Wednesday, April 11, 2018

আংটি চ্যাটুজ্যের ভাই



টেকনিকালিটি না বোঝায় যে কী স্বস্তি। সিনেমার মাঝেমধ্যেই আহাউঁহু করে নড়েচড়ে বসা যায়। ক্রিটিসিজমের ভারি স্কুলব্যাগ পিঠে থাকে না, তুলনামূলক আলোচনার জ্যামিতির বাক্স হাতে হাবুডুবু খেতে হয় না। সে ভারি মজার।

'এই সিনেমাটা জব্বর'। 'ওই সিনেমাটা তেমন জমেনি'। আমার প্রাইমারি স্প্রেক্ট্রাম অফ সিনেমা।

আল্ট্রা-জব্বর আর ইনফ্রা-জমেনি মার্কা ব্যতিক্রমের লিস্টও অবশ্যই আছে। সেই আলট্রা লিস্টে যোগ হল 'পলাতক'।

অনুপকুমার। মৌচাক-গোছের চ্যাঁচামেচি রোলে নষ্ট হওয়া অনুপবাবু যখন এ'খানে বুক বাজিয়ে বলেন 'আমি আংটি চাটুজ্যের ভাই', তখন তাঁর দেমাকে টেকা দায়। আবার উড়ে এসে জুড়ে বসার জাদুতে তিনি ম্যান্ড্রেক। কাছে টেনে নেওয়ায় যেমন তিনি ওস্তাদ, তেমনি পাশ কাটিয়ে দুম করে বেরিয়ে যাওয়াতে তিনি নোবেল লেভেলের কিছু পাওয়ার দাবী রাখেন। অথচ তিনি বাউল নন; রীতিমত জড়িয়েটড়িয়ে থাকেন, কষ্ট পোষেন। আবার অন্যদিকে তিনি তাঁর আনন্দের ঝুলি থেকে টপাটপ বেড়াল বের করে উঠোন ভর্তি নার্ভাস পায়রাদের মধ্যে ছেড়ে চলেছেন। এমন তরতর করে মনকাড়া উপন্যাসের গতিতে সিনেমার চরিত্রকে বেড়ে উঠতে সচরাচর দেখা যায় না।

বসন্তের তথাগত হতে না পারার যাবতীয় উপাদান নিয়ে এই সিনেমা। বসন্তের ফিরে আসার গল্প আর ফিরতে না পারার গল্প মিলেমিশে যে সৌন্দর্য, তার তুলনা শুধু টলটলে দু'চোখের সন্ধ্যা রায়।

টেকনিকাল ভাষায় যাকে বলে 'মোস্ট জব্বর সিনেমা'।

ধনক


কতবার মনে হয়েছে শৈলেনবাবুর লেখা নিয়ে সিনেমা তৈরি হলে কেমন হত। সারল্য, রূপকথা আর গতির ও'রকম মিশেল লেখা থেকে সিনেমায় তুলে আনা কি আদৌ সম্ভব? সিনেমার ঘণ্টা দুয়েকের পরিসরে ওই গল্পগুলোকে একই রকম প্রাণবন্ত রাখা যাবে?

সমস্ত চিন্তা দূর করে দিলেন নাগেশ কুকনুর। ওই, আমার সিনেমার টেকনিকাল দিকগুলোর ব্যাপারে তেমন কোনও ধারণাই নেই। কিন্তু সিনেমা ভালো লাগার ব্যাপারে স্পষ্ট বেঞ্চমার্ক আছে (নিজের 'ভালো লাগা', আইএমডিবি রটেনটোম্যাটোর রেটিং নয়, ক্রিটিকাল রিভিউ পড়ে মাথা নাড়া নয়)।  ভালো লাগা সিনেমা শেষ হলেই মনে হবে দিব্যি একটা গল্পের বই শেষ হল।

