Saturday, August 12, 2017

চেনা চেনা হাসিমুখ

সেই ছোটবেলার শহর।

সেই কবেকার। কত স্মৃতি। কত পুরনো মানুষের স্নেহসুবাস জড়িয়ে রয়েছে এ শহরে।  অনিন্দ্যর যে কী ভালো লাগছিল।

বাবা যখন বদলি হয়ে এখানে এসেছিল, অনিন্দ্য তখন ক্লাস ফোরে। এ'খান থেকে যখন বাবা ফের ট্রান্সফার নিয়ে কলকাতায় ফিরে আসে তখন অনিন্দ্য সবে ক্লাস নাইন থেকে টেনে উঠেছে। ওই পাঁচ বছরের স্মৃতি আজও অনিন্দ্যর মনে জ্বলজ্বল করে। বাগানে ঘেরা চমৎকার একটা দোতলা কোয়ার্টারে ওরা থাকত। স্কুলবাড়িটা ওদের সেই বাড়ি থেকে হেঁটে
বড় জোর মিনিট দশেকের রাস্তা। স্কুলের সামনের মাঠে রোজ ফুটবল বা ক্রিকেট। বাপ্পা, মন্টু, নেপাল আর আসিফের সঙ্গে সেই সন্ধে পর্যন্ত আড্ডা। এদ্দিন পর কাজের সূত্রে এ'খানে এসে কী ভালোই যে লাগছিল। অনিন্দ্যর খুব ইচ্ছে ছিল বাবা মাকে নিয়ে আসার, কিন্তু এই ছোট্ট শহরে হোটেলের সুব্যবস্থা কেমন থাকবে সে বিষয়ে সে ততটা নিশ্চিত ছিল না। পুরনো যোগাযোগও কিছু নেই। তাছাড়া মাত্র একটা দিনের ব্যাপার।

কাজ মিটে গেছিল সন্ধ্যে ছ'টার মধ্যেই, অনিন্দ্যর ট্রেন রাত্তির পৌনে ন'টায়। অনিন্দ্য ঠিক করেছিল স্টেশনবাজারে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে, কোনও পরিষ্কার ভাতের হোটেল দেখে রাতের খাওয়াটা সেরে নেবে। সঙ্গে শুধু একটা কাগজপত্র রাখার হালকা সাইডব্যাগ, কাজেই ঘোরাফেরায় কোনও অসুবিধে নেই। এই স্টেশন বাজার অনিন্দ্যদের পুরনো কোয়ার্টার থেকে হাঁটাপথ। বেশ জমজমাট বাজার। অটোস্ট্যান্ড,  রিক্সাস্ট্যান্ড, মাছ সবজির বাজার,  শাড়ি জামাকাপড়ের দোকান; সব মিলে বেশ জাঁকজমকপূর্ণ একটা ব্যাপার। বিশেষত সন্ধের দিকটায়।

অনিন্দ্য ছোটবেলায় এ'দিকে প্রায়ই আসত, কখনও বাবার সঙ্গে মাছসবজির বাজারে, কখনও বইখাতা কিনতে, কখনও বন্ধুদের সঙ্গে নিউ মাদ্রাজ ক্যাফের সম্বর-দোসা বা ডিলাইট বেকারির চিকেন প্যাটি খেতে, কখনও স্টেশন লাগোয়া মনোরমা বুক স্টোর থেকে আনন্দমেলা বা শুকতারা কিনতে অথবা অন্য কোনও কাজে। সে'সব স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে ঘণ্টা দুয়েক দিব্যি কেটে যাবে। পুরনো জায়গাগুলো এই সুযোগে আরও একবার ঢুঁ মারা যাবে।  পরেশকাকুর একটা দশকর্মার দোকান ছিল যে'খান থেকে ঠাকুমার ফরমায়েশ মত পুজোর সামগ্রী আসত, ভদ্রলোক দুর্দান্ত ভূতের গল্প বলতেন। দিনদুপুরে এমন সমস্ত অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি করে গল্প বলতেন যে অনিন্দ্যর গায়ে কাঁটা দিত, পরেশকাকুর সঙ্গে দেখা হলে বেশ হয়। অথবা বীণাপাণি ক্যাসেট সেন্টারের মনাদা যার কিশোরকুমারের সমস্ত গান মুখস্ত থাকত। এরা এখন কেমন আছে? মনাদা নিশ্চই এখন সিডি ডিভিডি বিক্রি করে।

