Thursday, December 21, 2017

রামশঙ্কর পাকড়াশির ডায়েরি - ১

২১ ডিসেম্বর, ২০১৭, 
রাত বারোটা বেজে দশ মিনিট। 
কলকাতা। 
............

আমার নাম রামশঙ্কর পাকড়াশি। নামের ওজন শুনেই ধরে ফেলা উচিৎ যে নামটা বানানো। অবশ্য সবাই যে চট করে ধরে ফেলতে পারবে তা নয়। ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি; যে কোনও বিষয় আমি তুড়ি মেরে বুঝে ফেলি অথচ আমার আশেপাশের মানুষজন মাথা ঠুকে ঠুকে হন্যে হয়েও সে বিষয়টা ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারেন না। যা হোক, দুনিয়াটা হাফ গবেট আর ফুল গবেটে ভর্তি, সে নিয়ে দুঃখ করে বিশেষ লাভ নেই। 

আর এই বেহেড দুনিয়ায় রামশঙ্কর পাকড়াশি হয়ে জন্মানো যে কী বিশ্রী ব্যাপার! নামটা বানানো কিন্তু এক্সিস্টেনশিয়াল ফ্রাস্ট্রেশনটা জেনুইন। যা হোক, এক গবেট ব্লগারকে শেষ পর্যন্ত বুঝিয়েসুঝিয়ে রাজি করাতে পেরেছি, সে কথা দিয়েছে যে তার ব্লগে আমার রোজনামচা বেনামে (বেনাম বললাম বটে, তবে রামশঙ্কর পাকড়াশি নামটা আমার দিব্যি পছন্দ হয়েছে) প্রকাশ করবে। উপকারটা অবশ্য তারই, তাঁর দরকচা মারা ব্লগের লজ্জা খানিকটা হলেও ঢেকে যাবে আমার কলমের আঁচড়ে। 

যাক গে। সে'সব কথা থাক। 

আমার পরিচয় প্রসঙ্গে বলি; শের শাহর রাজ্য পরিচালনা সম্বন্ধে কিছু কথা কি দু'লাইনে বলা সম্ভব? ডন ব্র্যাডম্যানের ব্যাটিং টেকনিক কি খান দুই ট্যুইট লিখে বোঝানো সম্ভব। তেমনই আমার পরিচয়ও স্যাট্‌ করে দু'চার কথায় ঠাহর করতে পারবেন না। 

বিশ্বাস করুন। পারবেন না। এই যদি আমি বলি আমার বয়স একচল্লিশ, পেশায় সরকারি অফিসের ক্লার্ক, বিয়েথা করিনি আর নেশায় সিগারেটিস্ট; তাহলে কি আমার চরিত্রের ব্যাপ্তিটুকু কোনও ভাবে ধরতে পারবেন? গড়পড়তা মানুষ হলে পারবেন না। তবে আমার বিশ্বাস আমার মূল্য ভবিষ্যতের নোবেল লরিয়েটরা অন্তত ধরতে পারবে। 

ভাবছেন ঠাট্টা করছি? আমার কথাবার্তা শুনে বাবাও তাই ভাবতেন। কী আর করা যাবে বলুন, আমাদের সমাজে যে'টা সবার চেয়ে বড় সমস্যা; পাইকারি মায়োপিয়া। আমার মা অবশ্য বিদুষী ছিলেন; তিনি চিরকাল জানতেন আমি ব্রিলিয়ান্ট। টপাটপ অঙ্কে ফেল করেও মায়ের কনফিডেন্সকে দমিয়ে দিতে পারিনি; মা বুঝতেন যে অঙ্কটঙ্ককে আমি চাইলেই পোষা কুকুরের মত বিস্কুট ছুঁড়ে ল্যাজে খেলাতে পারি। কিন্তু আমায় বাঁধবে এমন দম স্কুল সিলেবাসের কী করে থাকবে? সমগ্র জগত-সংসারের সেই ক্ষমতা নেই। 

অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে? সরকারি অফিসের গ্রেড ফোর ক্লার্ক মানেই সে ব্রিলিয়ান্ট নয় ভেবেছেন? পাঁচটা মেয়ে আমার প্রেম সঠিক ভাবে ধারণ করতে পারেনি, মানছি। কিন্তু ক্ষতিটা কাদের হল? নিউটনের মাথায় আপেল ঝরে না পড়লে ক্ষতি নিউটনের হত না আপেলের? উপমাটা ধরতে না পারলে বুঝবেন যে আপনিও গবেট আর সেমিগবেট স্পেকট্রামের মধ্যে কোথাও আছেন। যা হোক, মন খারাপ করবেন না ভাইটি, আফটার অল আপনি মেজরিটির দলে রয়েছেন।    

ভূমিকাটা একটু লম্বা হল। আমি আবার কীবোর্ডে লিখি না; ধবধবে সাদা ফুলস্কেপ কাগজ আর ফাউন্টেন পেন (আমি ঠিক করেছি নিজের ডায়েরিকে সাহিত্য গুণে ঠকাব না) । একটানা লিখলে আবার আমার কবজি আর আঙুল টনটনে করে ওঠে; একিলিস হীল আর কী। কেউ তো আর নিখুঁত হতে পারে না। ব্র্যাডম্যানেরও টেকনিকে ফাঁক ছিল, রবীন্দ্রনাথেরও দাড়ি কামানোর বাক্স ছিল। এই কবজির টনটন আর আঙুলের চিনচিনের জন্যই সাহিত্যের পরীক্ষাগুলোয় নম্বরটম্বরগুলো একটু কম পেতাম। অবিশ্যি তাই বলে মাঝেমধ্যে আমায় ফেল করানোটা বাড়াবাড়ি ছাড়া আর কিছু ছিল না। আর সে'টা আমার নয় , সিস্টেমের ব্যর্থতা ছিল। সম্ভবত ক্লাস নাইনে; "হে বঙ্গ ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন" নিয়ে একটা প্যারা লিখেছিলাম মনে আছে, ভাবলে আজও চোখে জল আসে। পরীক্ষার খাতাতেও টুপটুপ করে জল গড়িয়ে পড়েছিল। মধুবাবুর প্যাথোস থেকে "বিবিধ রতন" তুলে বিবিধ ভারতীর গানের অনুষ্ঠান নিয়ে দু'চার কথা লিখেছিলাম। তুলে ধরেছিলাম সঞ্চালকের ন্যাকামির প্রাবল্য। আর তারই পাশাপাশি দুঃসাহসিক ভাবে রতনের সঙ্গে শুয়োরের কচু চেনার ন্যাক্‌ নিয়ে চমৎকার একটা ট্যুইস্ট খাটিয়ে এম্পিরিকাল ডেটা চেয়ে প্রশ্ন তুলেছিলাম। ফলে যা হওয়ার তাই হল। তেমন লেখা আর তেমন প্রশ্ন হজম করার ক্ষমতা আমাদের সিস্টেমেরই নেই, আমাদের বাংলার টিচার অমলবাবু তো নস্যি। 

যা হোক। ব্রিলিয়ান্স গোবর নয় যে হাতে এক তাল নিয়ে ফ্যাটাস করে দেওয়ালে ছুঁড়ে মারব। আজ এ'টুকুই থাক। 

মাঝেমধ্যে লিখব'খন। ক'দিন ধরেই মনে হচ্ছিল; এই অপার ব্রিলিয়ান্সের বোঝা আর কদ্দিন বইব। 

দেখি, ডায়েরির মাধ্যমে কতটুকু বিলিয়ে দিতে পারি। 

**** 

(অসম্পূর্ণ)

Saturday, December 16, 2017

মৃদুলবাবু ও মশা

*আজ রাত্রে*

শোওয়ার ঘরের মশারির বাইরে একটা মশা ঘুর ঘুর করছে অনেকক্ষণ থেকে। নতুন ফ্ল্যাটে প্রায় বছর খানেক হতে চলল, মশার উপদ্রব এই প্রথম।
মৃদুলবাবু অবশ্য মশারির ভিতরেই।

