বাবাকে বেশ ম্যাজিশিয়ান মনে হয়। ভেজা গামছা গায়েব, শুকনো গামছা ওয়াপস। রোজ।
বাবা মাঝেমধ্যেই বলেন; "যারা ভিজে গামছা বরদাস্ত করতে পারে না, তাঁদের কিছুতেই ভরসা করবি না। সে ব্যাটারা দিব্যি মানুষ খুন করে গজল গাইতে পারে"।
বাবাকে বেশ ম্যাজিশিয়ান মনে হয়। ভেজা গামছা গায়েব, শুকনো গামছা ওয়াপস। রোজ।
বাবা মাঝেমধ্যেই বলেন; "যারা ভিজে গামছা বরদাস্ত করতে পারে না, তাঁদের কিছুতেই ভরসা করবি না। সে ব্যাটারা দিব্যি মানুষ খুন করে গজল গাইতে পারে"।
মেজমামা থাকলে বলতেন "ইট ইজ আ বিউটিফুল মর্নিং"। আরও দু'একটা মন ভালো করা কঠিন ইংরেজি শব্দও থাকত বোধ হয়।
শুভেন্দুরও ঠিক তেমনটাই মনে হচ্ছিল। হাওয়ায় তিরতিরে শীত। কফির মনোরম উষ্ণতায় সেঁকে নেওয়া হাতের তালু। আকাশের নীলে রোদের সেলোফেন। নিখুঁত; ঠিক যেমনটা হওয়া উচিৎ। এফএমে কোন চ্যানেল যেন 'কোন সে আলোর স্বপ্ন নিয়ে' চালিয়েছে।
দীপার কপালে এলোমেলো চুল, চোখে অল্প ঘুমের রেশ তখনও লেগে রয়েছে। ভালো লাগার গ্যাস বেলুনে ঝুলে ভেসে যেতে ইচ্ছে করছিল শুভেন্দুর। 'আহা' না বলে 'অহো' বলতে ইচ্ছে করছিল।
ঠিক তখনই। বেলুনে ফুস শব্দে ঢুলে গেল ছুঁচ আর কফিতে পড়ল চোনা। আকাশের মন কেমনের নীল কেউ যেন বাথরুম-ফ্লোর-ক্লীনার ঢেলে ফ্যাকাশে করে দিল।
ছুঁচ কাম চোনা কাম ফ্লোর ক্লীনার মার্কা প্রশ্নটা ছিল দীপার।
- আচ্ছা শুভেন্দু, আমি কি ইরিপ্লেসেবল?
- উঁ?
- আমি কি ইরিপ্লেসেবল?
- আমায় জিজ্ঞেস করছ গো?
- এখানে আর কে আছে বসে?
- আই সী। আমায় জিজ্ঞেস করছ।
- আমি কি ইরেপ্লেসেবল? আমার অভাব কি তোমার অপূরণীয় মনে হবে?
- অফ কোর্স। অবশ্যই। ডেফিনিটলি। নিঃসন্দেহে।
- রিয়েলি?
- আলবাত। তাছাড়া একজন মানুষ কখনও রিপ্লেসেবল হতে পারে?
- ও। তাহলে কেউই তোমার কাছে রিপ্লেসেবল নয়।
- হ্যাঁ। মানে হিউম্যান এলিমেন্ট, দোষে গুণে সকলেই ইউনিক পারমুটেশন।
- বুঝলাম।
- ইয়ে দীপা, অমন রাগ করে 'বুঝলাম' বলার কী আছে!
- রাগ? রাগের কী আছে? তবে আমার ব্যাপারে তোমার পারসেপশনটা স্পষ্ট হল।
- তোমার ব্যাপারে আমার ইয়ে? তেমন কিছু বললাম নাকি?
- ন্যাকা সেজো না। খুব সাটল কিন্তু স্পষ্ট ভাবে বলেছ। কেউই রিপ্লেসেবল নয়। প্রত্যেক মানুষের অভাবই অপূরণীয়। আর আমিও তোমার কাছে আর পাঁচটা মানুষের মতই।
- যাহ্। এ'টা কখন বললাম? এক্স প্লাস ওয়াই আর এক্স মাইনাস ওয়াই কে মিশিয়ে সাইমালটেনিয়াস ইকুয়েশন কষা সম্ভব। এক্স প্লাস ওয়াই আর জেড মাইনাস ডাব্লু মেশালে কিস্যু পাবে না গুরু।
- প্রথমত, আমি তোমার কাছে আর পাঁচ জনের মতই। দ্বিতীয়ত আমি তোমার মত ম্যাথেম্যাটিকালি করেক্ট নই। কেন সকাল সকাল আমার সঙ্গে বসে সময় নষ্ট করছ শুভেন্দু?
