Thursday, January 4, 2018

রাহাজানি

- আর কতক্ষণ কপালে রিভলভারটা ঠেকিয়ে রাখবেন জানতে পারি?

- কলজে কাঁপছে নাকি খোকন?

- লোহার নল তো, কপালে ঠাণ্ডা লাগছে। আজ আবার একটু শীত পড়েছে। হাফ সোয়েটারটা শেষ পর্যন্ত বের করতেই হল। তবে এখনও ন্যাপথালিনের গন্ধ পাবেন..।

- যা আছে বের করুন। যত্ত বাজে কথা! অত সময় আমার নেই!

- তাই তো বলছি! রিভলভারটা সরান। হারুদার রুটিতড়কার দোকান বন্ধ হল বলে। সে আর এক কেলেঙ্কারি হবে'খন।

- তবে রে! দেব ট্রিগার টেনে তখন বুঝবি কত ধানে কত চাল!

- ট্রিগার টানার দম আপনার নেই স্যার। দেশলাই আছে? আজ বিড়ির বদলে একটা গোল্ডফ্লেক জ্বেলে শীত সেলিব্রেট করব ভেবেছি।

- খুলিয়ে উড়িয়ে দেব শালা!

- আপনার আলোয়ানের আড়াল থেকে আপনার  বুকপকেট উঁকি মারছে। সে'টার থেবড়ে যাওয়া ভাজ দেখে স্পষ্ট কেউ সে'খানে মাথা রেখেছিল, এই কিছুক্ষণ আগেই।  পকেটের ছাপ দেখে যা বুঝছি যে মাথা যে রেখেছিল তার বছর দুই বয়স, বড় জোর। একটু কমও হতে পারে। তবে খুকি না খোকা  সে'টা বুঝতে বেগ পেতে হত। কিন্তু কপালে রিভলভার ঠেকিয়ে সারকাস্টিকালি খোকা বলতে গিয়েও যে ভাবে ইমোশনে ছড়ালেন..। ট্রিগার টানার দম আপনার নেই। তবে আপনার বুক পকেটে লেগে থাকা লালার নেচারাটার জন্য চিন্তা হচ্ছে। খোকার কি শরীর খারাপ?

- আপনি কে?

- তার চেয়েও বড় কথা, খোকা কেমন আছে?

- ভালো নেই, বিশ্বাস করুন! এখুনি ভালো জায়গায় ভর্তি না করলে  খোকা হয়ত আর...। অথচ আমার কাছে..।

- সে আপনার জুতোর হাল দেখেই বুঝেছি। এই রিভলভারটা পেলেন কোথায়?

- পাড়ার এমএলএর পোষা গুণ্ডার সঙ্গে আলাপ আছে। রিভলভারও তার, আইডিয়াও তার।

- রিভলভারটা কপাল থেকে সরাবেন?  এ'বার?

- সরি! কিন্তু আমি কী করব! কোথায় যাব!

- রাহাজানি আপনার দ্বারা হবে না। বললাম তো। আর দেশ আপনার লেভেলের ক্রিমিনালে ভরে যাওয়ায় আমার পকেট ন্যাচুরালি গড়ের মাঠ।  তবে ডাক্তার সেনগুপ্তর কাছে একটা ফেভার পাওনা ছিল। খোকার ব্যবস্থা হয়ে যাবে। চলুন। সুভাষনগরের দিকে থাকেন তো?

- হ্যাঁ..ইয়ে।

- আপনার নাম?

- মধু সান্যাল।

- আর দেরী নয় মধুবাবু, চলুন!

- কী করে জানলেন...? ইয়ে...সুভাষনগরের ব্যাপারটা?

- বিভূদার চপের দোকানের আশেপাশে বাড়ি না হলে গোটা  নিজের সঙ্গে এমন মনমোহিনী সুবাস বয়ে আনবেন কী করে? এ সময় আবার বিভূদা ধনেপাতার বড়ায় কনসেন্ট্রেট করে। আহা। অহো। যা হোক। ডাক্তার সেনগুপ্তকে এসএমএস করে দিয়েছি। চলুন।

- কিন্তু টাকা?

- ডাক্তার সেনগুপ্ত টাকায় আমার ঋণ শোধ করতে পারবেন না। সে চিন্তা নেই।

- আপনি কে বলুন তো?

- আমার বটুকেশ্বর নামটা আমার বাপেরই দেওয়া শুনেছি। তবে ভদ্রলোকের বুকপকেটের সুবাস আমার মনে নেই। খোকার কাছে চলুন মধুবাবু। একটা ট্যাক্সি পাকড়াও করা যাক। আর পিস্তলটা আমায় দিন, আপনার হাতে পিস্তল আর আরসালানে বাঁধাকপি একই ব্যাপার।

Wednesday, January 3, 2018

রিজোলিউশনস ২০১৮

এই বছরে হিসেবকিতেব পালটে দেওয়ার কথা।

ভিড় বাসে পড়ে পাওয়া জানালার সীটের দিকে বাউল হাসি ছুঁড়ে পাশে দাঁড়ানো ভদ্রলোককে বলব "আসুন স্যার"।

