Saturday, June 16, 2018

সঠিক


চিরকাল সঠিক মানুষরা পাশে থেকেছেন। যেমন কলকাতার মেসের আন্টি।
বছরের এই সময়টা মেসে রাত্তিরে খাওয়ার পাতে একটা করে আম থাকত। সবাইকে দেওয়া হত একটা গোটা আম তিনটে লম্বা ফালি করে; খোসা-সহ।
কিন্তু আন্টি আমার 'সেনসিটিভিটি' বুঝতেন, স্নেহ করতেন। আমার পাতের পাশে স্টিলের প্লেটে থাকতো খোসা ছাড়ানো কুচোনো আম (আঁটির বাহুল্য বাদ দিয়ে); সঙ্গে ফ্রুট-ফর্ক। 
"আমাদের তন্ময়ের খোসা ছাড়িয়ে খেতে অসুবিধে হয়"
বা
"পেটির মাছ ছাড়া তন্ময় ঠিক খেতে পারে না"
বা
"আজ মাছের তেল অল্প ছিল, তেলবেগুনের চচ্চড়ি তাই শুধু তন্ময়কে দিয়েছি। ও বেচারি ঝোলটোল তেমন ভালো খায় না"।

স্নেহ ব্যাপারটা সামান্য অন্ধ না হলে চলে না। আর স্নেহে নিখুঁত অবজেক্টিভিটি হচ্ছে প্যারামাউন্টের ডাব সরবতে চোনার মত।
কপাল করে মেস-মেটদের জুটিয়েছিলাম; আমার প্রতি আন্টির বাড়তি স্নেহে কারুর কোনোদিন চোখ টাটায়নি।

Thursday, June 7, 2018

খুচরো-রবিনহুড

- খুচরো চাই?
- খুচরো?
- চাই? আছে প্রচুর।
- জানা নেই শোনা নেই। আপনি আমায় খুচরো দেবেন কেন?
- বাহ্, আধ ঘণ্টা ধরে বাসে পাশাপাশি বসে আছি। বাস ঢাকুরিয়া থেকে আলিপুর চলে এলো। আপনার খোকার নাম বিট্টা, হাফ ইয়ার্লিতে অঙ্কে কম নম্বর পেয়েছে। কতটা জানি বলুন।
- আপনি কান পেতে আমার ফোনে বলা কথা শুনছিলেন?
- হ্যাঁ। বৌদির গা ম্যাজম্যাজ। আর আজ আপনার বড়ি কিনে বাড়ি ফেরার কথা, ওই কোন সাউয়ের দোকানের বড়ি।
- এই, আপনি তো ডেঞ্জারাস লোক মশাই।
- আরে! এমপ্যাথিতে আবার ডেঞ্জার কোথায়?
- রাখুন। এমপ্যাথি। গায়ে পড়ে খুচরো দেওয়া। এই আপনার মতলবটা কী বলুন তো।
- মতলব ছাড়া কিছু করতে নেই বুঝি? কন্ডাক্টরকে পয়সা দেওয়ার সময়ই দেখলাম তো। মানিব্যাগ থেকে শেষ দশ টাকার নোটটা অফার করলেন। এখন পড়ে সব ড্যাবা ড্যাবা নোট। বড়ি কিনতে গিয়ে বড় রকমের ঝামেলায় পড়বেন তো। দিন, দু'টো পাঁচশো দিন। পাঁচটা একশো, আটটা পঞ্চাশ, পাঁচটা কুড়ি আর দশটা দশ দিচ্ছি। কড়কড়ে নোট। মাইরি।
- ধেত্তেরি। কী গায়ে পড়া লোক মাইরি। বললাম তো, খুচরো চাই না।
- সন্দেহ করছেন? জাল নোট গছিয়ে দেব?
- ট্যুয়েন্টি সেভেন্টিতে বাস করছি মশায়। মার্সেও পিকপকেট হচ্ছে। এ'দিকে আমি ফট করে মিনিবাসে এক উটকো খুচরো-যুধিষ্ঠিরকে বিশ্বাস করে ডুবি আর কী।
- কী বাতিকগ্রস্ত বলুন দেখি আপনি। হাতের খুচরো পায়ে ঠেলছেন। বাজে তর্ক না করে দিন দু'টো পাঁচশো। ভাঙিয়ে দিই, সামনেই আমি নামব।
- খবরদার। খবরদার খুচরো খুচরো করে জোর করবেন না। নয়ত কন্ডাক্টরকে কম্পলেইন করতে বাধ্য হব।
- কন্ডাক্টর কি হেডমাস্টার?
- আপনি কি ডাকাত?
- না। তবে মাইল্ড বিপদে পড়েছি স্যার। আমার খুচরো গোটা করে দিন প্লীজ। আমি জেনুইন। আমার আধার কার্ডের কপি রাখতে পারেন।
- কিন্তু বিপদটা কীসের?
- অটো যাতায়াতের জন্য সাড়ে ছয় কেজি খুচরো জমিয়েছিলাম। এই দু'হাজার সত্তর সালের মধ্যেই বেহালা মেট্রো চালু হয়ে যাবে ভাবিনি। এলিয়েনরা কী সব টেকনোলোজি নিয়ে এমন  ইন্টারভিন করল যে আমার অটো-খুচরোর স্টক এখন লায়াবিলিটি। সে কারণেই আমি এখন খুচরো-রবিনহুড স্যার। তিলে তিলে স্টক ক্লীয়ার করছি।
- বেহালা মেট্রো চালু হচ্ছে। মনখারাপ হয়ে যায় ভাবলেই। অমন ঐতিহাসিক আলসে পিলারগুলোর গায়ে কত চাপ পড়বে। নাহ, এমপাথাইজ করতেই হবে। দিন দেখি যা খুচরো আছে।

