Tuesday, December 12, 2017

সৈনিক ও পোস্টমাস্টার



চারিদিকে বিস্তর গোলাগুলি,  বোমারু বিমান দমাদম তাল ঠুকে যাচ্ছিল শহর জুড়ে। মাঝেমধ্যেই হাড়-হিম করা সব চিৎকার। বেশির ভাগই আর্তনাদ; ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়ার যন্ত্রণা আর বিলাপ। এ'ছাড়া কিছু আস্ফালনও বাতাসে বারুদের গন্ধের সঙ্গে ঘুরঘুর করছিল;
"দুশমনের মুণ্ডু চাই, হারামজাদাদের রক্ত চাই"। 

এত সব কিছু মাঝে। যুদ্ধ বিধ্বস্ত এই আধ চেনা শহরের ঠিক মধ্যিখানে একটা ভাঙাচোরা প্রাসাদের এক কোণে বসে চিঠি লিখছিলেন কম্যান্ডার নেদু। 

ডিয়ার গিন্নী, 

খতরনাক যুদ্ধ চলছে। এ পক্ষ ইট ছুঁড়ছে তো অপর পক্ষ সোজা পাটকেল তাক করছে খুলিতে। রে রে রে রে ব্যাপার। 

খানিক আগেই মড়মড় করে পাশের বাড়িটা ধ্বসে পড়ল। ও'টা হাসপাতাল ছিল এই কিছুদিন আগে পর্যন্ত। কিছুদিন ধরে অবিশ্যি বাড়িটা বেওয়ারিশ পড়েছিল। মড়াদের হাসপাতাল না গেলেও চলে। এই আমি যে'খানে বসে এখন তোমায় চিঠি লিখছি; সে'টা কিছুদিন আগেও লাইব্রেরি ছিল। আমি শিশু সাহিত্যের শেলফের সামনে একটা টুল টেনে বসেছি। বইঠই বেশির ভাগই জ্বলে ছাই, শেলফের মাথায় টাঙানো বিভাগের নামগুলো রয়ে গেছে কোনও ক্রমে।  সেই একই কথা, মড়াদের দেশে লাইব্রেরি রাখা মানে সিগারেটকে চাটনিতে ডুবিয়ে খাওয়া। 

যা হোক, যে কথা বলতে তোমায় চিঠি লেখা। এই চিঠি হাতে পেয়ে একটা গান গাইবে? প্লীজ? মেঘলা দুপুরে কামিনী ফুলের সুবাসের মত সুর খেলে বেড়াবে হাওয়ায়। গাইবে? প্লীজ?

ওই। গোলাগুলির শব্দ এগিয়ে আসছে। এখন চিঠি পোস্ট না করলেই নয়। 

ইতি 
শ্রী শ্রী হাসব্যান্ডবিহারী নেদুগুপ্ত। 

মোটা কাগজের খয়েরী খামে যত্ন করে ঠিকানা লিখলেন নেদু কম্যান্ডার ( আহা, নিজের বাড়ির ঠিকানা লেখা খামের দিকে তাকিয়ে থাকলেও বুকে আরাম লাগে। আহা)।

পোস্টবাক্স হাতের কাছেই ছিল। বুকপকেটের ডাকবাক্সে চিঠি ফেললেন কম্যান্ডার নেদু। 

***

ফুরফুরিয়ে উড়ছিলেন নেদুকুমার! বাতাসে বারুদের সুবাস বিলকুল হাপিশ। মেঘলা আকাশ, ভেজা ভেজা হাওয়া আর তা'তে কামিনী ফুলের আনচান করা সুবাস।  

নেদুগুপ্তের টের পেতে সময় লাগলনো যে আর তিনি কম্যান্ডার নন। মিনিট খানেক হল তার চাকরী পাল্টেছে। 

চারদিকে বড় ভালো লাগা। পোস্টম্যান নেদু গুপ্ত বুঝলেন পোস্টবাক্স ক্লীয়ারেন্সের সময় এসেছে। নেদু বুকপকেটের পোস্ট বাক্স খুলে উঁকি মারলেন; একটাই চিঠি। 
আহা, সে চিঠিতে বুলেটের ছোপ! 
আহাম্মকের দল! যাক গে,চিঠি সামান্য ঝলসেছে বটে, তবে পড়তে অসুবিধে হয় না। 

