Sunday, May 21, 2017

চ্যাটার্জিবাবুর চিন্তা


- স্যার! মিস্টার চ্যাটার্জি!
- আরে! স্টোরবাবু!
- চিনতে পেরেছেন তাহলে?
- ঝারখণ্ডের ওই অজগাঁয়ে দিনের পর দিন বৌদির আশীর্বাদী মাছের ঝোল খেয়ে বেঁচে থেকেছি, সে ঋণ যে দশ জন্মেও ভোলার নয় স্টোরবাবু।
- অমন ভাবে বলবেন না স্যার। একে আপিসের বড়বাবু, তায় আমাদের পেয়িং গেস্ট। আপনার জন্য ও'টুকু করব না?
- বৌদিকে জিজ্ঞেস করলে জানতে পারবেন যে সম্পর্কটা শুধু অফিসের বা পেয়িংগেস্টের ছিল না।বেনিয়মে বৌদি আমায় ধমকটমক দিতেও কসুর করতেন না।
- সে'সব বিলক্ষণ জানি।
- আমার ঘরের অবস্থা তো দেখছেন। আপনাকে যে কোথায় বসতে বলি...।
- মাদুরটা পাতাই রয়েছে তো। আমি বরং..।
- বেশ।
- আপনি চলে আসার পর গিন্নীর মনটা বড় খারাপ হয়ে গেসল। আর আপনিও এমন দুম করে গায়েব হলেন...।
- আসলে ব্যাপারটা এমনই...।
- কী এমন ব্যাপার মশাই? যার জন্যে বছর চারেক এক্কেবারে ডুব মেরে রইলেন? আর ওইভাবে কেউ গায়েব হয়? আপনার জিনিসপত্র সব এখনও আমাদের ও'খানেই পড়ে রয়েছে। গিন্নীর উপরোধে আপনার বাড়ির ফোন নাম্বারেও কম চেষ্টা করিনি। কিন্তু সে'খান থেকেও সঠিক কোনও খবর পাইনি।
- আসলে কাউকেই ঠিক...। আচ্ছা, আমি যে ভাগলপুরে স্কুলমাস্টারি করছি, সে খবর আপনাকে কে দিলে?
- নরেশ মারাণ্ডির সঙ্গে গতমাসে আপনার দেখা হয়েছিল?
- হ্যাঁ হ্যাঁ, ভাগলপুর এসেছিল কোনও কাজে। স্টেশনেই দেখা। সেই জানালে বুঝি?
- স্যার, রাগ করেননি তো? এমন ঝুপ করে চলে এলাম বলে?
- হা হা হা, কী যে বলেন! আপনি স্নান সেরে নিন, আমি বরং মুর্গি নিয়ে আসি। কষিয়ে নেওয়া যাবে। ও'বেলা আপনাকে শহর ঘুরিয়ে আনব'খন।
- মুর্গির প্ল্যান তো দিব্যি। কিন্তু আমায় বিকেলের ট্রেনে ফিরতে হবে।
- যা হোক। আপনি জিরিয়ে নিন। আমি বাজার ঘুরে আসি।
- চ্যাটার্জিবাবু। আমি আপনার বয়োজ্যেষ্ঠ,  শুভাকাঙ্ক্ষী। অমন বড় চাকরী ছেড়েছুড়ে এ'খানে...এমন অবস্থায়...কেন?
- একলা মানুষ। যখন যেমন।
- পিড়াপিড়ি করতে আসিনি। আপনি যে সুস্থ আছেন, সে'টা জানলে গিন্নী সোয়াস্তি পাবে। আমার আসার মূল উদ্দেশ্যটা আগে জানাই। আপনি চলে আসার কিছুদিন পর আপনার এক পরিচিতা আপনার খোঁজে আসেন। আপনাকে না পেয়ে অত্যন্ত বিহ্বল হয়ে পড়েন। এই চিঠিটা উনি আপনার জন্য রেখে যান, এ'টা নাকি অত্যন্ত জরুরী।
- আচ্ছা।
- চিঠিটা টেবিলের ওপর রইল?
- বেশ। গামছা রইলো স্টোরবাবু। আপনি ফ্রেশ হয়ে নিন। আমি চট করে বাজার থেকে ঘুরে আসছি।

