Wednesday, October 25, 2017

বেরাদরি

- ব্রাদার! পেরেছি!

- এত রাত্রে...এত হাঁকডাক বিগ-বেরাদার...?

- রাত কোথায় ব্রাদার? ভোর। শুরু। আলো। নতুন। এই তো সময়। পেরে ওঠার। আমি পেরেছি।

- পেরেছ? যন্তর তৈরি?

- না হলে ডাকলাম কেন? যন্তর রেডি। তুমিই প্রথম সাবজেক্ট ব্রাদার।

- ওহ। এ যন্ত্র পারবে গো বিগবেরাদার? মন খারাপ বুঝতে?

- চটপট। তুরন্ত। এই মনখারাপ হল, হুই ডাক এলো।

- মাইরি? এ যন্তর হাঁক দেবে?

- নয়ত আর বানালাম কী! ডাকেই অ্যান্টিসেপ্টিক।

- তাতেই মনখারাপ গায়েব?

- মনখারাপ ইজ আ ফর্ম অফ এনার্জি ব্রাদার। এনার্জি গায়েব হয় না। এক ফর্ম থেকে অন্য ফর্মে কনভার্ট হয়। মনখারাপ টু মনকেমন। মনকেমন টু কবিতা। চটপট। তুরন্ত। দুরন্ত।

- কবিতা? আমি বুঝি না।

- যন্তর। বুঝিয়ে দেবে।

***

'কী রে! ভাবছিস কী? বললি না তো আমার বানানো।নাড়ু কেমন খেলি'? যন্তরের চোপায় চমকে ওঠে পিলে।

তাই তো। বিগ-বেরাদার তবে মিথ্যে বলেননি। আঁচলের খসখসে ছ্যাঁতছ্যাঁতে কবিতা টের পেয়ে বিগবেরাদারের প্রতি সামান্য গলে পড়তে ইচ্ছে হল।

Sunday, October 22, 2017

মাঝরাত্রের স্কুলবাড়ি আর দাসগুপ্তবাবু



- আসুন মিস্টার দাসগুপ্তা। ওয়েলকাম। ওয়েলকাম টু দ্য ফার্স্ট ডে অফ স্কুল।

- ধন্যবাদ। কিন্তু মানে...আমি ঠিক...।

- বুঝতে পারছেন না? ন্যাচরালি, ন্যাচরালি। ক্লাসরুমে নিয়ে যাওয়ার আগে তাই দেখা করতে এলাম..। আমি এ'খানকার হেডমাস্টার। ইয়ে, শিক্ষক বলতেও আমিই..।

- কিন্তু আমি কিছুই বুঝতে পারছি না...এত রাত্রে আমি এই সাতপুরনো ভাঙাচোরা স্কুলবাড়িতে কী করছি? এলামই বা কী করে? 

- ভূতের স্কুল তো পোড়ো স্কুলবাড়িতেই হবে।

- কী? আমি মৃত? 

- অফ কোর্স। আপনি মৃত! আমি বা এ'খানের সমস্ত ছাত্ররা, সবাই...।

- আমি মারা গেছি?

- নিঃসন্দেহে। শুধু মড়ারা এই স্কুলবাড়িটা দেখতে পায়।

- আমি মারা গেছি! ব্যারাকপুরের অরিন্দম দাসগুপ্ত মারা গেছে! 

