Friday, July 14, 2017

এ পাশে

ভাবনার এ পাশে দাঁড়িয়েছিলেন অনন্ত।

স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলেন অন্যপাশে জুটের কারখানার ধোঁয়া। অনর্গল, এই রাতেও।

ভাবনার বুক ছুঁয়ে মিঠে হাওয়াটুকু অবশ্য আসে, ভালো লাগে অনন্তর। ঘাটের বেঞ্চিটায় গা এলিয়ে বসে সে। রাতের এ সময়টা সামান্য শীত বোধ হয়।

দূরে ভাবনার বুকে একটা নৌকা স্থির হয়ে আছে, তার বুকে হ্যারিকেনের বিন্দুটা মায়াবী দানার মত জ্বলজ্বল।করে চলেছে। ভাবনার নিঃশব্দ অথচ স্পষ্ট বয়ে চলায় গান খুঁজে পায় অনন্ত;

আবছায়া ভালো লাগার গান।
ক্রমশ আকাশ একটু নীচে নেমে আসে। ক্রমশ আদুরর সমস্ত কিছু। বুক পকেট থেকে বিড়ির প্যাকেট বের করে অনন্ত।

আচমকা ঘোর কেটে যায় বেমানান স্টীমারের হুইসেলে।

- ঘুমোসনি, না?
- হেহ্।
- জানতুম।

Monday, July 10, 2017

যাইয়ো না

দিদা মাঝে মধ্যে গাইত;

"বাপ রে নিমাই আমার
যাইয়ো না যাইয়ো না
বৈরাগী না হইয়ো নিমাই
বিবাগী না হইয়ো..."।

পরের কথাগুলো দিব্যি ভুলে গেছি। শুরুটা মোটামুটি এ'রকমই ছিল। বড় আর্তি ছিল সেই সুরে। সামান্য ছমছম। শুনলেই মনে হত নিমাই অত একগুঁয়ে না হলেই ভালো হত; অত করে কেউ বলছে যখন, থেকে গেলেই হয়। দু'চার দিন পর না হয় সময় সুযোগ বুঝে আবার বিবাগী হওয়ার ইচ্ছেটা নিয়ে আলোচনা করা যাবে। তদ্দিন একটু কাজকর্ম বাজারঘাট করে কাটালে কী এমন ক্ষতি! আহা রে। গানের শুরুতে "বাপরে"টা এমন ককিয়ে বলত দিদা যেন প'য়ের নীচে বাহাত্তর খানা হসন্ত বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওই ডাক অগ্রাহ্য করে ছাতে যাওয়াটাও অন্যায়।

সন্ধ্যে দিয়ে আসার পর বারান্দায় একটা বেতের চেয়ারে দিদা বসে গুনগুন করে যেত। আমি মেঝেতে বসে; দাদুর দেওয়া কোনও গল্পের বই সামনে মেলা, পাশে দুধমুড়ির বাটি। মধুমামা দুধ দিতে আসত রোজ দুপুরে, একটা সুবিশাল অ্যালুমিনিয়ামের বাটিতে স্টিলের ছোট কাপে মেপে মেপে দশ কাপ দুধ। মধুমামার থেকে দুধ নিতে যে কী ভালো লাগত। সেই দুধের মোটা হলদে সর দু'চামচ জুটতো বিকেলে, শুধু শুধু। আর সরের বাকিটুকু মিশে থাকতে বিকেলের দুধমুড়িতে।

দিদার গুনগুনের সঙ্গে মিশে যেত রাস্তা থেকে ভেসে আসা সাইকেল বেলের টুংটাং,  আইসক্রিমওলার "এইস্কিরিম" হাঁক বা রিক্সাওলার প্যাডেলের মচরমচর।
দিদার গায়ে লেপ্টে পরা ছাপার শাড়ির মত নরম ছিল সে সব মফস্বলি সন্ধে। দিদার গায়ের সুবাস লেগে আছে সে'সব স্মৃতিতে।

পুজোবার্ষিকীর ওপর হুমড়ে পড়ার ভালোবাসাটুকু দিদা নিয়ে চলে গেছে।

Sunday, July 9, 2017

বালিশবাবুর অফিসে - ৪

- কী ব্যাপার বালিশেন্দ্রবাবু? এদ্দিন পর এ শর্মাকে হঠাৎ অফিসে ডাকার প্রয়োজন পড়ল কেন?

- বসুন।

- সময় কম। কিছুক্ষণের মধ্যেই অ্যালার্ম বাজবে, আমায় বেরোতে হবে।

- ব্যাপারটা সিরিয়াস।

- আপনার বয়স এক বছর। আপনার সিরিয়াসনেসের ম্যাক্সিমাম লেভেল হচ্ছে মেঝে না চেটে হামাগুড়ি দেওয়া। আমি, অন দ্যা আদারহ্যান্ড, একটা সংসার বয়ে বেড়াচ্ছি। সামনে পুজোর কেনাকাটি। কতটা প্রেশারে আছি জানেন?

