Thursday, June 29, 2017

মোম

*১*
টুথপিককে ছুরির মত ব্যবহার করে একটা আস্ত মোমবাতি খুন করল দিবাকর। হাতের পত্রিকাটা ছুঁড়ে ফেলল আলনার ও'দিকে। অফিসের ফেলে রাখা কাজগুলোর কথা মনে করে মনকে অন্য রাস্তায় ঘুরিয়ে দেওয়ার প্রবল চেষ্টা করেও লাভ হল না। অজন্তার সস্তা ইলেক্ট্রনিক দেওয়াল ঘড়ির খটখটখটখট শব্দ যেন দিবাকরের মাথা খামচে ধরছিল।

রাত একটা বেজে দশ।

ঘরের মধ্যে দ্রুত কুড়ি রাউন্ড পায়চারি সেরে নিল সে। ধুস। কিস্যুতে কিস্যু হওয়ার নয়। মিনুর কথাগুলো কিছুতেই মাথা থেকে বেরোচ্ছে না। অবিশ্বাসের পাত্র দিবাকর নয়, কিছুতেই নয়। শুধু মিনু যদি একবার বোঝার চেষ্টা করত। একবার।

*২*

ব্যাপারটা ক্রমশ অস্বস্তিকর হয়ে উঠছে। যেদিনই দিবাকরের কথা মনে পড়বে সে'দিনই তার প্রিয় মোমবাতিটার গায়ে নতুন নতুন খোঁচা দেখতে পাবে মিনু। নাকি উল্টোটা? গোটারাত ঘুম আসবে না। ছটফট।

ভুলতে চেয়েও সব গুলিয়ে যায় এই সব রাতগুলোয়। মিনুর বড় প্রিয় এই মোমবাতিটা। অসমের ডিগবই থেকে মেজমামা পাঠিয়েছিলেন দেড় বছর আগে। সে'খানকার বিশেষ রাইনো ব্র‍্যান্ডের ওয়্যাক্স থেকে তৈরি, সুগন্ধি সুবিশাল মোমবাতি। নিজের শোওয়ার ঘরে সাজিয়ে রেখেছে মিনু। শুধু মোমিবাতিটার গায়ে কী'ভাবে যেন কেউ ক্রমাগত খুঁচিয়ে যায়।

*০*

ঘুম আসছিল না, বাধ্য হয়েই পুরনো পত্রিকার পাতা ওল্টাচ্ছিল দিবাকর।  তখনই লোডশেডিং। এই অসময়ে। দিবাকরের মেজাজ গেল রীতিমত বিগড়ে। অথচ হাতের কাছে একটা মোমবাতিও নেই যে জ্বালবে।

রাগের চোট ছোটমামার দেওয়া টুথপিকের বাক্স থেকে একটা টুথপিক বের করে দাঁতনের মত চেবাতে লাগল দিবাকর।

*-২*

- এই যে দত্ত, তোমার ভাগনেকে সামলাও বলে দিলাম।
- দিবাকর? সে আবার কী দোষ করল?
- সে আমার ভাগ্নি মিনুর মাথাটা খাচ্ছে।
- রিল্যাক্স চ্যাটার্জি। ওরা একে অপরকে ভালোবাসে।
- রাবিশ। ওই ক্লার্কের সঙ্গে আমার ভাগ্নির আমি বিয়ে দেব ভেবেছ?
- যব মিয়াঁ বিবি রাজী তব...।
- কাজী কী করবে দেখতে চাও? পেরুতে গিয়ে ডার্ক ম্যাজিক শিখে এসেছি আমি দত্ত। তুমি ও ছেলেকে নিরস্ত করলে ভালো, নয়তো আমার ব্যবস্থা করা আছে। আমি মিনুকে এমন তুকতাক করা উপহার দিয়ে এসেছি যে সে নিজে থেকেই ওই ইডিয়টের থেকে সরে আসবে।
- ভুলে যেওনা চ্যাটার্জি আমার জ্যেঠু ছিলেন তান্ত্রিক। ও'সবের টোটকা আমারও জানা আছে। ওদের মিল হবেই।
- রাবিশ।

