Wednesday, August 30, 2017

এক্সকিউজ মি

- দাদা, এক্সকিউজ মি।
- কিছু বলবেন?
- একটা মাইনর ব্যাপার ছিল।
- টুক করে বলে ফেলুন।
- বলছিলাম যে, ইয়ে, আপনার বাঁ পা আমার ডান পায়ের ওপর রয়েছে।
- আপনার বাঁ পা কি মাটিতে রয়েছে?
- জুতোর সোল মোটা, তাই ঠিক টের পাচ্ছি না।
- আপনার জুতোর সোলের ওজন আপনার বাঁ'দিকের ভদ্রলোকের ডান পা ঠিক টের পাচ্ছে। আমার ডান পায়ের ওপর যেমন পাশের বৌদির ছুঁচলো হিল। জুতো নয়, চটি। কাজেই ব্যথার ডিগ্রীটা আশা করি বুঝতে পারছেন।
- ওহ। সরি।
- ইট ইস ওকে।
- লাইনটা মুভ করছে না কেন বলুন তো?
- আপনি বোধ হয় ক্যালক্যাটার নন, তাই না?
- উখড়া,  আসানসোলের দিকে।
- বুঝেছি। প্যান্ডেল হপিংয়ের জন্য জীনকে মিউটেট করাতে পারেননি। স্পীড কমফর্ট কমনসেন্সের মত অদ্ভুত সব জিনিস এক্সপেক্ট করছেন।
- সরি।
- ইট ইস ওকে।

Tuesday, August 29, 2017

রিভিউ

- হ্যালো, খোকা!
- হুঁ। বলো।
- এ'বারেও ছুটি পাবি না রে?
- সব জানোই তো মা।
- জানি। তবু, ইচ্ছে হয় জিজ্ঞেস করতে।
- বেশ করেছ জিজ্ঞেস করে।
- তোর বস তো বেশ ভালোমানুষ,  দেখ না একবার বলে কয়ে যদি..।
- ওই সময় রিভিউ আছে মা। না থাকলে আমারই ক্ষতি।
- জানি। জানি। তবু। বলে ফেলি।
- বেশ করো বলে ফেলো।
- খোকা জানিস, দত্ত বাড়ির ছোট মেয়ে পাড়ায় এসেছে..পুজো পর্যন্ত থাকবে। ওর ছেলেটা যে কী মিষ্টি হয়েছে..। আজ বাড়িতে এসেছিল। গিন্নীবান্নি হয়ে গেছে সে এখন। ছেলেটা সবার কোলে যায়...।
- মা।
- তোর কথা জিজ্ঞেস করছিল।
- আমি তো তোমায় এত কথা জিজ্ঞেস করিনি মা।
- বলে ফেলি।
- আচ্ছা। বেশ করো বলে ফেলো।
- আসবি? খোকা? কদ্দিন পুজোয় বাড়ি ফিরিস না। উৎসব পার্বনের দিনে ঘরটা একদম...।
- রিভিউ। প্রমোশন। কত কিছু!

***

- তুই কলেজ ফাঁকি দিয়ে চলে এলি?
- আমার দ্বারা পেল্লায় কেরিয়ার টেরিয়ার হবে না রে। একটা বেশ পোস্ট অফিসে ক্লার্কের হব। দশটা পাঁচটা। তুই হবি কোনও হেডমিস্ট্রেস।
- বাবু, তুই এমন কেন রে? সেমেস্টার পরীক্ষা বাদ দিয়ে কেউ পুজোয় বাড়ি ফেরে?
- পুজোয় কেউ কেরিয়ার ভাবে?

***

"পুজোয় কেউ কেরিয়ার ভাবে"? নবমী সকালে, নাগপুরের কোয়ার্টারের ছাতে; তিন নম্বর আর্নড লীভ নষ্ট করতে করতে ভাবছিলেন চ্যাটার্জীবাবু।

একটানা রিভিউ চলে এসএমএসে;

" এ'বারেও আসবি না বাবু? আমার সঙ্গে কি আর কোনওদিনও দেখা করতে নেই"?

