Friday, March 24, 2017

টিভির রিমোট

টিভির রিমোট বড় সংবেদনশীল বস্তু।

এ জিনিস যার হাতেই থাক তাকে ফেরেব্বাজ বলে মনে হয়। সামনে চলন্ত টিভি থাকলেই পাশে বসা রিমোট হাতে মানুষটার প্রতি অবিশ্বাস দৃঢ় হয়। হবেই। এই বুঝি চ্যানেল পালটে দিলো, এই বুঝি চ্যানেল পালটে দিল। রিমোট হারানোর সঙ্গে সঙ্গে জীবনে নেমে আসে একটা হাত কামড়ানো অস্বস্তি।

হয়তো আপনার মনে হল নিউজচ্যানেল ট্যু নিউজচ্যানের খেউর শুনে মন ভালো করবেন, অথচ রিমোটওলা মন দিয়ে ডিসকভারিতে পোলারবিয়ারের গ্যাস অম্বলের ধাত নিয়ে একটা অনুষ্ঠান দেখে চলেছেন। আপনাদের ইতিউতি কথা হচ্ছে বটে কিন্তু রিমোটওলার মন রয়েছে টিভিতে আর আপনার মনে ক্রমাগত প্রতিধ্বনিত হয়ে চলেছে স্লোগান "রিমোটওলা হাড়বজ্জাতের কালো হাত ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও"।

একটা ঘরে যদি বুদ্ধ (গৌতম), গান্ধী (মোহনদাস), একটা কেবল-সহ টেলিভিশন, একটা রিমোট আর একটা বন্দুক রেখে দেওয়া হয়, তাহলে বাহাত্তর ঘণ্টার মাথায় একটা লাশ পাওয়া যাবে। যাবেই। কেউ মন দিয়ে গবেষণা করলে জানতে পারবেন যে টেলিভিশন রিমোট আবিষ্কারের সঙ্গে গোটা বিশ্বে ডিভোর্সের সংখ্যা হুড়মুড় করে বেড়ে গেছে।

এই টেলিভিশনের রিমোটের জন্যই ছোটমামাও প্রায় তেত্রিশ বার ডিভোর্সের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছিলেন। ইন ফ্যাক্ট গত শনিবার মামাকে নিখিল তান্ত্রিকের ডেরা থেকে বেরোনোর সময় পাকড়াও করে জানাতে পারলাম যে নিখিল নাকি মামাকে আশ্বাস দিয়েছে যে গোপনে মামীর রিমোট ছাড়ানোর টোটকা তার জানা আছে। এ'দিকে মামীকে যে আমিই প্রতি বিস্যুদবার বিকেলে নিখিলের কাছে নিয়ে আসি সে গোপন খবরের আঁচ মামা পায়নি দেখলাম। নিখিলের ব্যবসায় টার্নওভারের প্রতি কমিটমেন্ট দেখেও ভালো লাগলো।

আমার বহুদিনের শখ ছিল একটা এলইডির। নিখিলেরই কল্যাণে ছোটমামার এলইডি আমার একলার সংসারের শোওয়ার ঘরে প্রতিষ্ঠিত হল অস্ট্রেলিয়া সিরিজের সেকেন্ড টেস্টের আগেই।

ইউটিউব এসে মামাবাড়ির সম্পর্কের একটা ঠ্যাং কফিন থেকে হিঁচড়ে বের করতে পেরেছে। আর হায়ার সেকেন্ডারি ফেল নিখিলের পকেটে টু পাইস যাওয়াটা একটা বাড়তি তৃপ্তির কারণ তো বটেই।

Wednesday, March 22, 2017

এফ আই আর

এফআইআর দিব্যি স্বাস্থ্যকর জিনিস। এ'তে চাপাতি নেই। গায়ে অ্যাসিড ছোঁড়া নেই। গুণ্ডা লাগিয়ে বেধড়ক পিটুনি নেই। এফআইআর হচ্ছে যা'কে বলে ইম্প্রুভমেন্ট।