***

- মিসেস গিন্নীগুপ্ত বাড়ি আছেন?
- কে? পোস্টমাস্টার নাকি?
- তবে আর বলছি কী! চিঠি আছে!
- কার চিঠি?
- বর গুপ্তের! 
- ও মা! তুমি! আচ্ছা মানুষ তো! অমন দুম করে কেউ ঘরবাড়ি ছেড়ে যুদ্ধে যায়? 
- যাহ্‌! তুমি কম খালিফা নও! অমন দুম করে কেউ দু'দিনে জ্বরে সরে পড়ে? 
- সরে না পড়লে চিঠি দিতে আসতে কাকে? 

"খিক খিক" শব্দের বিশ্রী হাসিতে গড়িয়ে পড়তে ভালোবাসেন পোস্টমাস্টার নেদুগুপ্ত। 
মেঘলা দুপুরে কামিনী ফুলের সুবাসের মত গীন্নিগুপ্তের সুর খেলছিল হাওয়ায়।

Friday, December 8, 2017

যুক্তি তর্ক গল্প

“আকাশ কী বিশ্রী রকম নীল দেখেছ”? পকেট থেকে পিতলের ছোট্ট ডিবেটা বের করে এক চিমটি মশলা জোয়ান মুখে ফেলে বলল পার্থ।

লাঞ্চের পর অফিসের নিচে নেমে খানিকক্ষণ আড্ডা দেওয়াটা প্রায় অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। অজিত আর দেবনাথের সঙ্গে আড্ডাটাও এই সময় জমে ভালো। দেবনাথ পার্থর মতই পারচেজ ডিপার্টমেন্টে কাজ করে, অজিত রয়েছে  ফাইনান্সে। খেলাধুলো, সাহিত্য,রাজনীতি, সিনেমা থেকে অফিস-গসিপ; আড্ডা থেকে কিছুই বাদ থাকে না। তবে যা দিনকাল পড়েছে কোনও আড্ডা-তর্কই তো বেশি দিন চলে না। সে দিক থেকে দেখতে গেলে ওদের তিনজনের এই দুপুরের আড্ডার বয়স প্রায় এক বছর হতে চলেছে। দিনের এই সময়টুকু বেশ প্রিয় ছিল পার্থর। সবচেয়ে বড় কথা ওদের তিনজনের মধ্যে গল্প বেশ জমেও ভালো, বেশির ভাগ ব্যাপারেই ওদের মতামত অদ্ভুত ভাবে মিলে যায়।  মিনিট পনেরো গল্প করে একটা সিগারেট ধরায় তিন জনে, তার দশ মিনিটের মাথায় যে যার কাজে ফেরত যায়।

আজকেও যথারীতি দুপুর দেড়টা নাগাদ অফিসের ক্যান্টিনে খেয়েদেয়ে তিনজনে মিলে নিচে নেমে এসেছিল। কিন্তু আগামীকাল থেকে অজিত আর থাকবে না, তিনজনের আড্ডার আজই শেষ দিন। ভাবতেই পার্থর মনটা খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। অজিতের মত ফুরফুরে মেজাজের মানুষ বড় একটা দেখা যায় না। কাজেকর্মেও একই রকম চটপটে। তাছাড়া সিনেমা আর সাহিত্যের ব্যাপারেও ভদ্রলোকের জ্ঞানগম্যি নেহাত কম নয়। সবই ঠিকঠাক চলছিল, হঠাৎ যে আজ কী হল।

