝুকুরঝুকুর শব্দ আর দুলুনিতে আমেজ জমাট বাঁধে বেশ। বিভিন্ন ঝকঝকে স্মৃতির টুকরো আপনা থেকেই বুকের মধ্যে সেঁধিয়ে গেল। জানালা বেয়ে গড়িয়ে আসা হাওয়ার কনকনে যখন দু'চোখে ঘুম জড়িয়ে এলো; তখন সেই সে'দিনের কথা মনে ভাসতে লাগল; অফিসের বড়সাহেব বলছেন "কঙ্গ্রাচুলেশন ভবদুলাল, ইউ হ্যাভ বিন প্রমোটেড"।

তড়াক করে ঘুমটা গেল কেটে। ঝুকুরঝুকুর শব্দ আর ট্রেনের দুলুনি সব গায়েব, সামনে একটা বিকট টেবিল। টেবিলের ও'পাশে বড়সাবেব; তার চোখজোড়া কটমটে;

"তোমায় আমি প্রমোশনের খবর দিচ্ছি ভবদুলাল, আর তুমি ঝিমোচ্ছ"? 

" সরি স্যর, সরি। না না, ঝিমিয়ে পড়িনি। খুব মন দিয়ে শুনছিলাম আপনার কথা, তাই চোখটা বুজে এসেছিল"। 

"ইউ হ্যাভ বিন প্রমোটেড। এক্সেকিউটিভ টু সিনিয়র এক্সেকিউটিভ। উইথ ইমিডিয়েট এফেক্ট। এবং তার সঙ্গে তোমায় দু'টো বাড়তি দায়িত্বও দেব"।

" দু'টো কেন বড়বাবু? চারটে দেবেন", জোর করে ঝিমুনিভাব ঝেড়ে ফেলতে চাইল ভবদুলাল। আমতাআমতা করে আরো কিছু বলতে যাবে, এমন সময় চনমনে খাস্তা কচুরির সুবাস নাকে বুকে টের পেল সে। আহা, বাতাসে সে গন্ধ যেন নেচে নেচে বেড়াচ্ছে; তার অপূর্ব আবেশে নিজের অজান্তেই ফিক করে হেসে ফেলল আর পরক্ষণেই নিল সামলে। কী না কী ভেবে বসবেন বড়বাবু। 

"থ্যাঙ্কিউ, থ্যাঙ্কিউ সো মাচ স্যার"। বড়সাহেবের দিকে কৃতজ্ঞতা ভরা আপ্লুত দৃষ্টিতে তাকানোর চেষ্টা করল ভবদুলাল। ও মা! বড়সাহেবের কাঁধে ওই ঢাউস ঝুড়িটা এলো কেন? আর সেই ঝুড়ি বোঝাই বর্ধমান লাইন-খ্যাত খাস্তা কচুরি যে! ঝুড়ির এক কোণে শালপাতা আর জোলো কাসুন্দির ডিবে।

"ঘুমের মধ্যেই কচুরি বলে হাঁক দিলেন দেখছি দাদা! আসুন, জোড়া দশটাকা" দু'টো কচুরি মোড়া শালপাতাটা তখন ভবদুলালের নাকের কাছে প্রায়।

"দু'টো কেন বড়বাবু? চারটে দেবেন"।

Friday, November 2, 2018

নো পার্কিং

হাইওয়ে ঘেঁষা ছোট্ট বসতি। এত রুক্ষ যে আর পাঁচটা বাংলার গাঁয়ের সঙ্গে তুলনা চলে না, আবার শহর যে নয় তা এ অঞ্চলের নিরিবিলিতেই মালুম হয়। খানকয়েক বাড়ি বেয়াড়া ভাবে দাঁড়িয়ে; মানুষজন কে আছে না আছে তা বাইরে থেকে দেখে নিশ্চিত হওয়া যায়না। দু'চারজন লোক যাও বা দেখা যায়, তা ওই জরাজীর্ণ 'জনতা ধাবা'তেই। পথচলতি কিছু ট্রাক বা অন্যান্য গাড়ি চা জলখাবারের জন্য দাঁড়ায়। 