- আপনি মারা গেছেন! অরিন্দম দাসগুপ্ত মারা যাবেন কেন? তিনি এই মাত্র ইয়ারবাড খুঁজে না পেয়ে "ধ্যারশ্লা" বলে ফের শুতে গেলেন।

- আমিই তো অরিন্দম দাসগুপ্ত।

- মিস্টার দাসগুপ্তা। রিল্যাক্স। ইউ আর নট হিম। ইউ আর জাস্ট আ ডেড ড্রীম অফ মিস্টার দাসগুপ্তা। আপনি দাসগুপ্তবাবুর সদ্য মৃত স্বপ্ন। এ'টা মড়া স্বপ্নদের স্কুল মিস্টার দাসগুপ্ত। 

- ওহ...আমি তাহলে...।

- আচমকা ছুটি নিয়ে দেশের বাড়িতে গিয়ে মাকে চমকে দেবেন ভেবেছিলেন। আজ সন্ধেবেলা পৌঁঁছনোর কথা ছিল। ভেবেছিলেন মাকে জড়িয়ে ধরবেন। পাড়ায় হাঁটতে বেরোবেন। দত্তবাজার থেকে ট্যাংরা কিনে এনে মাকে বলবেন ঝাল করতে। রাতে মায়ের পাশ ঘেঁষে শুয়ে কত গল্প। পুরনো পাশবালিশের কাচা ওয়াড়ের সুবাস। শোওয়ার ঘরের জানালার পাশে গন্ধরাজ গাছ। যেই গাছের আশেপাশে দত্তবাড়ির মিতুল ঘোরাঘুরি করত। সে'সব ছোটবেলার কথা ভাবতে ভাবতে আপনার ঘুমিয়ে পড়ার কথা ছিল। আপনি সেই স্বপ্নের মিস্টার দাসগুপ্ত,  আপনি মারা গেছেন। মারা গেছেন।

- তা'হলে...।

- যা হয়। মিস্টার দাসগুপ্তার মিসেস ভ্যাকেশন প্ল্যান করে ফেলেছিলেন। প্লাস ফিরে এসেই অফিসের রিভিউ।  দেশের বাড়িমুখো স্বপ্নের মিস্টার দাসগুপ্তা হ্যাড টু ডাই। দেশের বাড়ির স্বপ্নের মিস্টার দাসগুপ্তা বা আপনি না মরলে আদত দাসগুপ্ত ছিন্নভিন্ন হতেন। এই কিছুক্ষণ আগেই আদত দাসগুপ্ত দেশের বাড়ি ফেরার টিকিট ক্যান্সেল করেছেন।

- অর্থাৎ সে টিকিট ক্যান্সেল করে আদত দাসগুপ্ত আমায় খুন করেছেন। আর আমি ওর মৃত স্বপ্নের ভূত।

- প্রিসাইসলি। তবে মনখারাপ করবেন না। আপনার ক্লাসে অসংখ্য মৃত স্বপ্নের ভূত, ইন ফ্যাক্ট ব্যারাকপুরের অরিন্দম দাসগুপ্তর প্রচুর মড়া স্বপ্ন আপনার ক্লাসমেট হতে চলেছে। ওদের সঙ্গে আলাপ হলে আপনার ভালো লাগবে।

- ইয়ে, আপনার পরিচয়টা হেডমাস্টার স্যার? ক্লাসও তো আপনিই নেবেন?

- ক্লাস আমিই নেব। আমার ডাকনাম সুগা।

- সুগা?

- পুরো নাম সুমনবাবুর গান! 

- ওহ! যাক। ক্লাসরুমটা কোনদিকে সুগাবাবু?

- আসুন আমার সঙ্গে। আর হ্যাঁ, মিতুলদেবীর একটা মড়াস্বপ্ন আপনারই ক্লাসে রয়েছেন, "অরিন্দম একদিন অন্তত জোর গলায় বলবে 'তুই অন্য কাউকে বিয়ে করবি না' " গোছের একটা স্বপ্ন। মরে কাঠ হয়ে ছিল। আমি এই ক্লাসে ভর্তি করিয়ে নিয়েছি। আপনার ইন্টারেস্টিং লাগতে পারে, তাই বললাম। এ'বার চটপট আসুন দেখি, ক্লাস শুরু হতে দেরী হচ্ছে।