বিরিয়ানির অর্ডার দিয়ে রামপ্রসাদি গুনগুন করব; "মন রে পাতি আজ খাব না"।

গোপনে চিঠি লিখব। নীল খাম। হলুদ কাগজ। সপ্তাহে একটা। গোপনে পোস্ট করব। গোপন চিঠি পেয়ে লাফিয়ে উঠব।

পাড়ার ক্লাব-ক্যারম টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে হেরে বছরের একমাত্র সিগারেট খাব। শোওয়ার ঘরে ঠাকুমার ফ্রেম করা ছবিটার ভয়ে কেনা হবে ক্লোরমিন্ট।

কম্যুনিস্ট ম্যানিফেস্টো পড়ব রোজ হাফ পাতা করে, বুক মার্ক করব তারাপীঠের আশীর্বাদী জবাকে।

Tuesday, January 2, 2018

বছরটা জলে!

(গত বছর একটি পত্রিকার ওয়েবসাইটের জন্য লেখা)

- এ বছরটাও জলে গেল হে মহামন্ত্রী।
- আজ্ঞে, রাজন।
- এ বছরেও আমার জিমে যাওয়া হল না।
- হল না হে ভুঁড়িন্দ্রনাথ।
-  বড় সাধ ছিল এ বছর ভালো ভালো বই পড়ব। মিনিমাম মাসে দু'টো।
- মেনুকার্ড ছাড়া বিশেষ কিছু আর পড়া হল কই? মহারাজ?
- ভেবেছিলাম দমাদম দামী সিনেমা দেখব।
- দেখলেন হে রাজাধিরাজ, দেখলেন। সর্ষেফুল। খবরের চ্যানেলে, কাগজে। সিনেমাফিনেমার অবসর খবরেরকাগজবাজদের থাকতে নেই।
- ভেবেছিলাম রোজ ভোরে উঠে মর্নিং ওয়াকে বেরোব। ভোর পাঁচটার অ্যালার্ম বেজে ওঠা মাত্রই তড়াং করে লাফিয়ে উঠব।
- স্নুজরাজ, সমহাল কে। সমহাল কে।
- কিস্যু হল না।
- আহা, আহা রে।
- কিন্তু বুঝলে হে মহামন্ত্রী, এ বছর আমি ঘুরে দাঁড়াবই।
- বলছেন? সম্রাট?
- কফি হাউস থেকে এক পিস টেবিল এনে দাও, চাপড়ে প্রমাণ দেব আমি কতটা সিরিয়াস।
- যাবেন? জিমে? নতুন বছরে?
- জিম? ও'সব স্লিম টার্গেটের যুগ শেষ।
- বই সিনেমা মর্নিং ওয়াক? মহারাজ?
- ওয়াক থুঃ!  মারি তো গণ্ডার, লুটি তো বলরাম মল্লিকের ভাণ্ডার।
- ওহ। মেগা রিজোলিউশন? বলুন হে নরেশ।
- মেগার বাবা। এ বছর আমি পরোপকার করব।
- কী বললি বে?
- এ কী মহামন্ত্রী। রাজাকে তুইতোকারি?
- সরি হে বীরশ্রেষ্ঠ। পরোপকার শুনে বুকের ভিতরের পেসমেকার নড়ে উঠেছিল।
- জিম, বই, সিনেমা, মর্নিং ওয়াক। সমস্তই স্বার্থ কেন্দ্রিক।  কিন্তু আমি যে রাজা। দেশের কথা দশের ব্যথা আমি না বুঝলে কে বুঝবে?
- আপনি দেশের দিশা, দশের আশা, হে নৃপতি।
- তবে? আমি দশের হয়ে কাজ করব। অমুকের হয়ে রেশন তুলে দেওয়া। তমুকের সাইকেল রিপেয়ার করিয়ে আনা। এর বাড়ির বাজার করে দেওয়া। ওর কুকুরকে হিসু করিয়ে আনা। দিনভর।
- আহা, আপনি ধন্য মহারাজ। তবে একটাই ইস্যু।
- ইস্যু? পরোপকারে?
- আজ্ঞে সম্রাট।
- কী ইস্যু? পরোপকারে?
- আজ্ঞে ইয়ে...ওই মানে...।
- মানে কী? মন্ত্রী?
- মানে...গিয়ে...ইয়ে...পরোপকার করতে হলে আপনাকে যে ফেসবুক থেকে লগআউট করতে হবে।
- কী বললি শুয়ার?
- এ কী ভাষা দেবতা?
- সরি। ফেসবুক লগ আউট শুনে ব্রেনে অক্সিজেনের সাপ্লাই সামান্য কমে গেছিল। তা, তুমি বলছ  ফেসবুক থেকে লগ আউট না করে পরোপকার করা যাবে না?
- অসম্ভব। নইলে গ্র‍্যাভিটির কন্সেপ্ট যাবে পালটে। নিউটন আপেল গাছের ডালে উঠে মাথা ঠুকবেন।
- দেশের কাজ রাজা করলে দশে করবে কী?
- কাঁচকলা মহারাজ।
- তাছাড়া সুইডেন না সুমাত্রা কোথায় যেন কে পরোপকার করতে গিয়ে টপ করে মারা যায়। মেসোমশাই বলছিলেন আর কী।
- রাজার মেসো। তিনিই মেসিয়াহ্।
- অতএব মহামন্ত্রী, ফেসবুক লগ আউট বাদ। তুমি কাল ভোর পাঁচটার অ্যালার্ম লাগাও। ক্যুইক। কালকেই মর্নিং ওয়াকের শুরু। আর আমার জিমের জুতো জোড়া খুঁজে বার করো দেখি।

