Sunday, September 16, 2018

জমিদারবাড়ির ইজ্জত

- (অনিল চ্যাটার্জী কণ্ঠ) আমায় ডেকেছিলেন বাবা?

- (ছবি বিশ্বাস কণ্ঠ) হুঁ। নায়েবমশাইকে ডাক দাও।

- আজ্ঞে, এত রাত্রে?

- বলেছি যখন, নিশ্চয়ই প্রয়োজন আছে।

- বেশ, কিন্তু...।

- নায়েবমশাইকে বলো সিন্দুক খুলতে।

- সে কী, কোনো বিপদ হল নাকি বাবা?

- বিপদ নয়, প্রয়োজন। বাড়ির দলিলটা বের করে আনতে বলো।

- দলিল!

- আশা করি ভির্মি খাচ্ছ না।

- এত রাত্রে বাড়ির দলিল নিয়ে কী করবেন বাবা?

- উকিলমশাই এসে পড়লেন বলে।

- উকিলমশাই? দলিল? হচ্ছেটা কী?

- বয়স তো কম হল না। দুয়ে'দুয়ে চার করতে শিখবে কবে? এ বাড়ির অর্ধেকটা আমি বিক্রি করে দিচ্ছি। আজ রাত্রেই সে দলিল নিয়ে উকিলবাবু শহরের দিকে রওনা হচ্ছেন, খদ্দেরপক্ষ অপেক্ষায় রয়েছে।

- কিন্তু হঠাৎ বাড়ির বিক্রির প্রয়োজন হল কেন জানতে পারি বাবা?

- চোখকান খোলা রাখলেই নিজে থেকেই টের পেতে। বাড়ি বিক্রি ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। এখন মুখের সামনে সঙের মত দাঁড়িয়ে না থেকে নায়েব মশাইকে ডেকে আনো।

- বাবা, আপনার বড়ছেলে হিসেবে আমার জানার অধিকার রয়েছে! এ বাড়ি আপনি বিক্রি করছেন কেন?

- বড়ছেলে?  বড়ছেলে হয়ে বাপের মান সম্মান সম্বন্ধে কতটুকু ওয়াকিবহাল তুমি? কই, চুপ করে দাঁড়িয়ে কেন? বলো!

- আমি কিছুই বুঝতে পারছি না বাবা।

- আহাম্মক। তা বুঝবে কেন। গোটাদিন টোটো করে বেড়ালে দুনিয়ার খবর রাখবে কী করে। শোনো, আজ নতুন আইফোন এক্স এস লঞ্চ হয়েছে! দিন দুয়েকের মধ্যে সে ফোন কিনে ফেলতে না পারলে জমিদারবাড়ির ইজ্জত ধুলোয় মিশে যাবে না? আমার নাক কাটা যাবে না? আর বাড়ি বিক্রি না করলে সে ফোন আমি কিনব কী করে? তা বলতে পারো?

ঘৌলমন্ডির গোলমাল -১

**ঘৌলমন্ডির গোলমাল**

প্রথম পরিচ্ছেদ - এলেম নতুন দেশে

.......

কানের মধ্যের ঝমঝম আওয়াজটা কমে এসেছে। গা হাত পায়ের অসহ্য ব্যথাটাও দেখছি কম। চোখের দৃষ্টিটা সামান্য ঘোলাটে কিন্তু গোলমেলে অন্ধকারটা ক্রমশ কেটে যাচ্ছে।

বুকের মধ্যের হ্যাঁচড়প্যাঁচড়টাও বেশ কমে এসেছে।  একবার চোখ বুজে আবার খুললাম; ড্যাবড্যাব করে দেখার চেষ্টা করলাম।

সামনের দেওয়ালটা নীল।
আমি একটা সাদা চাদর পাতা বিছানায় শুয়ে। নির্ঘাৎ হাসপাতালের বেড।

