Thursday, October 12, 2017

ফিরে আসার গল্প

রাতের অন্ধকারে সদর দরজাটার দিকে তাকালে বড় মায়া হয়। কোনও এককালে সবুর রঙ ছিল বোধ হয়, এখন ফ্যাকাসে, অল্পেতেই মচমচ করে ওঠে। কব্জায় বারবার নারকোল তেল দিয়েও ক্যাঁচক্যাঁচ দূর করা যায়নি। অথচ বড় মায়া।

একটা কলিং বেল আছে বটে, কিন্তু সে’টা ব্যবহার করতে মন চায় না। সেলসম্যানের কাজে রোজ যে কত বাড়ির কলিং বেলে হানা দিতে হয়। কত রকমের টুংটাং, কত রকমের দরজা, কত রকমের মানুষ। ছোট্ট এক কামরার রেলের কোয়ার্টার থেকে ঝাঁ চকচকে ডুপ্লে; সবার বাড়িতেই আরশোলা আছে। আমার বিশ্বাস রাজভবনেও আরশোলা আছে।  মিসেস রাজ্যপালের সঙ্গে মিনিট দশে কথা বলতে পারলেই আয়ুর্বেদিক গুণ সম্পন্ন সুগন্ধি আরশোলাশ-প্লাস লিকুইডের তিনটে বড় শিশি আমি গছিয়ে দিতে পারতাম। গোটা ব্যাপারটাই আত্মবিশ্বাসের খেল। “বিলীভ ইন ইওর প্রডাক্ট”, আমাদের সেলস ম্যানেজার মাঝে মধ্যেই বলে। আমি রীতিমত বিশ্বাস করি। এবং সেই বিশ্বাসের প্রমাণ আমার বিক্রির পরিমাণ। শ্রীগোকুল গ্রীন ইন্সেক্টিসাইড কোম্পানির পয়লা নম্বর সেলসম্যান!

তবে রাতে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফেরার সময় কড়া নাড়তে ইচ্ছে করে। খটর খট খটর। এ’টুকুতেই দীপা সাড়া দেয়। দীপার পায়ের মৃদু ধুপধুপ শুনতে বড় ভালো লাগে, সাত সেকেন্ডের মাথায় দরজা খোলে দীপা। রোজ একই ঘ্যানঘ্যান;
“আজ এত দেরী হল কেন”?

দীপার ঘ্যানঘ্যান শুনতে বড় ভালো লাগে। অল্প সুর মিশে থাকে। রাতের ঝুমঝুমি। সোফার গায়ে বেড়ালের আঁচড়ের মত ওঁর শাড়ির আঁচলের খসখস; ক্লান্তি ঝরে যায় কয়েক মুহূর্তেই।
চটি আর ঘামে ভেজা জামা খুলতেই হাতে একটা পাট করা শুকনো গামছা, পাজামা আর ফতুয়া দিয়ে যায় সে। বাথরুমে দু’টো বালতিতে জল তোলা থাকে; একটা লোহার বালতি আর একটা নীল প্লাস্টিকের। সাদায় সবুজ ছোপ ছোপ প্লাস্টিক মগ। স্যাতলা পড়া বাথরুম, অ্যাসবেস্টসের ছাত, টিনের দরজা; কিন্তু ফাইভ স্টার সুবাস। বাথরুমের ভেন্টিলেটরের গা বেয়েই কামিনী গাছ;  সে সুবাস আর ঘাড়ের কাছে ঠাণ্ডা জলের ছিটে পড়লে গা শিরশির করে ওঠে, বুকের ভিতর ছ্যাঁতছ্যাঁত। বাথরুমে পাশেই এক চিলতে উঠোন, তার ও’পাশে সুর বারান্দা। সে’খানে একটা ছোট্ট স্টোভ জ্বেলে বসে দীপা, ঘুপচি রান্নাঘরে তার গুমোট লাগে। স্টোভের সঁসঁ ছাপিয়ে দীপার গুনগুন বারান্দা উঠোন পেরিয়ে, টিনের দরজা ছাপিয়ে কানে এসে পড়ে। সে সুর এসে মনে আলপনা দেয়;  “...কারে দাও মা ব্রহ্মপদ কারে কর অধোগামী, সকলি তোমার ইচ্ছা..........”।
মার্গো আর কামিনী মিলে তখন মনের ভিতর দাবা বোর্ড সাজিয়ে বসে; সুর মেলানোর চেষ্টা করি:
“আমি যন্ত্র তুমি যন্ত্রী, আমি ঘর তুমি ঘরণী।
আমি রথ তুমি রথী, যেমনি চালাও তেমনি চলি”। 
গা মুছে পাজামা গেঞ্জি গলিয়ে সোজা দীপার ড্রেসিংটেবিলের সামনে। এক খাবলা পন্ডস নিয়ে ঘাড়ে বুকে পিঠে। আর তারপর সোজা এসে দীপার স্টোভের পাশে টুল টেনে বসা।
দীপা কাপে চা ঢালার সময়ই চারিদিক পাহাড়ি হয়ে যায়, নিয়ম করে। অল্প শীত। অথচ দীপার কপালে দু’চারটে ঘামের দানা, মাঝেমধ্যেই ব্যস্ত হাতে কপালের চুল সরিয়ে চলে সে। দীপা সদর দরজাটার মত; বড় মায়া। চায়ের কাপ হাতে দীপা মোড়া টেনে নেয়, 
তার আজেবাজে কথায় প্রশ্নে রাত এগিয়ে চলে।