Saturday, December 30, 2017

সাঁতরাবাবুর বস

- বস!
- কী মুশকিল সাঁতরাবাবু।
- মুশকিল? সে কী! আমি তো কিছুই বলিনি এখনও।
- আপনার এই গলার টোন আমি চিনি।
- টোন?
- গদগদে। ধান্দাবাজ। কী চাই?
- ছুটি।
- সে কী! কোয়ার্টারের অবস্থা দেখেছেন? সমস্ত হিসেব ল্যাজেগোবরে। আগামী তিন মাস ছুটির আশা ভুলে যান।
- জরুরী। এমার্জেন্সি।
- কবে চাই?
- পয়লা।
- ফার্স্ট জানুয়ারি ছুটি চাইছেন? আপনি সোমবার অফিস ডুব দিতে চাইছেন?
- ক্রিটিকাল বস। ভেরি ক্রিটিকাল।
- অক্টোবর থেকে পইপই করে বলে আসছি কোয়ার্টারলি টার্গেটে মন দিন, ক্রিটিকাল। অথচ ডিসেম্বরে এসে সেই মুখ থুবড়ে পড়লেন। আপনার লজ্জা করছে না পয়লা জানুয়ারি ছুটি চাইতে?
- আমার বৌ বলেছিল "লজ্জা করে না বসের ফেউ হয়ে ঘুরতে"?
- আপনি জরু কা গুলাম!
- জরুরী কা গুলাম স্যার।ছুটিটা মাস্ট।
- বললাম তো হবে না।
- নিউটন আপেলকে যদি বলতেন "হবে না", তাহলে গ্র‍্যাভিটির কিছু এসে যেত?
- গ্র‍্যাভিটি আপনার বৌ?
- হেহ্। আর আমি আপেল। বৌ আমায় আপনার নিউটনি মাথায় টেনে হিঁচড়ে নামাবেই। পাত্তা না দিয়ে যাবেন কোথায়?
- কেসটা কী?
- নিউ ইউয়ার্স ইভে পার্টি। মদ! মোহ! উদ্দাম নৃত্য। হনি সিং। রাতভর। পরের দিন সকালে বমি বমি ভাব।
- অফিসে এসে বমি করবেন 'খন। ফার্স্ট জানুয়ারি পরের কোয়ার্টারের প্ল্যানিং শুরু করুন। মাস্ট।
- আপনার ধমককে পাত্তা দেওয়া বারণ! মিসেসের।
- পয়লা জানুয়ারি আপনি অফিসে আসছেন না?
- কলার ধরে টেনে আনলেও না।
- আমি আপনার বস।
- বস পেরেক। বৌ হামানদিস্তা।
- আই সী! ইন দ্যাট কেস, মঙ্গল বুধ বিস্যুদ লেট নাইট! সোমবারের ছুটি কম্পেন্সেট করতে।
- রাজী!
- ফাইনাল সেলস প্ল্যানিং আমার টেবিলে চাই, বাই ফ্রাইডে মর্নিং।
- ডান! প্রমিস বস। না পারলে আমার নামে জিরাফ পুষবেন।
- আপনার নামে বাড়িতে এক পিস বর পুষেই ঢের শিক্ষা হয়েছে। জিরাফে কাজ নেই।
- হে হে।
- আর মিস্টার সাঁতরা, অফিসে আমায় চোরাগোপ্তা ভাবে মিস গ্র‍্যাভিটি বলে আওয়াজ দেওয়া বন্ধ করুন, অফিস ডিসিপ্লিন নষ্ট হয়।
- সরি।
- প্রডাক্ট পার্ফমেন্সে ফাইলটা নিয়ে আসুন।
- তুরন্ত। আজ ফেরার পথে হাফ কিলো পাটালি নিয়ে ফিরবে? প্লীজ? আমার হবে না। সুমন্ত টুয়েন্টি নাইন খেলতে ডেকেছে!
- মিস্টার অভিরূপ সাঁতরা!
- সরি বস। ফাইল নিয়ে আসছি। চটপট!

