Tuesday, January 30, 2018

রাধাবিনোদের ইচ্ছে


রাধাবিনোদবাবু একা মানুষ। অনেক চেয়েও কারুর সাতপাঁচে থাকা হয় না। কদ্দিন যে একা আছেন তার ইয়ত্তা নেই। কদ্দিন। কতদিন। এই বাড়িতে তিনি চিরকালের একা। বাড়ি বলতে দু’কামরার একরত্তি আস্তানা, তার সামনে ছোট্ট উঠোন। উঠোন কিছু গাঁদাফুল আর শাকসবজির গাছপালা। একটা কাঠবেরালির গুষ্টি সে বাগানেই আছে বটে, তবে তারা বংশানুক্রমে রাধাবিনোদকে পাত্তা দেয় না। এ’টাই ওদের ট্র্যাডিশন।

যেমন রাধাবিনোদবাবুর ট্র্যাডিশন হল একা থাকা।

অনেক ছোটবেলায় এক পিসিমা ছিলেন সঙ্গে। তবে সে পিসিমার মুখ বড় একটা মনে পড়ে না। পিসিমার স্মৃতি বলতে পিসিমার বিড়বিড়ানি। বুড়ি একটানা বিড়বিড় করে যেতেন, তাঁর থেকেই মন্ত্রটা প্রথম শিখেছিলেন রাধাবিনোদবাবু;
“ফাঁসিতে ঝোলার চেয়ে ইলেকট্রিক চেয়ারে ইজ্জত বেশি”।

রাধাবিনোদবাবুর শোওয়ার ঘরের দক্ষিণের দিকের দেওয়ালে ঝোলানো ছবি; তা’তে লেখা “ফাঁসিতে ঝোলার চেয়ে ইলেকট্রিক চেয়ারে ইজ্জত বেশি”। রাধাবিনোদবাবুর খাটের পাশে রাখা ছোট্ট বেতের টেবিল; সেই টেবিলের ওপর রাখা একটা কাচের গেলাস আর একটা বই।
খয়েরী চামড়ায় বাঁধানো বই; যার নাম হল “ফাঁসি ভালো না ইলেকট্রিক চেয়ার”? বইটা ইয়াম্মোটা। হাজার দেড়েক পাতার বই। তবে গোটা বই জুড়ে একটাই লাইন বার বার লেখা; “ফাঁসিতে ঝোলার চেয়ে ইলেকট্রিক চেয়ারে ইজ্জত বেশি”। ঘুমোতে যাওয়ার আগে এই বইয়ের খান তিরিশেক পাতা না পড়লে রাধাবিনোদবাবুর কিছুতেই ঘুম আসতে চায় না; ছোটবেলার অভ্যাস যে।

বাইরের ঘরের সোফার পাশের দেওয়ালে ঝোলানো আড়াইশো বছরের ক্যালেন্ডার। সে ক্যালেন্ডারে গাঁদা ফুলের ছবি; তার নিচে লেখা; “ফাঁসিতে ঝোলার চেয়ে ইলেকট্রিক চেয়ারে ইজ্জত বেশি”। দিনের শেষে সেই তারিখে দাগিয়ে দেওয়াটা রাধাবিনোদবাবুর আরও একটি অভ্যাস।

রাধাবিনোদবাবুর আরও একটি অভ্যাস আছে; খবরের কাগজ পড়ার। ভোর বেলা মুখ ধুয়ে কাগজ না নিয়ে বসলে তার হয় না। “দৈনিক ইলেকট্রিকচেয়ার সংবাদ”। কাগজ জুড়ে রোজই থাকে ইলেকট্রিক চেয়ারের দুনিয়ার রংবেরঙে খবরাখবর। অবশ্য ফাঁসি বিরোধী খবরাখবরও যে দু’একটা থাকে না তা নয়। এ কাগজ পড়া না হলে রাধাবিনোদবাবুর মুখে জলখাবার রোচে না।

তবে খবরের কাগজ আর একটা বই উলটে পালটে কতক্ষণ আর সময় কাটে। মাঝেমধ্যে তিনি নেমে পড়েন বাগানের পরিচর্যায়। তখন তাঁর কোমরে কষে বাঁধা থাকে গামছা, হাতে খুপরি আর মুখে লোকগীতি;
“ফাঁসিতে ঝোলার চেয়ে ও ভাই,
ইলেকট্রিক চেয়ারে ইজ্জত বেশি”।
সে গানের যেমন সুর, তেমনি মন কেমন করা গানের কথা। বুকে আরাম লাগে।  