*-১*

দিবাকর এখনও ঠাহর করতে পারে না যে ছোটমামা তাকে গত জন্মদিনে ছয় ডিবে হোমমেড টুথপিক কেন উপহার দিয়েছিল। মামা মাত্রই বোধ হয় সামান্য ছিঁটগ্রস্ত হয়।

Wednesday, June 28, 2017

ধোঁয়া

- শুনুন, এই যে ভাই, আপনাকে বলছি।

- কী ব্যাপার?

- সিগারেটটা নিভিয়ে ফেলে দিন প্লীজ। আপনার বন্ধুদেরও বলুন তাই করতে।

- আপনি কে?

- নীল আর্মস্ট্রং না হলে সিগারেট নেভানো যাবে না ভাইটি?

- অত বাতিক থাকলে বাড়ির বাইরে বেরোন কেন?

- আপনারা যে কারণে বেরিয়ে এসেছেন। এই প্রতিবাদ সমাবেশে সামিল হতে। এ'বারে সিগারেটটা ফেলুন প্লীজ। প্লীজ।

- রাষ্ট্রের তুঘলকিপনার বিরুদ্ধে প্রটেস্ট চলছে, আমরা সবাই জান লড়িয়ে দিচ্ছি। আর এই আপনি পড়েছেন সিগারেট খাওয়া নিয়ে? সত্যজিৎ রায় পাইপ মুখে দাঁড়ালে তো গলে পড়তেন। ইস্যুতে ফোকাস রাখুন।

- এতগুলো লোক ভাই। আমার মত বুড়োহাবড়াও কম নেই। অনিচ্ছুক লোকেদের ধোঁয়া গিলিয়ে কী লাভ বলুন!

- কে বলুন তো আপনি? সরকারের এজেন্ট নাকি যে কাঠি করছেন?

- ক্যান্সার অ্যাজমা গছানোর ফন্দিকে কাউন্টার করা মানে কাঠি করা?

- দেখে তো মনে হচ্ছে বাংলা সিরিয়াল দেখা মাল। কফি হাউসে গিয়ে কোবরেজি খাওয়া ছাড়া কোনওদিন কিছু করেছেন? লিটল ম্যাগ উলটে পালটে দেখেছেন এ জীবনে? বার্গম্যানের নাম শুনেছেন? গ্রুপ থিয়েটার সম্বন্ধে কতটা ওয়াকিবহাল আপনি? নিকারাগুয়ায় কী ঘটেছিল সে সম্বন্ধে খবর রেখেছেন বাপের জন্মে? ইনি আবার এলেন ক্যান্সার অ্যাজমা দেখাতে। কেটে পড়ুন দেখি। প্রতিবাদের সময় যত্তসব ঢ্যামনামো।

- প্রহিবিশন অফ স্মোকিং ইন পাবলিক প্লেসেস রুলস ২০০৮, শোনা আছে ভাই? জানা আছে?

- ধ্যার্বাল। মটকা গরম হয়ে যাচ্ছে মাইরি কাকা। এ বয়সে আপনি খামোখা ক্যালানি খেলে কাকিমার টেনশন বাড়বে।

- ধুস। এই বাজে তর্কে সব গেল গুলিয়ে, প্রতিবাদ সমাবেশের থীমটাই মাথা থেকে ফসকে গেল।

- এ'সব প্রতিবাদটতিবাদ আপনাদের মত ডোমেস্টিক পেটদের কাপ অফ টী নয় কাকু। কেন স্টাইল মারতে এসে পড়েন? বুদ্ধিতে ধোঁয়া দিন। ফালতু আইনটাইন দেখাতে আসবেন না। আর এ'বার ওই ব্যানারগুলো পড়ুন, ঝালিয়ে নিন আমাদের প্রটেস্টের সাব্জেক্ট। অসহায় মানুষ অত্যাচারিত হচ্ছে অথচ সরকার স্পীকটি নট হয়ে বসে। প্রটেস্ট তার এগেন্সটে।

