Friday, April 6, 2018

লুঠ

- কোনো ত্যান্ডাইম্যান্ডাই নয়। এই যে রিভলভারটা আপনার কপালে ঠেকানো, এ'তে চারটে গুলি আছে। দু'টো কাল খরচ হয়ে গেছে। এক মাল বটুয়া দিতে দু'সেকেন্ড দেরী করে ফেলেছিল। কাজেই, বেশি চালাকি নয়।
- কম চালাকি কী ব্যাপার?
- দেব নাকি? ঠুকে?
- নিজে ভুল বলবে তারপর আবার মেজাজ। বেশি চালাকি নয়; এ আবার কেমন কথা। অপটিমাম চালাকি মাপার কোনো উপায় আছে নাকি? কোনো চালাকি নয়; সে'টা বরং বলতে পারতেন। আকাট গাধামো তাও চেষ্টা করলে ডিফাইন করা যায়।
- মানিব্যাগ দেখি। চটপট।
- আসুন। এই যে।
- আর কী আছে?
- বলছি। তার আগে মানিব্যাগের ফয়সালা হয়ে যাক।
- মানে?
- বাইশ'শো আছে। আমায় তিরিশ টাকা দেবেন প্লীজ? ফেরাটা রিক্সায় হলে একটু সুবিধে। রাহাজানির পর হেঁটে বাড়ি ফেরা যে কী ট্যাক্সিং। সে'বার জসিডিতে এ'রকম একটা সিচুয়েশনে পড়েছিলাম। সে'টা অবশ্য ঠিক ডাকাতি নয়, পকেটমারি। কাজেই মিষ্টি হেসে রিক্সার ভাড়া চাওয়ার স্কোপ পাইনি।
- এই নিন, পঞ্চাশ। যত বাজে কথা। এ'বার আর যা আছে...।
- এই সেরেছে। পঞ্চাশের ভাঙানি দেবে ভেবেছেন অত সহজে? ব্যাটাদের কথায় কথায় তর্কের অভ্যাস।
- এই যে। তিনটে দশটাকার নোট। শান্তি?
- এ মা! আপনি নিজের মানিব্যাগ বের করে আমায় খুচরো দিলেন? বড্ড মাইডিয়ার তো। এই লাইনে পোষাচ্ছে?
- দেব খুলি উড়িয়ে?
- খুচরো দিয়ে খুলি উড়িয়ে কী লাভ বলুন। জুতো মেরে গোদানের চেয়েও লোয়ার লেভেলের কথা বলে ফেললেন তো।
- উফফফফ!
- আহ্। পেশেন্স। যাক গে, মানিব্যাগ ছাড়া রয়েছে হাতঘড়ি। বিয়েতে শ্বশুরমশাই গিফট করেছিলেন। ভিন্টেজ এইচএমটি।
- খুলবেন না মালাইচাকিতে গুলি করব?
- আদেখলার ঘটি হল, জল খেতে খেতে প্রাণ গেল। একটা পিস্তল যোগাড় করে কী তম্বি।  যাকগে, এই রইল ঘড়ি। ওহহো। এক মিনিট, ঘড়িটা পাঁচমিনিট স্লো চলছে। ঠিক করে দিই।
- চোপ! কিচ্ছু করতে হবে না। দেখি ঘড়ি। আমার হাতে দিন।
- বাস ট্রেন মিস হলে আবার আমায় বাপান্ত করবেন না যেন। ও, শুনুন। মানিব্যাগে আমার বৌয়ের দু'টো পাসপোর্ট সাইজ ফটো আছে। কাইন্ডলি বের করে দিন।
- আচ্ছা ভোগান্তি হল মাইরি। এই। এই যে। আপনার বৌয়ের পাসপোর্ট সাইজ ছবি। এ'টা আদেখলাপনা নয়?
- আমি তো আর আমার বৌকে আপনার কপালে ঠেকিয়ে আপনার মানিব্যাগ চেয়ে বসিনি। আমার আদেখলাপনায় গাজোয়ারি নেই।
- ছবি দেখে মনে হল বৌদির শুগার আছে।
- পরস্ত্রীর চোখের কোলের দাগ অমন মন দিয়ে দেখতে নেই।
- আহ, আমি মোটেও সে ভাবে দেখিনি।
- আই সী। তা বলছিলাম যে; একটা আংটি আছে। অল্প সোনা, বড্ড বেশি খাদ। চাই?
- থাক বরং।
- ক্যাশেই সুবিধে, তাই না?
- তা তো বটেই। ঠিক আছে। ঘড়িটাও ফেরত নিন। কত আর পেতাম ও'টা বেচে।
- এহ্, এ'বার আমার খারাপ লাগছে। আমি ওই ভাবে বলিনি। ঘড়িটা রাখুন না।
- ধ্যার! বলছি ফেরত নিতে। নিন রাখুন।
- মোস্ট কাইন্ড অফ ইউ।
- ইয়ে, শুনুন। মেজাজ নড়ে গেল। ধুত। এই নিন আপনার মানিব্যাগ। যত্তসব আপদ।
- ছিঃছিঃ! প্রফেশনাল কম্প্রোমাইজ করাটা বাড়াবাড়ি। মানিব্যাগটা অন্তত রাখুন না প্লীজ। নয়ত আমি মরমে মরে থাকব।
- দেব? ট্রিগার টেনে?
- বলেছি না। আদেখলার ঘটি। যাক গে। থ্যাঙ্কিউ ফর দ্য মানিব্যাগ। আর সাবধানে যাবেন, কেমন? দিনকাল ভালো নয়।

