Friday, November 2, 2018

পুজোর রোল

যাদের কপালে বাড়ি ফেরার ছুটি জোটেনি, যাদের পুজো কাটবে এমএস-এক্সেলে মুখ গুঁজে গজরগজর করে। যাদের খোকাখুকুরা বাইরে বলে মনখারাপ, ঘনঘন পুরনো পুজোসংখ্যাগুলো হাতড়ে খোকার প্রিয় লেখাগুলো উল্টেপাল্টে পড়ে চলেছেন।

পারিবারিক সমস্যায় জর্জরিত যে মানুষটার 'উৎসব' শুনলে মুখে তেতো স্বদ খেলে যায়, পুজোর ছুটি যার কাছে যন্ত্রণার মত।

পুজোর বাতাস বুকে এলে যার পুরনো চিঠির কথা মনে পড়ে, 'কেমন আছিস' মার্কা ফোন করার সাহস আর অধিকার হারিয়েছে যে সাইকেল-সম্রাট।

যার খুব মায়ের কথা মনে পড়ছে। বাবার আঙুল শক্ত করে ধরে রাখার নিশ্চিন্দি হাতড়ে চলেছে যে বেআক্কেলে। 

পুজোয় তাদের সবার জন্য, কোথাও না কোথাও,নিশ্চয়ই একটা এগরোল ভাজা হচ্ছে। ভালোবাসার চাটুতে নেড়েচেড়ে, স্নেহের তেলে উল্টেপাল্টে। তাদের সবার কামড় সে রোলে এসে পড়ুক না পড়ুক, পুজোয় তারাও থাকুক।

শিউলি ও হামানদিস্তা

প্রেমে প্যানপ্যান ঘ্যানঘ্যান করলেই হবে?

যে রোগে যেমন ওষুধ। 

ছোটমামা দুম করে চলে আসায় চিলেকোঠার গোপন সাক্ষাৎ ভেস্তেছে? বুকের মধ্যে চড়া সুরের হাউহাউ? অ্যান্টিডোট একটাই; দু'প্যাকেট বাদামভাজা প্লাস লঙ্কা মেশানো বিটনুন।

ঘণ্টাদুয়েক মণ্ডপে থেকেও নীলশাড়ি একবারটির জন্যেও ভলেন্টিয়ারগিরির প্রাণপাত করা দৌড়োদৌড়িটা খেয়াল করে বাহবা-হাসি ছুঁড়ে দেয়নি? সে মনভার উড়িয়ে দেওয়ার জন্য চট করে জোগাড় করে নিতে হবে মশলাদার মটরভাজার প্যাকেট।

আবহাওয়া দপ্তরের অভয়বাণীর কানমলে নেমে আসা বৃষ্টিঝড়ে অষ্টমীর হাঁটতে যাওয়ায় প্ল্যান ডকে উঠেছে? কপালে রয়েছে বন্ধুদের বাঁকা আওয়াজ আর টুয়েন্টি নাইন? বুক বেয়ে ভসভসিয়ে উঠে আসা দীর্ঘশ্বাসকে রুখতে দরকার কাঠিভাজার মিউজিকাল মুচমুচ।

সাতপাতা লম্বা 'তোমায় ছাড়া বাঁঁচব না' মার্কা চিঠির জবাবে চাঁচাছোলা চিরকুট এসেছে? হেডস্যারকে বলে দেওয়ার ধমক? আদা লজেন্সকে সর্বিট্রেটের মত জিভের তলে ফেলে চুষতে হবে, যতক্ষণ না বুকের ধড়ফড় কমছে।

ডায়েরীর সমস্ত কবিতা জলে গেছে? সে জানলো না পর্যন্ত? রাস্কেলচন্দ্র ফার্স্টবয়ের সঙ্গে সে প্যান্ডেল আলো করে ঘুরে বেড়াচ্ছে? ঘুরে দাঁড়ানোর একটাই টোটকা; আড়াই প্যাকেট মৌরি লজেন্স।

বাদাম-লজেন্সওয়ালারা ডিস্পেন্সারি কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়ান। আর তা না চিনলে; প্রেমের শিউলিকে খুনে-দুনিয়ার হামানদিস্তার নীচে ফেলতেই হবে।

পাহাড়ি ও অতুলবাবু

পাহাড়ি সান্যাল মিস্টার সেনকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন৷ বেশ কিছুটা চিনেছিলেন। ভালোবেসেছিলেন অতুলদাকে। সেই স্মৃতিচারণ নিয়েই এই লেখা। 