দেওয়ালে একটা ঘড়ি, চোখ কুঁচকে সময়টা দেখার চেষ্টা করলাম; ও মা! ঘড়ির দু'টো কাটাই সমান সাইজের। আটটা দশ, একটো চল্লিশ যা কিছু একটা হতে পারে। কী আহাম্মকে ঘড়িরে বাবা। বিরক্ত হয়ে চোখ বুজে ফেললাম।

নিজের পরিস্থিতিটা বোঝার চেষ্টা করলাম।

আমি যাচ্ছিলাম উলুবেড়িয়ায় মেজপিসির বাড়ি। অবিশ্যি মেজপিসি আর নেই, এমনকী মেজপিসেও মারা গিয়েছেন বছর সাতেক হল। মেজপিসির মেজছেলে বাপনদাদার সঙ্গে আমার খুব দহরম। মহরমের ছুটি পেয়েছি আর অমনি সকাল বেলা সরভাজার বাক্স নিয়ে বাস ধরে সোজা উলুবেড়ে। গোটাদিন শুধু তাস পেটানো আর বাপনবৌদির হাতের বাটিচচ্চড়ি আর মাছের ঝোল।

আহ..এই আমার এক রোগ। কী ভাবার কথা আর কী ভেবে চলেছি। প্রশ্ন হচ্ছে আমি এই হাসপাতালে এলাম কী করে। সাঁতরাগাছি থেকে বাস ধরে উলুবেড়িয়া যাচ্ছিলাম; দিব্যি।

ওহ্ হো। মনে পড়েছে। ট্রাকের সঙ্গে ধাক্কা, মাঝ রাস্তায়।

যাব্বাবা!

কী কাণ্ড কী কাণ্ড। তাই এই হাসপাতালে। তবে অল্পের ওপর দিয়ে গেছে যা বুঝছি, হাতেপায়ে প্লাস্টার নেই কোনো, সামান্য ব্যান্ডেজও নেই। শুধু পেটের মধ্যে চনমনে খিদে। যাক। সেই কোন সকালে খইদুধের সঙ্গে আমসত্ত্ব মিশিয়ে খেয়ে বেরিয়েছিলাম। তারপরে পেটে পড়েছে বলতে শুধু চার প্যাকেট বাদাম আর একজোড়া ডিমসেদ্ধ, সাঁতরাগাছি বাসস্ট্যান্ডে কেনা।

ফের চোখ খুললাম।

নীল দেওয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে এক অদ্ভুত রকমের ফর্সা ভদ্রলোক। ফর্সার চেয়েও বেশি ফ্যাকাসে। মাঝারি হাইট, হাত পা ল্যাকপ্যাকে অথচ দিব্যি একটা টলমল ভুঁড়ি।  মাথার চুল উসকোখুসকো। সবচেয়ে বিটকেল ব্যাপার হল ভদ্রলোকের ডান গাল সাফসুতেরো অথচ বাঁ গালে অন্তত দিন তিনেকের না কামানো দাড়ি। চোখে একটা বিটকেল সবুজ ফ্রেমের চশমা।  আর মুখের হাসিটা যেমন নার্ভাস, তেমনি ছটফটে। গায়ে সাদা কোট আর গলার স্টেথোস্কোপ না থাকলে ঘোরতর সন্দেহ হত যে ভদ্রলোক মানুষ নয়, ভিনগ্রহের প্রাণী।

" কেমন বোধ করছেন মনোজবাবু"? এই ডাক্তারের গলা অবিশ্যি দিব্যি মখমলে।

"ইয়ে, তেমন ব্যথা বেদনা তো কিছু..."।

" না, তেমন আর কী। খান কুড়ি ভাঙা হাড়, লিটার চারেক রক্ত গেছে। ও তেমন কিছু নয়"।

" হাড় ভেঙেছে? কিন্তু...কই...কোনো যন্ত্রণা নেই, প্লাস্টার নেই। রক্ত ঝরল, তবু দুর্বল লাগছে না তো"।

"ও কোনো প্রবলেম নয়। এই একটু প্রেশার মেপে দিচ্ছি, ব্যাস; তা'হলে সমস্ত ব্যথা প্লাস্টার দুর্বলতা ফেরত আসবে"।

এই বলে ঝপাৎ করে আমার বুকে স্টেথোস্কোপ চেপে ধরলেন ডাক্তার।

" এ কী ডাক্তারবাবু! স্টেথোস্কোপে প্রেশার"?

