Sunday, June 4, 2017

বৃকোদর মল্লিকের নস্যির ডিবে


-   এক্সক্যিউজ মী। আপনার টেবিলে বসতে পারি? নাকি কাউকে এক্সপেক্ট করছেন?

-   বসুন।

-   আপনিই অরূপ সান্যাল তো? ফেমাস ঘোস্ট স্টোরি রাইটার।

-   ফেমাস বলাটা বাড়াবাড়ি হবে। তবে, ভূতের গল্প কিছু লিখেছি বটে।

-   দাঁড়ান, আমার পরিচয়টা দেওয়ার আগে একটা কফি বলে নিই। ওয়েটার! এইদিকে। দু’টো কফি বলি? আপনার পেয়ালাটা তো প্রায় শেষের দিকে...।

-   ব্ল্যাক।

-   দু’টো ব্ল্যাক কফি। যাক। এ’বারে আমার পরিচয়টা দিয়ে নি, আমি বৃকোদর মল্লিক।

-   বৃকোদর মল্লিক? নামটা যেন...।

-   চেনা চেনা ঠেকাটা অস্বাভাবিক নয়। বিশেষত আপনার পুরনো কলকাতার ব্যাপারে আগ্রহ আছে যখন, নামটা চেনা ঠেকাই উচিৎ।

-   চেনা চেনা ঠেকছে কিন্তু ঠিক...।

-   পেটে আসছে কিন্তু মনে পড়ছে না। বুঝেছি। চার্নক সাহেবের কথা মনে করুন।

-   ওহ্‌। মনে পড়েছে। চার্নক সুতনুটিতে এসে কিছু মাটির বাড়ি তৈরি করেন সাময়িক বসবাসের জন্য এবং ফিরে যান হুগলীতে। পরে নবাবের হুকুমকে কাঁচকলা দেখিয়ে যখন হুগলী চন্দননগর জ্বালিয়ে পালিয়ে আসেন এ’খানে তখন দেখেন যে কেউ সেই মাটির বাড়িগুলো ভেঙে ফেলেছে। জানা যায় সে’টা বৃকোদর মল্লিক নামে কেউ ভেঙেছে।

-   করেক্ট। শুধু ভাঙেনি, মাটির সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছিল।

-   তবে সে’টা ভুল তথ্য। ঘটনাটা বরখুরদার মালিক পদের কোনও মোগল কর্মচারীর কাজ। ইতিহাসে সে’সব গুলিয়ে ফেলে বৃকোদর মল্লিক তৈরি করেছে। আপনার বাপমা যদি সেই বৃকোদর মল্লিকের কথা ভেবে আপনার নাম রেখে থাকেন, তাহলে ভুল করেছেন।

-   আসুন। কফি।

-   থ্যাঙ্কস ফর দ্য কফি।

-   কফিটা খাওয়াচ্ছেন কিন্তু আপনি। আমি সেধে এসে টেবিলে বসলাম বটে, তবে আমার দাম দেওয়ার উপায় নেই।

-   আই সী।

-   অভদ্র ভাববেন না প্লীজ। একান্তই উপায় নেই।

-   ঠিক আছে।

-   তবে আপনার সঙ্গে আলাপ করাটা দরকার ছিল জানেন। কারণটা ওই, আপনি ভূতের গল্প লেখেন বলে।

-   কারণটা শুনি।

-   সরি টু ডিস্যাপয়েন্ট ইউ স্যার। বরখুরদার মল্লিকের থিওরিটা সঠিক নয়। সব কিছু ধান কাল কাটা থেকে ক্যালক্যাটা হয় না।

-   আপনি নিশ্চিত হয়ে জানলেন কী করে?

-   সুতানুটি তখন জলাজঙ্গল। সে’খানের এক দু’টো মাটির বাড়ি ধসিয়ে নবাবের কি মোক্ষলাভ হবে বলুন! আর ওই কুটীর বানিয়ে নেওয়াই বা এমন কী আর চ্যালেঞ্জ। মনে রাখবেন তখন কোম্পানি টপাটপ ফ্যাক্টরি, দুর্গ বা জেটি বানিয়ে চলেছে। জনশ্রুতি যে আতশকাচের তাপে জাহাজ থেকে চন্দননগরের বাজার জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন চার্নক। তেমন তোপ মানুষের দু’একটা মাটির বাড়ি রইল না গেল, তা’তে কী এসে যায়?

-   বেশ। তা’তে কী হল? আপনার বক্তব্যটা কী?

-   বক্তব্য এই যে আমি যে সে বৃকোদর মল্লিক নই স্যার। আমি সেই বৃকোদর মল্লিক।

-   আচ্ছা। আপনার কফি শেষ হলে উঠতে পারেন।

-   বড় আশা করে আপনার কাছে এসেছি।

-   অদ্ভুতুড়ে গল্প ফাঁদতে?

-   ভূতের গল্পের লেখক আপনি। আমি বড় আশা করে এসেছি যে আপনি অবিশ্বাস দিয়ে শুরু করবেন না।

-   আপনার পোশাক ভাষা, এগুলো কোনওটাই কি ১৬৮০ সালকে মনে করিয়ে দিচ্ছে?

