Saturday, June 16, 2018
সঠিক
Thursday, June 7, 2018
খুচরো-রবিনহুড
- খুচরো চাই?
- খুচরো?
- চাই? আছে প্রচুর।
- জানা নেই শোনা নেই। আপনি আমায় খুচরো দেবেন কেন?
- বাহ্, আধ ঘণ্টা ধরে বাসে পাশাপাশি বসে আছি। বাস ঢাকুরিয়া থেকে আলিপুর চলে এলো। আপনার খোকার নাম বিট্টা, হাফ ইয়ার্লিতে অঙ্কে কম নম্বর পেয়েছে। কতটা জানি বলুন।
- আপনি কান পেতে আমার ফোনে বলা কথা শুনছিলেন?
- হ্যাঁ। বৌদির গা ম্যাজম্যাজ। আর আজ আপনার বড়ি কিনে বাড়ি ফেরার কথা, ওই কোন সাউয়ের দোকানের বড়ি।
- এই, আপনি তো ডেঞ্জারাস লোক মশাই।
- আরে! এমপ্যাথিতে আবার ডেঞ্জার কোথায়?
- রাখুন। এমপ্যাথি। গায়ে পড়ে খুচরো দেওয়া। এই আপনার মতলবটা কী বলুন তো।
- মতলব ছাড়া কিছু করতে নেই বুঝি? কন্ডাক্টরকে পয়সা দেওয়ার সময়ই দেখলাম তো। মানিব্যাগ থেকে শেষ দশ টাকার নোটটা অফার করলেন। এখন পড়ে সব ড্যাবা ড্যাবা নোট। বড়ি কিনতে গিয়ে বড় রকমের ঝামেলায় পড়বেন তো। দিন, দু'টো পাঁচশো দিন। পাঁচটা একশো, আটটা পঞ্চাশ, পাঁচটা কুড়ি আর দশটা দশ দিচ্ছি। কড়কড়ে নোট। মাইরি।
- ধেত্তেরি। কী গায়ে পড়া লোক মাইরি। বললাম তো, খুচরো চাই না।
- সন্দেহ করছেন? জাল নোট গছিয়ে দেব?
- ট্যুয়েন্টি সেভেন্টিতে বাস করছি মশায়। মার্সেও পিকপকেট হচ্ছে। এ'দিকে আমি ফট করে মিনিবাসে এক উটকো খুচরো-যুধিষ্ঠিরকে বিশ্বাস করে ডুবি আর কী।
- কী বাতিকগ্রস্ত বলুন দেখি আপনি। হাতের খুচরো পায়ে ঠেলছেন। বাজে তর্ক না করে দিন দু'টো পাঁচশো। ভাঙিয়ে দিই, সামনেই আমি নামব।
- খবরদার। খবরদার খুচরো খুচরো করে জোর করবেন না। নয়ত কন্ডাক্টরকে কম্পলেইন করতে বাধ্য হব।
- কন্ডাক্টর কি হেডমাস্টার?
- আপনি কি ডাকাত?
- না। তবে মাইল্ড বিপদে পড়েছি স্যার। আমার খুচরো গোটা করে দিন প্লীজ। আমি জেনুইন। আমার আধার কার্ডের কপি রাখতে পারেন।
- কিন্তু বিপদটা কীসের?
- অটো যাতায়াতের জন্য সাড়ে ছয় কেজি খুচরো জমিয়েছিলাম। এই দু'হাজার সত্তর সালের মধ্যেই বেহালা মেট্রো চালু হয়ে যাবে ভাবিনি। এলিয়েনরা কী সব টেকনোলোজি নিয়ে এমন ইন্টারভিন করল যে আমার অটো-খুচরোর স্টক এখন লায়াবিলিটি। সে কারণেই আমি এখন খুচরো-রবিনহুড স্যার। তিলে তিলে স্টক ক্লীয়ার করছি।
- বেহালা মেট্রো চালু হচ্ছে। মনখারাপ হয়ে যায় ভাবলেই। অমন ঐতিহাসিক আলসে পিলারগুলোর গায়ে কত চাপ পড়বে। নাহ, এমপাথাইজ করতেই হবে। দিন দেখি যা খুচরো আছে।
মধুময়ের হিল্লে
Tuesday, June 5, 2018
অগ্নীশ্বর
ছোটবেলায় অগ্নীশ্বর সিনেমাটা বড় প্রিয় ছিল। দাপুটে ক্ষুরধার চরিত্রের ডাক্তার। তাঁর প্রতিটি কথার গায়ে যতটা দেমাকের ছাপ, ততটাই তা'তে মিশে রয়েছে অবিচল সত্য যা অনবরত মানুষের মুখের উপর আছড়ে পড়ছে।
কিন্তু ছোটবেলার রুচি চিরকাল স্থির থাকবে না; সে'টাই স্বাভাবিক। ক্রমে আদত লেখাটা পড়লাম, বয়স বাড়ল। সিনেমাটাকে ওভার অ্যাক্টিংয়ের ডিপো মনে হতে লাগল। অনেক সিচুয়েশনকে মনে হতে লাগল বাড়াবাড়ি।
অথচ বয়স দেখছি অতি খতরনাক বস্তু। আর রুচি মহাখালিফা; আজ সে নজরুলগীতি গাইছে তো কাল বলিউডি ঠুমকে তো পরশু ওয়াপিস অতুলপ্রসাদ তো তরশু মুকেশের গলায় ঝুলে কান্নাকাটি।
কী মনে করে আবার অগ্নীশ্বর দেখলাম কে জানে। আবার বুক ছাপানো ভালো লাগা ফিরে এলো। সমস্ত ওভার অ্যাক্টিং স্টোরবাবুর বৌয়ের স্নেহে ধুয়ে গেল। আহা, ফটিকের সন্দেশের প্রতি যে কী লোভ, সেই সৎছেলের লোভ ভুলে তিনি কোন মুখে নিজের পথ্যে দুধ খাবেন? তাঁর প্রণাম নেননি অগ্নিডাক্তার; স্টোরবাবুর বৌ বয়সে ডাক্তারের চেয়ে ছোট, তবু তাঁর মুখের দিকে চেয়ে নিজের মায়ের বিস্মৃত চেহারার মায়াটুকু খুঁজে পান তিনি। প্রণাম নেবেন কী করে?
