Friday, March 23, 2018

মুকাবলা

- গুরুদেব!
- আবার কী হল বাবা অর্জুন।
- এই দেখুন না গুরুদেব, একলব্যটা ফের বাড়াবাড়ি শুরু করেছে।
- ওই ব্যাটাচ্ছেলে লোয়ার ক্লাস ছেলেটা?
- আজ্ঞে। আমায় কী ইনসাল্টটাই না করলে।
- তোমার মত এলিটকে ইনসাল্ট করেছে?
- রীতিমত।
- কী'ভাবে? সমস্ত রিসোর্স তো আমি তোমার দিকেই ডাইভার্টেড রেখেছি। সে ব্যাটা ইনসাল্ট করার সুযোগ পায় কী করে?
- হস্তিনাপুর আপনাকে যে সিটিসি অফার করেছে, সে টাকা দিয়ে আমায় খান কুড়ি গেমিং কনসোল কিনে দিলে ল্যাঠা চুকে যেত।
- আহ চটছ কেন বাবু। খুলে বলই না! একলব্য তোমায় কীভাবে কাঠি করেছে?
- কাঠি? গদার গুঁতো মেরেছে পিছনে।
- আহ্। অর্জুন। ল্যাঙ্গুয়েজ সামলে। আমি গুরুজন।
- ধ্যাত্তেরি। গুরুজনে নিকুচি করেছি। একলব্যর বদমায়েসির চোটে আমার রয়্যাল এলিট শরীর ঘিনঘিন করছে।
- করেছেটা কী?
- চাকরবাকর মানুষ, লোহালক্কড় অস্ত্রটস্ত্র আমার চেয়ে না হয় একটু ভালো চালায়। তাই বলে আমার টিপ সামান্য এ'দিক ও'দিক হয়েছে বলে আমায় মিডল ফিঙ্গার দেখাবে?
- সর্বনাশ! বলো কী!
- কী অপমান। ছি ছি। আদিবাসীর পো কিনা রাজপুত্রকে মিডল ফিঙ্গার দেখায়?
- বেশ। ওকে শায়েস্তা আমি করব। অড নাম্বারের মিডল হয়, ইভেন নাম্বারে মিডল পাবে কোথায়? বাপের জন্মে আর কাউকে মিডল ফিঙ্গার দেখাতে যাতে সে না পারে, সে ব্যবস্থা আমি করে দেব।
- যাক। সে কথাই রইল। আর ইয়ে, রিপোর্টারদের বলে দেবেন আমার টিপ মিস করার গল্পটা একটু অন্যভাবে প্রেজেন্ট করতে। বিশেষত ওই বুড়ো রিপোর্টারটা একটু ঢ্যাঁটা, কী যেন নাম? ওই ব্যাস না কী যেন, ওর জার্নালে যেন আমার ব্যাপারে আজেবাজে কিছু না লেখা থাকে, কেমন? দেখে নেবেন, এখন আমি আসি। ডিডি মেট্রোতে সুপারহিট মুকাবলা শুরু হল বলে।

