Sunday, May 14, 2017

বিস্কুটের টিন

- মা।
- চুপ।
- মা!
- চুপ। চুপ।
- খিদে।
- চুপ।
- ওই উল্টোদিকের দেওয়ালে..।
- কী?
- তাকে বিস্কুটের টিন। ওই যে, হলুদ টিনটা।
- টিনে বিস্কুট না থাকলে? কার না কার বাড়ি। আর কয়েক ঘণ্টা মাত্র লুকিয়ে থাকতে হবে খোকা।
- ফাঁকা টিন কেউ সাজিয়ে রাখে?
- ভালো করে দেখ। ওই তাকের দিকে যেতে হলে ওই কাচের জানালা পেরিয়ে যেতে হবে। যদি সৈন্যরা দেখে ফেলে?
- দেখে ফেললেই গুম গুম গুড়ুম?
- ঠিক।
- কিন্তু খুব খিদে পাচ্ছে মা। কাল রাত্তির থেকে কিছু খাইনি।
- আর কিছুক্ষণ খোকা। সন্ধ্যে নামলেই সৈন্যরা এ অঞ্চল থেকে বেরিয়ে যাবে। তখন এ'খান থেকে দিব্যি পালানো যাবে। বিস্কুটের টিনটাও নিয়ে নেব, কেমন?
- আর কতদিন পালিয়ে থাকতে হবে?
- যদ্দিন যুদ্ধ চলবে।
- কদ্দিন যুদ্ধ চলবে?
- বিদেশ থেকে সৈন্য আসবে, মিত্রপক্ষের। আমাদের বাঁচাতে। আর মাত্র ক'দিন।
- ওরা আজকেই এসে পড়ছে না কেন? এখুনি এসে পড়ছে না কেন মা? আমার বড্ড খিদে। বড্ড।
- খোকা। আর একটু। ওই তাকের দিকে গেলেই জানলা পেরোতে হবে। আশেপাশেই সৈন্য।
- পারছি না মা।
- ঘুমো।
- খিদে মা। বিস্কুট। ওই যে। একটা।
- আর একটু খোকা। আর একটু।

খোকার 'খিদে খিদে' গোঙানি ক্রমশ ঝিমিয়ে এসেছিল ক্লান্তির ঘুমে। কতক্ষণ জানা নেই, তবে ঘুম ভেঙেছিল কান ফাটানো শব্দে।

খোকা অবাক হয়েছিল তার মাথার কাছে হলুদ বিস্কুটের টিনটা গড়াগড়ি যেতে দেখে। দূর থেকে ছুঁড়ে ফেলায় টিনের ঢাকনা খুলে কয়েকটা বিস্কুট ছড়িয়ে পড়েছিল মেঝেতে। খোকার প্রিয় বাদাম বিস্কুট।

খানিক দূরে জানালার সামনে ভাঙা কাচ ছড়িয়ে রয়েছে। সে'খানেই মেঝেতে উপুড় হয়ে পড়ে রয়েছে মা, মায়ের সাদা জামার পিঠে লাল ছোপ।

Friday, May 12, 2017

জাস্ট ইন

উইকিপিডিয়া বলছে জাস্টিন বীবারের বয়স তেইশ। তেইশ বছরের একজনকে নিয়ে আমরা বেশ খিল্লিটিল্লি করলাম। কারণ ওর গান গান নয়।

যদিও ওর শোয়ের টিকিট না কেটেও থাকা যায়। যদিও নিজের প্লেলিস্টে ওর গান রেখে বরদাস্ত করতেই হবে তেমন দিব্যি কেউ দেয়নি। তবু। খিল্লি বড় টেম্পটিং। আমার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জটা আরও বড় ছিল। ওর একটাও গান না শুনে আমায় খিল্লি করতে হয়েছে। পিয়ার প্রেশার। বীবারের প্রতি খিল্লি, বীবার ভক্তদের প্রতিও।

খিল্লির থীম? ওই; ওর গান গান নয়।

এই তেত্রিশ বছর বয়সেও বাপে দু'টো কড়া কথা বললে মনখারাপ হয়ে ল্যাটোরপ্যাটোর অবস্থা হয়। আর এই তেইশ বছরের ছেলেটাকে কী লেভেলের খিল্লি যে ম্যানেজ দিতে হয় কে জানে।

অবশ্য শোবিজনেসে খিল্লি থাকবেই। সে'টাই স্বাভাবিক।

তবে ইয়ে, ওই বয়সটা। তেইশ। ও এ'রকম লাইমলাইটে রয়েছে বছর পনেরো বয়স থেকে।

তেইশের আমি? মাকে কিছুদিন দেখতে না পেলেই নুনের জ্যাকেট গায়ে জোঁকের মত ছটফট করছি।

আর তেইশের বীবারকে একটা বহু মানুষ প্রাণপণে ভালোবাসছে। অনেকে আবার খিল্লিতে ভাসিয়ে দিচ্ছে ব্যাটাকে।

কারণ ওর গান গান নয়।

এর আগে কার কার গানকে গান নয় বলে নস্যাৎ করা হয়েছে যেন?

