Sunday, June 3, 2018

শোনো

- শোনো!
- এই সময় ফোন করলে? অফিস থেকে ফিরতে দেরী হবে নাকি?
- কচু। আজ তাড়াতাড়ি বেরিয়েছি, কিছুক্ষণেই পৌঁছে যাব।
- তা'হলে?
- তা'হলে কী?
- ফোন করলে কেন?
- বাহ্, ফোন করতে নেই নাকি?
- কিছুক্ষণেই পৌঁছে যাবে, অকারণ ফোনের ব্যালেন্স নষ্ট।
- আজ ফোনে একটা বড়সড় রিচার্জ করেছি!
- এ মা! কেন? কী দরকার? ক'টা ফোন করতে হয় আমাদের?
- শোনো তো। সমস্ত আউটগোয়িং কল ফ্রী। যতক্ষণ খুশি।
- সমস্ত?
- সমস্ত। তিন মাসে জন্য।
- এসটিডিতেও?
- হেহ্। হ্যাঁ। মালদায়য় ফোন করলেও ফ্রী।
- তা'হলে ঠিক আছে। তুমি অফিস থেকে ফিরলে রোজ একবার মাকে ফোন করব।
- একবার, দু'বার। যতবার খুশি।
- খুব ভালো। আমার ছোটবেলার এক বন্ধু বম্বেতে থাকে। গত পুজোয় দেখা হয়েছিল। ফোন নাম্বারও দিয়েছিল। বম্বেতে কল করা যাবে? ফ্রীতে?
- আলবাত যাবে।
- দারুণ। বেশ, আমিও একটা ভালো খবর দিই।
- ভালো খবর?
- জব্বর।
- কী'রকম?
- আজ রাত্রে বাটিচচ্চড়ি রেঁধেছি। কড়া ঝাল। খেতে বসার আগে দু'টো মামলেট ভেজে নেব। বৃষ্টির অনারে।
- তোমার জবাব নেই। তবে আমি কিছু টাকা আজ নষ্ট করে ফেলেছি জানো।
- সে কী!
- এত বৃষ্টি, ঝড়ঝাপটা। তার মধ্যে অটোর লম্বা লাইন ছিল জানো। খুব লম্বা। খুউব। তারপরে আবার একটা বাস।আর  তারপর আরও একটা অটো। ভেবেই গায়ে জ্বর এলো। কী যে হল, দুম করে একটা ট্যাক্সি ধরে ফেললাম। এক গাদা টাকা নষ্ট। ট্যাক্সিতে উঠে থেকে গা চড়চড় করছে।
- যা ঝাল দিয়েছি আজ বাটিচচ্চড়িতে, তোমার গা চড়চড় জাস্ট উবে যাবে, দেখো।
- আর মিনিট পনেরোর মধ্যে বাড়ি ঢুকে যাব।
- আরও একটা জব্বর খবর আছে কিন্তু।
- বোনাস জব্বর খবর?
- আরো একটা টিউশনি পেয়েছি। এ'বার থেকে মাসে দু'দিন তোমার অফিস ফেরতা ট্যাক্সি আমি স্পন্সর করব। প্লীজ।
- ট্যাক্সি স্পন্সর করার দরকার নেই, আমার অটোজোড়া আর বাস বেঁচে থাক। আমায় পয়লা বৈশাখে নীল ছাপার শাড়ি দেবে বলেছিলে, সে'টা এ'বার হোক?
- বেশ। এ মাসের মাইনে পেয়েই গড়িয়াহাট অভিযান, কেমন?
- জী জনাব।
- এ'বার ফোনটা রাখি। মামলেটের পেঁয়াজ লঙ্কা কুচিয়ে রাখতে হবে।

শশীবাবু কলি



শশীবাবু; বিহারের গ্যাস প্ল্যান্টের শ্রমিক। ট্রাকে গ্যাস সিলিন্ডার লোড আর আনলোড করতেন। ষাটোর্ধ, ছিপছিপে তামাটে দেহ, ধবধবে সাদা চুল, পাকানো গোঁফ। মুখে সবসময় নারকোল সন্দেশের গুঁড়োর মত হাসি লেপ্টে। সিলিন্ডার ওঠানো নামানোর মাঝে যে'টুকু ফাঁকা সময়, সে'টুকু মিহি গল্পগুজবে কাটাতেন। সমস্ত শ্রমিকদের মধ্যে শশীবাবুর উপস্থিতি যেন একটু বেশি উজ্জ্বল; শান্ত। ধর্মপ্রাণ, ধর্মভীরু নন। লোডিং-আনলোডিংয়ের কাজ টাকার দরকারে করতেন তা নয়; তার দুই ছেলে কর্মরত, ঘরে এবং গ্রামে তাঁকে সকলেই বেশ সমীহ করে চলে; ভালোবাসে। ছেলেরা মাঝেমধ্যে সকাতরে অনুরোধ করে বলে 'বাবা, এ'বারে ঘরে জুত করে বসুন। দিনের বেলা পাড়া ঘুরে বেড়ান, সন্ধ্যে হলে রামায়ণের বই খুলে আসরের মধ্যমণি হয়ে উঠুন'। শশীবাবু হেসে বলেন 'আমি ছেলেদের বলে দিয়েছি, আমার রামায়ণ হল সিলিন্ডার লোডিং আর মহাভারত হল সিলিন্ডার আনলোডিং। এ বয়সে ধর্মত্যাগ করতে পারব না রে'।

