Sunday, June 4, 2017
বৃকোদর মল্লিকের নস্যির ডিবে
Thursday, June 1, 2017
ভদ্রেশ্বরের ভাস্কো দা গামা
**
ডেলিপ্যাসেঞ্জারির হ্যাপার ওপর যদি এমন বাজে বকা নিয়ে কেউ ঘাড়ে চেপে বসে তাহলে কার মাথার ঠিক থাকে? বলে কিনা ভাস্কো দা গামা! এদের নাকে ঝামা ঘষা উচিৎ।
প্ল্যাটফর্মে নেমে কাজলের দোকান থেকে একটা ফ্লেক কিনতে গিয়ে সমস্যাটা মালুম হলো স্বদেশ সান্যালের। মানিব্যাগ সাফ। মানিব্যাগটা আছে, তবে ভিতরে খাঁখাঁ। না, একদম ফাঁকা নয়। একটা ছোট চিরকুট রয়েছে।
"গামা সাহেব,
কালিকটে কম নাস্তানাবুদ করেননি। তবে বিশ্বাস করুন, তার জন্যে রাগ পুষে রাখিনি। যেটুকু যা রাগ ছিল, কয়েকটা জন্মে সে'সব ডাইলুট হয়ে গেছে।
মরিচ মশলার জন্য কী খুনোখুনিটাই না করে বসলেন স্যার। তবে হাজার খুন মাফ করে দিই শুধু এই ভেবে যে আপনি এ দেশে লঙ্কা বয়ে এনেছিলেন। সামান্য ক'টা টাকা নিলাম, আপনার জিভের ডগায় সামান্য ঝালানুভূতি ছড়িয়ে দিতে। ডৌরো নদীর জলে ডৌরো পুজো আর কী।
ভালো থাকুন।
(রাগটাগ কম করুন। নাবিকদের অমন চণ্ডালে হাবভাব মানায়, ডেলি প্যাসেঞ্জারদের নয়)
ইতি,
জামোরিন, কালিকট/বৈদ্যবাটি"।
না হেসে থাকতে পারলেন না স্বদেশবাবু। মোবাইলে পর্তুগাল সম্বন্ধে সার্চ করতে করতে বাড়ির দিকে হাঁটা দিলেন ভদ্রলোক। গুবলুর হিস্ট্রি বইটইগুলো বের করে আজ একটু ভাস্কো বাবুর কীর্তিকলাপ সম্বন্ধে খবর নিতে হবে।
***
Saturday, May 27, 2017
মাধ্যমিক
১
- আরে এই যে, দত্তবাবু যে! আসুন আসুন আসুন। খুব ভালো সময়ে এসেছেন। আজকেই আমরা লঞ্চ করলাম আম রাবড়ি।
- রাবড়ি ফর আমজনতা না ম্যাঙ্গো ফ্লেভার?
- আজ্ঞে, ফ্লেভার। ফ্লেভার।
- অ।
- দেই? কিলো তিনেক?
- তিন কিলো?
- আড়াই? নাকি রসোগোল্লাতেই স্টিক করবেন? একশো পিস!
- আমি পাইকারি মেঠাই কিনব কেন?
- আজকের দিনটা আমি খেয়াল রেখেছি। মিষ্টির বাড়তি স্টক মজুত রাখতে সবকটা কর্মচারীকে কাল গোটা রাতের ওভারটাইম দিয়েছি।
- দেখুন, আমি এসেছি চারটে গুজিয়ে নিতে। প্রত্যেক শনিবার যেমন নিই, রিক্সাস্ট্যান্ডের শনিমন্দিরের জন্য। প্লাস দশটাকা দক্ষিণা। কিন্তু ব্যপারটা কী বলুন তো?
- আজ মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরিয়েছে, সকাল থেকে টার্নওভার ডাবল হয়ে গেছে। আপনার মেজছেলে মন্টুও এ'বারে এগজ্যাম দিয়েছে। তাই না?
- মাইরি?
- মানে?
- মাইরি? আজ মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরিয়েছে?
- ইয়ার্কি করছেন স্যার?