না স্যার, টিউশনি পড়িয়েও আমায় সিনেমা শেখাতে পারবেন না। স্টোরবাবুর বৌয়ের প্রণাম নিতে না পেরে অগ্নীশ্বর গলার মধ্যে টেনিস বল গুঁজে দেবেন। দেবেনই। আর শেষ বয়সে এসে যখন অবিশ্বাসী রুখাশুখা মেজাজের ডাক্তার দেখলেন যে ফটিক তার মাকে কাঁধে চাপিয়ে তীর্থভ্রমণে বেরিয়েছে; তখন তাঁর মুখের যে আলোময় আস্তিক হাসি ভেসে উঠল- তা দেখলে মনে পূর্ণেন্দু পত্রী মার্কা হাওয়া খেলে যাবে না? তা কি হয়? কাজ নেই আমার সিনেমা বুঝে।
বৃদ্ধ ডাক্তার আফশোস করছেন বাপের ঋণ শোধ করতে প্রতিবেশির জন্য প্রাণপাত করা দেহাতী মানুষটির সঙ্গে আগে দেখা হয়নি বলে, আমরা তা দেখে বলছি 'আহা'। নিজের ছেলে পণ নিয়েছে খবর পেয়ে সে বিয়ের আসর ত্যাগ করে উঠে আসার সময় দাঁত কিড়মিড় করে অগ্নীশ্বর বলছেন "যে দুধে কেরোসিনের গন্ধ তা গিলতে হয় তোমরা গেলো, আমি পারব না", তা শুনে আমরা বলছি "চাবুক'। সুছন্দা যে'দিন মারা গেল সে'দিন ভোরে আবহে 'তুমি নির্মল কর মঙ্গল কর'র ব্যথা ছিল। 'তবু মনে রেখো'য় ডাক্তারের স্ত্রীর আলপনার মত নিষ্পাপ ভালোবাসা ছিল। পুরানো সেই দিনের কথায় হেমন্ত ছিলেন।
আর সিনেমার শেষ প্রান্তে 'ধন ধান্য পুষ্প ভরা'র সুর মিশে গেছিল "দেবী সুরেশ্বরী ভগবতী গঙ্গে, ত্রিভুবন তারিণী তরল তরঙ্গে, জয় সুর তরঙ্গিণী, মকর বাহিনী, পতিত পাবনী, মা গঙ্গে জয় গঙ্গে"র অমোঘ টানে।
সব চেয়ে বড় কথা; দেশের এবং দশের অপদার্থতায় তিতিবিরক্ত ডাক্তার অগ্নীশ্বর মুখুজ্জে শেষ পর্যন্ত এ দেশেই আবার ফিরে আসতে চেয়েছিলেন।
আবারো বলি, কাজ নেই সিনেমার ভাষা খাতায়কলমে বুঝে। বয়সের ওজন যেন কোনোদিন সদ্য 'অগ্নীশ্বর' দেখা মনকেমনের ভার লাঘব না করতে পারে।
Monday, June 4, 2018
কলকাতার মেসিয়াহ্ - ৬
- এই যে ব্রাদার অরূপ, ঘুম আসছে না?
- এই প্রশ্নের যে কোনো উত্তরই সেল্ফ-ডিফীটিং, তাই না অজয়দা?
- সর্বনাশ। মেসবাড়িতে ফিলোসফিক উত্তর। ব্যাপারটা কী?
- আসছে না। ঘুম। অবভিয়াসলি।
- কী নাম যেন মেয়েটার? কুন্তলা?
- ধুস।
- কুন্তলা নয় ওর নাম?
- আহা, ওর নাম কুন্তলাই। কিন্তু ও আবার এলো কোথা থেকে। গরমে গলদঘর্ম, তাই..।
- লেটস সী। চিঠি দিয়েছে?