- না মানে ইয়ে...।
- ইয়ে কী?
- তোমার প্রতি আমার এই যে অপত্য স্নেহ...।
- স্নেহ? তুমি বাবলুকে স্নেহ কর..।
- বাবলু আমার ভাইপো..।
- মিঠুকে স্নেহ কর..।
- মিঠু পাশের বাড়িতে থাকে, ক্লাস ফাইভে পড়ে। আমি ওকে অঙ্ক পড়াই।
- তো? আমি সবার মতই। তুমি রাম শ্যাম যদুকেও স্নেহ কর, আমার ভাগ্যেও তোমার স্নেহর কিছুটা অ্যালোকেট করা আছে। তোমার স্নেহের স্টকে এক্স কিলো থাকলে আর তোমার পরিচিত মানুষের সংখ্যা এন হলে আমার কপালে জুটবে এক্স বাই এন পরিমাণ স্নেহ। আর পাঁচজনের মতই। তোমার হোমোজিনিয়াস দর্শনের দেওয়ালে আমি একটা ইট মাত্র।
- না না..সেমান্টিক্সে কনফিউজড হচ্ছ।
- বেশ। আমার গুরুত্ব আর পাঁচজনের মতই। আমি অঙ্ক বুঝি না কাজেই আমার ইন্টেলিজেন্স কম। আমি সেমান্টিক্স নিয়ে ভির্মি খাই, অতএব আমার ভাষাজ্ঞানও হাস্যকর। আমার সঙ্গে কত কষ্ট সহ্য করে তোমায় থাকতে হচ্ছে, তাই না?
- যাহ্ শালা! সেমান্টিক্স মানে...। আরে স্নেহর ক্যাটেগরি আছে তো।
- তাই বলে আমার সঙ্গে খিস্তি দিয়ে কথা বলবে?
- শালাটা খিস্তি? বাপের জন্মে শুনেছ শালার মত হার্মলেস স্বগতোক্তিকে কেউ খিস্তি বলে রেফার করছে?
- তুমি আমার বাপ তুলে কথা বললে শুভেন্দু?
- আমি একটু বেরোচ্ছি, কেমন? হাওড়া থেকে হিমালয় লোকাল যেহেতু এখনও চালু হয়নি, ভাবছি পার্ক থেকেই একটু হাঁটাহাঁটি করে আসব।
- আরে ক্রিফ্যাবাবু যে!
- চিনতে পেরেছেন স্যার?
- না চিনে আর উপায় কী বলুন। বিষমে বিষমে বেঁধে রেখেছিলেন যে এদ্দিন। তা ক্রিফ্যাবাবু, একটা কথা বলুন। বছর দশেক আগে যখন দেখেছিলাম তখন তো দিব্যি নাদুসনুদুস ছিলেন, এখন এমন হাড়গিলের মত চেহারা হল কী করে?
- ক্রিফ্যা তো আমি এক পিস নই স্যার। একপিস আমি হাড়গিলে হলে কী এসে গেল!