"কী স্কোপ"? ডাক্তার কেমন ঘাবড়ে গেলেন যেন।

" স্টে...স্টেথোস্কোপ"।

ধপাস করে পাশের চেয়ারে বসে পড়লেন সেই অদ্ভুতুড়ে ডাক্তার।

"শরীর খারাপ লাগছে নাকি ডাক্তারবাবু"?

" আরে ধুর, শরীর থাকলে তো খারাপ"। বলেই স্যাট করে ইয়া লম্বা জিভ কাটলেন ভদ্রলোক।

"শরীর নেই মানে"?

তখনই সব গড়বড় হয়ে গেল। ডাক্তার মাথা চুলকে আমতা আমতা করে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু বোধ হয় একটু বেশি জোরে চুলকে ফেলেছিলেন। স্টেথোস্কোপ জড়ানো গলার ওপর থেকে মুণ্ডুটা খুলে আমার বেডে এসে পড়ল। সাদা কোট পরা স্কন্ধকাটা দেহটা তখনও চেয়ারে; অসাড়।

" সরি, আই অ্যাম রিয়েলি সরি মনোজবাবু। আমি এ'ভাবে আপনাকে অস্বস্তিতে ফেলতে চাইনি। আপনার গা থাকলে ছুঁয়ে বলতাম"। খাটের ফ্যাকাসে-মুখো মুণ্ডুটা একটানা বিড়বিড় করে চলেছে। আমার অজ্ঞান হয়ে যাওয়া উচিৎ ছিল, কিন্তু কিছুতেই পারছি না ভির্মি খেতে।

খেয়াল করলাম আমার খাটের পাশের চেয়ারে মাথাকাটা দেহটা ক্রমশ আবছা হতে শুরু করেছে। কিন্তু খাটের মুণ্ডুটার "সরি সরি" বিড়বিড় থামেনি।

"তবে আপনি ঠিক ইয়ে...মানুষ নন, তাই না ডাক্তারবাবু"?

"এককালে ছিলাম মনোজবাবু"।

" আর আমিও বোধ হয়..."।

"মিনিট দশেক আগেও ছিলেন। মানুষ"।

" এখন"?

"ভূত"।

" অ। এ'টা হাসপাতাল নয়"?

"না, এ'টা বাফার জোন"।

" বাফার জোন"?

"ওই, মরার পর দুম করে ঘৌলমন্ডি দেখলে কচিভূতদের কনফিগারেশন গড়বড় হয়ে যায়। তারপর তাদের রিসেট করে রিলঞ্চ করতে হয়৷ তাদের খুলি-ক্লিনিকে পাঠিয়ে হাজার রকমের কন্ডশনিং করিয়ে তারপর নর্মাল করা দরকার৷ বিস্তর হ্যাপা। অনেকে আবার একবার বিগড়ে গেলে আর কিছুতেই বাগে আসতে চায়না। এই যেমন মাধবখুড়ো,  বোমা বাঁধতে গিয়ে চার টুকরো হলেন। অথচ ভূত হয়েছেন জেনে এমন ঘাবড়ে গেলেন যে কিছুতেই ফুল বডি রিকনসাইল করল না। আজও মাধবদার ডান পা আর বাঁ পা মিলে বডি আর মাথার নামে অকথ্য সব নিন্দে রটিয়ে বেড়ায়"।

