Saturday, November 3, 2018

ভবদুলালের ভোর

নভেম্বরের ভোরগুলোয় অমন একটু শীতশীত ভাব থাকেই। আর ছুটির ভোরগুলোতে ট্রেনও খালিখালি থাকবেই। ভোরের শীতশীত আমেজ আর ট্রেনের ফাঁকাফাঁকা ভাব; ভবদুলালের মনে হচ্ছিল যেন তার বুকের মধ্যে কেউ দু'ঘটি আনন্দ-শরবত ঢেলে দিয়েছে।

আর মনের মধ্যে আনন্দ চাগাড় দিয়ে উঠলেই একটু গড়িয়ে নিতে ইচ্ছে করে তাঁর। এমনিতেই চোখ ঢুলঢুল করছিল; সেই অন্ধকার থাকতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে স্টেশনমুখো ছুটতে হয়েছে। কামরাটা দিব্যি ফাঁকা; কাজেই সীটের ওপরেই লম্বা হতে দ্বিধা করেনি ভবদুলাল। হাওয়ায় শিরশিরানি ভালোই আছে, তবু জানালার কাচ সামান্য তুলে রেখেছিল সে। ট্রেনের ঝুকুরঝুকুর শব্দ আর দুলুনিতে আমেজ জমাট বাঁধে বেশ। বিভিন্ন ঝকঝকে স্মৃতির টুকরো আপনা থেকেই বুকের মধ্যে সেঁধিয়ে গেল। জানালা বেয়ে গড়িয়ে আসা হাওয়ার কনকনে যখন দু'চোখে ঘুম জড়িয়ে এলো; তখন সেই সে'দিনের কথা মনে ভাসতে লাগল; অফিসের বড়সাহেব বলছেন "কঙ্গ্রাচুলেশন ভবদুলাল, ইউ হ্যাভ বিন প্রমোটেড"।

তড়াক করে ঘুমটা গেল কেটে। ঝুকুরঝুকুর শব্দ আর ট্রেনের দুলুনি সব গায়েব, সামনে একটা বিকট টেবিল। টেবিলের ও'পাশে বড়সাবেব; তার চোখজোড়া কটমটে;

"তোমায় আমি প্রমোশনের খবর দিচ্ছি ভবদুলাল, আর তুমি ঝিমোচ্ছ"? 

" সরি স্যর, সরি। না না, ঝিমিয়ে পড়িনি। খুব মন দিয়ে শুনছিলাম আপনার কথা, তাই চোখটা বুজে এসেছিল"। 

"ইউ হ্যাভ বিন প্রমোটেড। এক্সেকিউটিভ টু সিনিয়র এক্সেকিউটিভ। উইথ ইমিডিয়েট এফেক্ট। এবং তার সঙ্গে তোমায় দু'টো বাড়তি দায়িত্বও দেব"।

" দু'টো কেন বড়বাবু? চারটে দেবেন", জোর করে ঝিমুনিভাব ঝেড়ে ফেলতে চাইল ভবদুলাল। আমতাআমতা করে আরো কিছু বলতে যাবে, এমন সময় চনমনে খাস্তা কচুরির সুবাস নাকে বুকে টের পেল সে। আহা, বাতাসে সে গন্ধ যেন নেচে নেচে বেড়াচ্ছে; তার অপূর্ব আবেশে নিজের অজান্তেই ফিক করে হেসে ফেলল আর পরক্ষণেই নিল সামলে। কী না কী ভেবে বসবেন বড়বাবু। 

"থ্যাঙ্কিউ, থ্যাঙ্কিউ সো মাচ স্যার"। বড়সাহেবের দিকে কৃতজ্ঞতা ভরা আপ্লুত দৃষ্টিতে তাকানোর চেষ্টা করল ভবদুলাল। ও মা! বড়সাহেবের কাঁধে ওই ঢাউস ঝুড়িটা এলো কেন? আর সেই ঝুড়ি বোঝাই বর্ধমান লাইন-খ্যাত খাস্তা কচুরি যে! ঝুড়ির এক কোণে শালপাতা আর জোলো কাসুন্দির ডিবে।

"ঘুমের মধ্যেই কচুরি বলে হাঁক দিলেন দেখছি দাদা! আসুন, জোড়া দশটাকা" দু'টো কচুরি মোড়া শালপাতাটা তখন ভবদুলালের নাকের কাছে প্রায়।