**

মাঝরাতে ট্রেনের হুইসল স্পষ্ট শোনা যায়। স্টোভে সসপ্যান চাপালে একটা অদ্ভুত স্বস্তি নেমে আসে, সে'টা ভালো লাগে চ্যাটার্জিবাবুর। দক্ষিণের জানালা দিয়ে ভেসে আসা বাতাসে কয়লার ধোঁয়ার গন্ধ। মোড়ের মাথায় বেজে চলা ঢোলের শব্দ আর দেহাতি সুরে আপন মনেই মাথা নেড়ে চলেন তিনি। বড্ড গরম পড়েছে,  একটু বৃষ্টি না নামলে ভ্যাপসা ভাবটা যাবে না।

গঙ্গার ঘাটের কথা মনে পড়ে চ্যাটার্জিবাবুর। ছোটবেলার পাড়া। ধুনো,ঘাস, ছোলাচানাচুরওলার ঠেলার লম্ফের গন্ধ মেশানো সন্ধ্যেগুলো। ক্রমাগত ক্রসব্যাট চালানোর জন্য সাহেবদার কানমলা। ক্লাবঘর থেকে ভেসে আসা একটানা ক্যারমের খটাখট। টিউশনির ব্যাগ পিঠে সাইকেল প্যাডেলের মচরমচর।

আর গঙ্গার ঘাট ঘেঁষা সেই নিমগাছটা। ছায়া আর শেষবিকেল মিলে যে'খানে এক খাবলা বুকছ্যাঁত পড়ে রইত প্রত্যেক সন্ধ্যেয়।

- আমরা বিয়ে করব, তাই না?
- ইডিয়ট।
- জাস্ট। রিকনফার্ম করছিলাম।
- ডাম্ব ট্যূ।
- কবে...মানে..ঠিক...মানে কী'ভাবে?
- তোর দ্বারা হবে না বাবু। আমিই বলব। কখন। কী'ভাবে।
- আমার দ্বারা কেন হবে না? দিব্যি হবে।
- আগে অনার্সটা না ধেড়িয়ে ম্যানেজ কর। ও'সব ডেঁপোমি পরে হবে।
- যদি...।
- যদি কী?
- যদি না হয়?
- সাধে বলি? ইডিয়ট? ডাম্ব?
- ছোটমামা বলে তুই আজহারউদ্দীনের কব্জির মোচড় হলে আমি উকুন বাছার আঙুল।
- শোন, যে'দিন সময় হবে সে'দিন দেখবি তোর ঘাড়ে চেপে বসে চিৎকার করে বলছি "এসে গেছি বাবু"! সে'দিন তোর কত কাজ। নতুন বাসনপত্র,  নতুন পর্দা, ছোট পোর্টেবল টিভি,কত কী কেনার।
- কী'সব যে বলিস।
- ঘাবড়াস না। ঘাড়ে চাপার কথাটা ফিগারেটিভ। চিঠি দিয়ে জানাবো। তখন আবার ধানাইপানাই করিস না।

**

স্টোরবাবু চিঠিখানা পড়ার টেবিলে রেখে গেছেন আজ মাস চারেক হলো। এনভেলপ খোলার সাহস এখনও হয়নি। রাতের চা খাওয়াটা বেড়েছে।
চিঠিতে ও কী লিখেছে? "সরি বাবু, খবরটা ঠিকই শুনেছিস" নাকি "এসে গেছি বাবু"?
ট্রেনের হুইসেলে বারবার বাড়াবাড়ি ভাবে চমকে ওঠাটা চ্যাটার্জীবাবুর এক বিশ্রী বদঅভ্যাস।