এই যেমন 'ধনক' দেখে মনে হল। শৈলেন লেভেল গল্পবলা, মনখারাপে মনভালোতে মেশানো প্লট। আর অবিকল সেই সব ফ্রেম যা শৈলেনের গল্প পড়তে পড়তে মনের মধ্যে ভেসে ওঠা উচিৎ। ইউটোপিয়ান অথচ কী ভীষণ স্মার্ট; আগাগোড়া। অমন একটা দিদি আর ও'রকম একটা ভাই; শৈলেনবাবু দেখলে বড় খুশি হতেন। আর এ'দিকে নাগেশ কুকনুরকে শৈলেন পড়ানোর দায়িত্ব যদি কেউ নিত।

তাছাড়া এই সিনেমার গান! ওই গানগুলো বাদ দিলে গল্পটা পুরো বলাই হত না। আর আছে বলিউড। ভাষার তফাৎ আর গিজগিজে বিটিকেল জিনিসপাতি থাকা সত্ত্বেও বলিউড যে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের সঙ্গে কতটা নিবিড়ভাবে জড়িয়ে; তা স্বপ্নের মত মেলে ধরা হয়েছে।

( শৈলেনকে আমরা তেমন পাত্তাটাত্তা দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলাম না। বাংলা ভাষাটা টিকে থাকলে অন্য কোনো প্রজন্ম দেবে হয়ত। একটা ব্যাপার সদ্য জেনেছি, শৈলেন ঘোষের উপন্যাসগুলোর সংকলন অবশেষে বেরিয়েছ। সম্ভবত পারুল প্রকাশনী, চার খণ্ডে)।

মেমোরিস ইন মার্চ


মিসেস মিশ্র আর অর্ণব।

ওদের আবারও দেখা হবে। মাস তিনেকের মধ্যেই,  সম্ভবত দিল্লীতে।

মিসেস মিশ্র অ্যাকোয়ারিয়ামে রাখা মাছের খবর নেবেন।

অর্ণব ব্যস্ত হয়ে ঘুরে দেখবে মিসেস মিশ্রর বাড়ি, খবর নেবে কলকাতা থেকে বয়ে আনা বইগুলো কোথায় রাখা হয়েছে।

আবার ওরা নিজেদের তফাৎগুলো হাতড়ে মরবেন আর শেষ 'তা বেশ, এই ভালো' বলে থামবেন। 'এম্প্যাথি' ব্যাপারটা সেই সব মাতব্বরদের জন্য নয় যারা কথায় কথায় "আমি ঠিক" বলে অন্যের গলা টিপে ধরেন (সে মাতব্বর ঈশ্বরের মত নির্ভুল হলেও নয়)।

দু'জনে পুরনো অ্যালবাম উল্টেপাল্টে দেখবেন; পাশাপাশি বসে। মিসেস মিশ্রর আপত্তি অবশ্যই থাকবে না অর্ণবের বানানো কফিতে। আর অর্ণব? তিনি হো-হো হেসে সোফা থেকে কুশন-বুকে মেঝেতে গড়িয়ে পড়বেন; থেরাপিস্ট দেখানোর উপদেশ শুনে।

রাতের দিকে মিসেস মিশ্র টের পাবেন অর্ণবের এই সময় দিল্লী আসার কারণ। তাঁর মতই, অর্ণবও প্রিয় মানুষদের জন্মদিন গুলিয়ে ফেলেন না।

মিসেস মিশ্রর জন্মদিনের ডিনার বাইরেই সারার প্ল্যান হবে; অর্ণবের ট্রীট। ওদের সঙ্গে বেরোবে সিড।

