Tuesday, May 2, 2017

দাসগুপ্তবাবুর ডায়েট

- নমস্কার।
- উঁ?..হুঁ। নমস্কার। 
- আপনার সামনের বার্থটায়  বসলে অসুবিধে হবে?
- কেন হবে? পুরো কামরাই তো ফাঁকা। যে'খানে ইচ্ছে বসবেন। আপনার মর্জি।
- স্ট্রেঞ্জ ব্যাপার। গোটা কামরায় মাত্র আমরা দু'জন। তাই ভাবলাম...।
- আপনি কদ্দূর?
- ধানবাদ। আপনি?
- লাইকওয়াইজ।
- যা হোক! একজন সঙ্গী জুটলো তাহলে। উম, একটা প্রশ্ন ছিল।
- আপনার কি যাকে তাকে যা খুশি প্রশ্ন করার বদঅভ্যেস আছে?
- আসলে একটা কিউরিওসিটি।
- শুনি।
- আমি কামরায় ঢোকার সময় দেখলাম আপনি ডিনার করছেন।
- রাত এগারোটা, ডিনার সেরে নেওয়াটা আনন্যাচুরাল কিছু কি? এ'বার ট্রেন ছাড়লেই দু'চোখের পাতা এক। তখন আবার কোনও প্রশ্ন করে বসবেন না। ঘুমে ব্যাঘাত এ বয়সে সহ্য হয় না।
- নাহ্। মানে...।
- মানে?
- মানে...আপনি ডিনারে ছোলাসেদ্ধ খেলেন। সে'টা কি এক্সেপশন?
- নর্ম। আমি ভাত আর ভাজাভুজি ছুঁয়ে দেখি না। স্ট্রিক্ট ডায়েট।
- ডায়েট!
- ডায়েট। সামান্য বাড়তি মেদ এ শরীরে দেখবেন না। আনলাইক...যাক গে। আপনাকে লজ্জা দিতে চাই না।
- লাশকে লজ্জা দেওয়া যায় না।
- এক্সকিউজ মি?
- মড়া কি লজ্জার ভয় পায় মিস্টার দাসগুপ্ত?
- মড়া? ইয়ার্কি হচ্ছে? আর আপনি আমার নাম জানলে কী করে? ওহ্, আই সী! চার্ট দেখে।
- চার্ট তৈরির অনেক আগে থেকেই আপনাকে আমি চিনি মিস্টার দাসগুপ্ত। গায়ে পড়ে আলাপ করতে আসাও সেই জন্যেই। আমি আপনাকে সাবধান করে দিতে এসেছি।
- স্কাউন্ড্রেল। ওপর চালাকি? ওল্ড চ্যাপ ভেবে ভয় দেখিয়ে লুট করতে আসা? ভদ্রলোকের চেহারা অথচ...।
- ভূতকে লোক বলছেন কেন  মিস্টার দাসগুপ্ত?
- গেট আউট।
- মড়া যেহেতু, চলন্ত ট্রেন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়লেও মরার চান্স নেই। তবে শুধু এইটুকু জানুন, এ ডায়েট ব্যাপারটা সুবিধের নয়।
- হোয়াট ডু ইউ মীন?
- আই মীন, ডায়েট ক্যান কিল। আমি নিজে ডায়েটে খুন হয়েছি।
- বাজে মিথ্যে বলতে হয় বলুন কিন্তু প্লীজ গুছিয়ে বলুন।
- এই ডায়েটই আমায় খুন করেছে মিস্টার দাসগুপ্ত।
- বেশ, ডায়েট করতে গিয়ে আপনি মারা পড়েছেন...সম্ভবত বাড়াবাড়ি...।
- ও কী! আমি ডায়েট করতে যাব কেন?
- ননসেন্স। এই মাত্র তো বললেন...।
- ডায়েটে মারা গেছি? ওই যে! আপনি ডায়েটে গিয়ে আমায় মারলেন।
- আপনি মারা গেছেন কারণ আমি ডায়েট করছি?
- প্রিসাইসলি।
- আপনি উন্মাদ।
- ভূত। উন্মাদ নই। কী লাভ আমাদের মত সরলকে খুন করে দাসগুপ্তবাবু?
- কে আপনি?
- আমার গা থেকে যে মনমাতানো সুবাস বেরোচ্ছে, তা'তেও ধরতে পারছেন না?
- আপনার গা থেকে তো..। আপনার গা থেকে..।
- আমিই লুচি দাসগুপ্তবাবু। মরে ভূত হয়ে পড়ে আছি আপনার ডায়েটের ঠেলায়।

