Friday, June 16, 2017

যদুবাবুর উকিল

- যদুবাবু! বিষের ইঞ্জেকশন চলবে?

- বিষের ইঞ্জেকশন?

- পিঁপড়ের কামড়ের মত অল্প খোঁচা! তার খানিক পর গোটা দেহ বিকল হয়ে চিত্তির।

- কী জানো হে তুলসী, আমার দাদু রঞ্জি খেলেছেন, ডাক্তারি পাস করেছেন, দুর্দান্ত ছবি আঁকতেন। আর আসর মাতাতেন বিভিন্ন ম্যাজিক দেখিয়ে। এহেন ট্যালেন্টেড পারসোনালিটি মাত্র পঞ্চাশ বছর বয়সে সন্ন্যাস নিয়ে গোমুখ যাত্রা করেন। তখন তাঁর দেহে দিব্যতেজ। তারপর ধরো আমার বাবা, থিয়েটার, কবিতা, রান্না; সর্বত্র তার রাজকীয় বিচরণ। এমন সব পূর্বপুরুষের রক্তকে বিষিয়ে দিয়ে মারা যাব ভাবতেই কেমন মন খারাপ করছে। আর মন খারাপ নিয়ে মরতে চাইছি না হে।

- মারা যাবেন, তার আবার মন খারাপ আর ফুর্তি কীসের?

- আমি কি আর দুঃখের চোটে মরতে এসেছি রে ভাই? গ্ল্যামারাস এগজিট চাইছি। রোগ ভোগ নয়, ট্রাকচাপা নয়। সাজানো গোছানো ছিমছাম। তাছাড়া আর কতদিন! সামনের আষাঢ়ে বিরানব্বুইয়ে পড়ব। এই বেলা ব্যবস্থা না করে ফেললে কবে খবর পাবে আমি বাথরুমে পা ফসকে কমোডে মাথা ঠুকে অক্কা পেয়েছি। কী শেমফুল হবে ব্যাপারটা ভেবেছ?

- তা সাজানো গোছানো মৃত্যুবরণের জন্য কলকাতা কী দোষ করেছিল? দিব্যি নাকতলার সিলিং থেকে ঝুলে পড়তেন। খামোখা এই পাহাড়ি জঙ্গলে আসার কী দরকার? শুধু শুধু নিজেও এদ্দূর ঠেঙিয়ে এলেন আর আমাকেও বগলদাবা করে নিয়ে এলেন।

- সে কী তুলসী! তুমি আমার উকিল কাম চীফ কনসাল্ট্যান্ট, তোমায় না আনলে চলবে কেন? তাছাড়া কলকাতার ওই ফার্নেসে এমনিতেই তো আধমরা হয় থাকা! সে'খানে আত্মহত্যা করলে সে'টা হাফ-সুইসাইড হত। লোকে ভীতুর ডিম বলে মুখে আগুন দিত।

- এ'দিকে লোকে সব কথা জানলে কী বলবে বলুন তো? আপনার উকিল হয়ে আমি আপনাকে আত্মহত্যার টেকনিক বাতলে দিচ্ছি?

- সে জন্যে আমি তোমায় মোটা টাকা ফীজ দিচ্ছি। এ'টা তোমার ফাইনাল কাজ। যাক গে। বিষের ইঞ্জেকশন বাদ। অন্য আইডিয়া দাও।

- খাদটাদ দেখে ঝাঁপ দেবেন নাকি? চারদকেই তো পাহাড়!

- আমার ডেডবডি যখন খুঁজে পাবে তখন দেখবে সমস্ত দাঁত উপড়ে এসেছে, নাক ভাঙা। শ্মশানে নেওয়ার আগে দাঁত বাঁধাতে হবে, প্লাস্টিক সার্জারি করাতে হবে; নয়তো বুড়িদের সামনে ইম্প্রেশন নষ্ট হবে। সে বিশ্রী ব্যাপার! তাছাড়া চোট আঘাতও কম নয়! আমার স্কিনটা আবার একটু সেনসিটিভ। নেক্সট অপশন শুনি।

- ঘুমের ওষুধ?

- পাতা ছিঁড়ে ওষুধ খাওয়ায় কী গ্ল্যামার খুঁজে পেলে বাবা তুলসী? এ তো অলিভ অয়েলে ইলিশ ভাজার কেস।

- আচ্ছা যদুবাবু! এই ধরুন যদি আপনি কোনও তান্ত্রিক টান্ত্রিক ধরেন? মানে, তারা তুকতাক করে যদি আপনার মুখে রক্ত তুলে আপনাকে ধরাশায়ী করতে পারে।

- মরার আগে সায়েন্সের পিঠে ছুরি মেরে মরব হে তুলসী? ধর্মে সইবে?

- আমার মেজপিসে এক বার প্রচুর পরিমাণে কাঁঠাল খেয়ে গোল পাকিয়েছিলেন। বুকে গ্যাস আটকে মরো মরো অবস্থা। ট্রাই করবেন নাকি? আনাবো কাঁঠাল?

- এই বুদ্ধি নিয়ে মক্কেল সামাল দাও কী করে হে?

