Sunday, March 4, 2018

বালিশবাবুর অফিসে - ৬



- এ যে দেখছি অনেক জল!
- অনেক বালিশবাবু! অনেক।
- কতটা? 
- সে কি আর মাপার উপায় আছে?
- যা মাপা যায় না তাকেই বুঝি 'অনেক' বলে মিস্টার মুখার্জী?
- বাবা ডাক থাকতে আবার মিস্টার মুখার্জী কেন?
- গোটা বালিশেন্দ্র থাকতে আবার বালিশ কেন?
- এ'সব কোনও প্রশ্ন হল?
- এ'সব কোনও উত্তর হল?
- ধুত।
- কতটা?
- কী কতটা?
- আমাদের সামনের এই বিশাল চৌবাচ্চাটায় কতটা জল? আন্দাজ? কয়েক লাখ ফীডিং বোতল ভরে ফেলা যাবে? 
- চৌবাচ্চা? এ'টা বে অফ বেঙ্গল বালিশেন্দ্রবাবু। সমুদ্র!
- চৌবাচ্চার তুলনায় সমুদ্রে কতটা বেশি জল থাকে বাবাবাবু?
- সমুদ্র যদি মাইনের পাওয়ার দিন সন্ধেবেলায় কলজের সাইজ হয়, তা'হলে চৌবাচ্চা হচ্ছে মান্থএন্ডের হঠাৎ ক্রেডিট কার্ডের বিল দেখা কলজে।
- উপমা দেওয়ার ক্ষমতা তুলি চালানোর মত সুক্ষ বাবাবাবু, আপনার দৌড় পেরেকে হাতুড়ি চালানো পর্যন্ত। 
- মোদ্দা কথা হল সমুদ্রে ইনফাইনাইট পরিমাণে জল আছে। চৌবাচ্চায় কয়েক লিটার।
- যা যা আপনি বা আপনারা মাপতে পারেন না, সে'টাই ইনফাইনাইট?
- মাপা সম্ভব নয়। 
- সম্ভাবনার লিমিট আপনি?
- মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।
- ইনফিনিটি তা'হলে মানুষের পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে। কচ্ছপ হলে কী হয় কিছুই বলা যাচ্ছে না।
- ধ্যাত্তেরি। 
- তবে বাবাবাবু, এই যে পায়ে জল খেলে যাচ্ছে, এই ব্যাপারটা অতি মনোরম।
- জানি। জলের ছপছপ, বালির সুড়সুড়। বাই দি বাই বালিশবাবু, এই জলের ছপাৎছপকে বলে ঢেউ। 
- ঢেউ। তা সমুদ্র দিনে কতগুলো ঢেউ জেনারেট করে?
- আমি জানি না। অবশ্য কচ্ছপেরা জানতে পারে।
- সারকাজম? বাবাবাবু?
- মনে কেমন করে না? বালিশবাবু? ঢেউ, বালি, আকাশ...সব মিলে?
- ডাইপার বাইরে থেকে ভিজে গেছে মাইরি। আপনার এই ঢেউয়ের ছপাতে। রোম্যান্টিক আয়রনি।
- রোম্যান্টিক? আয়রনি? এ'সব কোথায় শিখলেন?
- আপনার বন্ধু মিস্টার সেনকে এই দু'টো শব্দ ব্যবহার করতে শুনেছি বহুবার। বিশেষ করে যখন ভদ্রলোক ইন্টেলেক্ট ঝাড়তে গিয়ে ছড়িয়ে ফেলেন। আরও আছে। বুর্জোয়া, বার্গ্ম্যান, পোস্টমডার্ন, এলিটিস্ট..।
- ঝাড়তে গিয়ে ছড়িয়ে? আপনার ভাষার হয়েছেটা কি?
- আমার ভাষা। বালির ঢিপির মত। আপনাদের ইনফ্লুয়েন্সের ঢেউ এসে অবিরাম হিট করে যাচ্ছে। অগুনতি।
- থেবড়ে বসবেন? বালিতে লেপ্টে?
- বালি আর ডাইপার খুব আনইজি কম্বিনেশন স্যার। আমি বরং আপনার কোলে...।
- বেশ।
- ইনফিনিটির সামনে এলে মন তিরতির করে কাঁপে? এম্পিরিকাল হিসেবকিতেব কি তাই বলছে? মনকেমন? বাবাবাবু?
- ডাইপার ভিজেছে? ভিতর থেকে? বালিশবাবু?