একবার রেগে গেলে দাসগুপ্তবাবুর ভালোমন্দ জ্ঞান লোপ পায়। একেই ঘুম চোখ, তার ওপর এই অচেনা ভদ্রলোকের বাজে গপ্প আর বেয়াদপি। সোজা একটা জব্বর ঘুষি চালালেন উল্টো দিকের ভদ্রলোকের সুবিশাল ভুঁড়ি তাক করে।

দাসগুপ্তবাবুকে চমকে দিয়ে তাঁর মুঠো করা হাত সপাটে সেঁধিয়ে গেল সে ভদ্রলোকের ভুঁড়ির ভিতরে। কী কান্ড, তবুও রক্তপাত হল না। বেরিয়ে এলো না নাড়িভুঁড়ি।

চুপসে যাওয়া ভঁড়ির মধ্যে থেকে শুধু গলগল করে বেরিয়ে এলো একরাশ মন ভালো করা ধোঁয়া।

Sunday, April 23, 2017

মনোজবাবু ও দিদি

"অ্যাই ভাই, ওঠ"! 

মনোজবাবুর দুপুরের ঘুম ভাঙল দিদি মিতুলের ধাক্কায়। জ্ঞান ফিরলও বলা যায়। ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে নিশ্চিন্ত হলে ভদ্রলোক। বছর তিরিশেক সময় সত্যিই পিছিয়ে দিতে পেরেছেন সাধুবাবা। টাকের বদলে মাথার ভর্তি কোঁকড়ানো চুল, কাঁচাপাকা গোঁফের বদলে গোঁফের আলতো রেখা, ক্লাস এইটে যেমনটা তাঁর ছিল আর কী। 

এ'টা তাঁদের ব্যারাকপুরের সেই পুরনো বাড়িটার দোতলার ঘর। সবুজ রঙের দেওয়াল, দক্ষিণের জানালা। মহিন্দর অমরনাথ আর দিলীপ ভেংসরকারের দেওয়াল জোড়া পোস্টার বিছানার মাথার দিকে। সেই ঘর। 

আর দিদি। মনোজবাবুর চেয়ে বছর পাঁচেকের বড়। ঘর আলো করে থাকা দিদি। অঙ্ক শেখানো দিদি। ইংরেজির এস্যে লিখে দেওয়া দিদি। গরমের দুপুরে নুন লঙ্কা দিয়ে মাখা কাঁচা আম খাওয়ানো দিদি। 
দিদির জন্যেই তো এত কাঠখড় পুড়িয়ে ফেরত আসা। হৃষীকেশের সাধুবাবার এই অসাধ্য সাধন করতে পেরেছেন, সে'টা ভাবলেই মনোজবাবুর গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। চুয়াল্লিশ বছর বয়স থেকে সোজা চোদ্দয় নামিয়ে দিয়েছেন বাবাজী। অথচ সে সাধুবাবা প্রথমে কিছুতেই রাজী হচ্ছিলেন না। মাস ছয়েক হত্যে দিয়ে পড়ে থাকার পর অবশেষে ওঁর মনে গলেছিল। প্রথম দিকে খালি এক কথা "ইসমে কিসি কি ভলাই নহি বেটা, ওয়াপস মত যা। মত যা"। 