আমাদের উচিৎ এফআইআরের পক্ষে জনমত গড়ে তোলা।

অমুকে আমার বই থেকে আমায় না বলে পেজমার্ক সরিয়ে নিয়েছে। এফআইআর।
তমুকে প্যারামাউন্টের ডাব সরবতের গেলাস 'নাপসন্দ' বলেছে। এফআইআর।
ইস্টবেঙ্গল পেনাল্টি পেলে মোহনবাগানের এফআইআর।
বিরিয়ানির আলুর সাইজ ছোট পেলে এফআইআর।

এটিএমের মত হাফ মাইল অন্তর এফআইআর সংগ্রহ কাউন্টার থাকবে। রাগ হলেই সুট্ করে সে'খানে ঢুকে পড়ে এফআই আর করে দেব। রাগ নরম হয়ে আসবে। বেগুনী খেতে ইচ্ছে করবে।

এফআইআরের নেশা ছড়িয়ে দেওয়া হোক। এফআইআর করলে জিও সিম ফ্রী দেওয়া হোক।
সরকার বাহাদুর বছরের সেরা এফআইআর করিয়েকে
এফআইআরভূষণে সম্মানিত করুক।
মোড়ে মোড়ে মাইকে গজল বাজুক "FIR লে আয়া দিল.."।

এ'সব করে যদি চাপাতি বোমা ঠুসে দেওয়া হুজ্জুতিটা সামান্য কমে, সে'টাই হবে এ পুওরর ম্যান'স জায়ান্ট লীপ।

ময়ূরাক্ষী ফাস্ট প্যাসেঞ্জার

আপ ময়ূরাক্ষী ফাস্ট প্যাসেঞ্জার। বর্ধমান থেকে উঠতো ঝুড়িতে শিঙাড়া আর অ্যালুমিনিয়ামের বালতিতে গরম ডিম সেদ্ধ। সে শিঙাড়ার ভার্টেক্সের নিমকি পরত বাড়তি মজবুত, ভিতরে সাদাসিধে হলদে আলুর তরকারি। সেই শিঙাড়া দু'টো।

আর ডিম সেদ্ধ এক পিস। আধ ফালি করে মধ্যিখানে বিটনুন ছড়ানো। আর ভিড় ট্রেনকামরার হাওয়া গায়ে লাগলে ডিমসেদ্ধর স্বাদ দশগুণ বেড়ে যায়।

তখন শিঙাড়া মিলতো শালপাতার দোনায়,  ডিমসেদ্ধ থাকত চৌকো করে কাটা খবরের কাগজের পাতায়।
তখন মামাবাড়ি থেকে ফেরা। মনের ভিতর সে কী প্রবল হুহু। বাবা শিঙাড়া ডিমসেদ্ধতে ইনভেস্ট করতেন মনখারাপ ডায়লুট করতে। মনবভার যদি খুব বেশি হত আর ট্রেন যদি বুকস্টলের ধারেকাছে দাঁড়াত, তাহলে জুটত মেগাবোনাস; নারায়াণ দেবনাথ অথবা ডায়মন্ড কমিক্সের অরণ্যদেব বা চাচা চৌধুরী। কিন্তু ডিমের কামড় শিঙাড়ার মুচমুচ আর কমিক্সের ফুরফুরেও কতবার দিদাদাদুর জন্য মনকেমন কাটেনি।

দাদুর চশমা, বুকপকেটের ডটপেন। দিদার সিঁদুর ল্যাপটানো চিরুনি। দাদুর ক্রিকেটের গল্প, দিদার মাখা আম দুধ মুড়ি। ময়ূরাক্ষী ফাস্ট প্যাসেঞ্জারের ঝুপুর ঝুপের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সে'সব মনে ধাক্কা মারতো। আমি নন্টেফন্টের সুতো আর ডিমসেদ্ধর ছুঁচ দিয়ে নিজেকে এঁটে রাখতাম।