" আমার না, কেমন গা গুলোচ্ছে"।

" গা নেই মশাই, ঘৌলমন্ডিতে কারুর গা থাকলে তবে তো গা গুলোনোর প্রশ্ন। একটা সুইডিশ ভূতের টীম অবশ্য বছর দুয়েক ধরে চেষ্টা করছে গা না থাকলেও কী'ভাবে সুড়সুড়ি উপভোগ করার উপায় খুঁজে বের করতে। কিন্তু গা গুলোনোটা মনের ভুল মনোজবাবু"।

"ঘো..ঘৌ...ঘৌলমন্ডি...এ'টা কী"?

" ও'দিকটা পৃথিবী, এ'দিকটা ঘৌলমন্ডি। অবশ্য ভিনগ্রহের ভূতজগতগুলোর নামধাম আমার তেমন জানা নেই, আছে কিনা তাও জানিনা। আমাদের দৌড় এই ঘৌলমন্ডি তক"।

"আর..বাফার জোন"?

" মরার পর মড়াদের মধ্যে চমকে ভেবড়ে যাওয়ার একটা টেন্ডেন্সি দেখা দেয়। সে'টা রুখতেই গভর্নমেন্টের তরফ থেকে এই বাফার জোন অফিস তৈরি হয়েছে প্রায় বছর দশেক হল। সমস্ত মড়া এসে আগে এখানে জড়ো হয়। আর আমরা যারা এ'খানে চাকরী করি তারা পৃথিবী গোছের একটা পরিবেশ সিমুলেট করি। যা'তে আপনাদের একটু ধাতস্থ করে নেওয়া যায়। আফটার অল, আপনারা তো জানেন না যে কোয়ালিটি অফ লাইফে পৃথিবী ঘৌলমন্ডির কাছে বারো গোল আর দু'শো বারো রানে হারবে। ক্রমশ জানতে পারবেন"।

"মরেও মুক্তি নেই দেখছি ডাক্তারবাবু। এ'খানেও গভর্নমেন্ট,  এ'খানেও চাকরী। পড়াশোনাও আছে বোধ হয়"?

" রীতিমত। আমি নিজে গ্যাস পাস করেছি। নয়ত সরকারি চাকরী পেতাম না"।

"গ্যাস"?

" ঘোস্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসেস"।

"ওহ, তা এই হাসপাতাল বোধ হয় সিমুলেটেড, তাই না"?

"পুরোপুরি"।

" আর তাই বোধ হয় ওই ঘড়িতে গোলমাল, দু'টো কাটাই সেম সাইজের"।

" এহ বাবা, তাই তো। ফের সিমুলেশনে গণ্ডগোল। আমার প্রমোশনটা এ'বারেও গ্যালো"। বলে গজগজ করতে করতে মুণ্ডটা ফের চেয়ারে রাখা দেহের ঘাড়ে গিয়ে বসল; অমনি আবছা দেহটা ফের স্পষ্ট হয়ে উঠল।

"আপনার নামটা ডাক্তারবাবু"?

" ওহ, আমার আবার ডাক্তার বলা কেন। নাম ধরে ডাকবেন। আমার নাম হাতুড়েনসিক। ডাক নাম হাসি"।

"এ'টা কোনো নাম হল"?

" হ্যাঁ। মনোজ খুবই বদখত নাম। চলুন, সবার আগে গিয়ে আপনার নতুন নাম সংগ্রহ করে আসি"।

"নতুন নাম"?