- শেষ ইয়ার্কি করেছিলাম নাইন্টি ফাইভে। অফিসের বড়হুজুর মাইনে কাটার হুমকি দিয়েছিলেন বুঝতে না পেরে। সে যাক। আজ মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরিয়েছে মানে নিশ্চিন্দি। তবে ইয়ে, মন্টেটা এ'বার মাধ্যমিক দিয়ে দিল? সেই কবে পড়েছিলাম, টাইম অ্যান্ড টাইড ওয়েটস ফর নান...।
- এই যে আপনার গুজিয়া। আসুন।
২
- হ্যাঁ গো! মন্টের আজ রেজাল্ট বেরিয়েছে?
- বেরোলে বেরিয়েছে, তা'তে তোমার কী?
- এহ হে হে, দেখেছ কাণ্ড! এক্কেবারে গুলিয়ে গেছিল। ডাকো রাস্কেলটাকে। চাবকে দিই।
- ও'মা! চাবকাতে যাবে কেন?
- ওহ্! ভালো নম্বর পেয়েছে? ফার্স্ট ডিভিশন? স্টার? প্রচুর লেটার? বেশ, ঘোষের দোকানে আজই লঞ্চ হয়েছে ফুলকপির রাবড়ি। এইমাত্র জেনে আসলাম। যাই গিয়ে এক কুইন্টাল নিয়ে আসি।
- আমার হাড় না জ্বালালে শান্তি পাও না, তাই না?
৩
- বাবা! তোমায় প্রণাম করা হয়নি।
- আয় আয়। আশীর্বাদ করি তুইও যেন তোর দাদার মত ডাক্তারিতে চান্স পাস।
- বাবা, ইয়ে। মানে। দিদির মত ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। তাই তো?
- ওই হল। আরে আমি তো ভুলেই মেরে দিয়েছিলাম। সেই ভোর ভোর ডিউটিতে বেরিয়ে যাওয়া, মাথায় খালি ছ'টা ছাপ্পান্নর লোকালের হুইসল ঘুরপাক খায়। আজ নেহাত ফেরার পথে গুজিয়া নেওয়ার সময়...।
- বাবা! ইঞ্জিনিয়ারিং আমার দ্বারা হবে না বোধ হয়। ইলেভেনে সায়েন্স আমি নিচ্ছি না। আর্টস নেব।
- তবে রে? ফ্যামিলির নাম ডুবোতে চাস? ফক্করবাজি? আর্টস নিবি? আজ তোরই একদিন কি আমারই একদিন।
- অঙ্ক ফিজিক্স আমি ঠিক ম্যানেজ করতে পারব না।
- অঙ্কে কি এমন হাতি ঘোড়া আছে বল? এ প্লাস বি হোল স্কোয়্যার ইজ ইকুয়াল টু এ স্কোয়্যার প্লাস ট্যু এ বি প্লাস বি স্কোয়্যার। জলবৎ। আর ফিজিক্স? ম্যাগনেটিক ফিল্ড। একবার ঢুকে পড়তে পারলেই...।
- বাবা, তোমারও ইয়ে...আর্টস ছিল।
- আমার?
- আর্টস। ব্যাচেলর অফ আর্টস!
- মাইরি?
- আলমারির ফোলিও ব্যাগে তোমার মার্কশিট রাখা আছে। আমি দেখেছি।
- বলিস কী! তাহলে তো সন্তুটাই দেখছি ফ্যামিলির ব্ল্যাকশিপ। কোন সাহসে ও ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গেছে?
- সন্তু ক্লাস এইটে। দিদি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে।
- মিতুলটা এমন বিট্রে করল রে! ডাক ওকে।
- ও খড়গপুরে থাকে। হস্টেলে।
- তাই তো রে। মাকে কদ্দিন দেখিনা। কাল তো রোববার, যাবি? দিদির সঙ্গে দেখা করতে?
- দিদি কাল আসছে। ফোন করেছিল।
- মার দিয়া কেল্লা। কাল তিন কিলো পেঁপের রাবড়ি আনব।
- পেঁপের? রাবড়ি? হয় নাকি? ধুস!
- বিপুলা এ ব্যারাকপুরের কতটুকু জানিস তুই? ঘোষবাবুর মেঠাইরের দোকানটা একটা অত্যাধুনিক ল্যাবোরেটরি। অসাধ্য সাধন হতে পারে সে'খানে।
- ও।
- মন্টে।
- কিছু বলবে? বাবা?