এখনও ময়ূরাক্ষীর ঝুপুরঝাপুর এখন ক্রমাগত বুকে গোঁত্তা মারে,  বিশেষত রাতের দিকে। শিঙাড়া ডিমসেদ্ধর গন্ধ ফেরত আসে। একটু মন দিলে সাবু আর রাকার ঝগড়াঝাঁটিও শুনতে পাওয়া যায় স্পষ্ট।

এখন একটানা শুধু ভীড় ট্রেনের মত দমবন্ধ ভাব।
এখন আর কোত্থাও ফেরত যাওয়ার নেই।

Sunday, March 19, 2017

নয়নতারা ও খোকা


আমি ভালো ফটোগ্রাফ তুলতে পারি না। ফোকাস বুঝি না। কাছে ঘেঁষলে ঝাপসা হয়ে যায়। দূরে দাঁড়ালে ফ্রেম এলোমেলো হয়ে পড়ে। আলো ঠাহর করতে পারি না। কোন রঙের ঘাড়ে কোন রঙ চাপালে দৃষ্টিনন্দন হবে, সে বোধও তেমন নেই।

আমি ভালো ছবি তুলতে পারলে বোঝাতে পারতাম এই নয়নতারাগুলো কী সুন্দর। আমাদের ফ্ল্যাটবাড়ির ছাদে অন্য কারুর রাখা টব আলো করে আছে। ছাদ আলো করে আছে। বিকেল আলো করে আছে। গোলাপি রঙের নয়নতারা আকছার দেখা যায়, তবে এই রঙটা বড় একটা দেখি না। যদি আর একটু স্থির ভাবে মোবাইল ক্যামেরাটা ধরতে পারতাম তাহলে নয়নতারার পাপড়িগুলো স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ত।
তবু।

আরও বছর তিরিশ পর গুগল ইমেজেস স্ক্রোল করতে করতে এই ছবিটাই দেখে বিকেলের গন্ধ পাব। নয়নতারাগুলোকে স্পষ্ট মনে পড়বে।

নয়নতারা, আলো আলো একটা মেয়ে। ফিক্‌ হাসির মেয়ে। বিকেলের মেয়ে। অল্পবিস্তর সিজোফ্রেনিয়ার ওজন কি সকলেই বয়ে চলে না? এই মেয়েটার সঙ্গে আমার বেশ কিছুদিনের আলাপ। খানিক ভালোবাসাবাসিও আছে। আমার আস্তিনে ওর আঙুলের টান আছে। এমনকি আমার মেসবাড়ির পুরনো গন্ধ মিশে আছে খানিকটা। আমার পরিচিত কলকাতার গন্ধ। টিউশনি সন্ধ্যের আঁচ। দিল্লীর শীতের রাতের ধোঁয়া ওঠা পরোটার ওম। বিহারের রাত্রির ঝকঝকে তারা মাখানো আকাশের গল্প। সমস্ত মিলে আমি নয়নতারাকে চিনি। তার সঙ্গে অল্পস্বল্প কথাবার্তাও হয়। নয়নতারা আমার ভুল, বেঠিক, বিদঘুটে সমস্ত কিছু দেখতে পারে। কিন্তু ঠেলে সরিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যায় না। সে মেয়ে জ্বরের খাটে এসে চুপটি করে বসে থাকে।
একরত্তি মেয়ে হলে কী হবে, নয়নতারা কান্না দেখতে পায়। সমস্ত লেখা পড়তে পারে। ছাতের আবডালে হুমড়ি খেয়ে সামনে এসে পড়ে। অবিশ্যি খুকির সামনে নতজানু হতে নেই।

যা হোক। একদিকে নয়নতারা। অন্যদিকে আকাশ ভরা টলটলে মেঘ। বাপ আর ব্যাটা রাস্তায় বেমক্কা ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। তক্ষুনি, দু’চার ফোঁটা। আর তার মধ্যে থেকে খান দুই ফোঁটা খোকার গায়ে।