- আই সী। তাহলে এই প্রতিবাদ সভা হচ্ছে খামোখা ক্যালানির বিরুদ্ধে তাই তো? বেশ বেশ। তবে এখানে থাকলে যা বুঝতে পারছি আমায় খামোখা ক্যালানি আর ক্যান্সারের মধ্যে একটা কিছু বেছে নিতেই হবে। বেশ, আমি আসি। তোমরা বিড়ি খাও। কেমন?

- না মানে আমি সে'ভাবে ঠিক...।

- না না। আমি চলি। তোমাদের বার্গম্যানি ফুসফুসই পারবে ভাই। আমার সিরিয়ালের টাইম হয়ে এসছে। আসি।

Sunday, June 25, 2017

সার্ভে

- কী চাই?

- দু'মিনিট সময় হবে স্যার?

- কলিংবেল ঠুসে আমার রবিবারের প্রি-স্নান ঘুম ভাঙিয়েছেন। আপনাকে দু'মিনিট সময় দেওয়া সমীচীন হবে কিনা ভাবছি।

- দু'মিনিট। স্রেফ দু'মিনিটে আপনার থেকে চেয়ে নেব।

- আপনি কি সেলসম্যান? ওয়াশিং পাউডার বিক্রি করতে এসেছেন? বা ম্যাজিক ক্লীনার? ননস্টিক কড়াই? লটারি?

- না না! সে'সব কিছুই না। একটা সার্ভের জন্য এসেছি।

- সার্ভে? কী ব্যাপারে?

- আমি সুমিত ঘোষ। লাইফ বিয়ন্ড ডেথ ফাউন্ডেশন থেকে এসেছি।

- লাইফ বিয়ন্ড ডেথ! মড়াদের সার্ভে?

- না না। ঠিক তা নয়। মরে যাওয়ার তো বহুবিধ টাইপ রয়েছে স্যার। বায়োলজিক্যাল ডেথ ইজ ওনলি ওয়ান অফ দ্য দেম। আমাদের ফাউন্ডেশন রকমারি মৃত্যু নিয়ে রিসার্চ করে যাচ্ছে। আমি নিজেও গবেষণারত।

- ও। জলের মত সহজ।

- সার্ভে শুরু করি?

- একটা প্রশ্ন। কত রকমের মৃত্যুর লেভেল রয়েছে ঘোষবাবু?

- আড়াই হাজারেরও বেশি।

- বলেন কী?

- প্রমাণিত সত্য। অন্তত দেড়শো রিসার্চ পেপার ইতিমধ্যে প্রকাশিত। এই তো, গত সপ্তাহে গুটেনবার্গে প্রকাশিত জিমারম্যানের পেপার রীতিমত প্রমাণ কতে ছেড়েছে যে দুনিয়ার আশি শতাংশ মানুষই অন্তত বাইশ বার মারা গিয়েছে ইতিমধ্যে।

- কাগজে তো কিছু...।

- মেনস্ট্রিম মিডিয়ার পেটে ঘি সইবে কেন বলুন?

- আপনি বলছেন আমরা সবাই অল্পবিস্তর মারা গেছি?

- মরার আবার অল্প বেশি কী? সবাই পুরোপুরি মারা গেছি বেশ কয়েকবার। এমন মানুষও আছেন যারা একশো বার মরেও দিব্যি মেজাজে ঘুরঘুর করে বেড়াচ্ছেন

- রবিবারের ঘুম ভাঙিয়ে গুল দিচ্ছেন দাদা?

- আই সী। স্কেপ্টিসিজম। অবিশ্বাস।

- তা'তে কী?

- মৃত্যুর কালো ছায়া।

- এ'তে মৃত্যু কোথায়?