" নয়ত কি মনোজ নামে ডাকবে নাকি সবাই চিরকাল? ভূতেরা হাসবে যে"।

"ভাই হাসি, আমার মনে কয়েক হাজার প্রশ্ন গিজগিজ করছে"।

"সামনে অনন্তকাল পড়ে ভায়া। ব্যস্ত হওয়ার কিছুই নেই। ইয়ে, একটা রিকুয়েস্ট। নাম রেজিস্ট্রেশনের অফিসে গিয়ে ঘড়ির গলদ আর আমার মুণ্ডু খুলে পড়ার ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা না করাই ভালো, কেমন? নয়ত এ'বারের প্রমোশনটাও ঝুলে যাবে"।

"বেশ"।

"আর ইয়ে, আরো একটা জিনিস। বাসে আপনা সঙ্গে একটা বাক্স ছিল"।

" আহা রে, তাই তো। পরাশর সুইটসের সরভাজা। বাপনদা সে সরভাজা বলতে অজ্ঞান। ভোগে লাগল না"।

"ও মা। ভোগে লাগবে না কেন"? এরপর গলা একটু নামিয়ে বললেন " ও বাক্স আমি ঘৌলমন্ডিতে উঠিয়ে এনেছি"।

"আনা যায় নাকি"?

" আইন বিরুদ্ধ। তবে সে সরভাজার সুবাসের জন্য হাজার আইনকে জবাই করা যায়। চেপে যাবেন ব্যাপারটা, আপনি ভদ্র সন্তান, বোঝেনই তো; মাঝেমধ্যে আইন না ভাঙলে কন্সটিটিউশনের গালে ব্রণ বেরোয়। ইয়ে, ভাগ পাবেন"।

"খাওয়া যায়? আই মীন ভূতেরা খেতে পারে"?

" খেতে না পারুক, শুঁকতে পারে। এ'খানে ব্রেকফাস্ট লাঞ্চ ডিনার সব আছে। শুধু সে সব খাওয়া হয় না; শুধু শোঁকা। তবে তা'তে সুবিধে আছে; জিরো অম্বল আর নো গলাবুক জ্বালা"।

"তোফা"।

" ওয়েলকাম টু ঘৌলমন্ডি"।

যুধিষ্ঠির ও কলকাতা

- অ্যাই অ্যাই অ্যাই...যুধিদা তিন ছক্কা পুট চেলেছে। গোহারা গোহারা। আমরা জিতে গেছি যুধিদা। ভদ্দরলোকের এক কথা। এ'বার তোমাদের বারো বছরের বনবাস, আমাদের ইন্দ্রপ্রস্থে ফুর্তি।

- ব্রাদার দুর্যো, বলছিলাম কী...ইয়ে...।

- না না না...আপনি ধর্মরাজ, কথার খেলাপ করলে দেবতাদের মনখারাপ হবে। নীতিকথার লিস্টি সব নতুন করে নোটারাইজ করতে হবে। সে কিছুতেই হতে দেওয়া যায় না। না না না।

- আহ দুর্যো, তোমার সবেতেই বাড়াবাড়ি। কতবার বলেছি, অর্জুন ভীমের রক্তের শেষ বিন্দু খরচ না করে আমি মচকাব না। শুধু বলছিলাম কী..ডেঙ্গুর সিজন চলছে ভাই। জঙ্গলটা অ্যাভয়েড করলে হয়না? ইন্দ্রপ্রস্থ তুমিই দেখভাল করো না, আমরা বরং একটু ঘুরেই আসি। কিন্তু জঙ্গল না, জঙ্গলে উইকেন্ড শুনেছি বড্ড বোরিং। স্রেফ  মুর্গীর রোস্ট আর হরিণ কষা খেয়ে কদ্দিন থাকা যায় বলো। তাই বলছিলাম একটা অলটারনেট অপশন ভাবো দেখি, শহর ঘেঁষা কিছু একটা। এই নকুলের দিব্যি, আমি এই অপশন না মানলে নকুলকে ছারপোকায় ছারখার করবে।

- (শকুনির সঙ্গে ফিসফিস করে কথা বলার পর) আচ্ছা বেশ। বলছেন যখন, ছোট ভাই হয়ে এই রিকুয়েস্ট নাকচ করি কী করে। বনবাস ক্যান্সেল।

- ক্যান্সেল দুর্যো? মাইরি?