প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা। আরও কত অজস্র ভিজে সপসপ মুহূর্ত পড়ে আছে। কাকভিজে হয়ে ফুটবল নিয় হুড়োহুড়ি করবে, মনের মধ্যে একরাশ আকুলিবিকুলি নিয়ে কোনও একদিন ইচ্ছে করে এন্তার ভিজবে হাতের ছাতা না খুলে, বৃষ্টির রাতে জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে প্রথম অতুলপ্রসাদ আবিষ্কার করবে, অফিসের মুখে ঝমঝম বৃষ্টি পেয়ে বিরক্তিতে পায়চারি করবে, ভালবাসবে, চিঠি লিখবে।

কিন্তু ভায়া বালিশেন্দ্র, প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা গায়ে নামার সময় বাবা সঙ্গে ছিল। ভুলে, বেঠিকে, বিদঘুটেমোতে ঠাসা সেই ভদ্রলোক যে ভালো ছবি তুলতে পারে না। ফোকাস বোঝে না, আলো ঠাহর করতে পারে না।

তবু। মুহূর্তটার গন্ধ কি এ ছবিতে থাকবে না? অনেক বছর পরে? যখন ভুল, বেঠিক, বিদঘুটে সমস্ত উবে যাবে? নয়নতারার ছবিটার মত আলো আলো হয়ে থেকে যাবে না?     