মহাকাব্য নিয়ে কথা উঠেছিল। এ কথা সে কথা হতে হতে মহায়ণ প্রসঙ্গ উঠেছিল। স্বাভাবিক ভাবেই পার্থ আর দেবনাথ মহায়ণ নিয়ে নিজেদের ভালো লাগার কথা বলছিল। আজ থেকে শ’খানেক বছর আগে যখন অন্ধকার যুগ চলছিল, তখন  মহায়ণের মত মহাকাব্যকেও লোকে হ্যাঠা করত। সে যুগের হাতে গোনা যে কয়েকজন মহায়ণের গুণগ্রাহী ছিল, তাঁদেরও এই অপূর্ব সাহিত্যগুণ সমৃদ্ধ মহাকাব্যের রসাস্বাদন করতে হত গোপনে। অথচ আজকে সেই মহায়ণ বিশ্ব-দরবারে সমাদৃত, সে কাব্যের অংশ বিশেষ আজ জাতীয় সঙ্গীত, এ নিয়ে দেশের প্রত্যেক মানুষেরই গর্বিত হওয়া উচিত; পার্থ আর দেবনাথের ভাবনাও আর পাঁচটা প্রগতিশীল ভারতীয়র মতই তেমনটাই মনে করত। কিন্তু আজকের চমৎকার আড্ডাটা নষ্ট হল অজিত বেমক্কা উলটো কথা বলায়।

“মহায়ণ অত্যন্ত সস্তা আর নিম্নমানের”। অজিতের এই কথাটা শুনে পার্থ আর দেবনাথ দু’জনেরই মাথা ঘুরে গেছিল।

“তুমি কি পাগল হয়ে গেছ”? দেবনাথ আর পার্থ দু’জনে মিলে অজিতকে নিরস্ত করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সে ব্যাটার জেদ কম নয়। বার বার বলে গেল মহায়ণ নাকি কাব্য-গুণে অত্যন্ত নিম্নমানের। তর্ক শুরু হল, এ’দিকে হাতে সময় কম ছিল।

তার ফলে যা হওয়ার হল। দেবনাথ রাস্তা থেকে একটা আঁধলা ইট ছুঁড়ে মারল অজিতের মাথা লক্ষ্য করে। অজিত একটা ঘা খেয়েই পালাতে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু পার্থ ওকে বাধ্য হয়ে জাপটে ধরে ফেলল। ব্যাটাচ্ছেলের একে গায়ের জোর নেই তার ওপর নিজে একজন হয়ে দু’জনের সঙ্গে তর্ক জুড়েছে। ওকে মাটিতে ফেলে ওর পেটে দমাদম লাথি মারা ছাড়া কোনও উপায় ছিল না। অবশ্য এমন তর্ক কফি হাউসে হলে আজকাল খুব সুবিধে। সে’খানে টেবিলে টেবিলে আজকাল অ্যাসিডের বয়াম আর  অজস্র পেরেকওলা লাঠি রাখা আছে। দুর্বল তর্কবাজের হাড়গোড় ভেঙে, নাড়িভুঁড়ি বের করে দেওয়ার আর বহুরকমের সরঞ্জাম রয়েছে সে’খানে। এমন কী তর্কবাজকে পুরোপুরি নিকেশ করতে ইলেকট্রিক স্লো বার্নিং চুল্লিরও ব্যবস্থাও চালু হয়েছে গতবছর থেকে। সরকারের আমজনতার তর্ক-তৃপ্তির খাতিরে এমন অনেক প্রগতিশীল ব্যবস্থা চালু করেছে ইদানীং; ভাগ্যিস। শোনা যাচ্ছে জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য অ্যাসিডের বয়াম আর পেরেক-লাঠি প্রত্যেক পাড়ার প্রত্যেক রোয়াকে রাখার প্রপোজাল আসছে পরের পঞ্চবার্ষিকী যোজনায়।  পাড়ায় পাড়ায় তর্ক-নিকেশ চুল্লির ব্যবস্থা এখনই করা যাচ্ছে না জমির অভাবে।