Tuesday, August 22, 2017

গানের খাতা

- ডাক্তার।
- আরে দত্তবাবু যে,কী ব্যাপার? এই শেষ বেলায় কী মনে করে?
- চিন্তায় ছিলাম এত রাত্রে তোমার চেম্বার খোলা পাব কী না।
- বন্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। তা কী ব্যাপার? হাঁটুটা বেশি ট্রাবল দিচ্ছে?
- হাঁটু যেমন তেমন আছে হে ডাক্তার, সমস্যা অন্য।
- কী সমস্যা?
- জ্বর জ্বর ভাবটা কমছে না। টেম্পারেচার তেমন নেই, কিন্তু ভিতর ভিতর একটা যে ইয়ে রয়েই গেছে।
- দেখি, পালস দেখি দত্তবাবু।
- মড়ার আবার পালস কী হে?
- তাও তো বটে। আমারই মাথাটা গেছে।
- জিভ দেখি।
- মুখ দু'দিন ধরে এত তিতকুটে হয়েছিল...জিভটা খুলে রেখেছি। ভেবেছিলাম আজ বেরোনোর আগে পরে বেরোব কিন্তু মনে ছিল না। আসলে স্ট্রেস কমাতে কয়েক জিবি মেমোরি ব্রেন থেকে সরিয়ে আলমারিতে রেখে দিয়েছি কিনা, তা'তেই সমস্যা। সঠিক সময়ে সঠিক কথা কিছুতেই মনে পড়ছে না।
- পালস নেই, জিভ নেই। খানিকটা মেমোরিও মিসিং। মুশকিল হল তো।
- তোমার এদ্দিনের এক্সপিরিয়েন্স, দিয়ে দাও না দু'দাগ যা হয় কিছু।
- জ্বর জ্বর ভাব?
- প্রচণ্ড রকমের ম্যাজম্যাজ। গায়ে অল্প ব্যথা। একটা ভূত-বেল্যেডোনা গোছের কোনও বড়ি যদি...।
- নাহ্, এ যা দেখছি ওঝাও-হোমিওপ্যাথিতে কাজ হবে না...।
- সামান্য ফিভারের জন্য ছুরি কাঁচা ধরবে ডাক্তার?
- সিম্পটম তো তাই বলছে। ভিটামিন এম'য়ের অভাব, তা'তেই গায়ের টেম্পারেচার বাড়ছে।
- ভিটামিন এম?
- মড়াদের থাকে।
- এম ফর মড়া?
- না, এম ফর মিউজিক-মেমরি। আপনাকে গান টানছে। তাই এই জ্বর।
- উপায়?
- গানের কোনো স্মৃতিতে না ফিরতে পারলে মড়াদেহ ঝরঝরে হবে না মোটেও।
- গানের স্মৃতি? আছে, উপায় আছে। মায়ের গানের খাতাটা যদি...।

***

- খোকা! কাঁদছিস কেন?
- তোমার গানের খাতা মা! তোমার গন্ধ।
- খুঁজে পেলি তাহলে?
- সবাই বড় অযত্নে রেখেছিল মা তোমায়, আর এই এত দামী খাতাটাও..।
- তোর মায়ের গানের খাতা,  অন্যের কাছে দামী হবে কেন? তাও ভালো ওঝার কথায় ফেরত এলি..। দু'দণ্ড দেখতে পেলাম।
- ওঝা? হেহ্, আমাদের ও'দিকে ও ব্যাটাই আবার ডাক্তার। সেই বললে, আমার নাকি ভিটামিন-এম'য়ের অভাব। গানের সুবাস দরকার, নয়ত জ্বর কাটবে না। ভোর হল বলে, যেতে হবে। গাইবে? ওই যে 'তুই ফেলে এসেছিস কারে, মন, মন রে আমার। তাই জনম গেল, শান্তি পেলি না রে মন, মন রে আমার'।

***

- মা, তোমার জ্ঞান ফিরেছে তা'লে। সুস্থ বোধ করছ?
- কে..কে?
- আমি গো, সুজন ওঝা। খোকাকে দেখে কেমন লাগল মা? তাকে গান শুনিয়ে মন শান্ত হল?
- খোকার...খোকার জ্বর...।
- সে এখন দিব্যি ফুরফুর করছে। ভাগ্যিস তুমি গানের খাতাটা এনেছিলে মা, নয়তো তাঁকে নামানো সহজ হত না গো..।