- উফ! আপনার মত দু'এক পিস মক্কেল থাকলেই উকিলের আক্কেল গুড়ুম। এ'বার বুঝলাম আপনার আগের উকিল আপনাকে ত্যাগ করেছিলেন কেন। এ'মন উদ্ভট হাড়াজ্বালানো কাজের কোনও মানে হয়? সুইসাইড কন্সালটেন্সি? গলা বেয়ে চোঁয়াঢেঁকুর উঠছে মশাই এ'বারে।

- করেকশন। কন্সাল্টেন্সি ফর আ গ্ল্যামারাস সুইসাইড।

- মাইরি।

- অ্যান্ড ইফ ইউ মাস্ট নো এর আগে অন্তত চারজন উকিল আমায় ত্যাগ করেছে। যাক গে, পরের আইডিয়া শুনি...।

- গায়ে কেরোসিন ঢেলে...।

- তার চেয়ে গাভাস্কারের ষাট ওভারে ছত্রিশ রানের ইনিংস দেখতে দেখতে  বুক ব্যথা বাগিয়ে ঘুমিয়ে পড়া ভালো।

- তাহলে আপনিই বলুন!

- বললাম তো! গ্ল্যামার! থ্রিল! তোমার বুদ্ধির দৌড় বোঝা গেছে। ভাগ্যিস নিজের ব্যবস্থা নিজেই করেছিলাম।

- কী ব্যবস্থা?  কী ব্যবস্থা করেছেন?

- এই যে। এই খালি প্যাকেটে ছিল। ব্যবস্থা।

- এই বাদামের ছেঁড়া প্যাকেটে? এই প্যাকেটের বাদামে কি বিষ ছিল যদুবাবু? কী বলছেন আপনি? আমরা দু'জনেই এই বাদাম খেয়েছি তো! আপনি কী...।

- আহা! কী মুশকিল। সব বাদামে বিষ থাকবে কেন? গোটা প্যাকেটে একটা বাদামে সে বিষ মাখানো। কোন বাদাম? কেউ জানে না। কেমন বিষ?  সে বড় কাজের দাওয়াই হে তুলসী। যন্ত্রণাহীন মৃত্যু, সাইড এফেক্ট বলতে শুধু সামান্য অম্বল, একটু চোঁয়াঢেঁকুর। এ'ছাড়া আর রক্তে কোনও চিহ্নও থাকবে না। ম্যাজিক অফ জড়িবুটি। এ'বার প্রশ্ন হচ্ছে, বাদামটা কার মুখে পড়বে। আমার না উকিলের?  এই যে রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনা, আমি খুন করছি না আত্মহত্যা করছি, এই টানাপোড়েন, এ'টাই আলটিমেট থ্রিল হে তুলসী। এই থ্রিল বুকে নিয়েই আমি একদিন সরে পড়ব। কিন্তু আজ যে আমায় আবার থেকে যেতে হচ্ছে ভাই, তোমার চোঁয়াঢেকুর অন্তত সে'রকমই বলছে।

Sunday, June 11, 2017

চুলের যত্ন

খুব মন দিয়ে চুল আঁচড়াচ্ছিলেন মনোময়বাবু।

শালিমার আর চৌবাচ্চার জলে ভেজা চকচকে চুলকে প্রথমে পাট করে কপালের সামনে এনে জড়ো করা। তা'তে গেল দশ মিনিট। তারপর সিঁথিটা মাথার বাঁ দিকে ভালো করে কাল্পনিক রুলারে মেপে বসিয়ে নেওয়া, তা'তে আরও মিনিট পাঁচ। এরপর কপালের সামনের পাট করা চুল টেনে এনে শুইয়ে দেওয়া মাথার ডান দিকে। তা'তে আরও দশ মিনিট। তারপর দু'মিনিট মাথার বাঁদিক আঁচড়ে নেওয়া। শেষের মিনিট পাঁচ মাথার তালু থেকে ঘাড় পর্যন্ত  চিরুনি নেমে আসবে বারবার।

আধ ঘণ্টা পেলেই চুল আঁচড়ানোটা মনমত হতে পারে। কিন্তু তার উপায় নেই।

অফিস থেকে ফিরে স্নানটান করে আয়নার সামনে দাঁড়াতেই খোকার হোমওয়ার্ক বুঝিয়ে দাও বলে ঘ্যানঘ্যান, গিন্নীর বাজারের ফর্দ নিয়ে বাতিকগ্রস্ত বকরবকর, প্রতিবেশী নির্মলবাবুর "শুনেছেন মশাই?"গোছের যত ঝামেলা এই সময়। মনোময়বাবুর মনঃসংযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মেজাজ তিতকুটে হয়ে আসে। জ্যামিতির হিসেবে চুল যখন এলোপাথাড়ি, তখনই রণে ভঙ্গ দিয়ে ড্রেসিং টেবিলে চিরুনি নামিয়ে রাখতে হয়।

**

- কিছুতেই কিছু হল না ডাক্তার! আপনার ওষুধ সার্জারি সমস্ত ফেল। আমার আর কিছু হওয়ার নয়...।

- অমন মিইয়ে গেলেন কেন মশাই। পাশুপত অস্ত্রটা যে এখন ছাড়ব মনোময়বাবু...।

- এখনও অস্ত্র বাকি আছে আপনার আরসেনালে?