Saturday, October 21, 2017

সকলই তোমারই


- মন্টুদা! 
- উঁ।
- ও মন্টুদা! 
- কী! ঘ্যানঘ্যান করছিস কেন।
- এ'বারে ভাসাতে হবে তো।
- মনে সুরটা এখনও ফ্লোট করছে রে..।
- সুর?
- আমার মায়ের পায়ের জবা হয়ে ওঠ না ফুটে মন। গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।
- সুর বোধ হয় না মন্টুদা, বিলু বলল গাঁজার ডোজটা একটু কড়া হয়ে গেছিল নাকি...। আর গায়ে কাঁটা দিচ্ছে ঠাণ্ডায়, গঙ্গার ভেজা হাওয়া তো।
- গঞ্জিকা বল। ভক্তিভাব থাক।
- ভাসাতে হবে যে এ'বার।
- রংমশালগুলো কই?
- মিঠুদা ফুলবেলপাতার ঝুড়ির সঙ্গে তুবড়ি রংমশালের পেটিটাও জলে দিয়ে দিয়েছে।
- আহাম্মক।
- ঠিক।
- তবে মিঠু কবিতা লেখে ভাই। মিঠুকে আহাম্মক বললে ধর্মে সইবে না।
- স্কাউন্ড্রেল বলো। ম্লেচ্ছ খিস্তি হিন্দু শাস্ত্রে ইন্টিগ্রেট করা নেই বোধ হয়। এ'বার চলো, তুমি না এলে ভাসান লীড করার কেউ নেই।
- মন রে এমএস এক্সেল জানো না...মন রে...।
- ক্লার্কপ্রসাদী মন্টুদা?
- হেহ্, তুই বুঝিস। আরে ভাসাতে যাব! ভাসালে তো ভেসেই গেল। মা দু'চার মিনিট প্ল্যাটফর্মে ওয়েট করছেন,  করুন। সী অফ করতে এসে অত লাফালাফি করলে হয় না। আমরা পান্নালালের জাত, মিউজিক ইজ আওয়ার ধর্ম। চাই না মা গো রাজা হতে, রাজা হওয়ার সাধ নাই মা গো, দু'বেলা যেন পাই মা খেতে।
- আহা, তোমার গলায় মায়া আছে মন্টুদা। চোখে জল আসে।
- একটান দিবি নাকি?
- আমার আবার সয় না।
- শিবের চ্যালাগিরি না করে মায়ের পেয়ারের ছেলে হওয়া যায় না। সয় না আবার কী?নে টান।
- কড়া! 


- কেমন?
- মন্দ না। মন্টুদা, ভাসাবে না?
- কালো মেয়ের পায়ের তলায়, দেখে যা আলোর নাচন!
- আহা! আর দু'টান দাও দেখি।
- মায়ের রূপ দেখে দেয় বুক পেতে শিব যার হাতে মরণ বাঁচন।
- দেখে যা আলোর নাচন। আহা, মন্টুদা, আমায় দীক্ষা দাও।
- আমি দীক্ষা দেব রে? আমি কে? সকলই তোমারই ইচ্ছা, ইচ্ছাময়ী তারা তুমি...।
- মায়ের মেসেজ ট্রান্সমিট করে দিও। তাহলেই হবে।
- কয়েকটানেই বেশ ফ্লোট করছিস।
- প্লাস গায়ে কাঁটা। 
- গুড বয়। নে, কল্কেটা দে।
- আর দু'টান।
- মায়ের একটা মেসেজ এসছে, তোর জন্য।
- কমিউনিকেট গুরুদেব।
- কালীপুজোর ভাসানে গাঁজা টানার বান্দা তো তুমি নও চাঁদু! 
- ইচ্ছে। ইচ্ছে।
- ইচ্ছে? তা ইচ্ছে কি গতকাল লাল পেড়ে গরদের শাড়ি পরে মণ্ডপে এসেছিল? 
- গরদ দেখলে? জ্বলজ্বলে বিলিতি বর দেখলে না? গরদের ডান পাশ আলো করা?
- পান্নালালে ইন্ডাক্ট না হতে পেরেই তোদের জেনারেশন ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেল। ফলপ্রসাদ সাজানোর সময় তোর দিকে এক জোড়া ছলছলে চোখ ঠায় তাকিয়ে রইল সে'টা ক্যাপচার করতে পারলি না। ক্রিমিনাল। 
- আসলে...। ইয়ে, আর দু'টান যদি...!
- কত রাত হল দেখেছিস! এখন না ভাসালেই নয়। চল, ক্যুইক! এ'বার কালী তোমায় ভাসাবো, বলো, এ'বার কালী তোমায় ভাসাবো! 