অনশন

- দত্ত, এসো। এসো।
- কী ব্যাপার স্যর? এত জরুরী তলব?
- রাজনীতি হে দত্ত। তিষ্ঠোবার উপায় আছে? সারাক্ষণ মাথায় স্ট্র‍্যাটেজি কিলবিল করছে। যাক গে। চটপট কাজে লেগে পড়ো।
- কাজ? কীসের কাজ?
- বাহ্! আজ বাদে কাল অনশনে বসব। কত আয়োজন করতে হবে।
- অনশন?
- অনশন।
- কেন?
- তোমায় ডেকেছি কি আমার মুখ দেখতে? কীসের জন্য অনশন করব তার একটা যুতসই কারণ খুঁজে বের করো দেখি। অপোনেন্টরা ভেবড়ে যাবে এমন একটা কিছু। আর যে'টা মিডিয়া আর পাবলিক খাবে। প্রতিবাদি। সত্যাগ্রহী গোছের। চটপট একটা মোটিভ খুঁজে বের করো। আগামীকাল আমি অনশনে বসছি। ক্যুইক দত্ত। ক্যুইক। হাতে সময় খুব কম। আজ সন্ধের মধ্যে মিডিয়াকে বাইট দিতে হবে।
- আমরণ?
- ব্রেকফাস্ট ডিনার লাঞ্চ টিফিন বাদ দিলে জীবনটাই তো আমরণ অনশন। তবে এ'ক্ষেত্রে আমরণ না। টুয়েন্টি ফোর আওয়ার্স।
- ও, আচ্ছা।
- আমার সঙ্গে পার্টির ছেলেছোকরারাও উপোস করবে।
- উপোস?
- আহ্, অনশন। ওদের জন্য পরের দিন দুপুরে মাংস ভাতের ফীস্টি অর্গানাইজ করতে হবে। আর পার হেড হাফ বোতল ব্লেন্ডার্স প্রাইড। নোট করে নাও। তুরন্ত।
- ভেন্যু?
- অনশনের জন্য একটাই তো জায়গা ভাই। গান্ধী মূর্তির পাদদেশ। সে'টা নড়চড় হওয়ার উপায় নেই।
- সে'খানে আবার আগামীকাল ব্লাড ডোনেশন ক্যাম্প আছে।
- ও আমি পুলিশকে বলে দেব। পারমিশন উইথড্র করে নেবে। তুমি ওখানেই শামিয়ানা খাটাও। লাউডস্পিকার চাই। কারার ওই লৌহকপাট। মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় গোছের গান বাজবে। পরের দিন ফিস্টিতে অবশ্য তাম্মা তাম্মা চাই। ছেলেদের মনোবল নুয়ে পড়লে চলবে না।!
- আজ্ঞে। নোটেড।
- আরো চাই। ফেস্টুন। ব্যানার। শহরজুড়ে প্রতিবাদি পোস্টার।
- পার্টি ফান্ডের একটু টানটান অবস্থা। সামনেই আবার ইলেকশন।
- সিংঘানিয়ার কারাখানার লাইসেন্স হয়ে গেছে না?
- আজ্ঞে। গতকাল পার্টি অফিসে মিষ্টির বাক্স নিয়ে ঘুরে গেল।
- ন্যাকা, কোটি কোটি ব্ল্যাক টু হোয়াইট করবে আর আমাদের বেলায় এক বাক্স ক্ষীরকদম? ওকে বলে দাও। আমার অনশন স্পন্সর করবে। ইয়ে, আমিই বলে দেব'খন। পুরনো হিসেবেও কিছু একটা বাকি আছে; ঝালিয়ে নিতে হবে।
- বেশ। চিন্তা নেই স্যর, হয়ে যাবে। দত্ত থাকতে আপনার কোনো চিন্তা নেই। কিন্তু ইয়ে, স্যর। কালকেই অনশনটা করতে হবে কেন?
- গিন্নী পঞ্জিকা দেখে নিজে রেকমেন্ড করেছে। নির্জলা উপোস করতে হবে। কালকেই। সন্তোষী মা না শেতলা কিছু একটা ব্যাপার আছে। গেরস্তের মঙ্গল অমঙ্গল বলে কথা। রিফিউজ করি কী করে বলো দত্ত। তাই ভাবলাম রিলিজিয়াস উপোসটাকে যদি অপ্টিমাইজ করে রিভোলিউশনারি অনশনে কনভার্ট করা যায়।
- নোশনাল অনশন। দিব্যি। তা পরশুর ব্লেন্ডার্স প্রাইডে আপনি থাকছেন কি?
- নাহ্ দত্ত। আমার জন্য সুইট লাইম সোডা। অনলি। তবে তাম্মা তাম্মা থেকে আমায় আবার বঞ্চিত কোরো না, কেমন?