- ধ্যার।
- চিঠি এক্সপেক্ট করছিলিস অথচ দেয়নি?
- উফ, অজয়দা।
- প্রেমের কচু চেনার ব্যাপারে আমি রীতিমত শুয়োর, বুঝলি? বিকেলে চাউমিনে ডিম দিতে বললি না, ছাদে গেলি রেডিও ছাড়া; এ'সমস্তই শিওর শট সিম্পটম।
- কলকাতায় এসেছে। সে।
- কুন্তলা কলকাতায়?এই সময়? তোর না সামনে ফার্স্ট ইয়ারের এগজ্যাম? গেল পাঁচ পারসেন্ট।
- যত বাজে কথা। এ কী, আলো জ্বাললে কেন?
- হবে না, তোর এখন ঘুম আসবে না। গজার ডিবেটা এ'দিকে দে। আর খুলে বল। পটাটা থাকলে ভালো হত, প্রেমট্রেমের ব্যাপারে ওর মাথা বেশ খোলতাই।
- প্রেম কেন হতে যাবে?
- ওহ হো। তোর তো আবার সেমান্টিক অ্যালার্জি আছে। যাক গে, মাসীমা কিন্তু গজাগুলো বড় ভালো বানান।
- কুন্তলা এক হপ্তা হল এসেছে।
- থাকে তো দিল্লীতে, তাই না?
- জয়পুরে।
- ওই হল। তা, তুই জানলি কী করে? এসেছে?
- চিঠি।
- দেখা?
- করবে বলেছিল। ফোন নাম্বারও দিয়েছিল। বুথ থেকে ফোন করেছিলাম। বলল সোমবার দেখা করবে। সন্ধেবেলা।
- মানে...কালকে?
- হুঁ।
- ও, আনন্দে ঘুম আসছে না, তাই বল।
- অজয়দা, ওর গলা যেন কেমন শোনালো। দেখা করতে চায় না যেন, নেহাৎ বাধ্য হয়ে...।
- পেসিমিজম।
- গাট ফীলিং। ভাবছি দেখাটেখা করব না।
- তোর মাথায় গাঁট্টা মারলে তবে তোর বদফীলিংগুলো শায়েস্তা হবে। কোথায় দেখা করছিস? সেই আগের বারের মত? কমলা ক্যাফে?
- কথা তেমনই, কিন্তু আমি ভাবছিলাম...মানে মনে হচ্ছিল...কুন্তলা ঠিক দেখা করতে চায় না।
- রাবিশ। গজা শেষ। আর কাল দেখা করে আসিস। অবশ্যই। তারপর অ্যাসেস করব।
***
কমলা ক্যাফেতে অজয়দাও এসেছিল, অরূপের পিছুপিছু। প্রতিবার যেমন বিরক্ত করতে আসে, আচমকা উদয় হয়। কাটলেটে ভাগ বসায়, বাজে জ্ঞান দেয়। গতবার কুন্তলা বেশ বিরক্ত হয়েছিল। তবে অজয়দা ও'সব বিরক্তিকে পাত্তা দেয় না।
এ'বারে অবশ্য তেমন সমস্যা হয়নি। কুন্তলা আসেনি। অরূপের কাছে ব্যক্তিগত কোনো ফোন নেই, তাই হয়ত জানাতে পারেনি।
দেড় ঘণ্টা অপেক্ষা অপেক্ষা করেছিল অরূপ। অজয়দা তারপর পাশের কেবিন থেকে বেরিয়ে আসে।
"কুন্তলা খুব ভালো মেয়ে অজয়দা। আসলে, আমি ঠিক..." বেকুবের মত বলে ফেলেছিল অরূপ। তবে এ'বার দুম করে অজয়দাকে দেখতে পেয়ে বড় ভালো লেগেছিল।
স্পেশ্যাল মোগলাই দু'টো অজয়দাই অর্ডার করেছিল। টিউশনারি টাকাগুলো ওর কাছে বড় দামী, একদম বাজে খরচ করে না অজয়দা। ওর বাড়ির অবস্থা তেমন সুবিধের নয় কিনা। মোগলাইয়ের পর যখন দু'টো থামস আপ অর্ডার করল অজয়দা, তখন অরূপেরই গা কড়কড় করছিল। কিন্তু বারণ শুনল না। কমলা ক্যাফে থেকে বেরিয়ে এসে কলেজ স্ট্রীটের দে বুক স্টলে নিয়ে গিয়ে অরূপকে একটা বই কিনে দিয়েছিল অজয়দা, এ'বারও বারণ শোনেনি। শিব্রামের 'ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা'।
মেসে ঢোকার মুখে অজয়দা অরূপের কাঁধে হাত রেখেছিল;
"অরূপ, কুন্তলা সত্যিই ভালো মেয়ে। এ বিশ্বাস কোনোদিন নষ্ট হতে দিবি না, কেমন"?
মেসের 'বেড'টাই ক্রমশ অরূপের 'বাড়ি' হয়ে উঠছিল।
(চলছে, চলবে)