Thursday, October 19, 2017

সতীনাথ ও ঘুগনির বাটি

স্টিলের প্লেটে এক বাটি ঘুগনি আর দু'টুকরো পাউরুটি। ঘুগনিটা সামান্য আলুনি, তবে ধোঁয়া ওঠা গরম; তাই দিব্যি। পাউরুটি চুবিয়ে প্রথম কামড় দিতেই মনঃপ্রাণ জুড়ে সে কী আরাম। বুদ্ধি করে দোকানির থেকে সামান্য পেঁয়াজ-লঙ্কা কুচি চেয়ে নিয়েছিলেন সতীনাথ। আর প্লেটের কোনে ছোট্ট এক ঢিপি ফাউ বিট নুন। দোকানি বলতে বছর সাতেকের একটা ছেলে, যে একটানা বাসন মেজে যাচ্ছিল। খালি গায়ে কালো হাফ প্যান্ট পরে দিব্যি সামাল দিয়ে যাচ্ছে। বাপ নাকি বিড়ি খেতে গেছে। চটপটে আর শশব্যস্ত বাচ্চা ছেলেটা হাল ধরে রেখেছে।  

স্বাদে গলে পড়তে ইচ্ছে হচ্ছিল। আহ, কদ্দিন পর সামান্য ঘুগনি আর পাউরুটি। এর সঙ্গে একটা ডিম সেদ্ধ পেলেই সতীনাথের চোখে জল আসত। কত দিন পর। 

নীল রঙ করা কাঠের বেঞ্চিতে যে আরও একজন বসে রয়েছে সে'টা খেয়াল হল মিনিট খানেক পর। ততক্ষণে আরও দু'টো পাউরুটি চেয়ে নিয়েছে সতীনাথ। পরনে সাদা ফতুয়া আর সবুজ-নীল লুঙ্গি। গালে খোঁচা দাড়ি, ঝিমনো ঢুলঢুলে চোখ।

সুট করে প্লেট নামিয়ে রেখে সরে পড়তে চেয়েছিলেন সতীনাথ। লাভ হল না। হাত টেনে ধরলেন সাদা ফতুয়া। 