মধুময়ের হিল্লে

মধুময় জানে না ব্যাপারটা কী ভাবে ঘটে।
জানার কথাও না। কিন্তু মাঝেমধ্যেই হয়।
মধুময়ের গান পায়, শুধু গান পায় তাই নয়; গলা বেয়ে গান আপনা থেকেই বেরিয়েও আসে। মধুময় জানে না ব্যাপারটা কী ভাবে ঘটে।
জানার কথাও না। কিন্তু মাঝেমধ্যেই হয়।

মধুময়ের গান পায়, শুধু গান পায় তাই নয়; গলা বেয়ে গান আপনা থেকেই বেরিয়েও আসে।

সুরগুলো মধুময়ের চেনা নয়। সবচেয়ে বড় কথা; গানের ভাষাটাই মধুময় জানে না। তবু অচেনা ভাষায় নতুন নতুন সুরে নতুন নতুন গান মাঝেমধ্যে মধুময়ের মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসে। আর যখন আসে তখন সেই সুরের তোড় কিছুতেই রোখা যায় না; মধুময় গেয়ে উঠবেই। অমূল্য দাসের মুদীর দোকানে কাজ করে, হঠাৎ হঠাৎ গান পেলে বড় অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে সে। অমূল্য দাস বা খদ্দেররাও প্রথম প্রথম ভেবড়ে যেত আর অদ্ভুত ভাষার গান শুনে, কিন্তু মধুময়ের গলায় দিব্যি সুর এসে গেছিল। ক্রমশ ব্যাপারটা গা-সওয়া হয়ে এসেছে। এখন আর তার গানে কেউ চমকে ওঠে না, এমনিতেও 'পাগলছাগল' বলে তাকে বিশেষ কেউ ঘাটায় না।

কিন্তু গান এলেই আরো একটা ব্যাপার হয়, সে'টা মধুময় ছাড়া অন্য কেউ টের পায় না। কানের মধ্যে কারুর মিঠে খিলিখিল হাসির শব্দ ভেসে আসে। কোনো ছোট্টমেয়ে, নিশ্চিত। মাঝেমধ্যে আসে হাততালির শব্দ, কখনো ছোট্ট মেয়েটা কথায় বলে ওঠে, গেয়েও ওঠে; কিন্তু সেই উদ্ভট অজানা ভাষায়। ব্যাপারটা আরো গোলমেলে অন্য কারণে, মধুময় কালা। কানে কিস্যুটি শুনতে পায় না। সাত বছর বয়সে একটা বিশ্রী অসুখে কান দু'টোই গেছিল। খুকির গলা কী ভাবে শুনতে পায় মধুময়? খুকিটি কে? কোথায় থাকে?