মঁমঁমঁমঁ গোছের একটা গা শিরশিরানি শব্দ।  আর পাঁচটা মশার প্যানপ্যানানির মত বিরক্তিকর শব্দ নয়, বরং খানিকটা যান্ত্রিক এবং অস্বস্তিকর।

ঘণ্টাখানেক ধরে চলছে এই মঁমঁমঁমঁ। রাত পৌনে একটা বাজতে চলল। এ'বার একটা হেস্তনেস্ত না করলেই নয়।

মশারির আবডাল ছেড়ে বেরিয়ে এসে ঘরের আলো জ্বাললেন মৃদুলবাবু।

অদ্ভুত। গোটা ঘর জরীপ করেও মশা নজরে পড়ল না, অথচ মঁমঁমঁমঁ শব্দটা কিছুতেই থামছিল না।
গেলাস দুয়েক জল খেয়ে ফের মশারির মধ্যে ফেরত এসে লম্বা হলেন তিনি।

তখনও একটানা মঁমঁমঁমঁ।

মৃদুলবাবুর অস্বস্তিটা চড়চড় করে বাড়তে থাকল। আচমকা টের পেলেন ডান কনুইতে সামান্য জ্বালা। হাত দিয়ে টের পেলেন ফুলে গেছে। কামড়েছে ব্যাটাচ্ছেলে রাস্কেল।

মশাটাকে আরও খান দুই গাল পাড়তে যাবেন কিন্তু তখনই মঁমঁমঁমঁ শব্দটা গেল থেমে। আর বালিশের পাশে রাখা মোবাইল টুং শব্দে বেজে উঠল।

স্ক্রিন অন করে মৃদুলবাবু দেখলেন ব্যাঙ্কের এসএমএস।

**

*বছরখানেক আগে*

- মিস্টার মৃদুল, এই রইল আপনার হাউস লোনের অ্যাপ্রুভাল।
- থ্যাঙ্ক ইউ। আপনাদের ব্যাঙ্কের ইএমআই স্কীম কিন্তু বেশ সস্তা। লোভনীয়।
- মানুষের জন্যই আমাদের ব্যবসা। আগে মানুষ, মুনাফা পরে। আর ইএমাআইয়ের প্রসঙ্গে বলি, মাঝেমধ্যে পেমেন্ট পুরোপুরি করতে না পারলেও চাপ নেবেন না।
- নেব না? হাউজিং লোনের মাসের ইএমআই না পেলে আপনারা বাড়ি থেকে বের করে দেবেন না?
- নেভার।
- গুণ্ডা লেলিয়ে দেবেন না?
- তউবা তউবা। আমাদের অনেক সহজ টেকনিক আছে। ইএমআই উশুলও হবে, অথচ আপনি টেরটি পাবেন না।
- মাইরি? পেনলেস ইএমআই আদায়? টোটালি যন্ত্রণাহীন?
- অলমোস্ট পেনলেস।
- কী'রকম?
- আরে সে'সব পাতি টেকনিকাল ব্যাপার। তবে বললাম তো স্যার, আপনি প্রায় টেরই পাবেন না। দেখছেন না, অল্পদিনেই আমাদের কাস্টোমার বেস কতটা বেড় গেছে!
- আপনারা অনবদ্য।
- আপনারাই আমাদের ভাতরুটি স্যার।
- তা এমন জনদরদী ব্যাঙ্ক আপনাদের,  এমন বিটকেল নাম কেন? ড্রাকুলা ব্যাঙ্ক, এ'টা কোনও নাম হল?