যা হোক, পার্থ আর দেবনাথের কাছে তর্কজয়ের জন্য সে’সব আধুনিক সুযোগ সুবিধে না থাকায়, হাতের কাছের জিনিসপত্র নিয়ে কাজ সারতে হল। ফুটপাথে অজিতের মাথা ঠুকতে ঠুকতে যখন অজিতের মাথা থেকে ঘিলু রক্ত সব বেরিয়ে আসছে তখন পার্থর খেয়াল হল লাঞ্চের সময় প্রায় শেষ। তর্ক এখুনি শেষ না করলে সিগারেট খাওয়ার সময় থাকবে না। সে’বার বাস ভাড়া নিয়ে গণ্ডগোল হওয়ার পর থেকে এক শিশি পেট্রোল নিয়েই ঘোরে পার্থ, সে’টাই অজিতের গায়ে ছড়িয়ে দিল সে। দেবনাথ ইঙ্গিত বুঝতে তৎক্ষণাৎ নিজের জ্বলন্ত লাইটারটাই ছুঁড়ে ফেলল অজিতের গায়ে। অমনি দাউদাউ করে তর্ক ফুরিয়ে গেল।

জোয়ান চিবুতে চিবুতে পকেট থেকে গোল্ডফ্লেকের প্যাকেট বার করেই জিভ কাটল পার্থ। এই যাহ! দেবনাথ নিজের লাইটারটা নষ্ট করে ফেলল এ’দিকে পার্থ নিজের লাইটারটা অফিসের ড্রয়ারে ফেলে এসেছে। অগত্যা সিগারেট না খেয়েই দু’জনকে অফিসে ফিরতে হল। অজিতের ডিপার্টমেন্টে একটা মেমো পাঠিয়ে খবরটা জানিয়ে দিতে হবে। পার্থ আর দেবনাথ যখন অফিসের সদর দরজার সামনে তখন আকাশের নীল অনেকটা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে অজিত-পোড়ানো ধোঁয়ায়।


Wednesday, December 6, 2017

অঙ্কের ছ্যাঁত, ছ্যাঁতের অঙ্ক



১। 

মান্তুদা জবাব দিয়ে দিয়েছে। ফাইনালে অঙ্ক পরীক্ষায় ভদ্রস্থ নম্বরের আশা প্রায় নেই বললেই চলে। শুধু যদি কোনও ক্রমে পাশটা করা যায়। কোনও ক্রমে চল্লিশ।

বেশ কিছুদিন ধরে দীপুকে মান্তুদা একা পড়াচ্ছেন। মান্তুদার মতে দীপুর অঙ্ক-ভয়কে ম্যান টু ম্যান মার্কিং না করলে ক্যালামিটি এড়ানো অসম্ভব। গত তিন মাস ধরে প্রতিদিন রাত্রে মান্তুদার বারান্দায় এসে পড়ে থেকেছে দীপু। প্রবাবিলিটি পারমুটেশন অমুক তমুক পড়ানো শেষ হলে মান্তুদা নিজের পকেট রেডিওতে গান শোনাতেন। সাত-পুরনো হিন্দী গান। রোজ।  

"তোর মনে টার্বুলেন্স চলছে। এতগুলো কনসেপ্ট একসঙ্গে মাথায় ঘুরপাক খেয়ে ঘোল পাকাচ্ছে। সেডিমেন্ট জমতে না দিলে মুশকিল। মিউজিক কে ইউটিলাইজ করতে শেখ। নোটেশনেও অঙ্ক থাকে, সে খবর রাখিস তো"? 

ডিসেম্বরের রাত বারান্দাকে জাপটে ধরত। দীপুর হাফ সোয়েটার ছাপিয়ে গা শিরশির।  মান্তুদার টেবিলে তাল দেওয়া। দীপুর বুকে " আর হল না" গোছের ছ্যাঁত ছ্যাঁত। 

বারান্দা পেরিয়ে মান্তুদার বাবার নিজের হাতে চাষ করা গোলাপ বাগান। সে বাগানের ও'পাশে গোলাপের সুবাসকে জুতোপেটা করা সারের ঢিপি। তার ও'পাশে সরু গলি। গলির ও'পাশে নীল রঙের দোতলা বাড়ি। 

সেই দোতলার ব্যালকনিতে আবছায়ার সঙ্গে মিশে যেত মান্তুদার রেডিওর "রাহ্‌ হে পড়ে হ্যায় হম কব সে আপ কি কসম, দেখিয়ে তো কম সে কম, বোলিয়ে না বোলিয়ে, হম হ্যায় রাহি পেয়ার কে হম সে কুছ না বোলিয়ে"। 

