Saturday, April 8, 2017

খুড়োর চা


- খুড়ো, চা ফুটতে ফুটতে একটা গান ধরো দেখি।
- রামপ্রসাদি ধরি?
- ধরো। গানের মাঝে ফুট কাটব না, আগে থেকে বলে রাখি প্রজাপতি বিস্কুট দিয়ো চায়ের সঙ্গে। একটা।


খুড়োর দোকান থেকে বেরিয়ে একটা বিড়ি ধরালেন দিবাকর। খুড়োর গানের সুরের একটা মস্ত গুণ হল যে সে সুর মাথায় ঘুরপাক খেয়ে চলে ক্রমাগত।


দিবাকর বেরিয়ে যেতেই দোকানের ঝাঁপ নামালেন খুড়ো। এই রাতে আর বড় কেউ আসবে না। ও'বেলার বাটিচচ্চড়ি পড়ে আছে। এ'বার হাফ কৌটো চাল চাপিয়ে  দিলেই ঝামেলা মিটে যায়।  বিড়িটা ছুঁড়ে ফেলে চালের ড্রামের দিকে এগিয়ে গেলেন।


বাটিচচ্চড়িটা বেশ ঝাল হয়েছিল। চার গেলাস জল খেয়ে দিবাকরের পেট আইঢাই হল কিন্তুর মুখের জ্বালা গেল না।


- এক কাপ চা দিও খুড়ো।
- এই দিই।
- তোমার দোকান যে আজকাল ফাঁকাই থাকে খুড়ো।
- তা মন্দা যাচ্ছে বইকি। গান শুনতেও আর লোকে আসে না খুব একটা।
- একটা কথা বলি খুড়ো? রাগ করবে না?
- না না, বলো না।
- তোমার নাকি মাথার ব্যমো হয়েছে? নিজের মনেই একটানা বিড়বিড় করে চলো? দিবাকর খুড়ো পাগল এ হাওয়া বাজারে রটেছে। একটু সামলে চলো দিবাকর খুড়ো। নইলে আমাদের মত জনা দুয়েক কাস্টোমারও আর আসতে সাহস পাবে না।
- কী যে বলো দিবাকর। এই নাও চা। এ'বার একটা গান শোনাই?
- রামপ্রসাদি হোক বরং আজ। কেমন খুড়ো?

Friday, April 7, 2017

মায়াবন বিহারিণী

চার বছরের বেগুসরাই মানিব্যাগে রাখা লোকনাথবাবার ছবির মত রয়ে গেছে।  বিহারের কারুর সঙ্গে দেখা হলেই জিজ্ঞেস করি "কোন জেলা?"।

সে'খানে কাজের সূত্রে ঘোরাঘুরি কম হত না।
সহরসা, লক্ষ্মীসরাই, পটনা, জমুই, সুপল, পূর্ণিয়া, কটিহার, কিষণগঞ্জ,  বেতিয়া, মুজফফরপুর, ভাগলপুর; এই নামগুলো বাতাসে ওড়ে। কত পুরনো মুখ। আড্ডা। জ্বর কপালে হাত।

প্রত্যেকের স্মৃতির ঘরে একটা অরাজনৈতিক আলমারি থাকে। সে'খানে পুরনো রুমাল থেকে খামের গায়ে চায়ের কাপের ছোপ; সমস্ত অপ্রয়োজনীয় স্নেহস্মৃতি গুছিয়ে রাখা থাকে। সে আলমারির ন্যাপথালিনে থিনঅ্যারারুটের গন্ধ।

আমার স্মৃতিঘরের সে আলমারির লকারে বেগুসরাইয়ের সরগরম সযত্নে রাখা।

কত মুখ ব্রাউনিয়ান মেজাজে এখনও দিব্যি মনে ঘোরাঘুরি করে।

অফিস গেস্টহাউসের রাজীবজীর নিজের হাতে কষানো দেশী মুর্গীর ঝোলের স্বাদ ভোলবার নয়। রাজীবজীর গল্পের আন্তরিকতা অবশ্য আরও বেশি সুস্বাদু।