- ব্র‍্যান্ডনেম এমনি এমনি তৈরি হয়নি মশাই।

- আমার প্রব্লেম সলভ হবে ডাক্তারবাবু?

- ভরে যাবে! গ্যারেন্টি।

- ভরে যাবে?

- ভরপুর।

- ওষুধ আর ট্রান্সপ্লান্টের বাইরে অস্ত্রটা কী ডাক্তার বাটরা?

- আমি ম্যাজিশিয়ান মনোময়বাবু, আমার কাছে এসে কেউ বিফলমনোরথ হতে পারে না। আমার মূল অস্ত্র...।

- মূল অস্ত্র?

-  হিপনোটিজম।

কিছুনা

নিবিষ্টমনে ব্রীজের বাতিগুলোর টিমটিমের দিকে তাকিয়ে সল্টেড বাদাম চিবুলে বুকের মধ্যের চিনচিন কমে যায়। চোখের ফোকাস একটু আবছা হয় বটে তবে সন্ধ্যের লাগাম ফের হাতে ফিরে আসে।

পুরনো টোটকা। অব্যর্থ।

তিননম্বর বাদামের প্যাকেট ছিঁড়ে রেলিঙে ঝুঁকে দাঁড়াল দীপক। মুখে বুকে মেঘলা হাওয়ার ঝাপটা।

কিছু হয়নি।
সমস্ত ঠিক আছে। স্কেলে মেপে চলছে সমস্ত কিছু। যেমনটা হওয়ার কথা। আগামীকাল ফের আটটা সতেরোর ট্রেন ধরে অফিস। পেন্ডিং ফাইলগুলোর হিল্লে না করলে চলছে না, কাজেই ফিরতে রাত। বাড়ি ফেরার পথে মায়ের শুগারের ওষুধ, সে'টা আর্জেন্ট। ছাদের ঘরের প্লাস্টারটা নতুন করে করাতে হবে, দামোদর মিস্ত্রীকে রাতের দিকে ডাকতে হবে।
সমস্ত ঠিক আছে।
কিছু হয়নি।

বুক পকেটের চিঠিটা আদতে কিছু না। কিছু না।

"কিছু না কিছু না" বিড়বিড়টা ক্রমশ দলা পাকিয়ে উঠছিল বুকের ভিতর। কিছুনার গায়ে গন্ধরাজের সুবাস। ছোটবেলার বিকেলের আলো মাখানো কিছুনা। কিছুনা অঙ্কে ভালো। কিছুনা মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে মনে হয় এইবারে কলকাতা ভেসে যাবে।

হাওড়া ব্রীজ থেকে খাম না খোলা চিঠির দুলে দুলে নদীর বুকে নেমে যাওয়ায় কিছুনার ছটফট দেখতে পেলো দীপক।

**

"টিকিট করুন জলদি। স্টেশন না হাওড়া ময়দান"?

"স্টেশন। এই যে। আচ্ছা, চিঠি পড়তে হলে যে খাম খুলতেই হবে, তেমন প্রিমিটিভ ধারণায় আটকে থাকার কোনও মানে হয় না। তাই না দাদা"?

"আমায় কিছু বললেন নাকি"?

"নাহ্, ও কিছুনা।

Sunday, June 4, 2017

বৃকোদর মল্লিকের নস্যির ডিবে


-   এক্সক্যিউজ মী। আপনার টেবিলে বসতে পারি? নাকি কাউকে এক্সপেক্ট করছেন?

-   বসুন।

-   আপনিই অরূপ সান্যাল তো? ফেমাস ঘোস্ট স্টোরি রাইটার।

-   ফেমাস বলাটা বাড়াবাড়ি হবে। তবে, ভূতের গল্প কিছু লিখেছি বটে।

-   দাঁড়ান, আমার পরিচয়টা দেওয়ার আগে একটা কফি বলে নিই। ওয়েটার! এইদিকে। দু’টো কফি বলি? আপনার পেয়ালাটা তো প্রায় শেষের দিকে...।

-   ব্ল্যাক।

-   দু’টো ব্ল্যাক কফি। যাক। এ’বারে আমার পরিচয়টা দিয়ে নি, আমি বৃকোদর মল্লিক।

-   বৃকোদর মল্লিক? নামটা যেন...।

-   চেনা চেনা ঠেকাটা অস্বাভাবিক নয়। বিশেষত আপনার পুরনো কলকাতার ব্যাপারে আগ্রহ আছে যখন, নামটা চেনা ঠেকাই উচিৎ।

-   চেনা চেনা ঠেকছে কিন্তু ঠিক...।

-   পেটে আসছে কিন্তু মনে পড়ছে না। বুঝেছি। চার্নক সাহেবের কথা মনে করুন।

-   ওহ্‌। মনে পড়েছে। চার্নক সুতনুটিতে এসে কিছু মাটির বাড়ি তৈরি করেন সাময়িক বসবাসের জন্য এবং ফিরে যান হুগলীতে। পরে নবাবের হুকুমকে কাঁচকলা দেখিয়ে যখন হুগলী চন্দননগর জ্বালিয়ে পালিয়ে আসেন এ’খানে তখন দেখেন যে কেউ সেই মাটির বাড়িগুলো ভেঙে ফেলেছে। জানা যায় সে’টা বৃকোদর মল্লিক নামে কেউ ভেঙেছে।

