Friday, January 19, 2018

বিভূতি

বিভূতি এক্সপ্রেসের জেনারেল কামরায় কী প্রচণ্ড ভিড়। প্রতিদিনই থাকে, কিন্তু আজ যেন অস্বাভাবিক রকম বেশি। এক দাড়িয়াল ভদ্রলোকের নির্মম থুতনি কাঁধে বিশ্রি ভাবে ঠুসে পড়ছিল বারবার। ভদ্রলোকের অবশ্য কিছু করার নেই, আমার কাঁধ বেয়ে মাঝেমধ্যে উঠে না এলে অক্সিজেনের সাপ্লাইয়ে টান পড়তে পারে। পায়ের ওপর পা আর পায়ের পাতার টনটন মাথা পেতে নেওয়াটাই যুক্তিযুক্ত। আমার জুতোর তলে খান তিনেক পায়ের পাতা থাকলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই, আবার জুতোর ওপরে খান দুই ওজনদার পা।

এক চা-ওলা বদ সাহসে ভর দিয়ে ট্রেনে উঠেছিল, এখন ভিড়ে জব্দ হয়ে অপেক্ষা করছে কেটলি উঁচিয়ে, বর্ধমান এলেই নেমে হাঁপ ছাড়বে। এই ভিড়ে চায়ের কাপ সামলানো দূরের কথা, সল্টেড বাদামের প্যাকেট ছেঁড়াও অসম্ভব।

আর এই ভিড় বাঁচিয়ে বাঙ্কে এক বাপ তার বছর দুই বয়সের খোকাকে নিয়ে গ্যাঁট হয়ে বসেছে। বসেছে বটে, তবে খোকার ধড়ফড়ানিতে সোয়াস্তিতে বসার যো নেই। খোকার কথা স্পষ্ট ফোটেনি, কিন্তু মুখে হিজিবিজির ফুলঝুরি। তবে বাপের মুখে অবিরাম হ্যা-হ্যা ভাব সেঁটে আছে, খোকার শত ঘ্যানঘ্যানেও সে হাসি পরাস্ত হওয়ার নয়। খানিক পর বাপ একটা সবুজ প্লাস্টিকের টিফিন বাক্স খুলে রুটি সবজি বের করে খোকাকে খাওয়াতে শুরু করলে, সঙ্গে আগডুম বাগডুম গল্প। খোকা রুটি খায় কম, গল্প গেলে বেশি।

দেহাতি ভাষায় সে বাঘভল্লুকের গল্প বেশ জমে উঠেছিল। মিনিট তিনেক গল্প শুনলে খোকা এক গেরাস মুখে নেয়। বাপের মুখ থেকে হ্যা-হ্যা'র দাপট এক ইঞ্চিও এ'দিক ও'দিক হয় না। ভিড়ের চাপা গমগম ছাপিয়ে কার মোবাইল স্পীকারে তখন কিশোরকুমারের গান বাজছিল; "এক বার ইয়ু মিলি, মাসুম সি কলি..."।

টের পেলাম ভদ্রলোক নিজের বাপসুলভ হ্যা-হ্যা দিয়ে নিজের চোখের মা-মা ভাব ঢেকে রেখেছে। এ'দিকে পায়ের টনটন বেশ কমে আসছে। ইচ্ছে করছে গন্তব্যে না নেমে আরও দু'চার স্টেশন যাই বাপ-ছেলের সঙ্গে। খোকা ঘুমোনোর সময় বাপে গান গাইবে না?

Monday, January 15, 2018

বসত করে কয়'জনা


ব্যালকনিতে কনকনে হাওয়া। গায়ে মাথায় শাল জড়িয়েও ঠকঠক করে কাঁপতে হচ্ছে। মনোহরবাবু সিগারেট ধরিয়ে মোড়াটা টেনে বসলেন। তবে দু'টানের মাথাতেই টের পেলেন যে এই ঠাণ্ডায় বসে থাকা যাবে  না। বাধ্য হয়ে উঠতে হল।


