Sunday, June 3, 2018

কুমড়োফুল


কুমড়ো ফুলের প্রতি ভালোবাসা নিয়ে যথেষ্ট কবিতাটবিতা লেখা হয়নি। ভেজে খাওয়া যায়; কাজেই জুঁই গোলাপের মত সুপ্রিয়ার খোঁপা বা রাজেশ খান্নার শায়রির ডায়রির ভাঁজে ঠাঁই পায় না। বিবর্ণ বাজারের ব্যাগের এক কোণে লেপ্টে পড়ে থাকবে, তারপর বেসিনে ধুয়েটুয়ে স্ট্রেট কড়াইয়ে। কুমড়োফুলকে এমন ইন্ডাস্ট্রিয়াল অবহেলার লেন্সে ফেলে দেখাটা বন্ধ করতে হবে।

কাজেই; ব্যালকনির অকারণ শৌখিন গাছটাছ বাদ দিয়ে টবে কুমড়োফুলের গাছ বড় হচ্ছে। কুঁড়ি ধরবে। মন চনমন করে উঠবে। নতুন ফুলেরা অল্প হাওয়ায় মাথা দোলাবে। ভালোবাসা তৈরি হবে। নোলা আর হৃদয় এক সুরে বাঁধা পড়বে। তারপর বেসনে সমর্পণ।

চার মাস্কেটিয়ার্সের অন্যতম হরিবাবু; পকেট গড়ের মাঠ হলেও তাঁর বিলিতি স্কচ ছাড়া চলত না, নেশাকে তিনি এলিভেট করাতে পেরেছিলেন। কুমড়োফুলের নেশাটাও হেলাফেলার ব্যাপার নয়, নিজের ব্যালকনিতে বড় হওয়া ফুলে ভেজে খাওয়া, নচেৎ নয়।

ইন্টারসেপ্ট

- কেমন বুঝছ হে ঘোষ?
- ক্লীয়ার স্কাই স্যর।
- অ।
- বৃষ্টি এক্সপেক্ট করছিলেন?
- তুমি মেঘলা বললে এক্সপেক্ট করতাম  শুখা রাস্তা। অপ্টমাইজড বাড়ি ফেরা। আকাশ সাফ শুনে মনে হচ্ছে হাফভিজে অটোর লাইনে ফুলুরি না চিবুলে সমস্তটাই জলে।
- হিউম্যান এক্সপেক্টেশনের মত হাইকোয়ালিটি রাস্কেল আর দু'টি নেই। নজরুল স্যর বলে গিয়েছন।
- ওই ল্যাঙ্গুয়েজে?
- ভাব ইন্টারসেপ্ট করেছি।
- অ।
- আপডেট। গুগল বলছে ঢালবে; কাল বিকেলে।
- কালকের ফুলুরিতে অম্বল, আজকে ফুলুরিতে মুক্তি।
- টুয়েন্টি ফোর সেভেন অমন তেতো মুখে থাকবেন না স্যার। রবীন্দ্রবাবু মুখচোপা করে গেছেন অমন তেতোমীরদের।
- ভাব ইন্টারসেপ্ট?
- ইয়েস স্যর। তেলেভাজা কিনে বাড়ি ফিরুন, চৌবাচ্চা আর মার্গো সাবানে নিজেকে সঁপে দিন। ক্রিয়েট ইওর ওউন রেন। কর্পোরেশনের সাপ্লাইয়ের আকাশ, প্লাস্টিক মগের মেঘ। ভেসে যান।
- ফিনান্সে কী করছ ভাই ঘোষ? কবিতা ছেড়ে?
- ওই যে, স্যর ভাব ইন্টারসেপ্ট।

বংপেন৭৫য়ের তিন

গল্প ১।

- ওহে, কাল তোমার ফাঁসি।  ভোরবেলা। কোই আখরি খোয়াইশ?
- একটা বই যদি..।
- বাইবেল? কোরান? গীতা?  কমুনিস্ট ম্যানিফেস্টো?
- বংপেন৭৫। আজ রাতভর পড়তাম।
- ফাঁসির কয়েদীদের দেওয়াল কাটার কোদাল বা ঘুমের বড়ির ডিবে দেওয়া বারণ দেওয়া বারণ।