Wednesday, March 21, 2018

সোমালিয়া আর ঘটিদা

- পোয়েট্রি ছাড়া সমস্তই অন্ধকার, বুঝলি রে..।
- আমায় বলছ ঘটিদা?
- এ ঘরে মেসমালিকের বাপের ছবি আর তুই ছাড়া আর কে আছে রে গবেট বিশে?
- গত পরশু দুপুরে তুমি ওই ফ্রেমে বাঁধানো উমাপদ দত্তের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কত কিছু তো বললে। তাই ভাবলাম...।
- চুপ কর। যত বাজে কথা। ও'টা রিহার্স করছিলাম।
- রিহার্সাল? কলেজের নাটকে চান্স পেয়েছ বুঝি?
- ধুস। ও'সব পেটি লেভেলে আমি থাকিনা। নেহাত মৃণাল জ্যেঠু আর সিনেমা বানাচ্ছেন না। কোনো কমা জায়গায় স্টেজে নামতে চাওয়ার মত কাঙাল আমি নই।
- বিনুদা বলছিল তোমায় নাকি বাদ দিয়েছে...।
- বিনু বলেছে? হুক আর পুলে তফাৎ গুলিয়ে ফেলা ছেলের কথা তুই বিশ্বাস করলি? 
- তা মেসদাদুর ছবির সামনে কী রিহার্সাল করছিলে শুনি?
- সে সব বড় জটিল ব্যাপার। সামান্য ফার্স্ট ইয়ারের ছেলে হয়ে আমাদের সেকেন্ড ইয়ারের সমস্যাগুলো গ্রাস্প করবি কী করে?
- বেশ বলতে হবে না।
- বড্ড অভিমান তোর। ইনসিস্ট করছিস যখন বলি। সোমাকে প্রপোজ করার ব্যাপারটা অনেকদিন ঝুলিয়ে রেখেছিলাম। আমায় দেখলেই বেচারির চোখে এক ধরণের আকুতি বেশ কিছুদিন ধরেই ফুটে উঠছিল। মেয়ে তো, বড্ড নরম মন। ও'দের বুক ফাটে তবু মুখ ফোটে না। এই সে'দিন যখন ক্যান্টিনে দেখা হয়েছিল। জোর করে মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে নিজের চোখের যন্ত্রণা ঢাকার চেষ্টা করছিল। আপ্রাণ। অথচ ওর চোখ থেকে দানা দানা ভালোবাসা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে আমার বুক ভারি করে তুলেছিল।
- কী ছড়িয়ে কী হচ্ছিল?
- ফার্স্ট ইয়ার রে বিশে। তোর কলজে এখনও পোয়েট্রির জন্য তৈরি হয়নি।
- অ। তা করেছিলে? প্রপোজ?
- আলবাত। গত পরশু। শেষ ক্লাসের পর। তিনতলার করিডরে তখন শেষ বিকেলের আলোছায়া। দিলাম উইটের তলোয়ারে এফোঁড়ওফোঁড় করে। মেয়েরা উইট পছন্দ করে, মনে রাখিস। উইটে ধার দিয়ে যা। ব্যস।
- সোমাদি কী বললে?
- মুখে কী আর স্বীকার করতে চায় রে? লজ্জায় হাবুডুবু খেয়ে এক কথা বলতে গিয়ে বলে ফেললে 'জুতো মারব'।
- সোমাদি তোমায় জুতো মারবে বলেছে?
- ধুর বোকা। সে কি আর মনের কথা? হবু ইয়ের সামনে আনন্দে লাফানোটা আদৌ গ্রেসফুল নয়।
- জুতো মারার ব্যাপারটা বোধ হয় গ্রেসফুল?
- আজ জুতো মারবে বলেছে, কাল সোনা বলে ডেকে কান মুলবে। মিলেনিয়াল প্রেম ভাই। ও তুই বুঝবি না, সেকেন্ড ইয়ারে এমন কত ব্রেন-ধাঁধানো ব্যাপার আছে। সোমা মুখে যাই বলুক, ওর চোখের কোণে চিকচিক করছিল ভালোবাসা। স্পষ্ট দেখেছি।
- ও। চোখ। আগে বলবে তো। তা, এরপর?
- ওই যে। পোয়েট্রি। কবিতা লিখব ক'দিন ধরে। এ হপ্তায় তাই কলেজ বন্ধ। 
- ও। বেশ। শুনিও। 
- সংকলনের একটা নামও ঠিক করে ফেলেছি। সোমালিয়া। ওয়ার্ডপ্লেটা নোটিস করেছিস?
- বিলক্ষণ।
- লিটল ম্যাগট্যাগ না, স্ট্রেট বই। নন্তুদার নতুন পাবলিশিং কোম্পানি একটা ব্রেকথ্রু খুঁজছিল। ভাবছি অবলাইজ করেই ফেলব।
- বেশ। তবে ইয়ে, ঘটিদা..। 
- কী?
- বলছিলাম, সোমাদি কিন্তু গ্রেস ব্যাপারটা সবার সঙ্গে ঠিক ইউনিফর্মলি এক্সেকিউট করতে পারছে না। শুনছি ফিজিক্সের নির্মলদার সঙ্গে সে নাকি টপাটপ রোল কাটলেট খেয়ে বেড়াচ্ছে। আজ দেলখোশা তো কাল বসন্ত কেবিন। গতকাল আবার দু'জনে ব্যান্ডেল চার্চ ঘুরতে গেছিল। 
- নির্মল? ছোহ্। ও'তো হ্যান্ডমেড পেপার। মেটাফরিকালি অফকোর্স। সোমা ওর সঙ্গে ঘোরাঘুরি করে আমায় ইঙ্গিতের কলমে মেটাফরিকাল চিঠি পাঠাচ্ছে।
- মানে, তোমার জন্য গ্রেস আর চিকচিক। নির্মলদার জন্য কাটলেট আর ব্যান্ডেল?
- তোর ঘটে মালকড়ি আছে। যাক। চ', তোকে আজ অন্নপূর্ণা হোটেলে মটন টিকিয়া আর রুমালি রুটি খাওয়াবো।
- মাসের শেষে? টিকিয়া রুটি খাওয়াবে? লটারি পেয়েছ নাকি?
- লটারি নয়। তবে নির্মলের মানিব্যাগটা পেয়েছি। 
- কী?
- গতকাল ব্যাটা আমায় জিজ্ঞেস করেছিল ব্যান্ডেল স্টেশন থেকে চার্চ যাওয়ার ডিরেকশন। বুঝিয়ে দিলাম। মানিব্যাগটা দৃষ্টিকটু ভাবে হিপপকেটে উঁচিয়ে ছিল। বোঝা লাঘব করে দিলাম। স্কিল। এ'সব করতেও মেডিটেশন দরকার। যাক গে। শুনেছি ব্যান্ডেলে বড় রেস্তোরাঁয় ঢুকে খেয়েদেয়ে টাকা দেওয়ার সময় বেশ অপদস্থ হয়েছে, সোমা না থাকলে ব্যাটাকে বাসন মাজতে হত। যা হোক, যারা চোখের চিকচিক চিনতে পারে না, তাদের অমন একটু ভুগতে হয় বৈকি। আর আহাম্মকের সাহস দ্যাখ, ওয়ালেটে সোমার ছবি রেখেছে? পারভার্ট। দেখব বাছাধনের কী হাল হয় যখন বাড়ির গার্জেনদের কাছে উড়ো চিঠিটা পৌঁছয়। সোমাকে কেন যে এত ডিস্টার্ব করে ছেলেটা..।
- উড়ো চিঠি? নির্মলদার গার্জেনদের? কে দেবে?
- বড় বাজে প্রশ্ন করিস তুই বিশে। টিকিয়া রুটি খাবি তো? চটপট জামাটা গলা। ফেরার পথে একবার আলোছায়া স্টুডিওয় ঢুঁ মারতে হবে। সোমার পাসপোর্ট সাইজ ছবিটা এনলার্জ করাতে দিয়েছিলাম। আজ ফ্রেম করাতে হবে। দেওয়ালে মেসমালিকের বাপের ছবিটা বড্ড বিরক্তিকর। চে আর সোমা ছাড়া এই রুমে কারুর ছবি থাকবে না। চলো কমরেড!