আবছায়ায় গান আর বাতাসের গুঁড়ো গুঁড়ো শীত মিলে মিশে সে বারান্দায় তৈরি হত নীল রঙের শালের পায়চারি। নীল শাল জানে রাস্তার ও'দিকের বারান্দায় অঙ্ক কাহিল কলজের থেবড়ে বসে থাকা। নীল শাল অঙ্কে তুখোড়, মায়ায় নিখুঁত। 

বুকের ছ্যাঁত নরম হয়ে আসত। দুপুরের জমানো রোদ আর অল্প ন্যাপথালিন মেশানো লেপের সুবাস, ঠাকুমার ছ্যাঁচা পানের স্বাদ আর মায়ের হাতে মাখা আলুসেদ্ধ; সমস্ত মিলে মনের অসোয়াস্তি কমে আসত। দীপুর বুকের ভিতরের যাবতীয় "হল না" ভাব উবে যেত।  
ব্যালকনির গুনগুন আর রেডিওর মিনমিন বাতাসে মিশে অন্য ছ্যাঁত তৈরি হত 
"দিল পে আসরা কিয়ে, হম তো বস ইউ হি জিয়ে, 
এক কদম পে হস লিয়ে, এক কদম পে রোল লিয়ে"।  


২।

"দীপক, ডু ইউ হ্যাভ এনি আইডিয়া এই কোয়ার্টারের মার্কেট শেয়ার কতটা নেমেছে"?

"ইয়েস স্যর? আমায় কিছু বললেন"?

"হোয়াটস রং উইথ ইউ? তোমার মার্কেট শেয়ার প্লাঞ্জ করছে আর তুমি ক্লুলেস হয়ে বসে রয়েছ"? 

দীপকের কানে বুকে দমাদম আছাড় খেতে থাকে উৎকট সব অর্থহীন শব্দ; মার্কেটশেয়ার, রেস্পন্সিবিলিটি, টার্গেটস, ফোকাস...আরও কত কী। শহরের ঠুঁটো ডিসেম্বরে মান্তুদার রেডিও খাপ খেত না কিছুতেই। বুকে ছ্যাঁত জমতে শুরু করে, স্পষ্ট টের পায় দীপক।  

ছ্যাঁতছ্যাঁতের মেঘ ক্রমশ ডাগর হয়ে বুক ভারি করে ফেলে। দীপুর আঙুলগুলো তিরতির করে কাঁপতে থাকে। নোটেশনেও অঙ্ক থাকে।  মান্তুদার ফতুয়ার পকেট থেকে বেরোনো নীল কালো রেডিওটার কথা মনে পড়ে দীপুর। বারান্দার ও'পাশে গোলাপ বাগান, তার ও'পাশে রাস্তা, রাস্তার ও'দিকে দোতলা বাড়ি। ব্যালকনি। 

"দর্দ ভি হমে কবুল, চ্যেন ভি হমে কবুল 
হমনে হর তরহ কে ফুল হার মে পিরো লিয়ে"। 

দীপু বুকের মধ্যে অঙ্ক পরীক্ষা মার্কা "হল না"র জাপ্টে ধরা টের পায়। "আর হল না"গুলো  আর উবে যেতে পারে না। 

নীল শালের "বাবু দেখিস, সব ঠিক হয়ে যাবে" মার্কা অপ্রয়োজনীয় স্প্যাম এসএমএস ডিলিটি করে, মার্কেট শেয়ারের জরুরী স্প্রেডশিটে চোখ রাখেন দীপক চ্যাটার্জী।  ইয়ারফোনে ছ্যাঁত-রেগুলেটর:

"ধুপ থি নসীব মে, ধুপ মে লিয়া হ্যায় দম, 
চাঁদনী মিলি তো হম, চাঁদনী মে সো লিয়ে"।  