- আধ বাটি ঘুগনি পড়ে রইল যে, খেয়ে যাও!
- না মানে...আমি আসি। 
- যেতে চাইলেই কী যাওয়া যায় সতীনাথ?
- আপনি...কে...কে বলুন তো?
- ঘুগনি ঠাণ্ডা হচ্ছে যে ভাই। 
- আমি আসি...। 
- কোথায় যাবে?
- তা'তে আপনার কী? আপনি কে?
- আহ্‌, হুড়মুড় কেন। আর এক বাটি ঘুগনি বলি? তোমার জন্য?
- আমায় যেতে দিন ওস্তাদ। 
- এই যে বললে চিনতে পারনি? 
- আসলে...আসলে...আমায় যেতেই হবে।
- যাবে তো বটেই। তোমাকে নিতেই তো এসেছি আমি। 
- না মানে...ফেরত যাওয়ার কথা বলছি না। আমায় একটু টালিগঞ্জে যেতে হবে। 
- সতীনাথ। তুমি জান সে'টা হওয়ার নয়। বছরে একটি বার একদিনের জন্য ছাড়। সে ছাড় আজ সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই ফুরিয়েছে। এ'বার ফেরত যাওয়া। 
- ওস্তাদ। ওস্তাদ। এমন করে বোলো না। গতকাল...গতকাল...। 
- তোমার খোকার সঙ্গে দেখা হয়েছে। তুমি আইসক্রীমওলা সেজে ওকে আইসক্রীম বিক্রি করেছ। বছরের এই দিনটা ভূতেরা সাপের পাঁচ পা দেখে। আর দেখবে নাই বা কেন। এক দিনের জন্য এই দুনিয়ায় এসে মানবদেহ ধারণ করা যায়। ভূতদেরও শখ আহ্লাদ থাকবেই। সে জন্য আমি তোমায় দোষ দিই নি। তুমি যখন মারা গেলে তখন খোকার বয়স কতই বা...। 
- দু'বছর দেড় মাস। 
- রাইট। পাঁচ বছর পর শখ হওয়াটা ভুল নয়। কিন্তু পরলোকের নিয়ম অমান্য করবে হে? এমন বেহেড বেআক্কেলে কাজ করবে? ভূতচতুর্দশী খতম হওয়ার পরেও তুমি আমাদের স্পেসে ফিরে গেলে না? ধর্মে সইবে? তুমি জানো না এর ফলাফল কী? এখনও গ্রেস পিরিয়ড আছে। চুপচাপ ফিরে চলো। নয়ত কেলেঙ্কারি ঘটবে আর তখন আমার কিছু করার থাকবে না। 
- ওস্তাদ! প্লীজ। আর একটা দিন। আর এক দিনের জন্য খোকাকে দেখব। 
- দেখে?
- আজ্ঞে?
- দেখে কী হবে সতীনাথ? তোমাদের দুনিয়া আলাদা! আর তুমি তো জানো। ভূতচতুর্দশীর গ্রেস পিরিয়ড পেরিয়ে গেলেও এ'দিকে পড়ে থাকার পরিণতি ভয়ানক। অতৃপ্ত আত্মা হয়ে এ দুনিয়ায় ঘুরে বেড়ানো। অসম্ভব যন্ত্রণা। ছটফট। ফিরে চলো সতীনাথ। খোকা ভালো আছে। এমনিতেও মা ন্যাওটা ছিল চিরকাল। আর তাছাড়া এখন ও যাকে বাবা বলে চিনেছে সে তোমার মত বেহেড বেআক্কেলে ইডিয়টের চেয়ে অনেক বেশি ব্যালান্সড। খোকা ভালো আছে সতীনাথ। নিজের জেদের বসে ওকে নষ্ট করো না। যদি অতৃপ্ত আত্মা হয়ে থেকে যাও তাহলে দুঃস্বপ্ন হয়ে বার বার ওর  আশেপাশে ঘুরতে শুরু করবে তুমি, সে'টাই তুমি চাও? 
- ওস্তাদ। খোকা। আমার খোকা। এতোটুকুন খোকাকে বুকে জড়িয়ে দুলে দুলে ঘুরতাম। 'আমি যে জলসাঘর'য়ের টিউনটা বেশ ঘুমপাড়ানির কাজ করত। 
- সতীনাথ। ঘুগনি শেষ করো। এ শরীর এ'বার ঝেড়ে ফেলতেই হবে।  নয়ত মুশকিল...।
- কিন্তু খোকা? ওস্তাদ?
- ও ভালো আছে। ওকে ভালো থাকতে দাও। চলো এ'বার। আর আমার তো আর কাজের শেষ নেই। শুধু তোমাকে নিয়ে গেলেই হবে না। আর এক ব্যাটাচ্ছেলেও সময়মত পরলোকে ফেরেনি, তাকেও না নিয়ে গেলে নয়। 
- কে?