অতুলবাবু অবিকল তার গানের মত; অন্তত পাহাড়িবাবুর লেখায় তেমনটাই ফুটে ওঠে। সঙ্গীতের মত সুন্দর তার দুঃখের টুকরোগুলোকে গোপনে সাজিয়ে রাখার ক্ষমতা। একদিকে তিনি কর্মব্যস্ত, অন্যদিকে চট করে ভালোবেসে জড়িয়ে ধরতে পারেন। পরোপকারি, বন্ধুবৎসল। উচ্ছ্বাসের বাড়াবাড়ি নেই, অথচ স্নেহে পরিপূর্ণ। সেই অতুলপ্রসাদের কথা বোধ হয় শুধু পাহাড়িবাবুই লিখতে পারতেন।


পাহাড়িবাবুর ভাষায় সারল্য থাকলেও তা বাহুল্যবর্জিত নয়। কিন্তু কী ভীষণ অনেস্ট। ভালোবাসার কথা বলতে গিয়ে গতে বাঁধা 'পুরুষালি' এক্সপ্রেশনের ধার ধারেননি ভদ্রলোক। বিচ্ছেদে ক্ষতবিক্ষত অতুলপ্রসাদের পাশে থেকেই প্রেম চিনতে শিখেছিলেন তিনি। সে'টুকুর জন্যেই পড়ে ফেলা যায় এই লেখা। তা'ছাড়া লখনৌতে বড় হয়ে পাহাড়িবাবু যে 'তেহজিব' আয়ত্ত করেছিলেন, লেখায় তার ছাপও স্পষ্ট।


এই দু'জনকে নিয়ে সঞ্জীব যদি গোটা একটা নভেল লিখতেন; কী ভালোই না হত।

Wednesday, October 3, 2018

বেহালার সুর

কী অদ্ভুত। এই একটানা বিশ্রী গোলাগুলির গুড়ুম গুড়ুম। চারদিকে  বিকট চিৎকার। আর ঢেউয়ের মত আছড়ে পড়া সৈন্যদের বুটের বুকভার করা মসমস শব্দ। এই সব ছাপিয়ে কী ভাবে যেন একটা বেহালার সুর মাথাচাড়া দিয়েছিল। অদ্ভুতই বটে।

বহুক্ষণ কোনো জ্ঞান ছিলনা য়মনতের। যখন জ্ঞান ফিরল তখন মুখে কড়া রোদ্দুর, গোটা পিঠ রক্তে ভেজা। দু’টো বুলেট; একটা পিঠে আর অন্যটা ডান পায়ে। যন্ত্রণার ভার কিছুটা লাঘব হচ্ছিল অপার ক্লান্তিতে; যন্ত্রণা অনুভবের শক্তিটুকুও হারিয়েছিলেন য়মনত। একটা স্বস্তির কথা; শত্রু সৈন্যের হাতে বন্দী হতে হয়নি, নয়ত যে নরক যন্ত্রণা ভোগ করতে হত তার কাছে মৃত্যুও নস্যি। 

মাথা তোলার একটা মরিয়া চেষ্টা করেছিলেন য়মনত, লাভ হয়নি। তীব্র পিপাসার জ্বালা শরীরের অন্যান্য যন্ত্রণা আর ক্লান্তিকে ম্লান করে দিচ্ছিল। আর কী কাণ্ড; এই এতকিছুর মধ্যে বেহালার সুরটা কানে বুকে দিব্যি নেচে বেড়াচ্ছিল। 

য়মনত ঠিক সঙ্গীতের সমঝদার নয়। তবে বেহালাটা বড় মিঠে ঠেকছিল কানে; সে মিঠে স্বাদের সুরে সামান্য মনখারাপ মেশানো। বাড়ির সুবাস মেশানো, মায়াময়, তুলতুলে। গোলাগুলির শব্দ আর হাহাকারের মধ্যিখানে বড্ড বেমানান।  

সুরটা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। কী ভীষণ ভালোবাসা মেশানো সুর, যে সুরের আবডালে প্রেমিকার আঙুলের ডগা ছুঁয়ে বসে থাকা যায়। সে সুরে গোপন ডায়েরির পাতায় শুকনো পাতার পেজমার্ক এসে মেশে। তৃষ্ণা, যন্ত্রণা সে সুরের স্পর্শে মোমের মত গলে পড়ে যেন। প্রবল ভালোলাগার আবেশে যখন চোখ বুজলেন য়মনত; তখন রোদের তাপ কমে এসেছে, বাতাস থেকে বারুদের গন্ধ হাওয়া হয়ে অল্প শিউলি শিউলি মেজাজ। ব্যথা যন্ত্রণা হাপিশ। 