Tuesday, December 12, 2017

সৈনিক ও পোস্টমাস্টার



চারিদিকে বিস্তর গোলাগুলি,  বোমারু বিমান দমাদম তাল ঠুকে যাচ্ছিল শহর জুড়ে। মাঝেমধ্যেই হাড়-হিম করা সব চিৎকার। বেশির ভাগই আর্তনাদ; ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়ার যন্ত্রণা আর বিলাপ। এ'ছাড়া কিছু আস্ফালনও বাতাসে বারুদের গন্ধের সঙ্গে ঘুরঘুর করছিল;
"দুশমনের মুণ্ডু চাই, হারামজাদাদের রক্ত চাই"। 

এত সব কিছু মাঝে। যুদ্ধ বিধ্বস্ত এই আধ চেনা শহরের ঠিক মধ্যিখানে একটা ভাঙাচোরা প্রাসাদের এক কোণে বসে চিঠি লিখছিলেন কম্যান্ডার নেদু। 

ডিয়ার গিন্নী, 

খতরনাক যুদ্ধ চলছে। এ পক্ষ ইট ছুঁড়ছে তো অপর পক্ষ সোজা পাটকেল তাক করছে খুলিতে। রে রে রে রে ব্যাপার। 

খানিক আগেই মড়মড় করে পাশের বাড়িটা ধ্বসে পড়ল। ও'টা হাসপাতাল ছিল এই কিছুদিন আগে পর্যন্ত। কিছুদিন ধরে অবিশ্যি বাড়িটা বেওয়ারিশ পড়েছিল। মড়াদের হাসপাতাল না গেলেও চলে। এই আমি যে'খানে বসে এখন তোমায় চিঠি লিখছি; সে'টা কিছুদিন আগেও লাইব্রেরি ছিল। আমি শিশু সাহিত্যের শেলফের সামনে একটা টুল টেনে বসেছি। বইঠই বেশির ভাগই জ্বলে ছাই, শেলফের মাথায় টাঙানো বিভাগের নামগুলো রয়ে গেছে কোনও ক্রমে।  সেই একই কথা, মড়াদের দেশে লাইব্রেরি রাখা মানে সিগারেটকে চাটনিতে ডুবিয়ে খাওয়া। 

যা হোক, যে কথা বলতে তোমায় চিঠি লেখা। এই চিঠি হাতে পেয়ে একটা গান গাইবে? প্লীজ? মেঘলা দুপুরে কামিনী ফুলের সুবাসের মত সুর খেলে বেড়াবে হাওয়ায়। গাইবে? প্লীজ?

ওই। গোলাগুলির শব্দ এগিয়ে আসছে। এখন চিঠি পোস্ট না করলেই নয়। 

ইতি 
শ্রী শ্রী হাসব্যান্ডবিহারী নেদুগুপ্ত। 

মোটা কাগজের খয়েরী খামে যত্ন করে ঠিকানা লিখলেন নেদু কম্যান্ডার ( আহা, নিজের বাড়ির ঠিকানা লেখা খামের দিকে তাকিয়ে থাকলেও বুকে আরাম লাগে। আহা)।

পোস্টবাক্স হাতের কাছেই ছিল। বুকপকেটের ডাকবাক্সে চিঠি ফেললেন কম্যান্ডার নেদু। 

***

ফুরফুরিয়ে উড়ছিলেন নেদুকুমার! বাতাসে বারুদের সুবাস বিলকুল হাপিশ। মেঘলা আকাশ, ভেজা ভেজা হাওয়া আর তা'তে কামিনী ফুলের আনচান করা সুবাস।  

নেদুগুপ্তের টের পেতে সময় লাগলনো যে আর তিনি কম্যান্ডার নন। মিনিট খানেক হল তার চাকরী পাল্টেছে। 

চারদিকে বড় ভালো লাগা। পোস্টম্যান নেদু গুপ্ত বুঝলেন পোস্টবাক্স ক্লীয়ারেন্সের সময় এসেছে। নেদু বুকপকেটের পোস্ট বাক্স খুলে উঁকি মারলেন; একটাই চিঠি। 
আহা, সে চিঠিতে বুলেটের ছোপ! 
আহাম্মকের দল! যাক গে,চিঠি সামান্য ঝলসেছে বটে, তবে পড়তে অসুবিধে হয় না। 