বাবাজীর কাছে খুঁজেপেতে আসতে কম হ্যাপা পোহাতে হয়নি। সাধু তান্ত্রিকের পিছন পিছন ঘুরঘুর করার অভ্যাসটা মনোজবাবুর বহুদিনের, তবে এই বিশেষ বাবাটির দেখা পেতে তাঁকে বিস্তর খাটনি করতে হয়েছে। এই বাবাজীর বাজারে নরবলি দেওয়ার দুর্নাম ছে, কাজেই এর কাছে বড় একটা কেউ ঘেঁসে না। কিন্তু এই সাধুবাবা যে কাউকে সময়ের এ'দিক থেকে ও'দিকে বা ও'দিক থেকে এ'দিকে পাঠিয়ে দিতে পারেন, সে'টা শুনে থেকেই ছটফট করছিলেন মনোজবাবু। তাই  অনেক কষ্টে জঙ্গলে চষে ফেলে এ'কে খুঁজে বের করেছিলেন। ওঁর নিজের অবশ্য সাধুবাবাটিকে দেখে আদৌ খুনে বলে মনে হয়নি। দিব্যি তাঁর জংলি আস্তানার আশ্রয়ে ছ'টি মাস কাটিয়ে দিয়েছিলেন মনোজবাবু। একবার সাধুবাবাজীকে বোকার মত নরবলির ব্যাপারটাও জিজ্ঞেসও করে ফেলেছিলেন, শুনে বাবাজী নিজের ফোকলা দাঁত উজাড় করে টানা পনেরো মিনিট হেসেছিলেন। তবে বয়সের নদীতে পিছিয়ে দেওয়ার প্রসঙ্গ তুললেই এড়িয়ে যেতেন সাধুবাবা। অবশেষে যে তাঁকে রাজী করাতে পেরেছিলেন মনোজবাবু, সে'টাই তাঁর পরম ভাগ্য বলতে হবে। 

আজ তাই লাফিয়ে উঠতে ইচ্ছে করছিল মনোজবাবুর! কিন্তু দিদি পাগল ভাববে।  এদ্দিন পর দিদিকে দেখে যে কী ভালো লাগছিল মনোজবাবুর। দিদির জন্যেই তো ফেরত আসা। দিদির জন্যেই তো এত কিছু। 

দিদি মারা যায় ঠিক এ'রকমই একটা দিনে। পাড়ার শীতলা পুজোর মেলায় নাগরদোলায় চেপেছিল দিদি, মনোজবাবুর নাছোড়বান্দা হয়ে দিদিকে বাধ্য করেছিলেন তাঁর সঙ্গে নাগরদোলায় চাপতে। 
"চ' না দিদি, চ' না! একবারটির জন্য, দু'জনে মিলে চড়লে কী মজা হবে"। দিদি কিছুতেই রাজী হচ্ছিল না, ওর নাগরদোলায় বড় ভয়। তারপর যখন মনোজবাবু মুখগোমড়া করে মেলা ছেড়ে বাড়িমুখো হাঁটা দেবেন বলে এগোলেন তখনই দিদি হাত টেনে ধরেছিল। দিদির মন বড় নরম ছিল। সবাই দিদিকে ভালোবাসতো। খুব। মনোজবাবুও ভালোবাসতেন, খুউব। খুউব। কপাল এমন, সে'দিনই নাগরদোলাটার কলকব্জায় গণ্ডগোল ছিল, মনোজবাবু আর দিদি যে সীটে বসেছিলেন, সে'টা মাঝপথে খুলে পড়ে। অনেক উঁচু থেকে ছিটকে পড়েন ওঁরা দু'জন। মনোজবাবু হাত পা দুইই ভেঙ্গেছিল, হাত ঠিক হলেও বাঁ পা'টা পুরোপুরি সারেনি। চিরকাল তাঁকে খুড়িয়েই হাঁটতে হয়েছে। তবে দিদি আর বাঁচেনি। দিদিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ারও সময় ছিল না। আর তারপর থেকেই সব কিছু কেমন পালটে গেল। মা পাথর হয়ে গেলেন, বাবা দিদির মৃত্যুর বছর তিনেকের মাথায় মারা যান কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে। সংসারটা প্রায় ভেসে যায়।  কিন্তু এ'বার একটা সুযোগ পাওয়া গেছে সমস্ত পালটে দেওয়ার। এ সুযোগ মনোজবাবু কিছুতেই হাতছাড়া করবেন না। 