"দু'টো কেন বড়বাবু? চারটে দেবেন"।

Friday, November 2, 2018

নো পার্কিং

হাইওয়ে ঘেঁষা ছোট্ট বসতি। এত রুক্ষ যে আর পাঁচটা বাংলার গাঁয়ের সঙ্গে তুলনা চলে না, আবার শহর যে নয় তা এ অঞ্চলের নিরিবিলিতেই মালুম হয়। খানকয়েক বাড়ি বেয়াড়া ভাবে দাঁড়িয়ে; মানুষজন কে আছে না আছে তা বাইরে থেকে দেখে নিশ্চিত হওয়া যায়না। দু'চারজন লোক যাও বা দেখা যায়, তা ওই জরাজীর্ণ 'জনতা ধাবা'তেই। পথচলতি কিছু ট্রাক বা অন্যান্য গাড়ি চা জলখাবারের জন্য দাঁড়ায়। 

মানুষজনের দেখা পাওয়াই দুস্কর, কাজেই ঝগড়াঝাটির শব্দ সচরাচর কানে ভেসে আসে না। কিন্তু আজ একটা ভালো রকমের তালগোল পাকিয়েছিল, যা শুনে দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন অমর মিত্র। তাঁর বাড়ি থেকে দু'পা এগিয়েই একটা পাঁচিলের পাশে দাঁড়িয়ে নীল টিশার্ট পরা এক মাঝবয়সী ভদ্রলোক রীতিমত হাত পা ছুঁড়ে চিৎকার চেঁচামেচি জুড়েছেন। আর ভদ্রলোক আঙুল নাচিয়ে যাকে ফালাফালা করতে ফেলতে চাইছেন, সে একজন বিকট জোব্বা পরিহিত ছোকরা; সে ভয়ে প্রায় কাঁদোকাঁদো, ঠকঠক করে কাঁপছে। তম্বি করা ভদ্রলোককে দেখে মনে হচ্ছে সামনের ছেলেটিকে যে কোনো মুহূর্তে চড়থাপ্পড়ে কষিয়ে দিতে পারেন।

দ্রুত পায়ে নীল টিশার্টের ভদ্রলোকের দিকে এগিয়ে গেলেন অমর মিত্র। 

- কিছু গোলমাল হয়েছে নাকি?

- গোলমাল? রাহাজানি! ডাকাতি! 

- ব্যাপারটা কী?

- আপনি এই এলাকায় থাকেন?

- হ্যাঁ। আমার নাম অমর। কিন্তু আপনি বোধ হয়...।

- আমি নিমাই দত্ত! নিজে ড্রাইভ করে ইলামবাজারের দিকে যাচ্ছিলাম। ওই ধাবার চা খাবো বলে দাঁড়িয়েছি..। গাড়িটা এ'খানে পার্ক করে ও'দিকে গেছিলাম...।

- ও'মা! ধাবা তো কিছুটা দূরে৷ আপনি এ'খানে পার্ক করেছিলেন কেন?

- গাছের ছায়া দেখে অফকোর্স। যা রোদ্দুর। মিনিট দশেক পর ফিরে দেখি আমার গাড়ি হাওয়া! হাওয়া! মাত্র দু'বছরের গাড়ি। মারুতি ওয়্যাগনআর, সাদা রঙের। নাইন টু সেভেন ফাইভ। এই দশ মিনিট আগেও ছিল৷ এখন নেই! উবে গেছে জাস্ট। আর এই ব্যাটাচ্ছেলে আশেপাশে ঘুরঘুর করছিল...।

- আর তাই আপনি ওর ওপর হামলে পড়লেন?

- না মানে, ওর হাবভাব সুবিধের ঠেকছে না! দেখুন না কেমন চুপসে আছে!

- চুপসে আছে আপনার গলাবাজির ভয়ে!

- এই শুনুন, আপনি চেনেন একে?

- না! এ অঞ্চলে একে আগে দেখিনি। তবে আমি নিশ্চিত এ নির্দোষ।  গাড়ি চোর তো আর গাড়ি চুরি করে নিজের পকেটে লুকিয়ে রাখতে পারবে না৷ আর চুরির পর গাড়ির মালিকের মুখঝামটা শোনার জন্য পড়েও থাকবে না।

- থামুন মশাই! দেখুন না কেমন মিউমিউ করছে। আর কী বিটকেল এর জামা! হারামজাদা! বল আমার গাড়ি গেল কোথায়! আমি নিশ্চিত এ ব্যাটা গোলমেলে!