এ'বারের পুরী

১।

ভিড় মিনিবাসের হঠাৎ জানালা পাওয়ার যে শিউলি সুবাস,
ঘাটের নিরিবিলিতে আঙুলে আঙুল আড্ডার শেষে টিউশনি পড়তে গিয়ে ফতুয়ার বুক পকেটে পড়ে পাওয়া দু'টো খোসা ছাড়ানো বাদামের যে স্বাদ,
কপালে ঠেকে থাকা রিভলভারের ইস্পাত শীতল নল আচমকা সরে যাওয়ার যে স্বস্তি,
ঘি, তেল, শুকনো লঙ্কা ভাজা দিয়ে মাখা আলুসেদ্ধর গা বেয়ে ওঠা মুসুরির ডালের ঢেউয়ে যে ওম,
কয়েক হাজার অফিসের বকলসি ফোন-কলেরর ফাঁকে টুক করে সেঁধিয়ে যাওয়া "শালা বেঁচে আছিস না ফোটফ্রেমে দোল খাচ্ছিস" মার্কা ক্রিংক্রিংক্রিংয়ের যে আশ্বাস,
সাতপুরনো সঞ্জীব উপন্যাস সমগ্রের মধ্যে পোস্ট না করা গোপন প্রাগৈতিহাসিক পোস্টপকার্ডের যে হাড়হিম করা উঁকি, 
ছোটবেলার পড়ার ফাঁকে বাবার অফিস ফেরতা স্কুটারি ঘর্ঘর শুনতে পাওয়ার যে লজেন্স-নিমকি মার্কা উচ্ছ্বাস;

সেই সমস্ত "আরিব্বাস"য়ের টুকরো মিলেমিশে পুরী এক্সপ্রেসের সাইড আপারে টিকিট কনফার্ম হয়। অমনি পাতি মানুষের কলজের কয়েক টুকরো ফানুষ হয়ে উড়ে যায়, সে উড়ে যাওয়াগুলো প্রেমিকাদের ছাড়া কারুর চোখে পড়তে নেই।

২। 

নিজেকে কাস্টোমার সার্ভিস এক্সেকিউটিভ মনে করলেই মন্টুবাবুর যাবতীয় মনভার লাঘব হয়ে যায়। পরিবারের যে কোন থেকে সার্ভিস রিকুয়েস্ট এলেই "আপকা কল হামারে লিয়ে মহত্ত্বপপূর্ণ হ্যায়" মোডে চলে যান ভদ্রলোক। কোনও গণ্ডগোল পাকালেই মন্টুবাবুর গলায় নেমে আসে "আপ কি অসুবিধা কে লিয়ে হম সমা চাহতে হ্যায়"য়ের গন্ধরাজ লেবু মার্কা সুবাস। আর অভিমান জমলেই নিজেকে গুটিয়ে নেন তিনি, তার চারপাশে তখন "হমারে কাস্টমার সার্ভিস এক্সেকিউটিভ কিসি দুসরে কল মে ব্যস্ত হ্যায়। কৃপয়া লাইন পে বনে রহে ইয়া কুছ দের মে দোবারা কল কিজিয়ে" গোছের অদৃশ্য খোলস।

গোটা বছরের কাস্টোমার সার্ভিসিং শেষে এক তিতিবিরক্ত মন্টুবাবু প্রতি ডিসেম্বরে একবার পুরী আসেন। 

একা। এক হপ্তা থাকার জন্য টিকিট কেটে। ওই ক'দিন কাস্টোমার সার্ভিসের অফিস বন্ধ। ওই ক'দিন মন্টুবাবু শুধু নিজের জন্য বরাদ্দ রাখেন। দিনের বেলা প্রচুর হাঁটেন সমুদ্রের ধার দিয়ে, একা! বুকে আরাম জমা হয়। মন্টুবাবু বলেন ডিটক্স। সমুদ্রে স্নানটান অবশ্য করেন না, "আফটার অল বে অফ বেঙ্গল তো আর বাথরুমের চৌবাচ্চা নয়"।