Saturday, November 18, 2017

কাগজের টুকরো

অন্তত পনেরো বছর পর বাপ্পাদার সঙ্গে দেখা।

দক্ষিণ পাড়ার সর্বকালের সেরা অফ স্পিনার বাপ্পাদা। বিনি পয়সায় পাড়ার কুচেকাঁচাদের অঙ্ক আর আঁকা শেখানো বাপ্পাদা। বুল্টিদির এক ধমকে চেনস্মোকার থেকে চুইংগাম সর্বস্ব বাপ্পাদা। পুজোয় ধুনুচি নাচ, ভোগ বিতরণ আর লক্ষ্মী পুজোয় আলপনা স্পেশালিস্ট বাপ্পাদা। ছোটদের থিয়াটারের ডিরেক্টর বাপ্পাদা।

সব ঠিকঠাক ছিল। ইনকাম ট্যাক্স ডিপার্টমেন্টে একটা চাকরী পেয়েছিল, বুল্টিদির সঙ্গে বিয়ে ঠিক। সাজানো গোছানো ছিমছাম। রঙ ওঠা ফ্যাকাসে গোলাপি বালিশের ওয়াড়ের মত ভালোলাগা চারদিকে।  আমরা মাঝেমধ্যেই বাপ্পাদার কাছে বৌভাতের মেনুর খোঁজখবর নিচ্ছি আর ওর থেকে "ডেঁপো ছেলের দল" মার্কা এন্তার কানমলা খাচ্ছি। ইন্টার-পাড়া ক্রিকেটে বাপ্পাদা উইকেট নিলেই বুল্টিদির ফর্সা কান দুটো টকটকে লাল হয়ে উঠছে।

আমরা সবাই বাপ্পাদা হতে চাইতাম। আমরা সবাই স্বপ্ন দেখতাম আমাদের লেখা কবিতার চিরকুট বুল্টিদির মত কারুর কেমিস্ট্রির বইয়ের বুকমার্ক হবে।

বাপ্পাদা-বুল্টিদির বিয়ে জানুয়ারিতে হবে বলে ঠিক ছিল। নভেম্বরের শেষের দিকে বাপ্পাদার বাবা স্বদেশ জ্যেঠু মারা গেলেন। সেরিব্রাল। আমরা বাপ্পাদাকে কাঁদতে দেখিনি; আগেও না, সে'দিনও না।

স্বদেশ জ্যেঠুকে পোড়ানো শেষ হয়েছিল সন্ধে সাতটা নাগাদ। বাপ্পাদা গোটা রাত গঙ্গার ধারে কাটিয়েছিল। সঙ্গে ছিলাম আমরা দু'তিনজন।
মাঝরাতের পর বাপ্পাদা গেম থিওরি নিয়ে ঘণ্টাখানেক আলোচনা করেছিল। ভোর তিনটে নাগাদ "চলি" বলে ঘাট ছেড়ে গেছিল, তারপর থেকে পনেরো বছর পাড়ার কেউ ওর দেখা পায়নি।

সেই বাপ্পাদা। হঠাৎ আবার। হাড় জিরজিরে চেহারা, একমুখ দাড়িগোঁফ। গলার স্বর ক্ষীণ।

আমায় চিনতে ওকে নিশ্চয়ই বেগ পেতে হয়নি। তবু প্রথম ঘণ্টাখানেক কোনও কথা বলেনি। দু'জনে চা খেলাম, ডিমভাজা কিনে অফার করতেও আপত্তি করলে না। বাড়ি ফিরেছে কিনা জিজ্ঞেস করাতে মাথা নেড়ে না বললে।

অনেকক্ষণ পর জিজ্ঞেস করল "তুই কেমন আছিস"?

সেই বাপ্পাদা। আমায় অঙ্কে ঠেলেঠুলে পাশ করানো বাপ্পাদা। সোমাকে লেখা গোপন চিঠির বানান ঠিক করে দেওয়া বাপ্পাদা। "তুই কেমন আছিস"টুকুতে গলার কাছে দলা পাকিয়ে ওঠাটা অস্বাভাবিক নয়।

অথচ বাপ্পাদার চোখে যেন কাচ বসানো। স্থির, অবিচল।
নিজের চাকরীর কথা জানালাম। ঘাড় নাড়া দেখে মনে হল অখুশি হয়নি।
"ট্যাক্স ফাঁকি দিস না কোনওদিন",  বেমক্কা জোর দিয়ে বলে ডিমভাজার প্লেটটা খটাস করে নামিয়ে রাখল মধুদার দোকানের বেঞ্চিতে।

"কোথায় চললে বাপ্পাদা? বৃষ্টি পড়ছে তো। অন্তত আমাদের বাড়ি চলো আজ"।

"উপায় নেই"।

"বাপ্পাদা প্লীজ, একবার ক্লাবে যাবে না? রুরু, তপুরা তোমায় দেখলে..."।

"চারদিকে ফড়ফড়িয়ে টেবিল ফ্যান চলছে রে"।

"টে...টেবল ফ্যান"?