-   ভূত বলে কি মূর্খ হয়ে থাকব স্যার? ক্রমাগত শিখেছি। নিজেকে আপডেট করেছি।

-   আমার কপালেই যত জোটে।

-   প্লীজ শুনুন। একবার আমায় অন্তত বলতে সুযোগ দিন। তারপর না হয়...। আর কিছু না হোক, গল্পের জব্বর প্লট পাবেন।

-   বলে যান বৃকোদরবাবু। সে নামেই ডাকব তো আপনাকে?

-   হেহ্‌। থ্যাঙ্ক ইউ। আর এক কাপ কফি বলি? এই ওয়েটার! অউর দো কাপ। ব্ল্যাক।

-   এ’বার বলুন।

-   কিছু পর্তুগীজ তখনও রয়ে গেছিল ব্যান্ডেল চার্চের আশেপাশে। অল্প সংখ্যক সৈন্যসামন্তও ছিল, সে ছোট্ট সেনাদলেই আমি ছিলাম। কিন্তু তারপর তাঁদের অবস্থা আরও পড়ে যাওয়ায় ইংরেজদের কুঠিতে চলে যাই। পর্তুগীজদের সঙ্গে থাকার সময় দুধ কেটে ছানা করে মেঠাই বানানোর কিছু প্রক্রিয়া আমি শিখেছিলাম ফিরিঙ্গি রাঁধুনির থেকে। রান্নাবান্নার দিকে আমার বিশেষ ইন্টারেস্ট ছিল বরাবরই।

-   প্লীজ বলবেন না এ’বার যে আপনিই রসগোল্লা আবিষ্কার করেছিলেন।

-   আপনি ভীষণ শার্প স্যার।

-   খুব প্রেডিক্টেবল গাঁজা হয়ে যাচ্ছে।

-   আমার কাছে প্রমাণ আছে স্যার। কথাগুলো মিথ্যে যে নয় তার প্রমাণ।

-   বেশ। কফি যখন আসছেই, বলে যান।

-   তবে আবিষ্কারটা ঠিক ব্যান্ডেলে থাকার সময় হয়নি। সে’খান থেকে হুগলীর ইংরেজ কুঠিতে যাই। সে’খানে কিছুদিন কাজ করার পর আমায় বদলি করে দেওয়া হয় বালেশ্বরে। সে’খানে সাহেবদের রান্নার ঠাকুর অখাদ্য সব রান্না করত, বাধ্য হয়ে নিজেকেই মাঝে মধ্যে ঢুঁ মারতে হত হেঁসেলে। তখনই এক্সপেরিমেন্ট শুরু। আধুনিক ভাষায় যাকে বলে স্যুইট টুথ, সে’টা আমার গত সাড়ে তিনশো বছর ধরে আছে। কাজেই পড়ে রইলাম মেঠাই নিয়েই। বালেশ্বরে কিছুদিন বেশি হাত পা ছড়িয়ে ছিলাম। সময়ও ছিল অঢেল। তখনই রসগোল্লা আবিষ্কারটা করে ফেলি। তবে স্পঞ্জ নয়। সে’টা পরে কলকাতাতেই...।  

-   আপনার কথা অনুযায়ী রসগোল্লার আবিষ্কার উড়িষ্যাতেই হয়েছে।

-   কিন্তু করেছে একজন বাঙালি।

-   রাইট। বেশ। সো ফার সো গুড। এরপর? সমস্যাটা কোথায়? আপনার আমাকে দরকার হল কেন!

-   এইটার জন্য।

-   এ’টা কী ।

-   কী মনে হচ্ছে?

-   নস্যির কৌটো।

-   খাঁটি সোনার।

-   সোনারই তো মনে হচ্ছে। পুরনোও বটে। যাক। এর ভিতরে নস্যি রয়েছে?

-   নস্যি নেই। তবে যে’টা আছে সে’টাই প্রমাণ স্যার। সে’টাই তো প্রমাণ। যে আমিই বৃকোদর মল্লিক। আমিই ভূত।

-   বলে যান। শুনছি।

-   একবার বালেশ্বরের কুঠিতে এসে চার্নক সাহেব আমার হাতের তৈরি রসগোল্লা খেয়ে মুগ্ধ হন। এবং এতটাই আহ্লাদিত বোধ করেন যে আমায় বালেশ্বর থেকে উঠিয়ে ওয়াপিস নিয়ে যান হুগলী। এরপর প্রথমবার সুতানুটিতে আসেন সম্পূর্ণ অন্য এক বদ ফিকির নিয়ে। উনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে ফাঁকি দিয়ে নতুন কারখানা গড়তে চেয়েছিলেন। নতুন সাম্রাজ্য। রসগোল্লার কারখানা। ওনার ধারণা ছিল রসগোল্লার ফর্মুলা হাতিয়ে গোটা পৃথিবীর মেঠাই মার্কেট তিনি কব্জা করবেন। সুতানুটি হবে রসগোল্লা ক্যাপিটাল। জাহাজে করে হাজারে হাজারে লোক হুগলীতে তরী ভেড়াবে রসগোল্লা আস্বাদন করতে। শুধু...শুধু তাঁর বুদ্ধিতে একটাই ফাঁক ছিল...।

-   কী’রকম?

