Wednesday, April 11, 2018

যিস কা কোই নহি


যার অঙ্কে লেটার নেই, তার কপালে মাঝরাত্তিরে গঙ্গার ধারে বসে  প্রবাবিলিটির মজা বুঝিয়ে দেওয়ার একজন দাদা গোছের মাস্টার থাকুক।

যার ব্যাঙ্ক বোঝাই টাকা নেই, তার অন্তত একটা মেডিকাল ইন্স্যুরেন্স থাকুক।

যার যুক্তিতে ধার নেই, তার মনে মধ্যে গজলের ঘুরঘুর থাকুক।

যার গল্প নেই, তার ভূতের ভয় থাকুক।

যার পিঠে চাপড় দেওয়া "কুছ পরোয়া নহি" বন্ধু নেই, তার জন্য নিরিবিলি ছাতের  কোণার নিশ্চিন্দিটুকু থাকুক।

যার কাছে "তুমি চিঠি লেখনা কেন?"র উত্তর নেই, তার বুকের মধ্যে পাহাড়িসান্যাল গোছের বোরোলিন গন্ধ থাকুক।

যার বাড়ি ফেরার তাড়া নেই, তার জন্য মেঘলা সন্ধ্যের ভিড় মিনিবাসে জানালা রাখা থাকুক।

যার কবিতা লেখার ক্ষমতা নেই, তার আচমকা মনখারাপে অচেনা ছোট স্টেশনে নেমে চা-ওলার খোঁজ করতে পারার দুঃসাহস থাকুক।

যার 'মা কই মা কই' মনখারাপ ভাগ করে নেওয়ার কেউ নেই, তার বালিশে সাদা ওয়াড়ে সেলাই করা নীল ফুল থাকুক। আর থাক শিয়রের কাছের জানালা বেয়ে আসা চুল ওড়ানো হাওয়া।

যার কেউ নেই, তার সঞ্জীব থাকুক।

অন্য রাত


সে এক অন্য রাত। সাজানো গোছানো। আয়েশে রাঙানো। মখমলের মত আদুরে।

চারিদিকে বালির ঢেউ। মধ্যিখানে মুক্তোর মালার মত সাজানো আলোর কিছু বিন্দু। বালির ওপর বেমানান শৌখিনতায় পাতা তোষক তাকিয়া, সে'খানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে শহুরে 'রিল্যক্সেশন'। অল্প আরাম ছড়ানো বাতাসের ফরফর মুখে। হিসেব করে খুলে রাখা পাঞ্জাবির বোতাম। সমস্তই মাপা পেগের মত নিখুঁত; ওয়েল অ্যাকাউন্টেড।

তবে ওই। 'পড়তে বস্'য়ের চাবুক ধমকে কেঁপে উঠতে উঠতে বড় হয়ে ওঠা কলজের ফুর্তি ধারণ করার ক্ষমতা কম। এ'খানে আকাশ নিষ্পাপ, বড্ড বেশি তারা। দাদু তারা তৈরি হওয়ার গল্প বলতেন। অঙ্ক ভালোবাসার গল্প বলতেন। অনেক দূরের তারার গা থেকে ঠিকরে পড়া আলোর, হাজার বছর পর আমায় গায়ে নেমে আসার গল্প বলে; গায়ে কাঁটা এনে দিতেন।

আকাশ চিরে সুর ভেসে আসে। অচেনা ভাষার খোলস ছিঁড়েখুঁড়ে বেরিয়ে আসে রাজস্থানি মাটি-মাখানো সুরের দরদ। গান। দাদু আর আমি একসঙ্গে সুমন শুনতে শুরু করেছিলাম। দুই ভাই, দুই ছাত্রের মত।
'এই লাইনটা মন দিয়ে শুনেছ দাদু'?
'ভাই, এই গানটা আর একবার রিওয়াইন্ড করো। নয়ত উপায় নেই'। 

গানের চেয়ে বড় গার্জেন হয় না। সব 'এই চললাম, কেমন?"য়ের কানমলা ফিরে আসে। সমস্ত 'না থাকা' জ্যান্ত হয়ে হাতের তালুতে আঁকিবুঁকি কাটে।