“তোমার গা থেকে মরা আরশোলার গন্ধ পাই মাঝেমধ্যে”।
“আমায় এ’বার জয়দেবের মেলায় নিয়ে যাবে”?
“তুমি পদাবলী অ্যাপ্রিশিয়েট করো না? তুমি কি মানুষ”?
"খোলাখাম বলে একটা জায়গার খোঁজ পেয়েছি, সময় করে দু'জনে ঘুরে আসব, কেমন" ?
"সেই যে'খানে কাটলেটের সঙ্গে ঘরে বানানো ঝাঁঝালো কাসুন্দি আর অল্প আপেল কুচি দেয়, সেই দোকানটায় আমায় নিয়ে যাও না কেন "? 
"নজরুল। নজরুল। নজরুল। সমঝে জনাব? শুধুই নজরুল"।  

রাত ঘন হয়। টুল থেমে নেমে বসতে হয় দীপার পায়ের কাছে। দীপার পায়ে রক্ত, ও বলে আলতা অথচ আমার কান্না পায়। দীপা ঘন হয়ে আসে। 

আকাশ ফ্যাকাসে হতে শুরু করলে মায়ের গন্ধে আকাশ আর বারান্দা ঢেকে যায়। দীপা চুলে বিলি কেটে জানান দেয়;
"আজ ফের যাওয়ার সময় হল, তৈরি হয়ে নাও। কেমন? আর আজ তাড়াতাড়ি করে ফিরবে গো? একটি বারের জন্য? গোটাদিনের জন্য এ ঘর আগলে বসে থাকি। একা। আজ একটু তাড়াতাড়ি ফিরো, কেমন"?
আমার বলা হয়ে ওঠে না যে সদর দরজার ও'দিকে গেলেই আমিও একা। ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়ানো বোকা। 

আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে দীপা ক্রমশ আবছা হতে শুরু করে। আমি বুঝতে পারি অ্যালার্ম বাজার সময় এগিয়ে আসছে। উঠতে হবে। হুড়মুড়িয়ে উঠেই খবরের কাগজ, স্নান, জলখাবার, অফিসের তাড়া। 

অ্যালার্মে সব কেঁপে ওঠে। দীপার চোখ ছলছল। স্নুজ্‌ টিকিয়ে রাখে মিনিট দশেক। 
"আজ তাড়াতাড়ি ফিরো, কেমন"?

দীপা মিলিয়ে যায়। সদর দরজাটাও।   শ্রীগোকুল গ্রীন ইন্সেক্টিসাইড কোম্পানির চাকরীটাও গায়েব। শাওয়ারে রাতটুকু ঝেড়ে ফেলে মড়া টোস্ট চিবুতে চিবুতে ফের রাতের অপেক্ষা শুরু। 

Monday, October 9, 2017

কী বৃষ্টি কী বৃষ্টি!

- দাদা গো! কী বৃষ্টি! কী বৃষ্টি!

- বটে?

- ঝমঝম শুনতে পাচ্ছ না?