***

- মিসেস গিন্নীগুপ্ত বাড়ি আছেন?
- কে? পোস্টমাস্টার নাকি?
- তবে আর বলছি কী! চিঠি আছে!
- কার চিঠি?
- বর গুপ্তের! 
- ও মা! তুমি! আচ্ছা মানুষ তো! অমন দুম করে কেউ ঘরবাড়ি ছেড়ে যুদ্ধে যায়? 
- যাহ্‌! তুমি কম খালিফা নও! অমন দুম করে কেউ দু'দিনে জ্বরে সরে পড়ে? 
- সরে না পড়লে চিঠি দিতে আসতে কাকে? 

"খিক খিক" শব্দের বিশ্রী হাসিতে গড়িয়ে পড়তে ভালোবাসেন পোস্টমাস্টার নেদুগুপ্ত। 
মেঘলা দুপুরে কামিনী ফুলের সুবাসের মত গীন্নিগুপ্তের সুর খেলছিল হাওয়ায়।

Friday, December 8, 2017

যুক্তি তর্ক গল্প

“আকাশ কী বিশ্রী রকম নীল দেখেছ”? পকেট থেকে পিতলের ছোট্ট ডিবেটা বের করে এক চিমটি মশলা জোয়ান মুখে ফেলে বলল পার্থ।

লাঞ্চের পর অফিসের নিচে নেমে খানিকক্ষণ আড্ডা দেওয়াটা প্রায় অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। অজিত আর দেবনাথের সঙ্গে আড্ডাটাও এই সময় জমে ভালো। দেবনাথ পার্থর মতই পারচেজ ডিপার্টমেন্টে কাজ করে, অজিত রয়েছে  ফাইনান্সে। খেলাধুলো, সাহিত্য,রাজনীতি, সিনেমা থেকে অফিস-গসিপ; আড্ডা থেকে কিছুই বাদ থাকে না। তবে যা দিনকাল পড়েছে কোনও আড্ডা-তর্কই তো বেশি দিন চলে না। সে দিক থেকে দেখতে গেলে ওদের তিনজনের এই দুপুরের আড্ডার বয়স প্রায় এক বছর হতে চলেছে। দিনের এই সময়টুকু বেশ প্রিয় ছিল পার্থর। সবচেয়ে বড় কথা ওদের তিনজনের মধ্যে গল্প বেশ জমেও ভালো, বেশির ভাগ ব্যাপারেই ওদের মতামত অদ্ভুত ভাবে মিলে যায়।  মিনিট পনেরো গল্প করে একটা সিগারেট ধরায় তিন জনে, তার দশ মিনিটের মাথায় যে যার কাজে ফেরত যায়।

আজকেও যথারীতি দুপুর দেড়টা নাগাদ অফিসের ক্যান্টিনে খেয়েদেয়ে তিনজনে মিলে নিচে নেমে এসেছিল। কিন্তু আগামীকাল থেকে অজিত আর থাকবে না, তিনজনের আড্ডার আজই শেষ দিন। ভাবতেই পার্থর মনটা খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। অজিতের মত ফুরফুরে মেজাজের মানুষ বড় একটা দেখা যায় না। কাজেকর্মেও একই রকম চটপটে। তাছাড়া সিনেমা আর সাহিত্যের ব্যাপারেও ভদ্রলোকের জ্ঞানগম্যি নেহাত কম নয়। সবই ঠিকঠাক চলছিল, হঠাৎ যে আজ কী হল।