-   করেক্ট। শুধু ভাঙেনি, মাটির সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছিল।

-   তবে সে’টা ভুল তথ্য। ঘটনাটা বরখুরদার মালিক পদের কোনও মোগল কর্মচারীর কাজ। ইতিহাসে সে’সব গুলিয়ে ফেলে বৃকোদর মল্লিক তৈরি করেছে। আপনার বাপমা যদি সেই বৃকোদর মল্লিকের কথা ভেবে আপনার নাম রেখে থাকেন, তাহলে ভুল করেছেন।

-   আসুন। কফি।

-   থ্যাঙ্কস ফর দ্য কফি।

-   কফিটা খাওয়াচ্ছেন কিন্তু আপনি। আমি সেধে এসে টেবিলে বসলাম বটে, তবে আমার দাম দেওয়ার উপায় নেই।

-   আই সী।

-   অভদ্র ভাববেন না প্লীজ। একান্তই উপায় নেই।

-   ঠিক আছে।

-   তবে আপনার সঙ্গে আলাপ করাটা দরকার ছিল জানেন। কারণটা ওই, আপনি ভূতের গল্প লেখেন বলে।

-   কারণটা শুনি।

-   সরি টু ডিস্যাপয়েন্ট ইউ স্যার। বরখুরদার মল্লিকের থিওরিটা সঠিক নয়। সব কিছু ধান কাল কাটা থেকে ক্যালক্যাটা হয় না।

-   আপনি নিশ্চিত হয়ে জানলেন কী করে?

-   সুতানুটি তখন জলাজঙ্গল। সে’খানের এক দু’টো মাটির বাড়ি ধসিয়ে নবাবের কি মোক্ষলাভ হবে বলুন! আর ওই কুটীর বানিয়ে নেওয়াই বা এমন কী আর চ্যালেঞ্জ। মনে রাখবেন তখন কোম্পানি টপাটপ ফ্যাক্টরি, দুর্গ বা জেটি বানিয়ে চলেছে। জনশ্রুতি যে আতশকাচের তাপে জাহাজ থেকে চন্দননগরের বাজার জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন চার্নক। তেমন তোপ মানুষের দু’একটা মাটির বাড়ি রইল না গেল, তা’তে কী এসে যায়?

-   বেশ। তা’তে কী হল? আপনার বক্তব্যটা কী?

-   বক্তব্য এই যে আমি যে সে বৃকোদর মল্লিক নই স্যার। আমি সেই বৃকোদর মল্লিক।

-   আচ্ছা। আপনার কফি শেষ হলে উঠতে পারেন।

-   বড় আশা করে আপনার কাছে এসেছি।

-   অদ্ভুতুড়ে গল্প ফাঁদতে?

-   ভূতের গল্পের লেখক আপনি। আমি বড় আশা করে এসেছি যে আপনি অবিশ্বাস দিয়ে শুরু করবেন না।

-   আপনার পোশাক ভাষা, এগুলো কোনওটাই কি ১৬৮০ সালকে মনে করিয়ে দিচ্ছে?

-   ভূত বলে কি মূর্খ হয়ে থাকব স্যার? ক্রমাগত শিখেছি। নিজেকে আপডেট করেছি।

-   আমার কপালেই যত জোটে।

-   প্লীজ শুনুন। একবার আমায় অন্তত বলতে সুযোগ দিন। তারপর না হয়...। আর কিছু না হোক, গল্পের জব্বর প্লট পাবেন।

-   বলে যান বৃকোদরবাবু। সে নামেই ডাকব তো আপনাকে?

-   হেহ্‌। থ্যাঙ্ক ইউ। আর এক কাপ কফি বলি? এই ওয়েটার! অউর দো কাপ। ব্ল্যাক।

-   এ’বার বলুন।

-   কিছু পর্তুগীজ তখনও রয়ে গেছিল ব্যান্ডেল চার্চের আশেপাশে। অল্প সংখ্যক সৈন্যসামন্তও ছিল, সে ছোট্ট সেনাদলেই আমি ছিলাম। কিন্তু তারপর তাঁদের অবস্থা আরও পড়ে যাওয়ায় ইংরেজদের কুঠিতে চলে যাই। পর্তুগীজদের সঙ্গে থাকার সময় দুধ কেটে ছানা করে মেঠাই বানানোর কিছু প্রক্রিয়া আমি শিখেছিলাম ফিরিঙ্গি রাঁধুনির থেকে। রান্নাবান্নার দিকে আমার বিশেষ ইন্টারেস্ট ছিল বরাবরই।