অনিন্দ্য যখন ক্লাস সেভেনে তখন তাদের বাড়িতে প্রথম টেপ রেকর্ডার আসে। ফিলিপ্সের স্টিরিও। প্রথম ক্যাসেট কেনার টাকা দিয়েছিলেন ঠাকুমা, পঞ্চাশ টাকায় সে সময় অন্তত দু'টো ক্যাসেট হয়ে যেত। সে দিনটা অনিন্দ্যর স্পষ্ট মনে আছে। মনাদা খৈনি মুখে পুরতে পুরতে বলেছিল "মিউজিকের হিমালয় একজনই, কিশোরদা। বাকি সব স্পীডব্রেকার। কাজেই তোর প্রথম দু'টো ক্যাসেট হওয়া উচিৎ গোল্ডেন হিটস অফ কিশোর কুমার ভল্যুম ওয়ান আর ভল্যুম ট্যু"।

অনিন্দ্য ভল্যুম ওয়ানটাই নিয়েছিল। বাকি টাকায় একটা নতুন গানের ক্যাসেট খুঁজছিল সে। নতুন টেপরেকর্ডারে একদম নতুন সুর, নতুন কথা আর নতুন কণ্ঠ মিলিয়ে নতুন গান। মনাদার সমস্ত জ্ঞান কিশোরকুমার ঘেঁষা। কাজেই ওর ভরসায় না থেকে অনিন্দ্য নিজেই হন্যে হয়ে খুঁজছিল বীণাপাণি ক্যাসেট সেন্টারের প্রতিটা শেল্ফে। মলাট দেখে বই বিচারের চেয়ে সতেরোগুণ বেশি কঠিন হচ্ছে ক্যাসেটের মলাট দেখে গান বিচার। অনিন্দ্য যখন প্রায় হন্যে হয় কিশোরকুমারের গোল্ডেন হিটস ভল্যুম ট্যুয়ের বশ্যতা স্বীকার করে নেওয়া মুখে তখন পাশে দাঁড়ানো এক অপরিচিত কাকু তার পিঠে হাত রেখে জিজ্ঞেস করেছিলেন "সুমন চাটুজ্জের গান শুনেছ খোকা? না শুনে থাকলে এই বেলা ওর সদ্য রীলিজ হওয়া 'তোমাকে চাই' ক্যাসেটটা কিনে ফেল। জীবন পাল্টে যাবে সেই সুর আর কথায়"।

সেই নীল চেক শার্টের ভদ্রলোকটির কথা আজও মনে পড়ে অনিন্দ্যর। জীবনের একটা ভালোবাসা সে'দিন খুঁজে পেয়েছিল সে; সুমনবাবুর গান।

**

স্টেশন বাজার আমূল পালটে গেছে, অনিন্দ্যর প্রায় সব কিছুই নতুন ঠেকছিল। রিক্সাস্ট্যান্ড উঠে গিয়ে এখন টোটো স্ট্যান্ড হয়েছে।  পরেশকাকুর দশকর্মার দোকান ভেঙে একটা ছোটখাটো ডিপার্টমেন্টাল স্টোর হয়েছে; মালিক পরেশকাকুরই ছেলে। ডিলাইট বেকারির চেহারা বরং আগের চেয়ে  অনেক বেশি জীর্ণ, আগে সন্ধেবেলা টিউশন ফেরত ছাত্রেদের একটা ভিড় লেগে থাকত একটানা, সে'টা নজরে পড়ল না।