Saturday, May 20, 2017

কবরখানায় ইন্টারভ্যিউ

- মড়া হিসেবে এই কবরখানায় থাকার একটা মস্ত সুবিধে আছে জানেন দত্তবাবু!
- সে'টা কী?
- আপনার মত গোটা গায়ে ওডোমস মেখে হদ্দ হতে হচ্ছে না।
- ফানি! যাক গে। ইন্টারভ্যিউ শুরু করতে পারি ডাক্তার? আমাদের হাতে সময় বেশ কম। অলরেডি আপনি আবছা হতে শুরু করেছেন।
- ওহ হ্যাঁ। আজ বড্ড হাওয়া। বেশিক্ষণ থাকা যাবে না।
- এ'বার বলুন।
- কী?
- কবে ঘটনাটা ঘটল?
- কোন ঘটনা?
- মরে যাওয়াটা।
- ওহ। এই, বছর তিনেক।
- নর্মাল?
- সুইসাইড। তাই আমায় এত সহজে ট্র‍্যাক করতে পেরেছেন। আচ্ছা, একটা কথা জিজ্ঞেস করব দত্তবাবু?
- ক্যুইক।
- গোরস্থান ঘুরে বেড়িয়ে এমন ইন্টারভ্যিউ নিয়ে বেড়ানোর মানে কি?
- বই লিখছি। একশো ভূতের সাক্ষাতকার। গত বারো বছর ধরে এই টেকনিক ধরে দেশের অন্তত দেড়শো কবরখানা হানা দিয়েছি। এখনও পর্যন্ত বাহান্নটা ইন্টারভ্যিউ নিতে পেরেছি। আপনি ফিফটি থার্ড।
- আই সী!
- সুইসাইড করলেন কেন?
- বহুদিনের অপরাধ বোধ।
- আফসোস হয়?
- নাহ্।
- অপরাধ বোধটা কীসের, জানা যায়?
- আই কিল্ড আ চাইল্ড।
- কিল্ড? মার্ডার?
- চিকিৎসায় গাফিলতি।  সোজাসুজি দায়টা আমারই ছিল। তবে খুব সুচারু ভাবে ব্যাপারটা চেপে দেওয়া হয়েছিল। আমার হোল্ড কম ছিল না। ইন ফ্যাক্ট, ঘটনাগা এমন ভাবেই ঢেকে দেওয়া হয়েছিল যে বাচ্চাটার বাপ মাও সন্দেহ করেনি, ভবিতব্য বলে মেনে নিয়েছিল।
- ও। কিন্তু আপনি অপরাধবোধটা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। আই সী।
- কত বছর রাতে ভালো করে ঘুমোতে পারিনি। সামান্য চোখ লাগলেই মনে হত সেই খোকার মুখ চোখের সামনে  ভেসে উঠছে। বারবার। বড় হাসিখুশি ছিল। কতই বা বয়স, পাঁচ কি ছয়। মিস্টার দত্ত, আই কিলড হিম। স্রেফ গাফিলতি দিয়ে। তার চেয়ে ছেলেটাকে বিষ দিলে বোধ হয় আমার অপরাধ কম হত।
- ডাক্তার। ছেলেটার মুখ মনে পড়ে?
- স্পষ্ট, জানেন? স্পষ্ট। কটা চোখ। হাসলে দু'গালে টোল পড়ত। আর ডান গালে একটা কাটা দাগ।
- ঠিক এ'রকম ডাক্তার?
- মাই গড! অবিকল। আর আপনার চোখও তো...। ওহ।
- হেহ্। ডক্টর জোসেফ!
- টোল, দু'গালে...।
- আমার বাবা রিপোর্টার ছিলেন, সে'টা মনে আছে ডাক্তার? ওই ছোটবেলাতেও আমার মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন যে আমায় রিপোর্টার হতে হবে। বাবা মায়ের স্বপ্ন ছিল আমায় নিয়ে অনেক, ওঁরা চাইত আমি খুব বড় হব। কিন্তু আপনি সমস্ত হিসেব গুলিয়ে দিলেন। তবে মরে দেখলাম আমার বড় হওয়াটা থামল না, এমনি রিপোর্টার হওয়াটাও বিশেষ ঝামেলার কিছু নয়। শুধু জ্যান্ত কারুর ইন্টারভ্যিউ নিতে পারি না। এ'টাই যা।
- কিন্তু..কিন্তু...ওই মশা মারার ক্রীম গায়ে রগড়াচ্ছিলেন যে বড়?
- নাহ্, ও জিনিষ মশা তাড়ানোর জন্য নয় ডাক্তার! ও'টা ব্রেনোলিয়া আর ছায়া প্রকাশনী মেশানো জাদুক্রীম, যা গায়ে রগড়ে ভূতও জীবনে বড় হয়ে উঠতে পারে, সাফল্য অর্জন করতে পারে।

Thursday, May 18, 2017

মার্কেট

- সারকাস্ম কেন মন্দ হতে যাবে মামা? বঙ্কিম সারকাস্ম চালিয়ে বাংলাদেশ তোলপাড় করে ফেললেন। আর আমি সারকাস্টিকালি কিছু বললেই তুমি এত ইয়ে কর কেন?

- বঙ্কিম ফেদার টাচে প্রাণে মারতে পারতেন। আর তুই কোদাল দিয়ে ঘামাচি খুঁটিস। মনে রাখিস; সারকাস্ম সঠিক লোকের হাতে চন্দ্রহার, ভুল পাবলিকের হাতে লুঙ্গির গিঁট।

- ধ্যের। আধুনিক হিউমর সম্বন্ধে তোমার কোনও আইডয়াই নেই। আমার লেখায় টপাটপ কত লাইক পড়ে জানো?

- লাইক? তুই বংপেনে লাইক গুনিস রে?

- তা'তে কী?