বিকেলের দিকে স্বর্গদ্বারের বীচে এসে বসেন। ঢেউয়ের মত সব ট্যুরিস্ট এসে সমুদ্র ভিজিয়ে চলে যায়, মন্টুবাবু তৃপ্ত হয়ে দেখেন। আচমকা মন্টুবাবু দেখতে পান এক কাস্টোমার সার্ভিস এক্সেকিউটিভ পাজামা গুটিয়ে ঢেউয়ে লপড়ঝপড় করে চলেছে। তাঁর এক হাতে এক জোড়া সাদা নীল হাওয়াই চটি, অন্য হাতে আর এক কাস্টোমার সার্ভিস এক্সেকিউটিভের নীল শাড়ির আঁচল শক্ত করে ধরা। নীল শাড়ির কোলে খুকি কাস্টোমার এক্সেকিউটিভের খিলখিল হাসি। তিন কাস্টোমার এক্সেকিউটিভ মিলে স্বর্গদ্বার আলো করে রেখেছে। নীল শাড়ি কাস্টোমার এক্সেকিউটিভের একটানা গুনগুন; "তোমাদের দু'জনেরই সর্দির ধাত, ফেরত চলো। চলো বলছি", সাদা পাজামার "আর দশটা মিনিট। 

ঠিক এমনটাই প্রতিবার চোখে পড়ে। প্রতিবার। পুরী আসার দিন দুয়েকের মাথায়। প্রতিবার মনভার মুছে গিয়ে মনকেমন এসে পড়ে। চোখে চিকচিক, মনে চিনচিন।

"বাড়ির সবাইকে কদ্দিন দেখি না"। 
প্রতিবার সাত দিনের প্ল্যান দু'দিনের মাথায় জেনারেল টিকিটে হাওড়া ফেরায় খতম হয়।

খোকা ও বই



- খোকা, এই হল বই।
*খোকার বই হাতে নেওয়া*
- বইয়ের চেয়ে বড় বন্ধু আর দু'টি নেই।
*খোকার বইয়ে প্রথম কামড়*
- না না, কামড় নয়। বই আর বন্ধুদের কামড়াতে নেই খোকা।
*খোকার মলাট চেবানোর চেষ্টা*
- মনে রেখো। ইউ উইল বি নোন বাই দ্য কোম্পানি ইউ কীপ অ্যান্ড দ্য বুকস ইউ চিউ। থুড়ি। রীড।
*খক খক হাসিতে খোকার মাথা নাড়া আর আরও দাপুটে কামড়*
- আহ্‌। কী হচ্ছে কী। তুমি দেখছি বইয়ের অযোগ্য। যাও, হাওয়াই চটি নিয়ে খেলো গে।
*খোকার মলাট চেটে বিরক্তি-লাভ*
- খেতে ভালো লাগেনি বুঝি? শরদিন্দুতে বিশেষ স্বাদ নেই? শীর্ষেন্দু চলবে?
*দাপটের সঙ্গে আধ-চেবানো বই ছুঁড়ে মেঝেতে ফেললে খোকা*
- সর্বনাশ! সরস্বতী কে ইনসাল্ট! অঙ্কে ফেল রুখবে কে এ'বার?
*বইয়ের ওপর খোকার ডান পায়ের পাতার মচরমচ*
- মনে রেখো। তোমার ফ্যামিলি সরস্বতী বিশ্বাসী কম্যুনিস্ট।
* খোকার দ্বিতীয় পা মুখ থুবড়ে পড়া বইয়ের পিঠে*
- গোস্তাখি! ব্যাটাচ্ছেলে এই বয়স থেকে সহবতের মাথায় লাথি মারতে শিখেছে? বাপের চোখ রাঙানিকে কাঁচকলা?
* পাশের ঘরের টিভি থেকে ভেসে আসা ফুর্তি মার্কা হিন্দি গান, খোকার কোমর দুলুনি*
- আইকনোক্লাস্ট? শরদিন্দুর ঘাড়ে চেপে ব্রেকআপ সং? পিঠের চামড়া তুলে নেব!
*খোকা নাচের তালে তালে বইয়ের চামড়া তুলতে শুরু করলে*
- আই অর্ডার ইউ টু স্টপ দ্য অ্যাসল্ট! নাউ! এখুনি! তুরন্ত!
*খোকার কোমর দুলুনির গতি বৃদ্ধি, বইয়ের মলাট ততক্ষণে এস্পারওস্পার*
- তবে রে? ব্যাটাচ্ছেলে তুই বই ভালবাসবি না তোর বাপ বই ভালবাসবে! আজ তোরই একদিন কি আমারই একদিন। নেমে আয় রাস্কেল বই থেকে।
*বইয়ের ওপর থেকে বলিউডি বিট-বিদ্ধ খোকাকে জোর করে ওঠানোর চেষ্টা, খোকার তীব্র তীক্ষ্ণ প্রতিবাদ*
- খবরদার যেন আর কোনোদিন না দেখি বইকে ইনসাল্ট করতে।
*খোকার হাউমাউ চিৎকারে বাড়ির কেঁপে ওঠা, টিভির শীতল আশ্রয় ছেড়ে ঠাকুমার দাঁত কিড়মিড়িয়ে উঠে আসা*
- কী হয়েছে! তুই দাদুভাইকে ধমক দিচ্ছিস কেন? অমন ইডিয়টের মত চেল্লাছিসই বা কেন?- আরে দেখ না। ভাবছিলাম ছেলেটার মধ্যে একটু বই প্রেম কাল্টিভেট করব। - এই কালচার কালচার করে আজকাল তোর ঘাস খাওয়ার অবস্থা হয়েছে। কাজের কাজ সব বন্ধ করে শুধু বাতেলা। - মাইন্ড ইওর ল্যাঙ্গুয়েজ মা। আজকালকার প্যারেন্টিং পলিসি এ'টাই। আর খোকা কী লেভেলের বেয়াদপ হয়েছে দেখেছ? বইকে গ্রেসফুলি একসেপ্ট করার বদলে মাটিতে ফেলে তার ওপর ধেই ধেই করে নাচছে!- বইগুলো নিয়ে শেলফ বোঝাই করে তো হোয়্যাটস্যাপ ফরওয়ার্ড পড়ে দিন কাটাস। তার চেয়ে বই মেঝেতে ফেলে তার ওপর দাঁড়িয়ে নাচা বরং অনেক বেশি প্রো-কালচার।
*খেক্‌ খেক্‌ শব্দসহ খোকার বিশ্রী হাসি*