মাদ্রাজ ক্যাফে আগে বাতানুকূল ছিল না, সামনে ইয়াব্বড় গ্লোসাইন ছিল না। ভাতের হোটেল না খুঁজে ডিনারটা সে'খানেই সেরে নিল অনিন্দ্য। মশলা দোসার স্বাদ এখন আমূল পাল্টেছে। কাউন্টারে বসা রাজু ভাইয়ার বেশ মুটিয়ে গেছে, চুলেও পাক ধরেছে। দোসা আর ফিল্টার কফি খেয়ে বেরিয়ে অনিন্দ্য দেখল হাতে তখনও আধ ঘণ্টা সময় রয়েছে। 

স্টেশন বাজারের যে সরু গলিতে মনাদার বীণাপাণি ক্যাসেট সেন্টার ছিল সে'টা মাদ্রাজ ক্যাফের পাশেই। মনাদাকে দেখার সামান্য ইচ্ছে আর সময় দু'টোই হাতে ছিল। মাদ্রাজ ক্যাফের ক্যাশ কাউন্টারে রাখা স্টিলের বাটি থেকে তুলে নেওয়া ভাজা মৌরি চিবুতে চিবুতে অনিন্দ্য ঢুকল সেই গলিতে।

অদ্ভুত ব্যাপার, গোটা শহর ভোজবাজির মত বদলে গেলেও এই গলিটা আদৌ পালটায়নি। সেই সাতপুরনো পোস্টবাক্স, সেই দেওয়ালে হলুদ আর লাল পেন্টে আঁকা বাপি গেঞ্জির বিজ্ঞাপন, সেই ল্যাম্পপোস্টগুলোর গায়ে সাঁটা "এই চিহ্নে ভোট দিন" পোস্টারগুলো । গলির শেষ প্রান্ত থেকে ভেসে আসা ভেজিটেবল চপের গন্ধটাও ঠিক তেমন ভাবেই নাকে এলো; যেমনটা পাওয়া যেত অত বছর আগে।

অনিন্দ্য রীতিমত চমকে গেল বীণাপাণি ক্যাসেট সেন্টারের সামনে এসে। সেই পালিশ ওঠা সব শোকেস। সেই সবজে পেডেস্টাল ফ্যানের ঘরঘর। আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার, এ'খানে এখনও ক্যাসেট বিক্রি হচ্ছে। আজকালও লোকে ক্যাসেট কেনে? এখনও কারুর কাছে ক্যাসেট প্লেয়ার পাওয়া রয়েছে? মনাদার চেহারায় এতদিনেও তেমন কোনও পরিবর্তন নেই, সেই খৈনি চিবুনো হাসি। মনাদা অবশ্যই অনিন্দ্যকে চিনতে পারেনি, সে তখন বছর বারো তেরো বয়সের ছেলেকে কিশোরকুমারের ক্যাসেট গোছাতে ব্যস্ত।

হলদেটে জামা গায়ে ছেলেটার হাতে গোল্ডেন হিটস অফ কিশোরকুমার ভল্যুম ওয়ান। মনাদা ওকে দু'নম্বর ভল্যুমটাও গছাতে চাইছে। নিজের নীল চেক শার্টের দিকে তাকিয়ে অনিন্দ্যর বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। ঘামতে শুরু করেছিল অনিন্দ্য। ট্রেনের সময় হয়ে এসেছে, এখুনি ছুটতে হবে প্ল্যাটফর্মের দিকে।

ভাবনাগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ার আগে নিজেকে চটপট গুছিয়ে নিয়ে ছেলেটির কাঁধে হাত রাখল অনিন্দ্য;
"সুমন চাটুজ্জের গান শুনেছ খোকা? না শুনে থাকলে এই বেলা ওর সদ্য রীলিজ হওয়া 'তোমাকে চাই' ক্যাসেটটা কিনে ফেল"।

Tuesday, August 8, 2017

সারাহাহ্

"ঘুম আসছে না"?

কী কাণ্ড! ভালোই আন্দাজে ঢিল ছুঁড়েছে; রাত তিনটে অথচ ঘুমটি-নট। কী অসোয়াস্তি। নতুন বেডশিটের জন্য কী?