Saturday, December 23, 2017

দার্জলিঙের ৮



- তুমি দার্জিলিং যাওনি?
- না।
- তোমার বয়স বত্রিশ। তুমি বলছো তুমি দার্জিলিং যাওনি?
- না।
- রিয়েলি?
- রিয়েলি।
- বোঝ!
- এতে বোঝার আছেটা কী?
- দার্জিলিঙের এক্সপিরিয়েন্স নেই তোমার। এ যে বিয়েবাড়ির মেনুতে মাটনের না থাকা।
- মাইরি?
- নব্বইয়ের ইন্ডিয়ান ব্যাটিংলাইনআপে শচীনের না থাকা।
- আচ্ছা।
- শুক্তোয় বড়ি না থাকা।
- বুঝেছি রে বাবা।
- রগরগে চুমুতে জিভ না থাকা।
- উফফ! বেশ! অফিসের হলিডে হোম বুক করছি, কালই।
- কফি হাউসের আড্ডায় দাড়ি চুলকানি না থাকা।
- এ হপ্তার শেষেই চললাম। তৎকালে টিকিট।



- সোয়েটার?
- টিক। অবিশ্যি দার্জিলিঙে শুনেছি আজকাল তেমন ঠাণ্ডা পড়েনা।
- জ্যাকেট?
- ক্রস। দার্জিলিং উইন্টার বড় জোর রাঁচির চেয়ে দু'লেভেল উপরে।
- মাফলার?
- টিক। তবে দার্জিলিঙের ভয়ে নয়। কান ঢেকে রাখা ইজ আ গুড হ্যাবিট। দ্যাটস অল।
- বোরোলিন?
- ডাবল টিক। ফাটা ঠোঁট আনবিয়ারেবল।
- ফ্লাস্ক?
- বাড়াবাড়ি হচ্ছে।
- কফির জন্য পরমুখাপেক্ষী হয়ে থাকব?
- ব্যবস্থা হবে'খন।
- হিল স্টেশনে উষ্ণতা নিয়ে কম্প্রোমাইজ মানে কম্ফর্ট নিয়ে কম্প্রোমাইজ।
- চুমুর ব্যবস্থা করব নাকি?
- চুমুর সাবস্টিটিউট হয়। সঞ্জীব, পেঁয়াজ পোস্ত এট সেটেরা। কিন্তু উষ্ণতা জেনারেশনে এনিটাইম কফির আশ্বাসের কোনও বিকল্প নেই। ফ্লাস্ক থাকুক।
- প্যাকিং কম্পলিট। হটফ্লাস্ক নিতে হলে চানাচুরের প্যাকেট আর সোনপাপড়ির বাক্স বাদ যাবে।
- আনএক্সেপ্টেবল। তাহলে উপায়? উষ্ণতা ডকে?
- সাবস্টিটিউট আছে।
- এনিটাইম কফির সাবস্টিটিউট?
- দার্জিলিং স্পেসিফিক সাবস্টিটিউট। আছে।
- লেগ পুল?
- জেনুইন। মাইরি। আছে।
- কী?
- দার্জিলিঙে চুমুয়েবল কম্ফর্ট ও উষ্ণতার গ্যারেন্টি। প্লেলিস্ট ভরা দার্জিলিং দত্তের গান।
- বলছিস?
- ট্রেনে ওঠার আগের ডিনারে পোস্ত ঝিঙে। টেলিগ্রাফের তারে নাচুক ফিঙে।





- কাঞ্চনজঙ্ঘার এই ড্যাজলিং ভ্যিউয়ের জন্যেই আপনাদের পাঙখাবাড়ি রুটে ভায়া মকাইবাড়ি আনলাম।
- বাহ! দিব্যি!
- আর ডাইনে দেখুন। টি প্ল্যান্টেশনে মেয়েরা কাজ করছে। সব মিলে মোউস্ট পিকচারেস্ক। আর হাওয়ার পিউরিটি নিশ্চই টের পাচ্ছেন।
- দার্জিলিং আর কদ্দূর?
- আর তেত্রিশ কিলোমিটার মত। চায়ের ব্রেক হবে নাকি?
- জরুরী।
- এখানে চায়ের টেস্টও আলাদা। মোহময়। দু'কাপের কমে চলবে না। অর্গানিক ফাইন চা পাতার কয়েক প্যাকেট চাইলে নিয়েও নিতে পারেন।
- হোক।
- বেশ। নেক্সট স্টপ হাই ক্লাস চা আর টা।
- ইয়ে, আপনি আমায় ফ্রেশ ফ্রম প্ল্যান্টেশন খাস দার্জিলিং খাওয়ান, তার সাথে ফ্রেশ ক্যালক্যাটা'টা বরং আমিই প্রোভাইড করছি। সে টা'য়ের প্ল্যান্টশন আমার কাছেই রয়েছে। ওই সবজে সাইড ব্যাগটা, ওতেই টায়ের প্ল্যান্টেশন।
- ইয়ে, ফ্রেশ টা?
- হান্ড্রেড পারসেন্ট অর্গানিক ওভেন ফ্রেশ লেড়ো ফ্রম কলকাতা। ছয় প্যাকেট এনেছি। কোয়ালিটি লেড়ো ছাড়া চা চাপের হয়ে যায়। ও নিয়ে রিস্ক নেওয়া যায় না।