গল্প ২।

নিজের লেজকে পেজমার্ক হিসেবে ব্যবহার করায় যে কী অনাবিল আনন্দ, তা বংপেন৭৫ না পড়লে জানতে পারতেন না ডারউইন চট্টরাজ।

গল্প ৩।

কানায় কানায় ভরা বাথটাবে খান তিরিশেক বংপেন৭৫ ছুঁড়ে ফেললেন আর্কিমিডিস। কিন্তু লে হালুয়া, সব কটা বই তলিয়ে গেল অথচ এক ফোঁটা জলও উপচে পড়ল না। বাতাসে কুৎসিত সুর বেজে উঠল, কারা যেন গাইছে;
'You Wreck, Ahh"!

সিনেমানস

মিডিওক্রিটির বোঝা কাঁধে নিয়ে বড় হওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। আমি জানি।

কোনো চ্যাম্পিয়নসুলভ মুহূর্ত নেই, কোনো এক্সেলেন্সের জন্য জান লড়িয়ে দেওয়া নেই। সাফল্যের ডেফিনিশনকে নিজের স্কেলে বসিয়ে ফুর্তি করতে হয়। আমি বুঝি।

জীবনের প্রশ্নগুলোকে কানমুলে রাখতে হয়;
চাবকানি খেতে যাতে না হয়, পরীক্ষায় সেই বেসিক নম্বরটুকু পাব তো? কনসেপ্টটনসেপ্ট না বুঝলেও চলবে।
কোনোরকমে একটা চাকরী পাব তো? নিজের আগ্রহটাগ্রহের মত এলিটিস্ট ব্যাপারে না ভাবলেও হবে।
চাকরীটা টিকিয়ে রাখা যাবে তো? কাজে নিখুঁত হওয়ার চেষ্টা অতি বুর্জোয়া একটা খোয়াইশ।

খেলাধুলো? টিভির রিমোট।
এক্সট্রা কারিকুলার? ফোঁপরদালালি।

এই সব মিডিওক্রেসির ভিড়ে পিএফ-গ্র‍্যাচুইটির ইগলু বানিয়ে তার ভিতর নড়বড়ে আত্মবিশ্বাসের স্যান্ডো গেঞ্জি পরে বসে থাকা।

মধ্যমেধা, মধ্যমাপের শখআহ্লাদ, মধ্যরুচির চাহিদায় ভেসে বেড়ালে কী হবে। মাঝেমধ্যে কিছু সিনেমার মুহূর্ত সিনা চওড়া করে দেয়, বুকে দু'দণ্ড সাহসের বাতাস বয়।  আবহসঙ্গীত ভালোবাসা তৈরী করে। সাদামাটা একটা চরিত্র কেমন ঝকঝকে হিমাচলি আকাশের মত চোখ জুড়িয়ে দেয়। তার ভালো মন্দ নিজের বুকের মধ্যে বাজতে শুরু করে।

কয়েক মুহূর্তের জন্য মনে হয়; টুপ করে কয়েকটা ভালো কাজ করে ফেললে বেশ হয়। কোনো এক  দৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়ে  আচমকা মনে হয় কাল থেকে ধান্দাবাজি ছেড়ে দেব।

নিজের মধ্যের অজস্র ভালো-হতে-না পারাগুলো চোখের উপর ছলছলিয়ে ওঠে। মনখারাপ হয়, মনভালোর চেয়েও সুন্দর যে মনখারাপ। ছবির মত, সেই সিনেমার মত।

মিনিট দশেক থাকে সেই মনখারাপ। সেই মিডিওক্রিটিকে কাঁচকলা দেখানো দশ মিনিটের জন্যই ভালো সিনেমা। খানিক পরেই অবশ্য চোখ ছলছল কেটে যায়, মনের মধ্যে ফের ডালডা পোড়া অফিস চালাকি আর পারিবারিক গসিপ; পায়ের তলায় ফিরে আসে গ্র‍্যাভিট, জিভে তিতকুটে ভাব।

সিনেমারা বেঁচে থাক।

বেঁচে থেকে কী হবে?

১।
হপ্তায় এই নিয়ে তিন নম্বর বেনামি চিঠি।
তিনটেই ইনল্যান্ড লেটারে। একই বয়ান, "বেঁচে থেকে কী হবে শুভময়বাবু"?

