Sunday, February 26, 2017

মিছরি আর সৈনিক

- তুমি এসেছো মিছরি?
- উপায় রাখলে কই? বেহায়া। বেওকুফ।
- বসো। বসো।
- কয়েদী মানুষের অত কথা বলতে নেই।
- কিছু খাবে?
- কয়েদখানায় তোমার মাথাটুকু ছাড়া খাওয়ার আর কী আছে বলবে?
- কোণে একটা কুঁজো রাখা আছে। ওই দ্যাখো, ওই দিকে। ইঁদারার জলের মত ঠাণ্ডা।
- আগে তোমার মাথাটুকু চিবিয়ে নিই, তারপর জল দিয়ে ঢকঢক করে গিলে ফেলবো, কেমন?
- হেহ্। কেমন আছো গো মিছরি?
- সুখেই ছিলাম। সংসার। আত্মীয় পরিজন।  তারপর ওই ভূতে কিলোলো। শুনলাম তোমায় কাল ফাঁসি দেবে। যতই শত্রুপক্ষের সৈনিক হও, এককালে প্রেমিক ছিলে। লোকে দুর্নাম রটালে রটাক,ঝপাৎ করে চলে এলাম। তুমি কেমন আছ?
- দিব্যি।
- শহিদ শহিদ গন্ধ পাচ্ছ নিজের গা থেকে?
- ধুস। আমি ভালো অমলেট বানাতে পারি। শাড়ির কুঁচি ধরতে পারি। চট করে বানিয়ে গল্প বলতে পারি। বাথরুমে ক্লাসিকাল গাইতে পারি। লুডোতে দুর্দান্ত চুরি করতে পারি। শহিদ টহিদ হওয়া আমার কম্ম নয়। নেহাত জোর করে সেনাবাহিনীতে নাম লিখিয়ে নিলে। নেহাত জোর করে যুদ্ধে পাঠালে। মন্দ কপাল, তাই ধরাও পড়ে গেলাম।
- ভাগ্যিস দেশ ছেড়ে তোমার হাতে নিজেকে সঁপে দিইনি গো, নইলে কাল আমায় বিধবা হতে হত।
- মিছরি...তুমি আসবে আমি ভাবিনি...।
- বিয়ে না হওয়া ঠিকই ছিল, কিন্তু তুমি থাকবে না..সে'টা ভাবতে পারছি না যে।
- ও সয়ে যাবে।
- আমাদের বিয়ে না হওয়াটা যেমন তোমার সয়ে গেছিল।
- দু'টো দেশে যুদ্ধ লেগে গেল, আর বিয়ে। মিছরি...বড় আশা করেছিলাম, খবর পেয়ে তুমি একবার আসবে।
- এলাম তো..এবার বলো।
- আমার বলার তো কিছু নেই। সৈনিক মানুষ। খুনোখুনিতে আছি। বলাবলিতে নেই। তুমি কিছু বলবে?
- তুমি আমার দেশের মানুষ মেরেছ?
- হুঁ।
- অনেক?
- অগুনতি। কতগুলো মেডেল পেয়েছি জানো?
- আমার ভাইটা মারা গেছে মাস খানেক আগে। ফ্রন্টে।
- তোমার ভাই? প্রদ্যুম্ন? সে তো কবি মানুষ। যুদ্ধে গেল কেন?
- শাড়ির কুঁচি ধরা যার কাজ, সে বর্ডারে গেছিল কেন?
- ওহ্। সে কদ্দিন আগে দেখেছি তাকে। তখন প্রদ্যুম্ন স্কুলে। এখন হয়তো তাকে দেখলেও চিনতে পারতাম না। কে জানে, ওর বুকে আমিই গুলি চালিয়েছি কিনা।
- কে জানে। হতেও পারে। যুদ্ধ তো দেশের সঙ্গে দেশের। সে'খানে কেউ মিছরির ভাই নয়, কেউ প্রেমিক নয়।
- সবাই সৈনিক, আর কেউ কেউ লাশ।
- তুমি আজ সৈনিক,  কাল লাশ।
- লাশ চুমু খেতে পারে না। সৈনিক বরং...।
- শত্তুরের মুখে বড় বড় কথা! দেব জল্লাদ লেলিয়ে?
- তোমাদের দেশের কোনও গান শোনাবে মিছরি?
- কাল আমাদের দেশের হাতে কোতল হবে, আজ তার গানের খোঁজ করছ?
- তোমার দেশ। তোমার খাটের কোণায় রাখা ডায়েরি, ঢাকনা খোলা কলম, চশমা। তোমার জানালার পর্দা এলোমেলো করা হাওয়া। তোমার মায়ের হারমোনিয়াম। তোমার বালিশের ওয়াড়ে চোখের জল। তোমার রান্নাঘরের স্যাঁতসেঁতে দেওয়াল। তোমার বারান্দায় বিরক্তিকর পায়চারী।  তোমার তুমিটুকু দলা পাকিয়ে রয়েছে মিছরি এ দেশে। আমায় হাজার বার ফায়ারিং স্কোয়্যাডের সামনে দাঁড়ালেও মন কেমন ঘুচবে না। ঘেন্না করতে বড় সাহস দরকার মিছরি।
- ভাইটার গায়ে অন্তত কুড়িটা বুলেট ছিল জানো। একজনকে মারতে ক'টা গুলি লাগে বলো তো?
- মিছরি। কেন এলে?
- ভালোবাসি। অবিকল সেই পুরনো দুপুরগুলোর মত। তখনও খুনোখুনি জানতো না কেউ। তবে, ভালোবাসা আর কীই বা পারে। কতটুকুই বা পারে। আমি ভালোবাসার দায়ে আসিনি গো।
- তবে?
- ক্ষমা করবে গো? তোমার বুকে ওরা গুলি চালানোর আগে মন থেকে ঘেন্না মুছে ফেলে ক্ষমা করতে পারবে এ দেশকে? যে দেশ তোমায় খুন করবে?
- মিছরি...।
- কথা দাও ক্ষমা করবে। তুমি ক্ষমা করলে তার পাপ একটু লাঘব হবে।
- কে মিছরি?
- ঠিক সাতমাস পর তার আসার কথা। তোমার মিছরির সন্তান। তার দেশকে ক্ষমা করে যাবে গো?
- তাঁকেও শাড়ির কুঁচি ধরতে শিখিও মিছরি।
- লুডোয় চুরিটাও দিব্যি শিখিয়ে দিতে পারব।
- হেহ্। কাল ভোর নটায় ঘটবে। তখন গান গেও, কেমন? তোমার দেশের ভালোবাসার গান। আমি গান গাইতে পারি না, আমি চিৎকার করে অমলেটের সিক্রেট একটা রেসিপি বলে যাবো'খন। বন্দুকবাজরা মন দিয়ে না শুনলে জব্বর ঠকবে।