***

মনোহর বুঝলে আজ আর ডাকাতির চেষ্টা করে লাভ নেই। তাই সোজা গিয়ে বসল শেষ শান্তিপুর লোকালটায়। আজ বড় মনকেমন, আজ বড় মনভালো।

কদ্দিন পর মিনুর দেখা পেল। কদ্দিন পর। মিনু কি তাকে মনে রেখেছে? নিশ্চয়ই রেখেছে। ঘাটের ধারে বাদাম ভাজা খাওয়া আর সিনেমার গল্প করা কি অত সহজে ভোলার? তবে মিনুর বাবা বিচক্ষণ, ভাগ্যিস মনোহরের হাতে তুলে দিয়ে মেয়েটাকে ভাসিয়ে দেননি।

মিনুর বর বড় ভালো, মাটির মানুষ; ওকে খুব ভালোবাসে।
কিন্তু মিনু নিজের শরীরের এত অযত্ন করে কেন? এই বয়সে হাই-শুগার, এ'টা কোনো কাজের কথা নাকি?

Wednesday, April 4, 2018

ইভোলিউশন

- খিস্তির ইভোলিউশনে গতি নেই রে। 
- নেই বলছ?
- কচু আছে। সেই মান্ধাতা আমলের চার অক্ষরে আটকে রইল জেনারেশনের পর জেনারেশন। আমার বাপ জ্যাঠার মুখখারাপ আর আমার মুখখারাপে কোনো স্কেল চেঞ্জ হল না। 
- চার অক্ষর আউটডেটেড বলছ?
- আউটডেটেড নয়? একশো এমবিপিএস ব্রডব্যান্ডের যুগে ইনল্যান্ড লেটারের জন্য পোস্ট অফিসে লাইন দেব? 
- অলটারনেট খিস্তি ভেবেছ? আপগ্রেডেড?
- মুশকিল কী জানিস, আমার মোবাইলে জিও সিম থেকে কী হবে যদি বাকি সবার ট্যাঁকে নকিয়ার স্টোনএজের ফোন থাকে। মিউচুয়াল এক্সচেঞ্জ না হলে সমস্ত ইনোভেশন জলে।
- তবু। দু'এক পিস শুনি। চার অক্ষরের বদলে কী বলে তৃপ্তি পাবে?
- বেহালামেট্রো। 
- কী?
- আজকাল কাউকে বোকাইয়ে বললে সে ভাবে মাই ডিয়ার সুরে কথা বলা হচ্ছে। ইম্প্যাক্ট ঝুলে গেছে। কিন্তু তাকেই বলে দেখ 'তুই বেহালামেট্রো, তোর গুষ্টি বেহালামেট্রো'। তার গা থেকে চামড়া খুবলে উঠে না এলে আমি এক বছর খিস্তি দেওয়া ছেড়ে দেব।
- নেক্সট অপশন?
- রোলেসস্। 
- রোলেসস্?
- রোলেসস্। ঢ্যামনা বলার চেয়ে অনেক বেশি ধারালো। 
- বুঝলাম।
- বুঝিসনি। না বুঝে রোলেসসাচ্ছিস। 
- এই আবার শুরু হল তোমার বেহালামেট্রোমো।
- দেখেছিস? শুনেই কেমন ফ্লপিড্রাইভ জ্বলে যায় না? 