- সরি।
- এ মা! কেন?
- এই। ভুলে যাই। তুই জানিস তো। আমি বরাবরই...।
- জানি! আচ্ছা বাবা, তুমি শনিবারের গুজিয়া কেনার কথা কোনওদিন ভোলো না, তাই না?
- কারণ ভুতোকে মেঠাই খাওয়ানোর আর কেউ নেই।
- ভুতো?
- বিশুর ছেলে। যে রিক্সা চালায়, সেই বিশু। এত্তটুকুন বয়স ভুতোর। মা নেই। বাপও তো সেই উড়ো খই গোবিন্দায় নমঃ। ছেলেটা শনি মন্দিরের চাতালেই পড়ে থাকে গোটাদিন। সে ব্যাটা ওই সামান্য গুজিয়ার ছোট বাক্স দেখলে যা লাফালাফি শুরু করে। আর দিই দশটাকা, ঘুগনি পাউরুটি কেনে ব্যাটা। কোনওদিন আবার পুরিসবজি। বা দিলুর দোকান থেকে মামলেট।
- হেহ হে। তুমি লাজওয়াব বাবা।
- বলছিস?
- একশো বার।
- যাক, ডাক্তারিতে চান্স পেয়ে নিশ্চিন্ত করলি। আজকাল যা মেডিক্যাল খরচ বেড়েছে রে বাপ।
- বাবা, আমি মাধ্যমিক পাশ করেছি।
- ওহ হো! সরি। মাধ্যমিক। রাইট। যাক, সোজা সায়েন্স নিয়ে বসে যাবি।
- আর্টস!
- আমার ছেলে হয়ে তুই আর্টা নিবি রে ব্যাটা?
- বেশ। আজ শুতে যাই?
- অফ কোর্স। গুড নাইট।
- আমার একটা ক্রিকেট ব্যাট ভাবছি তোমার ভুতোকে দিয়ে দেব।
- তুই লাজওয়াব মন্টে। লাজওয়াব।
Friday, May 26, 2017
হিমসাগর
মামাবাড়ির পিছনের দিকে আধ-জংলি বাগান। জামরুল, গন্ধরাজ, টগর, জবা, সুপুরি, কাঁঠাল গাছে ঢাকা। নয়নতারার ঝোপ আর আগাছাও। গরমের দুপুরেও ছায়াছায়া ভালো লাগা। আর সেসে সমস্ত ছাপিয়ে হিমসাগরের গাছ। দু'মরসুমে একবার ফল ধরত গাছে, তখন নুয়ে পড়ত। সে অঞ্চলে হাওয়ার সুবাস পালটে যেত।
তখন বেশ ছোট, আমের প্রতি হাভাতেপনায় রাশটানার দরকার ছিল না। আমে কামড় দিয়ে লাফিয়ে উঠেছি "খুউউউব মিষ্টি"! দাদু শিখিয়েছিল "কন্যোসারের ভাষায় বলো। খুব মিষ্টির বদলে বলো সুমিষ্ট"।
মাঝেমধ্যেই হনুমানের উপদ্রবে গাছের আম নষ্ট হত, বিশেষত দুপুরের দিকে। ধুপধাপ শব্দ শুনলেই দিদা ছুটে যেত ছড়ি হাতে, পিছুপিছু আমি। ছড়ি ঘুরিয়ে খানিকক্ষণ তম্বি করলেই তারা লেজ গুটিয়ে বা না গুটিয়ে পালাতো। একদিন হয়েছে কী, দিদার ছড়ি আর হুঙ্কারে ডাল ছেড়ে তারা যখন শেষ স্টেশনে লোকাল খালি করার মেজাজে দৌড় লাগালে, তখন এক পুঁচকে এত্তটুকুন খোকাহনু ডাল ফসকে ধপাস। চোট তেমন পায়নি, কারণ পরক্ষণেই মায়ের হাত ধরে দুদ্দাড় ভেগে পড়ায় কোনও ঢিলেমি ছিল না। কিন্তু খোকাহনুর হাতের টসটসে হিমসাগরটা ছিটকে মাটিতে গড়িয়ে গেছিল, দিদা নাকি দেখতে পেরেছিল যে খোকা মায়ের হাত ধরে পালানোর সময় সকরুণ চোখে সেই মনমোহিনী আমের দিকে তাকিয়েছিল।
আচমকা দিদার সে কি হাহাকার! "ওইটুকুন বাছা আমার একটু আম খেতে চেয়েছিল"। সে আম হাতে দিদা "আয় আয়" বলে বেদম ডাকাডাকি করেছিল কিন্তু কুকুর ডাকা চুকচুক আহ্বানে হনুমানের গোঁসা কাটে না। শেষে আম গাছ ঘেঁষা পাঁচিলে খান কয়েক আম সাজিয়ে রেখে এসেছিল দিদা, যদি খোকার বাপ অন্তত সাহস করে ফেরত এসে খোকার জন্য খান দুয়েক আম নিয়ে যেতে পারে।
সে হিমসাগর গাছ সাফ হয়ে এখন গ্যারেজ। বাকি গাছপালার জঞ্জাল সরে গিয়ে বাঁধানো চাতাল। দিদা দাদু এখন সুমিষ্টঘ্রাণ স্মৃতি। আমি ব্যর্থ কন্যোসার।
Monday, May 22, 2017
ক্যালক্যাটা বিভ্রাট
- দাদা, আমায় বাঁচান।
- ম্যাডাম! কলার না ছাড়লে বাঁচাবো কী করে?