-   প্লীজ বলবেন না এ’বার যে আপনিই রসগোল্লা আবিষ্কার করেছিলেন।

-   আপনি ভীষণ শার্প স্যার।

-   খুব প্রেডিক্টেবল গাঁজা হয়ে যাচ্ছে।

-   আমার কাছে প্রমাণ আছে স্যার। কথাগুলো মিথ্যে যে নয় তার প্রমাণ।

-   বেশ। কফি যখন আসছেই, বলে যান।

-   তবে আবিষ্কারটা ঠিক ব্যান্ডেলে থাকার সময় হয়নি। সে’খান থেকে হুগলীর ইংরেজ কুঠিতে যাই। সে’খানে কিছুদিন কাজ করার পর আমায় বদলি করে দেওয়া হয় বালেশ্বরে। সে’খানে সাহেবদের রান্নার ঠাকুর অখাদ্য সব রান্না করত, বাধ্য হয়ে নিজেকেই মাঝে মধ্যে ঢুঁ মারতে হত হেঁসেলে। তখনই এক্সপেরিমেন্ট শুরু। আধুনিক ভাষায় যাকে বলে স্যুইট টুথ, সে’টা আমার গত সাড়ে তিনশো বছর ধরে আছে। কাজেই পড়ে রইলাম মেঠাই নিয়েই। বালেশ্বরে কিছুদিন বেশি হাত পা ছড়িয়ে ছিলাম। সময়ও ছিল অঢেল। তখনই রসগোল্লা আবিষ্কারটা করে ফেলি। তবে স্পঞ্জ নয়। সে’টা পরে কলকাতাতেই...।  

-   আপনার কথা অনুযায়ী রসগোল্লার আবিষ্কার উড়িষ্যাতেই হয়েছে।

-   কিন্তু করেছে একজন বাঙালি।

-   রাইট। বেশ। সো ফার সো গুড। এরপর? সমস্যাটা কোথায়? আপনার আমাকে দরকার হল কেন!

-   এইটার জন্য।

-   এ’টা কী ।

-   কী মনে হচ্ছে?

-   নস্যির কৌটো।

-   খাঁটি সোনার।

-   সোনারই তো মনে হচ্ছে। পুরনোও বটে। যাক। এর ভিতরে নস্যি রয়েছে?

-   নস্যি নেই। তবে যে’টা আছে সে’টাই প্রমাণ স্যার। সে’টাই তো প্রমাণ। যে আমিই বৃকোদর মল্লিক। আমিই ভূত।

-   বলে যান। শুনছি।

-   একবার বালেশ্বরের কুঠিতে এসে চার্নক সাহেব আমার হাতের তৈরি রসগোল্লা খেয়ে মুগ্ধ হন। এবং এতটাই আহ্লাদিত বোধ করেন যে আমায় বালেশ্বর থেকে উঠিয়ে ওয়াপিস নিয়ে যান হুগলী। এরপর প্রথমবার সুতানুটিতে আসেন সম্পূর্ণ অন্য এক বদ ফিকির নিয়ে। উনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে ফাঁকি দিয়ে নতুন কারখানা গড়তে চেয়েছিলেন। নতুন সাম্রাজ্য। রসগোল্লার কারখানা। ওনার ধারণা ছিল রসগোল্লার ফর্মুলা হাতিয়ে গোটা পৃথিবীর মেঠাই মার্কেট তিনি কব্জা করবেন। সুতানুটি হবে রসগোল্লা ক্যাপিটাল। জাহাজে করে হাজারে হাজারে লোক হুগলীতে তরী ভেড়াবে রসগোল্লা আস্বাদন করতে। শুধু...শুধু তাঁর বুদ্ধিতে একটাই ফাঁক ছিল...।

-   কী’রকম?

-   তিনি আমার সঙ্গে রসগোল্লা সাম্রাজ্যের মুনাফা ভাগ করতে অস্বীকার করেন। কালা আদমি বলে খিস্তি করতেও ছাড়েননি। অথচ ভদ্রলোকের পুরো বিজনেস আইডিয়াটাই আমার আবিষ্কারকে ঘিরে। কী খলিফা আদমি ভাবুন। হাড় বজ্জাত।

-   তারপর?

-   জোবের একটা মস্ত অসুবিধে ছিল। আমায় জনসমক্ষে কড়কাতে পারত না কারণ ওঁর ফন্দীর কথা কোম্পানি বাহাদুরের কানে পৌঁছলেই ওর চাকরী নট হত, বন্দী হওয়ার আশ্চর্য ছিল না। অথচ আমার থেকে ফর্মুলা হাতাতেও পারছিল না। আমার মুশকিল হয়েছিল অন্য জায়গায়। বালেশ্বরে শুরুর দিকে একবার বলে ফেলেছিলাম আমার রোজনামচার কথা। অর্থাৎ ডায়েরি। এও বলেছিলাম রসগোল্লার রেসীপি সে’খানেই আমি লিখে রেখেছি। হুগলীতে ফিরে জোব সাহেব ঘ্যানঘ্যান আরম্ভ করল ওই ডায়েরী আমায় দাও। আমিও স্পীকটি নট। অবশেষে ব্যাটাচ্ছেলে উপায়ন্তর না দেখে বাজে অছিলায় কিছু সৈন্য নিয়ে সুতানুটিতে এসে হাজির হলে। সঙ্গে আমিও, সমস্ত মালপত্তর সমেত। সুতানুটিতে ল্যান্ড করে বাবাজীর আসল মূর্তি প্রকাশ পেল। মাটির ছ’টা বাড়ি তৈরি হয়েছিল, একটায় সে নিজে থাকত। চারটেয় বাকি সৈন্যরা, আর অন্যটায় আমাকে সে বন্দী করলে। আর সে কী অকথ্য অত্যাচার! আমিও গোঁ ধরে রইলাম, জান কবুল কিন্তু রসগোল্লার রেসীপি আমি ওই সাহেবদের হাতে তুলে দেব না। এর মধ্যে ফরমান আসায় তাঁকে সুতানুটি ত্যাগ করতে হয়। ব্যাটাচ্ছেলে আমায় সুতানুটির সেই শিকলে বেঁধে রেখে চলে চায়। যাওয়ার আগে বলে যায় “তুই মর ব্যাটা কালা আদমি। কিন্তু তোর মালপত্তরের মধ্যেই কোথাও তোর ডায়েরি আছে তা আমি বেশ জানি। এখানে যখন পেলাম না, তখন নিশ্চয়ই হুগলী বা বালেশ্বরে আছে। আমি চললাম, তুই মর”।