ধর্মেন্দ্রর গাড়ি চালানো আর গার্জেনগিরি। নির্মলির কাছে মাঝরাতে একবার প্রবল বৃষ্টিতে গাড়ি আটকে। চারদিকে আধজঙ্গল, কাছেই কোশী নদী। চোরডাকাতের ভয় আর জন্তুজানোয়ার সাপখোপের আশঙ্কা মনের মধ্যে দিব্যি দাবা খেলছিল। সে খেলা ভেস্তে দিয়েছিল ধর্মেন্দ্র "দো ভাই সাথ মে হ্যায়, তো আপ কাহে লিয়ে চিন্তা করতে হ্যায়?"।

বেগুসরাইয়ের কপাসিয়া চৌকের কাছে এক ভদ্রলোক ঠেলা নিয়ে বসতেন ছোলে ভটুরে বিক্রি করতে। দশটাকায় তিন পিস্। সঙ্গে ফাউ তেঁতুলজল, পেঁয়াজকুচি আর নুনমাখানো ভাজা লঙ্কা। গরমাগরম। পাহাড়ের মত নিষ্ঠা নিয়ে ব্যবসা করতেন ভদ্রলোক্ল। ওঁর "অউর এক'গো লিজিয়ে গা?"র মধ্যে কী অপরিসীম মাথায় হাত বুলোনো স্নেহ ছিল।

বিহারকে ঘিরে এমন কত হাজার হাজার স্মৃতিটুকরো আর মানুষজন। মনকেমন বড় ওজনদার স্মৃতি-পিউরিফাইয়ার।

Thursday, April 6, 2017

চাটুতে খুন্তি

-  না। হয়নি।

- হয়নি মানে?

- পরোটাটা ঠিক ভাজা হয়নি। আরও হাফ মিনিটে চাটুতে খুন্তি চেপে ভাজতে হত।

- কেলিয়ে লাট করে দেব। আগের এগরোলটা নাকি বেশি মুচমুচে হয়ে গেছিল। দিলাম আরেক পিস কম ভাজা রোল আনিয়ে। এখন বলছিস ভাজা হয়নি? শুয়ার!

- শুয়োরে খেলেও তাই বলবে। কামড় দিয়ে দেখুন না স্যার।

- চোপ! হারামজাদা! শোন। তোকে কিডন্যাপ করে রাখা হয়েছে। হনিমুনে আসিসনি। বাসি রুটি দিলে তাই খাবি।

- তাই দিন। আপত্তি করব না। সঙ্গে অল্প আচার। প্রেফারেবলি আমের। ঝাল ঝাল। অল্প নুন। আর এক ফালি পেঁয়াজ। অমন হাফ ডজন বাসি রুটি জাস্ট উড়িয়ে দেব। প্রমিস। কিন্তু রোল এনেছেন যখন সঠিক ভাবে ভাজিয়ে আনুন। আরে মশাই আপনি কিডন্যাপার, ভ্যান্ড্যাল তো নন। মহাভারতে ভীষ্ম টু কৃষ্ণ সবাই কিডন্যাপট্যাপ করেছে। রিল্যাক্স। যান, ছেলে পাঠান! ভাজিয়ে আনবে নতুন করে।

- ধুত্তোর। থাক তুই না খেয়ে, ব্যাটা ঢ্যামনা।

- ক্ষতি কি? ডিফেক্টিভ এগরোলের চেয়ে খালি পেটে গান গাওয়া অনেক ভালো। জানেন, আমার মা বড় ভালো গাইত। যত দুঃখ,  তত সুর। আমি এই রোলের মত নেতানো হতে পারি, তবে সুরের কাঙাল। খালি পেটে দিব্যি মায়ের কথা ভাবব আর গাইব; "কী মায়া দেয় বুলায়ে,  দিল সব কাজ ভুলায়ে, বেলা যায় গানের সুরে জাল বুনিয়ে"। খালি পেটে মনপ্রাণ ঢেলে গাইতে পারলে মায়ের গন্ধ আসে। আর নামতে পারে বৃষ্টি। তাই হোক স্যার। রোলফোল ক্যান্সেল। গান গাইব। কেমন?