বেশি চিন্তা করে লাভ নেই। খুকির প্রতি সামান্য মায়া পড়ে গেছে। খুকি কি তার গান ভালোবাসে?

**

শিয়াঙের বন্ধুবান্ধব নেই, কথা বলতে না পারলে যা হয় আর কী। তবে শিয়াঙ সমস্ত কথা শুনতে পারে। সে আপন মনে খেলে বেড়ায়। মাঠে, ছাদে, উঠোনে, বাগানে আর মাঝেমধ্যে চিলেকোঠার ঘরে।
চিলেকোঠার ঘরটা শিয়াঙের বড় প্রিয়। কত সাতপুরনো আসবাবপত্র সে'খানে পড়ে। ছোট্ট শিয়াঙ সবচেয়ে ভালোবাসে পুরনো ভাঙাচোরা ট্রাঞ্জিস্টরটা। সবাই অবশ্য সে'টাকে অচল বলে, অথচ শিয়াঙ সে'টার নব ঘোরালেই একই কণ্ঠে খালি গলায় বিভিন্ন গান শুনতে পায়। সে কথা অবশ্য কেউ বিশ্বাস করে না। এক ভারতীয় বিজ্ঞানী কিছুদিন শিয়াঙের বাবার অতিথি হয়ে ছিলেন, শিয়াঙের সঙ্গে বড্ড ভাব জমে গেছিল তার। যাওয়ার আগে এই ভাঙা ট্রান্সিস্টর শিয়াঙকে উপহার দিয়ে গেছিলেন।

বাড়ির সক্কলে অবাক, এমন ভাঙা ট্রান্সিস্টর কেউ কাউকে দেয় নাকি? তবে বৈজ্ঞানিকরা অমন খ্যাপাটে হয় বটে, আর উপহার যখন; তা ফেলেও দেওয়া যায় না। কাজেই তার স্থান হয়েছিল চিলেকোঠায়। 

কিন্তু উপহারটা যে কতটা ভালো তা শুধু শিয়াঙ টের পায়। রেডিওর নব ঘোরালেই একটা অচেনা পুরুষ কণ্ঠ অদ্ভুত উচ্চারণে এবং অপূর্ব সুরে গাইতে শুরু করে। কী আনন্দ হয় শিয়াঙের। খিলিখিলিয়ে হেসে ওঠে সে, হাততালি দেয় আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার; সেই গান শোনার সময় রীতিমত কথা বলতে পারে ছোট্ট শিয়াং। কেউ বিশ্বাস করে না, তা'তে শিয়াঙের ভারি বয়েই গেছে! সে গান শুনে শিয়াঙ কথা বলতে পারে; এমন কী গাইতেও পারে। 