-   তিনি আমার সঙ্গে রসগোল্লা সাম্রাজ্যের মুনাফা ভাগ করতে অস্বীকার করেন। কালা আদমি বলে খিস্তি করতেও ছাড়েননি। অথচ ভদ্রলোকের পুরো বিজনেস আইডিয়াটাই আমার আবিষ্কারকে ঘিরে। কী খলিফা আদমি ভাবুন। হাড় বজ্জাত।

-   তারপর?

-   জোবের একটা মস্ত অসুবিধে ছিল। আমায় জনসমক্ষে কড়কাতে পারত না কারণ ওঁর ফন্দীর কথা কোম্পানি বাহাদুরের কানে পৌঁছলেই ওর চাকরী নট হত, বন্দী হওয়ার আশ্চর্য ছিল না। অথচ আমার থেকে ফর্মুলা হাতাতেও পারছিল না। আমার মুশকিল হয়েছিল অন্য জায়গায়। বালেশ্বরে শুরুর দিকে একবার বলে ফেলেছিলাম আমার রোজনামচার কথা। অর্থাৎ ডায়েরি। এও বলেছিলাম রসগোল্লার রেসীপি সে’খানেই আমি লিখে রেখেছি। হুগলীতে ফিরে জোব সাহেব ঘ্যানঘ্যান আরম্ভ করল ওই ডায়েরী আমায় দাও। আমিও স্পীকটি নট। অবশেষে ব্যাটাচ্ছেলে উপায়ন্তর না দেখে বাজে অছিলায় কিছু সৈন্য নিয়ে সুতানুটিতে এসে হাজির হলে। সঙ্গে আমিও, সমস্ত মালপত্তর সমেত। সুতানুটিতে ল্যান্ড করে বাবাজীর আসল মূর্তি প্রকাশ পেল। মাটির ছ’টা বাড়ি তৈরি হয়েছিল, একটায় সে নিজে থাকত। চারটেয় বাকি সৈন্যরা, আর অন্যটায় আমাকে সে বন্দী করলে। আর সে কী অকথ্য অত্যাচার! আমিও গোঁ ধরে রইলাম, জান কবুল কিন্তু রসগোল্লার রেসীপি আমি ওই সাহেবদের হাতে তুলে দেব না। এর মধ্যে ফরমান আসায় তাঁকে সুতানুটি ত্যাগ করতে হয়। ব্যাটাচ্ছেলে আমায় সুতানুটির সেই শিকলে বেঁধে রেখে চলে চায়। যাওয়ার আগে বলে যায় “তুই মর ব্যাটা কালা আদমি। কিন্তু তোর মালপত্তরের মধ্যেই কোথাও তোর ডায়েরি আছে তা আমি বেশ জানি। এখানে যখন পেলাম না, তখন নিশ্চয়ই হুগলী বা বালেশ্বরে আছে। আমি চললাম, তুই মর”।

-   আরিব্বাস। ড্রামাটিক। তারপর?

-   তারপর আবার কী! অত্যাচারে আধমরা হয়েই ছিলাম। দু’হপ্তার মধ্যেই মারা গেলাম। মারা গিয়ে সুবিধে এই হলো যে শিকলে আরা বাঁধা পড়ে থাকতে হল না। সোজা সাপটা বেরিয়ে এসে ছ’টা কুটির জ্বালিয়ে খাক করে দিলাম।

-   আপনার রসগোল্লার রেসীপি লেখা ডায়েরি?

-   সে জিনিসের খোঁজ চার্নক সাহেব বালেশ্বর আর হুগলীর কুঠিতে আমার ঘর তন্নতন্ন করে খুঁজেও পান নি। বেশ কিছুদিন পর সাহেবের খেয়াল হয় একটা ছোট ব্যাপারে ভুল করে ফেলেছেন তিনি। আমি সবে নস্যি নেওয়ার অভ্যাস ধরেছিলাম। নস্যি নেওয়ার চলটাই তখন এ দেশে নতুন। এত খোঁজ করেও, চার্নক সাহেবের কোনোদিন আমার নস্যির ডিবেটার প্রতি সন্দেহ যায়নি। অথচ বন্দীদশায় এ ডিবে থেকে নস্যি না নিলেও এ ডিবে আমার কোমরে বাঁধা ছিল। দুয়ে দুয়ে চার করতে সামান্য সময় লেগেছিল সাহেবের।

-   নস্যির ডিবের মধ্যে ডায়েরি? গুলের সীমা থাকবে না একটা?

-   টানা এক বছরের রোজ নামচা রয়েছে এই নস্যির ডিবের ভিতরে স্যার। কী ভাবে, সে প্রসঙ্গে আসছি। চার্নক সাহেবের যখন টনক নড়ল তখন তিনি হুগলী ছাড়ার অছিলা খুঁজতে লাগলেন। অকারণ যুদ্ধবাজি করে সৈন্যসামন্ত সমেত রওনা দিলেন ‘বালেশ্বর চললুম’ বলে। কিন্তু ব্যাটার প্রাথমিক টার্গেট ছিল সুতানুটি। সে’খানে পৌঁছে আমার লাশ থেকে নস্যির ডিবেটা নিতে পারলেই রসগোল্লার রেসীপি তাঁর হাতের মুঠোয়, এ বিষয়ে তিনি নিশ্চিত। আর একবার সেই রেসীপি হাতে এলে কোম্পানিকে কাঁচকলা দেখিয়ে নিশ্চিন্তে নিজের রসগোল্লা সাম্রাজ্য স্থাপন করতে কোনও অসুবিধেই হবে না। কিন্তু যাবতীয় উত্তেজনা নিয়ে সাহেব সুতানুটিতে নেমে দেখেন কোথায় কী? সমস্ত ঘরদোর মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। স্থানীয় লোকেরাই বললে যে বৃকোদর মল্লিকের ভূতই এ’সব করেছে। চার্নকের ব্যাটার সে কী মন খারাপ।

-   তা এই সেই নস্যির দিবে?