আলস্য অতি শক্তিশালী।
প্রথম দার্জিলিং। সুড়সুড়িটা প্রবল হওয়া উচিৎ ছিল।
প্রথম সন্ধ্যের প্ল্যান সে'রকমই ছিল:
১. বিকেল বিকেল হোটেল পৌঁছেই ফ্রেশ হয়ে এক কাপ কফি।
২. অতঃপর ম্যালের দিকে হাঁটাহাঁটি। টু সোক ইন দ্য মেজাজ। অল্প খাওয়াদাওয়া, পারলে কেভেন্টার্সে ঢুঁ।
৩. জোয়ি'জ পাব যে বিখ্যাত সে খবর নেওয়া আছে। সে'খানে যৎসামান্য হৃদয়-মালিশ।
৪. অতঃপর ফের এক রাউন্ড হন্টন।
৫. তারপর পছন্দসই রেস্তঁরা দেখে লাইট ডিনার।
৬. সবশেষে গোল্ডফ্লেক। নেশার টান আর নেই, তবে গোল্ডফ্লেকে একটা কাঁঠালি কলা গোছের ব্যাপার আছে।
ছয় গোলে জেতা সন্ধ্যে। নিখুঁত অঙ্ক।
কিন্তু ওই। নিঁখুতে জ্যামিতি। খুঁতেই আর্ট, মহাজাগতিক বিস্ময়।
স্কেল রেখে আঁকা প্ল্যান, সে'খানে গোবরজল স্প্রে করতে মায়া হচ্ছিল। কিন্তু হোটেলের গোছানো বিছানাটা এমন চুমু মাখিয়ে হাঁক দিলে...কুলুকুলু গলে গেলাম।
ঘুম যখন ভাঙলো তখন রাত সাড়ে নয়। শরীর জুড়ে অবসাদ, ক্লান্তির নয়; অপরাধ বোধের। একটা সন্ধ্যে গচ্চা গেল। ডিনারের ব্যবস্থা না করলেই নয়, অত রাত্রে হোটেলেও সুবিধে করা গেল না। অগত্যা হাঁটতে বেরোতেই হলো। ততক্ষণে শহরের এ'পাশটা নিঝুম।বাতসে শীতের কনকন দিব্যি রয়েছে।
যার কেউ নেই তার ভগবান আছে, আর যার উদ্যোগ নেই তার জন্য রয়েছে সৌরভ ছেত্রী। একটা মুদীর দোকান আর তার লাগোয়া ছোট্ট ঘরে তার সাইড বিজনেস; মোমো, ওয়াইওয়াই আর কফির।
যত্নের গুণে ফ্যান ভাত হয় বিরিয়ানির চেয়েও খোশবুদার আর মাদুর হয় ছয় ইঞ্চি ডুবে যাওয়া গদির চেয়েও তুলতুলে। জমজমাট ঠাণ্ডায়, পরিপাটি যত্নে, ঝকঝকে তকতকে প্লেটে; সৌরভ ছেত্রী যখন এক থালা ধোঁয়া ওঠা ওয়াইওয়াইয়ের নুডল পরিবেশন করলে; তখন মনে হচ্ছিল ছোকরাকে জড়িয়ে ধরি। সাথে চমৎকার ঘন দুধে তৈরি কফি। নিমেষে এক প্লেট নুডল খতম করে দ্বিতীয় প্লেটের অর্ডার করলাম। সৌরভ আসল কভার ড্রাইভ চালাচ্ছিলে অবিশ্যি একের পর এক নেপালি গান শুনিয়ে। ছেলেটার গলায় সুর আছে বটে।
দ্বিতীয় কফির কাপ হাতে সৌরভের সাথে গপ্প শুরু হল। কলকাতার গল্প। ছেলেটা কলকাতা আসেনি আগে, যাওয়ার খুব শখ। মিনিট পনেরোর মাথায় গুলিয়ে গেল কে ট্যুরিস্ট আর কে পাড়ার ছেলে। তৃতীয় কাপে ফিরে এলো দার্জিলিং আর গোল্ডফ্লেকের অফারে কিচেনের গ্যাস বন্ধ করে পাশে এসে বসলেন ছেত্রী।
দার্জিলিঙের গন্ধ কোন ফাঁকে নাক গলা বেয়ে বুকে এসে নামলো ঠিক টের পাওয়া গেল না। তবে এ'টুকু দিব্যি বোঝা গেল যে পুরুষদের কাছে নিজেকে সৌরভ ছেত্রী বলে পরিচয় দিলেও, অচেনা নারী মাত্রই সে নিজের আসল নামটা তুলে ধরে; "মেরা নাম শাহরুখ ছেত্রী"।
কেভেন্টার্স, জোয়ি'জ পাব সম্ভবত কালকেও ঝুলে থাকবে। শাহরুখ আগামীকালের জন্য স্পেশ্যাল মোমোর প্রতিশ্রুতি সাজিয়ে রেখেছে। এবং ওল্ড মঙ্কে সঙ্গী হতে যে তার বিশেষ আপত্তি নেই, সে'টা বোঝা গেল তার শেষের এক কাপ কফির দাম নিতে অস্বীকার করায়।