Tuesday, April 3, 2018

সময় মত

- ভাই বিনু।
- কী ব্যাপার?
- একটা বড় গোলমাল হয়ে গেছে ভাই।
- চোখের কোণে কালি। ফ্যাকাসে মুখ। ব্যাপারটা সিরিয়াস মনে হচ্ছে।
- সিরিয়াস তো বটেই। আর একটু ভেবড়ে দেওয়াও বটে। কাল গোটা রাত ঘুমোইনি। গায়ে অল্প টেম্পারেচারও আছে মনে হচ্ছে ভাই। থার্মোমিটারটা নেহাত ভেঙে গেছে তাই ভেরিফাই করতে পারিনি।
- সামনে পার্ট ওয়ানের এগজ্যাম। দেখো তপু, গোলমাল পাকিও না। এ'বার ড্রপ দিলে তোমার বাবা তোমায় একটা গরুর কাছে একদলা গোবরের দামে বেচে দেবেন বলেছিলেন। মনে নেই? গত মাসে যখন মেসে এসেছিলেন?
- একদিকে বাবার হুমকির ভয়ে, অন্যদিকে এই ক্যালামিটি। মাঝেমধ্যে ভয় হয়, পাছে কবিতা লিখতে না শুরু করি।
- হয়েছেটা কী? খুলে বলো দেখি।
- সে এক সাংঘাতিক কাণ্ড।
- কী'রকম?
- গতকাল আমি একটা চিঠি পেয়েছি।
- চিঠি?
- ইনল্যান্ড লেটার। আসানসোলে আমাদের পাড়া থেকেই।
- হুমকি?
- তা অবিশ্যি নয়।
- লিখেছে কে?
- লিপি।
- লিপি?
- পাশের বাড়ির মেয়ে। একই বয়সী। বন্ধু। একই টিউশনি।
- চিঠিতে কী লিখেছে?
- লিখেছে, আমাদের প্রেম এ'বার শেষ হওয়া দরকার।
- ব্রেক আপ?
- ব্রেক আপ। ইনল্যান্ড লেটারে।
- প্রেম ভাঙার ব্যথা, আহা তোমার জন্য যে আমার বুকই ফেটে যাচ্ছে।
- ব্যথা, বুক ফাটা ব্যথা। তবে, ইয়ে। ব্যাপারটা ঠিক বুঝছ না ভাই। আমি তো জানতামই না আমি প্রেম করছিলাম। লিপি ব্রেক আপের খবর জানাতে মালুম হল যে আমি প্রেম করছিলাম।
- সাংঘাতিক!
- প্রেম করার সময় প্রেম করছি জানাটা যে কী জরুরী ভাই। প্রেম ভাঙার দুঃখ ফীল করব কী, প্রেম করার সময় প্রেম বুঝতে না পারার দুঃখে হাত কামড়ে ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে।
- আহা।
- সময় মত প্রেম করছি জানলে সময় মত শেষের কবিতা পড়তে পারতাম। উদাস হয়ে শ্যামল মিত্রের গান গাইতে পারতাম। বন্ধুদের কাছে 'প্রেমিকা ডেকেছে, আজ খেলতে যেতে পারব না' বলে ল্যাজ নাড়তে পারতাম। এখন সব জলে।
- শ্রোডিঙ্গারের প্রেম ভায়া, বুক চাপড়ে আর লাভ নেই। প্যারাসেটামল দেব নাকি একটা?