-   আজ্ঞে।

-   তা এ’টা এদ্দিন কোথায় রাখছিল?

-   মাইরি, বিশ্বাস করবেন? ওই অভিশপ্ত নস্যির দিবে আমি কারুর হাতে দিতে চাইনি। গভীর জঙ্গল দেখে একটা জায়গার মাটির অনেক নীচে পুঁতে এসেছিলাম। অবিশ্যি রেসীপিটা হারিয়ে যেতে দিইনি। সোজা গিয়ে কয়েকজন ময়রার স্বপ্নে সে রেসীপি বলে দিয়ে এসেছিলাম। ভূত হওয়ার অ্যাডভান্টেজ তো কম নয় বলুন।

-   তা বটে।

-   কিন্তু কী কাণ্ড ভাবুন। নস্টালজিয়ার ঠেলায় অনেকদিন পর খেয়াল হল নস্যির ডিবেটা খুঁজে বার করি কিন্তু কিছুতেই সে জায়গা খুঁজে পাই না। সাড়ে তিনশো বছর আগের ঘটনা তো, তার মধ্যে গ্রামটা এত পালটে গেল। অবশেষে বছর খানেক খুঁজে জায়গাটা চিনতে পেরে আমার মাথায় হাত। ভাবতে পারেন, নস্যির ডিবে যে’খানে পুঁতে এসেছিলাম, জোব চার্নককে সে’খানেই গোঁড় দেওয়া হয়েছে? অ্যামেজিং না?

-   বটে! কিন্তু এই নস্যির কৌটের মধ্যে রেসিপি...!

-   রান্না ছাড়াও আমার একটা বিশেষ গুণ ছিল লেখক মহাশয়। আমি মসলিনের ওপর আঁকতে এবং লিখতে পারতাম।

-   মসলিন?

-   সে’সময়ে বাংলার মসলিনের খ্যাতি বিশ্বজোড়া। দাম আকাশ ছোঁয়া। আর সে মসলিন যে কী জিনিস মশাই। কেউ চার হাজার টাকা দিয়ে এক খণ্ড মসলিন কিনেছে সে সময়, এমন গল্পও শোনা যেত। পাশাপাশি ভাবুন ফরাসীরা গোটা চন্দননগর কিনেছিল চল্লিশ হাজার টাকায়। আরবিরা সে মসলিনকে বলত আর-ই-রওয়ান, অর্থাৎ চলন্ত জলধারা। সেই চলন্ত জলধারার ওপর আমি আমার রোজনামচা লিখতাম। এই নস্যির ডিবেতে প্রায় ষাট গজ মসলিন রয়েছে, আর সেই ষাট গজের ওজন বারো আউন্সের বেশি নয়। সেই কাপড়ের ওপর আমার বালেশ্বরের একবছরের ডায়েরী। এই নস্যির ডিবেটা কাকে দেব ভেবে পাচ্ছিলাম না। সবাই তো ধান্দাবাজ। আপনি সজ্জন মানুষ। আপনাকে দিয়ে যেতে চাই। ডিবেটা খুলে দেখারও সাহস হয়নি। আর পুরনো কাসুন্দি ঘেঁটে কী হবে বলুন। থ্যাঙ্ক ইউ ফর দ্য কফি। আসি।  

ভদ্রলোক ভূত হোক বা না হোক, আশ্চর্যজনক ভাবে কফি হাউসের ভিড়ে মিশে গিয়ে অবাক করে দিলে অরূপ সান্যালকে। নস্যির ডিবেটা অবশ্য বাড়ি ফেরার আগে খুলতে ইচ্ছে হয়নি তাঁর, তবে ডিবেটা যে খাঁটি সোনার সে’টা স্পষ্ট। বাড়ি ফেরার পথে মিনিবাসে খবরের কাগজের পাতা ওলটানোর সময় একটা ছোট্ট খবর দেখতে পেয়ে অল্প বিষম খেলেন সান্যালবাবু; কে বা কারা যেন গত রাত্রে চার্নকের সমাধি খুঁড়েছে, কিন্তু বিশেষ কিছু ক্ষতি করেনি। কড়া পাহারা থাকা সত্যেও এমন ঘটনাকে প্রায় ভৌতিক মনে করছেন কর্তৃপক্ষ।

বাড়ি ফিরেই হুড়মুড়িয়ে শোওয়ার ঘরে গিয়ে দরজায় খিল এঁটে সামান্য নিঃশ্বাস নিলেন অরূপ সান্যাল। নস্যির ডিবেটা খুলে আরও ঘাবড়ে যেতে হল। মসলিনের কোনও চিহ্ন নেই। আদ্যি কালের ইংরেজিতে লেখা ছোট্ট চিরকুট। কাগজটাও বহু পুরনো। যার তর্জমা করলে এই দাঁড়ায়;