- এই আপনি। আপনার প্রেশার বলতে মনে পড়ে পুজোর বাজার। গ্লোবাল ওয়ার্মিং নয়, ইকনমির ঝাড় খাওয়া নয়, পরমাণু বোমার স্টকপাইলিং নয়, আপনার চিন্তা আপনাকে পুজোর বাজার ম্যানেজ করতে হবে। পিতা কতটা অদূরদর্শী হলে পুজোর চাপ নিয়ে হন্যে হতে পারেন কিন্তু নিজের ছেলের জন্য একটা থার্ডক্লাস গ্রহ রেখে যেতে কোনও হেসিটেশন নেই।

- থামুন, কে বলেছে আমি সচেতন নই? পরিবেশ রক্ষা নিয়ে আমি ক্লাস নাইনে এস্যে লিখেছিলাম।

- কিন্তু ধেড়ে বয়সে এসে গুলিয়ে ফেলেছেন।

- কে বলেছে গুলিয়ে ফেলেছি?

- দেখুন, মাইরি বলছি।  মুখ খোলাবেন না।

- এ অফিসের বাইরে মুখ খুললে তো আবোলতাবোল ছাড়া কিছু বেরোয় না। যা বলার বলে ফেলুন।

- প্লাস্টিক ছড়ানোই ধরুন না। যে'ভাবে আপনি চারদিকে প্লাস্টিক ছড়িয়ে যাচ্ছেন তা'তে আর যাই হোক পরিবেশ নিয়ে জ্ঞান ঝাড়া আপনাকে মানায় না। বিশেষত এরপর যখন সরকার কোরাপ্ট বিরোধী নুইসেন্স বলে গালভরা গপ্প ঝাড়েন তখন আমার দুঃখ হয় এই ভেবে যে বাবার রেজিস্ট্রশন লাইফলং ভ্যালিড।

- আমি দায়িত্বজ্ঞানহীন হয়ে প্লাস্টিক ছড়িয়েছি? যত বড় মুখ নয় তত বড় কথা? একটা এগজ্যাম্পেল শুনলে নিজের নাম পালটে দেব।

- বেশ, গত শনিবার গড়িয়াহাট বাজারের সামনে চা খেয়ে প্লাস্টিকের কাপটা দিব্যি বেওয়ারিশ  ছড়িয়ে দিলেন। অথচ দু'পা এগোলেই ডাস্টবিন ছিল। তারপর গত সপ্তাহে হাওড়া স্টেশনে...।

- আমার তাড়া আছে। কী কাজ তাড়াতাড়ি বলুন।

- বেশ। তা যে কথা বলার জন্য আপনাকে ডাকা, বুঝলেন কুবলাইবাবু...।

- কুবলাইবাবু? কুবলাই কে?

- ওহ। নাম পালটে দেওয়ার কথাটা তাহলে সিরিয়াসলি বলেন নি।

- আমি আসি।

- আরে বসুন বসুন। মাইল্ড ঠাট্টা করছিলাম। উ সারকাজমে বিষ নাই।

- সারকাজম? মাইরি? তেরো মাস বয়সে।

- লেটস জাস্ট সে, আমার বাপের ভাগ্যি যে আমি সারকাজম বোধটা বাপের থেকে পাইনি। সে যাক গে, যা বলার জন্য ডাকা...।

- হ্যাঁ, বলে ফেলুন।

- বলছিলাম যে, ইয়ে, আপনারা কি উন্মাদ?

- আমরা?

- আপনি। আপনার মিসেস...। বুড়ো বুড়িগুলো।

- মা বলুন। আপনার মিসেস আবার কী। আর বুড়োবুড়ি? দাদান, দিম্মা...।

- ওই হলো। আপনার ডেটায় বড় অস্বস্তি কুবলাইবাবু। যাক গে। উত্তর দিন।

- আমরা উন্মাদ কেন হতে যাব? আপনি উন্মাদ। আপনার চোদ্দ গুষ্টি উন্মাদ।

- সে সন্দেহ আমারও হচ্ছে।

- এ প্রশ্নে করার মানে?

- আমার খেলনাগুলো নিয়ে আপনারা এমন পাগলামি করেন কেন?

- কী পাগলামি করা হয়েছে?

- নিত্যনতুন খেলনা আসছে, হরেক রকম সাইজের। হরেক রকম আকারের। কী আনন্দ হয়। কিন্তু সেগুলো আসার কিছুক্ষণের মধ্যেই খেলনাগুলো ফেলে দেওয়ার কোনও মানে হয়?

- খেলনা ফেলে দেওয়া হয়?

- আনার সঙ্গে সঙ্গেই। অমন দুরন্ত সব কাগজের আর কার্ডবোর্ড বাক্সের খেলনাগুলো ফেলে দিয়ে খেলনাগুলোর ভিতরে রাখা বিপজ্জনক সব প্লাস্টিক টিন লোহালক্কড়ের জঞ্জালগুলো যত্ন করে সাজিয়ে রাখা হয়। সে বিশ্রী জঞ্জালগুলো আবার থেকে থেকে নড়েচড়ে ওঠে, ভয়ানক সব আওয়াজ করে। এ'রকম বদ্ধ পাগলামোর জন্য আপনাদের শোকজ করছি। আপনাদের উত্তর ট্রিপ্লিকেটে আমার অফিসে জমা দেবেন আগামী সাত দিনের মধ্যে আর আর সে উত্তরে সন্তুষ্ট না হলে  আমি কড়া পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হব!