শিয়াঙ বড্ড ভালোবাসে রেডিওর কণ্ঠস্বরটাকে।

**

- প্রহ্লাদ রে, আছিস কোথায়?
- যাক, চীনদেশ থেকে ফিরলেন শেষে। আমি ভাবলাম আর ফিরবেন না। ল্যাবোরেটরির মায়া ত্যাগ করে মানস সরোবরের আশেপাশে সাধুটাধু হয়ে ঘুরে বেড়াবেন বোধ হয়।
- ল্যাবরেটরি সাফ রেখেছিস?
- ঝকঝকে তকতকে আজ্ঞে।
- তোর জন্য একটা ভালো খবর আছে।
- সন্ন্যাসটা নিচ্ছেন? আমায় এ বাড়ি উইল করে দিচ্ছেন। ল্যাবরেটরিতে কিন্তু আমি ঠাকুরঘর করব বলে রাখলাম।
- উফফ। এ ব্যাটাকে স্নাফ গানে শায়েস্তা না করলে চলছে না। যাক গে, তোর পিসতুতো ভাই মধুময়ের কথা বলেছিলিস না? তার বড় দুঃখ সে কানে শুনতে পায় না? হিয়ারিং এডেও কাজ হয়নি? 
- নবদ্বীপে বাস। ন্যালাখ্যাপা হতে পারে, কিন্তু বড় ভালো ছেলে। আহা, কী দুঃখ তার! 
- তার একটা হিল্লে করে এলাম।
- মধুময়ের?
- নয়তো আর বলছি কী। 
- চীনদেশে গেছিলেন না নবদ্বীপ?
- চীন। অপূর্ব দেশ, ছ'মাস ধরে চষে বেড়ালাম। 
- তা'তে মধুময়ের কী লাভ? সে যে নবদ্বীপে!
- এক ঢিলে দুই পাখি। তোর মাথায় ঢুকবে না। তা হ্যাঁ রে  প্রহ্লাদ,  নিউটনকে দেখছি না যে। তার কি অভিমান হয়েছে? 

Tuesday, June 5, 2018

অগ্নীশ্বর



ছোটবেলায় অগ্নীশ্বর সিনেমাটা বড় প্রিয় ছিল। দাপুটে ক্ষুরধার চরিত্রের ডাক্তার। তাঁর প্রতিটি কথার গায়ে যতটা দেমাকের ছাপ, ততটাই তা'তে মিশে রয়েছে অবিচল সত্য যা অনবরত মানুষের মুখের উপর আছড়ে পড়ছে।

কিন্তু ছোটবেলার রুচি চিরকাল স্থির থাকবে না; সে'টাই স্বাভাবিক। ক্রমে আদত লেখাটা পড়লাম, বয়স বাড়ল। সিনেমাটাকে ওভার অ্যাক্টিংয়ের ডিপো মনে হতে লাগল। অনেক সিচুয়েশনকে মনে হতে লাগল বাড়াবাড়ি।

অথচ বয়স দেখছি অতি খতরনাক বস্তু। আর রুচি মহাখালিফা; আজ সে নজরুলগীতি গাইছে তো কাল বলিউডি ঠুমকে তো পরশু ওয়াপিস অতুলপ্রসাদ তো তরশু মুকেশের গলায় ঝুলে কান্নাকাটি।

কী মনে করে আবার অগ্নীশ্বর দেখলাম কে জানে। আবার বুক ছাপানো ভালো লাগা ফিরে এলো। সমস্ত ওভার অ্যাক্টিং স্টোরবাবুর বৌয়ের স্নেহে ধুয়ে গেল। আহা, ফটিকের সন্দেশের প্রতি যে কী লোভ, সেই সৎছেলের লোভ ভুলে তিনি কোন মুখে নিজের পথ্যে দুধ খাবেন? তাঁর প্রণাম নেননি অগ্নিডাক্তার; স্টোরবাবুর বৌ বয়সে ডাক্তারের চেয়ে ছোট, তবু তাঁর মুখের দিকে চেয়ে নিজের মায়ের বিস্মৃত চেহারার মায়াটুকু খুঁজে পান তিনি। প্রণাম নেবেন কী করে?

না স্যার, টিউশনি পড়িয়েও আমায় সিনেমা শেখাতে পারবেন না। স্টোরবাবুর বৌয়ের প্রণাম নিতে না পেরে অগ্নীশ্বর গলার মধ্যে টেনিস বল গুঁজে দেবেন। দেবেনই। আর শেষ বয়সে এসে যখন অবিশ্বাসী রুখাশুখা মেজাজের ডাক্তার দেখলেন যে ফটিক তার মাকে কাঁধে চাপিয়ে তীর্থভ্রমণে বেরিয়েছে; তখন তাঁর মুখের যে আলোময় আস্তিক হাসি ভেসে উঠল- তা দেখলে মনে পূর্ণেন্দু পত্রী মার্কা হাওয়া খেলে যাবে না? তা কি হয়? কাজ নেই আমার সিনেমা বুঝে।