Friday, March 17, 2017

পাঁচুগোপালবাবুর চা আর মামলেট

“আসুন, আসুন দীপকবাবু। আপনার পাংচুয়ালিটিকে স্যালুট না করে মশাই থাকা যায় না। সন্ধ্যে ছ’টার অ্যাপয়েন্টমেন্ট, এখনও মিনিট পাঁচেক হাতে রয়েছে”, পাঁচুগোপালবাবু ইশারায় সামনের চেয়ারটা দেখিয়ে দিলেন।
“থ্যাঙ্কস”, ধন্যবাদটা জানালাম বসতে বলার জন্য। পাংচুয়ালিটিকে স্যালুট করার কথাটা জাস্ট বাড়াবাড়ি, পাঁচুগোপালবাবুর সবকিছুতেই বাড়াবাড়ি। গতবার আমার হাতের এইচএমটির ঘড়ি দেখে বলেছিলেন যে আমার ঘড়ির ডায়াল দেখেই বোঝা যায় আমি মানুষটা কতটা ছিমছাম। ভদ্রলোককে বলা হয়নি অবিশ্যি যে ঘড়িটা আদতে আমার বাবার।
“চা খাবেন নাকি দীপকবাবু”?
“তা হলে মন্দ হয় না। তবে দুধ ছাড়া প্রেফার করব। অসুবিধে থাকলে অবশ্য দুধের চাই চালিয়ে নেব ”।
“নিধু, নীচ থেকে দু’কাপ চা নিয়ে আয় বাবা। লেবু দিতে বলিস, কেমন”?
“মার্চ শেষ হতে চললো, গত বছরের ক্যালেন্ডারটা এবারে সরান পাঁচুগোপালবাবু”।
“সরাব সরাব”, কথায় কথায় পিকদানি মুখের কাছে টেনে নেওয়াটা পাঁচুগোপালবাবুর আরেকটা বিরক্তিকর অভ্যাস, “মুশকিল হচ্ছে, মেহেনতী ফ্লাওয়ার মিলসের এই মা কালী ক্যালেন্ডারটা বিজনেসে বেশ পজিটিভ ইনফ্লুয়েন্স এনেছে। রয় অ্যান্ড সন্সের যে অর্ডারটা পেলেম বছর জানুয়ারিতে, সে’দিনই এই ক্যালেন্ডার ঝুলিয়েছিলাম। কী সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার ভাবুন, এ বছর জানুয়ারিতে ক্যালেন্ডারটা নিধু খুলে রেখেছিল। ও মা, অমনি কোম্পানি থেকে খবর এলো এ বছর অর্ডার রিনিউ নাও হতে পারে। অমনি ক্যালেন্ডার দেওয়ালে ফের টাঙিয়ে ছুটলাম রয় অ্যান্ড সন্সের বড়সাহেবের অফিসে। ক্যালেন্ডারের গুণেই সম্ভবত ফের নরম হয়ে এলেন। অবিশ্যি আপনার কন্ট্রিবিউশনও কম ছিল না। তা, এ মাসের শেষে অর্ডার রিনিউয়ালের কনফার্মেশন আসার কথা। কনফার্মেশন এসে গেলেই, মেহেনতী ফ্লাওয়ার মিলসের নতুন ক্যালেন্ডারটা ঝুলিয়ে দেব। এই ড্রয়ারেই রেখেছি। মা কালী থেকে শিফ্‌ট করে এবারে ডাইরেক্ট নেতাজীতে এসেছে”।
“ক্যালেন্ডারের গুণে অর্ডার”?, পাঁচুগোপালবাবু কুসংস্কারের ফিরিস্তি বেশ অসহনীয়, “সোজা ঘুষ দিয়ে অর্ডার বের করেছেন। কৃতজ্ঞ থাকুন কোরাপশানের প্রতি”।  
“কোরাপশান তো চারদিকে দীপকবাবু। কোরাপশান আর যাই হোক ডিফারেনশিয়েটিং ফ্যাক্টর নয়। এ বাজারে ব্যবসা করে খেতে গেলে, একটু তুকতাক গোছের উইকনেস থাকবেই। যাক গে। চা নিন”। পাঁচুগোপালবাবু বড় বিরক্তিকর চুকচকাম আওয়াজ করে চা খান। রীতিমত অসোয়াস্তিকর।
“এ’বারে যে জন্য আসা”, চায়ে প্রথম চুমুক দিয়েই বুঝেছি লেবু নেই, “পাঁচুগোপালবাবু। দুঃসংবাদ আছে”।
“দুঃ কেন বলছেন। সংবাদে দুঃ সু হয়না। সবই মা তারার কৃপা”, পাঁচুগোপাল মুখের কালচে ভাবটা অবিশ্যি ঢাকতে পারছিলেন না।
“মিস্টার পোদ্দারের সঙ্গে গতকাল আমি দেখা করেছি”।
“পোদ্দার”?
“সাউথ ক্যালক্যাটা ইলেক্ট্রিকালের ম্যানেজিং ডিরেক্টর, এর মধ্যে ভুলে গেলেন?” পাঁচুবাবু নাম মনে রাখতে বড্ড হিমশিম খান। আমার মত কমিশন এজেন্টদের না পুষলে কবেই তলিয়ে যেতে হত ভদ্রলোককে।
“ওহ্‌ হো। মনে পড়েছে, মনে পড়েছে। তা দীপকবাবু, উনি তো বেশ মাই ডিয়ার মানুষ। গত শনিবারে হুইস্কির বোতল দিয়ে এলাম। আমায় হেসে থ্যাংক ইউ বললেন...”।
“হুইস্কি। ও’খানেই গোল পাকিয়েছেন”।