তা, একরকম একাএকাই দিন কেটে যাচ্ছিল রাধাবিনোদবাবুর। মাঝেমধ্যে একঘেয়ে লাগে বটে, তবে কী আর করা যাবে।
এইসব কিছুর মধ্যেই একটু বেহিসাব ঘটে গেল এই সেইদিন।
হঠাৎ একদল পেয়াদা এসে হাজির। রাধাবিনোদ সেলাম ঠুকে জানতে চাইলে ব্যাপারটা কী।

পেয়াদাদের সর্দার গলায় জানালে যে রাজাবাহাদুরের শমন নিয়ে এসেছে সে।
রাজাবাহাদুরের ইচ্ছে হয়েছে রাধাবিনোদের বাড়িটা ভেঙে সেখানে একটা বিড়ির দোকান বসাবেন। রাজার আদেশ, রাধাবিনোদকে নিকেশ করে তাঁর জমি বাড়ি কব্জা করতে হবে; তারপর সে’খানে বসবে এলাহি এক বিড়ির দোকান।

তবে রাজাবাহাদুর অবুঝ পাষাণ নন। তিনি নিজে জানতে চেয়েছেন যে রাধাবিনোদবাবুর ফাঁসিতে ঝুলতে বেশি ভালো লাগবে না ইলেকট্রিক চেয়ারে বসতে। আনন্দে চোখে জল এসেছিল রাধাবিনোদের। একটু খটকা ছিল অবশ্য মনে, তাই তিনি একবার মুখ ফসকে জিজ্ঞেস করে ফেলেছিলেন;
“পেয়াদা ভাই, তুমি বলছ বটে আমার কান্নাটা আনন্দের। তবু বুকের ভিতর থেকে দুঃখ দুঃখ মার্কা পোড়া গন্ধ আসছে কেন”?
“পোড়া গন্ধ? পাগল হলে নাকি রাধাবিনোদ। খোশবু বলো। রাজা তোমার পছন্দ অপছন্দ জানতে চেয়েছেন। এমন নসীব ক’জনের হয় বলতে পারো? তাই তোমার বুকে আনন্দের ঢেউ। এই খোশবু আনন্দের। আর তোমার চোখের জলও, আনন্দের চোটে বইছে”।
অমনি সমস্ত ধন্দ কেটে গেছিল রাধাবিনোদের মন থেক। সে গুনগুন করে গেয়ে উঠেছিল;
 “ফাঁসিতে ঝোলার চেয়ে ও ভাই,
ইলেকট্রিক চেয়ারে ইজ্জত বেশি”।
সুরে মোহিত হয়ে পেয়াদা সর্দার বলেছিলেন; “আহা, তোমার গলায় কী অপূর্ব সুর ভায়া রাধাবিনোদ। আরও গাও দেখি খানিকক্ষণ”।

পরের দিন “দৈনিক ইলেকট্রিক চেয়ার সংবাদ”য়ের প্রথম পাতার অর্ধেকটা জুড়ে ছিল রাধাবিনোদের হাসি হাসি ছবি। শিরোনাম; “রাজ্যের স্বার্থে স্বেচ্ছায় ইলেকট্রিক চেয়ার বরণ করলেন মানবশ্রেষ্ঠ রাধাবিনোদ”।   






  

Friday, January 26, 2018

বইমেলাফিকেশন

(পুরনো লেখা)


- দাদা রে, কাল যাবি?


- কোথায়?


- যেখানে যাওয়া উচিৎ। অবিলম্বে। চটপট। তুরন্ত।


- রান্নাঘর? পায়েসের ট্রায়াল মা অ্যালাউ করা শুরু করেছে? 


- উফ। না রে। 


- তা'হলে? অমন মনোহারিণী সুবাসে ঘর ভরে গেছে। তোর ব্রেন পায়েস ছাড়া অন্য কোনও ইনফর্মেশন প্রসেস করতে পারছে রে? 


- দাদা। খাইখাই একটু বাদ দে।  


- তুই ডেঁপোমিটা বন্ধ কর।


- আমার সঙ্গে যাবি কিনা বল।


- কোথায়? শুনি।


- বইমেলা। কাল। প্লীজ।


- কাল টিট্যুয়েন্টি আছে।


- বইমেলা বলে কথা। চ'না, তুই না গেলে আমার যাওয়া হবে না।


- বই? বাড়ির তাকে, বাবার আলমারিতে, তোর স্কুলের আর আমার কলেজের লাইব্রেরীতে, বন্ধুদের শেল্ফে, ফ্লীপকার্টে; চারিদিকে একগাদা বই পড়ে আছে তো। অবশ্য ধুলোবালি আর ভিড়ের ঠ্যালাঠেলি যদি তোর সাইডডিশ হিসেবে দরকারি মনে হয়, তাহলে সেটা আলাদা কথা।


- তুই যাবি না?