"টেবিল ফ্যান। ফুলস্পীডে ঘুরছে। আর আমি...কাগজের টুকরো। যা বুঝলাম, বাবা পেপারওয়েট ছিল রে। বাবা যাওয়ার পর, আমার ভেসে যাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না"।

"বুল্টিদি এখন ক্যানাডায়। ওর বর ওখানে..."।

"পেপারওয়েট। বুল্টি বেচারিও চিরকুট, তবে সে কাগজের গায়ে দামী ফাউন্টেন পেনে দরদী হাতের লেখায় কীটস কোট করা। আমার মত হিজিবিজি বাজারের ফর্দ নয়। আর যে'টা বললাম মনে রাখিস, ট্যাক্স ফাঁকি দিস না কোনওদিন। আর বানান ভুল নৈবচ। ডিমটা বড় ভালো ভেজেছিল মধুদা। তোর অ্যালজেব্রা আর ব্যাটিং স্টান্সের ঋণ শোধ হল। আসি, কেমন"?

মুখোমুখি বসিবার

- এক্সকিউজ মী!

- আমায়? আমায় বলছেন কিছু?

- আরে ক'টা লোক আছে এখন মেট্রোতে?

- অদ্ভুত। তাই তো। এই মাত্র ভিড় ছিল। এখন শুধু আপনি আর আমি।  স্ট্রেঞ্জ। 

- খবরের কাগজে মুখ গুঁজে থাকলে ওই হবে। ভিড়  আচমকা গায়েব। কামরায় শুধু আমরা দু'জনে। আর সমস্যাটা সে'খানেই...। 

- ওহ মাই গড! 

- যাক, ধরতে পেরেছেন তা'হলে!

- অবিশ্বাস্য! অভাবনীয়! 

- নয়ত আপনাকে ডাকলাম কেন বলুন!। 

- আপনি...আপনি অবিকল আমার মত।

- অথবা আপনি অবিকল আমার মত। 

- আমার দু'জনেই...। 

- সেম টু সেম। 

- ভাবা যায়?

- দশ মিনিট আগেও ভাবতে পারতাম না । কিন্তু এখন স্পষ্ট দেখতে পারছি। 

- অবিকল এক চেহারা। শুধু তাই নয়। একই পোশাক। একই চশমার ফ্রেম। আপনার গাল দেখে মনে হচ্ছে দাড়ি দু'দিন আগে কামিয়েছেন। 

- পরশু সকালে। করেক্ট। আটটা নাগাদ। 

- একদম তাই। গত পরশু সকাল আটটা নাগাদ। ভুল রেজার চালানোয় থুতনির কাছের কাটা দাগটা এখনও টাটকা আমার চিবুকে। 

- আমারই মত। আর আপনার বুকপকেটে ডালের ছিটে। 

- আপনার বুকপকেটের মতই । তাড়াহুড়োয় লাঞ্চ করতে গিয়ে...। 

- এগজ্যাক্টলি। তা'হলে কী বুঝছেন?

- দাঁড়ান। একটু ভেবে উঠতে দিন...মেট্রোটা কালীঘাট পেরোতেই...। বিস্ফোরণ। 

- ওহ হো!। মনে পড়েছে। ঠিক। বিস্ফোরণ। তবে কালীঘাট পেরোনোর পরে নয়, কালীঘাট ঢোকার মুখে। 

- না না, স্পষ্ট মনে আছে। কালীঘাট পেরোনোর পর। 

- ধুর। তা হবে কী করে? আমি রোজ সন্ধেবেলা টালিগঞ্জ থেকে চাঁদনী চক ফিরে যাই, কালীঘাটের ওপর দিয়ে। 