Monday, August 21, 2017

গোপন বোতল

- হ্যাঁ রে গুপে..একটা কথা অনেস্টলি বলবি আমায়?
- কী ব্যাপার মামা? তুমি এত সিরিয়াস টোনে কথা বলছ কেন?
- কারণ সাব্জেক্টটা সিরিয়াস তাই।
- কী ব্যাপার?
- তুই মদ খাস?
- ছিহ্! মদ? রামোহ্! মাকে প্রমিস করেছি ও'সব ছোঁব না।
- রিয়েলি? দিদিকে প্রমিস করেছিস? র‍্যামোহ্? বটে?
- তোমায় ছুঁয়ে বলব?
- পাগল নাকি রে! ডাক্তার এমনিতেই বলেছে কোলেস্টেরল অ্যালার্মিং ডায়রেকশনে বয়ে চলেছে।
- মাইরি গো। সে'বার অফিস পিকনিকে এক চুমুক বিয়ার খেয়ে কী বিশ্রী লেগেছিল। তারপর থেকে পার্টিফার্টিতেও বড় জোর লাইম সোডা, তাও আবার স্যুইট।
- গুড বয় গুপে।
- থ্যাঙ্ক ইউ মামা।
- ইয়ে, তোর ওই দেরাজে কেউ ভুলে একটা জনি ওয়াকারের বোতল ফেলে গেছিল।
- দেরাজ? আমার? মাইরি?
- নট টু ওয়ারি। ও আমি সরিয়ে নিয়েছি। এই ব্যাগে রেখেছি। যাওয়ার পথে কোনও ঝোপঝাড় দেখে ফেলে দেব।
- মামা, আমি থাকতে তুমি কেন কষ্ট করবে?
- কষ্ট কী? নাথিং। নাথিং। ঝোপঝাড় কত চারদিকে।
- কী দরকার। তুমি নিজে কোনও দিন মদের বোতল ছুঁয়ে দেখোনি, এই সেদিনই তুমি দিদার সামনে গল্প করছিলে।
- তা অবশ্য ঠিক। মদের বোতল মানে নরকের আধার কার্ড।
- তা বোতলটা রেখেই যাও।
- কী ভাবে এলো বল তো বোতলটা? দেরাজে?
- আমি তো আকাশ থেকে পড়ছি। বিশ্বাস করো। কেউ তুকতাক করছে না তো মামা?
- তুকতাক? হতে পারে। তবে এ বোতল বরং আজ ঝোপঝাড়ে ফেলে আসাই ভালো। এই বোতল ফেলে আমি বরং দু'লিটারের ফ্যান্টা নিয়ে আসব।
- আমি মরে গেছি মামা? আমি থাকতে তুমি বাইরে যাবে কষ্ট করে?
- যাব না?
- পম্পফ্রেট ভাজা খাবে মামা? ফ্যান্টা দিয়ে?
- পমফ্রেট এনে রেখেছিস?
- ম্যারিনেটও করাই আছে।
- ও। আচ্ছা। ওই কাজুর প্যাকেট দেখছি...।
- ওই...ফ্যান্টার সঙ্গে খাওয়ার জন্যে।
- তুই ফ্যান্টা সত্যিই ভালোবাসিস গুপে।
- ওই। নরনাং মাতুলং কী যেন।
- কথাটার মানে জানিস?
- মানুষ মামার মতই হয়...।
- ঠিক, অর্থাৎ মামা ঝোপ হলে...।
- ভাগনে ঝাড়।
- হেহ্। তা'হলে মামা, দেরাজের বোতলটা...।
- ঝোপঝাড়েই যাক।

জনি ওয়াকারের বোতলটা প্রতি রোববার ফ্যান্টায় রীফিল হয়ে চলে।
প্রতি রোববার মামার হুমকি।
প্রতি রোববার গুপের পমফ্রেট টোপ।

জনি ওয়াকার-ফ্যান্টায় মাতাল না হলে প্ল্যানচেট জমে না, প্ল্যানচেট না জমলে মামা ভাগ্নে নিজেদের মায়দের ডেকে হপ্তার ফিরস্তি শোনাবে কী করে?

Sunday, August 20, 2017

নতুন গান

এই যে বেঁচেবর্তে ঘুরে বেড়াচ্ছি।
এই যে চায়ের কাপে নিজের পছন্দ মত পরিমাণে চিনি মিশিয়ে নিচ্ছি।
খবরের কাগজের পাতা উলটে  চুকচুক করে চলেছি।
বসের মুখ গোমড়া হলেই মাথা চুলকে হদ্দ হচ্ছি।
এই যে প্রতিবেশীর পর্দার রঙ ক্যাটক্যাটে বলে মনখারাপ করছি।

এই যে সভ্যতায় গা এলিয়ে মৌজ করতে পারা। টেবিল চাপড়ে রেগে উঠতে পারা। এই যে মনের মধ্যে হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড়ে তৈরি হলে শীতের রাতের মিয়ানো বেড়ালের মত কাঠের পেটির আস্তানা খোঁজা। সন্ধে সাতটা পঞ্চাশের আপ ব্যান্ডেল লোকালের জানালার প্রতি এই যে প্রপঞ্চময় মায়া।

সব মিলে ইংরেজিতে যাকে বলে 'মাচ্ কভেটেড' এই মানবজীবন।
এই মানবজীবনের কচুপাতায় চকমকে মুক্তোর দানার মত যদি কোনও পাওনা থাকে তবে তা হল একটা নতুন গানকে দুম করে ভালোবাসতে পারা।

সুর মানেই প্রশান্ত মহাসাগর এ থিওরি আদ্যোপান্ত বাতেলা। আবার অমুক সুরে দুনিয়া মজছে বলেই আমিও ভেসে বেড়াবো তেমন নিউটনি আইনও খাটে না।

একটা নতুন গানকে আচমকা 'প্রিয়' বলে চিনতে পারা, এ'টাই সুপারপাওয়ার, এতেই নির্বাণ। একদম অচেনা অজানা কোনও সুর; প্রথম শোনা এক ঝাঁক কথার সিঁড়ি বেয়ে ছাতে উঠে পায়চারী করতে করতে গান হয়েছে। তার সামনে এসে ঝপাৎ করে বলতে পারা "যাক্, দেখা হলো তাহলে। খবর সব ঠিকঠাক"?