- এই শালা দিলু! একটা রোল গুছিয়ে আনতে পারছিস না? পাঁচ মিনিটের মধ্যে রোল চাই। ডাবল ডিম, পরোটা খুব কড়া নয়, আবার ল্যাতপ্যাত যেন না করে। শসা আর সস্ বাদ। ক্যুইক। ক্যুইক। নয়তো রাস্কেলটা যে কোন সময়ে গান গাইতে শুরু করবে।

Saturday, April 1, 2017

স্নেহ ও ঘুম

পুরুষ নারীর দৈহিক মিলন অতি অবৈজ্ঞানিক।
প্রবল অবিজ্ঞানে সভ্যতা, সাহিত্য ও সঙ্গীত এগিয়ে চলেছে এত বছর ধরে।

মিলনোত্তর নারী হৃদয় ভেবে চলে অবিচ্ছেদ্য বন্ধনের কথা,
সোনা গলানো উষ্ণতার কথা,
পূর্ণেন্দু পত্রীর কথা,
তুমি যে আমার ওগো তুমি যে আমারে সুচিত্রার কোলে উত্তমের মাথার কথা,
সবুজ ঘাসে ছড়ানো শিউলির কথা,
মোমের মত গলে পড়া টুপটাপ স্নেহর কথা,
অপার্থিব সমস্ত অনুভূতির কথা।
ভালোবাসার কথা।

মিলনোত্তর পুরুষ মগজ শুধু বোঝে ফ্যানের রেগুলেটরটা এক ঘাট বাড়িয়ে দিলে আর মুখের ওপর থেকে চুলফুল সরিয়ে নিলে ঘুমটা ভালো হত।

অফিস লামা

প্রত্যেক অফিসেও কিছু মানুষ আছেন যারা জবাকুসুম তেলের শিশির মত ঠাণ্ডা। কাজে ব্যস্ততায় যারা দুমড়ে মুচড়ে পড়েন না।

এরা কাজেকর্মে রীতিমত দক্ষ কিন্তু ব্যবহারে মিহি। এদের মুখে "আমি, আমি" কম কিন্তু হাতে সময় অফুরন্ত। এদের কপালে ভাঁজ বিশেষ দেখা যায় না। ফাইলের চৌবাচ্চায় ফেলে দিলেও এরা আয়েশের পাউডার ঘাড়ে বেরিয়ে আসবেন; মাথার চুল পাট করে আঁচড়ানো, মুখে বকফুলেরবড়া চেবানো হাসি। ঈর্ষায় কেউ খিস্তি করলে এরা অমায়িক সুরে বলেন "এসি রুমে চেগুর পোস্টার দেখে এথেইস্ট হতে গিয়েই ব্যালেন্স গুলিয়ে ফেলছেন। একটা অন্তত রিলিজিয়ন অ্যাডপ্ট করে ফেলুন,  সুকুমার পড়ুন"।

এরা সংখ্যায় কম কিন্তু প্রত্যেক অফিসের লক্ষ্মী। এদের শত্রু নেই, প্রমোশন নেই। কিন্তু এরা রয়েছেন সর্বত্র। এরা অফিস ক্যাফেটেরিয়ার মধ্যমণি,  এরা ক্রাইসিসে বরফ মাথা, ভালো চা ছাড়া এদের চলে না।

হিউম্যান রিসোর্স যে'দিন বেলকার্ভের তালুতে এই বোধিসত্ত্বদের ঠেলে তুলতে পারবে, সে'দিন কর্পোরেটের কুরুক্ষেত্র ভোলপালটে ছন্দবাণী ক্লাব হবে।