"জোর করে শুয়ে থেকে কী হবে? ছাত থেকে ঘুরে আসুন বরং"।
ঢিলের পর ঢিল। বেকারের হদ্দ। তবে ছাতে না গেলেও, ফ্রিজ থেকে ঠাণ্ডা জল দু'ঢোক খেলে ভালো লাগবে। আর ফ্রীজে খান দুই ক্ষীরকদম এখনও আছে বোধ হয়।

"নো স্যার, ক্ষীরকদমের বাক্স গতকাল রাতেই ফাঁক করে দিয়েছেন"।
হারামজাদা! ব্যাপারটা বাড়াবাড়ির পর্যায় চলে গেছে। তবে ফ্রীজে রাখা হলুদ বাক্সটা খালি দেখে একটু ঘাবড়ে যেতেই হল।

"ছাতে চলুন। ভালো লাগবে। এত রাত্রে খবরের কাগজ উল্টেপাল্টে দেখাটা অস্বাস্থ্যকর"।
ধুত্তোর। আনন্দবাজারটা দলা পাকিয়ে ছুঁড়ে ফেললাম। ব্যাপারটা আর সহজ ভাবে নেওয়া যাচ্ছে না।

"ছাতে। নিশ্চিন্ত বোধ করবেন। আর বেশ ফুরফুরে হাওয়া বইছে। রেডিওটা বন্ধ করুন।"।
ঘামতে শুরু করেছিলাম। নিশ্চিত ভাবেই কেউ গলা টিপে ধরতে চাইছে। মোবাইলের এফএম বন্ধ করে ছাতের সিঁড়ির দিকে গেলাম।

"পশ্চিম কোণে গিয়ে নীচের রাস্তায় চোখ রেখে দেখুন না"।
ব্যাপারটা কিছুতেই আর আমার হাতে ছিল না। অবসন্ন মনে এগিয়ে গেলাম ছাতের পশ্চিমের পাঁচিলের দিকে।

"এ'বার বিশ্বাস হল? যে আমি অন্ধকারে ঢিল ছোঁড়ার বান্দা নই"?
গা গুলিয়ে আসছিল। নীচের রাস্তায় ফুলদার বন্ধ পান দোকানের সামনের বেঞ্চিতে বসা নীল ফতুয়া আর পাজামা পরা চেহারাটা আমার রীতিমত চেনা।

সদর দরজার সামনে এসে টের পেয়েছিলাম চাবি হারিয়েছি। ডুপ্লিকেট চাবি বাড়ির ভিতরেই রয়েছে। ফুলদার পানের দোকানের সামনের বেঞ্চিতে বসে একটা সিগারেট ধরিয়েছিলাম। ভোরের আগে তালা ভাঙার ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। সময় কাটতে চাইছিল না। তারপর হঠাৎ মনে পড়লো নিজের সারাহাহ্ একাউন্টটার কথা। এত লোকের এত গোপন মেসেজ আসে, আমার কপালে কাঁচকলা। নিজেই মোবাইলে নিজের একাউন্ট খুলে মেসেজ টাইপ করতে বসলাম।

ছাতের পশ্চিম কোণের পাঁচিলের ওপার থেকে ঝুঁকে পড়া মুখটা দেখে দিব্যি আনন্দ হচ্ছিল। আমার ভীষণ চেনা নীল ফতুয়া। আহা।

"ডুপ্লিকেট চাবিটা নীচে ফেলবেন প্লীজ? শোওয়ার ঘরের দেরাজে রাখা আছে"?
কী সাহস!  দুদ্দাড় করে ছাত থেকে নেমে এসে শুয়ে পড়লাম।

কী মুশকিল। আমায় এই অবস্থায় দেখেও নীল ফতুয়া হাওয়া!