Tuesday, May 9, 2017

থার্ড ডিগ্রী

কৌতুহল অতি বিষম বস্তু। হজম শক্তি কমে আসে। বাঁ কানের পিছনে চুলকানি শুরু হয়। মাথার ভিতরে একটা অসোয়াস্তিকর ঝুনঝুনুন বেজে চলে একটানা।

বিনয় মল্লিকের কৌতুহলটা বরাবরই বাড়াবাড়ির দিকে, আর মরার পরেও ব্যাপারটা কমেনি আদৌ। নরকে চেক্ ইন করেছেন ঘণ্টা খানেক হল। দিব্যি সিস্টেমে চলে সবকিছু এ'খানে। আসার সঙ্গে সঙ্গেই তার পাপের ক্যাটেগরি-ওয়াইজ লিস্ট হাতে পেয়ে গেছেন। তিনটে পাপের ক্যাটেগরি;
ফার্স্ট ডিগ্রী অর্থাৎ হিংসে, লোভ, পরনিন্দা,  অন্যের পিছনে কাঠি ইত্যাদি। শাস্তি হিসেবে দিনে দেড়শো থেকে দেড় হাজার বার বিছুটি লাগানো মুগুর-পিটুনি, টানা দেড় হাজার বছর । বিনয়বাবুর কপালে জুটেছিল দিনে সাড়ে তিনশো ঘা।

সেকেন্ড ডিগ্রিতে খুন রাহাজানির শাস্তি। দিনে মিনিমাম দু'ঘণ্টা করে উনুনে পিঠ রেখে শুয়ে খবরের কাগজ পড়া। সে শাস্তি অবশ্য বিনয়বাবুকে ভোগ করতে হবে না।

সবার ওপরে থার্ড ডিগ্রী, এর থেকে নিস্তার জোটেনি বিনয়বাবুর। এক স্যুইমিং পুল ফুটন্ত তেলে বাটারফ্লাই স্ট্রোকে ঘুরে বেড়ানো, দিনে দশ ঘণ্টা; আগামী আড়াই হাজার বছর ধরে। শিউরে উঠতে হয় ভাবলেই। কিন্তু এ'খানে ডিসিশন রিভ্যিউ সিস্টেম নেই। সবচেয়ে মুশকিল হল লিস্টে থার্ড ডিগ্রী শাস্তি কোন অপরাধের জন্য সে'টা লেখা নেই।

এনকোয়্যারি অফিস খুঁজেপেতে বের করে বিনয়বাবু জানতে চাইলেন তাঁর থার্ড ডিগ্রী অপরাধ কী। কিন্তু কাউন্টারের পেত্নী ঝেড়ে কাশলেন না। এ'টুকুই জানা গেল যে থার্ড ডিগ্রী অপরাধ একটাই। কিন্তু তা এতটাই গুরুতর যে সেটার কথা মুখে আনাও পাপ, লিস্টে লেখা তো দূরের কথা। তবে ফুটন্ত তেলের স্যুইমিং পুলে নামার আগে তাঁকে জানিয়ে দেওয়া হবে।

কৌতুহল এতটাই বিষম যে প্রথম দিন সবার আর থার্ড ডিগ্রিই বেছে নিলেন বিনয়বাবু। সেই আগুন স্যুইমিং পুলে নামার মুখে তার কানে কেউ ফিসফিস করে বলে দিল; "থার্ড ডিগ্রীর পাপ; লহ প্রি-ফিক্স না লাগিয়ে রবীন্দ্রনাথকে প্রণাম জানানো"।

অশোকবাবুর ডেডবডি


অশোকবাবুর আঙুলের ডগার  তিরতিরে কাঁপুনিটা অনুভব করতে পারছিলেন। পিঠের নিচে কাঠের খরখরে ভাবটাও দিব্যি টের পাচ্ছিলেন। কিন্তু চোখ খোলার সাহস হচ্ছিল না। চারিদকে হাউমাউ চলছে উত্তাল সুরে। এ সময় দুম করে চোখ মেললে ঢিঢি পড়ে যেতে পারে।