- ঝমঝম কি? ঝিরঝির মনে হচ্ছে।

- তোমার কান গ্যাছে। এদিকে আবার শঁশঁশঁশঁ করে ঝড়!

- সামান্য ফুরফুর কানে এসেছে বটে।

- প্রলয় এলো বুঝি, এমন দিন তিনেক চললে কলকাতা বে অফ বেঙ্গলে মার্জ হয়ে যেতে পারে।

- না না। বড় জোর বেহালায় অটো উল্টোবে, আমহার্স্ট স্ট্রিটে হাঁটুজল। মেজকাকার সামান্য সর্দিজ্বর। ঠাম্মার সাধের গামছাজোড়া শুকোবে না।

- এই আন্ডারপ্লে করাটা তোমার একটা বদভ্যাস দাদা। সে'বার মোদীর ল্যান্ডস্লাইড ভিক্ট্রিকে বললে স্টেজম্যানেজ দিয়ে বেরিয়ে গেছে। মোহনবাগানের চার গোল খাওয়ার পর বললে ক্লোজলি ফট্ কনটেস্ট। পিসিমার কিডনি স্টোনের দুর্দান্ত ব্যথাকে মাইল্ড ডিসকমফর্ট বলে পিসেমশাইকে রিপোর্ট করলে।

- বাঙালির এই অকারণ লাফিয়ে ওঠার স্বভাবটা বড় বিশ্রী রে ছোট।

- ধুস, তোমার সঙ্গে কথা বলাই ঝকমারি। তার চেয়ে বরং রান্নাঘরে গিয়ে মায়ের কড়াইয়ে খুন্তি নাড়া দেখি। বাবা আজ ঢাউস ইলিশ এনেছে; দেড় কিলোর।

- খোকা ইলিশ নয়, সে'টা ঠিক। তাই বলে ঢাউস? ধুস। এক কিলো সাড়ে তিনশো। অনলি।

- বাজে না বকে পড়তে বসো। গতবার ফিজিক্সে অক্কা পেয়েছিলে সে'টা মনে আছে তো? জ্যাঠা বলেছে এ'বারেও ফেল করলে তোমার কান ছিঁড়ে নেবে।

- অক্কা কি বলা চলে রে? আর পঁয়ত্রিশটা নম্বর পেলেই ফার্স্ট ক্লাস হয়ে যেত। আর জ্যাঠা অতটা কানিং নয় যে গাধা পিটিয়ে ভ্যান গঘ বানাবে।

- আমি চললাম রান্নাঘরে।

- অ্যাই ছোট শোন! অল্প এক কুচি ভাজা ইলিশ আনিস তো বাটিতে করে। টেস্ট করব। মুখ জিভ ফ্রেশ থাকলে টোটাল ইন্টারনাল রিফ্লেকশনটা ভালো ভাবে ইন্টারনালাইজ করা যাবে।

- এক কুচি ইলিশ ভাজা, তাই তো?

- এক কুচি মাত্র। মাইনর। ইনসিগনিফিকেন্ট। এই ধর, তোদের মত বাঙালিদের হিসেবে দু'টো পেটির পিস। চট করে রান্নাঘর থেকে নিয়ে আয় দেখি।