- আপনিও তো কম গোলমেলে নন মশাই। দেওয়ালে স্পষ্ট নো পার্কিং লেখা আছে। তবু এ'খানে পার্ক করতে গেলেন কেন?

- কোথাকার আমার ট্রাফিক পুলিশ এলেন গো! চাদ্দিকে একটা সাইকেল পর্যন্ত নেই সেখানে আমায় দেওয়ালে নো পার্কিং লেখা দেখাচ্ছেন? বেশ করেছি এখানে পার্ক করেছি।

- তা'হলে বেশ হয়েছে আপনার গাড়ি গায়েব হয়ে গেছে।

- তবে রে! এত বড় সাহস? তুইও কি গাড়িচোরদের দলে আছিস নাকি?

- দেখুন, ভদ্রভাবে কথা বলুন। এ'খান থেকে দু'মাইলের মধ্যে একটা পুলিশচৌকি আছে। ওই ও'দিকে; সোজা গেলে রাস্তার বাঁ হাতে পড়বে। সে'খানে গিয়ে রিপোর্ট লিখিয়ে আসুন।

- তাই করব! কাউকে ছাড়ব না! নিমাই দত্তের গাড়ি গায়েব করা? দেখাচ্ছি মজা! 

দুদ্দাড় করে এগোলেন নিমাই দত্ত। ঘুরে তাকিয়েছিলেন কয়েকবার; বোধ হয় চাউনিয়ে ঝলসে দিতে চাইছিলেন অমরবাবু আর বিদঘুটে জোব্বা পরা ছেলেটাকে। ছেলেটা থরথর করে কাঁপছিল। অমরবাবু ওর দিকে এগিয়ে যেতেই ছেলেটা বলে উঠল;

- আমি কিছু করিনি...বিশ্বাস করুন।

- জানি। আমি চিনি তোমায়। 

- চেনেন? 

- তোমাকেই নিতে এসেছি ভায়া। বদমানুষের খপ্পর থেকে তোমার মত নিষ্পাপ বন্দীদের মুক্তি দিতেই তো এই নো পার্কিং দেওয়াল। চলো আমার সঙ্গে। অনেক বন্ধুবান্ধব অপেক্ষা করে আছে। তোমার নামটা কী যেন ভাই?

- আজ্ঞে, নদুসাপাঁ।

- নয় দুই সাত পাঁচ। অফ কোর্স। এসো আমার সঙ্গে। আমার গ্যারেজ এখান থেকে খুব দূরে নয়।

কুটুম্ব

- চা খাবেন?

- না।

- কফি?

- উঁ...না থাক।

- কোল্ডড্রিঙ্কস?

- শুনুন না মলয়দা। চা-ঠা থাক বরং।

- ও মা! সে কী বিধুদা! আপনি আমার শ্বশুরবাড়ির পাড়ার লোক। অদ্দূর থেকে আমার অফিসে এসেছেন৷ কিছু একটা না খেলে চলবে কী করে। আই ইনসিস্ট। আচ্ছা, লস্যি আনিয়ে দেব? আমাদের অফিসের নীচেই..।

- ওই চা হলেই হবে।

- গ্রীন টী দিতে বলি?

- গ্রীন? না ওই নর্মাল চা হলেই হবে।

- দুধ চা?

- হ্যাঁ।

- গুড। আমাদের নির্মল প্যান্ট্রি সামলায়। এ-ক্লাস চা বানায়। এ-ক্লাস। দাঁড়ান, হাঁক দিই। ওহে নির্মল, দু'টো চা দিয়ে যাও। একটা দুধচা। একটা লিকার। চিনি আলাদা করে। বিধুদা, সঙ্গে থিন অ্যারারুট না ক্রীমক্র‍্যাকার?