Sunday, April 1, 2018

হরিহরের রেস্টুরেন্ট

১।

- ম্যাডাম, আমি এখানে বসতে পারি?
- হুঁ?
- আমি এখানে বসতে পারি?
- না।
- ম্যাডাম, প্লীজ। ঠ্যাং টনটন করছে। আর দু'টো কফি আর একটা স্যান্ডুইচ বই তো নয়। বসি?
- না।
- আরে, দু'টো চেয়ারের টেবিল। আপনি একা। ও'দিকের চেয়ার খাঁখাঁ করছে। প্লীজ।
- আমার বয়ফ্রেন্ড আসছে। আমি ওর ওয়েট করছি।
- আচ্ছা, ঠিক আছে। একটা কফি আর একটা স্যান্ডুইচ, ওকে?
- আপনি তো রীতিমত বেয়াদপ।
- খিদের জ্বালায় এটিকেট ঠেটিকেট জাস্ট বাষ্প হয়ে উড়ে যায়। বসি?
- চেয়ার টেনে বসে পড়ে আবার জিজ্ঞেস করছেন?
- কনুইয়ে অযথা মেনুটা চেপে রেখেছেন। একটু এ'দিকে ঠেলে দেবেন? শুনেছি একটা ভালো মাছের পকোড়া অ্যাড করেছে মেনুতে। ভেটকি, তবে ফিশ ফিঙ্গার বা ফ্রাই নয়। একবারের জন্য দিন মেনুটা, প্লীজ। আর এদের ভেটকির গ্যারেন্টি আমার।
- আমি এ'বারে ওয়েটারকে ডেকে আপনাকে ঘাড় ধাক্কা দেওয়ার ব্যবস্থা করি।
- ডেকে লাভ নেই।
- ওয়েটার! ওয়েটারদাদা! একটু প্লীজ এ'দিকে আসুন।
- গরীবের কথা বাসি হলে পছন্দ হবে। পইপই করে বললাম ডেকে লাভ নেই।

***
২।

- বলুন ম্যাডাম!
- ওয়েটারদাদা! এই লোকটা আমার সঙ্গে অসভ্যতা করছে।
- কোন লোকটা ম্যাডাম?
- ওই, আমার সামনের চেয়ারের এই লোকটা। আমি একে চিনিনা। জোর করে এ'খানে বসে...।
- এই চেয়ারে?
- হ্যাঁ!
- ম্যাডাম, আমরা ব্যস্ত, প্লীজ এমন ঠাট্টা করবেন না।
- মানে? এই লোকটা আমার সঙ্গে বাজে ব্যবহার করছে আর আপনি ঠাট্টা ভাবছেন?
- কোন লোকটা ম্যাডাম? আপনার সামনের চেয়ার তো খালি! আপনার আর কিছু অর্ডার দেওয়ার না থাকলে...।

****

৩।

- কতবার বললাম, ওয়েটারকে ডাকবেন না। কে শোনে কার কথা।
- না মানে...এ'টা এত অদ্ভুত!
- আপনি পারেন বটে। এ'বার মেনুটা এ'দিকে দিন দেখি।
- আপনি ভূত?
- নয়ত এমন গায়েব হয়ে ঘোরাঘুরি করার ব্যাপারটা বড্ড গোলমেলে হত।
- আপনার নাম কী ছিল?
- নাম মরে না। নামটা ছিল নয়, আছে। দীপক। দীপক চ্যাটার্জী। আপনি?
- কুন্দকলি দত্ত।
- আপনার বয়ফ্রেন্ডের নাম কী?
- ভাঁওতা ব্যানার্জী।
- শুরুতেই ধরেছিলাম।
- বাজে কথা। যাক গে, এ'খানে আমি বেশি কথা বললে লোকে পাগল ভাববে আমায়। নিজে নিজে বকবক করে যাওয়াটা বড্ড অশোভন। বাইরে যাবেন?
- প্রথম আলাপেই ডেট? আপনি বড্ড গায়ে পড়া দেখছি।
- বেশ, আপনি থাকুন। আমি আসি। ওই ওয়েটার তখন থেকে আমার দিকে কেমন বিশ্রী ভাবে তাকাচ্ছে...।
- ইন্সিস্ট করছেন যখন...ঠিক আছে। তবে আপনি নিশ্চিত তো?
- ভয় পাচ্ছেন দীপকবাবু? মানুষের ভয়?
- যত্তসব! চলুন!