ভরা আকাশের নিচে এক ভাই একলা পড়ে। তার গান বোঝায় বিস্তর ফাঁকফোকর, তার অঙ্কে ভয়, তার পকেট ভর্তি লোক ঠকানো চালবাজি।

কিন্তু তার গানের প্রতি অসহায় ভালোবাসাটুকু আছে।
আর আছে দাদুর না-থাকাটুকু।

রোগনজোশ


আলজওয়াহরের মটন রোগনজোশ তাড়াহুড়োর মাথায় খেলে বোধ হয় মজাটাই মাটি। খানিক কাবাবটাবাব খেয়ে পেট আর জিভ তৈরি করে তবে রোগনজোশের বাটিটা টেনে নেওয়া উচিৎ। রুমালি রুটি সহযোগে, অবশ্যই।

কোমর বেঁধে ঝাল খাওয়াতে আমার কোনও আপত্তি নেই, তবে গাঁকগাঁক ঝালই যে মাংস রান্নার  শেষ কথা নয়, তা আলজওয়াহর জানে।

সেই রোগনজোশের নিখুঁত ভাবে কষানো, মাপা ঝাল দেওয়া ঝোল আর তা'তে অল্প টক হালকা মিষ্টি মিশেল। আহা, সেই তুলতুলে মাংসের টুকরো; রুটি-মাংসের দলা মেঘের মত জিভের ওপর চলা ফেরা করবে। হিংস্র মেজাজে গজগজ করতে করতে চেবানো এ ক্ষেত্রে পাপ। এ রোগনজোশে একটাই পলিসি: ধীরে ধীরে ধীরে বও ওগো উতল হাওয়া।

একসময় মনখারাপ বাসা বাঁধবে। যন্ত্রণা নয়, বুকে টনটন নয়; বরং খুব ভালো কিছুর মধ্যিখানে যেমনটা হয়। পুরনোর গানের খাতার শেষ পাতায় রেনল্ডস ডটপেনে আঁকা আলপনার মত। শরীর মন এলিয়ে পড়বে; ভালোবাসায়।

খাওয়া শেষে মৌরি মিছরিতে মেজাজ নষ্ট অবান্তর। পোস্ট-রোগনজোশ মুখশুদ্ধি একটাই; নজরুল;
'পূর্ণ চাঁদের এমন তিথি; ফুল-বিলাসী, কই অতিথি..."।

(রোগনজোশের বাটি আসার পর পকেটে রাখা মোবাইলের কথা মনে ছিল না, ছবি তোলা তো দূরের কথা। এমনই তার সুবাস)।

আংটি চ্যাটুজ্যের ভাই



টেকনিকালিটি না বোঝায় যে কী স্বস্তি। সিনেমার মাঝেমধ্যেই আহাউঁহু করে নড়েচড়ে বসা যায়। ক্রিটিসিজমের ভারি স্কুলব্যাগ পিঠে থাকে না, তুলনামূলক আলোচনার জ্যামিতির বাক্স হাতে হাবুডুবু খেতে হয় না। সে ভারি মজার।

'এই সিনেমাটা জব্বর'। 'ওই সিনেমাটা তেমন জমেনি'। আমার প্রাইমারি স্প্রেক্ট্রাম অফ সিনেমা।

আল্ট্রা-জব্বর আর ইনফ্রা-জমেনি মার্কা ব্যতিক্রমের লিস্টও অবশ্যই আছে। সেই আলট্রা লিস্টে যোগ হল 'পলাতক'।