“সে কী? হুইস্কি নয়”?
“লাখোটিয়ার বড় ছেলে ওর সঙ্গে দেখা করেছিল সিঙ্গল মল্টের বোতল হাতে”।
“সিঙ্গল মল্ট”?
“সঙ্গে দেড় কিলো কাজু”।
“দেড় কিলো? কাজু? এ’দিকে আমি যে প্রতি টনে দশটাকা দেব বলেছিলাম”?
“ও’টা স্ট্যান্ডার্ড রেট পাঁচুবাবু। স্ট্যান্ডার্ড। দালাই লামা এসে এ লাইনে ব্যবসা ধরলেও টনে দশটাকা আন্ডার দ্য টেবিল না দিয়ে ম্যানেজ করতে পারবেন না”।
“আপনি বললেন মদের বোতল দিতে। আমি একটা রিজনেবল দাম দেখে...”।
“উফ”, পাঁচুগোপালবাবু মাঝেমধ্যেই এমন চিটে মার্কা হয়ে যান, “উপঢৌকন রাজার মেজাজে দিতে হয় পাঁচুগোপালবাবু! ঢ্যাঁড়শ কেনার মেজাজে মদ কিনতে নেই”।
“মামলেট খাবেন দীপকবাবু”?
“আবার মামলেট কেন”! কোনও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার মাঝে ঝপ করে খাওয়ার কথা এনে ফেলেন পাঁচুগোপালবাবু।
“খান না। দিশি ডিম আছে অফিসে। নিধুকে ভাজতে বলি”?
“অফিসে দিশি ডিম”?
“ফর স্পেশ্যাল গেস্টস অনলি, আর আপনার ক্ষুরধার বিজনেস ব্রেন না থাকলে আমায় তো মেয়ের বিয়ের মেনুতে মুড়ি মাখা রাখতে হত মশাই। হে হে হে”। কারণে অকারণে গায়ে পড়ে যাওয়াটা ভদ্রলোকের একটা সুতীব্র গাজ্বালানো স্বভাব বটে।
“ভাজতে বলুন। বেশি করে কাঁচালঙ্কা দিতে বলবেন”।
“ওরে নিধু, একটা ডাবল ডিম আর একটা সিঙ্গল ডিম চট করে ভেজে নিয়ে আয়। সিঙ্গল ডিমের মামলেটে লঙ্কা দিবি না, আর ডাবল ডিমেরটায় এক্সট্রা লঙ্কা দিবি, কেমন? ক্যুইক”।
“মামলেটটা খেয়ে উঠবো। দত্তসাহেবের ছোটমেয়ের বার্থডে পার্টিতে যেতে হবে”।
“কমিশনার দত্ত”?
“হ্যাঁ”।
“দীপকবাবু, সাউথ ক্যালক্যাটা ইলেক্ট্রিকালের অর্ডারটা ফস্কে গেলে যে আমি দেউলিয়া হয়ে যাবে”। এই। এই ভদ্রলোকের আর এক রোগ। কথায় কথায় গলা শুকোনো।
“দেখুন, পোদ্দার যে’ভাবে লাখোটিয়ার দিকে ঝুঁকেছে, তা’তে হিসেবে গোলমাল হয়েছে বইকি”।
“কিছু একটা করতেই হবে আপনাকে। অক্টোবরে মেয়েটার বিয়ে”।
“একটা ডেস্পারেট চেষ্টা করতে পারি। তবে, ইয়ে তা’তে আপনার খরচ বাড়বে বই কমবে না”।
“এনিথিং দীপকবাবু। শুধু এই অর্ডারটা...”।
“প্রতি টনে ওকে দশের জায়গায় পনেরো অফার করুন”।
“তিরিশ টাকার তো প্রফিট ভাই দীপক। তা’তে তোমার পাঁচটাকা, আর তারপর যদি পোদ্দারকে দশের বদলে পনেরো দিতে হয় তো...”।
“বাজে কথা রাখুন তো। টনপ্রতি মিনিমাম পঞ্চাশ আপনার পকেটে ঢুকবে”।
“কী আর বলব ভাই, পুলিশ আছে। লেবার অফিস আছে। হ্যাপা কি কম”?
“বেশ, তাহলে এ বছর সাউথ ক্যালক্যাটা ইলেক্ট্রিকাল লাখোটিয়া নিক। পরের বছর না হয় আগে থেকে কিছু একটা...”।
“না না না ভাই দীপক, বেশ। এ’বারের মত পনেরো অফার করে দিন পোদ্দারের ব্যাটাকে”।
“আমারটা সাড়ে সাত। এই কেসে জল আছে অনেক”।
“দিশি ডিমের অমলেট ভাই। ডাবলটা তোমার। তারপরেও বাড়তি কমিশন চাইবে”?
“পাঁচুগোপালবাবু, উপরি আড়াই কি আমি নিজের জন্য চাইছি? সাউথ ক্যালক্যাটা ইলেক্ট্রিকালে আরও খুচরো পাপী কম আছে ভেবেছেন? লাখোটিয়ার গ্রিপ থেকে তাঁদের সরানো কি সহজ কথা ভেবেছেন? সেখানেও আমায় টু পাইস ঢালতে হবে”।
“বেশ। ঠিক আছে। কিন্তু এ অর্ডার আমার চাই”।
“ঠিক আছে। আর মামলেট ভাজা হয়ে গেলে নিধুকে বলুন বাজার থেকে একটা উপহার প্যাক করিয়ে আনবে। কমিশনার সাহেবের মেয়ের জন্মদিনে খালি হাতে তো যাওয়া যায় না”।
“ওরে নিধু, মামলেটটা হলো? তোকে একবার বাজারে যেতে হবে”।