***

৪।

দীপক বেরিয়ে যেতেই তড়িঘড়ি রেস্তোরাঁর ঝাঁপ নামালেন হরিহর। ঝেঁপে বৃষ্টি আসছে, ঝড়ও উঠেছে।

যতবারে নিজের মনে 'রেস্তরাঁ' বলেন, ততবার হেসে ফেলেন হরিহর। একা হাতে রান্না, নিজেই সার্ভ করা। আর একজন মাত্র খরিদ্দার!  তাও বিনেপয়সার খানেওয়ালা। তার ওপরে আবার সে খদ্দের বদ্ধ পাগল। যে সে পাগল নয়; নিজেকে ভূত ভাবা পাগল। এ'দিকে এই খদ্দেরের বায়নাক্কা কম নয়, হরিহরের এক উটকো দায়িত্বও আছে; সে পাগলের সামনের ফাঁকা চেয়ারের দিকে তাকিয়ে মাঝেমধ্যে কথা বলে না আসলেই নয়।  তবু দীপকের মায়া কাটানো যায়না, ওর জন্যই টিকে আছেন বিরাশি বছরের হরিহর। মা-বাপ মরা পাগলা ভাইপোটা বড় ভালো, বড় মায়ার।

যদ্দিন চলে এইভাবে, তদ্দিনই।

কিন্তু যার জন্যে ছেলেটা নিজেকে মড়া ভাবে, সে মেয়ে কি মরেও শান্তি পেয়েছে? তাঁর আত্মা কি মাঝেমধ্যে দীপকের সামনের ফাঁকা চেয়ারে এসে বসে না? ঠিক যেই ভাবে কুন্দকলি আর দীপকের প্রথমদিন দেখা হয়েছিল? এই টেবিলেই? গায়ে পড়ে এসে আলাপ করেছিল দীপক। ক্যাশবাক্সের ও'পাশ থেকে দিব্যি নজর রাখছিলেন হরিহর। সে কদ্দিন আগেকার কথা; তখন এই রেস্তোরাঁটা মরে ভূত হয়ে যায়নি। বড্ড মায়া মিশে আছে; এই মরা রেস্তোরাঁতে।

শেষ জানালাটা বন্ধের সময় হরিহরের মুখে বাদলা হাওয়া  ঝাপটা এসে পড়ল। এখনও মাঝেমধ্যেই মনভালো হয়ে যায় তাঁর।

