Sunday, January 7, 2018

মৃণাল সরকারের ব্যবসা

- আসতে পারি?
- না।
- মানে...।
- এ'বার আসুন। ভিতরে আসুন সেন্সে নয়। বিদেয় হোন।
- মিস্টার সরকার! আমায় আপনিই ডেকেছেন।
- আমি?
- আমার কাছে আপনার চিঠি আছে। আমি অনন্ত মজুমদার।
- বারুইপুরের?
- আজ্ঞে।
- ওহ! মজুমদারবাবু। আই অ্যাম সরি। প্লীজ আসুন।বিদেয় হোন সেন্সে নয়, সামনের চেয়ারটা টেনে বসুন।
- থ্যাঙ্কস। কিন্তু আমায় ডেকেছেন কেন সে'টা ঠিক..।
- বুঝতে পারেননি। কিন্তু তবু এসেছেন।
- আমি একা মানুষ। ঝাড়া হাত পা। স্কুলে পড়াই, সে'খানেও ছুটি চলছে। নেয়ামৎপুরের টেরাকোটা মন্দিরগুলো দেখতে আসার ইচ্ছেই ছিল। আপনার ইনভাইটটা পেয়ে...। আফটার অল আপনার পাঠানো অতগুলো টাকা পায়ে ঠেলার কলজে আমার নেই।
- আমার ব্যাপারে কিছু জানেন?
- আপনি মৃণাল সরকার। সর্ষের তেলের কল আছে। তিনটে কলকাতায়। দু'টো এ'খানে। আর ইয়ে...আপনার একটা অদ্ভুত শখের কথা একবার কাগজে পড়েছিলাম। আপনার নাকি কাঁকড়া পোষার শখ?
- আমার ড্রয়িং রুমে একটা জায়্যান্ট অ্যাকোয়ারিয়াম আছে। আপনাকে দেখাব 'খন। ইম্প্রেসিভ। তা, মোদ্দা খবরটা জানেন কী?
- মোদ্দা?
- যে আমার অঢেল টাকাপয়সা। ব্যবসার আমার মুনাফা ব্যালান্স শিট ফুঁড়ে বেরিয়ে যায় প্রত্যেক বছর।
- মুখের ওপর বলতে চাইছিলাম না। মানে, অমন দুম করে বড়লোকদের বড়লোক বলাটা খারাপ শোনায়। তা একটা কথা বলুন, আমায় ডাকলেন কেন? আর অত টাকার চেকটাই বা পাঠাতে গেলেন কেন।
- আমি বিজনেসম্যান মিস্টার মজুমদার। বাজে খরচ আমার মোটেও ধাতে সয় না। অত টাকা পাঠিয়েছি যখন, প্রয়োজন নিশ্চয়ই আছে। আমার রিসার্চ বলছে আপনিই সঠিক লোক।  তা একটা কথা বলুন, আমার সর্ষের তেলের ব্যবসার মূল মন্ত্রটা জানেন তো?
- গোটা দেশ সে নিয়ে হন্যে হয়ে যাচ্ছে, আর আমি জানব না? আপনার কারখানায় সর্ষের তেল তৈরি হয় সর্ষে ব্যবহার না করে। আমেরিকা ইউরোপ থেকে সকলে আপনার সাক্ষাৎকার নিয়ে যাচ্ছে। অথচ গোপন রহস্য কেউই ভেদ করতে পারেনি।
- পারেনি। তবে আজ আপনি পারবেন। আপনাকে আমিই জানাব জনাব!
- আমায় কেন?
- আমি প্রত্যেক বছর আপনারই মত বাছাই কয়েক জনকে জানাই! যেমন আজ আপনাকে জানাব! তার আগে বলে রাখি, আমি ব্যক্তিগত ভাবে ডিকনস্ট্রাক্টেড অ্যালকেমিস্টও বটে। তবে আমি সোনা নয়, খাঁটি সর্ষের তেল তৈরি করি। সর্ষে ছাড়া।
- অ। কী বললেন কিছুই বুঝলাম না।
- আমার পাঠানো চেকটা এনক্যাশ করিয়েছেন দেখলাম। কিছু খরচাপাতি করলেন?
- ও টাকায় আমার আগামী বছর পাঁচেকের ঘোরাঘুরির চিন্তা থাকবে না। আমি যাকে বলে প্যাশনেট ট্র‍্যাভেলার!  সামনের বছর মানস সরোবর দেখে আসব ভাবছি।
- টু ব্যাড। টাকাটা তেমন কাজে লাগল না।
- আজ্ঞে?
- আমার বিজনেসের অবিশ্বাস্য মুনাফার মূলে আছে সর্ষের তেল ছাড়া সর্ষের তেল তৈরি। আর সে'টা তৈরি হয়ে ভ্রমণপ্রিয় বাঙালির পায়ের তলা নিংড়ে।
- হোয়াট? কী ননসেন্স!
- মিস্টার মজুমদার! একজন বাঙালির পায়ের তলার সর্ষে নিংড়ে একটা মিল গোটা বছর চলে যায়। প্রসেসটা একটু কম্পলিকেটেড, সামান্য কেমিস্ট্রি আর কিছুটা ক্লেয়ারভয়েন্স। বছরের পাঁচটা বাঙালির পায়ের তলার সর্ষে নিংড়েই আমার দিব্যি চলে যায়। তবে খারাপ লাগে এদের কাউকেই ফেরত পাঠানো যায় না।
- আপনি পাগল!
- তবে এখান থেকে পালানোর চেষ্টা করা আরও বড় পাগলামো। তিনটে বন্দুক আপনার দিকে তাক করা। একটু ত্যান্ডাইম্যান্ডাই করলেই খুলি উড়বে। বরং আপনার পায়ের তলার সর্ষে নিংড়ে নিলে আপনি অন্তত মরবেন না। ফিরতে পারবেন না ঠিকই, তবে প্রাণে মরবেন না।
- আমার পায়ের তলার সর্ষে নিংড়ে নিলে আমার কী হবে?
- আর পাঁচটা বাঙালির যে দশা হয়। পায়ের তলার সর্ষে হারিয়ে আর তারা মানুষ হয়ে থাকতে পারেন না। আনফরচুনেট মেটামরফোসিস। তাঁদের মতই আপনার স্থান হবে আমার ড্রয়িং রুমের রাখা ঝলমলে কাঁকড়ার অ্যাকোয়ারিয়ামে।