-   আরিব্বাস। ড্রামাটিক। তারপর?

-   তারপর আবার কী! অত্যাচারে আধমরা হয়েই ছিলাম। দু’হপ্তার মধ্যেই মারা গেলাম। মারা গিয়ে সুবিধে এই হলো যে শিকলে আরা বাঁধা পড়ে থাকতে হল না। সোজা সাপটা বেরিয়ে এসে ছ’টা কুটির জ্বালিয়ে খাক করে দিলাম।

-   আপনার রসগোল্লার রেসীপি লেখা ডায়েরি?

-   সে জিনিসের খোঁজ চার্নক সাহেব বালেশ্বর আর হুগলীর কুঠিতে আমার ঘর তন্নতন্ন করে খুঁজেও পান নি। বেশ কিছুদিন পর সাহেবের খেয়াল হয় একটা ছোট ব্যাপারে ভুল করে ফেলেছেন তিনি। আমি সবে নস্যি নেওয়ার অভ্যাস ধরেছিলাম। নস্যি নেওয়ার চলটাই তখন এ দেশে নতুন। এত খোঁজ করেও, চার্নক সাহেবের কোনোদিন আমার নস্যির ডিবেটার প্রতি সন্দেহ যায়নি। অথচ বন্দীদশায় এ ডিবে থেকে নস্যি না নিলেও এ ডিবে আমার কোমরে বাঁধা ছিল। দুয়ে দুয়ে চার করতে সামান্য সময় লেগেছিল সাহেবের।

-   নস্যির ডিবের মধ্যে ডায়েরি? গুলের সীমা থাকবে না একটা?

-   টানা এক বছরের রোজ নামচা রয়েছে এই নস্যির ডিবের ভিতরে স্যার। কী ভাবে, সে প্রসঙ্গে আসছি। চার্নক সাহেবের যখন টনক নড়ল তখন তিনি হুগলী ছাড়ার অছিলা খুঁজতে লাগলেন। অকারণ যুদ্ধবাজি করে সৈন্যসামন্ত সমেত রওনা দিলেন ‘বালেশ্বর চললুম’ বলে। কিন্তু ব্যাটার প্রাথমিক টার্গেট ছিল সুতানুটি। সে’খানে পৌঁছে আমার লাশ থেকে নস্যির ডিবেটা নিতে পারলেই রসগোল্লার রেসীপি তাঁর হাতের মুঠোয়, এ বিষয়ে তিনি নিশ্চিত। আর একবার সেই রেসীপি হাতে এলে কোম্পানিকে কাঁচকলা দেখিয়ে নিশ্চিন্তে নিজের রসগোল্লা সাম্রাজ্য স্থাপন করতে কোনও অসুবিধেই হবে না। কিন্তু যাবতীয় উত্তেজনা নিয়ে সাহেব সুতানুটিতে নেমে দেখেন কোথায় কী? সমস্ত ঘরদোর মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। স্থানীয় লোকেরাই বললে যে বৃকোদর মল্লিকের ভূতই এ’সব করেছে। চার্নকের ব্যাটার সে কী মন খারাপ।

-   তা এই সেই নস্যির দিবে?

-   আজ্ঞে।

-   তা এ’টা এদ্দিন কোথায় রাখছিল?

-   মাইরি, বিশ্বাস করবেন? ওই অভিশপ্ত নস্যির দিবে আমি কারুর হাতে দিতে চাইনি। গভীর জঙ্গল দেখে একটা জায়গার মাটির অনেক নীচে পুঁতে এসেছিলাম। অবিশ্যি রেসীপিটা হারিয়ে যেতে দিইনি। সোজা গিয়ে কয়েকজন ময়রার স্বপ্নে সে রেসীপি বলে দিয়ে এসেছিলাম। ভূত হওয়ার অ্যাডভান্টেজ তো কম নয় বলুন।

-   তা বটে।

-   কিন্তু কী কাণ্ড ভাবুন। নস্টালজিয়ার ঠেলায় অনেকদিন পর খেয়াল হল নস্যির ডিবেটা খুঁজে বার করি কিন্তু কিছুতেই সে জায়গা খুঁজে পাই না। সাড়ে তিনশো বছর আগের ঘটনা তো, তার মধ্যে গ্রামটা এত পালটে গেল। অবশেষে বছর খানেক খুঁজে জায়গাটা চিনতে পেরে আমার মাথায় হাত। ভাবতে পারেন, নস্যির ডিবে যে’খানে পুঁতে এসেছিলাম, জোব চার্নককে সে’খানেই গোঁড় দেওয়া হয়েছে? অ্যামেজিং না?