( সে যাত্রা অ্যালার্মের আচমকা ঝনঝনানিতে রক্ষা পেয়েছিলেন শ্রী শ্রী কুবলাই মুখোপাধ্যায়)

Saturday, July 8, 2017

পুজো প্রস্তুতি আপডেট

পুজোবার্ষিকী আনন্দমেলার সবচেয়ে বড় অবদান; পুজোর বাজারকে টেনে হিঁচড়ে এগিয়ে আনা। লোকে নার্ভ ধরে রাখতে পারে না;
কাগজওলা পুজাবার্ষিকী দিচ্ছে, দর্জি প্যান্টের মাপ নেবে তো?
শাড়ির স্টক সাফ হয়ে যাবে না তো?

এই জুলাই মাসেই শনিবারের নিউমার্কেট বা গড়িয়াহাটের অক্সিজেন লেভেল কমে গেছে। পার্কিংয়ে ডাবল টাকা নেওয়া শুরু। রোলে পেঁয়াজ কমেছে। আগে অগস্ট সেপ্টেম্বরে এ'সব জায়গায় এসে স্রেফ পা মাড়ানো আর ঘামের গন্ধ হজম করতে হত, এখন জুলাই থেকে হাউমাউ শুরু হওয়ায় তার সঙ্গে জুড়েছে কাদার ছপছপ।

অবশ্য কাদাজলে বাঙালির বিশেষ আপত্তি নেই। দেড় ঘণ্টার বৃষ্টিতে কলেজ স্ট্রিট ডুবে গেল; উপচানো ড্রেন আর বৃষ্টির জল মিলে গোটা কলেজ স্ট্রীটই কলেজস্কোয়্যার। কিন্তু সে'টাই নাকি ক্যালক্যাটার রোম্যান্স, কবিতা-ইনভোকিংও বটে। আমরা মোবাইল ক্যামেরা বের করে রোম্যান্টিক-ফিল্টার লাগিয়ে নোংরা জলে আধ ডোবা মানুষের ছবি তুলে নস্টালজিয়াকে ছোট নস্ট্যাল বলে পোয়েটিক ফুর্তি করি।

উই আর অসাম।

Friday, July 7, 2017

ছাত ও দেরাজ

হাওয়াই চটি জোড়া পায়ে না গলিয়েই ছাতে উঠে এলেন মনোহরবাবু।

রাতবিরেতে ফটাসফট শব্দ মোটে কাজের কথা নয়।
উত্তর কোণে রাখা বেলফুলের টবের কাছে এসে মুখ গুঁজে দাঁড়িয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। সন্ধ্যেবেলা জোর বৃষ্টি হয়েছে, বাতাসে এখনও অল্প ভেজা ভাব, ফতুয়ার খোলা বোতাম বেয়ে বুকে টুপটাপ শীতের আভাস ঝরে পড়ছে।

মিনিট দশেক পর সে এলো। সপাটে। যেমন ভাবে মনোহরবাবু চাইছিলেন। বুক ভরিয়ে। মন হাল্কা করে। হাউহাউ করে। "মা মাগো, আর ভাল্লাগে না"র চাপা গোঙানিতে দিব্যি খানিকক্ষণ ভেসে রইলেন।

হাউহাউয়ের হুড়মুড় কেটে যেতেই ফতুয়ার খুঁট টেনে মুখ মুছে নেমে এলেন শোওয়ার ঘরে। গিন্নীর ভোঁসভোঁসানি থেমে গেছিল, ঘুম ভেঙেছে।

- ফের তুমি উঠেছিলে?
- ওই, দেরাজটা খুলে দেখে এলাম।
- বিশ্রী বাতিকটা কি আর যাবে না?
- কী করব গিন্নী, অতগুলো কাঁচা টাকা! বারবার গিয়ে নজরদারি না করলে শান্তি পাই না। কোনদিন যে ট্যাক্সের রেড পড়বে...শেষে এ বয়সে আবার...।
- ঘুষের টাকার গরমে ঘুম যদি না আসে তাহলে ঘুষ নাও কেন? রেড পড়লে আমি বাঁচি। রাতে অন্তর ঘুমোতে পারব। যত্তসব!

ও'দিকে দেরাজের অন্ধকারে গীতাদেবীর প্রাণ হুহু করে ওঠে। "বাছা আমার ঘুষ নেয় বলে কি মানুষ না যে বৌটা অমন বিশ্রীভাবে চোপা করবে? বাছা আমার নরম মনের মানুষ; ছাত ভালোবাসে, বেলফুলের সুবাস ভালোবাসে। অল্প ঘুষ নেয় আর ডেডবডি যক্ষের কাজ করে বলে মাকে পোড়ায়নি। তাই বলে ওই দু'চোক্ষের বিষ বৌটা ওকে চোপা করবে"?