কথামত ঠিক সেই দিনটায় ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছেন সাধুবাবা। দিদি ফের ডাকলে, "মেলায় যাবি না ভাই"? 
মনোজবাবু আনন্দে ভেসে বেড়াচ্ছিলেন। দিদির নরম হাত তাঁর মাথায়। দিদির গায়ের সেই মা মা গন্ধ। দিদির নীল রঙের সালোয়ার কামিজে হলুদ রঙের ফুল। জোড়া বিনুনি। দিদির চোখ দু'টো অবিকল মায়ের মত। দিদিকে না জড়িয়ে থাকতয়ে পারলেন না মনোজবাবু। 

"হঠাৎ এত আদর কেন ভাই? আমায় নাগরদোলায় চড়ানোর তাল করছিস? সে গুড়ে বালি, বলে রাখলাম"। দিদির গলায় মিছরিগোলা জল মেশানো। কী ভালোই যে লাগছিল মনোজবাবুর। 

"আমরা নাগরদোলা চাপবই না" ফিসফিস করে বলেছিলেন মনোজবাবু।
"নাগোরদোলা চাপবি না? তোর শরীর খারাপ হল নাকি রে ভাই"? দিদি তো হেসে কুটোপুটি। 

মনোজবাবু মেলায় যাবে না বলে গোঁ ধরে বসেছিলেন, কিন্তু দিদির উপরোধে বেরোতেই হল। 

** 

মেলায় গড়বড় হল কটকটি ভাজা কিনতে গিয়ে। মনোজবাবু স্পষ্ট ঠাহর করতে পারলেন, যে কটকটি বিক্রি যে করছে সে ব্যাটা খোদ সাধুবাবাজী। সাধুবাবা কটকটির ঠোঙা মনোজবাবুর হাতে দেওয়ার সময় স্পষ্ট বললেন
"কুছ বদলনে কা কোশিশ মত কর বেটা, নহি তো খুদ মরে গা। কিসি কো আজ মরনা হি হোগা"। কী অদ্ভুত, দিদি ওঁর এই কথাটা শুনতেই পেলো না। কিন্তু মনোজবাবু বেশ ঘাবড়ে গেলেন। দিদির হাতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরলেন মনোজবাবু। 

বন্দুকবেলুনওলার কাছেও সাধুবাবাজী, "ঝুলে পে চড় বেটা! ঝুলে পে চড়! নহি তো কয়ামত হোগা"। 

নাগরদোলার টিকিটের লম্বা লাইন। অনেক কষ্টে সে'টাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় লাইনে দাঁড়ানো একটা খোকার দিকে তাকিয়ে থমকে গেলেন চোদ্দ বছর বয়সে ফেরত যাওয়া মনোজবাবু। টিকিটের লাইনে যে পাঁচবছরের খোকা একা দাঁড়িয়ে সে মনোজবাবুর ছেলে তপু। 
তপু কী করে এলো এ'খানে? তবে কি দিদির বদলে...?
শিউরে উঠলেন মনোজবাবু!। তপু! তপুর কিছু হলে তিনি পাগল হয়ে যাবেন! যদিও তপুর তো সে সময় থাকারই কথা নয়। কিন্তু তবু ও আছে। স্পষ্ট, ওই তপু। আর টিকিট কাউন্টারে যে লোকটা টিকিট দিচ্ছে, ঝকমকে কুর্তাতেও তাঁর আদত চেহারাটা লুকিয়ে নেই; সাধুবাবা! সাধুবাবার মুখে বুক ঠাণ্ডা করা হাসি। ওঁর ঠোঁট নড়া দেখে দূর থেকেই স্পষ্ট ঠাহর করতে পারলেন মনোজবাবু যে উনি বলে চলেছেন; "কুছ বদলনে কি কোশিশ মত কর বেটা, নহি তো কয়ামত হোগা"। 

"চ' না দিদি, চ' না! একবারটির জন্য, দু'জনে মিলে চড়লে কী মজা হবে" এ'বারে গোঁ ধরলেন মনোজবাবু। দিদি অবাক। কিন্তু গোঁয়ের জোরে দিদির রাজী না হয় উপায় ছিল না। টিকিটের লাইনে গিয়ে দাঁড়াতেই মনোজবাবু খেয়াল করলেন যে তপুকে আর দেখা যাচ্ছে না। 
হাঁফ ছাড়লেন তিনি। 