- তুই পার্টটাইম গুড়ের ব্যবসা কর। আজকাল এক্সপোর্ট হচ্ছে শুনেছি। ভালো মার্জিন।

- মার্কেট ফীডব্যাককে উড়িয়ে দিচ্ছ মামা? আঁতলামি?

- মহামুশকিল রে। এই যে তোর মার্কেট। এই নিয়ে বড় মুশকিল।

- মার্কেট কী দোষ করল?

- মার্কেট অর্ধেক লোকজনকে বলছে লিটল ম্যাগে কবিতা লিখে নিজের লেখা নিজে পড়তে, অর্ধেক লোককে বলছে ফেসবুকে লাইক গুনতে, আর অপেক্ষায় রয়েছে যে বাকিরা তার পিছনে আসবে। তোর মার্কেট বড় একা রে বাবু। গুড়ের মার্কেটে আয়। আমার কন্ট্যাক্ট আছে। একটু কাজের কাজ অন্তত হবে।

Monday, May 15, 2017

ক্ষুদ্র

মোহন সিংহ চেষ্টা করছিলেন ছোট হওয়ার। বেশ ছোট।

ক্ষুদ্র।

অ্যালবামের হলদে গ্রুপ ফটোটার এক কোণে বসে থাকা খোকার মত একরত্তি। বড্ড রোগা, জংলি ঘাসের ওপরে একটা স্মাইলি বসিয়ে দিলে যেমনটা হওয়া উচিৎ আর কী। ডেসিমালের মত কুচি।

ক্ষুদ্র।

'মোহনকুমার সিংহ" বানানে হোঁচট খাওয়া খোকাটির সর্বস্ব ওই ফিক হাসি। তার সিঁথি,  যত্নে পাট করে আঁচড়ানো। এক খাবলা নারকোল তেল মাথায় রগড়ে, কুয়োর ঠাণ্ডা জলে ঝপাংঝপ স্নান করিয়ে, ঘসঘসিয়ে গামাথা মুছে; তারপর; তারপর যত্ন করে আঁচড়ে দেওয়া। যত্নে, ছায়াছায়া গন্ধে।

মোহন সিংহ মনে মনে পতপত করে উড়তে থাকেন, চারদিকে হুহু। আহা, যদি হওয়া যেত; ক্ষুদ্র।

**

"ধেড়ে গোবিন্দ হয়েই গোল পাকালি রে মোহন,  তুই ওইটুকুনি হলে দিব্যি তোর চুল পাট করে করে আঁচড়ে দিতাম"।

"মায়ের মত, বল"?

Sunday, May 14, 2017

র‍্যান্ডম

মা মানে গান। ছাপার শাড়ি। সন্ধ্যেবেলার পার্পল প্যাচ; খেলে ফেরা আর পড়তে বসার মাঝের মিনিট চল্লিশটুকু। মা মানে সবার আগে ওইটুকু।

স্টিলের গ্লাসে গরম ধোঁয়া ওঠা কম্পল্যান হাতে আমি। ঠাকুমার ঘর থেকে ভেসে আসা ধুনোর গন্ধ। আর হারমোনিয়ামের পাশে মা।

বাটিচচ্চড়িতে মা পিয়ারলেস। আর বেগুন দিয়ে ইলিশের ঝোলে। আর আধ ফালি করা হাঁসের ডিমের ঝোলে। আর সজনের চচ্চড়িতে।

দিদার হাতের রান্না আরও ভালো ছিল। তবে দিদার বয়ে আনা ঢাকার গন্ধ কিছুটা হলেও এখনও মায়ের হাতে রয়ে গেছে।

ওহ্। মায়ের হাতের আলু সেদ্ধ মাখা। ঘি সর্ষের তেল আর শুকনো লঙ্কা ভাজা দিয়ে। স্বপ্নের মত।

মা ঝগড়াকে ভয় পায়। যুদ্ধকে ঘেন্না করে। চিৎকারকে এড়িয়ে চলে। মায়ের মধ্যে নরম গামছা গোছের একটা ব্যাপার আছে।

মা অভাব দেখেছে। চিনেছে। আত্মস্থ করেছে। সে'সব দিনগুলোর দিকে তাকিয়ে আজও মা নুয়ে পড়ে, প্রণাম করে, সমীহ করে। অনটন মাকে তেতো করতে পারেনি, না পাওয়াগুলো ন্যুব্জ করে দেয়নি।
না পাওয়াগুলোকে ঘিরে কত অজস্র সুখস্মৃতি যে সাজিয়ে চলে মা, ভাবলে অবাক হতে হয়।