Saturday, February 25, 2017

শ্যামল মিত্র ও অনুপবাবু

রাত দু'টো পাঁচ নাগাদ রেডিওটা আপনা থেকেই চালু হয়ে গেল।

শ্যামল মিত্রর কণ্ঠ যে কী সুরেলা।

"ঘুম যখন আসছেই না, তখন অত কেরদানি মেরে পাশবালিশ জড়িয়ে লাভ কী"?

শ্যামল মিত্র রেডিও থেকে জিজ্ঞেস করলেন। অনুপবাবু ঠাহর করতে পারছিলেন না ভূতটা শ্যামল মিত্রের না রেডিও।

"রেডিওদের মারা যাওয়ার ব্যাপার থাকে না ভাই"।
ফের। শ্যামল মিত্র।

এ'বার ধড়মড়িয়ে উঠে বসলেন অনুপবাবু।

"কোন গান শুনবে? ফিল্মের একটা দিয়েই শুরু করি"?

অনুপবাবু হ্যাঁ বা না বলার আগেই শুরু হয়ে গেল
"জীবন খাতার প্রতি পাতায়..."।

ভয়টা কমে আসছিল। শ্যামল অন্তরার দিকে যেতে তিনি পা বাড়ালেন রান্নাঘরের দিকে। এক কাপ কফির দরকার।

অমনি। গান থেমে গেল।

"এ কী! চললেন কোথায়? বসুন। আর দু'টো গাই"।

" নাহ, এক কাপ কফি হলে বেশ হত"।

"কফিতে কী হবে? আমি তো ভূত"।

"না সরি, ইয়ে, আমার জন্য"।

"বোঝো, কখনও শুনেছেন ভূতের কথা ভূত না হয়ে কেউ শুনতে পেরেছে"?

"আজ্ঞে"?

"বসুন না। আরে নার্ভাস হবেন না। মরে যাননি। রাতে শোয়ার আগে রোজ নিউজচ্যানেল শুনে ঘুমোতে যান তো। তাই নিজের অজান্তেই নিজের ভিতরেই ভূত জেনারেট করে বসে আছেন। সেই ভূতের সঙ্গেই দিব্যি কমিউনিকেট করতে পারছি। আরে বসুন। বসুন। আপনার কফি নয়, সঙ্গীত দরকার। বৈঠিয়ে জনাব, বৈঠিয়ে। এবারে একটা ক্লাসিকাল ধরি, কেমন"?