ঘুম না এলে বিছানায় এ পাশ ও পাশ করাটা বেশ অস্বস্তিকর। তাছাড়া বিধাতা ব্যালকনি সৃষ্টিই করেছেন নির্ঘুম রাত্রিগুলোর জন্য। বালিশের পাশে রাখা গোল্ডফ্লেকের প্যাকেট আর দেশলাই পকেটে নিয়ে উঠলেন মনোহরবাবু। বারান্দায় যাওয়ার আগে গায়ে শালটা ভালোভাবে পেঁচিয়ে নিতে হল, এ'বছর ঠাণ্ডাটা মোক্ষম পড়েছে।


শোওয়ার ঘরের উত্তরে ব্যালকনির দরজা। সে'খানেই মুখোমুখি ধাক্কা। কী মুশকিল। ঘরে একা থেকেও ঝামেলার শেষ নেই। মাঝেমধ্যেই ঝুটঝামেলা। এই যেমন এই মাত্র বারান্দা থেকে উঠে আসা মনোহরবাবুর সঙ্গে শোওয়ার ঘর থেকে ব্যালকনির দিকে যেতে চাওয়া মনোহরবাবুর মুখোমুখি ধাক্কা। ব্যালকনি মুখো মনোহরবাবু গজরগজর করতে করতে ব্যালকনির মোড়ায় এসে বসলেন।


ব্যালকনি ফেরতা মনোহরবাবু তিতিবিরক্ত মেজাজে বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেলেন। ঘুম না আসার সমস্যা অতি বিশ্রী। বাথরুমের সামনে গিয়ে তিনি দেখলেন বাথরুমের দরজা বন্ধ, ভিতরে আলো জ্বলছে। আর বাইরে একজন ইতিমধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। মেজাজ সপ্তমে চড়ে গেল মনোহরবাবুর, তিনি বলেই ফেললেন "এত রাত্রেও বাথরুমের সামনে লাইন, পাবলিক ইউরিনালের মত অবস্থা হল দেখছি"।


বাথরুমের দরজা বন্ধ, ভিতরে বলাই বাহুল্য কেউ আছে। মনোহরবাবু বাথরুমের দরজায় দু'বার নক্ করে বাইরে দাঁড়িয়েছিলেন। এমন সময় পিছন দিক থেকে আওয়াজ এলো "এত রাত্রেও বাথরুমের সামনে লাইন, পাবলিক ইউরিনালের মত অবস্থা হল দেখছি"।


মনোহরবাবুর রাতের ঘুম না আসার সমস্যাটা নতুন নয়। আর বাথরুমের দিকেও মাঝেমধ্যেই ছুটতে হয়। কিন্তু তাতেও কি সোয়াস্তি আছে? বাথরুমে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই দরজায় টোকা আর বাইরে থেকে আওয়াজ। অসহ্য।

Saturday, January 13, 2018

প্যারামাউন্ট

ক্লাস ইলেভেনে ওঠার পর বুঝলাম পৃথিবীটা চটপট পালটে না ফেললেই নয়। বাবার দাড়ি কামানোর ক্ষুরটা মাঝেমধ্যেই হাতছানি দিয়ে ডাকতে শুরু করল। খবরের কাগজ ঘেঁটে 'পলিটিকাল ওপিনিওন' খুঁজে বের করে থুতনি চুলকোনোর আলগা মজা সবে টের পেতে শুরু করেছিলাম। টিউশন ফেরতা রাস্তায় মোটরসাইকেলের হুশ শুনলেই নিজের হিরো সাইকেলটার প্রতি খুনে অবজ্ঞায় মন ভার হয়ে আসত। নিজের ফুসফুসে ক্রমাগত পাতি অক্সিজেন চার্জ করছি ভাবলেই নিকোটিনিক-আত্মগ্লানিতে বালিশের ওয়াড় চিবিয়ে ফেলছি তখন। প্রেমটা দরকারি মনে হচ্ছে অথচ স্পষ্ট বুঝতে পারছি "প্রেমফ্রেম আবার কী" গোছের আঙুরফল বাক্য ছাড়া নিজের আত্মবিশ্বাসের অভাব ঢাকা অসম্ভব।

