Wednesday, January 24, 2018

রুথলেস

সে'খানে বেশ শীত।

রাতের ট্রেনের জানালা খোলা রাখা দায়।
সোয়েটারের ওপর একটা চাদর জড়াতে পারলে ভালো হয় যেন। কালচে সবুজ রঙের মাফলারটুকু আছে তাই বাঁচোয়া। চা, ঝালমুড়ি, কাগজ, প্যাকেটখোলা বাদাম, ট্রেনের ধুলো আর মানুষ; সব মিলে একটা গন্ধ তৈরি হয়। সে গন্ধের ভালো মন্দ নেই, শুধু থাকা আছে; নাক বুক জুড়ে।

মাঝে মধ্যে জানালার কাচ তুলে একটু বাতাস নাকে নেয় বিনু। কনকনে হাওয়া, তবু। আরাম লাগে। মুখে ট্রেনে ফুঁড়ে আসা হাওয়ার ঝাপটা লাগলেই বিনুর বাড়ি ফেরার কথা মনে পড়ে।

হস্টেল ফেরতা। বাড়ির স্টেশন আসার মিনিট দশেক আগে থেকেই কাঁসার থালায় বেড়ে দেওয়া গরম ভাতের ওম টের পেত বিনু।
বাড়ি ঢোকার মুখে অঙ্ক স্যার আনন্দবাবুর বাড়ি, সে বাড়ির সামনে চোখ জুড়োনো বাগান। আনন্দবাবু দুঃখ করে বলতেন "টপ ক্লাস মালি হতে চেয়েছিলাম রে, অ্যাকাডেমিক ব্রিলিয়ান্স এসেই সব গোলমাল করে দিল"। শীতের রাতে আনন্দবাবুর বাড়ির পাশ দিয়ে হাঁটলেই ঠাণ্ডা বাতাস আর আনন্দবাবুর বাগানের মিঠে গন্ধে বুকের ভিতর চনমন করে উঠত।

ট্রেনের জানালা বেয়ে আসা হাওয়ার ঝাপটা যে কী ভালো। আর কী "রুথলেস"।

রুথলেস শব্দটা দাদা খুব বলত।
আর বিনু বরাবর দাদার মত হতেই চাইত।
দাদার মত টপাটপ কবিতা কোট করতে চাইত।
দাদার মত অফস্পিন প্র‍্যাক্টিস করত।
দাদার মত দুপুরবেলা বালিশ বুকে গল্পের বই পড়ত।
দাদার মত ভালো ইংরেজি বলতে চাইত, ওর মত নিঁখুত বাংলা লিখতে চাইত।

আনন্দবাবুর মেয়েকে বাবা মেনে নেননি ওরা ব্রাহ্মণ নন বলে।
বাবাকে দাদা রুথলেস বলত।
দাদাও বাবাকে মেনে নেয়নি।
বিনুর বড় ইচ্ছে হয় দাদাকে রুথলেস বলতে।

বিনু এখনও মাঝেমধ্যেই বাড়িতে যায়। সেই কাঁসার থালায় গরম ভাত বেড়ে দেয় একজন হাড়হিম করা ভূত যে একটা প্রাণের নির্মম বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছে। ভূতকে মা বলে ডাকতে বিনুর বড় কষ্ট হয়।

বাড়িটা এখনও আছে।
বিনুর আর বাড়ি ফেরা নেই।

রাতের মত ভালো

বালিশের ওয়াড় হবে আবছা গোলাপি, তা'তে লাল সুতোর ডিজাইন।
ধবধবে সাদা বিছানার চাদর।
গায়ে দেওয়ার সাদা কালো চেক ভাগলপুরী চাদর।
বাটিক প্রিন্টের ওয়াড় দেওয়া পুষ্ট পাশবালিশ।
খাটের মাথার কাছে টেবিল। সেই টেবিলে কাঁচের গেলাস ভরা জল, কাঠের কোস্টারে ঢাকা। পাশে পুরনো কাচের স্কোয়্যাশ বোতলে জল।
জলের বোতলের পাশে এক শিশি মিষ্টি আমলকি।
আর বালিশের পাশে পকেট রেডিওতে নজরুল। 

আর বুকের ওপর সঞ্জীব।
মাথার ভিতর সদ্য পড়া 'রাবণবধ'।
হাতের নাগালে বেডস্যুইচ।

ডার্ক

- দশটা সাবজেক্টের মধ্যে সাতটায় ফেল করেছি। বাবা পিঠের চামড়া গুটিয়ে মাদুরে মলাট দেবে রে ভাই।

- সর্বনাশ। আর তোর বাবার যা মেজাজ!

- গতকাল মেজদা র'য়ে ড়'য়ে গুলিয়েছিল বলে বাবা বারো খানা গাঁট্টা কষালে। এই রেজাল্ট দেখলে আমার নামে মামলা না ঠুকে দেয়। কী যে বলব বাবাকে...।

- একটা যুক্তি দিতে পারিস, আজকাল পাবলিকে সে'টা খাচ্ছে বেশ।

- বলছিস?

- আলবাত।

- কী যুক্তি?