“কালা গবেটটার মনে এই ছিল? যাক! আমি যখন বেঁচে থাকতে অমৃতের রেসীপি পাইনি তখন আর কাউকে পেতে দেব না। এই মসলিন আমি আমার বৌয়ের মড়ার গায়ে জড়িয়ে দিলাম। এ দেশে দু’টো ভালোবাসাই খুঁজে পেয়েছিলাম, সে দু’জন একে অপরকে জড়িয়ে থাকুক”।   






Thursday, June 1, 2017

ভদ্রেশ্বরের ভাস্কো দা গামা

- শুনুন।
- আমায় বলছেন?
- হ্যাঁ। আপনি কি ব্যান্ডেল পর্যন্ত?
- নাহ্, ভদ্রেশ্বর। আপনি কি বৈদ্যবাটি? প্ল্যাটফর্ম এদিকে পড়বে? সরে দাঁড়াব?
- বৈদ্যবাটিটা ঠিক ধরেছেন। তবে সাফিশিয়েন্ট জায়গা আছে। গলে যাব। সে জন্য আপনাকে ডাকিনি। আসলে আপনার দাড়িটা...বুঝলেন...আর তার সঙ্গে ওই লম্বাটে মুখের গঠনটা...প্লাস গায়ের রঙটায় যে রোদ পোড়া তামাটে ব্যাপারটা রয়েছে সে'টারও ইনফ্লুয়েন্স আছে খানিকটা...।
- তা'তে কী? দাড়ি, লম্বা মুখ, তামাটে রঙ, তা'তে কী এসে গেল?
- আপনাকে অবিকল ভাস্কো দা গামার মত দেখতে।
- ভাস্কো দা গামা?
- দ্য গ্রেট পোর্তুগিজ এক্সপ্লোরার। দুঃসাহসী এবং খুনে মেজাজ সম্পন্ন।
- আপনি জানেন যে ইতিহাসের বইতে ভাস্কো দা গামার যে'সব ছবি রয়েছে তার সবই কল্পিত? ভালো করে চেয়ে দেখবেন, শাজাহানের চেহারাও একই স্টাইলে আঁকা রয়েছে।
- আমাদের দেশে হিস্ট্রি বলে তো রাবিশ গেলানো হয়। সে'সব আনইম্যাজিনেটিভ বইকে বেস করে অতবড় একটা কথা বলে ফেলব ভেবেছেন?
- তবে?
- থাক।
- এ কী! থাকবে কেন?
- না থাক। বাদ দিন।
- আরে বলুন না। বৈদ্যবাটি ঢুকছে।
- আমি গামা সাহেবকে দেখেছি।
- ওহ। আই সী। আপনি বরং মানকুণ্ডুতে নামুন।

**

ডেলিপ্যাসেঞ্জারির হ্যাপার ওপর যদি এমন বাজে বকা নিয়ে কেউ ঘাড়ে চেপে বসে তাহলে কার মাথার ঠিক থাকে? বলে কিনা ভাস্কো দা গামা! এদের নাকে ঝামা ঘষা উচিৎ।

প্ল্যাটফর্মে নেমে কাজলের দোকান থেকে একটা ফ্লেক কিনতে গিয়ে সমস্যাটা মালুম হলো স্বদেশ সান্যালের। মানিব্যাগ সাফ। মানিব্যাগটা আছে, তবে ভিতরে খাঁখাঁ। না, একদম ফাঁকা নয়। একটা ছোট চিরকুট রয়েছে।

"গামা সাহেব,

কালিকটে কম নাস্তানাবুদ করেননি। তবে বিশ্বাস করুন, তার জন্যে রাগ পুষে রাখিনি। যেটুকু যা রাগ ছিল, কয়েকটা জন্মে সে'সব ডাইলুট হয়ে গেছে।

মরিচ মশলার জন্য কী খুনোখুনিটাই না করে বসলেন স্যার। তবে হাজার খুন মাফ করে দিই শুধু এই ভেবে যে আপনি এ দেশে লঙ্কা বয়ে এনেছিলেন। সামান্য ক'টা টাকা নিলাম, আপনার জিভের ডগায় সামান্য ঝালানুভূতি ছড়িয়ে দিতে। ডৌরো নদীর জলে ডৌরো পুজো আর কী।

ভালো থাকুন।

(রাগটাগ কম করুন। নাবিকদের অমন চণ্ডালে হাবভাব মানায়, ডেলি প্যাসেঞ্জারদের নয়)

ইতি,

জামোরিন, কালিকট/বৈদ্যবাটি"।

না হেসে থাকতে পারলেন না স্বদেশবাবু। মোবাইলে পর্তুগাল সম্বন্ধে সার্চ করতে করতে বাড়ির দিকে হাঁটা দিলেন ভদ্রলোক। গুবলুর হিস্ট্রি বইটইগুলো বের করে আজ একটু ভাস্কো বাবুর কীর্তিকলাপ সম্বন্ধে খবর নিতে হবে।