ঠিক সেই সময়। সেই টানাপোড়েনের সময়। সেই টিউশন-সন্ন্যাসের বিকেলগুলোয়; আমাদের জীবনে বোধিবৃক্ষের ছায়া নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছিল পাড়ার নতুন পেস্ট্রি-প্যাটিসের দোকান - প্যারামাউন্ট। সেই সময় মফস্বলে অমন বাতানুকূল কেক-প্যাটির দোকান বড় একটা ছিল না। আর সে দোকানে কেক-প্যাটিস-কোল্ডড্রিঙ্কসের বাইরে ছিল এক দেওয়াল ভর্তি গ্রিটিংস কার্ড! সেই সব গ্রিটিংস কার্ডের বেশিরভাগের গায়ে অসংখ্য দগদগে হার্টসাইন; সেকেলে মফঃস্বলি ভাষায় আমরা হুহু বুকে বলতাম 'দিল চিহ্ন'। তা বাদেও হরেকরকম ইমোশনাল সুড়ুসুড়ি দেওয়া গ্রিটিংস কার্ড। আমরা যারা গ্রিটিংস কার্ডের দুনিয়ায় ব্রাত্য ছিলাম, তারা মনের দুঃখে প্যাটিস খেতাম আর গ্রিটিংকার্ডিস্টদের "ন্যাকা" বলে গায়ের ঝাল মেটাতাম।

যা হোক। প্যারামাউন্টের প্যাটিস প্রসঙ্গে আসি। ভেজ, চিকেন আর মাটন। তিন রকমের প্যাটিস পাওয়া যেত। কৈশোরের ভুঁড়িহীনতার মতই প্যারামাউন্টে মাটন প্যাটিস এখন আর পাওয়া যায় না। কিন্তু তখন যেত। বলাই বাহুল্য; ভেজ প্যাটিস খাওয়া বারণ ছিল।

আর সে চিকেন মাটন প্যাটিসের যে কী বুক এস্পারওস্পার করা স্বাদ। হাজারটা প্রেম মরলে তবে অমন স্বাদের জন্ম হতে পারে। টাটকা, মুচমুচে মোড়কে মাটন বা চিকেনের পরিমিত মণ্ড। বাল্বের আলোর ওমে উষ্ণ সে প্যাটিস ছুরি হয়ে মনের মাখনে এসে বসত। গ্রিটিংস কার্ডগুলোকে মনে হত জুপিটারের চাঁদ; অদরকারী।  আমাদের পূর্ণিমা বলতে প্যাটিসে কামড়। মেন ওয়াকড ইনটু দ্য বার, উই হ্যাড প্যারামাউন্ট টু ওয়াক ইনটু।

তবু। মাঝেমধ্যে দীর্ঘশ্বাস উঁকি দিত। এক শীতের সন্ধ্যের গরম মাটন প্যাটিসের দ্বিতীয় পেগে কামড় বসাতে বসাতে আমার ক্লাসমেট সঞ্জুর চোখ আটকে গেছিল আসমানি রঙের একটা গ্রিটিংস কার্ডে, সে কার্ডের সামনে নাম না জানা লাল পাখির স্কেচ। হ্যাপি বার্থডে লেখা কার্ড।

"কার্ডটা বড় ভালো রে", সঞ্জুর গলায় অ-প্যাটিসিও গাম্ভীর্য এসে পড়েছিল, "নীল রঙটা বড় প্লেজ্যান্ট। সুদিং। মন কেমন করা। সেকশন বি'র মুনমুনের মত। মুনমুনের জন্মদিন পরশু। এই কার্ডটা যেন ওর জন্যই তৈরি। শুধু ওর জন্য। কিন্তু আমি মুনমুনকে কার্ড দেব? আমি? মুনমুন জোড়া চাঁদ হলে আমি দু'মাথা ময়লা ইয়ারবাড। মুনমুন কবিতা হলে আমি বিড়ির প্যাকেট মোড়া হলুদ ছাপা কাগজ। মুনমুন অস্ট্রেলিয়ার ডন ব্র‍্যাডম্যান হলে আমি তুলসী চক্রবর্তীর ডন বৈঠক।  আমি দেব মুনমুনকে কার্ড? ছোহ্"।
সঞ্জুর দুঃখে সে'দিন বাড়তি এক জোড়া প্যাটিস খেয়ে তবে বেরিয়েছিলাম।