- বিস্কুটের দরকার নেই।

- না না, তা কী করে হয়। নির্মল! শুনতে পারছ তো? চায়ের সঙ্গে বরং একটু কাজু নিয়ে এসো। সল্টেড। 

- মলয়দা, ব্যস্ত হবেন না প্লীজ..।

- কী বলছেন। আপনি আমার শ্বশুরমশাইয়ের ছোটবেলার বন্ধুর ছেলের আপন শালা। এ'টুকু অফার করব না? ওহে নির্মল, কাজুর সঙ্গে একটু নিমকি দিও তো। 

- বলছিলাম যে, দাদা! বড় বিপদে পড়ে আপনার কাছে এসেছি।

- বিপদটিপদের কথা শুনব। তবে তার আগে আমাদের অফিসের এই স্পেশাল কুচো নিমকি খেয়ে দেখুন। মিনিমাম তেল, ম্যাক্সিমাম মুচমুচ। বম্বে থেকে আমাদের ডিরেক্টর সাহেব এলে আড়াই কিলো প্যাক করিয়ে নিয়ে যান। এভরিটাইম। শোনো নির্মল, নিমকিটা একটু বেশি করে এনো ভাই।

- আমার বড় বিপদ মলয়দা।

- বিপদ? 

- আপনাদের কোম্পানির এক ভদ্রলোক, ট্রেনে আলাপ। সে না, আমায় কেমন করে যেন হাত করে নিলে।

- হাত করে নিলে?

- মানে ওই, আমায় বললে সে হিউম্যান রিসোর্সে আছে। আর বললে; সে একটা চাকরীর ব্যবস্থা করতে পারে। কোম্পানির কাগজপত্রটত্রও দেখালে।

- বলেন কী? অ্যালেন স্টীল অ্যান্ড প্রজেক্টেসের এইচ-আর সামলানো লোকের সঙ্গে আপনার ট্রেনে আলাপ? 

- সদাশিব সান্যাল। কাটোয়া লাইনে বাড়ি। মানে, তাই তো বললে।

- এখানকার হিউম্যান রিসোর্স আমি সামলাই বিধুদা! ও নামের কেউ এখানে চাকরী করে না। আর আপনি আমার সঙ্গে একবার কথা বলতে পারলেন না?

- আসলে, আমার ঠিক খেয়াল ছিল না। তাছাড়া, ব্যাপারটা একটু ইয়ে, আন্ডার দ্য টেবিল ছিল কিনা। সে বোঝালে যে দু'লাখ টাকা দিলেই..।

- ও মাই গড! আপনি ওকে টাকা দিয়েছিলেন?

- হার্ড ক্যাশে। আমার মাথাখারাপ হয়ে গেছিল। লোভে পাপ, পাপে সর্বনাশ। 

- শুনেই খুব খারাপ লাগছে বিধুদা। আপনি যদি একবার অন্তত আমার সঙ্গে কথা বলতেন। তা'হলে এমন বিশ্রি ভাবে ঠকতে হত না।

- আসলে, ঘুষটুষের ব্যাপার কি আর জামাইমানুষের সঙ্গে আলোচনা করা যায়?

- দু'লাখ টাকার ধাক্কা। আপনাকে কী ধাপ্পাটাই না দিয়েছে। যাকগে। এমন দুঃখের খবর নিয়ে এসেছেন; সামান্য চা নিমকি খাইয়ে আপনাকে ছাড়ি কী করে বিধুদা। আপনার পাড়ার জামাই বলে কথা। ওহে নির্মল! চা নিমকি ক্যানসেল। আমরা নীচের রেস্টুরেন্ট থেকে বরং কাটলেট খেয়ে আসব।

- আহা! আবার কাটলেট কেন।

- নীচের দোকানে যা মাটন কাটলেট সার্ভ করে না বিধুদা, কোটি টাকা হারানোর দুঃখ হাপিস হয়ে যায়। দু'লাখ তো নস্যি। নস্যির কথায় মনে পড়লো, কাটলেটের পর কিন্তু আপনাকে লস্যি খেতেই হবে। রিফিউজ করলে শুনব না।

- কিন্তু...।

- আরে চলুন চলুন। কিছুতেই না শুনছি না। 

- আহা, আসলে আমি...।

- ওহে নির্মল। আমরা বেরোলাম বাবা। রুমের দরজাটা বন্ধ করে দিও। কেমন? চলুন। আর সময় নষ্ট নয়।