- আপনি বিশ্বাসের দিক থেকে খুন হয়েছেন। বহু আগেই। লেট মি সী। বাপ মার প্রতি বিশ্বাস আছে?

- আলবাত।

- শিওর?

- শুধু...।

- শুধু?

- ছেলেবেলায় মা বলত গোবরার সঙ্গে না মিশতে। ক্লাস এইটে ফেল তিন বার ফেল করেছিল। নাইন থেকে গুটখা চিবুতো। আমিও সাধ্যমত এড়িয়ে চলতাম গোবরাকে। আমি মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিকে ভালো রেজাল্ট করলাম। ফেলের ফুলঝুরি ছুটিয়ে গোবরা পড়াশোনা ছেড়ে ক্যাটারিংয়ের দলে সার্ভিসবয় হিসেবে ঢুকে গেল। আজ তার নিজের ক্যাটারিংয়ের ব্যবসা। কোটিপতি। আমি রেলের ক্লার্ক। গত মাসে মায়ের অপারেশনের জন্য গোবরাই আমায় দেড় লাখ টাকা ধার দিয়েছে। নো ইন্টারেস্ট।

- ওহ হো। কচুকাটা। কুপিয়ে হত্যা।

- চা খাবেন?

- না। সময় কম। চট করে প্রশ্নগুলো সেরে নিই। নেমপ্লেটে দেখলাম নামটা বিমল সান্যাল। আপনিই বিমলবাবু তো?

- আজ্ঞে।

- বিমল সান্যাল, রেলের ক্লার্ক। বেশ। বাড়িতে কে কে আছেন?

- বিধবা মা। আর আমি।

- বয়স অন্তত চল্লিশ তো হবেই। বিয়েথা?

- আসলে ঠিক...।

- ওরেব্বাবা। নিজের মধ্যে তো আস্ত শ্মশান পুষে রেখেছেন মশাই।

- কেন? কেন? বিয়ে না করাটা অপরাধ নাকি? সে'টাও মৃত্যু?

- নট অ্যাট অল। তবে বিয়ে না করার জন্য অমন অ্যাপোলোজেটিক হওয়াটা বেশ গভীর মৃত্যুর সিম্পটম। আপনার কনফিডেন্স তো মশাই ডাইনোসরের ফসিলের চেয়েও বেশি ধসে গেছে। যাক গে, টিভি দেখেন?

- ওই। খবরের চ্যানেল,  দিনে ঘণ্টাখানেকের বেশি নয়।

- মাই মাই মাই! আপনি তো দেখছি নিজের ভিতর কবর খুঁড়ে শুয়ে আছেন। নিউজ চ্যানেল? গ্যাস চেম্বারে বসে সোয়াবিনের কীমার খিচুড়ি খাওয়াও যে তার চেয়ে ভালো মশাই। আজ লাঞ্চে কী খাবেন?

- ভাত আর কাঁকরোলের তরকারি। আসলে বাজার যেতে ইচ্ছে করছিল না তাই...।

- বিমলবাবু! সার্ভেটা বরং বন্ধ রাখি। আমার ক্রমশ মনে হচ্ছে আমি একটা কফিনের ভিতর দাঁড়িয়ে আছি।

- বুকের ভিতরটা কেমন ঠাণ্ডা করে দিলেন। দিব্যি ঘুমোচ্ছিলাম নাক ডেকে।

- শুনুন, এ মৃত্যু উপত্যকা থেকে বেরোবার একটা সুযোগ আপনাকে অফার করতে পারি আমরা। লাইফ বিয়ন্ড ডেথ ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে।

- সে'টা কী?

- আকাশের দিকে দেখুন!

- উম...আর...এই রে...বাপ রে!

- আঁতকে উঠবেন না প্লীজ!

- আকাশে অতগুলো মুখ...মা,  ডাক্তার দত্ত বোধ হয় ও'টা, পাশে আমার সহকর্মী সাহাবাবু...ওরা আকাশ থেকে ও'ভাবে দেখছে কেন?