সে ঘটনার দেড় মাসের মাথায় সঞ্জুর সঙ্গে ফের গেছিলাম প্যারামাউন্টে জোড়া মাটন প্যাটিস খেতে। সঞ্জুই খাইয়েছিল। খাওয়ানোর কারণটা জেনেছিলাম দু'নম্বর প্যাটিসে কামড় বসিয়ে। সঞ্জুর জন্মদিন ছিল তিন দিন পর। সে'দিন সকালেই ক্লাসের ফাঁকে নাকি কবিতা/চাঁদের পক্ষ থেকে বিড়ির প্যাকেট/ইয়ারবাডের নামে গোপন আগাম-শুভেচ্ছাবার্তা এসেছিল। আসমানি নীল রঙের কার্ডে, যার সামনে অচেনা লাল পাখির স্কেচ।

"প্যারামাউন্টের গ্রিটিংস কার্ড আমার স্কুল ব্যাগে রে। আমার নামে লেখা কার্ড। সেই কার্ড। লাল খামে। আমার মত অঙ্কে বাইশ পাইয়ের ব্যাগে। মুনমুনের লেখা কার্ড। আমার ব্যাগে। অ্যাচিভমেন্ট আনলকড। আমি ফ্যান্টমের আংটি, তুই ভাঙা টুথপিক। আমি বিলির বুট, তুই অনিমেষ স্যারের নস্যি মাখানো রুমাল। আর একটা প্যাটিস খাবি ভাই"?

সেই প্রথম প্যারামাউন্টের মটন প্যাটিস তেতো মনে হয়েছিল। গলা বুক জ্বালা শুরু হয়েছিল। সঞ্জুকে "ন্যাকামির ডিপো" বলে গাল পেড়ে, আধখাওয়া প্যাটিস ঠোঙায় পুরে সুট্ করে বেরিয়ে এসেছিলাম প্যারামাউন্ট থেকে।

কেষ্টার শেষটা!

- এ কী রে কেষ্টা!

- আর বলো কেন বলাদা! ডিপ্রেশনে আছি।

- তাই বলে সুদর্শন চক্রের এই হাল? ভেঙে তুবড়ে একাকার অবস্থা! এরপর আর তোর ইজ্জৎ থাকবে রে ভাই? শিশুপালের দিকে সুদর্শন ছুঁড়ে এই হল শেষে?

- প্রেস্টিজে গ্যামাক্সিন পড়েই গেছে দাদা। যত নষ্টের মূলে ওই ব্যাসদেব! বুড়ো বলে কিনা ফার্স্ট ড্রাফটে স্পষ্ট লিখে রেখেছে যে আমার ছোঁড়া সুদর্শনে শিশুপালের মুণ্ডচ্ছেদ হবে। আমিও সেই ভরসায় ছুঁড়ে দিলাম। কে জানত শিশুপালের মাথা গলা জুড়ে অমন সুদর্শন তোবড়ানো প্রটেকশন থাকবে? এ'খন কী দুর্দশা বলো দেখি। শিশুপাল আমার প্রোফাইল ফটোর কমেন্ট সেকশনে এসে খিস্তি করে যাচ্ছে, আর সেই স্প্যাম কমেন্টেও হাজার হাজার লাইক।

- শিশুপালের গলায় মাথায় কী এমন পরানো ছিল রে কেষ্টা? যাতে সুদর্শনও মচকে গেল?

- খবর নিয়েছি। ওই মাথা কান গলা প্যাঁচানো মালের নাম মাঙ্কিটুপি।

Tuesday, January 9, 2018

হর্ন

কিছুদিন আগে এক বন্ধুর সঙ্গে লম্বা আলোচনা হল গাড়ি চালানোর সময় হর্ন বাজানোর অভ্যাস নিয়ে।

স্বাভাবিক ভাবেই আমি বলেছিলাম হর্ন যতটা সম্ভব কম বাজানো উচিৎ। সেই বন্ধুটি তাজ্জব বনে গেছিল কথাটা শুনে; ও বেশ মাথাটাথা নেড়ে বলেছিল "কমঠম আবার কী রে? হর্ন আদৌ বাজানো উচিৎ না, 'রেয়ারেস্ট অফ রেয়ার' ঘটনা বাদে। ওর মতে গাড়ি চালানো বেশ নিচু স্তরের স্কিল, সে'খানে "ডিসিশন মেকিং"য়ের কোনও সুযোগ নেই। অর্থাৎ গাড়ি চালানোয় যে কোনও কেৎই অপ্রয়োজনীয়,  মাথা খাটানোর কোনও সুযোগ ড্রাইভিংয়ে নেই। সোজাসাপটা কিছু নিয়ম, সে'গুলো মাথা নিচু করে মেনে নিয়ে 'প্লেয়িং ইন দ্য ভি'। 'স্টেপ আউট' ড্রাইভিংয়ের জগতে অদরকারী আর ক্ষতিকারক।