"চাবিটা দিন না ভাই"।

হাজার দেড়েক বার একই মেসেজ পেয়ে বাধ্য হয় দেরাজ খুলে চাবি বের করে সদর দরজামুখো হলাম।

১০
অদ্ভুত! তালা খোলার শব্দ হলো। দরজা খুলে গেল। অথচ বাইয়ে সেই নীল ফতুয়া নেই।  বরং একটা দমকা হাওয়া এসে আমায় দিব্যি উড়িয়ে নিয়ে গেল।
ওড়ার আগে শেষ মেসেজ নজরে পড়ল
"ঘুঘু দেখেছ, কিন্তু ফাঁদ আনসীন? টাটা"।

উপসংহার

ঘুম আসছিল না। এ'দিকে ফ্রীজে ক্ষীরকদমও নেই। বিরক্তিতে হাতের কাছের আনন্দবাজার উলটে পালটে দেখছিলাম।
আচমকা ওই উৎকট বিজ্ঞাপনটা নজরে এলো।
"ঘুঘু তান্ত্রিক, সারাহাহ্ বিদ্যায় কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার প্রক্রিয়ায় সহজে ভূত বিদায়"।

তখনই মোবাইলে দেখলাম চার নম্বর মেসেজ:

"ছাতে চলুন। ভালো লাগবে। এত রাত্রে খবরের কাগজ উল্টেপাল্টে দেখাটা অস্বাস্থ্যকর"।

Sunday, August 6, 2017

দিদি ও জনার্দন

১। 

- ভাই, অ্যাই ভাই!
- উঁ। 
- অ্যাইই ভাই। ওঠ না। 
- না। 
- আয়। আয় না। 
- না! 
- ছাতে এক ছুটে যাব, এক ছুটে ফেরত। আয় না ভাই। 
- ঘুমোব!
- রোব্বারে দুপুরে কেউ ঘুমোয়?
- মা বলেছে। তুইও ঘুমো। 
- মা তোকে হিস্ট্রি বইতে লুকিয়ে রোজ সন্ধেবেলা নন্টেফন্টে পড়তে বলে?
- দিদি। বিকেলে যাব। এখন না। 
- তাহলে দেখতে পাবি না। 
- কী?
- সে’টা গেলেই দেখতে পাবি। 
- দরকার নেই আমার দেখে। 
- স্কোয়াশের সরবত বানাবো ছাদ থেকে ঘুরে এসে। ফ্রিজের জল। তা’তে আবার বরফ। 
- ছুট্টে যাব আর ছুট্টে চলে আসব?
- চ’। 


২। 

- অনিন্দ্য। 
- ইয়েস স্যর। 
- প্রেজেন্টেশন রেডি?
- মোটামুটি। 
- মাত্র ঘণ্টা দুই বাকি, এখনও মোটামুটি?
- আসলে স্যর ডেটায় এত গ্যাপ...। 
- এক্সকিউজ অ্যান্ড এক্সকিউজ! মাই গড অনিন্দ্য। তুমি এত বড় অ্যাসাইনমেন্ট যে কী ভাবে ম্যানেজ করবে...। লুক। আই ওয়ান্ট দ্য প্রেজেন্টেশন মেইলড টু মি ইন থার্টি মিনিটস। 
- ইয়েস স্যার। 

৩। 

- ভাই, এই দ্যাখ!
- এ’টা কী? ম্যাগোহ্‌!
- ন্যাকামো করিস না। এর নাম জনার্দন। 
- জনার্দনকে পেলি কোথায়?
- কার্নিশে পড়েছিল। ওই দিকের। আম গাছটার ডাল ভেঙে পড়েছে হয় তো। 
- এ’টা কাকের বাচ্চা না?
- তোকে যদি বিট্টু না বলে মানুষের বাচ্চা বলি শুনতে ভালো লাগবে?
- দিদি, মা দেখলে কিন্তু...। 
- সদ্য ডিম ফুটে বেরিয়েছে হয়ত। জনার্দনকে এখন ছেড়ে দিলে মরে যাবে। বিড়ালে খাবে। তার চেয়ে এই চিলেকোঠার ঘরেই থাক। জুতোর বাক্সটা কাজে লেগে গেল। 
- মা জানতে পারলে...। 
- তুই বলবি?
- আমার পড়তে বসে কমিক্সের বই পড়ার ব্যাপারটা...। 
- আমি মাকে বলব না। 
- জনার্দন খাবে কী?  
- কেন্নো দিলাম, দিব্যি খেয়ে নিল। তুই বিকেলে মাঠের ওদিক থেকে বেশ কিছুটা কেন্নো ধরে আনতে পারবি? চমনবাহারের খালি ডিবে দিয়ে দেব’খন। 
- আমার ঘেন্না লাগে। 
- তুই এত ন্যাকা কেন?
- আমি আজ তিন গ্লাস অরেঞ্জ স্কোয়াশ খাবো কিন্তু। 