Sunday, October 8, 2017

ক্যাপ্টেন ক্ক্ব্র আর ঈশ্বর

- কী বুঝছ ভধ্রকিধস? 
- ক্যাপ্টেন ক্ক্ব্র, আমাদের এই মিশন ঐতিহাসিক সাফল্য লাভ করতে চলেছে।
- এই গ্রহ মড়া নয়?
- মরাদের গ্রহ, তব এ গ্রহ চিরকালীন মড়া নয়। আজ থেকে মাত্র দেড় লাখ বছর আগেও এখানে বাসযোগ্য পরিবেশ ছিল। প্রচুর অক্সিজেন, অফুরন্ত জল। আর প্রাণ।
- তুমি নিশ্চিত ভাই ভধ্রকিধস? এ'খানে প্রাণ ছিল? আমাদের টীম তো কোনও প্রমাণই যোগাড় করতে পারেনি। এ'দিকে স্পেসশিপ ফেরত নিয়ে যাওয়ার দিন সামনেই।
- ক্যাপ্টেন ক্ক্ব্র, প্রমাণ যোগাড় করতে পেরেছি বলেই তো আপনার কাছে আসা। এ গ্রহে শুধু বহু রকমের প্রাণিই ছিল না, রীতিমত উন্নত প্রজাতিও বাস করত।
- দেশে ফিরে এমন বাজে বাতেলা দিলে হবে না। যদি এতই উন্নত প্রাণীদের বাস ছিল তবে সে সব চিহ্ন কই? তাঁদের ফসিল? তাঁদের সৃষ্টি?
- আমি এই বিস্তীর্ণ প্রান্তর চষে ফেলেছি ক্যাপ্টেন ক্ক্ব্র, আর এ'খানে সে'সব চিহ্ন কিছু নেই বটে। তবে প্রতিটা বালুকণায় রয়েছে পারমাণবিক বিস্ফোরনের চিহ্ন, সে এমন ভয়াবহ বিস্ফোরণ যে এ গ্রহের সমস্ত কিছু সাফ হয়ে গেছে। পাহাড়  নিশ্চিহ্ন,  সমুদ্র গায়েব, বাতাস হাওয়া। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এ গ্রহের আয়তনও অনেক বড় ছিল। কিন্তু সে বিস্ফোরণ এতই খতরনাক ছিল যে গ্রহ থেকে কয়েক খাবলা উড়ে যায়। 
- পারমাণবিক বিস্ফোরণ? অত্যাধুনিক পারমাণবিক অস্ত্র?
- হ্যাঁ। 
- তার মানে ততটাও উন্নত বুদ্ধির প্রাণি নয়।
- সে'খানেই খটকা ক্যাপ্টেন ক্ক্ব্র, পারমাণবিক অস্ত্রে নিজেদের গ্রহ নিকেশ করে দেওয়া প্রাণীদের মগজ অত সুবিশাল আর ক্ষুরধার কী ভাবে হয়? দেহগঠনেই বা তাঁরা অত উন্নত কী ভাবে হয়েছিল? 
- যে'খানে পাহাড় সমুদ্রের নিশ্চিহ্ন, সে'খানে তুমি সে প্রাণীদের মগজ আর দেহগঠনের ব্যাপারে কী ভাবে জানলে হে ভধ্রকিধস?
- সে'টাই তো চমক! যে'খানে সমস্ত কিছুই ধুলো হয় গেছে, সে'খানে কোনও এক জাদু মন্ত্রবলে  একটা অতিকায় মূর্তি রয়ে গেছে। 
- বলো কী!
- স্পেসশিপ থেকে দেড় হাজার মাইল পশ্চিমে বালি খুঁড়ে এ'টা উদ্ধার করেছি ক্যাপ্টেন। স্পেসশিপের জানালা দিয়ে দেখুন, আপনার খিদমতে হাজির করেছি সেই মূর্তি।
- কই দেখি!
- এই যে। এ'দিকে!
- দুর্ধর্ষ,  দুরন্ত, দুর্দান্ত।
- কেমন দেখলেন? ক্যাপ্টেন ক্ক্ব্র?
- ঈশ্বর! আমার যে ঈশ্বর দর্শন হল হে ভধ্রকিধস!
- অতি উন্নত প্রাণী!
- আমাদেরই মত পা; পেশিবহুল,  মজবুত, ক্ষিপ্র। অথচ বুকের বাহুল্য নেই। হৃদয়ের টনটন নেই, অম্বলে বুকজ্বালা নেই। মগজ আর উদর মিলে...।
- যে সে উদর নয় ভধ্রকিধস! স্ফীতোদর। তা'তে মগজগুণ মেশাতে পারলেই ইভোলিউশনের চরম স্তর; ঈশ্বর। পাহাড়, সমুদ্র লোপাট হয়ে গেলেও, ঈশ্বর তাঁর নিজের চিহ্নটুকু বিলিন হতে দেননি। 
- ক্যাপ্টেন ক্ক্ব্র, আদেশ দিন।
- এসেছিলাম ভিনগ্রহে প্রাণের খোঁজে, ফিরে যাচ্ছি ঈশ্বরের চিহ্নটুকু নিয়ে। ও মূর্তিকে এখুনি স্পেসশিপে নিয়ে এসে ধূপদীপ দাও। 