মহাকাব্য নিয়ে কথা উঠেছিল। এ কথা সে কথা হতে হতে মহায়ণ প্রসঙ্গ উঠেছিল। স্বাভাবিক ভাবেই পার্থ আর দেবনাথ মহায়ণ নিয়ে নিজেদের ভালো লাগার কথা বলছিল। আজ থেকে শ’খানেক বছর আগে যখন অন্ধকার যুগ চলছিল, তখন  মহায়ণের মত মহাকাব্যকেও লোকে হ্যাঠা করত। সে যুগের হাতে গোনা যে কয়েকজন মহায়ণের গুণগ্রাহী ছিল, তাঁদেরও এই অপূর্ব সাহিত্যগুণ সমৃদ্ধ মহাকাব্যের রসাস্বাদন করতে হত গোপনে। অথচ আজকে সেই মহায়ণ বিশ্ব-দরবারে সমাদৃত, সে কাব্যের অংশ বিশেষ আজ জাতীয় সঙ্গীত, এ নিয়ে দেশের প্রত্যেক মানুষেরই গর্বিত হওয়া উচিত; পার্থ আর দেবনাথের ভাবনাও আর পাঁচটা প্রগতিশীল ভারতীয়র মতই তেমনটাই মনে করত। কিন্তু আজকের চমৎকার আড্ডাটা নষ্ট হল অজিত বেমক্কা উলটো কথা বলায়।

“মহায়ণ অত্যন্ত সস্তা আর নিম্নমানের”। অজিতের এই কথাটা শুনে পার্থ আর দেবনাথ দু’জনেরই মাথা ঘুরে গেছিল।

“তুমি কি পাগল হয়ে গেছ”? দেবনাথ আর পার্থ দু’জনে মিলে অজিতকে নিরস্ত করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সে ব্যাটার জেদ কম নয়। বার বার বলে গেল মহায়ণ নাকি কাব্য-গুণে অত্যন্ত নিম্নমানের। তর্ক শুরু হল, এ’দিকে হাতে সময় কম ছিল।

তার ফলে যা হওয়ার হল। দেবনাথ রাস্তা থেকে একটা আঁধলা ইট ছুঁড়ে মারল অজিতের মাথা লক্ষ্য করে। অজিত একটা ঘা খেয়েই পালাতে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু পার্থ ওকে বাধ্য হয়ে জাপটে ধরে ফেলল। ব্যাটাচ্ছেলের একে গায়ের জোর নেই তার ওপর নিজে একজন হয়ে দু’জনের সঙ্গে তর্ক জুড়েছে। ওকে মাটিতে ফেলে ওর পেটে দমাদম লাথি মারা ছাড়া কোনও উপায় ছিল না। অবশ্য এমন তর্ক কফি হাউসে হলে আজকাল খুব সুবিধে। সে’খানে টেবিলে টেবিলে আজকাল অ্যাসিডের বয়াম আর  অজস্র পেরেকওলা লাঠি রাখা আছে। দুর্বল তর্কবাজের হাড়গোড় ভেঙে, নাড়িভুঁড়ি বের করে দেওয়ার আর বহুরকমের সরঞ্জাম রয়েছে সে’খানে। এমন কী তর্কবাজকে পুরোপুরি নিকেশ করতে ইলেকট্রিক স্লো বার্নিং চুল্লিরও ব্যবস্থাও চালু হয়েছে গতবছর থেকে। সরকারের আমজনতার তর্ক-তৃপ্তির খাতিরে এমন অনেক প্রগতিশীল ব্যবস্থা চালু করেছে ইদানীং; ভাগ্যিস। শোনা যাচ্ছে জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য অ্যাসিডের বয়াম আর পেরেক-লাঠি প্রত্যেক পাড়ার প্রত্যেক রোয়াকে রাখার প্রপোজাল আসছে পরের পঞ্চবার্ষিকী যোজনায়।  পাড়ায় পাড়ায় তর্ক-নিকেশ চুল্লির ব্যবস্থা এখনই করা যাচ্ছে না জমির অভাবে।