অ্যাপয়েন্টমেন্ট

- অমল। তাই তো?
- আজ্ঞে না। সুবিমল।
- সুবিমল? সে কী!
- সত্যিই সুবিমল।
- রিয়েলি? আপনার নামটা অমল ছিল না?
- নিজের নাম স্যর। অমলই যদি হবে তা'হলে খামোখা সুবিমল বলব কেন।
- তা ঠিক। যাকগে। তা অমলবাবু, আমার কাছে কী মনে করে?
- সুবিমল। সু বিমল।
- কে সুবিমল?
- আমি।
- তাই তো বললাম।
- না, আপনি অমল বললেন।
- ওহ। তা সুবিমলবাবু। আমার কাছে কী মনে করে?
- না মানে...।
- না মানে নো। ইংরেজিতে।
- তা নয়...।
- নিশ্চয়ই তাই।
- আসলে আমায় আপনি ডেকেছেন।
- আমি? আপনি কি প্লাম্বার? অমলবাবু?
- সুবিমল। আমি সুবিমল।
- আপনি কি প্লাম্বার? আমার বেসিনটা লীক করছে তাই...।
- না না..।
- না মানে? আমার বাথরুমের বেসিন, আমি জানব না?
- তা নয়।
- তাই। আমার বাথরুমের মেঝে ভিজে যাচ্ছে। এ'দিকে।আমি মোজা পরে বাথরুমে যাই। ক্যালামিটি।
- মৈত্রবাবু। আমি অমল নই, সুবিমল। আর আমি প্লাম্বারও নই। আমায় আপনি ডেকেছেন। অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেয়ে তবে এসেছি।
- আমি ডেকেছি?
- কবিতা লেখা শেখাতে। মাইনে ভালোই অফার করেছেন। ভুলে গেছেন? একদম?
- ওহ ওহো। সুবিমলবাবু। এইবারে মনে পড়েছে। কবিতার টিউশনি। বটেই তো। বটেই তো। তা এতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছেন কেন? বসুন। আপনি শিক্ষক, আমি ছাত্র। প্লীজ, বসুন।
- ধন্যবাদ। ঘণ্টায় হাজার টাকার ব্যাপারটা। ভুলবেন না প্লীজ।
- চেক চলবে? মাসের শেষে ঘণ্টা হিসেব করে। নাকি অ্যাডভান্স মাস্ট?
- না, মাসের শেষে দিলেই হবে।
- গুড। শুরু করুন তা'হলে।

**

কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাথের পুরনো বইয়ের আস্তানায় কত রকমের বিচিত্র বই দেখতে পাওয়া যায়। খোঁজার চোখ থাকা চাই। এই যেমন গত শনিবার। পুরনো বইয়ের ঢিপির মধ্যিখানে সাতপুরনো বাঁধাইয়ের ইংরেজি বইটা চোখে পড়েছিল; 'প্ল্যানচেট ফর ব্রিঙ্গিং ব্যাক দ্য ডেড এলিমেন্টস ফ্রম ইনসাইড ইওর সোল'। লেখক বাঙালি আর লেখকের নামটা তাঁর নিজের নামের বেশ কাছাকাছি ; অমল মৈত্র।

লোভে পড়ে বইটা ঝুপ করে কিনে ফেলেছিলেন মানিতলার সুবিমল মৈত্র।