Monday, October 2, 2017

নেশাভাং

- হ্যালো!
- হুঁ।
- বাবু, শুভ বিজয়া।
- হুঁ?
- শুভ। বিজয়া।
- শু..শুভ।
- এ'বারেও মন্টুদারা সিদ্ধিতে তামা ঘষে দিয়েছে?
- আমি ভাবলাম তোর সঙ্গে কথা বলতে নেই।
- নেই তো।
- তাহলে...ফোন করলি কেন?
- এমনি।
- আমি ফোন করব? কাল?
- না?
- কেন?
- তোর ফোন করতে নেই।
- ওহ। কিন্তু তুই ফোন করতে পারিস?
- পারি। সবসময় নয়। এই যেমন আজ, তোর জ্ঞানগম্যি যখন গুলিয়ে গেছে।
- ভাবছি...।
- তুই ভাবিস? বাবু?
- ওহ,  ভাবতে নেই?
- ভাবলে কেরিয়ারের কথা আর একটু মন দিয়ে ভাবতিস। অন্তত মায়ের কথা ভাবতিস। সে যাক, এখন কী ভাবছিলিস?
- সিদ্ধির জন্য বিজয়াদশমী পর্যন্ত ওয়েট না করে যদি মাঝেমধ্যেই...।
- মাঝেমধ্যেই আমাদের কথা বলতে নেই।
- ওউক্কে। আন্টিল নেক্সট বিজয়া দশমী দেন।
- কেন এমন করিস?
- যাস না।
- আমি নেই তো। যাব কই?
- ট্রু। সরি। শুভ বিজয়া।
- সাবধানে থাকিস। কেমন?
- যাস না।
- আবার?
- সরি।
- সামনের বিজয়ার সিদ্ধির আগে আর কোনও নেশাভাঙ নয়, কেমন?
- তোর শশীকাকাকে মনে আছে?
- স্কুলের বিহারী দারোয়ান? তুই যার সঙ্গে লুকিয়ে তাস খেলতিস?
- হুঁ।
- তাঁর কী হয়েছে?
- অষ্টমীর দিন মারা গেছেন। ওর বডি নিয়ে ছপড়া এসেছি ওর তিনজন দেশোয়ালির সঙ্গে। নবমী থেকে এখানেই। এ'টা ঠিক সিদ্ধি নয়, জানিস? ভাংয়ের গুলি।
- তুই এখন কোথায় বাবু?
- শ্মশান। পাশে গঙ্গা। চাঁদ, নীলচে কালো আকাশ। শীত শীত হাওয়া। শশীকাকাকে এ পুজোয় একটা ফতুয়া কিনে দিয়েছিলাম। আই জিঙ্কসড হিম। না রে?
- ধুর বোকা।
- কী ভয় রে। কী ভয়। ভূতের নয়।
- জানি।
- আই জিঙ্কস এভ্রিওয়ান।
- একটা চড় মারব।
- হেহ্।
- বাড়ি কবে ফিরছিস?
- যবে, তবে।
- তোর সর্দি লেগেছে?
- আমায় ফোন করিস না আর।
- ছিঃ বাবু।
- করিস না।
- আচ্ছা।
- জানিস, নতুন ফতুয়াটাও চিতায় চড়িয়ে এসেছি। বড় ভালো হনুমানের গান গাইত শশীকাকা। বড় দরাজ গলা। ভাব আসলে চোখ বেয়ে অঝোরে জল পড়ত। ট্রু সেন্ট। জুয়া না খেললে চুরি করত না।
- আমিও খুব ভালো হনুমানের গান গাইতে পারি। তোর ল্যাজটা থাকলে বেশ টের পেতিস।
- হেহ্। তোকে সেই যে একবার একটা শাড়ি দিলাম...। জিঙ্কস সে'খানেই হল।
- ক্যাটক্যাটে লাল! জিঙ্কস হওয়াই ভালো। এখন রাখি। কেমন?
- আয়। শুভ বিজয়া।
- শুভ। শ্মশান থেকে ফিরে স্নান করিস। আর এ'দিক ও'দিক হুটহাট চলে যাওয়ার আগে মায়ের কথাটা একটু ভাবিস। কেমন?