অনুপকুমার। মৌচাক-গোছের চ্যাঁচামেচি রোলে নষ্ট হওয়া অনুপবাবু যখন এ'খানে বুক বাজিয়ে বলেন 'আমি আংটি চাটুজ্যের ভাই', তখন তাঁর দেমাকে টেকা দায়। আবার উড়ে এসে জুড়ে বসার জাদুতে তিনি ম্যান্ড্রেক। কাছে টেনে নেওয়ায় যেমন তিনি ওস্তাদ, তেমনি পাশ কাটিয়ে দুম করে বেরিয়ে যাওয়াতে তিনি নোবেল লেভেলের কিছু পাওয়ার দাবী রাখেন। অথচ তিনি বাউল নন; রীতিমত জড়িয়েটড়িয়ে থাকেন, কষ্ট পোষেন। আবার অন্যদিকে তিনি তাঁর আনন্দের ঝুলি থেকে টপাটপ বেড়াল বের করে উঠোন ভর্তি নার্ভাস পায়রাদের মধ্যে ছেড়ে চলেছেন। এমন তরতর করে মনকাড়া উপন্যাসের গতিতে সিনেমার চরিত্রকে বেড়ে উঠতে সচরাচর দেখা যায় না।

বসন্তের তথাগত হতে না পারার যাবতীয় উপাদান নিয়ে এই সিনেমা। বসন্তের ফিরে আসার গল্প আর ফিরতে না পারার গল্প মিলেমিশে যে সৌন্দর্য, তার তুলনা শুধু টলটলে দু'চোখের সন্ধ্যা রায়।

টেকনিকাল ভাষায় যাকে বলে 'মোস্ট জব্বর সিনেমা'।

ধনক


কতবার মনে হয়েছে শৈলেনবাবুর লেখা নিয়ে সিনেমা তৈরি হলে কেমন হত। সারল্য, রূপকথা আর গতির ও'রকম মিশেল লেখা থেকে সিনেমায় তুলে আনা কি আদৌ সম্ভব? সিনেমার ঘণ্টা দুয়েকের পরিসরে ওই গল্পগুলোকে একই রকম প্রাণবন্ত রাখা যাবে?

সমস্ত চিন্তা দূর করে দিলেন নাগেশ কুকনুর। ওই, আমার সিনেমার টেকনিকাল দিকগুলোর ব্যাপারে তেমন কোনও ধারণাই নেই। কিন্তু সিনেমা ভালো লাগার ব্যাপারে স্পষ্ট বেঞ্চমার্ক আছে (নিজের 'ভালো লাগা', আইএমডিবি রটেনটোম্যাটোর রেটিং নয়, ক্রিটিকাল রিভিউ পড়ে মাথা নাড়া নয়)।  ভালো লাগা সিনেমা শেষ হলেই মনে হবে দিব্যি একটা গল্পের বই শেষ হল।

এই যেমন 'ধনক' দেখে মনে হল। শৈলেন লেভেল গল্পবলা, মনখারাপে মনভালোতে মেশানো প্লট। আর অবিকল সেই সব ফ্রেম যা শৈলেনের গল্প পড়তে পড়তে মনের মধ্যে ভেসে ওঠা উচিৎ। ইউটোপিয়ান অথচ কী ভীষণ স্মার্ট; আগাগোড়া। অমন একটা দিদি আর ও'রকম একটা ভাই; শৈলেনবাবু দেখলে বড় খুশি হতেন। আর এ'দিকে নাগেশ কুকনুরকে শৈলেন পড়ানোর দায়িত্ব যদি কেউ নিত।

তাছাড়া এই সিনেমার গান! ওই গানগুলো বাদ দিলে গল্পটা পুরো বলাই হত না। আর আছে বলিউড। ভাষার তফাৎ আর গিজগিজে বিটিকেল জিনিসপাতি থাকা সত্ত্বেও বলিউড যে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের সঙ্গে কতটা নিবিড়ভাবে জড়িয়ে; তা স্বপ্নের মত মেলে ধরা হয়েছে।

( শৈলেনকে আমরা তেমন পাত্তাটাত্তা দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলাম না। বাংলা ভাষাটা টিকে থাকলে অন্য কোনো প্রজন্ম দেবে হয়ত। একটা ব্যাপার সদ্য জেনেছি, শৈলেন ঘোষের উপন্যাসগুলোর সংকলন অবশেষে বেরিয়েছ। সম্ভবত পারুল প্রকাশনী, চার খণ্ডে)।