গানও তো মানুষ গোছেরই। তাদেরও ভালো মন্দ, পছন্দ অপছন্দ, ঠিক বেঠিক, শাড়ি ফতুয়া, কান্না গোপন চুমু, কবিতা বোধ খিস্তি; সবটুকুই রয়েছে। কথার আদর, সুরের স্নেহ আর কণ্ঠস্বরের মেরুদণ্ডে তাদের স্পষ্ট হয়ে ওঠা।

এই সবকিছু মিলে কিছু গান দুম করে এসে কড়া নাড়ে। "কউন হ্যায়" হাঁক পাড়বার আগেই খেয়াল হয় 'দরজাটা কোথায়"?
তারপর খানিক খোঁজখবরে হদিশ মেলে গোপন কুঠুরির। সে কুঠুরির গায়ে নক্সা করা সেগুন কাঠের দরজা। কুঠুরিটা যে আছে সে খবরই এদ্দিন জানা ছিল না। হঠাৎ একটা বেমক্কা গান এসে নিদান দেয় "ইয়ে দরওয়াজা খোলিয়ে জনাব"। পিতলের ছিটকিনি নামিয়ে দরজা খুলে দিতেই গানের সুর, কথা, কন্ঠ হুশহাশ সে কুঠুরিতে রোদ নিয়ে ঢুকে পড়ে।

মনের তলে দিব্যি কত কিছু জমা থাকে; কত মাদুর পাতা মন খারাপ, কত আতরে ভেজা তুলোর মত ব্যথা, কত বৃষ্টি ধোয়া রাস্তার মত ভালো লাগা, কত দেশলাই বাক্সে ঠেসে ভরে রাখা সুপারনোভা সাইজের অভিমান; একেকটা নতুন গান ভালোবেসে এক একটা নতুন গল্প তৈরি করে যায়।

'অলির কথা শুনে বকুল হাসে' প্রথম শুনেছিলাম দাদুর ফিলিপ্সের রেডিওতে। সে গানে আজও শীতের রাত্রির গন্ধ লেগে আছে। মায়ের গলায় প্রথম শোনা 'এমনই বরষা ছিল সেদিন'; হাতে গরম মনখারাপি সুর। ক্লাস নাইনের একটা  বিকেলে, এক স্কুলের বন্ধুর চিলেকোঠার ঘরে  প্রথম শুনেছিলাম 'তোমার তুলনা আমি খুঁজি না কখনও'; বিকেলের গন্ধে আজও বেমক্কা বুক ছ্যাঁত করে ওঠে। বা সোজাসুজি সে ভদ্রলোকের কণ্ঠে শোনা "বন্ধুরা, বিশ্বাস করুন আমি মানুষটা হিংসুটে নই মোটেও। তবু আমার ভীষণ মন খারাপ হয় এই ভেবে যে এই লাইন দু'টো আমার লেখা নয় - 'ভালো আছি ভালো থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো'"; প্রেসিডেন্সির ডিরোজিও হল, বছরটা সম্ভবত ২০০২।  
অথবা মাঝরাতের ছাতের অবকাশে আর গোল্ডফ্লেকিও সুবাস মিশিয়ে শোনা 'তেরে খত্ আজ ম্যায় গঙ্গা মে বহা আয়া হুঁ, আগ বেহতে হুয়ে পানি মে লগা আয়া হুঁ'।

মোদ্দা কথা হলো কিছু কিছু গান শুনেই 'আরে, এ'টা তো আমার' বলে জড়িয়ে ধরতে পারা; এই ক্ষমতাটুকু যদ্দিন আমাদের আছে তদ্দিন যুদ্ধটুদ্ধ থাকা সত্ত্বেও মানুষামি ঘুচবে না।

পুনশ্চ - চন্দ্রাণীদেবীর 'তোমাকে বুঝি না প্রিয়' গানটা শুনে যে দুম করে ভালো লাগা (যুক্তি জানি না, গানের কতটুকুই বা বুঝি), তার পরিপ্রেক্ষিতে এই বেমক্কা র‍্যান্ডম র‍্যান্ট