- কলকাতা থেকে?
- হ্যাঁ। আপনি?
- ওই। সাবআর্বানের। কত নম্বরে উঠেছেন?
- চারশো এক।
- ওহ। লাকি। সে'খান থেকে তো চমৎকার ভ্যিউ। কাঞ্চনজঙ্ঘা ফ্রম বেড। গতবার ওই রুমই পেয়েছিলাম তো।
- হ্যাঁ। তা ঠিক।
- সানরাইজ কেমন দেখলেন?
- ইয়ে...।
- রঙের খেলা...। চার্মিং বললে কম বলা হয়...তাই না?
- ইয়ে...।
- ইয়ে?
- মানে সানরাইজ দেখার খুবই ইচ্ছে ছিল, তবে...।
- তবে?
- জানালার পর্দা টানা ছিল কিনা, তাই সানরাইজটা ঠিক ভিজিবল হয়নি।
- পর্দা টেনে সানরাইজ দেখছিলেন?
- না মানে, পর্দা টানা না থাকলে ঘরে ভোর ভোর রোদ্দুর আসতে পারে, তা'তে ঘুমের মারাত্মক অসুবিধে।
- আই সী।
- আসি?
- আসুন।


দার্জিলিং -৬


কেভেন্টার্স।
কাঞ্চনজঙ্ঘার গার্নিশংয়ে সস্যেজ হ্যামের জবাব নেই।
ফুরফুরে আলিস্যিতে শিব্রামের পাতা উল্টোতে উল্টোতে কফি আর চিকেন ললিপপের জবাব নেই।
কিন্তু। ওই। সমস্তটাই তো আর জবাবে থাকে না।
"কোথাও যাওয়ার নেই"য়ে যে সুর।
"কিচ্ছু করার নেই"য়ে যে ছ্যাঁত।
সেই সুর আর ছ্যাঁত আপনাকে কেভেন্টার্স দেবে না।
সেই সুর আর ছ্যাঁত দেবেন কমল।
কেভেন্টার্স না হয় ফুলটসের মত আপনার দিকে লোপ্পা হয়ে ঝুলে আসবে। ম্যালে হাঁটতে বেরিয়ে টুক করে ঢুঁ দিলেন কেভেন্টার্সের ছাতে। কমলবাবুর জাদু টের পেতে হলে সামান্য বেশি কাঠখড় পোড়াতে হবে আপনাকে।
প্রথমত, রঙ্গিত ভ্যালি রোপওয়ের টিকিট কাউন্টারের সামনে পৌঁছে জানতে হবে যে টিকিট কাউন্টার সে'দিনের মত বন্ধ হয়ে গেছে।
দ্বিতীয়ত, রোপওয়ে নেই বলেই আপনি টুক করে অকুস্থল থেকে তখনই সরে পড়বেন না।
তৃতীয়ত, রোপওয়ে ফস্কে যাওয়ার দুঃখে জমে থাকা খিদেটাকে চাড় দিয়ে উঠতে হবে।
এই ত্র‍্যহস্পর্শে আপনার চোখের কুয়াশা কেটে যাবে এবং আপনার গোচরে আসবে কমলবাবুর একটা টেবিল আর দু'টো স্টোভ সমৃদ্ধ আস্তানা।
"কোথাও যাওয়ার নেই"য়ে যে সুর।
"কিচ্ছু করার নেই"য়ে যে ছ্যাঁত।
এই দুইয়ে নতজানু হয়ে আপনি দুই হাত পেতে নেবেন পেঁয়াজির প্লেট। আপনার সামনে ফেটিয়ে ভাজা, নরম আঁচে, সযত্নে। সস্নেহে লাল, ওমে মুচমুচে; সত্যিই কামড়ে আদর। কাঞ্চনজঙ্ঘা এক অমোঘ মুহূর্তের জন্য আবছা হয়ে আসবে স্বাদের মেঘে।
তবে কমলবাবুর স্পর্শ সে'টুকুতেই নয়। তাঁর পেঁয়াজী মোমো ছাড়িয়ে রয়েছে গল্প। সে গল্প ছুঁতে আপনাকে চলে যেতে হবে এক প্লেট ভাজা ভাজা স্বাদের ম্যাগিতে। মন রাখা দরকার, আপনার আর কোথাও যাওয়ার নেই, আর কিস্যু করার নেই। সে'খান থেকে আপনাকে একা হাত ধরে টেনে নিয়ে যাবেন কমল।
গল্পে। কমল গিটারে বড় হওয়া মানুষ। আমার বেসুরো গুনগুনে তাঁর পেঁয়াজি ভাজার তাল কেটে যাচ্ছিল বারবার।
"গানা হ্যায় দাদা। মিউজিক। পেয়ার সে গাইয়ে! হড়বড়ি কিউ?", নিতান্তই অপারগ হয়ে বলতে হল কমলবাবুকে।এক গাল হাসি, মুচমুচে। তারপর গল্প। তাঁর পেঁয়াজি ভাজার দুপুরগুলো আর রিনরিনে গিটারের রাতগুলোর। তিনি সহাস্যে জানালেন যে কোনওদিকেই সঙ্গীতের কমতি নেই।
এ শহরে এ'দিক ও'দিক আনাচেকানাচে কী সহজ অবহেলায় গান চাপা দেওয়া আছে। কমলবাবুর পেঁয়াজি বা সৌরভ ছেত্রীর কফির আবডালে কত নিরিবিলি সুর; বুক চাপড়ানি নেই, ইয়ে দেখো উয়ো দেখো নেই। গানের প্রতি আনুগত্য আছে, স্নেহ আছে, পিঠে হাত রাখা উষ্ণতা আছে।
তিন নম্বর প্লেটের পেঁয়াজিতেও মার্জিনাল ইউটিলিটি ডিমিনিশ করেনি। কমলবাবু হাসিমুখে আর পাঁচটা 'কাস্টোমার' সামাল দিতে দিতে জানালেন;
"একলা থেকেও একা থাকা মানুষের সাজে না। যে একবার সঙ্গীত চিনেছে, তাঁকে একা রাখা নামুমকিন। গানা অগর গয়া তো ফির আপকো চলে যানা হ্যায়, কেয়া সমঝে দাদা"?