আর মুখ বুজে নিয়ম মেনে গাড়ি চালানোয় যে'টার আদৌ দরকার পড়ে না সে'টা হল গাড়ির হর্ন। এই যেমন গাড়ির হ্যান্ডব্রেক, গাড়িতে আছে বলেই খচাং খচাং করে যখন তখন টানতে হবে? রেয়ারেস্ট অফ রেয়ার ঘটনায় হয়ত দরকার হতে পারে। সে'রকমই; হর্ন।

বন্ধুর কথা শুনলাম। মাথা নাড়লাম। তবে চিন্তা রয়ে গেল। আমি না হয় মাথা গুঁজে নিয়ম মেনে গাড়ি চালালাম, কিন্তু অন্যেরা গায়ে এসে পড়লে? তখন তো বোধ হয় হর্ন না দিলে ঘ্যাচাং ফু! 

কলকাতায় ফিরে জয় মা বলে শুরু করলাম এক্সপেরিমেন্ট। হর্ন না বাজিয়ে কদ্দূর গাড়ি  চালানো যায়।

দিন দশেক কেটে গেছে। গাড়ি কলকাতা শহরে দেদার ঘুরেছে। এই কদিনে আমার সাতপুরনো গাড়িটা বেহালা, পার্কসার্কাস, ঢাকুরিয়া, হাজরা, ময়দান, সল্টলেক; এই সমস্ত জায়গায় ঘুরে বেরিয়েছে। পুরো যাতায়াতটাই অফিস টাইমের ভিড় ঠেলে। অদ্ভুত কাণ্ড,  এই দশ দিনে তিনশো কিলোমিটার গাড়ি চালানো হল; একবারও হর্ন না বাজিয়ে। মাইরি, একবারও না।

হর্ন বাজানোর জন্য হাত নিশপিশ করেনি?

আলবাত।

সিচুয়েশন ১ - ট্রাফিক সিগনালের কাছাকাছি এসে। মনের মধ্যে নার্ভাসনেস জমা হয়। সবুজ দেখলেও স্পীড বেড়ে যায়। আগে নার্ভাস হলেই হর্ন দিতাম। অ্যাটিচিউড হল "সাবধান কুরুসেনা, আমার রথের জন্য রাস্তা ফাঁকা করে দাও। তুরন্ত"। পাশের গাড়ির হর্ন শুনে ছোঁয়াচে কাশির মত আরও হর্ন বাজাতে ইচ্ছে করত। কিন্তু। সেই বন্ধু বলেছে "গাড়ি চালানোয় ডিসিশন নেই, ইনোভেশন নেই, বি আ রোবট"। ব্যাস। টেনশন গন, নার্ভাসনেস হাওয়া। গাড়ি উড়িয়ে নিয়ে গেলেও নোবেল তো পাব না। আর সাধের গাড়ির গায়ে বাসের চুমু আর অটোর খোঁচার চেয়ে অফিস পাঁচ মিনিট লেটে ঢুকে গজরগজর শোনাও ভালো। অতএব সিগনালে সবুজ দেখলেও গতি বাড়ানোর বদলে সামান্য কম করছি। আর হলুদ দেখলে সোজা রোক্কে। ব্যাস, নার্ভাসনেস হাওয়া! নিজেকে নবরত্ন তেলের ডিবে মনে হচ্ছে ক'দিন ধরে।