Saturday, March 3, 2018

চিঠি ও পদ্য

গত তিনদিনে এই নিয়ে বাহাত্তর নম্বর চিঠি এলো। উড়ো। এ'তেও বক্তব্য মোটামুটি একই রকম।
অবশ্য বক্তব্য না বলে হুমকি বলা ভালো।

বিয়ে না করলে সে মেয়ে নাকি আত্মহত্যা করবে। কিন্তু কী মুশকিল। সে যে নিজের নাম ঠিকানা কিছুই লেখেনি। অবশ্য তাঁর পরিচয় কিছুটা হলেও আঁচ করেছেন মনোহর। নিজে থেকে তাঁর একটা নাম দেওয়া হয়ে গেছে ভাবতে একটু লজ্জাই লাগে মনোহরের; সুলিয়া। খামে অল্প গন্ধরাজের সুবাস। আর চিঠির ভাষায় এই যে সামান্য অনুযোগ মেশানো হুমকি, তা'তে মায়া আরও তরতর করে বেড়ে চলে।

পরিচয় পেলে বিয়েটা সেরে ফেলতে খুব আপত্তি করতেন না মনোহর। সুলিয়াকে নিয়ে সে'সবই সাতপাঁচ ভাবছিলেন  তিনি। ভেবে ভেবে উপায়ন্তর না দেখে নীল ডায়েরীটা টেনে নিয়ে বাহাত্তর নম্বর পদ্যটা লিখে ফেললেন মনোহর।

আর তখনই চড়ুইপাখির ডানঝাপটানো সুরে জানালা বেয়ে তিয়াত্তর নম্বর চিঠিটা এলো।

***

- চিঠি?
- তাই তো বলে ডাক্তারবাবু।
- আপনি দেখেছেন সে চিঠি?
- চিঠি না হাতি।
- আরে! কী মুশকিল। এই যে বললেন আপনার দাদার চিঠি পাওয়া বাতিক হয়েছে?
- বাতিক না। ব্যামো। আর আদতে কিস্যু আসে না। সে জন্যেই তো আপনার কাছে আসা ডাক্তারবাবু।
- নার্ভটার্ভ ফেল করেছে নাকি?
- আশ্চর্য নয়, নতুন কবিদের অমন একটু হতেই পারে। এ'বার দু'দাগ ওষুধ দিন দেখি।