এ'টা কি হুমকি? না মাথায় হাত বুলোনো নিহিলিজম? পুলিশে যাওয়া ঠিক হবে?

২।
বাহাত্তর নম্বর বেনামি ইনল্যান্ড লেটার যখন পেলেন তদ্দিনে ভয়ডর কেটে গেছে। ব্যাচেলর জীবনের এক সঙ্গী হয় উঠেছে প্রতি হপ্তার খান তিনেক ইনল্যান্ড লেটার।
সেই একই বয়ান;
"বেঁচে থেকে কী হবে শুভময়বাবু"?
অপূর্ব হাতের লেখা,  মায়া পড়ে গেছে। কোনো হপ্তায় তিনটের কম চিঠি এলে মন খারাপ হয়। সামান্য অভিমানও যে হয় না তা নয়। একটা ইনল্যান্ড লেটারের গায়ে একটা মাত্র লাইন, তা'তে অত গড়িমসির কী আছে?
সমস্ত চিঠিগুলোকে আলমারির এক কোণে যত্নে জমিয়ে রাখছিলেন শুভময়বাবু।

৩।
দার্জিলিংয়ের প্ল্যানটা একরকম দুম করেই করে ফেলেছিলেন। একাই কয়েকদিন ঘুরে আসা। বাড়ি থেকে বেরোবার মুখে এক হাজার দু'শো সাঁইত্রিশতম ইনল্যান্ড লেটারটা পেলেন। সদর দরজায় তালা দেওয়া হয়ে গেছে, কাজেই চিঠিটা আর আলমারিতে রাখা হল না।

ট্রেনের সময় হয়ে আসছিল, চিঠিটা চটজলদি পকেটে গুঁজে ট্যাক্সির দিকে এগোলেন শুভময়বাবু।

৪।
কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কেমন ঘোর লেগে যায়। দু'দিন যাবৎ দার্জিলিংয়ের আকাশ একদম সাফ, নিরিবিলি রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় মাঝেমধ্যেই দাঁড়িয়ে পড়ছেন শুভময়বাবু। কাঞ্চনজঙ্ঘার বেশ একটা মায়া আছে। মায়ার প্রসঙ্গে নিজের ট্রাউজারের পকেটে রাখা চিঠিটার কথা মনে পড়ল। এসে থেকে ট্রাউজার পাল্টানোর সঙ্গে সঙ্গে মানিব্যাগের সঙ্গে চিঠিটাও এ পকেট থেকে ও পকেট চালান করে চলেছেন তিনি। তবু এ'বারের ইনল্যান্ড লেটারটা আলাদা করে পড়া হয়নি। প্রতি চিঠিতেই যদিও সেই একই লাইন, তবু বারবার পড়তে ইচ্ছে হয়। এমনই টান রয়েছে সে হাতের লেখায়।

ইনল্যান্ডলেটারের জন্য পকেট হাতড়ালেন শুভময়বাবু।

৫।

কী অদ্ভুত ব্যাপার। এই এক হাজার দু'শো সাঁইত্রিশতম চিঠিতে হাতের লেখা এক হলেও বয়ান উলটে গেছে।
"পৃথিবীটা বড্ড সুন্দর, তাই না শুভময়বাবু? এত ভালোবাসার সমস্ত কিছু ছেড়ে দুম করে চলে গেলেই হল নাকি? বেঁচে থাকাই নির্বাণ। তাই না"?

কেমন বিহ্বল লাগছিল শুভময়বাবুর। কেমন মন কেমন। নাকে হঠাৎ বয়ে আসা অস্বস্তিকর গন্ধটাই কি ভালোবাসা?

ইনল্যান্ড লেটারটা পকেটে ফেরত রাখতেই পিঠে বেপরোয়া ধাক্কাটা অনুভব করলেন শুভময়বাবু। বেসামাল হয়ে খাসের অতলে হারিয়ে যাওয়ার সময় দেড় সেকেন্ড সময় পেয়েছিলেন ভদ্রলোক, দেড় সেকেন্ডের মনখারাপ;
একহাজার দু'শো আটত্রিশতম চিঠিটার জন্য।