যা হোক, পার্থ আর দেবনাথের কাছে তর্কজয়ের জন্য সে’সব আধুনিক সুযোগ সুবিধে না থাকায়, হাতের কাছের জিনিসপত্র নিয়ে কাজ সারতে হল। ফুটপাথে অজিতের মাথা ঠুকতে ঠুকতে যখন অজিতের মাথা থেকে ঘিলু রক্ত সব বেরিয়ে আসছে তখন পার্থর খেয়াল হল লাঞ্চের সময় প্রায় শেষ। তর্ক এখুনি শেষ না করলে সিগারেট খাওয়ার সময় থাকবে না। সে’বার বাস ভাড়া নিয়ে গণ্ডগোল হওয়ার পর থেকে এক শিশি পেট্রোল নিয়েই ঘোরে পার্থ, সে’টাই অজিতের গায়ে ছড়িয়ে দিল সে। দেবনাথ ইঙ্গিত বুঝতে তৎক্ষণাৎ নিজের জ্বলন্ত লাইটারটাই ছুঁড়ে ফেলল অজিতের গায়ে। অমনি দাউদাউ করে তর্ক ফুরিয়ে গেল।

জোয়ান চিবুতে চিবুতে পকেট থেকে গোল্ডফ্লেকের প্যাকেট বার করেই জিভ কাটল পার্থ। এই যাহ! দেবনাথ নিজের লাইটারটা নষ্ট করে ফেলল এ’দিকে পার্থ নিজের লাইটারটা অফিসের ড্রয়ারে ফেলে এসেছে। অগত্যা সিগারেট না খেয়েই দু’জনকে অফিসে ফিরতে হল। অজিতের ডিপার্টমেন্টে একটা মেমো পাঠিয়ে খবরটা জানিয়ে দিতে হবে। পার্থ আর দেবনাথ যখন অফিসের সদর দরজার সামনে তখন আকাশের নীল অনেকটা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে অজিত-পোড়ানো ধোঁয়ায়।


Wednesday, December 6, 2017

অঙ্কের ছ্যাঁত, ছ্যাঁতের অঙ্ক



১। 

মান্তুদা জবাব দিয়ে দিয়েছে। ফাইনালে অঙ্ক পরীক্ষায় ভদ্রস্থ নম্বরের আশা প্রায় নেই বললেই চলে। শুধু যদি কোনও ক্রমে পাশটা করা যায়। কোনও ক্রমে চল্লিশ।

বেশ কিছুদিন ধরে দীপুকে মান্তুদা একা পড়াচ্ছেন। মান্তুদার মতে দীপুর অঙ্ক-ভয়কে ম্যান টু ম্যান মার্কিং না করলে ক্যালামিটি এড়ানো অসম্ভব। গত তিন মাস ধরে প্রতিদিন রাত্রে মান্তুদার বারান্দায় এসে পড়ে থেকেছে দীপু। প্রবাবিলিটি পারমুটেশন অমুক তমুক পড়ানো শেষ হলে মান্তুদা নিজের পকেট রেডিওতে গান শোনাতেন। সাত-পুরনো হিন্দী গান। রোজ।  

"তোর মনে টার্বুলেন্স চলছে। এতগুলো কনসেপ্ট একসঙ্গে মাথায় ঘুরপাক খেয়ে ঘোল পাকাচ্ছে। সেডিমেন্ট জমতে না দিলে মুশকিল। মিউজিক কে ইউটিলাইজ করতে শেখ। নোটেশনেও অঙ্ক থাকে, সে খবর রাখিস তো"? 

ডিসেম্বরের রাত বারান্দাকে জাপটে ধরত। দীপুর হাফ সোয়েটার ছাপিয়ে গা শিরশির।  মান্তুদার টেবিলে তাল দেওয়া। দীপুর বুকে " আর হল না" গোছের ছ্যাঁত ছ্যাঁত। 

বারান্দা পেরিয়ে মান্তুদার বাবার নিজের হাতে চাষ করা গোলাপ বাগান। সে বাগানের ও'পাশে গোলাপের সুবাসকে জুতোপেটা করা সারের ঢিপি। তার ও'পাশে সরু গলি। গলির ও'পাশে নীল রঙের দোতলা বাড়ি। 

সেই দোতলার ব্যালকনিতে আবছায়ার সঙ্গে মিশে যেত মান্তুদার রেডিওর "রাহ্‌ হে পড়ে হ্যায় হম কব সে আপ কি কসম, দেখিয়ে তো কম সে কম, বোলিয়ে না বোলিয়ে, হম হ্যায় রাহি পেয়ার কে হম সে কুছ না বোলিয়ে"। 