Friday, February 24, 2017

থরের ডর

হাতুড়িটা না পেলেই মন খারাপ হয়ে যায় থরবাবুর। ও'দিকে বনমালী নস্কর লেনে গিয়ে নিজের জিনিস চেয়ে ফেরত নিতেও হাজার ঝ্যামেলা, সে'সব ভাবলেই থরহরিকম্প। এ'দিকে প্রতি বছর এ সময় একবার করে হাতুড়ি গায়েব হবেই।

কিন্তু দেবতাদের অত লাজুক হলে চলে না। হাতুড়িটাই যে আই-কার্ড।  দিন কয়েকের মাথায় ফেরত না এলেই সে'খানে গিয়ে হত্যে দিতে হয়। এ'বারেও হলো। এ'বার সাহস করে ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করেই ফেললেন থর;

"বলছিলাম দাদা, চাদ্দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে পেপারওয়েট, তবুও আমার হাতুড়ির দিকে ফি'বছর নজর পড়ে কেন"?

সিগারেট ধোঁয়ার খান কয়েক রিং বাতাসে ভাসিয়ে উত্তর দিলেন ভদ্রলোক;
"জরুরী দরকারেই তোমার হাতুড়িটা সরিয়ে আনি ভাই। সব পেপারওয়েটে তো আর রাষ্ট্রনেতাদের গোপন চিঠি চাপা দেওয়া ঠিক নয়। এমনিতেই মেসের ফচকে ছেলেগুলোর কিউরিওসিটি প্রয়োজনের চেতে কিঞ্চিৎ বেশি"।

দেবতা হওয়ার আবার এই এক মুশকিল। অন্তর পড়ে ফেলা যায়।

ফস্ করে বলে ফেললেন থর;
"দাদা, ডিভোর্স যখন তোমাদের দু'জনেরই হয়ে গেছে, তখন তো এটাকে আর এক্সট্রাম্যারিটাল বলা যায় না। তা ছাড়া তোমার দেওয়া বন্যা ডাকনামটা তো ভালোই ছিল, লাবণ্য দিদিভাইকে অকারণ রাষ্ট্রনেতা বলে ডাকার কী মানে? প্রতি বসন্তে তুমি একটা চিঠি লিখবে, তার একটা উত্তর আসবে। ব্যাস। তাতে অত লুকোছাপা কেন? থরের হাতুড়ির পেপারওয়েট! বোঝো! মাঝখান থেকে হাতুড়ির অভাবে আমি হয়রান। আরে শেষের পরেই তো শুরু গুরু..."।

বেজার মুখে, হাতুড়ি হাতে, মাথায় একজোড়া গাঁট্টায় পয়দা হওয়া জোড়া আলু নিয়ে সেই মেসবাড়ি ছাড়লেন থর।

Wednesday, February 22, 2017

এক্সেল

দিব্যি মরে উঠে এলাম বডি ফেলে। হাতঘড়িতে এখন রাত পৌনে ন'টা। পঞ্জিকা অনুযায়ী ক্ষতি নেই। কিন্তু আমি রেডি থাকলেও ব্যাটাচ্ছেলে যমদূতের দেখা নেই।

মহামুশকিল। মারা যাওয়ার পর দেখছি ফ্রি ফোর-জি সিমের কনেকশনটাও কাজ করছে না। সে ব্যাটা যতক্ষণ উদয় না হচ্ছে ততক্ষন আমার ভেসে বেড়ানো ছাড়া কোনও কাজ নেই। আত্মার ওজন এতই কম যে পায়চারী করতে মাটিতে নামারও কোনও উপায় নেই।

আধ ঘণ্টার মাথায় যে বস্তুটির দেখা মিললো সে'টা একটা হাওয়ায় পতপত করে ওড়া এমএস-এক্সেল স্প্রেডশিট। সে ব্যাটা আবার কথা বলে।

"এসে গেছি", বলে গায়ের উপর এসে পড়লো সে।

"কেন? এসে কী হবে?"

"ভি-লুক আপ করে আপনার খোঁজ পেলাম। টাটকা মড়া। নিয়ে যেতে এসেছি"।

"হোয়াট ননসেন্স, শিংওলা যমদূত কই"?

"ও'সব তো গত সেঞ্চুরির ব্যাপার স্যার। চলুন। আর দেরী হলে নরকের এন্ট্র‍্যান্স বন্ধ হয়ে যাবে। তখন আবার আপনাকে পিভট টেবিলে লুকিয়ে রাখতে হবে"।

"নরক? স্বর্গে শর্টলিস্ট হল না ভাই এক্সেল"?