Thursday, March 29, 2018

পিহু আর ঠগি

- আয়। এ'দিকে আয়।
- তুমি ভালো লোক?
- হ্যাঁ। বিলকুল।
- তোমার নাম?
- হরেন। হরেন জ্যেঠু।
- আমার নাম পিহু।
- পিহু।
- হ্যাঁ। পিহু।
- তা, তুমি জেলখানায় কেন?
- বাহ্, তুমি জান না?
- না। এত্তটুকুন বাচ্চা তুমি, জেলে এলে কেন?
- জানি না।
- বাহ্ বাহ্। জানো না। দিব্যি। তা তোমার বাড়িতে কে কে আছে?
- কেউ নেই।
- সে কী!
- ছিল। মরে গেছে।
- সর্বনাশ।
- রাজার পেয়াদারা পুড়িয়ে মেরেছে। সবাইকে। বাবা, মা, দাদা। আমার বুড়ি পিসিমা। সবাই। মরে গেছে।
- তুমি বাঁচলে কী করে?
- আমি বাইরে খেলতে গেছিলাম যে। বিরুমিনের সঙ্গে।
- বিরুমিন? তোমার বন্ধু?
- সবচেয়ে ভালো বন্ধু।
- তা জেলে এলে কেন?
- আমি রাজপেয়াদাদের ধাওয়া করে গিয়ে ঢিল ছুঁড়েছিলাম।
- ওহ হো।
- মা জানলে কিন্তু খুব রাগ করত। কাউকে মারতে নেই যে। মা মরে গেছে, তাই বকবে না। তুমি জেলে এলে কেন হরেন জ্যেঠু? তুমিও পেয়াদাদের মেরেছিলে?
- না। আমি ঠগি। তাই জেলে রয়েছি।
- ঠগি মানে ডাকাত। আমার বাবা ছোটবেলায় ঠগি দেখেছিল। বাবা কত বলত, কত মজার গল্প। কতরকম দেশ, কতরকম মানুষ। বাবা মরে গেছে, তাই আর গল্প বলবে না।
- পিহু, রুটি খাবে?
- খাবো। খুব খিদে।
- খাও।
- আর তুমি কি খাবে?
- ও মা! আজ অমাবস্যা,  জানো না? অমাবস্যায় রুটি খেলে বাতের ব্যথা বাড়ে।
- তা'হলে আমি খাই?
- খাও।
- উফ, বড় খিদে। দু'দিন আমায় কিছু খেতে দেয়নি।
- পিউ, পেয়াদারা তোমার বাড়ি কেন পোড়ালো? জানো?
- বাবা গান গাইত। পাহাড়ি ভাষায়। আমরা কিনা পাহাড়ি। আর সমতলে পাহাড়ের গান গাওয়া বারণ। তাই রাজা রেগে এমন করেছেন।
- তুমি জানো? পাহাড়ি ভাষা? পাহাড়ি ভাষার গান?
- এ বাবা! না। আমি তো পাহাড় দেখিনি কোনদিন। দাদাও দেখেনি। বাবা পাহাড়ের গল্প করত। বলত পাহাড় দেখাবে একদিন, আমি আর দাদা বড় হলে। দাদার আর পাহাড় দেখা হল না, সে মরেই গেল।
- খাওয়ার সময় কাঁদে না পিহু। তুমি জানো, তোমাদের পাহাড় থেকে সৈন্য আসছে?
- সৈন্য? তারা যে মন্দ! ভয়ানক!
- না, পাহাড়ের সৈন্যরা দিব্যি ভালো। তারা তোমায় পাহাড়ে নিয়ে যাবে। পাহাড়ি ভাষা শেখাবে, আর শেখাবে পাহাড়ি গান।
- আসবে? পাহাড়ি সৈন্য? আমি বাবার মত পাহাড়ি গান গাইতে পারব?

****

- ক্যাপ্টেন হরেন!
- সে..সে...সেলাম! মহারাজ!
- মদ ডুবে থাকলেই তো পারো হে।
- ম...মহারাজ। এক্সটার্মিনেশন ক্যাম্প চালানো। বেয়াড়া জাতের খোকাখুকুদের এক্সটার্মিনেশন ক্যাম্প। মদে ভেসে না গিয়ে উপায় নেই।
- ওদের সমূলে নিকেশ না করলে বিপদ হে হরেন। রক্তবীজের দল, বড় বিপদ। এ'সব কাজে বুলেট, গিলোটিন ব্যবহার করলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়, তা না তোমার যত অদ্ভুত টালবাহানা।
- আমার কাজ ঘুম পাড়ানোর আর রুটিতে বড় নিশ্চিন্দির ঘুম আসে। তাছাড়া, রুটিতে বিষ আর স্বপ্ন দুইই মেশানো বড় সহজ হে রাজাধিরাজ।