- এই সার্ভেটা শুধু কোমায় থাকা মানুষদের জন্য। গতকাল রোববার ছিল। আপনি প্রিলাঞ্চ ঘুমের মধ্যেই কোমায় চলে যান। সন্ধ্যে থেকে হসপিটালে। এ'রা এখন আপনাকে দেখতে এসেছেন।

- কো...কোমা...আমি কোমায়?

- লাইফ অ্যান্ড ডেথ ফাউন্ডেশন থেকে আমরা বিভিন্ন ডেটা ক্যাপচার করর যাই অনবরত। কেউ দেড়শো মৃত্যু পেরোলেই আমরা রিমোট কন্ট্রোলে তাকে কোমায় ঠেলে দিতে পারি। গতকাল খবরের কাগজে কুড়ি মিনিট ধরে বিজ্ঞাপন পড়াটাই আপনার একশো একান্নতম মৃত্যু। অমনি আমাদের জার্মানির কন্ট্রোল রুম থেকে আমরা আপনাকে কোমায় ঠেলে দিয়েছি।

- আমার গা গুলোচ্ছে।

- এ'বারে সার্ভের মূল প্রশ্নটা। আপনি মৃত্যু উপত্যকায় ফেরত যেতে চান? নাকি আমাদের লাইফ বিয়ন্ড ডেথের নতুন সদস্য হতে আপনি প্রস্তুত?

**

- আরে বিমল, এই অসময়ে তুই?

- গোবরা, টাকাটার এখনও কোনও ব্যবস্থা করে উঠতে পারিনি রে।

- আরে সে চিন্তা করিস না। মাসীমা এখন কেমন আছেন?

- ভালো। বেশ ভালো।

- কী দরকার বল...।

- আসলে...।

- টাকার দরকার?

- না তা নয়। আসলে আমি এসেছিলাম একটা সার্ভের ব্যাপারে। তোর দু'মিনিট সময় হবে রে?

Wednesday, June 21, 2017

পোস্টকার্ড

দুপুরবেলা ঘরে খিল এঁটে ড্রেসিংটেবিলের সামনে বসে চিঠি লেখাটা নীলার অভ্যেস। ভাত খেয়ে এক খিলি পান মুখে দেওয়ার মত ব্যাপার। নিত্যনৈমিত্তিক।
এ'দিকে নিজের মনের সমস্ত কথা তো আবার যার তার কাছে উপুড় করে দেওয়া যায় না। চিঠি দেওয়ার জন্য নিজের মনের মত একটা নাম বেছে নিয়েছে সে; অনুপ সামন্ত। নিজের মনের মত একটা ঠিকানাও তৈরি করেছে নীলা। বত্রিশের এ, নাড়ুগোপাল দত্ত লেন, বারাসাত।

পোস্টকার্ডগুলো ডাকবাক্সেই বিসর্জন দেয় রোজ বিকেলে, টিউশন পড়িয়ে ফেরার পথে। ভুল ঠিকানার পোস্টকার্ড নিয়ে ডাকবিভাগ কী করে? ছিঁড়ে ফেলে? পুড়িয়ে ফেলে?

বৃষ্টি থামার পরে ছাদে উঠে গিয়ে হাওয়া চটি খুলে পায়চারি করেন অনুপবাবু।
ভালোবাসেন রাতের শেষ মেনলাইন লোকালের জানালায় মিঠে ফুরফুর।
আর মনে রাখেন পোস্টকার্ড প্রাপ্তি। গোটাগোটা অক্ষরে লেখা ঠিকানার মাথায় নিজের নাম। পোস্টকার্ডে পন্ডসের সুবাস।

"এই হল বত্রিশের নাড়ুগোপাল দত্ত লেন, এ'খানে আমি থাকি, রাইট সমরবাবু"?

"ঠিক"।

"আপনি থাকেন তেত্রিশ নম্বরে। রাইট"?