কালাহারি

কালাহারি ক' রকমের?

দু'রকম! তুলতুলে ও খতরনাক।

তুলতুলেটা রয়েছে আফ্রিকায়।

আর খতরনাক?

এই যে মাঝরাত্রে গায়ের কম্বল সরিয়ে, স্যুইচবোর্ড হাতড়ে আলো জ্বেলে, শোওয়ার ঘরের দরজা পেরিয়ে, ড্রয়িং রুমে ছড়িয়ে থাকা মোড়া ডিঙিয়ে,  ব্যালকনির কনকনে হাওয়ার থাপ্পড়কে হেলায় উড়িয়ে ফ্রিজের কাছে পৌঁছনো...

আর তারপর বুঝতে পারা যে হিসেবে গরমিল ছিল,
ফ্রীজে একটাও ক্ষীরকদম পড়ে নেই।
নেই। একটাও।

সেই শুনশান ফ্রীজ থেকে খাট অবধি ফেরার যে'টুকু পথ; সে'টুকুই; খতরনাকেস্ট কালাহারি।

Thursday, January 4, 2018

রাহাজানি

- আর কতক্ষণ কপালে রিভলভারটা ঠেকিয়ে রাখবেন জানতে পারি?

- কলজে কাঁপছে নাকি খোকন?

- লোহার নল তো, কপালে ঠাণ্ডা লাগছে। আজ আবার একটু শীত পড়েছে। হাফ সোয়েটারটা শেষ পর্যন্ত বের করতেই হল। তবে এখনও ন্যাপথালিনের গন্ধ পাবেন..।

- যা আছে বের করুন। যত্ত বাজে কথা! অত সময় আমার নেই!

- তাই তো বলছি! রিভলভারটা সরান। হারুদার রুটিতড়কার দোকান বন্ধ হল বলে। সে আর এক কেলেঙ্কারি হবে'খন।

- তবে রে! দেব ট্রিগার টেনে তখন বুঝবি কত ধানে কত চাল!

- ট্রিগার টানার দম আপনার নেই স্যার। দেশলাই আছে? আজ বিড়ির বদলে একটা গোল্ডফ্লেক জ্বেলে শীত সেলিব্রেট করব ভেবেছি।

- খুলিয়ে উড়িয়ে দেব শালা!