মানুষজনের দেখা পাওয়াই দুস্কর, কাজেই ঝগড়াঝাটির শব্দ সচরাচর কানে ভেসে আসে না। কিন্তু আজ একটা ভালো রকমের তালগোল পাকিয়েছিল, যা শুনে দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন অমর মিত্র। তাঁর বাড়ি থেকে দু'পা এগিয়েই একটা পাঁচিলের পাশে দাঁড়িয়ে নীল টিশার্ট পরা এক মাঝবয়সী ভদ্রলোক রীতিমত হাত পা ছুঁড়ে চিৎকার চেঁচামেচি জুড়েছেন। আর ভদ্রলোক আঙুল নাচিয়ে যাকে ফালাফালা করতে ফেলতে চাইছেন, সে একজন বিকট জোব্বা পরিহিত ছোকরা; সে ভয়ে প্রায় কাঁদোকাঁদো, ঠকঠক করে কাঁপছে। তম্বি করা ভদ্রলোককে দেখে মনে হচ্ছে সামনের ছেলেটিকে যে কোনো মুহূর্তে চড়থাপ্পড়ে কষিয়ে দিতে পারেন।

দ্রুত পায়ে নীল টিশার্টের ভদ্রলোকের দিকে এগিয়ে গেলেন অমর মিত্র। 

- কিছু গোলমাল হয়েছে নাকি?

- গোলমাল? রাহাজানি! ডাকাতি! 

- ব্যাপারটা কী?

- আপনি এই এলাকায় থাকেন?

- হ্যাঁ। আমার নাম অমর। কিন্তু আপনি বোধ হয়...।

- আমি নিমাই দত্ত! নিজে ড্রাইভ করে ইলামবাজারের দিকে যাচ্ছিলাম। ওই ধাবার চা খাবো বলে দাঁড়িয়েছি..। গাড়িটা এ'খানে পার্ক করে ও'দিকে গেছিলাম...।

- ও'মা! ধাবা তো কিছুটা দূরে৷ আপনি এ'খানে পার্ক করেছিলেন কেন?

- গাছের ছায়া দেখে অফকোর্স। যা রোদ্দুর। মিনিট দশেক পর ফিরে দেখি আমার গাড়ি হাওয়া! হাওয়া! মাত্র দু'বছরের গাড়ি। মারুতি ওয়্যাগনআর, সাদা রঙের। নাইন টু সেভেন ফাইভ। এই দশ মিনিট আগেও ছিল৷ এখন নেই! উবে গেছে জাস্ট। আর এই ব্যাটাচ্ছেলে আশেপাশে ঘুরঘুর করছিল...।

- আর তাই আপনি ওর ওপর হামলে পড়লেন?

- না মানে, ওর হাবভাব সুবিধের ঠেকছে না! দেখুন না কেমন চুপসে আছে!

- চুপসে আছে আপনার গলাবাজির ভয়ে!

- এই শুনুন, আপনি চেনেন একে?

- না! এ অঞ্চলে একে আগে দেখিনি। তবে আমি নিশ্চিত এ নির্দোষ।  গাড়ি চোর তো আর গাড়ি চুরি করে নিজের পকেটে লুকিয়ে রাখতে পারবে না৷ আর চুরির পর গাড়ির মালিকের মুখঝামটা শোনার জন্য পড়েও থাকবে না।

- থামুন মশাই! দেখুন না কেমন মিউমিউ করছে। আর কী বিটকেল এর জামা! হারামজাদা! বল আমার গাড়ি গেল কোথায়! আমি নিশ্চিত এ ব্যাটা গোলমেলে!

- আপনিও তো কম গোলমেলে নন মশাই। দেওয়ালে স্পষ্ট নো পার্কিং লেখা আছে। তবু এ'খানে পার্ক করতে গেলেন কেন?