Monday, March 19, 2018

হেস্


রুডল্ফ হেস্ নাজি পার্টির ডেপুটি ফুয়েরার পদে থাকাকালীন হিটলারের নজর এড়িয়ে একটা যুদ্ধবিমান নিয়ে জার্মানি থেকে স্কটল্যান্ড উড়ে গেছিলেন; একা। তখন যুদ্ধ তুঙ্গে, হিটলার লন্ডনে বোমাটোমা ফেলতে শুরু করেছেন। ফ্রান্স নাজিদের পকেটে। সোভিয়েত আক্রমণের  প্রস্তুতি চলছে। হেস্ বুঝেছিলেন যে জার্মানির পক্ষে দু'দিক সামাল দিয়ে বেশিদিন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া মুশকিল। ল্যান্ডিংয়ের সময়ে আবহাওয়া অনুকূল না থাকায় জীবনে প্রথম প্যারাশুটে ঝাঁপ দিতে হয় তাঁকে। হেস্ ভেবেছিলেন চার্চিলের সঙ্গে দেখা করে তাঁকে বোঝাবেন জার্মানির সঙ্গে সমঝোতা করার জন্য; ব্রিটেন নিজের এলাকা আর নিজের উপনিবেশগুলো নিয়ে সুখে থাকুক। জার্মানি নিজের এলাকাটুকু বুঝে নেবে। চার্চিল নরম হলে জার্মানির আখেরে মঙ্গল, হেস্ তেমনটাই আঁচ করেছিলেন।

পরের দিন হেস্-য়ের পাগলামোর খবর পেয়ে হিটলার রাগের চোটে আশাপাশের মানুষজনকে চিবিয়ে খাওয়ার উপক্রম করেছিলেন। গোয়েবল দেশময় রটিয়ে দিয়েছিলেন "ও পাগল! আপদ বিদেয় হয়েছে, ভালো হয়েছে"। এ'দিকে ব্রিটেনও ব্যাপারটাকে স্রেফ ফিচলেমো মনে করে উড়িয়ে দিল। হেস্ বন্দী হলেন। তাঁর চার্চিলের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছে উবে যেতে বেশিদিন লাগল না।