সেই শশীবাবুর বলা একটা কথা চিরকাল আমার সঙ্গে রয়ে যাবে।
"কলিযুগের ব্যাপারটা জানেন তো বাবু? আমাদের মধ্যে প্রতি মুহূর্তে ঘেন্না তৈরি হচ্ছে। অনবরত। যে ঘেন্নায় মনে হয় আমি সহজেই আর একজনের টুঁটি ছিঁড়ে ফেলতে পারি। যে ঘেন্নায় মনে হয় অন্যের চামড়ায় পোকা পড়ুক। তেমন ঘেন্না। আর কলির খেল সেখানেই; এই ঘেন্না একটা নেশার মত হয় দাঁড়াবে। জীবনে যথেষ্ট ঘৃণা অনুভূত না হলে আমরা ছটফট করে বেড়াব, হন্যে হয়ে খুঁজব নতুন কারণ; যদি কোনোভাবে পাশে বসা মানুষটার মৃত্যুকামনা করে বুকের জ্বালা জুড়িয়ে নেওয়া যায়"।

শশীবাবুর কলিযুগ থিওরিটা মাঝেমধ্যেই মনে পড়ে। দিব্যি এগিয়ে চলেছি আমরা সেই দিকে।

রাজনৈতিক মতামত এ'দিক ও'দিক হলে মনে অন্য পক্ষের মানুষগুলো জ্বলেপুড়ে গেলে দেশটা শান্ত হবে।
অন্যের প্রিয় লেখকের লেখা আমার বিশ্রী লাগলে মনে হয় সে ভক্তের চোখে গরম শিক ঢুকিয়ে দিলে সামান্য শান্তি জুটবে।
অন্তত তর্কের সময়টুকু মনে হয়ই; "ব্যাটাচ্ছেলের মরণ হয় না কেন?

একদিকে ভাষার তফাতে দমবন্ধ হয়ে আসে।
ধর্মের তফাতে লাশ ছড়িয়ে দেওয়া তো জলভাত।
অন্য দিকে পর্যাপ্ত জল নেই।
যথেষ্ট ভাত নেই।
বুক ভরে দম নেবার মত বাতাস নেই।

ভাবলে হাড়হিম হয়ে আসে যে আমার খোকার প্রতিও কেউ কোনোদিন এমন রক্তচক্ষু শানাতে পারে, সামান্য যে কোনো তফাতের সূত্র ধরে।

আর মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করে এই ভেবে যে নিজের অজান্তেই খোকার মধ্যে এমন কোনো ঘৃণা ইঞ্জেক্ট করে দিচ্ছি না তো যে বিষের প্ররোচনায় খোকা এমন রক্তচক্ষু আয়ত্ত করে নেবে?

রায়তা

- সঙ্গে রায়তা দেবে তো রে?
- কেন?
- বাহ্, বিরিয়ানি বললাম। সঙ্গে রায়তা দেবে না?
- ওহ্, দেবে।
- যাক।
- তবে ইয়ে।
- আবার কি? রায়তাটা অতটা ভালো নয়? বিরিয়ানির সঙ্গে আবার আমার কোয়ালিটি রায়তা ছাড়া চলে না।
- রায়তা দেয় বইকি। গেলাস ভরে রায়তা দেবে। আমি বলে দিয়েছি।
- গেলাসে দেবে? রায়তা?
- এ'টা একটু অন্য রকমের রায়তা ভাই। কালো রঙের, ঝাঁঝালো।
- কালো? ঝাঁঝালো?  রায়তা?
- আমরা এ'দিকে থামস আপ বলি। রিয়েল বিরিয়ানি পাশে সেমি-ঘোলটোল থাকলে কেমন ঘোলাটে লাগে।

নাট বল্টু



- একটাও নাটবল্টু নেই।
- একটাও নেই?
- একটাও নেই।
- তাজ্জব।
- তাজ্জব তো বটেই।
- ঠিক আমার মায়ের হাতের বাটিচচ্চড়ির  মত তাজ্জব।
- কীসের মত?
- মায়ের রান্না বাটিচ্চড়ির মত। 
- মানে?
- মানে ওই, অতিরিক্ত মশলাপাতির নাট নেই, পেল্লায় রেসীপির বল্টু নেই। তবু; দিব্যি দাঁড়িয়ে যায়।

ডাকওয়ার্থ ল্যুইস


- স্যার।
- কী হল?
- একটা কথা ছিল।
- আবার কী কথা? দস্তুরের চারটে ফাইল ক্লীয়ার করতে হবে। সন্ধে ছ'টার আগে। ক্যুইক ক্যুইক।
- টার্গেট রিভাইজ হয়েছে স্যার।
- মানে?
- রিভাইজড টার্গেট। আজ বিকেল সাড়ে চারটের আগে দু'টো ফাইল শেষ করলেই হবে। দস্তুরের অফিসে জানিয়ে দিয়েছি, তারা আপত্তি করেনি। আপনি আবার রিভাইজড টার্গেট নিয়ে বাগড়া দেবেন না প্লীজ।
- সে কী! টার্গেট রিভাইজ হল কেন?
- টেবিল থেকে মুখ তুলুন মাঝেমধ্যে। আকাশের সিচুয়েশন দেখেছেন? ছ'টা পর্যন্ত চারটে ফাইলের টার্গেট ডাকওয়ার্থ ল্যুইসে রিভাইস করে সাড়ে চারটের মধ্যে দু'টো ফাইলে নেমেছে। উপায় ছিল না যে। চলুন চলুন, চালিয়ে খেলতে হবে; চটপট শেয়ালদা না পৌঁছলেই ক্যালামিটি। কুইক কুইক।