বিধুবাবুকে কাটলেট লস্যি খাইয়ে, বাসে তুলে দিয়ে যখন মলয়বাবু বাড়িমুখো হলেন তখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে। কাল সকালে এসেই নির্মল ছোকরাকে জোর ধমক দিতে হবে। পইপই করে বলা সত্ত্বেও ব্যাটা তার শ্বশুরবাড়ির লাইনের লোককে পাকড়াও করে। চা নিমকি নিয়ে সদাশিব সান্যাল ঘরে এসে ঢুকলেই যে কী বিশ্রী কাণ্ড হত, তা ভাবতেই বার বার শিউরে উঠছিলেন মলয়বাবু।

রসম-এ-মহব্বত

যে যাই বলুক, ভালোমানুষ চারদিকে দিব্যি ছড়িয়ে আছে৷ কেউ আলপটকা উপকার করে বেড়াচ্ছে, তো কেউ ট্যাক্স ফাঁকির কথা শুনলেই আঁতকে উঠছে। কেউ কেউ আবার অন্যায় দেখলেই তেলেবেগুন মোডে চলে যাচ্ছে। কাজেই ভালোমানুষের খোঁজ পাওয়া তেমন বড় ব্যাপার নয়। তার চেয়ে বরং ভালো ডিম তড়কার সন্ধান পাওয়া ঢের কঠিন। ফোড়ন মশলা ঠিকঠাক পড়তে হবে, ঝালনুন খাপে খাপ হতে হবে, ডিমের পরিমাণ বেশি কম হবে না; হাজার রকম নক্সা মেনে চলার কথা।

নেদু আলাভোলা মেজাজে তড়কা বানানো চলেনা। হাইওয়ের ওপর ট্রাক আসা যাওয়ার শোঁ শাঁ আর ঢাউস উনুনের ওপর চাটুতে পেঁয়াজ টমেটো লঙ্কাকুচি ছাড়ার চ্যাড়চ্যাড় শব্দ মিলে প্রিলিমিনারি সিম্ফনি তৈরি হবে। ধাবার ক্যাশিয়ারের থ্রুতে উনুনের ও'পাশে ইনস্ট্রাকশন যাবে "এক্সট্রা ঝাল হবে, ডাবল ডিম"।  নাকে আসবে রুটি সেঁকার গন্ধ আর পাশের টেবিল বা খাটিয়া থেকে ভেসে আসা চিকেন কষার সুবাস। স্টিলের গেলাসে ডিম ফ্যাটানোর ফটরফটর শব্দ কানে আসলেই জিভ তৈরি হবে; ওই এলো বুঝি। 

স্টিলের থালার পাশে একবাটি তড়কা আর ধবধবে হাফফুলকো খানকয় রুটি। সঙ্গে ফালি করা কাঁচা পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা আর সামান্য আচার। অবশ্যই সে তড়কা প্যাকেট করে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার মানে হয়না। বাড়ির ডাইনিং টেবিলে বসে জি-টিভিতে সারেগামাপা দেখতে দেখতে তড়কা খাওয়া আর লুঙ্গি, স্যান্ডোগেঞ্জি পরে ব্রিসেবেনে ব্যাট করতে নামা; একই ব্যাপার। 

মুখভর্তি তড়কা-রুটির আবেশকে ইন্টেন্সিফাই করবে ধাবার ধারে দাঁড় করানো ট্রাকের স্ট্রিরিও থেকে ভেসে আসা কুমারশানুর আশ্বাস; " দিল হ্যায় কি মানতা নহি, মুশকিল বড়ি হ্যায় রসম-এ-মোহব্বত, ইয়ে জানতা হি নহি"..।

বনমালী কন্ডাক্টরের বাস

১।

স্ট্রীট ল্যাম্পের ঘোলাটে হলুদ আলো ভেদ করে ডাবলডেকার বাসটা টুপ করে উদয় হল। প্রায় নিঃশব্দে। প্রথমে বিভূবাবু বিলকুল টের পাননি, তারপর হঠাৎ যেন বাসটা রাস্তা বেয়ে ভেসে উঠলো। তা'তে ঘাবড়ে যাননি বিভূবাবু; এ বাস এমনভাবেই আসে। 