এক চাষি হেস্-কে প্যারাশুটে নামতে দেখেছিলেন। পরমশত্রু নাজি পার্টির ডেপুটি ফুয়েরারকে চিনতেও পেরেছিলেন।
এবং সবচেয়ে বড় কথা ব্রিটিশ সৈন্য হেস্-কে পাকড়াও করার আগে তাঁকে এক কাপ চা অফার করেছিলেন সেই চাষি। 

এত পাঁয়তারার পিছনে মূল বক্তব্য একটাই; 
কোথাও অতিথি হয়ে গেছেন আর তারপর প্রবল চায়ের তেষ্টা পেয়েছে?
গৃহকর্তা/গৃহকর্ত্রী চা বাদে যাবতীয় ভুজুংভাজুং গছিয়ে চলেছেন অথচ চায়ের প্রসঙ্গই উঠছে না?

তাঁদের রুডল্ফ হেস্ আর বিলিতি চাষির গল্প শোনান।

Saturday, March 10, 2018

বিউলির বিশ্বাস

বিউলির চোখে ঘুম নেই। আজ তিন দিন ধরে দু'চোখের পাতা এক হয়নি। বালিশে মাথা ঠেকালে মাথার ভিতর চিড়বিড় করে উঠছে। অথচ শরীর মন অবশ করা ক্লান্তি তাকে গিলে খাচ্ছে যেন। শাশুড়ি মা অবশ্য মাঝেমধ্যেই গায়ে মাথায় হায় বুলিয়ে তাকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছেন। কিন্তু সে বেচারির নিজের দুঃখই বা কম কীসে? যে মায়ের জোয়ান ছেলে মাত্র তিন দিনের জ্বরে মরতে বসেছে, তাঁর বুকের ভিতরে কি রক্তগঙ্গা বয়ে চলছে না? বুড়ি বিউলিকে চোখে হারায়।

ক'মাসের মাত্র বিয়ে, তবু এরই মধ্যে নিজের স্বামীকে বেশ মায়া মায়া সুরে ভালোবেসেছে ফেলেছে বিউলি। জানালা বেয়ে চুইয়ে নামা জ্যোৎস্নায় হারুর চিবুক ভেসে যেতে দেখে বিউলি। মায়া হয়। বড় মায়া। বুক ধড়ফড়ানো মায়া।

এই মানুষটাকে এখন দিব্যি ছোঁয়া যায়। চাইলেই চুলে বিলি কেটে দেওয়া যায়। 'বুকে কষ্ট হচ্চে গো" বলে বুকে মাথা রাখা যায়। সে থাকবে না? বর না থাকলে বুক মুচড়ে মুচড়ে ওঠে; বাপের বাড়ির পাড়ার শিউলিপিসি অন্তত তাই বলতেন। হারু থাকবে না? সন্ধেবেলা মেলা থেকে ফেরার পথে অসভ্য সুরে 'অ্যাই বৌ, ইদিকে ঘেঁষে আয়' বলে চিমটি কাটবে না আর সে? বিউলির গলায় রামপ্রসাদী শুনে হারুর চোখ ছলছল হয়ে আসে, তখন বিউলির মনে হয় শীতের রাতে কেউ যেন তার গায়ে ভালোবাসাবাসির লেপ চাপিয়ে দিয়েছে।

এমন স্বামীটা আর থাকবে না? কবিরাজ মশাই অমন থাপ্পড়ের মত কথাগুলো বলতে পারলেন?

কবিরাজমশাই অবশ্য বলেছেন শহরে থেকে বড় ডাক্তার ডেকে নিয়ে আসতে পারলে কিছু একটা হলেও হতে পারে। কিন্তু সে ডাক্তারের খরচ কম নয়। বিউলিদের টাকা নেই।