আবছায়ায় গান আর বাতাসের গুঁড়ো গুঁড়ো শীত মিলে মিশে সে বারান্দায় তৈরি হত নীল রঙের শালের পায়চারি। নীল শাল জানে রাস্তার ও'দিকের বারান্দায় অঙ্ক কাহিল কলজের থেবড়ে বসে থাকা। নীল শাল অঙ্কে তুখোড়, মায়ায় নিখুঁত। 

বুকের ছ্যাঁত নরম হয়ে আসত। দুপুরের জমানো রোদ আর অল্প ন্যাপথালিন মেশানো লেপের সুবাস, ঠাকুমার ছ্যাঁচা পানের স্বাদ আর মায়ের হাতে মাখা আলুসেদ্ধ; সমস্ত মিলে মনের অসোয়াস্তি কমে আসত। দীপুর বুকের ভিতরের যাবতীয় "হল না" ভাব উবে যেত।  
ব্যালকনির গুনগুন আর রেডিওর মিনমিন বাতাসে মিশে অন্য ছ্যাঁত তৈরি হত 
"দিল পে আসরা কিয়ে, হম তো বস ইউ হি জিয়ে, 
এক কদম পে হস লিয়ে, এক কদম পে রোল লিয়ে"।  


২।

"দীপক, ডু ইউ হ্যাভ এনি আইডিয়া এই কোয়ার্টারের মার্কেট শেয়ার কতটা নেমেছে"?

"ইয়েস স্যর? আমায় কিছু বললেন"?

"হোয়াটস রং উইথ ইউ? তোমার মার্কেট শেয়ার প্লাঞ্জ করছে আর তুমি ক্লুলেস হয়ে বসে রয়েছ"? 

দীপকের কানে বুকে দমাদম আছাড় খেতে থাকে উৎকট সব অর্থহীন শব্দ; মার্কেটশেয়ার, রেস্পন্সিবিলিটি, টার্গেটস, ফোকাস...আরও কত কী। শহরের ঠুঁটো ডিসেম্বরে মান্তুদার রেডিও খাপ খেত না কিছুতেই। বুকে ছ্যাঁত জমতে শুরু করে, স্পষ্ট টের পায় দীপক।  

ছ্যাঁতছ্যাঁতের মেঘ ক্রমশ ডাগর হয়ে বুক ভারি করে ফেলে। দীপুর আঙুলগুলো তিরতির করে কাঁপতে থাকে। নোটেশনেও অঙ্ক থাকে।  মান্তুদার ফতুয়ার পকেট থেকে বেরোনো নীল কালো রেডিওটার কথা মনে পড়ে দীপুর। বারান্দার ও'পাশে গোলাপ বাগান, তার ও'পাশে রাস্তা, রাস্তার ও'দিকে দোতলা বাড়ি। ব্যালকনি। 

"দর্দ ভি হমে কবুল, চ্যেন ভি হমে কবুল 
হমনে হর তরহ কে ফুল হার মে পিরো লিয়ে"। 

দীপু বুকের মধ্যে অঙ্ক পরীক্ষা মার্কা "হল না"র জাপ্টে ধরা টের পায়। "আর হল না"গুলো  আর উবে যেতে পারে না। 

নীল শালের "বাবু দেখিস, সব ঠিক হয়ে যাবে" মার্কা অপ্রয়োজনীয় স্প্যাম এসএমএস ডিলিটি করে, মার্কেট শেয়ারের জরুরী স্প্রেডশিটে চোখ রাখেন দীপক চ্যাটার্জী।  ইয়ারফোনে ছ্যাঁত-রেগুলেটর:

"ধুপ থি নসীব মে, ধুপ মে লিয়া হ্যায় দম, 
চাঁদনী মিলি তো হম, চাঁদনী মে সো লিয়ে"।