***

- হ্যাঁ গো, তুমি কি নিজের নাকখানা কুচিকুচি করে কেটে হরির লুটের মত পাড়ার রাস্তায় ছড়িয়ে না দেওয়া পর্যন্ত থামবে না?
- তুমি বড় বেশি চিন্তা কর গিন্নী।
- প্রফেসর হয়ে লোকের পকেট মেরে বেড়াও, চিন্তা করব না? পুলিশ এ বয়সে আড়ংধোলাই দিলে আর বাঁচবে গো?
- বত্রিশ বছর ধরে এই ফাইন আর্ট প্র‍্যাক্টিস করছি। আজ পর্যন্ত শুনেছ যে কোনওদিন ঝামেলায় পড়েছি? আর শোনো, আবারও বলি; আমি পকেটমার নই। আমি শিক্ষক। কলেজে ছেলেপিলেরা সিলেবাস বলতে অজ্ঞান। টিউশনেও সেই রোগ দেখে বীতশ্রদ্ধ হয়ে সে'দিকে ঘেঁষিনি। কেউ শিখতে চায় না মাইরি। আমি রোজ লোকের ঘাড় ধরে তাকে শিখতে বাধ্য করি, শেখার ইচ্ছেটা উস্কে দিই। আর তার বদলে সামান্য ফী নিই। ক্ষতি কী? আমি হলফ করে বলতে পারি আমার পকেটমারিতে কেউ মনমরা হয়ে পড়ে না, বরং পড়ে। জ্ঞানপিপাসা ইজ দ্য ফাইনেস্ট ফর্ম অফ আনন্দ গিন্নী। যে'দিন তোমার পকেট কাটতে পারব, সে'দিন বুঝবে।

Saturday, May 27, 2017

মাধ্যমিক

- আরে এই যে, দত্তবাবু যে! আসুন আসুন আসুন। খুব ভালো সময়ে এসেছেন। আজকেই আমরা লঞ্চ করলাম আম রাবড়ি।
- রাবড়ি ফর আমজনতা না ম্যাঙ্গো ফ্লেভার?
- আজ্ঞে,  ফ্লেভার। ফ্লেভার।
- অ।
- দেই? কিলো তিনেক?
- তিন কিলো?
- আড়াই? নাকি রসোগোল্লাতেই স্টিক করবেন? একশো পিস!
- আমি পাইকারি মেঠাই কিনব কেন?
- আজকের দিনটা আমি খেয়াল রেখেছি। মিষ্টির বাড়তি স্টক মজুত রাখতে সবকটা কর্মচারীকে কাল গোটা রাতের ওভারটাইম দিয়েছি।
- দেখুন, আমি এসেছি চারটে গুজিয়ে নিতে। প্রত্যেক শনিবার যেমন নিই, রিক্সাস্ট্যান্ডের শনিমন্দিরের জন্য। প্লাস দশটাকা দক্ষিণা। কিন্তু ব্যপারটা কী বলুন তো?
- আজ মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরিয়েছে, সকাল থেকে টার্নওভার ডাবল হয়ে গেছে। আপনার মেজছেলে মন্টুও এ'বারে এগজ্যাম দিয়েছে। তাই না?
- মাইরি?
- মানে?
- মাইরি? আজ মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরিয়েছে?
- ইয়ার্কি করছেন স্যার?
- শেষ ইয়ার্কি করেছিলাম নাইন্টি ফাইভে। অফিসের বড়হুজুর মাইনে কাটার হুমকি দিয়েছিলেন বুঝতে না পেরে। সে যাক। আজ মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরিয়েছে মানে নিশ্চিন্দি। তবে ইয়ে, মন্টেটা এ'বার মাধ্যমিক দিয়ে দিল? সেই কবে পড়েছিলাম, টাইম অ্যান্ড টাইড ওয়েটস ফর নান...।
- এই যে আপনার গুজিয়া। আসুন।

- হ্যাঁ গো! মন্টের আজ রেজাল্ট বেরিয়েছে?
- বেরোলে বেরিয়েছে, তা'তে তোমার কী?
- এহ হে হে, দেখেছ কাণ্ড! এক্কেবারে গুলিয়ে গেছিল। ডাকো রাস্কেলটাকে। চাবকে দিই।
- ও'মা! চাবকাতে যাবে কেন?
- ওহ্! ভালো নম্বর পেয়েছে? ফার্স্ট ডিভিশন? স্টার? প্রচুর লেটার? বেশ, ঘোষের দোকানে আজই লঞ্চ হয়েছে ফুলকপির রাবড়ি। এইমাত্র জেনে আসলাম। যাই গিয়ে এক কুইন্টাল নিয়ে আসি।
- আমার হাড় না জ্বালালে শান্তি পাও না, তাই না?