- এই সেরেছে। এ'টা তো মিলল না। আমি ফিরি কালীঘাটের ওপর দিয়েই তবে চাঁদনী চৌক  থেকে কালীঘাট। রিভার্স ডাইরেকশন।  

- লে হালুয়া! তা'হলে আমরা এক নই, আর আমাদের মেট্রো ট্রেন দু'টোও আলাদা। 

- মহামুশকিল। অথচ বাকি সব মিলে যাচ্ছে। আর দু'টো মেট্রোয় একই সময়ে বিস্ফোরণ! এত বড় কোইন্সিডেন্স? 

- বিস্ফোরণ বলে বিস্ফোরণ! আরডিএক্সে কাঁপিয়ে দিয়েছে মাইরি। 

- আরডিএক্স?

- টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরিতে আপনি আরডিএক্সের নাম শোনেননি? টেররিস্টরা শুনলে কষ্ট পাবে। 

- টেররিস্টরা আরডিএক্স ব্যবহার করে বিস্ফোরণ ঘটায়? মানুষ মারতে?

- অবভিয়াসলি। হাফ কিলো আরডিএক্সে শুনেছি খান চারেক পাড়া নিকেশ হয়ে যেতে পারে। 

- গুলিয়ে যাচ্ছে মশাই। আরডিএক্সের নাম অবশ্যই শুনেছি। কিন্তু ও জিনিস তো আমরা লুচির পর খাই; মিনিমাম দেড়বাটি। মর্নিং ডেজার্ট আর কী। তবে আরডিএক্স পচে গেলে একটা বিশ্রী ব্যাপার ঘটে বটে...। 

- আরডিএক্স ডেজার্ট? গুল দেওয়ার একটা লিমিট থাকবে তো? 

- ওহ হো। গুল নয় স্যর। গুল নয়। এ'বার স্পষ্ট হচ্ছে ব্যাপারটা। 

- আপনি আরডিএক্স খান এ'টা আমায় বিশ্বাস করতে হবে?

- আলবাত। জলের মত স্পষ্ট তো। আমি আপনি একই তবে আমাদের পৃথিবী আলাদা। সমস্তই এক, শুধু পৃথিবী আলাদা। আর স্রেফ প্যারালালই নয়। কন্ট্রাস্টিং অর্থাৎ দু'টো দুনিয়া বিপরীত দিকে দৌড়চ্ছে । আপনার মেট্রোর রুট আমার উলটো। খেয়াল করে দেখুন আপনার দাড়ি কাটতে গিয়ে কেটেছে থুতনির ডান দিক, আমার ঘা বাঁ দিক। 

- বুক পকেটের দাগ যে একই দিকে। 

- আপনি কোন ডাল খেয়েছেন?

- আমি? মুসুরি। 

- আমি মুগ। 

- প্যারালাল ওয়ার্ল্ড?

- ওই যে বললাম জলের মত। আমার দুনিয়ায় আমিই আপনি। আপনার দুনিয়ায় আপনিই আমি। 

- বড্ড ঘোড়েল। তা ভিড় মেট্রোয় সেই ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর কী হল?

- অত্যন্ত সরল! বিস্ফোরণের চোটে আমাদের দু'টো দুনিয়া ওয়ার্ম হোলে দলা পাকিয়ে গেল। এই আমি আর আপনি এখন মুখোমুখি। 

- আর আপনার পৃথিবীতে সবাই লুচির পর বাটি বাটি আরডিএক্স সাঁটায়? 

- আরডিএক্স নিয়ে কবিতা লিখতে লিখতে আমাদের কবিরা কেঁদে ভাসিয়ে দিচ্ছেন মশাই। রোম্যান্সের নদী বয়ে চলেছে আরডিএক্স নিয়ে। 

- তাহলে আপনাদের টেররিস্টরা বিস্ফোরণ ঘটান কী দিয়ে?

- পচা মিহিদানা, অফ কোর্স। দেড়শ গ্রাম পচা মিহিদানা চার্জ করে আমাদের নবালিতা জঙ্গি গোষ্ঠীরা একটা ট্রেন উড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।