- কোথাকার আমার ট্রাফিক পুলিশ এলেন গো! চাদ্দিকে একটা সাইকেল পর্যন্ত নেই সেখানে আমায় দেওয়ালে নো পার্কিং লেখা দেখাচ্ছেন? বেশ করেছি এখানে পার্ক করেছি।

- তা'হলে বেশ হয়েছে আপনার গাড়ি গায়েব হয়ে গেছে।

- তবে রে! এত বড় সাহস? তুইও কি গাড়িচোরদের দলে আছিস নাকি?

- দেখুন, ভদ্রভাবে কথা বলুন। এ'খান থেকে দু'মাইলের মধ্যে একটা পুলিশচৌকি আছে। ওই ও'দিকে; সোজা গেলে রাস্তার বাঁ হাতে পড়বে। সে'খানে গিয়ে রিপোর্ট লিখিয়ে আসুন।

- তাই করব! কাউকে ছাড়ব না! নিমাই দত্তের গাড়ি গায়েব করা? দেখাচ্ছি মজা! 

দুদ্দাড় করে এগোলেন নিমাই দত্ত। ঘুরে তাকিয়েছিলেন কয়েকবার; বোধ হয় চাউনিয়ে ঝলসে দিতে চাইছিলেন অমরবাবু আর বিদঘুটে জোব্বা পরা ছেলেটাকে। ছেলেটা থরথর করে কাঁপছিল। অমরবাবু ওর দিকে এগিয়ে যেতেই ছেলেটা বলে উঠল;

- আমি কিছু করিনি...বিশ্বাস করুন।

- জানি। আমি চিনি তোমায়। 

- চেনেন? 

- তোমাকেই নিতে এসেছি ভায়া। বদমানুষের খপ্পর থেকে তোমার মত নিষ্পাপ বন্দীদের মুক্তি দিতেই তো এই নো পার্কিং দেওয়াল। চলো আমার সঙ্গে। অনেক বন্ধুবান্ধব অপেক্ষা করে আছে। তোমার নামটা কী যেন ভাই?

- আজ্ঞে, নদুসাপাঁ।

- নয় দুই সাত পাঁচ। অফ কোর্স। এসো আমার সঙ্গে। আমার গ্যারেজ এখান থেকে খুব দূরে নয়।

কুটুম্ব

- চা খাবেন?

- না।

- কফি?

- উঁ...না থাক।

- কোল্ডড্রিঙ্কস?

- শুনুন না মলয়দা। চা-ঠা থাক বরং।

- ও মা! সে কী বিধুদা! আপনি আমার শ্বশুরবাড়ির পাড়ার লোক। অদ্দূর থেকে আমার অফিসে এসেছেন৷ কিছু একটা না খেলে চলবে কী করে। আই ইনসিস্ট। আচ্ছা, লস্যি আনিয়ে দেব? আমাদের অফিসের নীচেই..।

- ওই চা হলেই হবে।

- গ্রীন টী দিতে বলি?

- গ্রীন? না ওই নর্মাল চা হলেই হবে।

- দুধ চা?

- হ্যাঁ।

- গুড। আমাদের নির্মল প্যান্ট্রি সামলায়। এ-ক্লাস চা বানায়। এ-ক্লাস। দাঁড়ান, হাঁক দিই। ওহে নির্মল, দু'টো চা দিয়ে যাও। একটা দুধচা। একটা লিকার। চিনি আলাদা করে। বিধুদা, সঙ্গে থিন অ্যারারুট না ক্রীমক্র‍্যাকার?