য়মনতের দৃষ্টির অন্ধকার ভেদ করে এক বিন্দু আলো ফুটে উঠলো। সেই আলোর দানা ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ল একটা রোদ্দুর মাখানো ঝুলবারান্দায়। সে’খানে মাদুর পাতা। বৌয়ের বৌ-বৌ বকরবকর, মায়ের মা-মা গন্ধ, নয়নতারার মাথা দোলানো; খোকার খিলখিল হাসি; সমস্ত মিলে পরিপূর্ণ। সে বেহালার সুরের মত।  

***

- ক্যাপ্টেন। সময় হয়ে গেছে।

- আমার বাজানোও শেষ। আই অ্যাম রেডি। 

- বাজানো? মানে? 

- সে কী! এতক্ষণ ধরে বাজালাম! শুনলেন না? বেহালার সুর? আপনার কানটা গেছে। 

- আপনি শত্রুপক্ষের লোক হলেও সৈনিক। আপনাকে অপমানসূচক কথা বলতে আমি চাইনা ক্যাপ্টেন। কিন্তু তবু বলে বাধ্য হচ্ছি। আমার কান নয়। আপনার মাথাটা গেছে। গত আধঘণ্টা ধরে এই যে বেহালা বাজানোর ভানটা করলেন, সে’টা আর যাই হোক সুস্থতা নয়। অবশ্য ফায়ারিং স্কোয়াডের নাম শুনলে মাথার পোকাগুলো নড়ে ওঠা অস্বাভাবিক নয়। যা হোক।  স্কোয়াড রেডি। আপনার কাউকে কিছু জানানোর আছে? শেষ বার্তা? 

- ও মা! জানিয়ে গেলাম যে। 

- এক্সকিউজ মি? 

- ওই যে! বেহালার সুরে। আরে সঙ্গীতের জন্য সবসময় যন্ত্রের প্রয়োজন হয়না স্যার। মিউজিক ইস নট ফায়ারিং স্কোয়াড।  

- আপনি বেহালা বাজালেন? এতক্ষণ? 

- রীতিমত। আমার মধ্যে যতটুকু ভালোবাসা জমেছিল, বিলিয়ে দিলাম। আহা, আপনি যদি শুনতে পারতেন মশাই, ভেসে যেতেন, বর্তে যেতেন। 

- যত্ত পাগলামি। বেহালাই নেই, অথচ হাত পা নেড়ে দুলে দুলে নেচে বলে বেহালা বাজিয়েছি। 

- বাজিয়েছি স্যার। আমার এই সেল থেকে অপার্থিব সুর ছড়িয়ে দিয়েছি এ শহর জুড়ে। যার শোনার হৃদয় আছে সে শুনেছে, সব সুরে কানের ফাঁদে ধরা দেয় না স্যার। জানেন, আমার বিশ্বাস অন্তত একজন শুনেছে সে সুর। সমস্ত গোলাগুলির শব্দ আর হাহাকার সরিয়ে রেখে একজন অন্তত সে সুর শুনেছে। আমি নিশ্চিত। বাজাতে বাজাতে একসময় আমি স্পষ্ট দেখলাম এক ভদ্রলোক ছেলে বৌ মা নিয়ে ব্যালকনিতে গা এলিয়ে বসে; পাশে নয়নতারার টাব। ভদ্রলোকের নামটাম জানি না; কিন্তু আহা। তাঁর মুখের তৃপ্ত হাসিটা লাখটাকার। সে শুনেছে, আমার বেহালার সুর। কোথায়, কী ভাবে তা জানি না। বিশ্বাস করুন!  

- স্কোয়াড রেডি। শ্যাল উই গো?

- জো হুকুম!  