বৃদ্ধ ডাক্তার আফশোস করছেন বাপের ঋণ শোধ করতে প্রতিবেশির জন্য প্রাণপাত করা দেহাতী মানুষটির সঙ্গে আগে দেখা হয়নি বলে, আমরা তা দেখে বলছি 'আহা'। নিজের ছেলে পণ নিয়েছে খবর পেয়ে সে বিয়ের আসর ত্যাগ করে উঠে আসার সময় দাঁত কিড়মিড় করে অগ্নীশ্বর বলছেন "যে দুধে কেরোসিনের গন্ধ তা গিলতে হয় তোমরা গেলো, আমি পারব না", তা শুনে আমরা বলছি "চাবুক'। সুছন্দা যে'দিন মারা গেল সে'দিন ভোরে আবহে 'তুমি নির্মল কর মঙ্গল কর'র ব্যথা ছিল। 'তবু মনে রেখো'য় ডাক্তারের স্ত্রীর আলপনার মত নিষ্পাপ ভালোবাসা ছিল। পুরানো সেই দিনের কথায় হেমন্ত ছিলেন।

আর সিনেমার শেষ প্রান্তে 'ধন ধান্য পুষ্প ভরা'র সুর মিশে গেছিল "দেবী সুরেশ্বরী ভগবতী গঙ্গে, ত্রিভুবন তারিণী তরল তরঙ্গে, জয় সুর তরঙ্গিণী, মকর বাহিনী, পতিত পাবনী, মা গঙ্গে জয় গঙ্গে"র অমোঘ টানে।

সব চেয়ে বড় কথা; দেশের এবং দশের অপদার্থতায় তিতিবিরক্ত ডাক্তার অগ্নীশ্বর মুখুজ্জে শেষ পর্যন্ত এ দেশেই আবার ফিরে আসতে চেয়েছিলেন।

আবারো বলি, কাজ নেই সিনেমার ভাষা খাতায়কলমে বুঝে। বয়সের ওজন যেন কোনোদিন সদ্য 'অগ্নীশ্বর' দেখা মনকেমনের ভার লাঘব না করতে পারে।

Monday, June 4, 2018

কলকাতার মেসিয়াহ্ - ৬



- এই যে ব্রাদার অরূপ, ঘুম আসছে না?
- এই প্রশ্নের যে কোনো উত্তরই সেল্ফ-ডিফীটিং, তাই না অজয়দা?
- সর্বনাশ। মেসবাড়িতে ফিলোসফিক উত্তর। ব্যাপারটা কী?
- আসছে না। ঘুম। অবভিয়াসলি।
- কী নাম যেন মেয়েটার? কুন্তলা?
- ধুস।
- কুন্তলা নয় ওর নাম?
- আহা, ওর নাম কুন্তলাই। কিন্তু ও আবার এলো কোথা থেকে। গরমে গলদঘর্ম, তাই..।
- লেটস সী। চিঠি দিয়েছে?
- ধ্যার।
- চিঠি এক্সপেক্ট করছিলিস অথচ দেয়নি?
- উফ, অজয়দা।
- প্রেমের কচু চেনার ব্যাপারে আমি রীতিমত শুয়োর, বুঝলি? বিকেলে চাউমিনে ডিম দিতে বললি না, ছাদে গেলি রেডিও ছাড়া; এ'সমস্তই শিওর শট সিম্পটম।
- কলকাতায় এসেছে। সে।
- কুন্তলা কলকাতায়?এই সময়? তোর না সামনে ফার্স্ট ইয়ারের এগজ্যাম? গেল পাঁচ পারসেন্ট।
- যত বাজে কথা। এ কী, আলো জ্বাললে কেন?
- হবে না, তোর এখন ঘুম আসবে না। গজার ডিবেটা এ'দিকে দে। আর খুলে বল। পটাটা থাকলে ভালো হত, প্রেমট্রেমের ব্যাপারে ওর মাথা বেশ খোলতাই।
- প্রেম কেন হতে যাবে?
- ওহ হো। তোর তো আবার সেমান্টিক অ্যালার্জি আছে। যাক গে, মাসীমা কিন্তু গজাগুলো বড় ভালো বানান।
- কুন্তলা এক হপ্তা হল এসেছে।
- থাকে তো দিল্লীতে, তাই না?
- জয়পুরে।
- ওই হল। তা, তুই জানলি কী করে? এসেছে?
- চিঠি।
- দেখা?
- করবে বলেছিল। ফোন নাম্বারও দিয়েছিল। বুথ থেকে ফোন করেছিলাম। বলল সোমবার দেখা করবে। সন্ধেবেলা।
- মানে...কালকে?
- হুঁ।
- ও, আনন্দে ঘুম আসছে না, তাই বল।
- অজয়দা, ওর গলা যেন কেমন শোনালো। দেখা করতে চায় না যেন, নেহাৎ বাধ্য হয়ে...।
- পেসিমিজম।
- গাট ফীলিং। ভাবছি দেখাটেখা করব না।
- তোর মাথায় গাঁট্টা মারলে তবে তোর বদফীলিংগুলো শায়েস্তা হবে। কোথায় দেখা করছিস? সেই আগের বারের মত? কমলা ক্যাফে?
- কথা তেমনই, কিন্তু আমি ভাবছিলাম...মানে মনে হচ্ছিল...কুন্তলা ঠিক দেখা করতে চায় না।
- রাবিশ। গজা শেষ। আর কাল দেখা করে আসিস। অবশ্যই। তারপর অ্যাসেস করব।