- বললাম তো। টিটুয়েন্টি।


- মামা আমায় দু'হাজার টাকা দিয়েছে।


- মামা? তোকে দু'হাজার? আর আমি এক প্যাকেট হজমিগুলি চাওয়ায় গাঁট্টা মারলে?


- তুই তো আর মাধ্যমিকে আমার মত রেজাল্ট করিসনি।


- তুই বড্ড এলিটিস্ট হয়ে যাচ্ছিস। কথায় কথায় অমন বাতেলা ভালো নয়। যাক গে, দুহাজার নিয়ে কী বলছিলিস?


- বলছিলাম তোমায় বইমেলা থেকে ফেরার পথে রোল না হয় আমি খাওয়াবো।


- অত ইজি না চাঁদু। এক আমার এক তোর।


- মামা আমায় ভালোবেসে টাকাটা দিয়েছেন।


- কংসকেই বল তাহলে,তোকে বইমেলা ঘুরিয়ে আনবে।


- বেশ, এক হাজার তোর। কিনিস বই।


- সরি। বইমেলায় আমি বই কিনি না। আমার ফ্লিপকার্ট আর কিন্ডল বেঁচে থাক।


- তবে?


- সোল অফ বইমেলা কী? জানিস তো?


- বই অফ কোর্স।


- কচুপোড়া।


- নয়তো কী?


- বইমেলার প্রাণ ভোমরা রয়েছে বেগুনী আর বেনফিশে। বেশক্। বেফিকর। 


- বেশ। তুই কাল আমার সঙ্গে গেলে আমার ফান্ডের পঞ্চাশ পার্সেন্ট বেগুনিতে আর বেনফিশে। এবার কাটাতে পারবি টিট্যুয়েন্টির মায়া?


- টিট্যুয়েন্টি আবার ক্রিকেট নাকি? টেস্ট ম্যাচ হলে বইমেলা ক্যানসেল করার কথা ভাবতাম। কাল তাহলে দুপুর দুপুর বেরিয়ে পড়ব, কেমন?


দেশের দশের

দেশের জন্য দশের জন্য মাঝেমধ্যে ভাবতে ভালো লাগে।

মন কেমন হয়ে যায়।

বুকের মধ্যে 'বলো বলো বলো সবে'র সুবাস বয়ে যায়। একটা কিছু পাল্টে ফেলার তাগিদ টের পাই। মনে পড়ে যায় স্বামীজীর কথাগুলো। ভার্বাটিম মনে পড়ছে না তাই কোট করছি না।
বা সুভাষবাবুর সেই ইস্পাত বাণী। ভার্বাটিম মনে পড়ছে না তাই কোট করছি না।
অজান্তেই মুঠো শক্ত হয়ে আসে, সোফার হেলান কেটে যায়।

জানালার বাইরের আকাশের দিকে চেয়ে মনভার খানিকটা লাঘব হয়। আহা এমন উজ্জ্বল আসমানি রঙ কী অবলীলায় একই সঙ্গে মনভালো আর মনখারাপ মিশিয়ে দেয়।

হোক এ দেশ মিডিওক্রিটিতে ভরা।
নাচুক এ দেশ রিগ্রেসিভ হনুমানেদের লেজের তালে।
কোরাপশনের ডকে উঠুক।
তবু। আমার দেশ তো।
অরবিন্দই তো বলেই গেছিলেন সে কথা..ভার্বাটিম মনে পড়ছে না তাই পুরো কোট করছি না।

দেশ। মা। চোখের পাতা তিরতির করে কাঁপতে থাকে। মা। দেশ।

সুর আপনা থেকেই গলা বেয়ে জিভের ওপর দিয়ে গড়িয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। তাতে মিশে থাকে সামান্য অদৃশ্য মা মা ডাকের মিহিকান্না;
"তোমার ভয় নেই মা আমরা প্রতিবাদ করতে জানি...."।

সমস্ত কালিমাটালিমা যে আমাদেরই মুছতে হবে। আমাকেই মুছতে হবে। গানের ধাপে ধাপে হাতের মুঠো শক্ত হয়, সোফা-কুশন খামচে ধরি।

"মা গো, ভাবনা কেন"।

ঠিক তখুনি বিশ্রী চিৎকার ভেসে আসে;

"দিনের বেলাতেও লাটসাহেবের বাথরুমের আলো জ্বালা চাই।  অথচ বাথরুম থেকে বেরোনোর সময় বাতি বন্ধ করার প্রয়োজন নেই, তাই না? আর কল ভালো করে বন্ধ করলে কি ঠাকুর পাপ দেয় না পাঁজিতে বারণ"?