একটু ভুল হল। বিউলির কাছে একটা গিনি আছে, জমিদার বাড়ির সই এলোকেশীর তাকে বিয়ের সময় দিয়েছিল। আর বিউলি গিনিটা লুকিয়ে রেখেছিল নিজের পুঁটুলির গোপন কোণে। হারুও জানতে পারেনি সে গিনির কথা।  সে গিনি ভাঙিয়ে কবিরাজমশাইয়ের কথামত শহুরে ডাক্তারের ব্যবস্থা করাই যায়। কিন্তু গতকাল থেকে বিউলির মনের ভিতর হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় করেই চলেছে। বাপের বাড়ির গাঁয়ের বুড়োশিবঠাকুরের কথা মনে করে সে যখনই কোনও পয়সা মানত করে জলে ভাসিয়েছে, তখনই তার মনোবাসনা পূর্ণ হয়েছে। বিউলির দাদা নিমকি সে'বার দিন দুয়েকের জন্য জঙ্গলে হারিয়ে গেছিল, মায়ের লক্ষ্মীর ঝাঁপি থেকে এক পয়সা চুরি করে দাদার নামে মানত দিয়ে সে পয়সা নদীতে ছুঁড়ে ফেলেছিল বিউলি; পরের দিনই ফেরত এসেছিল দাদা।  কিছুতেই মেজদির বিয়ে ঠিক হচ্ছিল না, বাবার পুরনো দেরাজ থেকে একটা গোটা টাকা চুরি করে নদীতে ভাসাতেই কাটোয়ার পাত্রপক্ষ মত দিয়েছিল। এমনও আরো বেশ কয়েকবার এইভাবে টাকাপয়সা বুড়োশিবের নাম মানত করায় কাজ হয়েছিল। এই মানতগুলোর কথা অবশ্য কাউকে সে কখনও বলেনি।

কাজেই গোটা একটা গিনি জলে ভাসালে কি বুড়োশিব তার স্বামীকে বাঁচিয়ে দেবে না?  অচেনা ডাক্তারের জন্য অন্ধের মত খরচ না করে বুড়োশিবের ভরসা করাই কি উচিৎ হবে না? এক বুক আকুতি নিয়ে ঘাটের দিকে ছুটল বিউলি।

***

"আপনি আমার থেরাপিস্ট যখন আপনাকে খুলে বলতেই পারি। মাঝেমাঝে মেয়েটাকে স্বপ্নে দেখি। সে বড় অদ্ভুত স্বপ্ন। এক নদী কালচে নীল জলে মেয়েটা ডুবে যাচ্ছে। বড় মায়া মেয়েটার চোখে।
মেয়েটার ঠোঁটে অল্প কাঁপুনি।
মুখ ফ্যাকাসে কিন্তু তাতে ভালোবাসা জমাট বেঁধে আছে। মেয়েটা আমার নাম ধরে হাতছানি দিয়ে ডাকে
'আমায় ডুবতে দিওনি শঙ্করবাবু, তোমায় পয়সা দেব'।

এক বুক জলে নেমে মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরি আমি। স্বপ্নেই।
আহ, বড় মায়া।

গতকালও স্বপ্নে সে'ভাবেই এসেছিল সে;
'আমায় ডুবতে দিওনি শঙ্করবাবু, তোমায় একটা গিনি দেব'। কিন্তু আমি জলে নামার আগেই অ্যালার্ম ঘড়িটা বিশ্রী ভাবে বেজে উঠল। ভোরের স্বপ্ন আর কী। কিন্তু সেই থেকে নাকে শুধু শ্মশানের গন্ধ আসছে ডাক্তার। আমি কি পাগল হয়ে গেলাম ডাক্তার"?

Tuesday, March 6, 2018

মূর্তিভাঙার গল্প


- নমস্কার খাসনবীসবাবু। 

- আরে দত্ত? হঠাৎ আমার অফিসে? পথ ভুল করে নাকি?

- আপনার অফিস? হে হে। 

- আরও অন্তত দু'দিন। পরশু সন্ধেবেলা গিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে ইস্তফা দেব। তদ্দিন এ অফিস আমারই। তারপরের দিন থেকে না হয় এ'টাকে নিজের অফিস করে নিও। 

- হে হে হে। তবে, মার্জিনটার জন্য খারাপ লাগছে খাসনবীসবাবু। এদ্দিনের নেতা আপনি। এদ্দিনের পার্টি। এ'ভাবে গোহারান হেরে যাওয়াটা ঠিক হয়নি। মাইরি বলছি, আপনার দুঃখে নিজের এমন ল্যান্ডস্লাইড ভিক্ট্রি নিয়েও ঠিক আহ্লাদ করতে পারছি না। 