***

দুপুরবেলা গন্ধরাজ গাছটায় হেলান দিয়ে একটু ঝিমটি না দিলে টুসুর চলে না। দিন তিনেক হল; সে'খানে শুয়ে সে রোজ ঝিমঝিমে স্বপ্ন দেখছে। সে'সব স্বপ্নে বাবার পছন্দের ব্যাঙ্ক চাকুরে পাত্রটি তার পিছনে ঘুরঘুর করে না। বরং তার চোখের সামনে নতুন নতুন পদ্যরা নেচে বেড়ায়। সব পদ্যর একই বিদঘুটে শিরোনাম; "অ্যাই সুলিয়া"!

Wednesday, February 28, 2018

সৈন্যদল


- জাহাঁপনা!
- উঁ...। 
- জাহাঁপনা!
- ধ্যার। আবার কী হল? শান্তিতে একটু দেশলাই কাঠি দিয়ে কান খোঁচাব তারও উপায় নেই। থেকে থেকে জ্যাঁহ্যাঁপঁন জ্যাঁহ্যাঁপঁন। কী চাই?
- আসলে হয়েছে কী জাহাঁপনা...। 
- বুঝলে মন্ত্রী, তোমায় নিয়ে এই এক সমস্যা। ধানাইপানাই ছাড়া কোনও কথা বলতে পারবে না। ঢেঁকুরের কথা বলতে এসে আগে বলবে বাসি লুচির গল্প। ধেত্তেরি। আমি এখন ব্যস্ত। তুমি পরে এসো'খন। 
- জাহাঁপনা, ব্যাপারটা অত্যন্ত জরুরী। 
- বটে?
- আজ্ঞে। 
- জরুরী?
- রীতিমত। জাহাঁপনা। 
- আমার যে পা মালিশের তেল গরম হয়ে গেছে। আর যে সময় নেই হাতে। 
- কয়েকটা ব্যাপারে আপনার হুকুম বড় দরকারি...। 
- তোমার মাইনেটা এ'বার থেকে আমাকেই দিও। আমাকেই যখন সব সামাল দিতে হবে তখন...।
- হুকুম দিন। আমিই তবে সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে ফেলি...। 
- সিদ্ধান্ত? তুমি কি রাজা?
- আজ্ঞে না। 
- তবে তুমি সিদ্ধান্ত নেওয়ার কে? তুমি কি চক্রান্ত করছ আমার বিরুদ্ধে? ব্যাটাচ্ছেলে! দুধ কলা মদ দিয়ে আমি কালসাপ পুষছি?
- আমি ও'ভাবে বলতে চাইনি জাহাঁপনা। 
- পিঠে ছুরি ঢোকাবে তার আবার ও'ভাবে এ'ভাবে কী?
- একটু শুনুন আমার কথাটা মহারাজ! সেনাবাহিনী বড় বিপদে রয়েছে। 
- সেনাবাহিনী বিপদে? কে বলেছে?
- আজ্ঞে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পত্রবাহক এসেছে যে। 
- মহা-মুশকিল। ওদের অমুকপুর জয় করতে পাঠিয়েছি না ওখানে গিয়ে বুকে বালিশ নিয়ে চিঠি লিখতে বলেছি? অমুকপুরের সেনা আর প্রজাদের খুনটুন না করে ওরা চিঠি লিখছে কেন? আমি কি মেঘবালিকা? 
- তারা খুব বিপদে পড়েছে?
- বিপদ? কচুকাটা করার লোকের অভাব পড়েছে? অনুশীলনে ব্যাঘাত? ওদের চিন্তা করতে বারণ করো। অমুকপুরে চন্দন কাঠের জঙ্গল বগলদাবা করে তাঁদের যেতে হবে তমুকপুরে। সে'খানে রয়েছে অঢেল লোহা। আর অঢেল বোকাপাঁঠা মানুষজন যাদের কুচিকুচি না করতে পারলে শান্তি নেই। যা হোক। কথাবার্তা যখন হয়েই গেল তখন আমি যাইগে, পা মালিশ আর কানে পালকের সুড়সুড়ি। এক জাতের পাহাড়ি শকুনের পালক আনিয়েছি বুঝলে মন্ত্রী। কানে ছোঁয়ালেই.....জাদু!
- আজ্ঞে জাহাঁপনা, কথাটা বলা হয়নি। 