- রিয়েলি। শুধু তাই নয়, বারো বছরটাও বড্ড বেশি হয়ে যাচ্ছিল। এক বছর থাকলেই হবে। তারপরেই ইন্দ্রপ্রস্থ ওয়াপিস আপনার।

- অনলি বারো মাস? শুনলি ভাই সহদেব? শুনলি? দুর্যো বড্ড মাইডিয়ার। ভীমটা মাথামোটা তাই অকারণ গালমন্দ করে। তা ব্রাদার দুর্যো, এই একবছর কোথায় থাকতে হবে?

- শহরেই।

- শহর? বুকে আয় ভাই।

- কলকাতায়। যে কোনো ফ্লাইওভারের নীচে। একটি বছর। ও কী যুধিদাদা, শরীর আনচান করছে নাকি? গা গুলোচ্ছে?

- না মানে, যদি তলিয়ে দেখিস দুর্যো; বনজঙ্গল ব্যাপারটা নেহাত মন্দ নয়। ইনফ্যাক্ট কবিই তো বলেছেন; দাও ফিরে সে অরণ্য লহ এ ফ্লাইওভার। আর জঙ্গল গেলে কি এক বছরের মধ্যে ফিরতে ইচ্ছে করবে ভাই? অমন অক্সিজেনের গুদাম ছেড়ে আসতে কার ভালো লাগে বলো। ডেঙ্গু হলে হবে, আমাদের ওই বারো বছরের বনবাসই ভালো। কী বলো পাঞ্চালী?

- সরি যুধোদা। বারো বছরের বনবাসের অপশন ক্যান্সেল। একবছর ফ্লাইওভারের তলে থাকো। তা'লেই হবে।

- আহ্ দুর্যো, তোমার এখনও ছেলেমানুষের মত জেদ। বেশ। শোন, বারো বছরের বনবাস শুধু নয়, তারপর এক বছর অজ্ঞাতবাসেও থাকব। তোর জন্য বোনাস অফার৷ কিন্তু ভাইটি, কলকাতার ফ্লাইওভারের নীচে থাকতে বোলো না। প্লীজ। প্লীজ।