- আপনার আলোয়ানের আড়াল থেকে আপনার  বুকপকেট উঁকি মারছে। সে'টার থেবড়ে যাওয়া ভাজ দেখে স্পষ্ট কেউ সে'খানে মাথা রেখেছিল, এই কিছুক্ষণ আগেই।  পকেটের ছাপ দেখে যা বুঝছি যে মাথা যে রেখেছিল তার বছর দুই বয়স, বড় জোর। একটু কমও হতে পারে। তবে খুকি না খোকা  সে'টা বুঝতে বেগ পেতে হত। কিন্তু কপালে রিভলভার ঠেকিয়ে সারকাস্টিকালি খোকা বলতে গিয়েও যে ভাবে ইমোশনে ছড়ালেন..। ট্রিগার টানার দম আপনার নেই। তবে আপনার বুক পকেটে লেগে থাকা লালার নেচারাটার জন্য চিন্তা হচ্ছে। খোকার কি শরীর খারাপ?

- আপনি কে?

- তার চেয়েও বড় কথা, খোকা কেমন আছে?

- ভালো নেই, বিশ্বাস করুন! এখুনি ভালো জায়গায় ভর্তি না করলে  খোকা হয়ত আর...। অথচ আমার কাছে..।

- সে আপনার জুতোর হাল দেখেই বুঝেছি। এই রিভলভারটা পেলেন কোথায়?

- পাড়ার এমএলএর পোষা গুণ্ডার সঙ্গে আলাপ আছে। রিভলভারও তার, আইডিয়াও তার।

- রিভলভারটা কপাল থেকে সরাবেন?  এ'বার?

- সরি! কিন্তু আমি কী করব! কোথায় যাব!

- রাহাজানি আপনার দ্বারা হবে না। বললাম তো। আর দেশ আপনার লেভেলের ক্রিমিনালে ভরে যাওয়ায় আমার পকেট ন্যাচুরালি গড়ের মাঠ।  তবে ডাক্তার সেনগুপ্তর কাছে একটা ফেভার পাওনা ছিল। খোকার ব্যবস্থা হয়ে যাবে। চলুন। সুভাষনগরের দিকে থাকেন তো?

- হ্যাঁ..ইয়ে।

- আপনার নাম?

- মধু সান্যাল।

- আর দেরী নয় মধুবাবু, চলুন!

- কী করে জানলেন...? ইয়ে...সুভাষনগরের ব্যাপারটা?

- বিভূদার চপের দোকানের আশেপাশে বাড়ি না হলে গোটা  নিজের সঙ্গে এমন মনমোহিনী সুবাস বয়ে আনবেন কী করে? এ সময় আবার বিভূদা ধনেপাতার বড়ায় কনসেন্ট্রেট করে। আহা। অহো। যা হোক। ডাক্তার সেনগুপ্তকে এসএমএস করে দিয়েছি। চলুন।

- কিন্তু টাকা?

- ডাক্তার সেনগুপ্ত টাকায় আমার ঋণ শোধ করতে পারবেন না। সে চিন্তা নেই।

- আপনি কে বলুন তো?

- আমার বটুকেশ্বর নামটা আমার বাপেরই দেওয়া শুনেছি। তবে ভদ্রলোকের বুকপকেটের সুবাস আমার মনে নেই। খোকার কাছে চলুন মধুবাবু। একটা ট্যাক্সি পাকড়াও করা যাক। আর পিস্তলটা আমায় দিন, আপনার হাতে পিস্তল আর আরসালানে বাঁধাকপি একই ব্যাপার।

Wednesday, January 3, 2018

রিজোলিউশনস ২০১৮

এই বছরে হিসেবকিতেব পালটে দেওয়ার কথা।

ভিড় বাসে পড়ে পাওয়া জানালার সীটের দিকে বাউল হাসি ছুঁড়ে পাশে দাঁড়ানো ভদ্রলোককে বলব "আসুন স্যার"।

বিরিয়ানির অর্ডার দিয়ে রামপ্রসাদি গুনগুন করব; "মন রে পাতি আজ খাব না"।

গোপনে চিঠি লিখব। নীল খাম। হলুদ কাগজ। সপ্তাহে একটা। গোপনে পোস্ট করব। গোপন চিঠি পেয়ে লাফিয়ে উঠব।

পাড়ার ক্লাব-ক্যারম টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে হেরে বছরের একমাত্র সিগারেট খাব। শোওয়ার ঘরে ঠাকুমার ফ্রেম করা ছবিটার ভয়ে কেনা হবে ক্লোরমিন্ট।

কম্যুনিস্ট ম্যানিফেস্টো পড়ব রোজ হাফ পাতা করে, বুক মার্ক করব তারাপীঠের আশীর্বাদী জবাকে।

Tuesday, January 2, 2018

বছরটা জলে!