নবা ও জগা

- নবা রে। আর এক পিস রোববার। গন্।
- এই আবার শুরু হল। এখনও দুপুরের খাওয়াটাও তো হয়নি। রোববার রীতিমত জলজ্যান্ত। স্নান করতে যাও জগাদা।
- লাঞ্চ। তারপর ঘণ্টাখানেক গড়িয়ে নেওয়া। তারপরেই বুকের মধ্যে ধড়ফড়। সকালের অ্যালার্ম লাগাও রে। জামা ইস্তিরি করো রে। জুতো পালিশ করো রে৷ মেসের এই জলডাল আর চালানি রুইয়ের ঝোলে মাখা ভাত গেলা। তারপর মিনিবাসের চটকানি। অটোর বিষাক্ত লাইন। বসের খ্যাচরম্যাচর। ফাইলের চালাচালি। ধুর।
- স্নান করতে যাবে না আমি যাব?
- ও মা। তুই যাবি কী রে। গতকাল বাথরুমে তুই আগে গেলি। আজকে যে রস্টারে আমার নাম।
- তা'হলে যাও না। খামোখা ঘ্যানঘ্যান করে সময় নষ্ট করছ কেন?
- তুই একটা পাষাণ রে নবা। রোব্বারের চানে কাউকে তাড়া দিতে আছে? পরের জন্মে নিরামিষভোজী হয়ে জন্মাতে হবে যে।
- ও মা। তা'তে ক্ষতি কী? দিব্যি ছানার ডালনা আর আলুপোস্ত দিয়ে হাপুসহুপুস করে খাব'খন। শেষ পাতে টমেটো আমসত্ত্বের চাটনি। প্লাস ওয়ান পিস রসগোল্লা। ওয়ান? না। দু'টো।
- নেহাত অবজেকশনেবল কিছু বলিসনি। তবে অবলা পাঁঠাগুলোকে মাঝেমধ্যে মুক্তি না দিলে যে এই পাপের দুনিয়ায় তাদের অন্তরাত্মা পচে মরবে।
- জগাদা। লেনিন তোমার ভাষায় কমিউনিজম বোঝালে আর কোনো বাঙালির মধ্যে ঈশ্বরবিশ্বাস পড়ে থাকত না। এ'বারে একটু মাদুর ছেড়ে ওঠো দেখি।
- হ্যাঁ রে নবা, ঠাকুর আজ ফের ব্রয়লার রেঁধেছে?
- বাতাসে তো তেমনই গন্ধ ভাসছে।
- এ মেস আমি ছেড়ে দেব। যে মেস রবিবারগুলোকে ব্রয়লায় খাইয়ে মার্ডার করে সে'খানে পড়ে থেকে পাপের বোঝা বাড়ানোর কোনো মানে হয়না।
- জগাদা৷ চলো আজ আমি আর তুমি রাতের ডিনারটা বাইরে কোথাও...।
- কষানো পাঁঠা?
- সঙ্গে ছোটমাছের চচ্চড়ি যা পাই। শম্ভুদার হোটেলের নতুন ঠাকুরটার এলেম আছে। এ'বার যাও দেখি স্নান করতে?
- কিন্তু মাসের শেষ দিন রে, এতগুলো টাকা...।
- আহ্। আমার কাছে কিছু পড়ে আছে। দু'জনের হয়ে যাবে'খন।
- তুই খাওয়াবি? গা ছুঁয়ে বল?
- মাইরি।
- বামুনকে খাওয়াচ্ছিস। খরচের একটা টাকাও জলে যাবে না। কালকের মধ্যে চিঠি পাবি। ওগো হ্যাঁগো করে। কী, তার জন্যেই তো কিঞ্চিৎ মনমরা কাল থেকে। তাই না?
- মুরাকামি না অরুণ গোভিল কে একটা বলেছেন; ইলিশের পেটিতে মন দাও, ইলিশের বায়োডেটা চেয়ে সময় নষ্ট কোরো না।
- তা হ্যাঁ রে, পুজোয় তার জন্যে একটা শৌখিন কিছু কিনবি ভেবেছিলিস যে।
- শৌখিন কিছুই কিনব। আজই। জগা বামুনের থালাসাফ করা ঢেঁকুর। তবে তার জন্য নয়। নিজের জন্য। তোমায় তৃপ্তি করে খেতে দেখা ইস আ বিউটিফুল সাইট।
- সে কী! তার জন্য কিছু কিনবি না?
- আমার গত তিনটে চিঠি আমার কাছেই ফেরত এসেছে। কুচিকুচি হয়ে। সঙ্গে চিরকুট ; খবরদার যেন আর চিঠি না লিখি।
- এ'টা সে লিখেছে? তবে রে! বামুনের অভিশাপ যদি ফোকাস করে ঝাড়া হয় তা'হলে তা ফলবেই। সে পরের জন্ম নিরামিষভোজী হয় জন্মাবে অ্যালং উইথ ছানা আর পোস্তয় অ্যালার্জি।
- আহ, জগাদা।
- বড্ড কড়া হয়ে গেল না রে। যাকগে, শোন। তুই স্নান করতে যা আগে। আর আগামী হপ্তা পুরোটাই তোর বাথরুম প্রায়োরিটি প্রিভিলেজ রইল, কেমন? যা যা, দেরী করিস না। দুপুরের খাওয়াটা তাড়াতাড়ি না সেরে ফেললে রাতের খাওয়াটা ঠিক গ্রিপ করা যাবে না। ক্যুইক।