-   বটে! কিন্তু এই নস্যির কৌটের মধ্যে রেসিপি...!

-   রান্না ছাড়াও আমার একটা বিশেষ গুণ ছিল লেখক মহাশয়। আমি মসলিনের ওপর আঁকতে এবং লিখতে পারতাম।

-   মসলিন?

-   সে’সময়ে বাংলার মসলিনের খ্যাতি বিশ্বজোড়া। দাম আকাশ ছোঁয়া। আর সে মসলিন যে কী জিনিস মশাই। কেউ চার হাজার টাকা দিয়ে এক খণ্ড মসলিন কিনেছে সে সময়, এমন গল্পও শোনা যেত। পাশাপাশি ভাবুন ফরাসীরা গোটা চন্দননগর কিনেছিল চল্লিশ হাজার টাকায়। আরবিরা সে মসলিনকে বলত আর-ই-রওয়ান, অর্থাৎ চলন্ত জলধারা। সেই চলন্ত জলধারার ওপর আমি আমার রোজনামচা লিখতাম। এই নস্যির ডিবেতে প্রায় ষাট গজ মসলিন রয়েছে, আর সেই ষাট গজের ওজন বারো আউন্সের বেশি নয়। সেই কাপড়ের ওপর আমার বালেশ্বরের একবছরের ডায়েরী। এই নস্যির ডিবেটা কাকে দেব ভেবে পাচ্ছিলাম না। সবাই তো ধান্দাবাজ। আপনি সজ্জন মানুষ। আপনাকে দিয়ে যেতে চাই। ডিবেটা খুলে দেখারও সাহস হয়নি। আর পুরনো কাসুন্দি ঘেঁটে কী হবে বলুন। থ্যাঙ্ক ইউ ফর দ্য কফি। আসি।  

ভদ্রলোক ভূত হোক বা না হোক, আশ্চর্যজনক ভাবে কফি হাউসের ভিড়ে মিশে গিয়ে অবাক করে দিলে অরূপ সান্যালকে। নস্যির ডিবেটা অবশ্য বাড়ি ফেরার আগে খুলতে ইচ্ছে হয়নি তাঁর, তবে ডিবেটা যে খাঁটি সোনার সে’টা স্পষ্ট। বাড়ি ফেরার পথে মিনিবাসে খবরের কাগজের পাতা ওলটানোর সময় একটা ছোট্ট খবর দেখতে পেয়ে অল্প বিষম খেলেন সান্যালবাবু; কে বা কারা যেন গত রাত্রে চার্নকের সমাধি খুঁড়েছে, কিন্তু বিশেষ কিছু ক্ষতি করেনি। কড়া পাহারা থাকা সত্যেও এমন ঘটনাকে প্রায় ভৌতিক মনে করছেন কর্তৃপক্ষ।

বাড়ি ফিরেই হুড়মুড়িয়ে শোওয়ার ঘরে গিয়ে দরজায় খিল এঁটে সামান্য নিঃশ্বাস নিলেন অরূপ সান্যাল। নস্যির ডিবেটা খুলে আরও ঘাবড়ে যেতে হল। মসলিনের কোনও চিহ্ন নেই। আদ্যি কালের ইংরেজিতে লেখা ছোট্ট চিরকুট। কাগজটাও বহু পুরনো। যার তর্জমা করলে এই দাঁড়ায়;

“কালা গবেটটার মনে এই ছিল? যাক! আমি যখন বেঁচে থাকতে অমৃতের রেসীপি পাইনি তখন আর কাউকে পেতে দেব না। এই মসলিন আমি আমার বৌয়ের মড়ার গায়ে জড়িয়ে দিলাম। এ দেশে দু’টো ভালোবাসাই খুঁজে পেয়েছিলাম, সে দু’জন একে অপরকে জড়িয়ে থাকুক”।   