Sunday, October 1, 2017

বিপিনবাবুর একাদশী

(এই লেখাটা ২০১৬তে 'এই সময়'য়ের জন্য লেখা, সে'বার একাদশী রোব্বারে পড়েনি)

বিপিনবাবুর জ্ঞান যখন ফিরলো তখন গোটা মুখে রোদ! গোটা গায়ে অসহ্য যন্ত্রণা। মাথার বিশ্রী দপদপ আর ঝিমঝিম মেশানো অনুভূতিটা কিছুতেই যাচ্ছে না। শরীরটা মনে হচ্ছিল আড়াইশো কিলোর এক বস্তা লোহা।

“অফিস যাবে না নাকি”? বৌয়ের স্টিলের-বাসনপত্র-আছড়ে-পড়া কণ্ঠস্বরে বিপিনবাবুর মনের মধ্যে একটা সুতীব্র ঝাঁকুনি পড়ল। ঝাঁকুনি জিনিসটা খুব দরকারি। দৈনিক অটোরিকশার ঝাঁকুনিটাকে বিপিনবাবু ফ্রি জীম বলে ধরে নেন। আজকের এই বৌয়ের ডাকের ঝাঁকুনিটা তেঁতুলজলের কাজ করল। গোটা গা থেকে সিদ্ধির ভারটা এক ধাক্কায় অনেকটা নেমে গেল।

অফিস! পুজো খতম! একাদশী ইজ হিয়ার! অফিস! অফিস! অফিস! ঢনঢনিয়ার ফাইলের রিকনসিলিয়েশন, বড়সাহেবের চাওয়া গত কোয়ার্টারের রিভিউ স্টেটমেন্ট; একে একে সমস্ত পড়ে থাকা কাজ মাথায় হুড়মুড় করে এসে বুকের ভিতরের ঝিমঝিমে সিদ্ধি তন্দ্রাটা ঘুচিয়ে দিল। বমিবমি ভাব অবশ্য কম হল না।

ছয় গেলাস সিদ্ধি,

তারপর চার পিস পান্তুয়া,

তারপর দলের মেহেন্দির গানের তালে ধুনুচি নাচ। একটানা। ঠাকুর না ভাসানো পর্যন্ত।

সেই থেকে বুকের ভিতরটা এমন হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় হয়ে গেলো। রাতের মাটন রেজালা আর রুমালি রুটিতেও সবিশেষ মন দেওয়া হয়নি। নেশা এমনই জবরদস্ত উঠেছিল যে রুমালি রুটিতে মাখাবার জন্য মাঝেমাঝেই জ্যাম আর ধনেপাতা বাটা চেয়ে বসছিলেন। নেহাত গিন্নী সামাল দিয়ে বের করেছে। তবে বিজয়া দশমীর ডিনার এদিক ওদিক হলেও, পুজোর বাকি দিনগুলো বিপিনবাবু মন্দ খেয়েছেন, তেমন কথা পরম শত্রুও বলবে না। জলখাবারে পাঁচ দিনই থেকেছে লুচি, সাথে কখনও বেগুন ভাজা , কখনও আলু ভাজা, কখনও আলুর দম, কখনও নারকোল কুচি দেওয়া ছোলার ডাল। সঙ্গে পায়েস (রকমফেরে) এবং দু’রকমের মিষ্টি। দুপুরের খাওয়া হয়েছে বাড়িতে। থেকেছে দু’রকম মাছ; অসময়ে ইলিশ থেকে শুরু করে মৌড়লা বা ট্যাঙরা বা লইঠ্যা বা বোয়াল বা কাঁকড়া বা চিংড়ী। সাথে চিকেন বা মাটন। মুর্গি বলতে অবশ্য দেশীই বোঝেন বিপিনবাবু, তাঁর মতে ব্রয়লারের ভাজা পিস দিয়ে ভাল টেনিস বল বানানো যেতে পারে। ডিনার কেটেছে রেস্তোরাঁ হপিং করে। বিপিনবাবু প্যান্ডেল হপিঙয়ে বিশ্বাস করেন না। তিনি পুজো বলতে পাড়ার পুজো মণ্ডপ বোঝেন, তার বাইরে সমস্তটাই অন্ধকার। পাড়ার মণ্ডপ আর খাওয়াদাওয়া। চাইনিজ টু মুঘলাই ডিনারের মাঝে টুকিটাকি রোল ফুচকায় ডাইভারসন থাকে অবশ্য থাকেই।