- বিস্কুটের দরকার নেই।

- না না, তা কী করে হয়। নির্মল! শুনতে পারছ তো? চায়ের সঙ্গে বরং একটু কাজু নিয়ে এসো। সল্টেড। 

- মলয়দা, ব্যস্ত হবেন না প্লীজ..।

- কী বলছেন। আপনি আমার শ্বশুরমশাইয়ের ছোটবেলার বন্ধুর ছেলের আপন শালা। এ'টুকু অফার করব না? ওহে নির্মল, কাজুর সঙ্গে একটু নিমকি দিও তো। 

- বলছিলাম যে, দাদা! বড় বিপদে পড়ে আপনার কাছে এসেছি।

- বিপদটিপদের কথা শুনব। তবে তার আগে আমাদের অফিসের এই স্পেশাল কুচো নিমকি খেয়ে দেখুন। মিনিমাম তেল, ম্যাক্সিমাম মুচমুচ। বম্বে থেকে আমাদের ডিরেক্টর সাহেব এলে আড়াই কিলো প্যাক করিয়ে নিয়ে যান। এভরিটাইম। শোনো নির্মল, নিমকিটা একটু বেশি করে এনো ভাই।

- আমার বড় বিপদ মলয়দা।

- বিপদ? 

- আপনাদের কোম্পানির এক ভদ্রলোক, ট্রেনে আলাপ। সে না, আমায় কেমন করে যেন হাত করে নিলে।

- হাত করে নিলে?

- মানে ওই, আমায় বললে সে হিউম্যান রিসোর্সে আছে। আর বললে; সে একটা চাকরীর ব্যবস্থা করতে পারে। কোম্পানির কাগজপত্রটত্রও দেখালে।

- বলেন কী? অ্যালেন স্টীল অ্যান্ড প্রজেক্টেসের এইচ-আর সামলানো লোকের সঙ্গে আপনার ট্রেনে আলাপ? 

- সদাশিব সান্যাল। কাটোয়া লাইনে বাড়ি। মানে, তাই তো বললে।

- এখানকার হিউম্যান রিসোর্স আমি সামলাই বিধুদা! ও নামের কেউ এখানে চাকরী করে না। আর আপনি আমার সঙ্গে একবার কথা বলতে পারলেন না?

- আসলে, আমার ঠিক খেয়াল ছিল না। তাছাড়া, ব্যাপারটা একটু ইয়ে, আন্ডার দ্য টেবিল ছিল কিনা। সে বোঝালে যে দু'লাখ টাকা দিলেই..।

- ও মাই গড! আপনি ওকে টাকা দিয়েছিলেন?

- হার্ড ক্যাশে। আমার মাথাখারাপ হয়ে গেছিল। লোভে পাপ, পাপে সর্বনাশ। 

- শুনেই খুব খারাপ লাগছে বিধুদা। আপনি যদি একবার অন্তত আমার সঙ্গে কথা বলতেন। তা'হলে এমন বিশ্রি ভাবে ঠকতে হত না।

- আসলে, ঘুষটুষের ব্যাপার কি আর জামাইমানুষের সঙ্গে আলোচনা করা যায়?

- দু'লাখ টাকার ধাক্কা। আপনাকে কী ধাপ্পাটাই না দিয়েছে। যাকগে। এমন দুঃখের খবর নিয়ে এসেছেন; সামান্য চা নিমকি খাইয়ে আপনাকে ছাড়ি কী করে বিধুদা। আপনার পাড়ার জামাই বলে কথা। ওহে নির্মল! চা নিমকি ক্যানসেল। আমরা নীচের রেস্টুরেন্ট থেকে বরং কাটলেট খেয়ে আসব।

- আহা! আবার কাটলেট কেন।

- নীচের দোকানে যা মাটন কাটলেট সার্ভ করে না বিধুদা, কোটি টাকা হারানোর দুঃখ হাপিস হয়ে যায়। দু'লাখ তো নস্যি। নস্যির কথায় মনে পড়লো, কাটলেটের পর কিন্তু আপনাকে লস্যি খেতেই হবে। রিফিউজ করলে শুনব না।