এক টাকা নিয়ে দু'টো টিকিট দেওয়ার সময় টিকিটওলার মুখ থেকে স্পষ্ট শুনতে পেলেন মনোজবাবু;
"বলি চড়তি হ্যায় বেটা, জরুর চড়তি হ্যায়। অউর বলি কো কভি রোকনে কি কোশিশ মত করনা "। 

Thursday, April 20, 2017

সৈন্যদল

- ক্যাপ্টেন! 
- হুঁ।
- শুনছেন? দামামা বেজে গেছে। ডাক এসেছে। 
- হুঁ। 
- কী ব্যাপার ক্যাপ্টেন? এ মুহূর্তে এমন বিষণ্ণতা আপনাকে মানায়? সবার আগে ছুটে যাবেন আপনি। আপনার দেখা পথে ঝাঁপিয়ে পড়ব আমরা সকলে। 
- বিষণ্ণ নই, তবে এদ্দিন একসঙ্গে ছিলাম। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ব্যূহ রচনা করেছি। প্রস্তুত হয়েছি এ মুহূর্তটার জন্যেই। কিন্তু আমার সহস্র কমরেড আজ নিজেদের বিলিয়ে দেবেন, সে'টা ভেবে মন সামান্য হলেও তো কেঁপে উঠবেই। 
- বিলিয়ে দেওয়া বটে, কিন্তু ভেসে যাওয়া তো নয় ক্যাপ্টেন। কত প্রতিশ্রুতি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া আমাদের। কত স্বপ্ন, কত সবুজ। 
- আমরাই সর্বনাশও বয়ে আনতে পারি কমরেড। 
- পারি। কিন্তু আমাদের পুনর্জন্মও যে অবিচল সত্য ক্যাপ্টেন। সমস্ত সর্বনাশ মুছে ফেলে আমরাই আবার না হয় ফিরে আসব নজরুল হয়ে। 
- আমি ক্যাপ্টেন হতে পারি, কিন্তু তুমি আমায় সেই শুরুর মুহূর্ত থেকে তুমিই আগলে রেখেছ কমরেড। 
- আমি সৈনিক মাত্র ক্যাপ্টেন। অধিনায়কের পাশে থাকা, এ'টুকুই তো। 
- মনে পড়ে কমরেড, সেই শুরুর দিনটা? যেদিন শুধু আমি আর তুমি মিলে বুনতে শুরু করেছিলাম এই স্বপ্নটাকে? তারপর সহস্র সঙ্গী এসে আমাদের পাশে দাঁড়ালো, ক্রমে আমরা দিগন্ত ঢেকে ফেললাম। এখন কত দুঃসাহসের স্বপ্ন নিয়ে আমরা ঝাঁপিয়ে পড়ব। অথচ প্রথম দিনটা কথা মনে করলে মনে হয় কী ক্ষুদ্র, কী প্রয়োজনীয় ছিলাম আমরা। 
- অথচ আজ দেখুন, আমরা পালটে দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ব। আর দেরী নয়, দামামার শব্দ বেড়ে চলেছে। এ'বার ঝাঁপ না দিলেই নয়। আপনি পথ দেখিয়ে নিয়ে চলুন ক্যাপ্টেন, আপনার দল আপনার নির্দেশ মত ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্তুত!
- বেশ। কমরেড, তুমি আমার সেনাপতি। ম্যাপটা ভালো করে দেখে নাও, বাকিদের তোমাকেই বুঝিয়ে দিতে হবে। আমরা আছি ঠিক এইখানে। গত আড়াই মাস ভাসতে ভাসতে আমরা আকাশের কাঙ্ক্ষিত সেই বিন্দুতে এসে পৌঁছতে পেরেছি। আমাদের ঠিক নিচেই রয়েছে ছাদ, পুরনো শহরের ঘিঞ্জি গলির ভাঙাচোরা বাড়িটার স্যাতলা গন্ধওলা ছাদ। 
- ক্ষেত নয়, জঙ্গলের সবুজ নয়, ঝর্নার আলোড়ন নয়, বড় রাস্তার গরম ধোয়ানো উচ্ছ্বাস নয়, শেষ পর্যন্ত এই পুরনো ছাদ? ক্যাপ্টেন?
-  মনে নেই কমরেড? আমরা চেয়েছিলাম মিরাকেল হয়ে ঝরে পড়তে? আজ সেই মিরাকেল হতে পারার সুযোগ। আমার প্রতি বিশ্বাস আছে তো? 
- ক্যাপ্টেন! আপনার মেঘ প্রস্তুত। 