“অমন ড্যাবা চোখে বসে আছো যে এখনও? এ’দিকে সাড়ে সাতটা বাজতে চললো যে! খবরদার বাজার না করে যদি বাড়ি থেকে বেরিয়েছ”। ফের বৌয়ের গলায়  স্টিলের-বাসনপত্র-আছড়ে-পড়া হুমকি। ফের চমকে উঠে নিজের খোঁচা দাড়ির গাল চুলকে ফেলেন বিপিনবাবু।

অফিস! পুজো শেষ! সামান্য ভূমিকম্প অনুভূত হল কি? দু’সেকেন্ড তেমনটাই মনে হলেও বিপিনবাবু বুঝলেন তিনি নিজেই সামান্য দুলে উঠেছিলেন। ফের বড়সাহেব, ফের ইয়ে করো,উয়ো করো। পুজোর সমস্ত নবাবী খতম।

“ইয়ে, বাজার ফেরতা আজ কচুরি আনব”? ফতুয়াটা গলাতে গলাতে মিনমিন করে জিজ্ঞেস করে ফেলেছিলেন বিপিনবাবু।

“পুজোয় গজানো আড়াই হাতের ল্যাজটা এবার কাটো। পাঁচ দিন ধরে লুচি গিলে আজ আবার কচুরি? লক্ষ্মীপুজোর আগেই নিমতলায় যাওয়ার ইচ্ছে নাকি? ভালো করে দাঁড়াতে পারছেন না আবার কচুরি খাবেন। কচুরি আনলে আজ তোমারই একদিন কি আমারই একদিন। অনেক আদেখলামো আর জমিদারি সহ্য করেছি পুজোর এ কয়দিন। এবারে আমি যেমন বলব তেমনটি খাওয়া! আর জেলুসিল চাইলেও পাবে না, বলে রাখলাম”!

“ওহ। আচ্ছা বেশ। আজ জলখাবারে তাহলে...”।

“ছাতু”!

“ছা...ছা...”?

“ছাতু! নাম শোনোনি বাপের জন্মে মনে হচ্ছে”?

“ছাতু খাওয়াবে জলখাবারে, আর বাপ তুলে কথাও বলবে”?

“এক হপ্তার মধ্যে যদি তেলেভাজা কিছু খাওয়ার নাম শুনেছি, তাহলে আমি চোদ্দ-পুরুষ তুলে কথা বলব। পুলিশে কমপ্লেইন করব”।

“আচ্ছা বেশ। ছাতু”।

“নুন লেবু লঙ্কাকুচি পেঁয়াজকুচি দিয়ে গুলে দেব। অমৃতের চেয়ে কম নয়”।

“ছাতু! অমৃতসমান হতেও পারে গো, তাই বলে লুচি তো নয়”!

“গা জ্বালিও না তো! গা জ্বালিও না। চটপট বাজার করে এনে উদ্ধার করো”।

“মাছ আছে কি? না কি আনতে হবে”?

“চারাপোনা এনো। আমি পাতলা ঝোল করে দেব। সাথে ভাত আর শসা মুলো কুচোনো স্যালাড। আজ তোমার টিফিনে”।

“চা...চা...চার...”।

“আবার গোঙায় ধরলো দেখি। চারাপোনার ঝোল”!

“সঙ্গে মুলো”?

“পেট ক্লেন্স করতে হবে না! ওই ডিজেলে ভাজা চপ রোল যে’ভাবে কিলো কিলো খেয়েছ”!

“সকালে ছাতু আর দুপুরে চারাপোনার ঝোল আর ভাত। ওহ্‌!ক্লেন্সিং! বটে”!

“আর একটু কুমড়ো এনো বুঝলে! রাতে কুমড়োর ঝাল ছাড়া ছক্কা আর দু’টো রুটি” ।

"ছাতু, চারাপোনা, মুলো আর কুমড়োর ছক্কা! ছাতু, চারাপোনা, মুলো আর কুমড়োর ছক্কা! ছাতু, চারাপোনা, মুলো আর কুমড়োর ছক্কা"!

"ও মা! অমন নামতা পড়া শুরু করলে কেন"?

বিপিনবাবু বিড়বিড় করেই চললেন; “ছাতু, চারাপোনা, মুলো আর কুমড়োর ছক্কা!ছাতু, চারাপোনা, মুলো আর কুমড়োর ছক্কা”!