সতীনাথ অবাক হয়ে দেখলে ওস্তাদ বেঞ্চি ছেড়ে উঠে গিয়ে বাসনের স্তূপের মধ্যে থেকে দোকানি খোকার হাত টেনে ধরলেন। 
"এই যে বাবলুবাবু, ইনি ফি বছর বাপকে দেখতে ফেরত আসেন আর সময় শেষ হওয়ার পরেও ফেরার নামটি নেন না। প্রতি বছর এই সময় ওর বাপ অবাক হয়ে ভাবে থরে থরে বাসন কোন জাদুমন্ত্রবলে আপনা থেকে মাজা ধোয়া করে গুছিয়ে রাখা হচ্ছে। যাকগে, এ'বার দু'জনেই ওয়াপস চলো দেখি। আমার অনেক কাজ পড়ে রয়েছে"। 

"বাবা বিড়ি কিনে ফিরুক গো ওস্তাদ , আর একবার অন্তত দেখি। ওস্তাদ গো। আর একটু সময় ওস্তাদ"। বাবলুর কান্নাকাটি ওস্তাদকে স্পর্শ করল না, ওর ডান হাত ওস্তাদের নির্মম মুঠোয় বন্দী। 

বাবলুর বাঁ হাতটা নরম করে ধরলেন ঘুগনি তৃপ্ত সতীনাথ। 

Friday, October 13, 2017

সৈনিক আর হারমোনিকা


- বিল্টুবাবু!
- কে?
- ভয় পেয়েছ?
- তুমি কে?
- আমি? আমি সৈনিক।
- তুমি আমার শোওয়ার ঘরে এলে কী করে? তুমি কি ভূত?
- ঠিক ধরেছ। আমি ভূত। মৃত সৈনিকের ভূত।
- তুমি আমার ঘরে কেন এসেছ? আমি চিৎকার করলেই মা ছুটে আসবে কিন্তু।  তারপর তোমার যে কী দুরবস্থা হবে...।
- তুমি চিৎকার কেন করবে বিল্টুবাবু? তুমি কি ভয় পেয়েছ?
- ক্লাস ফোর পর্যন্ত খুব ভয় পেতাম, জানো। গতকাল ক্লাস ফাইভে যেই উঠেছি, অমনি ভয়টয় গেছে কমে।
- তাই? কী রকম ব্যাপারটা?
- ক্লাস ফোরে পড়ার সময়ও ধুন্ধুমার যুদ্ধ চলছিল তো। রোজ রাত্রে পাড়া অন্ধকার।  চুপটি করে বসে থাকা, এই বুঝি বোমা পড়ল। হারুদাদাদের কী হয়েছিল জানো তো?
- কী হয়েছিল?
- শত্রুদের একটা বোমা, পড়বি তো পড় এক্কেবারে হারুদাদাদের বাড়ি ছাদে। হারুদাদা, হারুদাদার মা, বাবা, হারুদাদার গরু লালি, আর আরও অনেকে; ছাই হয়ে গেছিল।
- ওহ হো।
- গোটা ক্লাস ফোর তো আমায় স্কুলেই যেতে হয়নি। যুদ্ধের জন্য।
- ওহ।