- দাদার কথা ফেলি কী করে। বেশ। তাই হোক।

ময়ূখের মাস্টারমশাই

- আরে! মাস্টারমশাই?
- কে?
- আগে প্রণামটা সেরে নিই।
- আরে এ'সব আবার কেন...। দীর্ঘজীবী হও।
- চিনতে পারেননি?
- অভ্র? স্কুলের লেফট ব্যাক?
- না, আমি অভ্রদার একবছরের জুনিয়র। ময়ূখ।
- ময়ূখ,  হ্যাঁ হ্যাঁ। মনে পড়েছে। তুমিই তো বরাবর কেমিস্ট্রিতে হাইয়েস্ট পেতে। আটানব্বইয়ের ব্যাচ।
- ব্যাচটা ঠিক ধরেছেন তবে কেমিস্ট্রিটা ঠিক...ইয়ে...মাস্টারমশাই আমি আপনার অযোগ্য ছাত্র৷ কোনোরকমে টেনেটুনে পাশ করতাম। আপনি বোধ হয় মৃণালের কথা বলছেন, সে বরাবর কেমিস্ট্রিতে টপ করত।
- রাইট! মৃণাল। তাই তো। আসলে বয়স বাড়লে যা হয় আর কী। স্মৃতিশক্তি মিইয়ে এসেছে৷ তা এখন আছ কোথায়?
- বম্বেতে, নিজের একটা ছোটখাট ব্যবসা শুরু করেছি। পাড়ায় এলাম প্রায় বছর দশেক পর।
- বাহ্, বাহ্। এই তো চাই, নিজের মত করে কিছু একটা করছ। এ'টাই তো দরকার।
- আসলে চাকরীর যা বাজার...।
- তা ঠিক..উমম...মনে পড়েছে।
- আজ্ঞে?
- ময়ূখ সান্যাল। রাইট? অফস্পিন বল করতে? স্কুল লিগের সেমিফাইনালে শেষ ওভারে চারটে উইকেট নিয়ে জিতিয়েছিল?
- আপনার মনে আছে মাস্টারমশাই?
- সো গুড টু সী ইউ এগেইন ময়ূখ। আমার উচিৎ ছিল তোমায় আগেই চিনতে পারা৷ এমন ভুল আমার সচরাচর হয় না।
- আপনার দোষ নেই৷ এমন মেদবহুল চেহারা তো আগে ছিল না। তা, আপনি কেমন আছেন মাস্টারমশাই? আপনার বাগানের শখ এখনও আছে?
- এখন আমার বাড়িতে এলে অন্তত বাইশ রকমের গোলাপ দেখতে পারবে।
- বাহ্। দারুণ তো।
- তা এসো না একদিন, আজকেই এসো।
- নিশ্চয়ই আসব।
- তোমার বাড়ির সবাই ভালো আছেন ময়ূখ?
- বাবা আর নেই। মা আমার সঙ্গেই থাকেন।
- বিয়েথা করেছ?
- হ্যাঁ।
- ছেলেপিলে?
- ছেলে নেই। একটি পিলে। পারলে আজ তাকে আপনার বাড়ি নিয়ে যাব'খন।
- এনো, অবশ্যই এনো। ওকে তোমাদের কানমলার গল্প করব। আর তোমরা আজ বিকেলেই এসো, ওই সময় আমি আমার গোলাপ গাছগুলোর দেখভাল করি৷ রিটায়ার করেছি বেশ কিছু বছর হল, এখন ওগুলোই আমার ছাত্র। তা ময়ূখ, তোমার ব্যবসাটা কীসের?
- হুঁ?
- ওই যে বললে বিজনেসে ঢুকেছ। কী বিজনেস?
-  বড্ড বেলা হয়ে গেছে মাস্টারমশাই। আমি বরং এখন এগোই।
- বেশ। এসো কিন্তু। আমার হাতের কানমলা যতটা তেতো ছিল, আমার হাতের চা ততটাই চমৎকার। কোয়ালিটি দার্জিলিং লিভস। ওই একটা লাটসাহেবি কিছুতেই ছাড়তে পারিনি।

ফেরার সময়ই ময়ূখ ঠিক করে নিয়েছিল যে মাস্টারমশাইকে এক টিন দামী চা পাতা উপহার দেবে। মানুষটা বড্ড ভালো। প্রচণ্ড পরিশ্রম করতেন ছাত্রদের জন্য, খেলাপাগলও বটে। তবে চায়ের টিন হাতে করে তাঁর বাড়ি নিয়ে যাওয়া যাবে না, পোস্টে পাঠাতে হবে। বিকেলের প্ল্যানও ক্যান্সেল। না গেলে সামান্য দুঃখ পাবেন বটে, কিন্তু ফের যদি মাস্টারমশাই 'তোমার ব্যবসাটা কীসের' জিজ্ঞেস করেন তা'হলে বড্ড ফাঁপরে পড়তে হবে। বৃদ্ধ কেমিস্ট্রির মাস্টারকে সে কী করে বোঝাবে যে তার ফুলেফেঁপে ওঠা ব্যবসাটা আদতে ইস্কুলের ব্যবসা আর ছাত্রদের আনাগোনাকে সে স্রেফ টার্নওভার বলে চেনে।

প্রগ্রেস

- মাস্টার, ছেলের প্রগ্রেস কেমন বুঝছ?

- বাপকা ব্যাটা। সিপাহী কা ঘোড়া।

- কমপ্লিমেন্ট না কানমলা?