"অত প্রমোশন প্রমোশন করলে স্বর্গ জোটনা স্যার। জিভে দেখুন। এখনও চেরী ব্লসম শু-পালিশের ছোপ লেগে আছে"।

" আই সী, নরক। বেশ, গেলেই হয়। আচ্ছা, সে'খানে আছে কী? গরম তেলের কড়াই? পাপীরা কনস্ট্যান্ট ডিপফ্রাইড হচ্ছে"?

"কড়াই ফড়াই এখন মিউজিয়ামে স্যার। নরকে এখন চারদিকে শুধু ল্যাপটপ ছড়ানো। আর সব পাপী সেখানে বসে পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন বানাচ্ছে। দিন রাত। রাত দিন"।

"হোয়াট দ্য হেল, বলেন কী"?

"নরক দিনদিন টাফ হয়ে যাচ্ছে স্যার"।

"স্বর্গে তাহলে কী কেস ভাই এক্সেল"?

"মেঘলা বিকেলের বাবুঘাট স্যার। চিরমেঘলা। চিরবিকেল। সে'খানে সল্টেড বাদাম বিক্রি"।

"ওহ্"।

"ও'সব বেশি ভাববেন না স্যার। মনখারাপ হবে। তাও তো স্বর্গে আনলিমিটেড ফ্রি লেবুজলের কথা বলিইনি। যাক গে। আপনার কপালে পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশন। চলুন এবার"।

"আর ভাই...চলো"।

Tuesday, February 21, 2017

পিতৃভাষা বনাম মাতৃভাষা

মাতৃভাষা। পিতৃভাষা নয় কিন্তু। আমাদের ভালোবাসা আবেগ সমস্তটুকু মাতৃভাষাকে ঘিরে।

পিতৃভাষা হলে সে ভাষার জন্য এমন প্রাণপাত করা সম্ভব হত না। পিতৃভাষা দিয়ে মাটি কোপানো যেতে পারত, মাথা ফাটানো যেতে পারত। কিন্তু সে ভাষাকে তুলিকলম ধারণ করে উঠতে পারত না।  

আর এই ব্যাপারটা পুরোপুরি বুঝে উঠতে কেটে গেল এতগুলো বছর। তবে এদ্দিনে স্থির বুঝেছি যে ব্যাপারটা যদি মাতৃভাষার বদলে পিতৃভাষা হত, তাহলে একুশের ফেব্রুয়ারির দিনে কালো ব্যাজ লাগিয়ে ঘুরতে হত। 

তা, পিতৃভাষা হল না কেন? 

পরিস্থিতি ১ঃ
রোগা হয়ে গেছি। 

মা - 
"তোর অমানুষিক খাটনি যাচ্ছে রে। খাওয়াদাওয়াটা অবহেলা করিস না বাবা। আর দিনে এক গ্লাস করে দুধ খেতে তোর এত আপত্তি কীসের বল তো"?

বাবা-
"দিন দিন টিকিটব্ল্যাক করা চেহারা হয়ে যাচ্ছে তো রে ব্যাটা রাস্কেল"।


পরিস্থিতি ২ঃ
মোটা হয়ে গেছি।

মা-
"ছেলের আমার রাজপুত্রের মত চেহারা"। 

বাবা-
"তোর বোধ হয় আর হাইট বলে কিছু রইল না, না রে? শুধুই ডায়ামিটার"। 

পরিস্থিতি ৩ঃ
রেজাল্ট বেরিয়েছে। 

মা-
"নম্বর যা খুশি হোক, তুই মানুষের মত মানুষ হ খোকা"। 

বাবা- 
"হাফ ন্যাড়া করে ইলেক্ট্রিক পোলে টাঙিয়ে রাখা উচিৎ ব্যাটাচ্ছেলেকে। গরু যে কিনে দেব তারও উপায় নেই, গরুদের ইনসাল্ট হবে"। 

পরিস্থিতি ৪ঃ
ডান হাতের হাড় ভেঙ্গেছে।

মা-
*হাউ হাউ করে কান্না*

বাবা-
"কে বলেছিল মোটরসাইকেলে হাত দিতে? স্কাউন্ড্রেলটার বাঁ হাতের হাড় আমি ভাঙবো"। 

পরিস্থিতি ৫ঃ
জ্বর।

মা-
"মাথা ব্যথায় খুব কষ্ট হচ্ছে বাবা? বাম লাগিয়ে দিই"?

বাবা-
"সামান্য টেম্পারেচারে এমন ছটফট? আমার কপালেই এমন নেদু একটা ছেলে জুটলো? ডিসগ্রেস্‌"। 

**

অতএব। 
মোদের গরব মোদের আশা
আ মরি মাতৃভাষা।