***

কমলা ক্যাফেতে অজয়দাও এসেছিল, অরূপের পিছুপিছু।  প্রতিবার যেমন বিরক্ত করতে আসে, আচমকা উদয় হয়। কাটলেটে ভাগ বসায়, বাজে জ্ঞান দেয়। গতবার কুন্তলা বেশ বিরক্ত হয়েছিল। তবে অজয়দা ও'সব বিরক্তিকে পাত্তা দেয় না।

এ'বারে অবশ্য তেমন সমস্যা হয়নি। কুন্তলা আসেনি। অরূপের কাছে ব্যক্তিগত কোনো ফোন নেই, তাই হয়ত জানাতে পারেনি।

দেড় ঘণ্টা অপেক্ষা অপেক্ষা করেছিল অরূপ। অজয়দা তারপর পাশের কেবিন থেকে বেরিয়ে আসে।

"কুন্তলা খুব ভালো মেয়ে অজয়দা। আসলে, আমি ঠিক..." বেকুবের মত বলে ফেলেছিল অরূপ। তবে এ'বার দুম করে অজয়দাকে দেখতে পেয়ে বড় ভালো লেগেছিল।

স্পেশ্যাল মোগলাই দু'টো অজয়দাই অর্ডার করেছিল। টিউশনারি টাকাগুলো ওর কাছে বড় দামী, একদম বাজে খরচ করে না অজয়দা। ওর বাড়ির অবস্থা তেমন সুবিধের নয় কিনা। মোগলাইয়ের পর যখন দু'টো থামস আপ অর্ডার করল অজয়দা, তখন অরূপেরই গা কড়কড় করছিল। কিন্তু বারণ শুনল না। কমলা ক্যাফে থেকে বেরিয়ে এসে কলেজ স্ট্রীটের দে বুক স্টলে নিয়ে গিয়ে অরূপকে একটা বই কিনে দিয়েছিল অজয়দা, এ'বারও বারণ শোনেনি। শিব্রামের 'ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা'।

মেসে ঢোকার মুখে অজয়দা অরূপের কাঁধে হাত রেখেছিল;
"অরূপ, কুন্তলা সত্যিই ভালো মেয়ে। এ বিশ্বাস কোনোদিন নষ্ট হতে দিবি না, কেমন"?

মেসের 'বেড'টাই ক্রমশ অরূপের 'বাড়ি' হয়ে উঠছিল।

(চলছে, চলবে)