সিচুয়েশন ২ - ওভারটেক। ওভারটেক খুব টেনশনের স্যার। খুব। বি-কমে নম্বর কম পাওয়ার দুঃখ দু'চারটে হুশহাশ ওভারটেক করলে কম হবে বলে মনে হয়। কিন্তু আদতে রক্তচাপ বাড়ে। মুখ দিয়ে খিস্তি বের হয়। রোখ চেপে যায়। আর অত্যধিক রক্তচাপ খুব চাপের; তা নিয়ে অফিসে ঢুকলে গোল, তা নিয়ে বাড়ি ফিরলে মেগা-কেস। অতএব? ফাঁকা গোল পেলে শট নেব, নয়ত নয়। রাস্তা পুরোপুরি ফাঁকা থাকলে তবেই ওভারটেক। যে ওভারটেকে গাঁক গাঁক করে হর্ন বাজাতে হয়, সে ওভারটেক ঝুঠা হ্যায়। আপার-ডিপার ফায়ার তবু মন্দের ভালো, হর্ন বাজিয়ে ওভারটেক মহাচাপ। আর সে'টা কোনও মারাদোনা লেভেলের স্কিলও নয়। বরং অনেকটা আঙুলের ডগায় থুতু মাখিয়ে সুইচবোর্ড ঘেঁটে পদ্মশ্রী আশা করার মত ব্যাপার।

সিচুয়েশন ৩ - আপনার চার চাকার সামনে রয়েছে রিক্সা বা সাইকেল; জিরো হর্সপাওয়া, পুরোপুরি প্যাডেলে। হর্ন দিতেই হবে?
মাইরি। না। সে সুযোগ পেলেই আপনাকে জায়গা দেবে পাশ কাটিয়ে বেরোনোর; উইদাউট হর্ন। আর সে যদি গাজোয়ারি পথ আটকাতে চায় তবে হর্ন কেন, ট্রাম্পের থেকে পরমাণু বোমার বোতাম ধার পেলেও আপনি কিস্যু করতে পারবেন না। তবে এ'খানে একটা 'রেয়ারেস্ট অফ রেয়ার' ব্যাপার ঘটতে পারে; সাইকেল বা রিক্সা চালক হয়ত প্যাডেল করতে করতে স্বপ্ন দেখছেন, আপনার উপস্থিতিই তাঁর গোচরে আসছে না। সে ক্ষেত্রে হয়ত আপনাকে হর্ন বাজাতে হতে পারে। তবে ওই, শহরের রাস্তায় তেমন হওয়ার সুযোগ খুব কম। গত তিনশো কিলোমিটারে অন্তত আমি তেমনটা দেখিনি।

সিচুয়েশন ৪ - পথচারী হাত দেখিয়ে রাস্তা পেরোচ্ছেন। গা জ্বলতে পারে। কিন্তু ওই বুদ্ধ হয়ে না হেসে উপায় নেই। রিল্যাক্স।  যারা চলন্ত গাড়ির সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে পারেন, তাঁদের বাঁটুল বুকে হর্নের বুলেট হেনে লাভ নেই। ইউ ক্যান বি দ্য জলসাঘরেস্ক ছবি বিশ্বাস ইন আ ওয়ার্ল্ড ফুল অফ কেষ্ট মুখুজ্যেস। চয়েস ইস ইওর্স।

ইয়ে - আর একটা 'রেয়ার' ব্যাপার হতে পারে। খুব সরু আর/বা আঁকাবাঁকা গলিতে ঢুকে পড়েছেন, উল্টো দিক থেকে কী/কে আসছে বোঝার উপায় নেই, তেমন রাস্তায় হয়ত হর্ন দরকার হতে পারে। হয়ত।

এইবার। হর্ন না বাজিয়ে কি আমায় খুব ধীরে ড্রাইভ করতে হয়েছে? এক ঘণ্টার রাস্তায় বড় জোর পাঁচ থেকে দশ মিনিট বাড়তি সময় যোগ হয়েছে। বড়জোর।

আর সবচেয়ে জরুরী দু'টো কথা:

১। "হর্ন বাজাব না" মনস্থ করার পর থেকে আমার ড্রাইভিং বেশ শুধরেছে। ভালো বাংলায় যাকে বলে; "মাচ স্মুদার"।

২। এ'টা সব চেয়ে বড় কথা। শহুরে ড্রাইভিং-ঘটিত স্ট্রেস কমে দশ ভাগের এক ভাগে এসে ঠেকেছে। ক্লান্তি কম হচ্ছে। অফিসে ফুরফুরে মেজাজে ঢুকছি, বাড়ি ফিরছি মেজাজকে মাখনে চুবিয়ে।

আর। শহরের রাস্তা কানে যে গরম আলকাতরা ঢেলে দেয়, তার অনেকটা জুড়েই অকারণ হর্ন। অথচ হর্নবাজি দিব্যি বাদ দেওয়া সম্ভব। আমাদের দেশেও; সম্ভব।