- জল...। একটু জল।
- চোপ্।
- আররে, মরেই তো যাচ্ছি। একটু জল দিলে কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হবে হে ক্যাপ্টেন?
- চারটে বুলেট খরচ করতে হয়েছে তোমার ওপর, তারপরেও এতক্ষণ তড়পে চলবে ভাবিনি।
- এই এক ঢোক জলের দাম পাঁচ নম্বর বুলেটের চেয়ে অনেক কম ক্যাপ্টেন।
- শত্রুকে জল দেব?
- পরাজিত শত্রু। মরতে বসেছে। জল দিলে বেঁচে উঠব না। দাও না ভাই ক্যাপ্টেন, এক ঢোক জল। তোমার পিঠের জলের বোতলটা দেখে থেকে কেমন মনটা আনচান করছে। তোমায় আশীর্বাদ করে যাব। বয়সে তুমি আমার চেয়ে বোধ হয় ছোট।
- এই নাও, জল। আর শোন, আমায় খবরদার ভাই বলে ডাকবে না। তোমার আশীর্বাদের মাথায় আমি লাথি মারি। এই নাও জল, হাঁ করো দেখি।
- আহ্, বাঁচালে ক্যাপ্টেন। মড়ার মুখে জল দেওয়া বড় পুণ্যির কাজ গো।
- আশা করি তোমায় বাঁচাইনি,  কিছুক্ষণের মধ্যেই ভবলীলা সাঙ্গ হবে। আর আমার পুণ্যির লোভও নেই। যুদ্ধটা জিতলেই যথেষ্ট।
- আমাদের প্রতিরোধ তো...। শেষের দিকেই..।
- হ্যাঁ, আর দিন দুয়েক। তারপর তোমাদের রাজধানী আমাদের দখলে।

- আচ্ছা বিল্টুবাবু, যুদ্ধ খুব খারাপ, তাই না?
- আমার বাবা যুদ্ধে গেছে, যুদ্ধ খারাপ কেন হবে? যুদ্ধ খারাপ হলে কি বাবা যুদ্ধে যেত?
- তাও বটে। তা যুদ্ধ তো শেষ। তোমার বাবা...।
- বাবা ফিরছে তো। সৈন্যদলের সঙ্গে। কুচকাওয়াজ করতে করতে। বিজয় নিশান উড়িয়ে। আর কয়েক দিনের মধ্যেই ফিরে আসবে...।
- ওহ্, আচ্ছা।
- আমিও বাবার মত একদিন যুদ্ধে যাব। পরনে ইউনিফর্ম, হাতে বন্দুক। বাবার মত ফিরব কুচকাওয়াজ করতে করতে।
- তুমি বেশ সাহসী ছেলে তো বিল্টুবাবু।
- ক্লাস ফোরে আমি খুব ভীতু ছিলাম। এখন বেশ সাহস হয়ে গেছে। কিন্তু সৈনিক, তুমি এখনও বললে না কেন এসেছ! তুমি আমার বাবাকে চিনতে?
- চিনতাম বৈকি। আমাদের কত গল্প আড্ডা হয়েছিল। তোমার বাবা বেশ বীর যোদ্ধা। আর বড় ভালো মানুষ।
- তুমি জানো আমার বাবা খুব ভালো হারমোনিকা বাজাতে পারে?

- ক্যাপ্টেন!
- কই মাছের জান তোমার মাইরি। এখনও বেঁচে আছ। আর জল চাইলে পাবে না, এ'টুকু বলে দিলাম।
- তোমার পকেটে... তোমার পকেটে..।
- এ'টা? হারমোনিকা!
- শোনাবে? একটু? শোনাবে?
- নাহ্, পাঁচ নম্বর বুলেট তোমার মাথায় না গুঁজে দেওয়া পর্যন্ত তুমি বোধ হয় এমনি ভাবেই ঘ্যানঘ্যান করে যাবে।
- সমস্ত কেমন কালচে নীল হয়ে আসছে ক্যাপ্টেন।
- ওহ্, তার মানে আর দেরী নেই।
- জানো ক্যাপ্টেন, রিলোড করতে সামান্য তিন সেকেন্ড দেরী করে ফেলেছিলাম...নয়তো...।
- নয়তো তোমার বদলে এ'খানে আমার লাশ পড়ে থাকত।  জানি। স্কার্মিশে এমনটাই হয়। দু'তিন সেকেন্ডের দেরীতে হিসেব এ'দিক ও'দিক।
- আচ্ছা, ক্যাপ্টেন...। দোষ কার? তোমার দেশের? না আমার দেশের?
- দেশের আবার দোষ কী? নেতাদের ইচ্ছেয় যুদ্ধ। আমরা সৈনিক, হুকুম তামিল করব। ব্যাস।
- কালচে নীল ক্যাপ্টেন। কানে ঝুনঝুনি বাজছে। আমার খোকার রিনরিনে হাসি...।
- বয়স কত তোমার খোকার?
- বারো। ওর গালে টিপলে এখনও হাসির মধুর ঝরে ক্যাপ্টেন। খোকাও হারমোনিকা বাজায়।
- বটে?
- মন কেমনের বাঁশি গো ক্যাপ্টেন। আমার আর শোনা হল না।
- সরি।
- আরে ধুস। তুমি আমায় না মারলে..আমিই তোমায়...। হুকুম। তামিল। জানোই তো। তোমার বাড়িতে..।
- প্রায় ওই বয়সেরই আমার ছেলে। নাম বিল্টু।
- আমার ছেলের নাম ইবু। হারমোনিকা অন্ত প্রাণ,বাজাবে একটু? হারমোনিকা? ক্যাপ্টেন? ইবুর কথা বড় মনে পড়ছে। চারদিকে কালচে নীল...সমস্ত আলো নিভে যাচ্ছে।