(গত বছর একটি পত্রিকার ওয়েবসাইটের জন্য লেখা)

- এ বছরটাও জলে গেল হে মহামন্ত্রী।
- আজ্ঞে, রাজন।
- এ বছরেও আমার জিমে যাওয়া হল না।
- হল না হে ভুঁড়িন্দ্রনাথ।
-  বড় সাধ ছিল এ বছর ভালো ভালো বই পড়ব। মিনিমাম মাসে দু'টো।
- মেনুকার্ড ছাড়া বিশেষ কিছু আর পড়া হল কই? মহারাজ?
- ভেবেছিলাম দমাদম দামী সিনেমা দেখব।
- দেখলেন হে রাজাধিরাজ, দেখলেন। সর্ষেফুল। খবরের চ্যানেলে, কাগজে। সিনেমাফিনেমার অবসর খবরেরকাগজবাজদের থাকতে নেই।
- ভেবেছিলাম রোজ ভোরে উঠে মর্নিং ওয়াকে বেরোব। ভোর পাঁচটার অ্যালার্ম বেজে ওঠা মাত্রই তড়াং করে লাফিয়ে উঠব।
- স্নুজরাজ, সমহাল কে। সমহাল কে।
- কিস্যু হল না।
- আহা, আহা রে।
- কিন্তু বুঝলে হে মহামন্ত্রী, এ বছর আমি ঘুরে দাঁড়াবই।
- বলছেন? সম্রাট?
- কফি হাউস থেকে এক পিস টেবিল এনে দাও, চাপড়ে প্রমাণ দেব আমি কতটা সিরিয়াস।
- যাবেন? জিমে? নতুন বছরে?
- জিম? ও'সব স্লিম টার্গেটের যুগ শেষ।
- বই সিনেমা মর্নিং ওয়াক? মহারাজ?
- ওয়াক থুঃ!  মারি তো গণ্ডার, লুটি তো বলরাম মল্লিকের ভাণ্ডার।
- ওহ। মেগা রিজোলিউশন? বলুন হে নরেশ।
- মেগার বাবা। এ বছর আমি পরোপকার করব।
- কী বললি বে?
- এ কী মহামন্ত্রী। রাজাকে তুইতোকারি?
- সরি হে বীরশ্রেষ্ঠ। পরোপকার শুনে বুকের ভিতরের পেসমেকার নড়ে উঠেছিল।
- জিম, বই, সিনেমা, মর্নিং ওয়াক। সমস্তই স্বার্থ কেন্দ্রিক।  কিন্তু আমি যে রাজা। দেশের কথা দশের ব্যথা আমি না বুঝলে কে বুঝবে?
- আপনি দেশের দিশা, দশের আশা, হে নৃপতি।
- তবে? আমি দশের হয়ে কাজ করব। অমুকের হয়ে রেশন তুলে দেওয়া। তমুকের সাইকেল রিপেয়ার করিয়ে আনা। এর বাড়ির বাজার করে দেওয়া। ওর কুকুরকে হিসু করিয়ে আনা। দিনভর।
- আহা, আপনি ধন্য মহারাজ। তবে একটাই ইস্যু।
- ইস্যু? পরোপকারে?
- আজ্ঞে সম্রাট।
- কী ইস্যু? পরোপকারে?
- আজ্ঞে ইয়ে...ওই মানে...।
- মানে কী? মন্ত্রী?
- মানে...গিয়ে...ইয়ে...পরোপকার করতে হলে আপনাকে যে ফেসবুক থেকে লগআউট করতে হবে।
- কী বললি শুয়ার?
- এ কী ভাষা দেবতা?
- সরি। ফেসবুক লগ আউট শুনে ব্রেনে অক্সিজেনের সাপ্লাই সামান্য কমে গেছিল। তা, তুমি বলছ  ফেসবুক থেকে লগ আউট না করে পরোপকার করা যাবে না?
- অসম্ভব। নইলে গ্র‍্যাভিটির কন্সেপ্ট যাবে পালটে। নিউটন আপেল গাছের ডালে উঠে মাথা ঠুকবেন।
- দেশের কাজ রাজা করলে দশে করবে কী?
- কাঁচকলা মহারাজ।
- তাছাড়া সুইডেন না সুমাত্রা কোথায় যেন কে পরোপকার করতে গিয়ে টপ করে মারা যায়। মেসোমশাই বলছিলেন আর কী।
- রাজার মেসো। তিনিই মেসিয়াহ্।
- অতএব মহামন্ত্রী, ফেসবুক লগ আউট বাদ। তুমি কাল ভোর পাঁচটার অ্যালার্ম লাগাও। ক্যুইক। কালকেই মর্নিং ওয়াকের শুরু। আর আমার জিমের জুতো জোড়া খুঁজে বার করো দেখি।