৭ 


অন্ধকার।
নিঝুম। নিকষ। বাতাসে কনকন। হাফ সোয়েটার আর গায়ে জড়ানো শাল ফুঁড়ে সে কনকন গায়ে পিঠে অনবরত খোঁচা মেরে যায়।
মনোময়বাবুর বড় প্রিয় বেঞ্চি এ'টা। কদ্দিনের পুরনো, কদ্দিনের চেনা। বেঞ্চির সামনে খাদ, তার ও'পাশে শহরতলির মিটিমিটি বাতিগুলো। শহরের নাম হয়, ল্যান্ডমার্কদের ল্যাটিচিউড লঙ্গিচিউড থাকে। আশ্রয়ের পোস্টাল অ্যাড্রেস হয় না। এ বেঞ্চিটা কতকটা তাই। শহরের কোণে পড়ে থাকা এ অঞ্চলের একটা নাম অবশ্যই আছে, সে নামে কেমন ঘাস মাখানো পাহাড়ি গন্ধ। তবে সে নাম বামুনপাড়া বা ময়মনসিংহ হলেও কিছু এসে যেতো না মনোময়বাবুর। মোদ্দা কথা হলো এই খাদ ঘেঁষা বেঞ্চিটা দিব্যি নিরিবিলিতে রয়েছে, সেই কবে থেকে। এই বেঞ্চিতে রাত নামে, বেঞ্চির কাঠে কুয়াশা ও ঠাণ্ডা জমাট হয়ে বসে। রাত্রের দিকে বেঞ্চিটায় কোনও প্রাচীন পেল্লায় গাছের ছায়াময় আত্মার বাস টের পান মনোময়বাবু।
মনোময়বাবু ট্র‍্যাভেলার নন। ক্লার্ক। ডিভোর্সি। বাজাজ স্কুটারিস্ট। মুড়িপ্রিয়। মালদার বাইরে পা রাখার কথা হলেই তাঁর হাত-পা কাঁপে। কিন্তু। এই বেঞ্চির টান মাঝেমাঝেই তাঁকে তাঁর নিয়মের মধ্যে থেকে টেনে হিঁচড়ে বের করে আনে। মোহগ্রস্তের মত ট্রেন বাস ঠেলে এসে ওঠেন এ শহরে। আস্তানা বলতে তামাংবাবুর হোমস্টে। সস্তা, ছিমছাম।
মনোময়বাবু ট্যুরিস্ট নন। সাইট সীয়িংয়ের ইচ্ছে, ধৈর্য বা পয়সা; কোনওটাই তার থাকেনা। তামাং গিন্নীর 'ফুলকা' আর সবজি তিন বেলা খেয়ে দিন তিনেক গুজরান করেন তিনি। দিনের বেলাটা কাটিয়ে দেন ঘরের চৌকিতে। শুয়ে বসে। বেরোতে মন সরে না। ঝুপ করে নামা পাহাড়ি অন্ধকারের আবডাল কে ব্যবহার করে, টুপ করে একটা টিফিন বাক্সে রুটি সবজি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি।
খাদ ঘেঁষে এসে দাঁড়ান। এ জায়গাটা মূল শহরের আওতার বাইরে আর এতই বেমক্কা যে এ বেঞ্চিতে কাউকে তেমন দেখা যায়না। রাত সাড়ে সাতটার পর সমস্তই শুনশান। দিনের বেলা এ জায়গাটাই কেমন ভূতুড়ে ঠেকে মনোময়বাবুর, বেঞ্চিটাকে মনে হয় অচেনা।
এ জায়গাটা রাতে খোলস ছেড়ে বের হয়, তা দিব্যি টের পান মনোময় সাহা। রাতের নিরেট কালো চারদিক আর শীতের ঠকঠকে মিশে যান তিনি। ঝাপসা হয়ে আসে খাদের ওপারের পাহাড়ের গায়ের টুপটাপ বাতিগুলো।
দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করে মনোময় আঁচ করতে পারেন কতকিছু। প্রতিটা আলোর নিচে এক একটা বাড়ি।
সংসার।
গেরস্থালী।
বৌ, বর, বাপ, মা, খোকা, খুকি মিলে একেকটা রুবিক কিউব। তারই মধ্যে বাপ ও খোকা। এবং তাদের গল্প।
বাপেরা খোকাদের অঙ্ক শেখায়?
বইয়ে মলাট দিয়ে দেয়?
গল্প শোনায়? আগডুম বাগডুম?
হাঁটতে বেরোয় হাত ধরে?
বাপেরা খোকাদের মাসে একবার সেলুনে নিয়ে যায়? সপাট বাটি ছাঁট?
রাতে পাহাড়ে দম বন্ধ হয়ে আসে মনোময়বাবুর। ঝাপসা। চিনচিনে।
মাধুরী খোকাকে কি কোনওদিন বলেছে যে তার বাবার কষ্ট হয়? দূরে থাকতে কী কষ্ট। বাপ রে বাপ। খোকা। বেবিপাউডার, বেবীফুড, হসপিটালের গন্ধ মাখা খোকা। তুলতুল করে বড় হয়ে ওঠা খোকা। খোকা। আইনে আইনে দূরে থাকা একটা ছোট্ট টিমটিমে আলোর জ্বলজ্বল ; খোকা। সে আলো ছুঁতে না পারার যে কী যন্ত্রনা। বাপ। বাপের বুকের ভিতরের দগদগটা।
"মা, মা গো", নিজের অজান্তেই মাঝেমাঝে অস্ফুটে ককিয়ে ওঠেন মনোময়বাবু।
খোকা কি জানে পাহাড়ের রাতকালো স্লেটে বসানো প্রতিটা আলোর বিন্দুতে মনোময়বাবু দেখতে পান একটা খাট?
সে খাটের বিছানার সাদা চাদরে লাল কমলা ফুলফুল প্রিন্ট।
সে'খাটের মাথার দিকে জানালা, জানালা ঘেঁষে দুই বাপ ব্যাটা। নীল ওয়াড়ের পাশবালিশ কোলে বাপ গল্প করছে নেপোলিয়নের, মাচ্চুপিচুর, রোমের, টিনটিনের আরও কত কী! ছেলের চোখে ঝিলিক, চোয়াল আলতো ঝুলে।
ঝাপসা। চিনচিনে।
রাতের অন্ধকারে বেঞ্চিটাকে মাঝেমধ্যে "বাবু" বলে ডেকে ফেলেন ভদ্রলোক। "কেউ না বুঝুক, তুই তো বুঝিস"।
ভোরের আলোর সাথে ঝাপসা কেটে যায়। চিনচিন সংযত হয়। তামাংবাবুর আস্তানার দিকে গুটিসুটি ফিরে যান মনোময় সাহা। কে যে কোথায় আশ্রয় কুড়িয়ে পায়।