- বিল্টুবাবু, তোমার বাবা অপূর্ব সুরে হারমোনিকা বাজায়। সে সুর শুনলে মনে হয় পাহাড় গলে পড়ছে। মনে হয় শিউলি টুপটাপ ঝরে পড়ছে ঘাসের নরমে। তোমার বাবার হারমোনিকায় মায়া আছে বিল্টুবাবু।
- তুমি বড় ভালোমানুষ সৈনিক। তুমি বাবার দলে ছিলে?
- আমি এখন তোমার বাবার দলে।
- তোমার নাম কি?
- ইবুর বাবা।
- ওহ।
- বিল্টুবাবু। আমি কেন এসেছি জানো?
- কেন?
- আমায় ক্ষমা করবে বিল্টুবাবু?
- মানে?
- আমায় হারমোনিকা শোনাতে গিয়ে...তোমার বাবা...।
- আমার বাবার কী হয়েছে সৈনিক?
- আমি খুব গোঁ ধরেছিলাম, আমায় একটু হারমোনিকা শোনানোর জন্য। আহা, কী অপূর্ব সুর তোমার বাবার হারমোনিকায়। কিন্তু হারমোনিকার শব্দে শত্রুপক্ষ তোমার বাবার পোজিশন জেনে যায় আর...।
- সৈনিক।
- সরি বিল্টুবাবু। আমায় ক্ষমা করবে?
- ক্লাস ফোরে থাকলে করতাম না। কিন্তু আমি এখন ক্লাস ফাইভ।
- কাঁদছ বিল্টুবাবু?
- ইবু কোন ক্লাসে পড়ে?
- ক্লাস ফাইভ। সেও হারমোনিকা বাজায় বেশ।
- তুমি ইবুর সঙ্গে দেখা করতে যাওনি?
- ইবুর কাছে ক্ষমা চাওয়ার নেই। কিছু ফেরত দেওয়ার নেই। বিল্টুবাবু, তোমার যদি কোনওদিন ইবুর সঙ্গে দেখা হয়, ওকে বলবে যে ওর বাবা মারা যাওয়ার আগের মুহূর্তে হারমোনিকা শুনতে শুনতে শুধু ইবুর কথা ভেবেছে?
- খুব কষ্ট হচ্ছে সৈনিক।
- তুমি না ক্লাস ফাইভে পড়ো?
- তবুও। বাবা। বাবার হারমোনিকা।
- সে'টাই তোমায় ফেরত দেওয়ার ছিল।

পরের দিন খুব ভোরের দিকে খবরটা পেয়ে মা এসে জড়িয়ে ধরেছিলেন বিল্টুকে। বিল্টুর বালিশের তলায় রাখা হারমোনিকায় তখনও বাবার গায়ের সুবাস।