- বাবা! তোমায় প্রণাম করা হয়নি।
- আয় আয়। আশীর্বাদ করি তুইও যেন তোর দাদার মত ডাক্তারিতে চান্স পাস।
- বাবা, ইয়ে। মানে। দিদির মত ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। তাই তো?
- ওই হল। আরে আমি তো ভুলেই মেরে দিয়েছিলাম। সেই ভোর ভোর ডিউটিতে বেরিয়ে যাওয়া, মাথায় খালি ছ'টা ছাপ্পান্নর লোকালের হুইসল ঘুরপাক খায়। আজ নেহাত ফেরার পথে গুজিয়া নেওয়ার সময়...।
- বাবা! ইঞ্জিনিয়ারিং আমার দ্বারা হবে না বোধ হয়। ইলেভেনে সায়েন্স আমি নিচ্ছি না। আর্টস নেব।
- তবে রে? ফ্যামিলির নাম ডুবোতে চাস? ফক্করবাজি? আর্টস নিবি? আজ তোরই একদিন কি আমারই একদিন।
- অঙ্ক ফিজিক্স আমি ঠিক ম্যানেজ করতে পারব না।
- অঙ্কে কি এমন হাতি ঘোড়া আছে বল? এ প্লাস বি হোল স্কোয়্যার ইজ ইকুয়াল টু এ স্কোয়্যার প্লাস ট্যু এ বি প্লাস বি স্কোয়্যার। জলবৎ। আর ফিজিক্স? ম্যাগনেটিক ফিল্ড। একবার ঢুকে পড়তে পারলেই...।
- বাবা, তোমারও ইয়ে...আর্টস ছিল।
- আমার?
- আর্টস। ব্যাচেলর অফ আর্টস!
- মাইরি?
- আলমারির ফোলিও ব্যাগে তোমার মার্কশিট রাখা আছে। আমি দেখেছি।
- বলিস কী! তাহলে তো সন্তুটাই দেখছি ফ্যামিলির ব্ল্যাকশিপ। কোন সাহসে ও ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গেছে?
- সন্তু ক্লাস এইটে। দিদি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে।
- মিতুলটা এমন বিট্রে করল রে! ডাক ওকে।
- ও খড়গপুরে থাকে। হস্টেলে।
- তাই তো রে। মাকে কদ্দিন দেখিনা। কাল তো রোববার, যাবি? দিদির সঙ্গে দেখা করতে?
- দিদি কাল আসছে। ফোন করেছিল।
- মার দিয়া কেল্লা। কাল তিন কিলো পেঁপের রাবড়ি আনব।
- পেঁপের? রাবড়ি? হয় নাকি? ধুস!
- বিপুলা এ ব্যারাকপুরের কতটুকু জানিস তুই? ঘোষবাবুর মেঠাইরের দোকানটা একটা অত্যাধুনিক ল্যাবোরেটরি। অসাধ্য সাধন হতে পারে সে'খানে।
- ও।
- মন্টে।
- কিছু বলবে? বাবা?
- সরি।
- এ মা! কেন?
- এই। ভুলে যাই। তুই জানিস তো। আমি বরাবরই...।
- জানি! আচ্ছা বাবা, তুমি শনিবারের গুজিয়া কেনার কথা কোনওদিন ভোলো না, তাই না?
- কারণ ভুতোকে মেঠাই খাওয়ানোর আর কেউ নেই।
- ভুতো?
- বিশুর ছেলে। যে রিক্সা চালায়, সেই বিশু। এত্তটুকুন বয়স ভুতোর। মা নেই। বাপও তো সেই উড়ো খই গোবিন্দায় নমঃ। ছেলেটা শনি মন্দিরের চাতালেই পড়ে থাকে গোটাদিন। সে ব্যাটা ওই সামান্য গুজিয়ার ছোট বাক্স দেখলে যা লাফালাফি শুরু করে। আর দিই দশটাকা, ঘুগনি পাউরুটি কেনে ব্যাটা। কোনওদিন আবার পুরিসবজি। বা দিলুর দোকান থেকে মামলেট।
- হেহ হে। তুমি লাজওয়াব বাবা।
- বলছিস?
- একশো বার।
- যাক,  ডাক্তারিতে চান্স পেয়ে নিশ্চিন্ত করলি। আজকাল যা মেডিক্যাল খরচ বেড়েছে রে বাপ।
- বাবা, আমি মাধ্যমিক পাশ করেছি।
- ওহ হো! সরি। মাধ্যমিক। রাইট। যাক, সোজা সায়েন্স নিয়ে বসে যাবি।
- আর্টস!
- আমার ছেলে হয়ে তুই আর্টা নিবি রে ব্যাটা?
- বেশ। আজ শুতে যাই?
- অফ কোর্স। গুড নাইট।
- আমার একটা ক্রিকেট ব্যাট ভাবছি তোমার ভুতোকে দিয়ে দেব।
- তুই লাজওয়াব মন্টে। লাজওয়াব।

Friday, May 26, 2017

হিমসাগর

মামাবাড়ির পিছনের দিকে আধ-জংলি বাগান। জামরুল, গন্ধরাজ, টগর, জবা, সুপুরি, কাঁঠাল গাছে ঢাকা। নয়নতারার ঝোপ আর আগাছাও। গরমের দুপুরেও ছায়াছায়া ভালো লাগা। আর সেসে সমস্ত ছাপিয়ে হিমসাগরের গাছ। দু'মরসুমে একবার ফল ধরত গাছে, তখন নুয়ে পড়ত। সে অঞ্চলে হাওয়ার সুবাস পালটে যেত।

তখন বেশ ছোট, আমের প্রতি হাভাতেপনায় রাশটানার দরকার ছিল না। আমে কামড় দিয়ে লাফিয়ে উঠেছি "খুউউউব মিষ্টি"! দাদু শিখিয়েছিল "কন্যোসারের ভাষায় বলো। খুব মিষ্টির বদলে বলো সুমিষ্ট"।