৪। 
দীপার চিঠি। অন্তত খান চল্লিশেক। অনিন্দ্য মাঝেমধ্যে উলটেপালটে পড়ে। একমাত্র দীপার চিঠি পড়ার সময় অনিন্দ্য সিগারেট খায়। বেশ একটা ইয়ে লাগে। দীপাকে দিদি অঙ্ক শেখাত। 

ক্লাস টুয়েলভ পর্যন্ত পাড়ায় ছিল দীপারা। 
ওঁর বাবার জামশেদপুরে ট্রান্সফার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সমস্ত গোলমাল হয়ে গেল। এখন অবশ্য ফেসবুকে মাঝেমধ্যে যোগাযোগ হয়। টুকরোটাকরা হোয়াটস্যাপে মেসেজ। তবে এই চিঠিগুলোর কথা দীপাকে মনে করালে ও হয়ত লজ্জায় মাটির সঙ্গে মিশে যাবে। 
দীপার বর ভারী অমায়িক, শুভেন্দুদা। আমেরিকা থেকে আসার সময় অনিন্দ্যর জন্য দামী স্কচ নিয়ে এসেছিল; “তুমি নাকি দীপাকে প্রথম ব্যাটম্যান পড়িয়েছিলে? তার জন্য একটা গোটা ব্রিউয়ারি তোমার প্রাপ্য”। 
কী বাজে ঠাট্টা। দীপা অবশ্য হেসে গড়িয়ে পড়েছিল। 
সেই মদ এক চুমুক খেয়ে দিদিকে ফোন করেছিল অনিন্দ্য। ঘণ্টাখানেক ধরে দিদি ফোনের ওপার থেকে সঞ্জীবের রম্যরচনা পড়েছিল। 

দিদির গায়ে দুপুরের গন্ধ। 

অনিন্দ্য মদটাকে ঠিক গ্রিপ করতে পারেনি। সেই প্রথম ও শেষ চুমুক। 

৫। 

- দিদি, খাবি না?
- তুই যা না ভাই। বলেছি তো খাব না। 
- জনার্দনের বাঁচার কোনও চান্স ছিল না। বাবা বলল তো। 
- ও আমার জন্য মরেছে। কেন যে ওকে কার্নিশ থেকে তুলে আনতে গেলাম। ওখানে থাকলে হয়ত ওর মা ওকে দেখতে পেত, তুলে নিয়ে যেত। ধুস। 
- দিদি। আচ্ছা, তুই না হয় খাস না। কিন্তু কাঁদিস না। প্লীজ। 
- ভাই, তুই প্লীজ যা না। 
- কাল আমার অঙ্ক পরীক্ষা। 
- ফের ভয় পাচ্ছিস?
- তোকে কাঁদতে দেখে আরও নার্ভাস লাগছে। 
- ভালো ভাবে প্র্যাক্টিস করিয়েছি তো তোকে এ’বার। তুই এত হাবা কেন?
- ফেল করলে বাবা খুব...। 
- অনেক প্র্যাক্টিস করেছিস। এরপর ফেল করলে তোর কিছু করার নেই। 
- তবু। বাবা আমায় নিয়ে খুব চিন্তা করে। মাও করে হয়ত। এত খারাপ নম্বর পাই...। 
- ভাই। 
- কী?
- ভয় করছে? শিব্রাম পড়বি? ভয় দুম করে কেটে যাবে। 
- আমার কমিক্স ছাড়া কিছু পড়তে ইচ্ছে করে না।
- আমি পড়ি? তুই শুনে যা, কেমন?
- ভয়ে কমে যাবে?
- তুই অঙ্ক পরীক্ষার কান মুলে দিতে পারবি। দাঁড়া, শিব্রামটা নিয়ে আসি। 