- দুঃখের আর এ কী দেখলে হে দত্ত। দু'বছর যেতে দাও। তারপর দেখো মিডিয়া আর পাবলিক কী খতরনাক চিজ। সে যাক গে, তা এই হেরো অপোজিশনের কাছে কী মনে করে? গোলমেলে ফাইলটাইল সব জ্বালিয়ে দিয়েছি ভায়া। কিস্যু পাবে না। 

- কী যে বলেন খাসনবীসবাবু। আপনি খাস হতে পারেন, আমি নভিস হতে পারি; তবে ঘটে এ'টুকু বুদ্ধি আছে। সে'সব ফাইলটাইল নিয়ে আপনার কোনও চিন্তা নেই। র‍্যালিট্যালিতে একটু চমকাতে হয়, তাই বলে কি ও'সব নিয়ে পড়ে থাকলে আমার চলবে? ও নিয়ে আপনি ভাববেন না। আমি এসেছিলাম অন্য একটা রিকুয়েস্ট নিয়ে। 

- রিকুয়েস্ট? 

- অনুরোধ। 

- বাংলা তর্জমার জন্য আমার তোমায় দরকার পড়বে না দত্ত। দরকারটা কী?

- বলছিলাম যে দু'দিনের মধ্যে রাজধানীর কোনও একটা ব্যস্ত মোড়ে আপনার একটা মূর্তি না বসালেই নয় যে।  

- আমার মূর্তি? 

- গ্র্যান্ড হবে খাসনবীসবাবু। আমি কথা দিচ্ছি। পনেরো ফুটের মূর্তি। জায়ান্ট। আর আপনার ক্যারিস্মার সঙ্গে খাপেখাপে। সমস্ত প্রস্তুতি নেওয়া হয়ে গেছে। এ'বার শুধু আপনি হ্যাঁ বললেই...। 

- আমি ইলেকশনে হেরেছি। আমার দল সাফ হয়ে গেছে ভাই দত্ত। আমার আবার মূর্তি কেন? 

- কী করব স্যার। পার্টির ছেলেরা ইলেকশনের জন্য মুখে রক্ত তুলে খাটল ছ'মাস। ইলেকশন জেতার পর শুধু মদ মাংস খাইয়ে তো আমার দায়িত্ব শেষ হয়ে যেতে পারে না। ও'দের যথেষ্ট উজ্জীবিত না করতে পারলে যে আমি ভেসে যাব খাসনবীসবাবু। আপনি এদ্দিনের পিএম। আমার মত ইয়ং চ্যাপের ফিউচার নিয়ে একবারও ভাববেন না? 

- মূর্তিভাঙাটা লোকে আজকাল বেশ খাচ্ছে, তাই না?

- আলবাত। রক্ত টগবগ। টিআরপিতে বিস্ফোরণ। 

- ভ্যানডালিসম একটু আছে বটে...। 

- এই আপনাদের এক রোগ। কথায় কথায় পাথর-ছোঁড়া-ইংরেজি। আর ছেলেছোকরারা পিকনিকে গিয়ে মাংস না কষিয়ে কি উচ্ছে-সেদ্ধ বসাবে? আর আমার ফুট সোলজাররা ভোটে জিতিয়ে দু'চার পিস মূর্তি না উপড়ে কি শ্যামাসঙ্গীত গাইবে?

- মার্কেট পালটে যাচ্ছে হে দত্ত। ট্রেন্ড বুঝতে হবে। যাক গে। বেশ। তাই হবে। আমার মূর্তি কাল বসুক। দু'দিন পর ভেঙেটেঙে দিও'খন। 

- আপনি মাই ডিয়ার লোক খাসনবীসবাবু। টিভি চ্যানেলে দেওয়া খিস্তিগুলো গায়ে মাখবেন না প্লীজ। বাজারের হাল তো দেখছেন, একটু আগুন না ঝরালে জনগণ পিঠ চুলকে দেবে কেন? 

- বেশ বেশ। কিন্তু শোনো হে দত্ত। সামনেই মিউনিসিপালিটির ইলেকশন আসছে। ও'টা আমার চাই কিন্তু। ছেলেটা বড্ড আইডল হয়ে বসে আছে। ওর একটা হিল্লে করতে হবে। 

- সে দায়িত্ব আমার। ও নিয়ে আপনি কিচ্ছু ভাববেন খাসনবীসবাবু। দরকার পড়লে মিউনিসিপালিটির অফিসের সামনে আমি আমার একটা মূর্তি বসিয়ে দেব ইলেকশনের আগে। ইলেকশন জিতে এলে খোকার সুবিধে হবে মৌজ করতে। কেমন?