অটোওলা খুচরো চাইলে তিনি ফস করে বলে বসলেনঃ “ছাতু, চারাপোনা, মুলো আর কুমড়োর ছক্কা”। অটোওলা আর ঘাঁটাতে সাহস না পেয়ে নিজে সুড়সুড় করে খুচরো বার করে ব্যাপারটা সামাল দিলেন।

অফিসের বড়সাহেব জিজ্ঞেস করলেন “হাউ ডু ইউ ডু”। বিপিনবাবু অম্লানবদনে বলে ফেললেন; “ছাতু, চারাপোনা, মুলো আর কুমড়োর ছক্কা”! বড়সাহেব চশমা কপালে তুলে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেলেন।

পিসতুতো ভাই ফোন করে বিজয়ার প্রণাম জানালে, বিপিনবাবু বললেন “ছাতু, চারাপোনা, মুলো আর কুমড়োর ছক্কা”!পিসতুতো ভাই “ক্রস কনেকশনের যুগ ফিরে এসেছে” বলে লাইন কেটে দিলেন।

অফিস ফেরতা রাতে খেতে বসে বিপিনবাবু যথারীতি গিন্নীকে বললেন “কই দাও! ছাতু, চারাপোনা, মুলো আর কুমড়োর ছক্কা”!

গিন্নী থালায় সাজিয়ে দিলেন ফুলকো ডিমের কচুরি আর কিমা ঘুগনি। পাশে ঘরে বানানো নারকোলের সন্দেশ।

ফের সেই ঝাঁকুনি অনুভব করলেন বিপিনবাবু; ছাতু, চারাপোনা, মুলো আর কুমড়োর ছক্কার তাল কেটে এ কী এলাহি ব্যাপার! আজ একাদশী যে! আজ যে ছাতু-মুলো দিবস।

“এ কী গো! আমার পেট ক্লেন্স করার কথা যে! কুমড়োর ছক্কা দিয়ে! এ’সব কী”? বিপিনবাবু বিহ্বল বোধ করছিলেন।

“সেই যে প্রথম বিয়ের পর, প্রথম বিজয়ার রাতে কী বলেছিলে খেয়াল আছে”? 

“ক্..কী? কী বলেছি?”

“বলেছিলে যে শাস্ত্রে আছে মেয়েদের বরের সাথে বিজয়া কোলাকুলিতেই সারা উচিৎ। গোপনে”।

“অ। ওহ! আচ্ছা! হ্যাঁ। তাই তো”।

“সকাল থেকে চারাপোনা ছাতু শুনে সেই যে নামতা পড়া শুরু করেছ, তখনই বুঝেছি গণ্ডগোল। তোমার পেট সাফ করতে গিয়ে আমাদের বিজয়ার কোলাকুলিটাই না নষ্ট করে ফেলি”।

“হেহ্! হেহ্‌ হে”!

“অমন হাঁ করে ড্যাবা চোখে বসে না থেকো কচুরিগুলো গিলে আমায় উদ্ধার করো দেখি। ও হ্যাঁ! কাল তো সিদ্ধিতে ডুবে ছিলে তাই বলা হয়নি। বিজয়ার শুভেচ্ছা জানালাম। মন থেকে। আর খেয়ে ওঠো, তারপর প্রণামটা সেরে নেব’খন। আরও কচুরি দেব। গরমাগরম। ভাজছি কিন্তু”।

গিন্নীর হাতের খুন্তিটাকে যেন জগজ্জননীর ত্রিশূল বলে মনে হল বিপিনবাবুর! দেবীর তৃতীয় নয়ন সদা সজাগ থাকে, ভক্তের যন্ত্রণাকে ভুলেও অবহেলায় রাখেন না তিনি। বিপিনবাবু তক্ষুনি “ভালোবাসি গো, বিজয়ার শুভেচ্ছা ও আশীর্বাদ রইল’ বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু চোখ ভরা ছলছল আর মুখভরা কচুরির গ্রাসে তাঁর মুখ দিয়ে কেবল বেরোল “বিববাব বুবেব্বা বো বাবীর্বাব বইবো”।

হট্টগোলের পৃথিবীতে এক জোড়া মানুষ হৃদয় উজাড় করে রান্নাঘর আলো করে পড়ে রইলেন। আফটার অল,  অষ্টমী সন্ধ্যে ইজ আ স্টেট অফ মাইন্ড।