Thursday, June 1, 2017

ভদ্রেশ্বরের ভাস্কো দা গামা

- শুনুন।
- আমায় বলছেন?
- হ্যাঁ। আপনি কি ব্যান্ডেল পর্যন্ত?
- নাহ্, ভদ্রেশ্বর। আপনি কি বৈদ্যবাটি? প্ল্যাটফর্ম এদিকে পড়বে? সরে দাঁড়াব?
- বৈদ্যবাটিটা ঠিক ধরেছেন। তবে সাফিশিয়েন্ট জায়গা আছে। গলে যাব। সে জন্য আপনাকে ডাকিনি। আসলে আপনার দাড়িটা...বুঝলেন...আর তার সঙ্গে ওই লম্বাটে মুখের গঠনটা...প্লাস গায়ের রঙটায় যে রোদ পোড়া তামাটে ব্যাপারটা রয়েছে সে'টারও ইনফ্লুয়েন্স আছে খানিকটা...।
- তা'তে কী? দাড়ি, লম্বা মুখ, তামাটে রঙ, তা'তে কী এসে গেল?
- আপনাকে অবিকল ভাস্কো দা গামার মত দেখতে।
- ভাস্কো দা গামা?
- দ্য গ্রেট পোর্তুগিজ এক্সপ্লোরার। দুঃসাহসী এবং খুনে মেজাজ সম্পন্ন।
- আপনি জানেন যে ইতিহাসের বইতে ভাস্কো দা গামার যে'সব ছবি রয়েছে তার সবই কল্পিত? ভালো করে চেয়ে দেখবেন, শাজাহানের চেহারাও একই স্টাইলে আঁকা রয়েছে।
- আমাদের দেশে হিস্ট্রি বলে তো রাবিশ গেলানো হয়। সে'সব আনইম্যাজিনেটিভ বইকে বেস করে অতবড় একটা কথা বলে ফেলব ভেবেছেন?
- তবে?
- থাক।
- এ কী! থাকবে কেন?
- না থাক। বাদ দিন।
- আরে বলুন না। বৈদ্যবাটি ঢুকছে।
- আমি গামা সাহেবকে দেখেছি।
- ওহ। আই সী। আপনি বরং মানকুণ্ডুতে নামুন।

**

ডেলিপ্যাসেঞ্জারির হ্যাপার ওপর যদি এমন বাজে বকা নিয়ে কেউ ঘাড়ে চেপে বসে তাহলে কার মাথার ঠিক থাকে? বলে কিনা ভাস্কো দা গামা! এদের নাকে ঝামা ঘষা উচিৎ।

প্ল্যাটফর্মে নেমে কাজলের দোকান থেকে একটা ফ্লেক কিনতে গিয়ে সমস্যাটা মালুম হলো স্বদেশ সান্যালের। মানিব্যাগ সাফ। মানিব্যাগটা আছে, তবে ভিতরে খাঁখাঁ। না, একদম ফাঁকা নয়। একটা ছোট চিরকুট রয়েছে।

"গামা সাহেব,

কালিকটে কম নাস্তানাবুদ করেননি। তবে বিশ্বাস করুন, তার জন্যে রাগ পুষে রাখিনি। যেটুকু যা রাগ ছিল, কয়েকটা জন্মে সে'সব ডাইলুট হয়ে গেছে।

মরিচ মশলার জন্য কী খুনোখুনিটাই না করে বসলেন স্যার। তবে হাজার খুন মাফ করে দিই শুধু এই ভেবে যে আপনি এ দেশে লঙ্কা বয়ে এনেছিলেন। সামান্য ক'টা টাকা নিলাম, আপনার জিভের ডগায় সামান্য ঝালানুভূতি ছড়িয়ে দিতে। ডৌরো নদীর জলে ডৌরো পুজো আর কী।

ভালো থাকুন।

(রাগটাগ কম করুন। নাবিকদের অমন চণ্ডালে হাবভাব মানায়, ডেলি প্যাসেঞ্জারদের নয়)

ইতি,

জামোরিন, কালিকট/বৈদ্যবাটি"।

না হেসে থাকতে পারলেন না স্বদেশবাবু। মোবাইলে পর্তুগাল সম্বন্ধে সার্চ করতে করতে বাড়ির দিকে হাঁটা দিলেন ভদ্রলোক। গুবলুর হিস্ট্রি বইটইগুলো বের করে আজ একটু ভাস্কো বাবুর কীর্তিকলাপ সম্বন্ধে খবর নিতে হবে।

***

- হ্যাঁ গো, তুমি কি নিজের নাকখানা কুচিকুচি করে কেটে হরির লুটের মত পাড়ার রাস্তায় ছড়িয়ে না দেওয়া পর্যন্ত থামবে না?
- তুমি বড় বেশি চিন্তা কর গিন্নী।
- প্রফেসর হয়ে লোকের পকেট মেরে বেড়াও, চিন্তা করব না? পুলিশ এ বয়সে আড়ংধোলাই দিলে আর বাঁচবে গো?
- বত্রিশ বছর ধরে এই ফাইন আর্ট প্র‍্যাক্টিস করছি। আজ পর্যন্ত শুনেছ যে কোনওদিন ঝামেলায় পড়েছি? আর শোনো, আবারও বলি; আমি পকেটমার নই। আমি শিক্ষক। কলেজে ছেলেপিলেরা সিলেবাস বলতে অজ্ঞান। টিউশনেও সেই রোগ দেখে বীতশ্রদ্ধ হয়ে সে'দিকে ঘেঁষিনি। কেউ শিখতে চায় না মাইরি। আমি রোজ লোকের ঘাড় ধরে তাকে শিখতে বাধ্য করি, শেখার ইচ্ছেটা উস্কে দিই। আর তার বদলে সামান্য ফী নিই। ক্ষতি কী? আমি হলফ করে বলতে পারি আমার পকেটমারিতে কেউ মনমরা হয়ে পড়ে না, বরং পড়ে। জ্ঞানপিপাসা ইজ দ্য ফাইনেস্ট ফর্ম অফ আনন্দ গিন্নী। যে'দিন তোমার পকেট কাটতে পারব, সে'দিন বুঝবে।