যাক, এ'বার অন্তত রাতভর বাসস্টপের বেঞ্চিতে হাপিত্যেশ করে বসে থাকতে হবে না। অবশ্য বাসের অপেক্ষায় রাতভর বাসস্টপে পায়চারী করার অভিজ্ঞতা নতুন নয়;  অন্তত হাজার দেড়েক রাত এইভাবে কেটেছে। 

সে হাজার দেড়েক রাতের মধ্যে বড় জোর বার চারেক এসেছে এই বাস। কাজেই রাতভর অপেক্ষা করার অভ্যেস তার নতুন নয়।

২।

ফিস শব্দে সে বাস এসে দাঁড়ালো বিভূবাবুর সামনে। যথারীতি ড্রাইভারের সীট খালি; স্টিয়ারিংটা ট্যাওটুই করে এ'দিক সে'দিক পাক খাচ্ছে। এ'বাসে এমনটাই হয় বটে। আগেরবারগুলোর অভিজ্ঞতায় এ'সব হালচাল দিব্যি বুঝে গেছেন তিনি। তাও ভালো, হাজারখানেক রাতের চেষ্টায় অন্তত বারচারেক এ বাসে চড়ে হাওয়া খেয়ে বেরিয়েছেন তিনি। 

বিভূবাবুর চেনাজানা প্রায় কেউই এ বাসের খোঁজ পাননি। এমন কী গিন্নীকেও এ বাসের খবর দিতে গিয়ে রীতিমত 'ছিটগ্রস্ত' বলে চোপা শুনতে হয়েছে।

এদ্দিনে তিনি দিব্যি বুঝেছেন যে এ খবর নিয়ে বেশি আলোচনা না করাই ভালো। বাসেই অবশ্য একবার অফিসের দিলু প্রামাণিকের সঙ্গে দেখা হয়েছিল; সেই থেকে মাঝেমধ্যে লাঞ্চের সময় চাপা গলায় বাসযাত্রা নিয়ে কিঞ্চিৎ আলোচনা তাঁদের মধ্যে।

বিভূবাবুর ধারণা, কলকাতা শহরে আরো অন্তত জনা কুড়ি লোক আছেন যারা এ বাসের খবর জানেন। রাস্তাঘাটে চলাফেরার সময় আশেপাশের মানুষজনকে মন দিয়ে জরীপ করেন তিনি, যদি সেই অদ্ভুত ডাবলডেকার বাসের কোনো সহযাত্রীর দেখা পাওয়া যায়। যদি।

৩।

কন্ডাক্টর বনমালীর একগাল হাসি দেখলেই বুকের ভার লাঘব হয়ে আসে। ঢলা পাজামা আর গোলাপি ফতুয়া পরা বনমালী খৈনি ডলতে ডলতে শুধোয়;

- আরে বিভূতি যে!

- এ বাসের খোঁজে হন্যে হয়ে রাত কাটে গো বনমালীদা, দেখা পাই কোথায় রোজ।

- খোলামকুচি যে নয় ভায়া। খোলামকুচি নয়। 

- তা তো বটেই। 

- তা এ জয়রাইডে তো তুমি নতুন নয় হে। দেরী না করে সোজা দোতলায় উঠে জানালার পাশে বসে পড়ো। আমি ড্রাইভারদাদাকে বলি বাস ছাড়তে...।

- ড্রাইভারদাদাকে দেখা যায় না যে বনমালীদা। এ বাস আপনি চলে না?

- তুমি দেখতে পাওনা বলে কি তোমার পিঠের আঁচিলটা  নেই ব্রাদার?

- ও। ঠিক। ঠিক।

সুড়সুড় করে বাসের ওপরের তলায় উঠে এলেন বিভূবাবু। এ বাসের এ'টাই মজা, সবার জন্য দোতলার জানালা। 

৪।

এ যাত্রায় বাসে আরো জনা দশেক লোক দেখতে পেলেন তিনি। সবার চোখে ঢুলুঢুলু আলসেমি, ঠোঁটে মাখাসন্দেশের মত নরম হাসি। কেউ মাথা নেড়ে নিজের মনে বেজে চলা সুরে তাল দিচ্ছেন, কেউ কেউ স্থির হয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে; মিঠে বাতাসে সবার চুলে ফুরফুর। পছন্দমত জানালা বেছে বসে পড়লেন বিভূবাবু।