মাঝেমধ্যেই হনুমানের উপদ্রবে গাছের আম নষ্ট হত, বিশেষত দুপুরের দিকে। ধুপধাপ শব্দ শুনলেই দিদা ছুটে যেত ছড়ি হাতে, পিছুপিছু আমি। ছড়ি ঘুরিয়ে খানিকক্ষণ তম্বি করলেই তারা লেজ গুটিয়ে বা না গুটিয়ে পালাতো। একদিন হয়েছে কী, দিদার ছড়ি আর হুঙ্কারে ডাল ছেড়ে তারা যখন শেষ স্টেশনে লোকাল খালি করার মেজাজে দৌড় লাগালে, তখন এক পুঁচকে এত্তটুকুন খোকাহনু ডাল ফসকে ধপাস। চোট তেমন পায়নি, কারণ পরক্ষণেই মায়ের হাত ধরে দুদ্দাড় ভেগে পড়ায় কোনও ঢিলেমি ছিল না। কিন্তু খোকাহনুর হাতের টসটসে হিমসাগরটা ছিটকে মাটিতে গড়িয়ে গেছিল, দিদা নাকি দেখতে পেরেছিল যে খোকা মায়ের হাত ধরে পালানোর সময় সকরুণ চোখে সেই মনমোহিনী আমের দিকে তাকিয়েছিল।

আচমকা দিদার সে কি হাহাকার! "ওইটুকুন বাছা আমার একটু আম খেতে চেয়েছিল"। সে আম হাতে দিদা "আয় আয়" বলে বেদম ডাকাডাকি করেছিল কিন্তু কুকুর ডাকা চুকচুক আহ্বানে হনুমানের গোঁসা কাটে না। শেষে আম গাছ ঘেঁষা পাঁচিলে খান কয়েক আম সাজিয়ে রেখে এসেছিল দিদা, যদি খোকার বাপ অন্তত সাহস করে ফেরত এসে খোকার জন্য খান দুয়েক আম নিয়ে যেতে পারে।

সে হিমসাগর গাছ সাফ হয়ে এখন গ্যারেজ। বাকি গাছপালার জঞ্জাল সরে গিয়ে বাঁধানো চাতাল। দিদা দাদু এখন সুমিষ্টঘ্রাণ স্মৃতি। আমি ব্যর্থ কন্যোসার।

Monday, May 22, 2017

ক্যালক্যাটা বিভ্রাট

- দাদা, আমায় বাঁচান।
- ম্যাডাম! কলার না ছাড়লে বাঁচাবো কী করে?
- সরি। সরি। খুব লেগেছে?
- টুঁটি টনটন করছে। তবে ইট ইজ ওকে।
- আমায় বাঁচান প্লীজ।
- আমি ইয়ে...আমি তো পুলিশ! ডাক্তার তো নই।
- ডাক্তার পারবে না পুলিশদাদা, ডাক্তারের ক্ষমতায় কুলোবে না। ওই হারামজাদার জন্যে আজ আমার এই দশা!
- ওই...ওই লোকটা? দাড়িওলা? ওই বাজে মেকআপ করা লোকটা? আমি ভাবলাম আপনারা দু'জনেই থিয়েটার আর্টিস্ট। আপনি হিরোইন। ও ব্যাটা সাইডরোল।
- এ'সব থিয়েটার থিয়েটার কী করছেন? বাঁচান আমায়!
- ওই রাস্কেলটা আপনাকে টীজ করেছে? দেব লকআপে ঢুকিয়ে দু'ঘা মালটাকে?
- ধুস। ও'সব কিছু না।
- তাহলে? যাক গে, আমি রিপোর্ট লিখে নিচ্ছি। আগে নাম বলুন আপনার।
- সীতা।
- সীতা কী?
- সীতা।
- আই সী। সারনেম ইউজ করেন না। হাজব্যান্ডের নাম?
- আজ্ঞে?
- স্বামীর নাম?
- রামচন্দ্র।
- বাহ্। রাজযোটক মাইরি। এ'বারে বলুন। কেসটা কী?
- ব্যাপারটা তেমন কিছুই না। এই লোকটা আমায় এই বিশ্রী জায়গায় নিয়ে চলে এসেছে।
- আপনার বাড়ি কোথায়?
- অযোধ্যা।
- ইয়ার্কি হচ্ছে?
- জনকরাজার মেয়ে আমি দাদা। গলা কাটলেও মিথ্যে বেরোবে না।
- যাহ শালা। অদ্ভুত চাপ। আপনি সীতা? অযোধ্যার রামের সীতা? তাহলে এ'খানে কী করছেন?
- দিব্যি লঙ্কায় রামচন্দ্র  এসে পৌঁছলেন। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। ও মা! মিনসের আবার মতিভ্রম। বলে কিনা অগ্নিপরীক্ষা দিতে হবে। বাধ্য হয়ে অগ্নিদেবকে, মানে ওই ব্যাটাচ্ছেলেকে ডাকলাম। অল্প কমিশনে আগুনে প্রবেশ করিয়ে দেবার কথা। বদ ব্যাটাছেলে কলির মে মাসের কলকাতায় এনে বলে এই হল অগ্নিপ্রবেশ। দাদা গো, আমায় বাঁচান। রামচন্দ্র অগ্নিপরীক্ষা বলেছিলেন, উনি এতটা পাষাণ নন যে এই গা ভাঁপানো গরম কড়াইতে আমায় পাঠাবেন। আমায় বাঁচান স্যার, আমায় এই কলকাতা থেকে বের করুন।