"ঠিক"।

"আমরা গত বাইশ বছর ধরে প্রতিবেশী, রাইট"?

"অবশ্যই স্বপনবাবু"।

"এই বাইশ বছরে আপনি খেয়াল করেছেন যে বত্রিশ নম্বর আর তেত্রিশ নম্বরের মধ্যে বত্রিশের এ রয়েছে"?

"বলেন কী"?

"একটা নীল রঙের ছোট্ট বাড়ি, একতলা। থাকেন অনুপ সামন্ত বলে একজন। হুগলী না ব্যান্ডেলে কী একটা কাজ করে"।

"সামন্ত, আমার বাড়ির পাশে। নীল বাড়ি। আপনি শিওর"?

"ভোজবাজি। ও বাড়ি নতুনও নয়। সে'দিন বাড়ির মালিককে পাকড়াও করতে অবাক হয়ে জানালে যে সে বহু বছর ধরে এ পাড়ায়"।

"ইয়ে মানে, হয়ত তাই হবে। আজকাল ক'জনই বা আমরা পাড়াপড়শির খবর রাখি। আমিই তো জানতাম আপনার ছেলে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। পরশু গিন্নী করেক্ট করে জানালে আপনার ছেলে হাজরায় ল পড়ছে"।

নীলার পোস্টকার্ড দু'একদিন না এলেই আয়নায় নিজেকে অস্পষ্ট দেখেন অনুপবাবু। বাড়ির পলেস্তরা ঝরে পড়তে শুরু করে। অফিস কামাই করতে শুরু করেন ভদ্রলোক।
"নীলা নিজের হাতের লেখার মতই ছেলে মানুষ", বলে গজগজ করে চলেন তিনি।

তারপর একদিন  পন্ডসের সুবাস মাখা পোস্টকার্ড এসে পড়তেই ফের অনুপবাবুর চনমনিয়ে ওঠা।

নীলার বড় জানতে ইচ্ছে করে ভুল ঠিকানার চিঠিগুলোর কী গতি হয়।

অনুপবাবু ট্রেনের দুলুনির তালে তালে নীলার কথা ভাবেন, মেয়েটা কি একটাও ইনল্যান্ড লেটার পাঠাবে না কোনওদিন?

Friday, June 16, 2017

লেজুড়

কোনও কিছুর প্রতিবাদ করতে হলে একটা লম্বা লেজুড় দিতে হবে।

প্রতিবাদ -

অমুক তমুককে পিটিয়ে ঠিক করেনি।

লেজুড়:

১. অমুক যখন তমুককের হাতে মার খেয়েছিল ১৯৫৬, ১৯৭৩, ১৯২৩, ১৭৬৩ আর ১৫৯৭য়ে, তখনও আমার খারাপ লেগেছিল।

২. অমুকের পিসেমশাই যখন ইথিওপিয়া, বারুইপুর বা প্যারিসে মারধোর খান , তখনও আমার বিশ্রী লাগে।

৩. তমুকের ব্যথায় এখন ১০০ শব্দে প্রতিবাদ করেছি। অমুকের সময় ৪২টা শব্দ খরচ করেছিলাম। কিন্তু কথা দিচ্ছি যে বাকি ৫৮টা শব্দও ছিল, শুধু বুকে থেকে ফেসবুকে নামানোর আগে ওয়ানডে ম্যাচ এসে গেছিল। রিয়েলি।

৪. আমি আসলে অকারণে বেধড়ক পেটানো ব্যাপারটায় বিরক্তি প্রকাশ করেছি। অমুক তমুক মূল বিষয় নয়, ইনফরমেশন মাত্র। তমুকের ওপর অমুকের অকারণ তম্বিকে গাল দেওয়া মানেই বাই ডিফল্ট   তমুকের অমুক পেটানোর প্রতি চোখ বুজে থাকা নয়। অকারণ বেধড়ক পিটুনিতে দু'পক্ষেরই খুব ব্যথা লাগে। এ'টুকু নিশ্চিত।

Phew.