আহ্, বসামাত্রই হাওয়ার ঝাপটায় বড় গান পেল ভদ্রলোকের। তুলতুলে নরম সীটে গা এলিয়ে দিলেন তিনি; নাকে এলো বিকেলের জিলিপি শিঙাড়ার সুবাস।

জানালার বাইরে অন্ধকার, তা'তে টুপটাপ জোনাকির দানা ভেসে বেড়াচ্ছে। 

৫।

বিমলের কথা তরতরিয়ে বিভূবাবুর মনের মধ্যে এসে পড়লো। কী সুন্দর বেহালা বাজাতো ছেলেটা, বাজারের মাছ চেনার জুড়ি ছিল না ওর, আর ক্যারমটা বড় ভালো খেলত। সবচেয়ে বড় কথা বিভূবাবুর প্রাণের বন্ধু ছিল বিমল। সেই ক্লাস সেভেন থেকে। 

ছিল। ছিল। এখন নেই।

বিকম পাশ করে দু'জনে মিলে একটা ব্যবসা শুরু করেছিলেন; লোহার স্ক্র‍্যাপ কেনাবেচা৷ টু পাইস পকেটে আসতে শুরু করেছিল। দিব্যি চলছিল সবকিছু। তারপর কীভাবে যেন বিমল পালটে গেল; ঠকিয়ে হাতিয়ে নিলো ব্যবসাটা। অনটনের সংসারে ভার ছিল বটে ওর কাঁধে, কিন্তু তাই বলে নিজের বন্ধুকে এমন ভাবে ঠকাবে? গা গনগনে রাগ আর বিশ্রী ঘেন্না নিয়ে সরে এসেছিলেন বিভূবাবু। বছর তিনেক পর একবার বিমল ফিরেছিল; অপরাধীর মত। একমিনিটের জন্যেও তাকে বরদাস্ত করতে পারেননি বিভূবাবু।

কদ্দিন আগেকার কথা, অন্তত বছর কুড়ি কেটে গেছে তারপর। বিমলের সঙ্গে আর কখনও কোনো যোগাযোগ হয়নি।

৬।

বাস থেকে নেমে প্রতিবারের মত এ'বারেও তিনি সোজা এসে পড়েছেন বিছানায়। পাশে গিন্নী তখনও ঘুমে কাদা। জানলা দিয়ে ভোরের নরম আলো গায়ে এসে পড়ছে।

ভালোলাগায় বড্ড আলুথালু বোধ করছিলেন বিভূবাবু।ততক্ষণে তিনি মনেমনে ঠিক করেই ফেলেছেন যে আজ অফিসে না গিয়ে তিনি সোজা যাবেন বেলঘরিয়া; বিমলের বাড়ি। নিশ্চয়ই তাঁর খোঁজ পাওয়া যাবে সে'খানে। আর এ'বার দেখা হলে আর কোনো ছাড়াছাড়ি নয়, এমন কী বিমল নিজে ফসকে বেরিয়ে যেতে চাইলেও তাকে ছাড়া হবে না। জাপটে জড়িয়ে রাখবেন বিভূবাবু। ঠিক আছে, বিমল না হয় একবার একটা বড় ভুল করেই ফেলেছে, কিন্তু তা বলে ছোটবেলার অমন বন্ধুত্ব গোটা জীবনের জন্য নষ্ট হয়ে যাবে? বিভূবাবুর বন্ধুত্ব কি অতই খেলো? রাগধাপ গজরগজর অনেক হয়েছে; বিমলকে কম কথা শোনাননি বিভূবাবু। এ'বার সব ফেলে ঘুরে দাঁড়ানোর পালা। আজ বিমলের বেহালা বাজানো শুনেই ছাড়বেন তিনি। সবচেয়ে বড় কথা, কথা জমানো আড্ডা সাতপুরনো রাগের পাল্লায় পড়ে নষ্ট হচ্ছে; এর একটা হিল্লে করা দরকার।

তবে অফিসের বদলে বেলঘরিয়া যাওয়ার প্ল্যান  গিন্নীকে এখনই বলা যাবেনা, বিমলের নাম শুনলেই সে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠবে। জ্বলে উঠবেই। তার জন্য অবশ্য  গিন্নীকে দোষ দেওয়া যায়না। আর যাই হোক, সে বেচারি তো আর বনমালী কন্ডাক্টরের বাসের খোঁজ পায়নি।