৬। 

দিদির গায়ে দুপুরের গন্ধ। দিদির যে কোনও গল্পে পুজো ছুটির প্ল্যানের চনমন। দিদি মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে মনে হয় সামনেই গরমের ছুটি। বাবার দু’কাঁধে দুই ভাই বোনে থুতনি রেখে জব্বর ঘোরার প্ল্যান। ট্রেনের আপার বার্থটা কে নেবে, টিফিন কেরিয়ারে লুচির সঙ্গে আলুর দম না ছক্কা, কতগুলো গল্পের বই ব্যাগে নিলে ওজন বাড়াবাড়ি হবে না; এমন কত কী। 

দিদি অঙ্কে একই ভুল বার বার করলে রেগে যেত। কাউকে কটু কথা বললে দুঃখ পেত। বেড়াল কুকুরকে অবজ্ঞা করলে ওর মুখ কালো হয়ে যেত। ভয় পেলে দিদি জড়িয়ে ধরত। দিদি গল্পের বই পড়লে মনে হত হাওয়ায় একটা মাদুরে ভাসতে ভাসতে সিনেমা দেখা চলছে। 

মায়ের বায়পসি রিপোর্ট পেয়ে দিদিকে ফোন করেছিল অনিন্দ্য।
টেলিফোনের ও’পার থেকে অনিন্দ্যর হ্যালো শুনেই আঁচ করেছিল দিদি। 
- এ’বার মাকে বলে দিই তুই হিস্ট্রি বইয়ের মধ্যে নন্টে ফন্টের বই লুকিয়ে পড়ায় ফাঁকি দিতিস?
- হুঁ।
- ভাই...। 
- উঁ?
- জনার্দনকে মনে পড়ে? 
- হুঁ। 
- কষ্ট হচ্ছে?
- হুঁ। তোর?
- খুব। 
- তোর বেশি কষ্ট রে দিদি। 
- কেন? তোর কম?
- কমই তো। 
- কেন?
- আমার তবু তুই রইলি। 
- ভাই, তোর মনে আছে জনার্দন মারা যাওয়ার পর মায়ের কান্না? 
- হুঁ। 

***
মা টের পেলেন অনিন্দ্য দিদিকে ফোনে সঞ্জীব পড়ে শোনাচ্ছে। আহা রে, এখনও কমিক্স পড়া ছেলেটাকে কী সব রিপোর্ট আনতে হাসপাতালে ছুটতে হয়। 
মা রিপোর্ট আঁচ করতে পারেন।

ভাই বোন একে অপরের বন্ধু হতে পেরেছে, তাই চিন্তা কম। অনিন্দ্যর জন্য কড়া মিষ্টি দিয়ে এক গেলাস অরেঞ্জ স্কোয়াশ না বানালেই নয়; ছেলেটা এক হাজারটা অঙ্ক পরীক্ষার ভয় এক সঙ্গে পেয়ে বসেছে।     

Saturday, August 5, 2017

শারদীয়া খবর ও গল্প

-খবর-

সুখবর।

আইআরসিটিসিতে টিকিট নেই।
মেকমাইট্রিপে খোঁজ নেওয়ার দম নেই।

সোশ্যাল প্রেশারে নার্ভফেল করে পুজোর ছুটিতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে বাইরে যেতে হচ্ছে না।

-গল্প-

খরগোশ আর কচ্ছপ দৌড়বে।

প্রতিযোগিতা বলে কথা।

টান টান উত্তেজনা। উত্তেজনা ঠিক নয়। উল্লাস।
"খরগোশ জিতছেই" বলে কাগজে হেডলাইন। গাজর মার্কা তুবড়ি আর রংমশালে বাজার ছয়লাপ।

এমন সময় জানা গেল খরগোশের নাম "পুজো আসছে"।
আর কচ্ছপের নাম? "মানিব্যাগ খালি হচ্ছে"।

সেই যে খরগোশ গেল ভেবড়ে, তারপর কিছুতেই কিছু হল না। ফিনিশিং লাইন যখন খরগোশ পেরোলে তখন ওদিকে কচ্ছপ বাবাজী চিৎ হয়ে শুয়ে কীর্তন গাইছেন।