**

এ ছাদের গন্ধে বুক ভার হয়ে আসে। বৃষ্টির আভাস মাখানো হাওয়া ছাদ জুড়ে, ছাতের শ্যাওলা এ সময়টায় সুবাসিত হয়ে ওঠে। 

ছলছলটা ছুঁতে পারে দীপু। 

রাতের মধ্যে বিকেলের আনচানটা ফিরে আসে ফস্‌ করে। 
ঝিলের ও'পাশে সবুজে সবুজ, এ'পাশে দীপু। অশ্বত্থ গাছটার নীচে কে যেন দেবতা ঠাহর করে পাথর ফেলে গেছে, তার পাশে মরা ধূপ।  সে সুখা  বিকেলে বৃষ্টি গন্ধ এনে দিয়ে কেউ ঠক্‌ করে প্রশ্ন করেছিল;

"তুই সজনে গাছ চিনিস না? ছিঃ! এই দ্যাখ"। 

আজ এই বেঢপ মাঝরাতের ছাদে সে বিকেলের ছলছল গন্ধ, ছুঁতে পারে দীপু। 

প্রথম ফোঁটাটা ফতুয়ার বুক পকেটে টপাত মাইক্রোঢেউ হয়ে মিলিয়ে যেতেই টের পাওয়া যায় বিকেল জড়িয়ে ধরছে মাঝরাতকে। 

সেই সজনে গাছে। 

ওই প্রথম ফোঁটা বুক ছোঁয়ার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বেমক্কা ভেজা  বছরের প্রথম বৃষ্টি, বিকেলের গন্ধ আর সজনে গাছে। দীপু অবশ্য শুনতে পেলো না ওঁর বুকপকেট থেকে ভেসে আসা অস্ফুট উচ্ছ্বাসটুকু ;
"ডিয়ার কমরেডস, আমরা পেরেছি! পেরেছি! ইট্‌স আ মিরাকেল"। 

Monday, April 17, 2017

অমল তালুকদারের ভাবনা ২.০

১.
অমল তালুকদার ভাবার চেষ্টা করছিলেন যে তিনি আর বেঁচে নেই। দিব্যি লাগছিল তেমনটা ভেবে যেতে। খানিকটা সত্যিই লাগছিল ব্যাপারটা।

২.
ডাক্তার একরাশ বিরক্তি নিয়ে রিতাকে জানালেন "দেখুন ম্যাডাম, আপনি বেঁচে নেই। এই এক অদ্ভুত রোগ। দিব্যি মড়া আপনি, হঠাৎ কেন মনে হবে যে বেঁচে আছেন? এ'টা ভূতের দুনিয়া। জ্যান্ত হলে এ দুনিয়ায় আপনি থাকতে পারতেন? যত্তসব"!

৩.
শনিবার রাত্রে মাছ কিনে বাড়ি ফেরার পথে, গলির অন্ধকারে অমল তালুকদার দেখতে পেলেন দত্তদের ভাঙা বাড়ির কার্নিশে পা ঝুলিয়ে বসে একটি সাদা থান পরা ভূত। ভূত দেখে অমলবাবু বেশ নিশ্চিন্ত বোধ করলেন, যাক এর মাঝে নিশ্চই মরেফরে যাওয়া গেছে। বিশ্বাসে মিলায় বস্তু। তিনি আদতে ভূত বলেই এত সহজে ভূত দেখতে পারছেন।

৪.
মাছের ব্যাগ হাতে ভদ্রলোকের গভীর চাউনিতে এক লহমায় প্রেম চিনে নিয়েছিলেন রিতা। অন্ধকারে ভেসে যেতে ইচ্ছে করছিল তার। একজন মানুষ তার প্রেমে পড়েছে মানে সে নিশ্চই ভূত নয়। হারামজাদা থেরাপিস্টকে পেলে তার মাথার ঘিলু চেটে খাওয়া যেত। যদিও সে ব্যাটা স্কন্ধকাটা।