ইলেক্ট্রিক চুল্লিতে ঢোকার আগে এমন বদখত ভাবে বাঁশের ওপর শোয়ায় কেন? অসোয়াস্তি। অবিশ্যি মড়ার তো অসোয়াস্তি বোধ থাকতে নেই। মুশকিল হল অশোকবাবু দিব্যি টের পাচ্ছিলেন যে তাঁর জ্ঞান ফিরছে। অর্থাৎ তিনি মারা যাননি।

তবুও। স্যাট করে চোখ মেলতে সাহস হচ্ছিল না।


- বাবা!
- উঁউঁউঁ!
- ও বাবা!
- ধ্যাত্তেরি। সকাল থেকে একটানা বাবা বাবা বাবা। দেখছিস না আমি কাঁদছি? বাপ মারা যাওয়ায় দু'দণ্ড প্রাণ খুলে কাঁদব তারও উপায় নেই। তখন থেকে ব্যাবা ব্যাবা ব্যাবা। কী ব্যাপার?
- দা...দাদুর আঙুল নড়ল এই মাত্র। বাঁ হাতের!
- কী?
- দাদুর আঙুল নড়ে উঠল।
- চুপ কর স্টুপিড। যত্তসব বাজে কথা।
- ওই দ্যাখো, আবার নড়লো।
- কই!
- ওই যে। আবার!
- ও সামান্য হয়, মড়া মাঝেমাঝে নড়াচড়া করে। বাজে কথা না বলে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদ দেখি। কাজের বেলার লবডঙ্কা,  এ'দিকে যত আজেবাজে কথা।
- বাবা! দাদুর চোখের পাতা নড়ছে। হুই দ্যাখো।
- চোপ হারামজাদা ছেলে! উইল জাল করার হ্যাপা জানিস?
- উইল?
- ফের বাজে প্রশ্ন? এক চড়ে চোয়াল উড়িয়ে দেব। কাঁদ, দাদু মরেছে তোর! কাঁদ!


- এই যে! এ'দিকে শুনুন।
- বলুন।
- আমাদের মড়া চুল্লিতে কখন ঢুকবে?
- একটা পোড়ানো প্রায় শেষ হয়ে এলো বলে। আপনার বাবার বডির আগে আরও দু'টো মড়া আছে। আপনার বাবারটা তারপরে।
- ভাইটি। এরপরেই আমার বাবার বডিটা চুল্লিতে দিতে হবে যে।
- লাইনে আসতে হবে স্যার। নিয়ম!
- পাঁচশো দেব।
- শ্মশানে ঘুষফুষ চলেনা।
- ঘুষ না। উপঢৌকন।  পাঁচ হাজার।
- টাকা?
- ডলার দিলে ভাঙাবে কোথায়?
- বডি রেডি করুন।


- বাবা! দেখেছ?
- আবার কী!
- দাদুর ঠোঁটে বাঁকা হাসি।
- হাসি?
- হাসি! চুল্লির মুখে। তোমায় অপদার্থ বলার সময় যে হাসি দাদু হাসত, অবিকল সে'রকম।
- আজ তোকেই কোতল করব রাস্কেল!

Monday, May 8, 2017

ঝন্টুমামার শিক্ষা

দূর সম্পর্কের মামা কাম ছেলেবেলার পার্সোনাল কন্সলাট্যান্ট ঝন্টুমামার মত হচ্ছে "যত পারবি এডুকেট করবি। যেটুকু জানিস, সে'টুকু বিলিয়ে দে"। আর ঝন্টুমামা এই "এডুকেট" করা ব্যাপারটা মন দিয়ে প্র‍্যাক্টিস করে থাকে।

যথা ১
"সুনিয়ে ফুচকা দাদা। আলুঠো ভালো করে মাখনেকা থা। অভি ভি থোড়া ড্যালা ড্যালা মুখে ঠেকতা হ্যায়। আর ইয়াদ রখিয়ে জনাব, তেঁতুলকা টক হি আখরি বাত নহি হ্যায়। গন্ধরাজ ইঞ্জেক্ট কিয়া কিজিয়ে, নহি তো অপটিমাইজেশন নহি হোগা"।