- সরি। সরি। খুব লেগেছে?
- টুঁটি টনটন করছে। তবে ইট ইজ ওকে।
- আমায় বাঁচান প্লীজ।
- আমি ইয়ে...আমি তো পুলিশ! ডাক্তার তো নই।
- ডাক্তার পারবে না পুলিশদাদা, ডাক্তারের ক্ষমতায় কুলোবে না। ওই হারামজাদার জন্যে আজ আমার এই দশা!
- ওই...ওই লোকটা? দাড়িওলা? ওই বাজে মেকআপ করা লোকটা? আমি ভাবলাম আপনারা দু'জনেই থিয়েটার আর্টিস্ট। আপনি হিরোইন। ও ব্যাটা সাইডরোল।
- এ'সব থিয়েটার থিয়েটার কী করছেন? বাঁচান আমায়!
- ওই রাস্কেলটা আপনাকে টীজ করেছে? দেব লকআপে ঢুকিয়ে দু'ঘা মালটাকে?
- ধুস। ও'সব কিছু না।
- তাহলে? যাক গে, আমি রিপোর্ট লিখে নিচ্ছি। আগে নাম বলুন আপনার।
- সীতা।
- সীতা কী?
- সীতা।
- আই সী। সারনেম ইউজ করেন না। হাজব্যান্ডের নাম?
- আজ্ঞে?
- স্বামীর নাম?
- রামচন্দ্র।
- বাহ্। রাজযোটক মাইরি। এ'বারে বলুন। কেসটা কী?
- ব্যাপারটা তেমন কিছুই না। এই লোকটা আমায় এই বিশ্রী জায়গায় নিয়ে চলে এসেছে।
- আপনার বাড়ি কোথায়?
- অযোধ্যা।
- ইয়ার্কি হচ্ছে?
- জনকরাজার মেয়ে আমি দাদা। গলা কাটলেও মিথ্যে বেরোবে না।
- যাহ শালা। অদ্ভুত চাপ। আপনি সীতা? অযোধ্যার রামের সীতা? তাহলে এ'খানে কী করছেন?
- দিব্যি লঙ্কায় রামচন্দ্র এসে পৌঁছলেন। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। ও মা! মিনসের আবার মতিভ্রম। বলে কিনা অগ্নিপরীক্ষা দিতে হবে। বাধ্য হয়ে অগ্নিদেবকে, মানে ওই ব্যাটাচ্ছেলেকে ডাকলাম। অল্প কমিশনে আগুনে প্রবেশ করিয়ে দেবার কথা। বদ ব্যাটাছেলে কলির মে মাসের কলকাতায় এনে বলে এই হল অগ্নিপ্রবেশ। দাদা গো, আমায় বাঁচান। রামচন্দ্র অগ্নিপরীক্ষা বলেছিলেন, উনি এতটা পাষাণ নন যে এই গা ভাঁপানো গরম কড়াইতে আমায় পাঠাবেন। আমায় বাঁচান স্যার, আমায় এই কলকাতা থেকে বের করুন।