৫.
ঘেমেনেয়ে অস্থির বোধ করছিলেন অমলবাবু। রিতার সঙ্গে তিন মাস প্রেম করে তিনি মোক্ষম বুঝেছেন যে তিনি বেঁচে আছেন। আর রিতা আদতে ভূত।  রিতাকে তিনি সত্যিই ভালোবাসেন, ওর জন্য সুইসাইড করে ভূত হতেও তিনি রাজি। কিন্তু রিতাকে যদি বলা হয় সে ঠিক জ্যান্ত নয়, তাহলে সে রাগেদুঃখে প্রেমট্রেম ভেঙে দেবে। এ'দিকে মানুষে ভূতে প্রেমটা চালানোও সুবিধেজনক মনে হচ্ছে না।

৬.
রিতার নজর এড়িয়ে, আন্তর্জাতিক নোবেল কমিটির তদারকিতে, অতিগোপনে; অমল তালুকদারকে ফিজিক্স আর কেমিস্ট্রির জোড়া নোবেলে ভূষিত করা হয়। তাঁর যুগান্তকারী আবিষ্কার; শ্রডিঙ্গারের প্রেম।

Sunday, April 16, 2017

অমল তালুকদারের ভাবনা

অমল তালুকদার ভাবছিলেন। তাঁর ভাবতে ভালো লাগে। ভাবার মত ভালো ব্যাপার আর হয় না। এই কিছুক্ষণ আগেই ভাবছিলেন গলে পড়া নরম মোমে আলপিন ঠুসে দেওয়ার কথা। বেশ লাগছিল। তারপর চট করে একটু ঘাসের ডগা নাকে দিয়ে হাঁচি টেনে বের করার কথা ভেবে মাথা নাড়লেন। এরপর অল্প কিছুক্ষণ পোলাও আর আজহারউদ্দীনের কব্জি মোচড় ভেবে মৌজ করলেন। এরপর একটু আয়েসে গা এলিয়ে দেবেন,  এমন সময় একটা তাঁতের আঁচলের ঝাপটা মুখে লেগে ভাবনার সুতোটা গেল ছিঁড়ে।

আঁচলের রঙটা আজ আকাশী ছিল। তা'তে ছোট ছোট কালো ফুল।
ধুস।

- অমল তালুকদার।
- রিয়েলি রিতা? তুমি ওর একটা নামও দিয়েছ?
- বার বার কল্পনার মানুষ হিসেবে অ্যাড্রেস করাটা সবিশেষ সুবিধেজনক নয় ডাক্তার।
- উম। আই সী। ডাস হি হেল্প?
- অবশ্যই।
- সে কথা বলে? তোমার সঙ্গে?
- কথা? না। তার কথা বলার সময় কোথায়? সে অনবরত ভেবে চলেছে। আমি ওর ভাবনাগুলো দেখতে পাই। বড় ভালো লাগে।
- আমি ঠিক বুঝতে পারছি না রিতা।
- প্রথম প্রথম আমিও বুঝতে পারতাম না। তবে এখন বোঝার চেষ্টা ছেড়ে দিয়েছি। ওর ভাবনাগুলো আমায় ভালো রাখে। যন্ত্রণা কমায়।
- ভাবনাগুলো তোমার রিতা।
- না। বিশ্বাস করো ডাক্তার! ভাবনাগুলো আমার নয়। আমার ভাবনায় অতটা আলো নেই।
- আমার থেরাপির চেয়ে অমল তালুকদারের থেরাপিতেই তোমার বেশি কাজ হয় বলো।
- হেহ্। আমি একটু ভালো থাকতে চাই ডাক্তার। তুমি তো জানো, আমার সময় বড় কম। নিজের ভাবনাগুলো বড্ড জট পাকিয়ে গেছে। ওর ভাবনাগুলো আমার দরকারি, ওগুলো আমায় ভালো রাখে।

"পাঁচ নম্বরে মনোময় মাইতি, মনোময় মাইতি! আছেন? মনোময় মাইতি আছেন"?