- আবার কোন কথা? বলে দিলাম তো। অমুকপুর ঘ্যাচাংফু করে সিধে তমুকপুর। তমুকপুর যাওয়ার আগে সেনাবাহিনীকে আমি তিন রাত ধরে মদ মাংস খাওয়াবো। তুমি আবার তখন বাঁধাকপি বাঁধাকপি করে আসর মাটি কোরো না যেন মন্ত্রী। কেমন?
- জাহাঁপনা। আমাদের সেনাবাহিনী বড় বিপদে পড়েছে। অমুকপুরের রাজধানী চন্দনপুর আমাদের হাতছাড়া হতে চলেছে যে। 
- কী? 
- তমুকপুর অমুকপুরে  সৈন্য পাঠিয়েছে। আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে। অমুকপুরের সেনাদের সঙ্গে মিলে তারা যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। তমুকপুরের সেনাদের সঙ্গে এসেছে অত্যাধুনিক কামান, বিষ মাখানো তরবারি...।
- চোপরাও! তোমায় ফর্দ করতে কে বলেছে আহাম্মক?
- গোস্তাখি মাফ জাহাঁপনা। 
- সেনার কী অবস্থা?
- তিন দিক থেকে তাঁদের ঘিরে ফেলা হয়েছে। ইতিমধ্যে আশি হাজার সেনার মধ্যে তিরিশ হাজার নিহত। অপর দিকে কয়েক লাখ সৈন্য। আমাদের রসদ শেষ...টিকে থাকার কোনও সুযোগই নেই। এ'বার আপনি হুকুম দিলে সেনাপতি সৈন্যদল নিয়ে পশ্চাদপসরণ শুরু করতে পারে। 
- পশ্চাদপসরণ?
- যুদ্ধের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ জাহাঁপনা। 
- তোমার মাথা। 
- আজ্ঞে?
- কেউ পিছু হটবে না। তোমরা শোনোনি জননী জন্মভূমিশ্চ ওই কী একটা যেন? 
- জাহাঁপনা, আমরা অন্যদের ভূমি দখল করেছি। আমাদের জন্মভূমি ঠিক ও'টা নয়। কাছেই এ'তে কোনও অসম্মান নেই। বরং এখনই রণভঙ্গ দিলে সেনাবাহিনীর কচিকাঁচা ছেলে ছোকরাগুলোকে বেঘোরে প্রাণ দিতে হবে না। 
- এই বুদ্ধি নিয়ে তুমি আমার মন্ত্রী হয়েছ? ওরে মূর্খ, অমুকপুর এখন আমার। আলবাত ও'টা এখন আমাদের দেশ। আমাদের রক্তের শেষ বিন্দু পর্যন্ত দেশের মাটি ছাড়া চলবে না। শেষ সৈন্য বেঁচে থাকতে আমি সেনাবাহিনীকে পশ্চাদপসরণ করার অনুমতি দেব না, বুঝলে? 
- কিন্তু মহারাজ এ যে তাঁদের নিশ্চিত মৃত্যু...। 
- তোমার চামড়া তুলে তা দিয়ে পাশবালিশের ওয়াড় দিলে যদি শান্তি পাই। সৈন্য মরবে না তো কি মরবে আমার বাগানের মালী? ওদের মাইনে দিয়েছি কী করতে? ওরা যুদ্ধ হেরে না মরে ফিরে এলে আমার নাক আস্ত থাকবে ভেবেছ?
- যে আজ্ঞে মহারাজ। 
- ও চিঠির উত্তর দাও। পিছু হঠার উপায় নেই। সবাইকে আমি মরণোত্তর মহাবীর উপাধি দেব। আর পিতলের শংসাপত্র। 
- যে আজ্ঞে। 
- আর শোন। 
- জাহাঁপনা?
- জল্লাদকে ডেকে আন। 
- কেন? 
- কেন? ন্যাকা! ভাজা মাছ উল্টোতে গিয়ে থালা পালটি করে ফেলেছে। তোমা শূলে বসতে হবে। 
- জাহাঁপনা! আমি কী করলাম?
- আমার পা মালিশের তেল যে ঠাণ্ডা হয়েছে তোমার জন্য। দেশের ক্ষতি করে দশের ক্ষতি করে সটকে যাবে ভেবেছ? আমি কি অতটাই বোকা?