স্বাদ শুধু জিভের ডগায় মুহূর্তের তড়াক্ নয়।
স্বাদ স্রেফ "ডেলিশাস্ মশাই" বলে বাঘা কামড়ে হামলে পড়া নয়।
স্বাদ গদা নয়, তুলি।
লেদারের সোফাসেট নয়, নরম তোশকের খাট হল স্বাদ। যে খাটের মাথার দিকে জানালা, জানালার ও'পাশে ছোট্ট একটা পার্ক যেখানে বিকেল হলেই খোকাখুকুরা মনের আনন্দে দোল খায়। ছোট্ট স্বাদের দানা জিভ ছুঁয়ে ক্রমশ স্নোবল হয়ে মনে ছড়িয়ে পড়বে, তেমনই একটা ফেনোমেনা হচ্ছে আস্বাদন।
স্বাদে সহজে ভেসে যেতে নেই, আর একবার ভেসে গেলে ভালোবাসায় রাখঢাক রাখতে নেই।
এ লেখার কারণ; আমি ভেসেছি। ঝুমঝুম ভালো লাগা সুর বুকের ভিতর জমা হয়েছে। লোভ নয়, একরকমের আঙুলে আঙুল স্নেহ সেই ভাসিয়ে নেওয়া স্বাদে।
কুঙ্গা রেস্তোরাঁ, দার্জিলিং।
তার চিকেন চীজ মোমো।
নরম তুলতুলে, আদরে সাঁতলানো মুর্গিকুচিতে ঠাসা আর চীজের প্রাচুর্যে পরিপূর্ণ। চীজের কোয়ালিটি ও সুবাস ভিভিএসলক্ষ্মনীয়।
ব্যাপার মোমো বলে নয়। চীজ চিকেন মোমো সর্বত্র ছড়াছড়ি। ব্যাপার হল এ মোমোর মখমলে স্পর্শে যা জিভে মনে রয়ে যায় বহুক্ষণ।
রবি ঘোষের "সো খাইন্ড অফ ইউ"র মত মসৃণ।
উত্তমের হাসির মত ভুবনবিজয়ী খুশবু।
প্রতি কামড়ের চীজ চলকানো উচ্ছ্বাসে সুপ্রিয়ার ঠোঁট কাঁপুনি।
ফাইভস্টারের চকোলেটের ট্যাগলাইন "যো খায়ে খো যায়ে" সবিশেষ ভাবে লাগসই।
কামড় দিয়ে চোখ বুজুন, দেখবেন চারপাশটা ভালোবাসায় লাল, আদরে নীল, চুমুতে আগুন, সোহাগে সবুজ। টের পাবেন, আপ্লুত আর আলোড়িত; এ দুই শব্দের কম্বিনেশন ঠিক কেমন।
আর। এ মোমো প্লেট দুই শেষ করার পর কিছুতেই অন্য কোনও মুখশুদ্ধি চলবে না। এ স্বাদের মসলিনে সামান্য খোঁচাখুঁচিও বরদাস্ত করা চলে না।