- কিন্তু...।

- আরে চলুন চলুন। কিছুতেই না শুনছি না। 

- আহা, আসলে আমি...।

- ওহে নির্মল। আমরা বেরোলাম বাবা। রুমের দরজাটা বন্ধ করে দিও। কেমন? চলুন। আর সময় নষ্ট নয়।

বিধুবাবুকে কাটলেট লস্যি খাইয়ে, বাসে তুলে দিয়ে যখন মলয়বাবু বাড়িমুখো হলেন তখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে। কাল সকালে এসেই নির্মল ছোকরাকে জোর ধমক দিতে হবে। পইপই করে বলা সত্ত্বেও ব্যাটা তার শ্বশুরবাড়ির লাইনের লোককে পাকড়াও করে। চা নিমকি নিয়ে সদাশিব সান্যাল ঘরে এসে ঢুকলেই যে কী বিশ্রী কাণ্ড হত, তা ভাবতেই বার বার শিউরে উঠছিলেন মলয়বাবু।

রসম-এ-মহব্বত

যে যাই বলুক, ভালোমানুষ চারদিকে দিব্যি ছড়িয়ে আছে৷ কেউ আলপটকা উপকার করে বেড়াচ্ছে, তো কেউ ট্যাক্স ফাঁকির কথা শুনলেই আঁতকে উঠছে। কেউ কেউ আবার অন্যায় দেখলেই তেলেবেগুন মোডে চলে যাচ্ছে। কাজেই ভালোমানুষের খোঁজ পাওয়া তেমন বড় ব্যাপার নয়। তার চেয়ে বরং ভালো ডিম তড়কার সন্ধান পাওয়া ঢের কঠিন। ফোড়ন মশলা ঠিকঠাক পড়তে হবে, ঝালনুন খাপে খাপ হতে হবে, ডিমের পরিমাণ বেশি কম হবে না; হাজার রকম নক্সা মেনে চলার কথা।

নেদু আলাভোলা মেজাজে তড়কা বানানো চলেনা। হাইওয়ের ওপর ট্রাক আসা যাওয়ার শোঁ শাঁ আর ঢাউস উনুনের ওপর চাটুতে পেঁয়াজ টমেটো লঙ্কাকুচি ছাড়ার চ্যাড়চ্যাড় শব্দ মিলে প্রিলিমিনারি সিম্ফনি তৈরি হবে। ধাবার ক্যাশিয়ারের থ্রুতে উনুনের ও'পাশে ইনস্ট্রাকশন যাবে "এক্সট্রা ঝাল হবে, ডাবল ডিম"।  নাকে আসবে রুটি সেঁকার গন্ধ আর পাশের টেবিল বা খাটিয়া থেকে ভেসে আসা চিকেন কষার সুবাস। স্টিলের গেলাসে ডিম ফ্যাটানোর ফটরফটর শব্দ কানে আসলেই জিভ তৈরি হবে; ওই এলো বুঝি। 

স্টিলের থালার পাশে একবাটি তড়কা আর ধবধবে হাফফুলকো খানকয় রুটি। সঙ্গে ফালি করা কাঁচা পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা আর সামান্য আচার। অবশ্যই সে তড়কা প্যাকেট করে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার মানে হয়না। বাড়ির ডাইনিং টেবিলে বসে জি-টিভিতে সারেগামাপা দেখতে দেখতে তড়কা খাওয়া আর লুঙ্গি, স্যান্ডোগেঞ্জি পরে ব্রিসেবেনে ব্যাট করতে নামা; একই ব্যাপার। 

মুখভর্তি তড়কা-রুটির আবেশকে ইন্টেন্সিফাই করবে ধাবার ধারে দাঁড় করানো ট্রাকের স্ট্রিরিও থেকে ভেসে আসা কুমারশানুর আশ্বাস; " দিল হ্যায় কি মানতা নহি, মুশকিল বড়ি হ্যায় রসম-এ-মোহব্বত, ইয়ে জানতা হি নহি"..।