মায়ের গজরগজর।

মুঠো আলগা হয়ে আসে।
মাথার ভিতরের প্যাট্রিওটিক টিউনগুলো তালগোল পাকিয়ে যায়।
জননী জন্মভূমিশ্চ (পুরো মনে পড়ছে না তাই কোট করছি না) না ছাই। দেশের কথা দশের কথা ভাবার সময় যত বাথরুমের আলো নেভানো আর কলবন্ধের ফরমায়েশ।

ডিসগাস্টিং।

Wednesday, January 24, 2018

রুথলেস

সে'খানে বেশ শীত।

রাতের ট্রেনের জানালা খোলা রাখা দায়।
সোয়েটারের ওপর একটা চাদর জড়াতে পারলে ভালো হয় যেন। কালচে সবুজ রঙের মাফলারটুকু আছে তাই বাঁচোয়া। চা, ঝালমুড়ি, কাগজ, প্যাকেটখোলা বাদাম, ট্রেনের ধুলো আর মানুষ; সব মিলে একটা গন্ধ তৈরি হয়। সে গন্ধের ভালো মন্দ নেই, শুধু থাকা আছে; নাক বুক জুড়ে।

মাঝে মধ্যে জানালার কাচ তুলে একটু বাতাস নাকে নেয় বিনু। কনকনে হাওয়া, তবু। আরাম লাগে। মুখে ট্রেনে ফুঁড়ে আসা হাওয়ার ঝাপটা লাগলেই বিনুর বাড়ি ফেরার কথা মনে পড়ে।

হস্টেল ফেরতা। বাড়ির স্টেশন আসার মিনিট দশেক আগে থেকেই কাঁসার থালায় বেড়ে দেওয়া গরম ভাতের ওম টের পেত বিনু।
বাড়ি ঢোকার মুখে অঙ্ক স্যার আনন্দবাবুর বাড়ি, সে বাড়ির সামনে চোখ জুড়োনো বাগান। আনন্দবাবু দুঃখ করে বলতেন "টপ ক্লাস মালি হতে চেয়েছিলাম রে, অ্যাকাডেমিক ব্রিলিয়ান্স এসেই সব গোলমাল করে দিল"। শীতের রাতে আনন্দবাবুর বাড়ির পাশ দিয়ে হাঁটলেই ঠাণ্ডা বাতাস আর আনন্দবাবুর বাগানের মিঠে গন্ধে বুকের ভিতর চনমন করে উঠত।

ট্রেনের জানালা বেয়ে আসা হাওয়ার ঝাপটা যে কী ভালো। আর কী "রুথলেস"।

রুথলেস শব্দটা দাদা খুব বলত।
আর বিনু বরাবর দাদার মত হতেই চাইত।
দাদার মত টপাটপ কবিতা কোট করতে চাইত।
দাদার মত অফস্পিন প্র‍্যাক্টিস করত।
দাদার মত দুপুরবেলা বালিশ বুকে গল্পের বই পড়ত।
দাদার মত ভালো ইংরেজি বলতে চাইত, ওর মত নিঁখুত বাংলা লিখতে চাইত।

আনন্দবাবুর মেয়েকে বাবা মেনে নেননি ওরা ব্রাহ্মণ নন বলে।
বাবাকে দাদা রুথলেস বলত।
দাদাও বাবাকে মেনে নেয়নি।
বিনুর বড় ইচ্ছে হয় দাদাকে রুথলেস বলতে।

বিনু এখনও মাঝেমধ্যেই বাড়িতে যায়। সেই কাঁসার থালায় গরম ভাত বেড়ে দেয় একজন হাড়হিম করা ভূত যে একটা প্রাণের নির্মম বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছে। ভূতকে মা বলে ডাকতে বিনুর বড় কষ্ট হয়।

বাড়িটা এখনও আছে।
বিনুর আর বাড়ি ফেরা নেই।

রাতের মত ভালো

বালিশের ওয়াড় হবে আবছা গোলাপি, তা'তে লাল সুতোর ডিজাইন।
ধবধবে সাদা বিছানার চাদর।
গায়ে দেওয়ার সাদা কালো চেক ভাগলপুরী চাদর।
বাটিক প্রিন্টের ওয়াড় দেওয়া পুষ্ট পাশবালিশ।
খাটের মাথার কাছে টেবিল। সেই টেবিলে কাঁচের গেলাস ভরা জল, কাঠের কোস্টারে ঢাকা। পাশে পুরনো কাচের স্কোয়্যাশ বোতলে জল।
জলের বোতলের পাশে এক শিশি মিষ্টি আমলকি।
আর বালিশের পাশে পকেট রেডিওতে নজরুল। 

আর বুকের ওপর সঞ্জীব।
মাথার ভিতর সদ্য পড়া 'রাবণবধ'।
হাতের নাগালে বেডস্যুইচ।