রিসেপশনিস্টের ডাকে ধরফড়িয়ে উঠতে হলো। চিন্তার সুতোটা ফের ছিঁড়ল। ধুস। তবে এ'বার আঁচলের ঝাপটায় নয়। কিন্তু মনোময়বাবুর বুক কাঁপিয়ে থেরাপিস্টের চেম্বারের দরজা খুলে যিনি বেরিয়ে এলেন তাঁর আকাশী আঁচলে কালো কল্কেফুল।

"চার নম্বর বেরোলেন। এরপর আপনি, আপনিই মনোময় মাইতি তো? ভিতরে যান"।

- ভাবনাকে কেউ পিছু করছে?
- হ্যাঁ ডাক্তার। অনবরত। গত মাস দুই ধরে হচ্ছে। কত ভালো ভালো ব্যাপারস্যাপার ভেবে দিন কাটাই, কিন্তু তা'তে এসে গোল পাকাচ্ছেন ইনি।
- ইনি কে?
- জানি না তো। মহিলা। তাঁতের শাড়ি। ঠিক দেখতে পাইনা। তবে আঁচলের ঝাপটা টের পাই মাঝেমাঝেই। আর সেই আঁচলে ভাবনা গুলিয়ে যায়।  ভাবনা গুলিয়ে যাওয়াটা বড্ড গোলমেলে ডাক্তারবাবু। এই ভাবনাগুলো আমায় ভালো রাখে। সুস্থ রাখে।
- কেমন ভাবনা?
- ছুঁচের মাথা দিয়ে অবলীলায় সুতোর ডগা এস্পারওস্পার করে চলেছি। সমুদ্রের ঢেউয়ে গোড়ালি ডুবিয়ে আখের সরবত আর মুড়ি চানাচুর খাওয়া হচ্ছে। জ্বরের ঘোরে কানে পান্নালাল আর বুকে ভাঁজ করা সঞ্জীবের বই। এইসব। এই ভাবনাগুলো ছিঁড়ে গেলে বড় মুশকিল ডাক্তারবাবু। আমার সময় বড্ড কম।
- সময় কম কেন?
- সেকেন্ড কেমো আগামী মাসে। অবিশ্যি সিচুয়েশন যা, বিশেষ...।

- রিতা! তাই বলে মন্দিরে বিয়ে? তুমি না নাস্তিক?
- জানি ডাক্তার, ব্যাপারটা অদ্ভুত। আমার দ্যাবাটিও নাস্তিক। তবে বিয়ের অকেশনটা নেহাতই শখের। রেজিস্ট্রি বিয়ের জন্য ডেট পাওয়া অনেক হ্যাপা, আর আমাদের সময় বড় কম। যাই হোক, আগামী শনিবার, তোমায় আসতে হবেই। কালীঘাটে। তোমায় ঘটকবিদেয় না করলে আমাদের ওয়েডলকে গড়বড় রয়ে যাবে।
- ইয়েস ইয়েস। আই ডিসার্ভ দ্যাট।যাক,  কঙ্গ্র‍্যাচুলেশনস। তবে, আগামী শনিবার? সে'দিন তোমার অ্যাডমিশন না?
- হ্যাঁ। থার্ড কেমো। তার আগেই বিয়েটা সেরে নিতে চাইছিলাম দু'জনেই। তাই মন্দিরমুখো হচ্ছি।
- মনোময়ের নম্বরটা দিও। ওকেও কঙ্গ্র‍্যাচুলেট করি। সে ব্যাটার থেকেও আলাদা করে ঘটকালির ফীজ চেয়ে নেব'খন।
- আমি তোমায় এসএমএস করে দিচ্ছি ওর নাম্বারটা। তবে ও'কে আর মনোময় বলে ডেকোনা। গত সপ্তাহেই সে বেচারি কোর্টে গিয়ে নিজের নাম অ্যাফিড্যাভিট করে পালটে এসেছে। এখন সে শ্রীযুক্ত অমল তালুকদার।

***

এক ফালি মেঘ,এক ফোঁটা জল,
রংধনুকের একটি কণায়,
একটি নিমেষ ধরতে চেয়ে..
আমার এমন কাঙালপনা ।