- এমন বিমর্ষ হাবভাব আপনাকে মানায় না ক্রিফ্যাবাবু। সে'বার কী ফুর্তি দেখেছিলাম আপনার মধ্যে।
- সেই অদ্দিন আগে? তখন আমার ভিটামিন, প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেটরা সবাই ছিলেন, আমিও ভুঁড়ি বাগিয়ে সুখে ছিলাম। শেষ পুষ্টির সোর্স আপনি পড়েছিলেন, সে জন্যেই এ দেহ নিয়ে কোনওক্রমে পড়েছিলাম...। এ'বার ইউথ্যানেসিয়া।
- ও কী কথা ক্রিফ্যাবাবু! আপনারাই তো সব, আমরা সবাই একে একে যাবই, যেতেই হবে। কিন্তু আপনাদের থাকতে হবে যে।
- বললাম যে স্যার, এক এক ক্রিফ্যার এক এক জাতের খাদ্য। আমাদের ব্যাচের পাতের পাশে প্লাস্টিক বাটিতে গরম জল আর কাগজের সাবান সার্ভ হয়ে গেছে। আপনি এদ্দিন ছিলেন, তাই পরের ব্যাচের হল্লা শুনেও চেয়ার ছাড়িনি...।
- কিন্তু এ'বার যে আমাকেও যেতে হবে ক্রিফ্যাবাবু।
- ক্রিকেটারদেরই শুধু রিটায়ারমেন্ট থাকে? আজ আপনার কাছে এলাম কেন? আপনি চললেন, আমার আর থেকে কী কাজ? এ'বার পরের ব্যাচ কবজি ডুবোবে। মহেন্দ্রবাবু, আজ্ঞা করুন; আপনার সঙ্গে এই আমি, বাবু ক্রিকেটফ্যান এইবারে মানে মানে কেটে পড়ি। একটা স্যুটকেস আমায় দিন দেখি মশাই!
- কী রে পঞ্চা, নার্ভাস?
- না..ইয়ে..মানে বলাইদা, এত বড় এন্ট্রান্স...।
- এগজামিনেশনেই এত ভয়? এরপর গ্রুপ ডিসকাশন, ভাইবা। তখন তা'হলে কী করবি? রিল্যাক্স।
- খুব খেটেছি বলাইদা, তুমিই তো কোচিং করালে। জানোই তো।
- সে জন্যেই বলছি। তোর প্রিপারেশন চমৎকার হয়েছে। স্পট-হিউমরের অব্জেক্টিভ টাইপ কোশ্চেনগুলো একটু মাথা ঠাণ্ডা রেখে হ্যান্ডেল করিস। কেমন?
- প্রচুর ক্যান্ডিডেট, তাই না বলাইদা?
- প্রতি বছর মড়ার সংখ্যা বেড়েই চলেছে। মেডিকাল সায়েন্সের প্রগ্রেসেও মহামারী যুদ্ধ আটকাচ্ছে না। আর মড়াদের ইন্টেলিজেন্সও বাড়ছে। আমার কোচিং সেন্টারেই দেখ না, পাঁচ বছর আগে দেড়শো মড়া নিয়ে শুরু করেছিলাম। এখন হাজার দুই, তিরিশটা ব্যাচ।
- একবার যদি লাগিয়ে দিতে পারি...।
- তাহলে একটা হিল্লে হলো আর কী! এস-ও-বি এন্ট্রান্স ক্লীয়ার করা ! এর মানে স্ট্রেট অফ ফেমে চলে যাওয়া। প্রতি বছর কয়েক লাখ ভূত এই পরীক্ষার জন্য মেহেনত করে। কোয়ালিফাই করে জনা দশেক। এস-ও কোয়ালিফায়েড ভূত চাঁদু, শুধু ভূতেরা নয়; মানুষও তেনাদের হিংসে করে।
- বলাইদা এস-ও কোয়ালিফাইড ভূতেরা নাকি রবি ঘোষের ডায়লগের মত? নতুন ছুরির মত ধারাল অথচ গুপ্তিপাড়ার মাখা সন্দেশের মত নরম?
- নিশ্চয়ই এ'সব বাজে এক্সপ্রেশন আঁশবাজার পত্রিকায় পড়েছিস? পত্রিকাটা কী ছিল আর কী হল! যাক গে, তবে এস-ও-বি'রাই শ্রেষ্ঠ। পূর্ণেন্দুবাবুর পোয়েট্রির চেয়েও লিরিকাল তেনারা, লক্ষণের ব্যাটের পেটির মত শানানো। তোর মধ্যে এস-ও-বি এন্ট্রান্স ক্লীয়ার করার সমস্ত কোয়ালিটি আছে।
- জীবদ্দশায় সে ভদ্রলোকের স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী চোর হতে পারলাম না। সে দুঃখ যাওয়ার নয়। বলাইদা, আশীর্বাদ কর মড়া হয়ে অন্তত যেন শীর্ষেন্দু-অদ্ভুতুড়ে-ভূত এন্ট্রান্স ক্লীয়ার করে সেল্ফ অ্যাকচুয়ালাইজেশন স্পর্শ করতে পারি।