**
-   “হ্যালো, পোদ্দারসাহেব”?
-   “আরে দীপকবাবু, বলুন। পাঁচুবাবু কিছু জানালেন”?
-   “টন প্রতি ছয়ের বদলে আপনাকে আট টাকা দেবে বলেছে”।
-   “মাইরি? আপনার এলেম আছে মানতে হবে, থ্যাঙ্ক ইউ”।
-   “আমার শেয়ারটা ভুলে যাবেন না সাহেব। আপনার তিরিশ পারসেন্ট”।
-   “ভদ্রলোকের এক কথা”।
-   “আর ইয়ে, পাঁচুগোপালবাবু যদি পরে কখনও লাখোটিয়ার কথা জিজ্ঞেস করে বলবেন তাঁর সঙ্গে আপনার নিয়মিত যোগাযোগ হয়”।
-   “হু ইজ লাখোটিয়া”?
-   “সে’টা জেনে আপনার কাজ নেই। শুধু জেনে রাখুন ওই নাম ভাঙিয়েই আপনার জন্য এক্সট্রা দু’টাকা পার টন আদায় করেছি”।
-   “ আই সী। ভেরি স্মার্ট দীপকবাবু”।
-   “ টু পাইস করে না খেলে এ বাজারে টিকব কী করে সাহেব”।
-   “আচ্ছা একটা কথা, আগের দিন পাঁচুবাবু আমায় এক বোতল হুইস্কি দিয়ে গেছেন। এ’দিকে আমার তো আবার সে’দিকে ঝোঁক নেই। আপনার চলে নাকি”?
-   “আপনার প্রসাদ রিফিউজ করি কী করে স্যার। কাল বিকেলের দিকে একবার আপনার অফিসে যাবো। পাঁচুগোপালবাবু কিছু অ্যাডভান্স অফার করেছেন। আমার তিরিশ পারসেন্ট কেটে আপনার টাকা আপনাকে দিতে পারলে শান্তি। তো কালকেই বোতলটা আপনার থেকে নিয়ে নেব’খন”।
-   বেশ।
-   আর ইয়ে। এর মাঝে পাঁচুগোপালবাবু একবার আপনার অফিসে স্কচের বোতল আর দেড় কিলো কাজুসহ ঢুঁ মারতে পারেন।
-   দেড় কিলো কাজু? বলেন কী!
-   শিওর না। আন্দাজ করছি। যদি দেয় তাহলে রিফিউস করবেন না। বোতল আর কাজুর তিরিশ পারসেন্ট আমি আপনার পরের ইন্সটলমেন্ট দিতে যাওয়ার সময় নিয়ে নেব। কেমন”?