Wednesday, August 2, 2017

স্যাম্পেল টেস্টিং

- হজৌর!
- আরে এজেন্ট যে! এতক্ষণে আসার সময় হল তোমার? আর আধ ঘণ্টা দেরী হলে তোমায় নিকেশ করার হুকুম জারি করতাম।
- হজৌরের হুকুমনামায় মউত। সে তো খুশনসিবি।
- থামো থামো, ক্রমশ অয়েল মিল হয়ে উঠছ। পৃথিবীতে তোমার পরিচয় গোপন আছে তো? বাঙালিরা চিনে ফেলেনি তো তোমায়?
- জী বিলকুল গোপন।
- আর কাজের কাজ হল কিছু? স্যাম্পেল?
- আজ্ঞে হজৌর, স্যাম্পেল প্লান্ট করে দেওয়া হয়েছে।
- গুল নয় তো?
- তৌবা হজৌর তৌবা। হজৌরকে গুল দিলে আমার জিভে যেন সয়াবিনের কোপ্তা পড়ে।
- সয়াবিন? সে'টা কী?
- পৃথিবীর এক প্রত্যন্ত প্রদেশের খাদ্য। বহুত দর্দনাক হজৌর। তা সেই প্রদেশেই আমরা স্যাম্পেল প্লান্ট করে এসেছি।
- দেখো বাবা এজেন্ট! বিষ এক্সপোর্ট করতে গিয়ে ইম্পোর্ট করে ফেলো না। শেষে আমরা সবাই মিলে নিকেশ হই।
- আজ্ঞে হজৌর, দেড় ঘণ্টা কুলকুচি করেছি। জিভ এখন বিলকুল সাফ।
- তা স্যাম্পেল কোথায় পুঁতে এলে?
- বাংলায়। শুরুটা সে'খান থেকে করাই সুবিধে। আলাভোলা মানুষজন। একটা অদ্ভুত মন্ত্রপাঠ করে চলেছে সারাক্ষণ!
- মন্ত্র? কী মন্ত্র?
-ওই...কালচারকালচারকালচারকালচারকালচার...।
- বাপ রে! ওই মন্ত্রে হয় কী?
- কিচ্ছু না। ও'টা কিছু না হওয়ার মন্ত্র।
- কিছু না হওয়ার মন্ত্র?
- জী হজৌর। ওই প্রদেশের সক্কলে ত্রস্ত হয়ে আছে। যদি কিছু হয়ে যায়? যদি কেউ নড়চড় করে? যদি হাওয়া দেয়? তাই সবাই মন্ত্র পড়ে যায়, যাতে কিছু না হয়।
- ওই কালচারকালচারকালচারকালচারকালচার?
- জী হজৌর। ও মন্ত্র অব্যর্থ।
- গোলমেলে ব্যাপার তো হে এজেন্ট।
- কিন্তু স্যাম্পেল টেস্ট করার জন্য সেরা স্যাম্পেল পপুলেশন যে ওই প্রদেশেই হজৌর।
- তা স্যাম্পেল কাজ কেমন করছে?
- দুরন্ত হজৌর। দুর্দান্ত। সবাই মগ্ন। সবাই হারিয়ে যাচ্ছে। সব কিছু গুলিয়ে যাচ্ছে। সবাই নিজের ব্রেনে সেম সাইড গোল ঝেড়ে যাচ্ছে। পরীক্ষা সফল। আমাদের রাস্তা সাফ। এই ভাবে গোটা পৃথিবীকে বিকল করে দেওয়া যাবে সহজেই।
- তারপর গোটা পৃথিবী আমাদের! এই ব্যাজার মার্কা গ্রহে আর পড়ে থাকতে হবে না।
- জী হজৌর। শুধু ওই সয়াবিনের বড়ি এড়িয়ে চলতে হবে।
- তা, এই বাংলা প্রদেশের স্যাম্পেল টেস্টিং প্রজেক্টের কী নাম দেওয়া হয়েছে?
- আজ্ঞে হজৌর; টেস্টনি।