- আপনার ছেলে কম্পাস দিয়ে চাউমিন খায় সাহাবাবু। প্রগ্রেস প্রগ্রেস করে নিজেকে এম্ব্যারেস করবেন না।

- সিগারেট খাবে মাস্টার?

- কোনোদিন মাংস পোলাও বা রাবড়ি তো অফার করতে শুনলাম না। যাক, তাই দিন। গাধা পেটানোর কাজ, বাড়তি বেঁচে আর কী হবে।

- তা তোমার ইংরেজি খবরের কাগজ কী বলছে?

- ইকনমি ধসছে। নেতাদের লারেলাপ্পাগিরি বাড়ছে। সরকার অপোজিশন সব মিলেমিশে গোল্লায় যাচ্ছে।

- চিন্তার ব্যাপার নাকি?

- চিন্তা দেশের ও দশের। আপনি চালের আড়তদারি করছেন, পায়ের ওপর পা তুলে বসে থাকুন। ইকনোমি যত ঝুলবে তত আপনার পোয়াবারো।

- বলছ?

- অফকোউর্স। তবে ছেলেটাকে বলুন সামান্য ম্যাথেম্যাটিক্স না শিখলেই নয়৷ শেষে আপনার উৎপাতের ধন ও চিৎপাতে বিলোবে।

- মায়ের আদরে ছেলেটা বাঁদর হয়ে পড়ল মাস্টার। আমি কি আর চেষ্টার কমতি রেখেছি? ক্লাস সিক্সে ফেল করল, দিলাম স্কুলের দালান বাঁধিয়ে। টেনে ক্লাস সেভেনে গেলো, ফের ফেল। সে'বার স্টাফরুমের জন্য ফ্রিজ আর চারটে কম্পিউটার কিনে দিলাম। এ'বারে কিছু একটা করো, নয়ত হেডমাস্টার বলে রেখেছে; ছেলেকে ক্লাসে এইটে তুলতে ছাতে দু'টো ঘর তুলে দিতে হবে। তোমার ওপর আমার বড় ভরসা মাস্টার।

- স্বয়ং বীণাপাণি আপনার ছেলেকে টিউশানি পড়ালেও বিশেষ লাভ করতে পারতেন না৷ যা হোক।

- বীণাপাণি কে? ওই নতুন ইতিহাসের দিদিমনি?

- সাহাবাবু। আপনি চালের ব্যবসায় ফোকাস করুন। যা বর্ষার সিচুয়েশন, কালোবাজারির স্কোপ কিন্তু দিব্যি বাড়বে।

- বাড়বে? বলছ? স্টক ধরে রাখব? দেখো মাস্টার, ইকনমির হালহকিকত তোমার থেকেই জানতে পারি।

- এ'বার পাঁচ কিলো দুধেরসর ওজন করিয়ে দিন দেখি।

- পল্টে। মাস্টারকে পাঁচকিলো চাল দিয়ে যা। তা মাস্টার, খাতায় লিখব না নগদ দেবে?

- খাতা?

- নগদ?

- নগদ?

- নয়? দ্যাখো মাস্টার। আমি কম্পাসে চাউমিন তুলি না।  হাত দিয়ে কষে ঝোলভাত মাখি। ব্যাবসায় ওয়ান পাইস ফাদার মাদার মাস্টার। তোমার আগের তিনশো বাহাত্তর টাকা বাকি আছে।

- পাঁচ নয়। দেড় কিলো দিতে বলুন৷ নগদে নেব।

- পল্টে। মাস্টারকে দেড় কিলো দিবি। আর দেখিস, মাস্টার মানুষ, ওজনে মারিস না বাবা।

- আপনি একটা যন্তর।

- আমি তো তাই বলি মাস্টার, আমি যন্তর তিনি যন্ত্রী। যেমন চালাচ্ছেন তেমন চলছি। যাক গে,ছেলেটাকে দেখো। আর দেশের হালহকিকত জানিওটানিও। আর একটা সিগারেট খাবে নাকি হে?