যথা ২
"সই প্লীজ। তবে ইয়ে, অটোগ্রাফটা আমার জন্যে নয়। আমার ভাগ্নের জন্য। ব্যাটার ক্রিকেট নিয়ে একটু বাড়তি মাতামাতি আছে। আর ইয়ে বলছিলাম কী, আপনার ফ্রন্টফুট মুভমেন্টে প্রবলেম আছে স্যার। বাউন্সি ট্র‍্যাকে অমন দমাদম কমিট করে দেবেন না প্লীজ। ইজ দ্যাট ওকে? থ্যাঙ্কস ফর দ্য সই বাই দি ওয়ে"।

যথা ৩
"তুই শেষ পর্যন্ত পকেট কাটতে গিয়ে ধরা পড়লি মন্টে? পাড়ার নাম ডোবাবি যে তুই। নিশ্চই সস্তার ব্লেড ব্যবহার করেছিস! ওরে আর্টে অত ওয়ান পাইস ফাদার মাদার দেখলে হয় না। সেভেনওক্লক্ ছাড়া ব্লেড ইউজ করা মানেই গুস্তাখি"।

যথা ৪
প্রেমট্রেম মামা কোনওদিনই ম্যানেজ করতে পারেনি। শেষ প্রেমিকার সঙ্গে বিচ্ছেদ সেই কলেজের থার্ড ইয়ারে। তাঁকে মামা এগরোল ধরার সঠিক গ্রিপ শেখাতে দু'টো  সন্ধ্যে নষ্ট করেছিল বলে শোনা যায়।

যথা ৫
মামার চাকরী গেছিল বসকে 'এডুকেট' করতে গিয়ে।
"আপনার জুতোর রঙ দেখে বুঝতে পারি যে আপনি অত্যন্ত কেয়ারলেস ভাবে শুপালিশ ব্যবহার করেন। সমস্ত এলোপাথাড়ি স্ট্রোকস। দামী ওয়াইন গিলে এলিট হতে গিয়েই আপনি মরলেন। আপনার জুতো জোড়া আমারটার চেয়ে দামী অথচ আপনারটা বেয়াড়া পালিশের খপ্পরে পড়ে কেমন ম্যাদা মেরে থাকে দেখুন। আর এদিকে আমার জুতোর ঝলকানিটা নোটিস করুন। মিয়ানো জুতো ইম্পলাইজ মিয়ানো কনফিডেন্স স্যার। ডু সামথিং"।

এহেন বহুবিধ এডুকেশনের ঠ্যালায় মামার চাকরী নট হয়েছিল, বসবাবুর সে ক্ষেত্রে অন্তত কনফিডেন্সের অভাব ঘটেনি।

যথা ৬
ঝন্টুমামার সঙ্গে শেষ দেখা পার্ক স্ট্রিটে হট কাটিরোলের সামনে। বছর সাতেক আগে। মামার সঙ্গে সুতপার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছিলাম সে'দিন।
অদ্ভুত ভাবে তারপর থেকে ঝন্টুমামা বেমালুম বেপাত্তা হয়ে গেল।
আমিও ওর কথা ভুলতে বসেছিলাম প্রায়। এমন সময় আচমকা ওর পোস্টকার্ড, সুতপার সঙ্গে আমায় বিয়ের ঠিক দেড় মাসের মাথায়। পোস্টকার্ড এসেছে দেওঘর থেকে।

"বিট্টা,

তোর বিয়ের খবর পেয়েছি। সুতপা বড় ভালো মেয়ে। আগে বলার সুযোগ হয়নি। এখন জানিয়ে দিই। তোর বর্তে যাওয়া উচিৎ।  ভালো রাখিস ওকে।

একটা মাইনর ব্যাপার। ওর এগরোল ধরার গ্রিপটা প্রায় মুগুর ধরার মত। ওই বেমক্কা বাজে গ্রিপ দেখেই ধরতে পেরেছিলাম ব্যাপারটার জেনেটিক সোর্স কোথায়। সে যাক্। ওই দোষটুকু বাদ দিলে মেয়েটা হিরের টুকরো।
তোরা ভালো থাকিস,

ঝন্টুমামা।

*পুনশ্চ - দেওঘর ছেড়ে আজই বেরিয়ে যাচ্ছি। খোঁজটোঁজ করে লাভ নেই।"

মামার খোঁজ আর করিনি। তবে অন্যদিকে সামান্য খোঁজ নিয়ে এটুকু জানতে পেরেছি যে সুতপার মা ঝন্টুমামার ব্যাচমেট ছিল গ্র‍্যাজুয়েশনে। আর এ'টাও দিব্যি টের পেয়েছি যে ঝন্টুমামার কথা উঠলে শাশুড়িমায়ের গালে সামান্য বেমক্কা লাল ছুঁয়ে যায়।