- রেজাল্ট দেখিয়ে গম্ভীর মুখে বল 'ডার্ক হিউমর'। কাকু তোকে আনন্দের চোটে কাফকাটাফকার বই কিনেটিনে দিতে পারেন।

আপ বঙ্গালী হ্যায়?

- আপ বঙ্গালী হ্যায়?

- কেয়সে পতা চলা? ওয়েট, লেট মি গেস...।

- হাঁ কিজিয়ে গেস।

- বিকজ আই ওয়াজ টকিং আবাউট মিস্টার ঘটকস মুভি মেকিং স্টাইল?

- ঘাটাক সাহাব তো ইন্টারন্যাশনাল ফিগার হ্যায়।

- ও। বিকজ আই আস্কড ফর ফিশ?

- না না, ফিশ ভি আজকল কাফি কসমোপলিটান হ্যায়।

- ফির? ক্যাইসে পতা চলা যে ম্যায় বাঙালি?

- ইহা পে সব লোগ শেয়ার মার্কেট ক্র‍্যাশ লেকে পরেশান হ্যায়। লেকিন উধর আপকে অপোজিট সাইডকে ওয়াল পে যো অগলা সাল কা ক্যালেন্ডার হ্যায়, আপ উয়ো ক্যালেন্ডারকে বারা মহিনে মে সিরফ অক্টোবর কা ডেটস ঘুর রহে থে। অউর হস রহে থে।

- ওহ, না মানে আসলে....ওই কী বলে যেন; শেয়ারফেয়ার তো হাতের ময়লা হ্যায়। কৃষ্ণ আগর বেঙ্গলি হোতা তো উয়ো কেয়া বোলতা পতা হ্যায়? কর্মটর্ম তো হোতা রহেগা, আগে পুজোর প্ল্যানফ্ল্যান লেকে  ডিসেম্বর সে চিন্তাভাবনা শুর কর দেনে কা।

Monday, January 22, 2018

সিলভার লাইনিং


- এই যে মিস্টার প্ল্যাটিরিঙ্কোস! ডেটা তৈরি? 
- ইয়েস ম্যাডাম। স্প্রেডশিট আর সামারি তৈরি।
- শুনি। হাইলাইটস।
- আপনার পায়ের কাছে এ বছর যা যা বই ডিপোজিট হয়েছে সে'টা অ্যানালিসিস করে একটা ব্যাপার স্পষ্ট। ট্রেন্ড এ বছরেও পাল্টায়নি। বাহান্ন শতাংশ বই অঙ্কের।
- ধুস। অঙ্ক ভুল ভাবে শিখিয়ে শিখিয়ে আমরা একের পর এক ভিতু জেনারেশন তৈরি করছি। এ আর পাল্টানোর নয়। 
- স্পেশ্যাল ট্রিভিয়া ম্যাডাম। জমা পড়া অঙ্কের বইয়ের মধ্যে বত্রিশ শতাংশ বই হচ্ছে গাইড বই আর সাজেশনের খাতা। যা কিনা গত বছরের তুলনায় সাড়ে ছয় শতাংশ বেশি। 
- এর মানে খবরের কাগজে জ্যোতিষ আর তুকতাকের বিজ্ঞাপন বেড়েছে, তাই না মিস্টার প্ল্যাটিরিঙ্কোস? 
- ইনক্রেডিবল। জ্যোতিষ চর্চার বিজ্ঞাপন ঠিক সাড়ে ছয় শতাংশ বেড়েছে। ইয়ার অন ইয়ার।
- কনেকশনটা স্পষ্ট ভাই প্ল্যাটিরিঙ্কোস। এত হিন্ট দেওয়ার চেষ্টা করি। সব জলে। সবাই কুল খাওয়ার ডুজ অ্যান্ড ডোন্টস নিয়ে পড়ে আছে। নাহ্, এ'সব ডেটা নিয়ে পড়ে থেকে লাভ নেই। ও স্প্রেডশিট আমার ডেস্কটপে এক কপি সেভ করে দিও। খামোখা প্রিন্টট্রিন্ট নিয়ে ফাইল মোটা করতে যেও না। সিলিভার লাইনিং কিস্যু নেই কোথাও।
- ইয়ে।
- কী ইয়ে?
- একটা মাইনর অ্যানোমালি আছে ম্যাডাম। 
- মাইনর? কী?
- না মানে, এ'টা সিলভার লাইনিং কিনা জানিনা। আপনার পায়ের কাছে জমা পড়া সমস্ত কেতাব দস্তাবেজের মধ্যে খান তিরিশেক ইয়ে...পাওয়া গেছে।
- আবার ইয়ে?
- কয়েকটা মেনুকার্ড। তিনটে আরাসালান, পাঁচটা সিরাজ, দু'টো আমিনিয়া এট সেটেরা...। আর কয়েকটা ট্র‍্যাভেল ব্রশার...কুণ্ডু ট্র‍্যাভেলস টাইপের। ব্যাপারটা কী ভাবে যে ইন্টারপ্রেট করব ম্যাডাম...!
- ফাদার অফ সিলভার লাইনিং মিস্টার প্ল্যাটিরিঙ্কোস! আশা আছে, ডেফিনিটলি আছে।